উপেন্দ্রকিশোর সংখ্যা

অভীক দত্ত
ছোটবেলায় গল্পের বই পড়ার শুরুটাই আমার হয়েছিল উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী দিয়ে। দুটো বই। যার একটাতে ছিল টুনটুনির গল্প, গল্পসল্প ইত্যাদি, আর আরেকটাতে ছিল ছেলেদের রামায়ণ, ছেলেদের মহাভারত, মহাভারতের গল্প, পুরাণের কথা ইত্যাদি। টুনটুনির গল্প, জোলার গল্প, কিংবা ওই শিয়াল পণ্ডিত কিংবা কুমীরের গল্পের কথা ভাবলে এখনো শৈশব জেগে ওঠে। বিশেষত এই সংখ্যাটা করতে গিয়ে আমি যতবার এই প্রসঙ্গে ভেবেছি ততবার আমার ক্লাস থ্রি ফোরের সেই মজাদার দিনগুলির কথা মনে হয়েছে।পরে অবশ্য মনে হয়েছে এই মজন্তালী সরকার কিংবা সিংহের মামা আমি নরহরি দাস চরিত্রগুলি কি আসলে রূপক? এই চরিত্রগুলি আসলে তো আমাদের সমাজে সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কখনও কখনও তাই কোন গল্প পড়ে মনে হয়েছে এগুলি আসলে ঈশপের গল্পের মতোই। আপাতদৃষ্টিতে সহজ কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে এর তল পাওয়া ভার।ভাল মন্দের বিচার তৈরি হয়, চরিত্র গঠন হয়।
তবে আমি বেশি মজেছিলাম রামায়ণ, মহাভারতের গল্পে। এত চমৎকার গল্প বলার ভঙ্গি এবং “মিষ্টি” (আমি ইচ্ছা করেই এই শব্দটা ব্যবহার করলাম) সাধুভাষার প্রয়োগে মহাভারত এবং রামায়ণ অত্যন্ত সুখপাঠ্য। শৈশবের এবং কৈশোরের শুরুটা অনেকটাই জুড়ে রয়েছে এই আখ্যান।অবশ্য মহাভারতটা আরও বারবার পড়েছি, যুদ্ধের জায়গাটা, কিংবা বনপর্ব। রাক্ষসের সাথে ভীমের যুদ্ধের জায়গাগুলি ভারী মজাদার লাগত। তারপর পড়েছি মহাভারতের গল্প। মহাভারতের ভেতরেও যে এত গল্প ছিল সেটা কে জানত? নল-দময়ন্তী কিংবা সাবিত্রী-সত্যবান অথবা আস্তিক মুনির গল্প আমার মনে বেশ ছাপ ফেলেছিল। বেশ মনে আছে কলিকে জয় করে নলের দময়ন্তী লাভ কিংবা সাবিত্রী সত্যবানের সেই মিলনান্তক গল্প। “যারপরনাই আনন্দিত হলেন”, “তিনি অত্যন্ত প্রীত হলেন” এই ভাষাগুলির প্রয়োগ অত্যন্ত সুন্দর।
এটা আমার পরে বারবার মনে হয়েছে, মহাভারতের মত এত চরম “অ্যাডাল্ট” জিনিস ছোটদের মত করে পরিবেশনা করা যার তার কর্ম নয়। এই কৃতিত্ব উপেন্দ্রকিশোর অবশ্যই পাবেন। এ এক অসামান্য কাজ। অবশ্য তাঁর অসামান্য কাজের কি শেষ আছে? “সন্দেশে”র মত পত্রিকার জন্য বাঙালি পাঠক তাঁর কাছে আজীবন ঋণী হয়ে থাকবে। সুকুমার রায় যথার্থই বলেছেন “তিনি শিশুদের জন্য যে কাজ করিয়াছেন, জীবনে যদি আর কোন কাজ না করিতেন, তবুও শুধু এই কাজই তাঁহাকে আমাদের কৃতজ্ঞতা ও সম্মানের অধিকারী করিত”।
এই সংখ্যা তাই আমাদের কেবলমাত্র উপেন্দ্রকিশোরের ১৫১তম জন্মবার্ষিকী পালনের জন্য নয়। এই সংখ্যা তাঁকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য করা। থাকল উপেন্দ্রকিশোর সম্পর্কিত বিভিন্ন স্মৃতিচারণা যা তাঁকে জানতে আরও সাহায্য করবে, পুনর্মুদ্রণ সহায়তার জন্য আমাদের অগ্রজপ্রতিম কৌশিক মজুমদারকে ধন্যবাদ জানিয়ে ছোট করতে চাই না। তবে তাঁকে আমরা কথা দিয়েছি, ভবিষ্যতে একটি মুদ্রণ সংখ্যা করব উপেন্দ্রকিশোরের উপরে যেখানে আরও জানা-অজানা বহু তথ্য পাঠকদের কাছে আমরা উপস্থাপিত করতে পারব। থাকল এই প্রজন্মের উপেন্দ্রকিশোর সম্পর্কিত তিনটি লেখা, থাকল টুনটুনির গল্প এবং অবশ্যই সেই দিনগুলির কথা মনে রেখে তাঁর বেশ কিছু লেখার পুনর্মুদ্রণ।
পাঠকের কাছে আরও আবেদন জানাই, আমাদের উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী মুদ্রণ সংখ্যার জন্য যদি আরও তথ্য সহায়তা করেন তবে আমরা চিরকৃতজ্ঞ থাকব।
ভেসে চলুক...

আপনার মতামত জানান