ওকতাভিও পাজ এবং কার্লোস ফুয়েন্তেস-এর ঝগড়া

মলয় রায়চৌধুরী


বিদেশি সাহিত্যিকদের মাঝে নিজেদের বিশ্ববীক্ষার সমর্থনে পারস্পরিক বিবাদ-বিতর্কের কথা যেমন শোনা যায় তেমনটা বাঙালি লেখকদের ক্ষেত্রে বড়ো একটা দেখা যায় না । আমরা পড়েছি গোর ভিডাল আর নরম্যান মেইলারের বিবাদ এমনকি হাতাহাতি, সালমান রুশডি - জন আপডাইক বিবাদ, হেনরি জেমস - এইচ জি ওয়েল্স বিবাদ, জোসেফ কনরাড - ডি এইচ লরেন্স বিবাদ, জন কিটস - লর্ড বায়রন বিবাদ, চার্লস ডিকেন্স - হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যাণ্ডারসন বিবাদ ইত্যাদি ।
বাঙালি সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, মনে করেন মানুষ ও প্রাণীরা এসেছে অন্য গ্রহ থেকে, অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য । ওই একই দপতরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর পাশের কেবিনেই বসতেন যিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন না, ডারউইনের তত্বে বিশ্বাস করতেন, বামপন্হী ছিলেন । অথচ পরপস্পরের লেখা আলোচনার সময়ে এই বিষয়গুলো ওনাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যেত, যেন সাহিত্য আলোচনায় লেখকের বিশ্ববীক্ষার কোনো প্রভাব থাকে না । অধিকাংশ বাঙালি সাহিত্যিক এই ধরণের ভাই-ভাই ক্লাবের সদস্য ।
বাসুদেব দাশগুপ্ত আর সুভাষ ঘোষ মাও জে ডং, সাংস্কৃতিক বিপ্লব, চিন, মার্কসবাদ ইত্যাদি নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় কতো তর্কাতর্কি করেছিলেন কিন্তু পরস্পরের লেখালিখি সম্পর্কে লিখতে বা বলতে গিয়ে তাত্ত্বিক বিবাদকে এড়িয়ে গিয়ে সেই একই ভাই-ভাই ক্লাব সমালোচনার আশ্রয় নিয়েছেন ।

আমি যে বিবাদটি এখানে আলোচনা করছি, তা মেকসিকোর দুই প্রখ্যাত সাহিত্যিক ওকতাভিও পাজ এবং কার্লোস ফুয়েন্তেসের ; প্রথমজন কবি এবং দ্বিতীয়জন ঔপন্যাসিক । তাঁরা পঞ্চাশের দশকে বন্ধু ছিলেন, কিন্তু ওকতাভিও পাজ-এর কমিউনিজম বিরোধিতা এবং কার্লোস ফুয়েন্তেসের বামপন্হী চিন্তাধারার সংঘর্ষে দুজনের মাঝে অসেতুসম্ভব বিবাদ দেখা দেয়,. যা তাঁদের মৃত্যু পর্যন্ত মিটমাট হয়নি ।
ওকতাভিও পাজ ( ১৯১৪ - ১৯৯৮ ) ছিলেন মেকসিকোর কবি ও কূটনীতিক । ১৯৯০ সালে তিনি সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন । স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়ে প্রথম দিকে তিনি রিপাবলিকানদের সমর্থন করতেন কিন্তু রিপাবলিকানদের হাতে তাঁর এক বন্ধুর মৃত্যুর পর রিপাবলিকানদের সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটে । ১৯৫০এর শুরুর দিকে প্যারি শহরে থাকার সময়ে তিনি ডেভিড রুসে, আঁদ্রে ব্রেতঁ এবং আলবেয়ার কামুর সংস্পর্শে আসেন এবং জোসেফ স্ট্যালিন ও কমিউনিস্ট সরকারগুলোর বিরুদ্ধে লেখালিখি আরম্ভ করেন ।
বাড়িতে তাঁর দাদুর বিশাল গ্রন্হসংগ্রহের দ্বারা শৈশবে প্রভাবিত হয়েছিলেন ওকতাভিও পাজ । দাদু ছিলেন ঔপন্যাসিক ও পপকাশক । বিশের দশকে তিনি গেরারদো দিয়েগো, হুয়ান রামন হিমেনেথ, আনতোনিও মাশাদো প্রমুখ স্প্যানিশ লেখকদের রচনার সঙ্গে পরিচিত হন। চল্লিশের দশকে টি এস এলিয়টের ‘দি ওয়েস্ট ল্যাণ্ড’ তাঁকে সে সময়ে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে এবং তিনি মেকসিকোর শ্রমিকদের জীবন নিয়ে ১৯৪১ সালে লেখেন ‘এনত্রে লা পিয়েদ্রা লা ফ্লোর’ শিরোনামে দীর্ঘ কবিতা, যেটি ১৯৭৬ সালে পরিমার্জন করে আবার প্রকাশ করেছিলেন । তাঁর কবিতা যাঁরা অনুবাদ করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্য হলেন স্যামুয়েল বেকেট, চার্লস টমলিনসন, এলিজাবেথ বিশপ, মার্ক স্ট্র্যাণ্ড প্রমুখ ।
১৯৭৬ সালে শ্রমিকদের পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলে ওকতাভিও পাজ ‘ভুয়েলতা’ বা ফেরা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করা আরম্ভ করেন । পত্রিকাটি মেকসিকোর এসট্যাবলিশমেন্টের সমর্থক ছিল । ‘ভুয়েলতা’ পত্রিকায় ওকতাভিও পাজ কমিউনিস্ট সরকারগুলোর অত্যাচারের বিরুদ্ধে লেখালিখি আরম্ভ করেন, এমনকি কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রোর সরকারের বিরোধীদের প্রতি অত্যাচারের বিরুদ্ধেও কলম ধরেন । এর ফলে তিনি লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ বুদ্ধিজীবির আক্রমণের মুখে পড়েন । তাঁর গ্রন্হাবলীর মুখবন্ধে পাজ লিখে গেছেন যে যবে থেকে তিনি কমিউনিস্টদের তত্বে অবিশ্বাস ব্যক্ত করা আরম্ভ করেছেন তবে থেকে মেকসিকোর অধিকাংশ বুদ্ধিজীবি তাঁর বিরোধী হয়ে উঠেছেন, এমনকি ঘোর শত্রু হয়ে উঠেছেন তাঁরা ।
ষাটের দশকে তিনি ভারতে রাষ্ট্রদূত হয়ে আসেন আর হাংরি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কলকাতায় দেখা করেন । আমি তখন কলকাতায় ছিলুম না । পরে তিনি সরকারি কাজে পাটনায় এলে জেলা ম্যাজেসট্রেটকে সঙ্গে নিয়ে আমার বাসায় দেখা করতে এসেছিলেন । দেহরক্ষীসহ অমন একটা পরিবেশে সাহিত্য নিয়ে কোনো কথাই সম্ভব হয়নি, তবে তিনি আমাদের আন্দোলনে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন, জেলা ম্যাজিসট্রেটের সামনেই ।
১৯৯০ সালে বার্লিনের দেয়ালের পতনের পর তিনি পৃথিবীর বহু বুদ্ধিজীবিকে মেকসিকোয় নিমন্ত্রণ করে আনেন এবং ‘দি এক্সপিরিয়েন্স অফ ফ্রিডাম’ নামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন । ‘ভুয়েলতা’ পত্রিকা ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ; পাজ-এর মৃত্যুতে পত্রিকাটি ১৯৯৮ সালে বন্ধ হয়ে যায় ।


কার্লোস ফুয়েন্তেস ( ১৯২৮ - ২০১২ ) ছিলেন মেক্সিকোর ঔপন্যাসিক ও প্রবন্ধকার । তিনি তাঁর উপন্যাসের জন্য স্প্যানিশ ভাষার একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন । কিন্তু তাঁর বেলায় সমস্যা ছিল যে তাঁর পছন্দ না হলে তিনি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করতেন । নোবেল পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম বহুবার বিবেচিত হলেও, তিনি তা পাননি ; আলোচকদের মতে তাঁর বামপন্হী চিন্তাধারা এবং অন্যান্য দেশের উগ্র বামপন্হীদের সমর্থন হয়তো অন্তরায় হয়ে থাকবে । তিনি রোনাল্ড রিগানের অর্থনৈতিক চিন্তা আর জর্জ ডাবলিউ বুশ-এর সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধেরও বিরোধী ছিলেন ।
তাঁর বহু আলোচিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখ্য হল ‘দি ডেথ অফ আর্তেমিও ক্রুজ ( ১৯৬২ ), ‘অরো’ ( ১৯৬২ ), ‘তেরা নোস্ত্রা’ ( ১৯৭৫ ), ‘দি ওল্ড গ্রিঙ্গো’ ( ১৯৮৫ ) এবং ‘ক্রিস্টোফার আনবর্ন’ ( ১৯৮৭ )। ষাট ও সত্তর দশকে লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে যে প্রস্ফূটন ঘটে, তার অবদানে তাঁকে একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বলে মনে করা হয় । তাঁর কূটনীতিক বাবা পানামায় থাকার সময় কার্লোস ফুয়েন্তেসের জন্ম । তারপর তিনি লাতিন আমেরিকায় বাবার পোস্টিঙের শহরগুলোয় শৈশব কাটিয়েছেন ।
১৯৩৪ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত কার্লোসের বাবা ওয়াশিংটনে পোস্টেড ছিলেন । কার্লোস সেখানকার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়তেন এবং ইংরেজিতে বেশ সড়গড় হয়ে ওঠেন ; তাঁর ইংরেজি দক্ষতার জন্য ওকাতাভিও পাজসহ আরও কয়েকজন লাতিন আমেরিকান সাহিত্যিকের ঈর্ষার পাত্র হয়ে ওঠেন পরবর্তীকালে ।
১৯৩৮ সালে মেক্সিকো বিদেশী পেট্রলিয়াম কোম্পানিগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত করলে, আমেরিকায় তার বিরুদ্ধে বেশ হইচই হবার দরুন মার্কিন সহপাঠীদের টিটকিরির ফলে ক্লাসে কার্লোস একঘরে হয়ে যান । তিনি বলেছেন যে এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে জরুরি ছিল ; এর পরেই তিনি বুঝতে পারেন যে পৃথিবীর নানা দেশ বাবার সঙ্গে ঘুরে বেড়ালেও, আসলে তিনি একজন মেক্সিকান এবং ইংরেজি নয়, তাঁর মাতৃভাষা স্প্যানিশ । ১৯৪০ সালে তাঁর বাবার পোস্টিং হয় চিলের সান্টিয়াগোতে এবং এই দেশে থাকাকালে তিনি সমাজবাদে আকৃষ্ট হন, প্রধানত পাবলো নেরুদার কবিতাপাঠের প্রভাবে ।
ষোলো বছর বয়সে কার্লোস পাকাপাকি মেক্সিকোয় থাকা আরম্ভ করেন এবং যাতে তিনি কূটনীতিক হতে পারেন তাই তাঁর বাবা তাঁকে আইন কলেজে ভর্তি করে দেন । আইন পাশ করে ১৯৫৭ সালে তিনি বিদেশ মন্ত্রকে সংস্কৃতি বিভাগে চাকরি পান । ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘হোয়্যার দি এয়ার ইজ ক্লিয়ার’ ; গ্রন্হটির জনপ্রিয়তার কারণে তিনি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে ১৯৫৯ সালে হাভানায় চলে যান এবং কিউবার বিপ্লব ও ফিদেল কাস্ত্রোর সমর্থনে প্রবন্ধ লেখা আরম্ভ করেন । ১৯৭১ সালে ফিদেল কাস্ত্রো যখন কবি হেবের্তো প্যাদিলাকে জেলে পুরলেন তার পর থেকে কার্লোস কিউবা বিরোধী হয়ে ওঠেন । তিনি ভেনেজুয়েলার হুগো চাভেজেরও সমালোচনা করে তাঁকে বলতেন ‘ট্রপিকাল মুসোলিনি’ ।
হেবের্তো প্যাদিলা ( ১৯৩২ - ২০০০ ) কিউবার বিপ্লবে অংশ নিয়ে ফিদেল কাস্ত্রোকে সমর্থন করলেও, ষাটের দশকে কিউবার গতিপ্রকৃতি দেখে আশাহত হন এবং খোলাখুলি ফিদেল কাস্ত্রোর এসট্যাবলিশমেন্টকে আক্রমণ করে লেখালিখি আরম্ভ করেন । তাঁর এই সময়ের কাব্যগ্রন্হগুলো হল ‘এল হুস্তো তিয়েমপো হুমানো’ ( ১৯৬২ ), ‘লা হোরা’ ( ১৯৬৪ ), ‘ফুয়েরা দেল হুয়েগরো’ ( ১৯৬৬ ) । ক্রুদ্ধ ফিদেল কাস্ত্রো ১৯৭১ সালে তাঁকে জেলে পোরেন । পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বুদ্ধিজীবিরা, যেমন জাঁ পল সার্ত্রে, সুসান সোনটাগ, মারিও ভারগাস য়োসা, হুলিও কোর্তাজার প্রমুখ এই কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন । হেবের্তো প্যাদিলাকে সরকার মুক্তি দেয় বটে কিন্তু ১৯৮০ পর্যন্ত কিউবা ছেড়ে যেতে দেয়নি । পশ্চিমবঙ্গের কোনো পত্রিকায় কবি হেবের্তোর কারবাস নিয়ে কোনো পত্রিকায় কিছু পড়েছিলুম বলে মনে পড়ছে না, অথচ কিউবা নিয়ে কতো মাতামাতি চলচিল চারিধারে ।
১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত কার্লোস ফ্রান্সে মেকসিকোর রাজদূত ছিলেন । প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি গুস্তাভো দিয়াজ ওরদেজকে স্পেনের রাজদূত নিযুক্ত করা হলে তিনি প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন । তারপর তিনি ইংল্যাণ্ড ও আমেরিকার বিভিন্ন আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন ।
কার্লোস বিয়ে করেন সুন্দরী চিত্রাভিনেত্রী রিতা মাশেদোকে । রিতার ক্যানসার ধরা পড়ায় আত্মহত্যা করেছিলেন । কার্লোসের প্রেমপর্ব চলে আরও দুই অভিনেতী জিন মোরেস এবং জিন সিবার্গের সঙ্গে । তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন সাংবাদিক সিলভিয়া লেমুসকে ; মৃত্যু পর্যন্ত তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন ।


কার্লোস ফুয়েন্তেস এবং ওকতাভিও পাজ এর বিবাদের সূত্রপাত ঘটে ১৯৮০ সালে কার্লোস ফুয়েন্তেস কর্তৃক নিকারাগুয়ায় স্যান্দিনিস্তাদের সমর্থন নিয়ে । নিকারাগুয়াকে আমেরিকার দখলদারি থেকে মুক্ত করার জন্য স্যান্দিনিস্তা দলের জন্ম । ১৯৭৯ সালে সামোজা পরিবারকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরিয়ে স্যান্দিনিস্তা দল একটি বৈপ্লবিক সরকারকে ক্ষমতায় এনেছিল । ওকাতভিও পাজ, যিনি রক্ষণশীল চরিত্রের মানুষ ছিলেন স্যান্দিনিস্তাদের সমর্থন করতে পারেননি । ফুয়েন্তেস চিয়াপা রেড ইনডিয়ানদের জাপাতিস্তা স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন করেছিলেন, পাজ করেননি । পাজ মিলিটারির মাধ্যমে জাপাতিস্তাদের আন্দোলন দমনের পক্ষে ছিলেন । এর দরুন দুজনে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় এবং যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায় । এক সাক্ষাৎকারে ওকতাভিও পাজ বলেছিলেন যে কার্লোস ফুয়েন্তেস একজন নন, দুই জন : একজনের কন্ঠস্বর ইউরোপীয় এবং আরেকজনের মেকসিকান ।
তাঁদের এই বিবাদকে আরও জটিল করে তোলেন ওকতাভিও পাজ । তাঁর ‘ভুয়েলতা’ পত্রিকায় এবং আমেরিকার ‘দি নিউ রিপাবলিক’ পত্রিকায় ওকতাভিও পাজ-এর সহযোগী এনরিকে ক্রাউসে ১৯৮৮ সালে দুটি প্রবন্ধে কার্লোস ফুয়েন্তেসকে আক্রমণ করে লিখলেন যে, “ফুয়েন্তেস আসলে একজন অসৎ অভিনেতা, সাহিত্যিক ভানকারী, যিনি গেঁজিয়ে আর লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে যা লিখে চলেছেন তা ধার-করা, যার কোনো মানেই হয় না, কিন্তু শোনায় বেশ শক্তিশালী । লেখাগুলো বিশ্বাসযোগ্য নয়, যদিও তা মনকাড়া গোছের।” এনরিকে ক্রাউসে লিখেছেন যে ফুয়েন্তেস দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে বিশাল লাতিন আমেরিকান ইতিহাসকে দুমড়ে-মুচড়ে ব্যক্তিগত কাজে লাগিয়েছেন ; ব্যক্তিগত আর সর্বজনীনকে বেমানানভাবে গুলিয়ে ফেলেছেন ।
জুন ১৯৮৮ সালে দি নিউ রিপাবলিক পত্রিকায় এনরিকে ক্রাউসে , “গেরিলা ড্যানডি : দি লাইফ অ্যান্ড ইজি টাইমস অফ কার্লোস ফুয়েন্তেস’ শিরোনামের প্রবন্ধে লিখলেন যে ফুয়েন্তেস হলেন পিয়ের কার্ডিন আর চে গ্বেভারার মিশেলে গড়া একজন গেরিলা ভদ্রলোক, কেননা একদিকে তিনি মার্কসবাদের সমর্থক আবার আরেকদিকে ব্যক্তিগত জীবনে একেবারে সায়েবসুবো । ফুয়েন্তেসের মেকসিকান আত্মপরিচয়কেই প্রকারান্তরে চ্যালেঞ্জ করে বসেন ওকতাভিও পাজ, এনরিকে ক্রাউসের ঘোর সমালোচনামূলক প্রবন্ধের মাধ্যমে । ক্রাউসে প্রশ্ন তুললেন ফুয়েন্তেস ও রাষ্ট্রপতি লুইস এশেভেরিয়ার হৃদ্যতা নিয়ে, এশেভেরিয়া ছাত্রদের আন্দোলন দমন করেছিলেন কড়া হাতে, করপাস ক্রিস্তি উৎসবের দিন ছাত্রদের ওপর গুলি চালিয়েছিল পুলিশ, তখন ফুয়েন্তেস কেন মুখ খোলেননি । পরবর্তীকালে এই অত্যাচারের দরুণ এশেভেরিয়াকে তাঁর বাড়িতেই কারারুদ্ধ রাখার আদেশ হয়েছিল ।
জীবনের বেশির ভাগ সময় ফুয়েন্তেস মেকসিকোর বাইরে কাটিয়েছেন এই অভিযোগে ক্রাউসে বললেন যে উনি মেকসিকোর কিই বা বোঝেন, ওনাকে মোটেই খাঁটি মেকসিকান বলা যায় না । উনি বাইরের পাঠকদের জন্য মেকসিকোর সংস্কৃতিকে ভয়াবহ, সন্ত্রাসময়, মাদকাসক্ত ও জোচ্চোরদের ঘাঁটি হিসাবে উপস্হাপন করতে চেয়েছেন । ক্রাউসে বললেন, মেকসিকোর লোকেদের মনে সন্দেহ আছে যে আমেরিকায় বিকোবার জন্যে ফুয়েন্তেস মেকসিকোকে থিম হিসাবে ব্যবহার করেন । ক্রাউসের আক্রমণের ফলে মেকসিকোর বুদ্ধিজীবিরা দুই দলে ভাগ হয়ে যান, এক দল ফুয়েন্তেসের পক্ষে এবং আরেকদল বিপক্ষে । ক্রাউসের প্রবন্ধটি লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশেও সেখানকার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ।
ওকতাভিও পাজ বারবার দাবি করেছেন যে ক্রাউসের লেখায় তাঁর কোনো হাত ছিল না, কিন্তু তা পক্ষে-বিপক্ষে কেউই বিশ্বাস করতে চায়নি । ১৯৯৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে ওকতাভিও পাজ জানিয়েছিলেন যে ক্রাউসকে প্রবন্ধটা প্রকাশ করতে দিয়ে তিনি অনুতপ্ত, কিন্তু সাহিত্যিকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা পছন্দ করেন না বলে ক্রাউসের লেখাটি প্রকাশ করা হয়েছিল । ফুয়েন্তেসের সমর্থনে লা হোর্নাদা পত্রিকায় একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেন ফেরনান্দো বেনিতেজ ; তিনি লেখেন যে ক্রাউসে যা লিখেছে তা ঈর্ষাবশে লিখেছে, আর সাহিত্য সমালোচনার মতন পড়াশোনা এনরিকে ক্রাউসের একেবারেই নেই ; ওকতাভিও পাজ-এর যদি অসহমতি ছিল তাহলে তিনি প্রবন্ধটির পাশাপাশি সম্পাদকীয় কলামে তা জানিয়ে দিতে পারতেন ।
১৯৯০ সালের মাঝামাঝি মেকসিকোতে হোর্হে ভোলপির নেতৃত্বে ‘ক্র্যাক জেনারেশান’ আন্দোলনের সূত্রপাত হয় যার সদস্যরা ছিলেন ইগনাচিও প্যাদিলা, এলোয় উরুস, পেদরো অ্যাঞ্জেল পালৌ, রিকার্দো চাভেজ-কাসতেনেদা প্রমুখ । এই আন্দোলন লাতিন আমেরিকান প্রস্ফূটনের লেখকদের শৈলীর ও বিশ্ববীক্ষার বিরোধী ছিল । হোর্হে ভোলপি ( ১৯৬৮ ) লিখেছেন যে ফুয়েন্তেসের বামপন্হী রাজনীতি স্রেফ একটা কায়দা ; যদিও তিনি কমিউনিজমের ধারেকাছে ছিলেন না, কিন্তু কিউবার বিপ্লবের দৌলতে তৃতীয় বিশ্বের দায়বদ্ধ লেখকদের নিকটবর্তী হবার সুযোগ গড়ে তুলেছিলেন আর মেকসিকোর মানুষদের দেখাতে চেয়েছেন যে লাতিন আমেরিকায় পরিবর্তনের সূচনা করার তিনি প্রধান বৈপ্লবিক কন্ঠস্বর ।
ক্রাউসের প্রবন্ধটি সম্পর্কে ফুয়েন্তেসকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন যে অমন লেখকদের আমি সকালের জলখাবারের সঙ্গে খাই । হোর্হে ভোলপিদের দলকে তিনি পাত্তাই দেননি ।
ফুয়েন্তেসের মৃত্যুর পর এনরিকে ক্রাউসে ২০১২ সালে লিখেছিলেন যে, “ফুয়েন্তেস হলেন বিশ শতকের অত্যুৎকৃষ্ট স্প্যানিশ লেখকদের অন্যতম ।”
[ রচনাকাল : জুন ২০১৫ ]


আপনার মতামত জানান