টুনটুনিদের দেশে

সরোজ দরবার

বাংলাদেশের শিশু কিশোরের সন্ধেগুলোয় কার্টুন চ্যানেলের স্বায়ত্তশাসন কায়েম তখন ছিল প্রায় স্বপ্নের অতীত। দিনভোর দস্যিপনার ক্লান্তি যখন ঝুঁঝকো আঁধারে মাখামাখি হয়ে চোখের পাতায় ঘুম নামাত, তখনও উনুন থেকে ভাতের হাঁড়ি নামেনি। অতএব আর একটু জাগিয়ে রাখার খাতিরেই, উজাড় হত মা-ঠাকুমার গল্পের ঝুলি। এভাবেই হে বঙ্গ ভান্ডারে তব কত বিবিধ রতন যে জমা হয়েছিল, তা সংকলন করার জন্য, বাংলা সাহিত্য নিশ্চিতই দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের কাছে কৃতজ্ঞ। ১৯০৭-এ ‘ঠাকুমার ঝুলি’ প্রকাশের প্রায় বছর চারেকের মধ্যেই প্রায় এক কথাই নিবেদন করে ‘টুনটুনির বই’-এর গ্রন্থকার লিখলেন, ‘সন্ধ্যার সময় শিশুরা যখন আহার না করিয়াই ঘুমাইয়া পড়িতে চায় , তখন পূর্ববঙ্গের কোনো কোনো অঞ্চলের স্নেহরূপিনী মহিলাগণ এই গল্পগুলি বলিয়া তাহাদের জাগাইয়া রাখেন। সেই গল্পের স্বাদ শিশুরা বড় হইয়াও ভুলিতে পারে না। আশা করি আমার সুকুমার পাঠক পাঠিকাদেরো এই গল্পগুলি ভালো লাগবে।’ হ্যাঁ এতক্ষণে আমরা উপেন্দ্রকিশোরের চির শিশু কিশোরের দেশে ঢুকে পড়েছি। সালতারিখের সালতামামি মেলালে অবশ্য আর একটু আগেই সেখানে যেতে হবে। যখন উপেন্দ্রকিশোর লিখলেন ‘ছেলেদের রামায়ণ’।


শিশুসাহিত্যের শৈশবে

কিন্তু তার আগে অন্তত আমরা স্মৃতির ঘরে যে ধন ছিল, নিজের ঘরেও সে ধন পেয়ে একটু উল্লসিত হই। হওয়ার যথেষ্ট কারণও আছে বৈকি। ‘ছেলেদের রামায়ণ’ থেকে টুনটুনির গল্প যখন লেখা হচ্ছে, তখন বাংলা শিশুসাহিত্য টলমল পায়েও হাঁটতে শেখেনি। ১৮১৮ সালে বেরিয়ে গেছে ‘নীতিকথা’। ঠিক শিশুসাহিত্যের বই নয়, মূলত পাঠ্যবই হলেও এই বইখানাই বাংলাতে শুধু ছোটদের জন্যই লেখা একটা বই। সুতরাং এই বইটিকে বাংলা শিশুসাহিত্যের গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার বলা যেতে পারে। অতঃপর বিদ্যাসাগর মশায়ের কল্যাণে আমাদের ‘বোধোদয়’ ও ‘বর্ণপরিচয়’ দুইই হবে যথাক্রমে ১৮৫১ ও ১৮৫৫ সালে।অক্ষয় কুমার দত্তের ‘চারুপাঠ’ ও মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশুশিক্ষা’ থাকল এই তালিকায়। সবই ছোটদের জন্য লেখা বই, তবে ছোটদের বই নয়। সেই যে আধো ঘুমে শোনা মা-ঠাকুমার মুখের গল্পের সোয়াদ না মেলায় শিশুসাহিত্য খানিকটা শিশু হয়েই ছিল। ‘ছেলেদের রামায়ণ’ এসে সে শিশুকে যেন হাঁটি হাঁটি পা পা করে একেবারে হাঁটতে শিখিয়ে দিল।


সে ও ‘সখা’

বাংলা সাহিত্যের ঘরদুয়ারে শিশুসাহিত্যের এই হামা দেওয়া অবস্থা উপেন্দ্রকিশোরের চোখ এড়ায়নি। বিএ ক্লাসের ছাত্র হয়েই তাই কলম ধরেছিলেন। ১৮৮৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হল বাংলা ভাষায় সবচেয়ে পুরনো ছোটদের পত্রিকা ‘সখা’। সম্পাদক ছিলেন প্রমদাচরণ সেন, শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দচরন সেন এবং নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্জ। এই পত্রিকার লক্ষই ছিল বাংলা শিশু সাহিত্যের আড় ভাঙানো। সেখানেই অভিষেক হল উপেন্দ্রকিশোরের। সম্ভবত পত্রিকা মুদ্রণের গুণগত মান সম্বন্ধেও তাঁর নিজস্ব ভাবনা এই সময় থেকেই দানা বাঁধে। ‘সখা’ পত্রিকা চলেছিল বছর ১১, পরে ‘সাথী’ পত্রিকার সঙ্গে মিলেমিশে ‘সখা ও সাথী’ হিসেবে (১৮৯৪) প্রকাশিত হতে শুরু করে। সে যাই হোক, এই পত্রিকাই বাংলা শিশুসাহিত্যকে তার চিরসখা উপহার দিয়ে গেল বললে অত্যুক্তি করা হবে না।


ছেলেদের রামায়ণ বা মহাভারত!

ছেলেদের অর্থাৎ ছোটদেরই তো! ভাষা যেন কাপাস তুলোর মতো উড়তে উড়তে একটার পর একটা কান্ড, একটার পর একটা পর্ব পেরোতে পেরোতে ১০০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেল। নাহ এতটুকু সময়ের ভার জমা পড়েনি তো। এ চলন তো ছোটদেরই মানায়। মনে করুন সীতার অগ্নিপরীক্ষার মতো জটিল একটি বিষয়। তার উপস্থাপনা হল এরকম- ‘ সীতা আসিলে রাম তাঁহাকে বলিলেন, ‘সীতা তুমি রাক্ষসদিগের সঙ্গে এতদিন ছিলে। এখন তুমি আমাদিগকে আগের মতো ভালোবাসো কি না কি করিয়া বলিব? আমি রাবণকে মারিয়া তাহার উচিত শাস্তি দিয়াছি। এখন তোমার যেখানে ইচ্ছা, সেইখানে চলিয়া যাও।’ কোথায় গেল মহাকাব্যের গুরুভার, আর কোথায়ই বা আসন্ন অগ্নিপরীক্ষার ন্যায়-অন্যায় বিচারবোধ, বরং এই বাচনভঙ্গিতে যেন মিশে আছে যে কোনও ‘বালকদিগের সর্দার’-এর কন্ঠস্বর। ঠিক এইখানটায় বাজিমাত উপেন্দ্রকিশোরের। ছোটদের জন্য লেখা থেকে ছোটদের আপন লেখা হয়ে ওঠার মধ্যের ব্যবধানটুকু তিনি এমন চুপিসাড়ে অননুকরণীয় ভঙ্গিতে পেরিয়ে যান যে শতবর্ষের সীমানাও তাঁর সামনে ছোট হয়ে যায়।
তবু যে কোনও সাহিত্যিকের থেকে শিশুসাহিত্যের দায় বোধহয় আর একটু বেশিই থাকে। কারণ তাঁরা অনাবাদী জমতে সোনা ফলানোর গুরুভারটি নেন। তাই শুধু ছেলেদের রামায়ণ মহাভারত হয়েও উপেন্দ্রকিশোরের সৃষ্টি আরও গুঢ় উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়। ছেলেদের রামায়ণ প্রকাশ পেল মোটামুটি ১৮৯৪-৯৫ সালে। ততদিনে বাংলা সাহিত্য পেয়ে গেছে ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২)। ঔপনিবেশিক বাংলা তথা দেশের প্রেক্ষাপটে দেশের ঐতিহ্যের প্রতি যে দিকনির্দেশ ছিল বঙ্কিমের লেখনিতে, সে দায়িত্বই পালন করলেন উপেন্দ্রকিশোর। মহাকাব্যের মতো ইতিহাসের আয়নাকে তিনি ছোটদের সামনে তুলে দিলেন, ছোটদের মনের মতো করেই। তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির বড় অংশই এই ঐতিহ্য তুলে ধরার কাজে ব্যবহৃত। ‘মহাভারতের কথা’ র ভূমিকায় তিনি বলেছেন, ‘মহাভারতের অবান্তর গল্পগুলো লইয়া এই পুস্তক লিখিত হইল। এ সকল গল্পের প্রত্যেকটির আগাগোড়া অবিকল রাখিয়া বালক বালিকাদিগের নিকট বলা অসম্ভব। আর , তাহার বিশেষ প্রয়োজন আছে বলিয়াও বোধ হয় না, কারণ মহাভারতের ভিতরেই এক গল্পের নানারূপ দেখিতে পাওয়া যায়।’ এই বালক বালিকাদিগের কাছে বলার দায় বা প্রয়োজনীয়তা শুধু উপেন্দ্রকিশোরের সাহিত্যসত্তার নয়, সময়েরও বটে। ১৩১৬ –এর আশ্বিনে সুকিয়া স্ট্রিটের ঠিকানা থেকে এ ভূমিকা যখন উপেন্দ্রকিশোর লিখেছিলেন, তার বেশ কয়েক বছর আগে (১২৯৪) রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবন্ধে জানিয়েছেন, ‘ বিশুদ্ধ সাহিত্যের মধ্যে উদ্দেশ্য বলিয়া যাহা হাতে ঠেকে তাহা আনুষঙ্গিক। এবং তাহাই ক্ষণস্থায়ী। ... সৃষ্টির উদ্দেশ্য পাওয়া যায় না, নির্মাণের উদ্দেশ্য পাওয়া যায়।’
সুতরাং ঔপনিবেশিক প্রেক্ষিতের সঙ্গে ছেলেদের মহাভারত রামায়ণের মিলিয়ে দেখাটা ঐতিহ্যের পুর্ননির্মাণের উদ্দেশ্য হিসেবেই দেখা যাক বরং।


এক টুনিতে টুনটুনাল

রামায়ণ, মহাভারত, পৌরাণিক কাহিনি, সেকালের গল্প, বিজ্ঞানের কথা – সব মিলিয়ে উপেন্দ্রনাথের গোটা সাহিত্য সমুদ্রকে যদি মন্থন করা যায়, তবে আমার মতে নিশ্চিতই সেখান থেকে অমৃত হয়ে উঠে আসবে ‘টুনটুনির বই’।উপমাটা নেহাতই পুরনো, তবে বাঙালি শিশু কিশোর যারা ওই টুনটুনি, শিয়াল পন্ডিতের জগতের স্বাদ পেয়েছে, তারা অন্তত এ ব্যাপারে দ্বিমত হবে না। ‘সিংহের মামা নরহরি দাস’ কিংবা মজন্তালী সরকারের দুনিয়াটা আগাগোড়া শিশু কিশোরের মনের রঙে রঙানো। তাই সেখানে মর‍্যাল অব দ্য স্টোরি বলে দিতে শেষে ফুটনোট দিতে হয় না। নাক কাটা রাজার সাজায় কে দুষ্টু বুঝে নিতে নিমেষমাত্র লাগে না শৈশব-কৈশোরের। অবশ্য শেয়াল পন্ডিতের কুমিরছানা দেখানো বা ‘ইক্ষুর ফল’-এর রঙ যে আদতে কীভাবে পালটে যেতে পারে সে তো অনেক পরের কথা। কিন্তু টুনটুনি, চাষি, চাষি বউ, বাগের ঘরে মানুষ বউ, বাঘ বর, উকুনে বুড়িদের নিয়ে উপেন্দ্রকিশোর ছোটদের সামনে যে জগৎ তুলে ধরেন তা যেন রূপকথা থেকে খানিক স্বতন্ত্র, অনেকখানি বিশ্বাসযোগ্যভাবে ঘরোয়া লোককথা। তবে কোনওভাবেই তা নিছক কল্পকথা নয়। এ দুনিয়ার দুটোই রং-সাদা আর কালো। একদা ময়মনসিংহের কামদারঞ্জনের(কাকা হরিকিশোর রায় দত্তক নিয়ে নাম দেন উপেন্দ্রকিশোর) গল্প শোনার দুনিয়াও হয়ত ঠিক এমনই ছিল। পূর্ববঙ্গের মা ঠাকুমাদের গল্প বলার রীতি কেমন ছিল কে জানে, তবে উপেন্দ্রকিশোরের সঙ্গে দেখা না হলে বাংলা সাহিত্যের এমন এক নিজস্ব কল্পজগতের সঙ্গে এমন করে দেখা হত না। আর গুপি বাঘার সঙ্গে আমাদের এমনকী সত্যজিতেরও যে দেখা হতই না সে তো বলাই বাহুল্য।


ছাপাখানা-সন্দেশ

হাফটোন ব্লক এর প্রবর্তন বাংলা মুদ্রণশিল্পকে কতটা গতি দিয়েছিল- তা ইতিহাস মনে রেখেছে। বস্তুত সাহিত্যকীর্তির বাইরে শুধু মুদ্রণজগতে তাঁর স্বকীয়তা, ইউ রায় এন্ড সন্সের প্রতিষ্ঠা চিনিয়ে দেয় বিজ্ঞানমনস্কতা ছাড়াও আপাদমস্তক স্বাদেশিক চিন্তাধারার একজন মানুষকে। উপেন্দ্রকিশোর শুধু বর্জন আর পোড়ানোর স্বদেশিয়ানাতে যে বিশ্বাস করতেন না তা সহজেই অনুমেয়। ছাপা বিষয়ে তার প্রবন্ধ যে বিলেতের পেনরোজ ম্যাগাজিনে দারুণ প্রশংসা পেয়েছিল, সে কথা সবার জানা। আর যে ভাবে তিনি প্রেসের প্রতিষ্ঠা(১৮৯৫) করে ব্যবসা শুরু করেছিলেন, তার তুলনা সম্ভবত একমাত্র ঠাকুরবাড়ির কর্মদ্যোগের সঙ্গেই মেলে। তাই বন্ধু রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য থেকে তুলনা খুঁজে বরং বলা যায়- উপেন্দ্রকিশোর বিদ্যা আর শখের আড়ম্বরে ভূপতিও নন, স্বদেশিয়ানায় সন্দীপও নন, বরং কর্মযোগে অনেকটাই নিখিলেশ।
১৯১৩ সাল বাংলা সাহিত্যে নিসন্দেহে ল্যান্ডমার্ক। তার প্রথম কারণ যদি হয় রবীন্দ্রনাথের নোবেল্প্রাপ্তি তবে দ্বিতীয় অবশ্যই ‘সন্দেশ’ পত্রিকার আত্মপ্রকাশ। ছোটদের পত্রিকা আগে দু একটা(মুকুল, বালক) থাকা সত্ত্বেও সন্দেহ নেই যে, সন্দেশ পত্রিকাই বাংলা শিশুসাহিত্যের ধারাকে বাংলার দিকে দিকে সার্থক ভাবে প্রবাহিত করেছিল। সুতরাং রবি ঠাকুরের দেওয়া ‘শিশুশাহিত্যের ভগীরথ’ অভিধা বোধহয় উপেন্দ্রকিশোরের ক্ষেত্রেই একেবারে আক্ষরিকভাবে সুপ্রযুক্ত।
আমার কথাও ফুরিয়ে গেল
কল্পজগতের গল্পমালা তৈরির নিরিখে কখনও উপেন্দ্রকিশোরের তুলনা আসে ড্যানিশ লেখক এইচ সি অ্যান্ডারসনের সঙ্গে। তাঁর ‘ফেয়ারি টেলস’রা অন্তত ১২৫ টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১২৫ তো দূরে থাক, উপেন্দ্রকিশোরের ঘরের ছেলেরাই আজ জাদু ঝাঁটার দাপটে টুনটুনিদের খেদিয়ে দিয়েছে। তাতে অবিশ্যি টুনটুনির কিছু যায় আসে না। হালফিল নাকউঁচু মধ্যবিত্তের ঘরে জন্ম নেওয়া বাঙালি শৈশবের নাকখানাই যা কাটা যায়। দেখে বাবা চেঁচায়, মা চেঁচায়। ডাক্তার এসে ওষুধ দিয়ে , পটি বেঁধে অনেক কষ্টে বেচারির প্রাণ বাঁচায়। দেখে বইয়ের পাতা থেকে দুঃখিত টুনুটুনি শুধু অস্ফুটে বলে ওঠে-
নাক কাটা বাছা রে
আহা, কী বিষম সাজা রে!
উপেন্দ্রকিশোর না পড়তে পাওয়া বাঙালি শৈশব আসলে তো বিনাদোষে দন্ডপ্রাপ্তই।

আপনার মতামত জানান