সমাপতন

প্রিয়াঙ্কা রায় বন্দ্যোপাধ্যায়


প্রবীরের মনমেজাজ খারাপ। গত মাসে বাবা কলেজের মাইনে আর খরচের টাকা পাঠিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। এ মাসে হয়ত আর টাকা পাঠাতে পারবেন না। খরচ সে চালিয়ে নিতে পারবে, ট্যুইশন আছে কয়েকটা হাতে। কিন্তু বিলাসিতা এক ধাক্কায় অনেকটা কমাতে হবে। বিলাসিতা বলতে কিন্তু বিশাল কিছু নয়, মাসে দুমাসে কয়েকটা সিনেমা, হিন্দি-বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে - একটু দেব আনন্দ, একটু উত্তম কুমার, একটু লরেন্স অফ অ্যারেবিয়া।
প্রবীরের গানের গলাটি চমৎকার। একলব্যের মত সে মহম্মদ রফির বন্দনা করে যায়, সকাল বিকেল রেডিও শুনে তাঁর গান প্র্যাক্টিস করে। আর কলেজের পর অনাদি কেবিনে বসে বন্ধুদের শোনায়। ঠিক ঠিক তুলতে পারলেই মোগলাই বা কাটলেট বাঁধা। তবে এবারে তার ফাইনাল ইয়ার, পড়ার চাপ কিঞ্চিৎ বেশি। আর্থিক অনটনের জন্যে বাবা চান সে ব্যাঙ্কে চাকরি নিক, মেসোমশায় ব্যাঙ্কে আছেন, তাকে নিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু প্রবীর চায় সিনেমায় গান গাইতে। তার এক বন্ধু আছে মৃণাল, অভিনয় করে। দুজনে মিলে বাংলা সিনেমায় নবজাগরণের স্বপ্ন দেখে।
মৃণাল তিনদিন কলেজে আসেনি। সবাই চিন্তা করলেও প্রবীর জানে সে কোথায়। কাউকে বলতে বারণ করে মৃণাল গেছে উত্তম কুমারের একটা সিনেমায় ছোট্ট পার্ট করতে। আগে থেকে জানলে লোকে ক্ষ্যাপাবে বলে সে শুধু প্রবীরকে বলেছে। সিনেমাটা রিলিজ করলে কলেজে হইচই পড়ে যাবে। বাংলা সিনেমায় এখনও স্টুডিয়োর অভিনেতারাই জুনিয়ার আর্টিস্ট হন, একজন আনকোরা কলেজের ছেলে সুযোগ পেয়েছে জানলে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে।
আনমনা হয়ে কলেজ হস্টেলের উঠোনে পায়চারি করছিল প্রবীর। একটু আগে মৃণাল এসেছিল দেখা করতে। খুবই বিমর্ষ আর মনমরা হয়ে। শুটিংয়ে সে চান্স পায়নি, শেষ মুহুর্তে উত্তম কুমার নিজেই নাকি তার কন্ঠস্বর শুনে বাতিল করে দিয়েছেন। স্বপ্নের নায়ক, যাকে সে রোজ পুজো করে, তাঁর থেকে এরকম অপমান পেয়ে মৃণাল মর্মাহত। সে কলেজ, পড়া, বাড়ি, মায় জীবন অব্দি ছেড়ে দেবে বলছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেন গেটের সামনে এসে প্রবীর একটা সিগারেট ধরালো। সে মৃণালের কথাই ভাবছিল, কী হবে ছেলেটার কে জানে। হঠাৎ কলেজের ছাদ থেকে একটা দেহ তীরবেগে নীচে পড়ল, কেউ ঝাঁপ দিয়েছে। প্রবীর এগিয়ে গিয়ে দেখল, দেহটা মৃণালের।

আপনার মতামত জানান