তপন সিংহের যুবদর্শন: উত্তরাধিকার থেকে উত্তরণে

আবেশ কুমার দাস


নুটুবিহারী: আচ্ছা ডাক্তারবাবু, আমরা এগিয়ে চলছি না পেছন দিকে হাঁটছি?
ডাক্তারবাবু: কেন?
নুটুবিহারী: দিন দিন এ কী পরিবর্তন হচ্ছে বলুন তো... এই বাঙালি ছেলেকে একটি ডেকে জিজ্ঞেস করুন, দেখবেন নিজের বংশেরই পুরো খবর রাখে না। এদিকে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করবে, আমাদের নেতাজি, আমাদের রবীন্দ্রনাথ, আমাদের বিবেকানন্দ। কিন্তু একটু চেপে ধরুন দেখবেন ওই রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, এঁদের সম্বন্ধে কিচ্ছু জানে না।
ডাক্তারবাবু (মৃদু হেসে): তা সত্যি।
নুটুবিহারী (মৃদু হেসে): বুঝতেই পারছেন, অখণ্ড অবসর আমার। বসে বসে এইসবই লক্ষ্য করি। কিন্তু, ভারী কষ্ট হয় ডাক্তারবাবু। আমাদের গোটা জাতটাই না নষ্ট হয়ে যায়।

(‘হাটে বাজারে’ ছবির একটি দৃশ্যে নুটুবিহারীর চরিত্রে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত এবং ডাক্তারবাবুর চরিত্রে অশোককুমারের কথোপকথন)

প্রাসঙ্গিক শিল্পমাত্রেরই এক কালগত পরিপ্রেক্ষিত থাকে। ‘হাটে বাজারে’ উপন্যাসও ইতিহাসের এক বিশেষ কালক্ষেপের সন্তান। যার সমকালের চরিত্র বিশ্লেষণে প্রখ্যাত সাহিত্যিক অভিজিৎ তরফদারের মন্তব্য ছিল
... পঞ্চাশের দশকের শেষ, ষাটের দশকের শুরু সেই সময়ে। মনে রাখতে হবে স্বাধীনতা আন্দোলনের উন্মাদনা তখন শেষ... মানুষ ক্রমশ নব্যপ্রাপ্ত স্বাধীনতার অসারত্ব বুঝতে পারছে,—একটা হতাশা, একটা গ্লানি, একটা ক্ষোভ জড়ো হচ্ছে মানুষের মনে।
আর যে সময়ে রুপোলি পর্দায় চিত্রিত হচ্ছে এই উপন্যাসের কাহিনি সেটা ১৯৬৭ সাল।
এমন একটা সময়ের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে নুটুবাবুর এই আন্তরিক আক্ষেপ যেন আমাদের জাতিগত জীবনের এক অনাগত অস্থির অধ্যায়েরই আবছা দিকনির্দেশ দিয়ে যায়। ‘আবছা’ বললাম এই কারণেই যে ‘হাটে বাজারে’ ছবিতে এক প্রত্যন্ত দেহাতি জীবনের প্রাত্যহিক সংগ্রামের আলেখ্য ছিল। সেই স্রোতস্বিনী জীবনের বাঁকে বাঁকে বিচিত্র সুখ দুঃখ আনন্দের ক্ষণে ক্ষণে উদ্ভাস এবং পলে পলে বিলীন হওয়ার ছবি ছিল। স্বাধীনতার পর দেশে যে এক বিশেষ সুবিধাভোগী তথাকথিত উচ্চশ্রেণির উন্মেষ ঘটছে একটু একটু করে তারও স্পষ্ট সঙ্কেত ছিল। কিন্তু রাজনীতির পাকেচক্রে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ একটি জাতির গোটা একখানা প্রজন্মের মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে যাওয়ার আর কোনও ইঙ্গিত ছিল না—কেবল বাঙালি জাতির তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে নুটুবাবুর উক্ত আন্তরিক হাহুতাশটুকু ব্যতীত।
কিন্তু ‘হাটে বাজারে’ (১৯৬৭) ছবির অব্যবহিত পর থেকেই যেন চলচ্চিত্রকার তপন সিংহের ভাবনায় এল এক আচমকা পালাবদল। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রবিশারদ সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের মতে ‘...তপন সিংহ নিজের সময়ের সঙ্গে করমর্দন করেন ঊনিশশো আটষট্টির ‘আপনজন’-এ’। সমকালের সঙ্গে চলচ্চিত্রকারের এই হাত মেলানোরই অনিবার্য পরিণতি তাঁর চলচ্চিত্র ভাবনার সেই আচমকা পালাবদল—যার ফলাফল কেবল ‘আপনজন’-ই (১৯৬৮) নয়, ‘এখনই’ (১৯৭১) বা ‘রাজা’ (১৯৭৫) থেকে পরবর্তীকালের ‘আতঙ্ক’ (১৯৮৬) বা ‘অন্তর্ধান’-এর (১৯৯২) মতো ছবি। অসুস্থ থেকে অসুস্থতর যৌবনের ছায়া যেখানে হয়ে ওঠে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। সেই হিসেবে ছাত্রাবস্থায় ব্রাউনিং-শেক্সপিয়ারে বুঁদ হয়ে থাকা, অক্সফোর্ডের কলেজ ম্যাগাজিনে আর্টিকল লেখা নুটুবিহারীকে ভবিষ্যদ্রষ্টাই বলতে হয়। ‘হাটে বাজারে’ ছবিতে তাঁর চরিত্রটিকেও ধরা যায় এক অদ্ভুত মিসিং লিঙ্কের মতো। এবং উক্ত ছবির উক্ত দৃশ্যপটটুকুকেও এক ভাবী যুগান্তরের মাইলফলক হিসেবেই গণ্য করা চলে। কেননা কেবল তপন সিংহই তো নয়, অবিলম্বে সত্যজিৎ রায় বা মৃণাল সেনদের চলচ্চিত্রপঞ্জীতেও ছাপ রেখে গেল নুটুবিহারীর সেই গভীর অন্তর্দর্শন। সুকান্ত-নজরুলের মনীষার উত্তরাধিকার যাদের রক্তে তারাই আবার রেড ক্রসের ফান্ড কেটে একটা সন্ধে ট্রিঙ্কাসে সোডা-হুইস্কি ওড়াতে যাচ্ছে—এমন দৃশ্যও তো রুপোলি পর্দায় অবিলম্বেই দেখতে হল আমাদের। আরও লক্ষণীয়, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ (১৯৭০) ছবির সেই মেসের ঘরে ঠিক যখন চলতে থাকে এই ফান্ড হাপিস পর্ব তখনই আবার রেডিওয় বাজতে থাকে ‘শারপে লাল টোপি রুশি/ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্থানি’। স্বাধীনতা উত্তর ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম ব্রান্ড অ্যাম্বাসাডর রাজ কাপুরের সেই পঞ্চাশের অনুপম ছবিগুলিতে প্রদর্শিত প্লেবিয়ান সোশ্যালিজমের ছায়া ততদিনে সমাজমানস থেকে অন্তর্হিত।
একটা জাতির মনন, মগজ, প্রবৃত্তির সবটুকুই যখন একত্রে এইভাবে অধঃপাতে যাত্রা শুরু করে তখন প্রৌঢ় নুটুবিহারীদের হাহুতাশে এমন করেই ধরা দেয় সেই জাতির স্বীয় ঐতিহ্যের অতীত আভিজাত্য। সেই অতীতেরই কায়াময় ছায়াসত্তা যেন ‘আপনজন’-এর গ্রাম্য বৃদ্ধা আনন্দময়ী (চরিত্রায়নে ছায়াদেবী)। কেননা তখনও অবধি তপন সিংহের ক্ষেত্রে বলা চলে ‘সংঘর্ষ ও প্রতিহিংসার বদলে তাঁর ঝোঁক নির্মলতায়... রাজনীতির থেকে, ক্ষমতার পদশব্দের থেকেও মনুষ্যত্বের বয়স বেশি’। তাই হাতবোমা, রিভলভার, হকিস্টিক নিয়ে সন্ত্রাসে মত্ত যুবকরা কত অবলীলায় তাঁর দৃষ্টিতে অগ্নিযুগের স্বদেশি ডাকাতদের উত্তরসূরী হয়ে ওঠে। ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১) সম্পর্কে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের অত্যন্ত মূল্যবান বিশ্লেষণ মনে পড়ে প্রসঙ্গক্রমে,
...খোয়াইয়ের বন্ধুর প্রান্তর, ধ্যানমগ্ন একাকী তালগাছটিকে সাক্ষী রেখেই অনসূয়া তার মৃত মায়ের ডায়েরি নিবেদন করে ভৃগুকে যাতে নোয়াখালির গাঁধীজির কথা আছে... পাশাপাশি, ভৃগুর গলায় ঝুলে থাকে শহিদের মায়ের দেওয়া গতরাত্রির স্মারক মেডেল যাতে মুকুন্দ দাসের মতো গণকবির প্রত্যাশা। আর সন্দেহ থাকে না যে ঋত্বিক মনে করেন স্বাধীনতা আন্দোলনের যাবতীয় ঐতিহ্য ভারতীয় মার্কসবাদীদের পক্ষে বৈধ উত্তরাধিকার। আপাত বিপরীত এই রাজনৈতিক অবস্থানে মিলনের পৌরোহিত্য করতে পারেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।
‘আপনজন’ ছবিতেও অনুরূপ স্বদেশি আমলের সঙ্গে ১৯৬০-৭০ সন্ধিক্ষণপর্বের অশান্ত কলকাতার উত্তাল সময়ের আপাত অবাস্তব দৌত্য ঘটাতে পর্দায় হাজির হতে হয় কখনও রবীন্দ্রনাথ, কখনও অতুলপ্রসাদ আবার কখনও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনকে।
আবার দুই ভিন্ন যুগের পারস্পরিক এই দৌত্যই এক অনিবার্য প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়ে ‘এখনই’ ছবিতে (ছবির শেষে পর্দাজোড়া যে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন আঁকা হয়ে যায় তা কি তবে এই পরম্পরারই জাতক?)। যেখানে গতকাল এবং আগামীকালের ডায়ালেক্ট স্পষ্টতই পৃথক হয়ে গেছে। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র অরুণের (চরিত্রায়নে স্বরূপ দত্ত) জবানিতে তাই আমরা শুনতে থাকি,
... আমরা দিনরাত সবাই শুধু কথা বলছি। অথচ মজা দেখ আমরা কেউ কারুর কথা বুঝতে চাই না। তাহলে কথা বলার দরকার কী? কতগুলো আওয়াজ, কতগুলো অর্থহীন শব্দ, তাই না?
জেনারেশন গ্যাপের চিহ্ন অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় ছবির এই পর্বে।
অথবা নিছক প্রজন্মগত ব্যবধানের বৃত্তেও কি আটকে থাকে এই ছবির গতি? ঘটনা পরম্পরার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ‘কথা’ নামক সেই অতি পরিচিত অণ্বয়টুকুর অস্তিত্বই হয়ে পড়তে থাকে বিপন্ন। আর অরুণের সন্দেহকে সার্থকতা দিতেই যেন তাদের নিজেদের প্রজন্মেরও এক একজন ক্রমশ দুর্বোধ্য হয়ে উঠতে থাকে বাকিদের কাছে। অবিরাম কথার ভিড়েও দৌত্য ঘটতে পারে না পারস্পরিক চিন্তা ভাবনার। সুজিত (চরিত্রায়নে মৃণাল মুখোপাধ্যায়) বদলে যায় একটু একটু করে। ক্রমশ বোহেমিয়ান হয়ে ওঠে আধুনিক কবি (চরিত্রায়নে চিন্ময় রায়)। নিজেকে আচমকা গুটিয়ে নেয় ঊর্মি (চরিত্রায়নে অপর্ণা সেন)। অরুণের ভাবনার মতো করেই এক একটি একক মানুষ নিজস্ব চিন্তা চেতনা ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের স্বেচ্ছাবৃত ঘেরাটোপকে বর্ম করে যেন এক একখানা গাছের মতো একলা বেঁচে থাকার কৌশল রপ্ত করতে থাকে।
লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে আমরা যেন একা, একান্তভাবে একা... আমাদের পথ গন্তব্যবিহীন, আমাদের জীবন উদ্দেশ্যবিহীন।
এই লক্ষ্যহীন একাকীত্ব সত্যজিতের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-রও মূলগত বৈশিষ্ট্য। যে ছবির নায়ক সিদ্ধার্থকে (চরিত্রায়নে ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়) তার কম্যুনিস্ট ছোটভাই টুনু (চরিত্রায়নে দেবরাজ রায়) বলে, ‘তোর তো কোনও রাস্তাই নেই’। যে সিদ্ধার্থ নিজস্ব অবচেতনে ক্রমাগত শুনতে পায় একটা নাম না জানা পাখির ডাক। যে পাখিটার খোঁজে অকারণেই বন্ধুর সঙ্গে নিউ মার্কেটে যায় সে। সেই বন্ধু (চরিত্রায়নে কল্যাণ চট্টোপাধ্যায়) রেড ক্রসের ফান্ড হাপিস পর্বকে নৈতিক বৈধতা দিতে যে বলেছিল, ‘দ্য হোল কান্ট্রি ইজ গোয়িং ডাউন ব্রাদার। আমি নিচে না নামলে কি শূন্যে সাসপেন্ডেড হয়ে থাকব?’
‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ বা ‘এখনই’-র নায়ক নায়িকাদের এই গন্তব্যবিহীন একাকীত্বের সাধনা সমষ্টি থেকে ব্যক্তি মানুষের ব্যষ্টিপ্রবণতার দ্যোতক। আবার শ্রেণি থেকে স্বাতন্ত্র্যকামী এই মনোবৃত্তিকে অর্থপরতাগত অবনমনও বলা যাবে না। সিদ্ধার্থ এবং অরুণ উভয় চরিত্রের পরিণতিতেই সেই সত্য প্রকট। সমকালের নিরিখে ছবির ভাবসত্যে এই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের বুনন অত্যন্ত মূল্যবান সংঘটন যেহেতু সময়টা ১৯৭০-এর সূচনালগ্ন। বামপন্থার ডালপালা যখন বঙ্গীয় যুবমানসে বিস্তার নিতে শুরু করেছে প্রবল দ্রুতিতে। সেই শ্রেণিগত সমাজ সন্দর্শনের বিপ্রতীপে হেঁটে তপন সিংহের ‘এখনই’ বা সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ আধুনিক মানুষের ক্রমশ একলা হওয়ার গল্প বলে। আবার এই যুগের হাওয়ার প্রতিকূল গমনের জন্য পর্দায় কোনও বায়ুভূত কল্পনিকেতনের বিনির্মাণেরও প্রয়োজন পড়ে না। যে একক সংগ্রাম তত্ত্বের ঘোরতর প্রবক্তা হিসেবে তপন সিংহকে আমরা চিনেছি বরাবর ‘এখনই’-র নির্মিতিতে সত্তরের দিগভ্রষ্ট যুবসমাজে সেই তত্ত্বেরই অতি জীবন্ত পুনর্মুদ্রণ ঘটিয়ে দেখান তিনি।
বিপথগামী যৌবনকে বিষয় করে নির্মিত ‘আপনজন’ বা ‘রাজা’-র মতো ছবিগুলিতেও কেন্দ্রীয় চরিত্ররা বারে বারে নিঃসঙ্গ হয়। বৃদ্ধ পিতার (চরিত্রায়নে সন্তোষ সিংহ) খেদোক্তির জবাবে রবির (চরিত্রায়নে স্বরূপ দত্ত) মুখচোখের সেই নিরুত্তর অভিব্যক্তি, হারু চক্রবর্তীর (চরিত্রায়নে রবি ঘোষ) সঙ্গে দেখা করে হোটেলের ঘরে ফিরে এসে ছেনোর (চরিত্রায়নে সমিত ভঞ্জ) সেই ক্ষণিকের ভাবান্তর অথবা পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়তে লড়তেও রাজার (চরিত্রায়নে দেবরাজ রায়) এমনকি নিজের জীবন দিয়েও আপন মনুষ্যত্ববোধের মূল্য চুকিয়ে যাওয়া—কোনওটাই বিচ্ছিন্ন ঘটনামাত্র নয়। রাজা, ছেনো, রবি বা অরুণরা প্রত্যেকেই কোনও এক বিশেষ মুহূর্তে দঙ্গল থেকে একলা হয়।
‘এখনই’ ছবির অন্তিমে অয়নের (চরিত্রায়নে শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়) ঔরসে সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়া ঊর্মিকে যুগপৎ লোকলজ্জার অপমান এবং ভ্রূণহত্যার পাপ থেকে উদ্ধার করতে তার হাত ধরে অরুণ নিজের বাড়িঘর আত্মীয়স্বজনকে ত্যাগ করে নেমে আসে রাস্তায়। শেষ শটে নাগরিক কলকাতার ব্যস্ত রাজপথ, চলমান গাড়ির স্রোত, প্রাত্যহিক যানজট, মানুষের উদ্বেল মিছিল। অরুণ আর ঊর্মি ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে বৃহত্তর জনতার প্লাবনে। কেবল ঊর্মির প্রতি ইনফ্যাচুয়েশন থেকে কি এমন একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলা সম্ভব? তা যদি না হয় তবে এই আত্মত্যাগের শক্তি কোথায় পেল অরুণ? কোথায় পেল এইভাবে একা হওয়ার সাহস? রামমোহন বিদ্যাসাগরের জীবনচর্যার অব্যক্ত বাণী থেকে একক মানুষের সংগ্রামে ঐকান্তিক বিশ্বস্ত হয়ে ওঠা তপনবাবু কি তবে অলক্ষ্যেই অরুণের অন্তরাত্মায় ঘটিয়ে দেন এক অন্যতর উত্তরণ? শম্ভু মিত্র ও অমিত মৈত্রের দ্বৈত পরিচালনায় নির্মিত ‘জাগতে রহো’ (১৯৫৬) ছবিতে যেভাবে রাত্রির উপসংহারে উত্তরণের এক বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় যেখানে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সেই ভবঘুরেটির (চরিত্রায়নে রাজ কাপুর) পৌঁছে যাওয়া সেই শেষ ফ্ল্যাটের দেওয়ালে ঝুলে থাকে রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দর ফটো—‘এখনই’ ছবিতেও কি কাহিনির বহিরঙ্গের গতির অগোচরেই রচনা হয়ে চলে না তেমন এক অন্যতর উত্তরণের বৃত্ত! যে বৃত্তের সঞ্চারপথ সম্ভবত সর্বদাই দর্শকের অগোচরে থাকে না—অতীনদার রেখে যাওয়া চিঠির মারফৎ প্রকাশ্যেও আসে অন্তত একবার,
আমরা কি মানুষ অরুণ? শুধু টুকরো টুকরো সুখ খুঁজে বেড়াব, একটুও দুঃখ নিতে চাইব না? ... কাজ সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। চোখ চাই তাকে দেখবার, মন চাই তাকে গ্রহণ করবার।
অর্থাৎ ব্যক্তি মানুষের সেই বহুকথিত একক সংগ্রাম যে আদপেই তার একার বেঁচে থাকার সংগ্রাম নয় বরং এক অন্যতর পরার্থপরতাও তার বৈশিষ্ট্যগত, ‘এখনই’-র অরুণ তার সার্থক দৃষ্টান্ত।
‘এখনই’ প্রসঙ্গে তপনবাবুর নিজস্ব অভিমত,
... ফাস্ট্রেটেড যুবসমাজকে নিয়ে ছবি। স্কুল-কলেজ থেকে পাস করার পরও যাদের ভবিষ্যতে একটা বিরাট জিজ্ঞাসার চিহ্ন।
এই ছবিতে প্রথমত তিনি ব্যক্তি মানুষের একা হওয়াকে চিত্রিত করেন। তারপর সেই একক মানুষকেই পরার্থপরতার মাধ্যমে জীবনের বৃহত্তর তাৎপর্য সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেন। সেই অস্থির সমকালে দাঁড়িয়ে এবং তাকে শিরোধার্য করে নিয়েও অন্তিমত জীবনের এমন পারমার্থিক মূল্যায়ন সেই সময়ের পক্ষে নেহাত সহজসাধ্য ছিল না। অভিনেতা কুমার রায়ের মতে,
... ‘আপনজন’ ‘সাগিনা মাহাতো’ বা ‘এক যে ছিলো দেশ’—এই সব ছবি থেকে কেউ হয়তো অন্য এক তপন সিংহকে খুঁজে নিতে গিয়ে ক্ষুণ্ন হতে পারেন তাঁর ধর্মচ্যুতির আশঙ্কায়। কিন্তু সেই আশঙ্কিত মানুষরাই খুঁজে পাবেন এই সব ছবির মধ্যেও সেই পরিচিত মানুষটিকেই,—শুধু তারা দেখবেন, সেই পরিচিত মানুষটির মধ্যে একটা নিজস্ব উৎকন্ঠা।
তাঁর এই বিশ্লেষণ শতকরা একশো ভাগ খাঁটি। সমকালীন সমস্যানির্ভর ছবিগুলিতেও পরিচালকের ঝোঁক যে অন্তিমত এক মানবিক উত্তরণেরই প্রতি ‘এখনই’ তার এক বলিষ্ঠ নমুনা।
আর এখান থেকেই প্রশ্ন উঠবে তাঁর অন্যতম বিতর্কিত ছবি ‘রাজা’-র ব্যাপারে। ‘রাজা’ কি সেই অর্থে কোনও উত্তরণের গল্প বলে? ‘আপনজন’ বা ‘এখনই’-র তুলনায় ‘রাজা’ অনেক অনেকগুণে রূঢ়। আবার সংলাপগত ডায়ালেক্টের ব্যবহারে বা বস্তুবাদের ক্রম বিবর্তনে ‘আপনজন’ বা ‘এখনই’-র উত্তরাধিকারও কম নেই এই ছবির কাঠামোয়।
বাংলা ছবির ইতিহাস সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু জ্ঞাত আমি তাতে মনে হয় ‘এখনই’-ই সেই প্রথম বাংলা ছবি যেখানে কলেজের ছেলেমেয়েরা পরস্পরকে সম্বোধন করে ‘তুই’ বলে (ইতিপূর্বে যে পারস্পরিক সম্বোধন চলত ‘আপনি’-র মাধ্যমে)। ছবির নাম যেমন ‘এখনই’ তেমনই এক আপাদমস্তক আধুনিকতাও এই ছবির সংলাপের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সেই বিশেষত্বেরই নমুনা মেলে কফি হাউসের আড্ডায়। বিমানের (চরিত্রায়নে ভাস্কর চৌধুরী) সঙ্গে নন্দিনী (চরিত্রায়নে যুঁই বন্দ্যোপাধ্যায়) বাড়ি থেকে পালিয়ে এলে তাদের জীবনে আচমকা ঘনিয়ে ওঠা দুর্যোগের দিনে টিকলু (চরিত্রায়নে দিলীপ বসু) মন্তব্য করে, ‘দারোগাবাবু ডিম খাবে আর সেইজন্যে আমাদের মুরগি পুষতে হবে?’ এই ডায়ালেক্টই দ্রুত বিবর্তিত হয়ে আরও উলঙ্গ রূপ নেয় ‘রাজা’-য়। যেখানে রাজাকে তার বিধবা বউদি বলে, ‘আমাকে রোজগার করতে হলে এখন রাস্তার লোকের সঙ্গে গিয়ে শুতে হবে’। ‘আপনজন’ ছবির ডায়ালেক্ট প্রসঙ্গে তরুণ চলচ্চিত্র সমালোচক পরিচয় পাত্রর মূল্যায়ন,
... এ ছবিতেও যদি বা তথাকথিত সমাজবিরোধী ছেলেদের ঠোঁটের কোণে উঠে আসে কয়েক বছর আগে মুক্তিপ্রাপ্ত হিন্দি ছবি গাইড-এর গান, দেব আনন্দ ও ওয়াহিদা রেহমানের অসামাজিক, পারিবারিক বন্ধনহীন যৌনজীবনের মুক্তিচিত্র, ইতিহাসের দেহধারী ছায়াদেবী তা থামিয়ে দেন মাঝপথেই, জনপ্রিয় সংস্কৃতির ফাটলকে আগলাবার মরিয়া চেষ্টায় চিরকেলে চেনা ছকে উঠে আসেন রবীন্দ্রনাথ ও অতুলপ্রসাদ।
এতখানি কঠোর না হয়েও বলা যায় ‘আপনজন’-এর ডায়ালেক্ট সত্যিই বেশ পেলব। সে ব্যাপারে ‘অমৃত’ পত্রিকার ১৪ বর্ষ ৩৩ সংখ্যায় প্রচ্ছন্ন স্বীকারোক্তি আছে স্বয়ং তপন সিংহেরই। কিন্তু পরিচয় পাত্র কর্তৃক উত্থাপিত অভিযোগটুকু একেবারেই খাটবে না ‘রাজা’-র বেলায়। গঞ্জঘেঁষা শহরতলির যে নিম্ন মধ্যবিত্ত সমাজ থেকে উঠে আসা রাজা বা জয়াদের (চরিত্রায়নে মহুয়া রায়চৌধুরী) প্রায় সেই একই আর্থ সামাজিক বাস্তবতার প্রতিনিধি তো ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র (১৯৬০) নীতাও (চরিত্রায়নে সুপ্রিয়া দেবী)। কিন্তু উক্ত ছবির ডায়ালেক্টকে নিয়ে ঋত্বিক ঘটকও এতদূর সাহসী হয়ে উঠতে পারেননি (অবশ্য বিষয়বস্তুর নিরিখে সেটা মানানসই নাও হতে পারত)। সর্বোপরি ঋত্বিকের উক্ত ছবিতে নীতা যেখানে অন্তিমত পৌরাণিক জগদ্ধাত্রীর রূপকল্পপ্রাপ্ত হয় তার বিপ্রতীপে ননীর বোনের মতো মেয়েরা ‘রাজা’-র উপসংহারে সংসারের ভরণপোষণের তাগিদে পৃথিবীর আদিতম ব্যবসার পথে হাঁটে।
আসলে ‘আপনজন’, ‘এখনই’ এবং ‘রাজা’-য় ব্যবহৃত ভিন্ন ভিন্ন ডায়ালেক্টের তুল্যমূল্য বিচার করতে বসলে খেয়াল রাখতে হবে ছবি তিনটিতে প্রদর্শিত যুবসমাজের ভিন্নতর আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটকে। ‘আপনজন’-এর রবিকে খানিকটা শিক্ষিতই বলতে হয়। তার সাঙ্গোপাঙ্গোদের প্রায় সকলেও কলেজ পড়ুয়া। পরিস্থিতির পরিণামে বখে যেতে হলেও মোটামুটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের রক্ত আছে তাদের ধমনীতে। মূল্যবোধের অবশেষটুকু তাই একেবারে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারেনি তাদের চরিত্র থেকে। বরং প্রতিস্পর্ধী ছেনোগুণ্ডার শিকারি বাহিনীর আচার আচরণে এক ধরনের পাতি লুম্পেনী প্রকট। তাই ছেনোর ডায়ালেক্টও অনেক বেশি ডাকাবুকো। বেপাড়ার রেশন দোকানে কেরোসিনের খোঁজে গিয়ে এককথায় বলতে পারে সে, ‘মানে বোঝো না? আগুন লাগিয়ে বুঝিয়ে দেব কেরোসিন কী?’
‘এখনই’-র অরুণ, বিমান বা সুজিতরাও ভদ্র বংশের সন্তান। ছবির শুরুতেই যাদের ধোপদুরস্ত পোশাকে জেন্টলমেনস গেম ক্রিকেট খেলতে দেখা যায়। ছবির ক্লাইম্যাক্সের ক্ষণিক আগেও তাদের কয়েকজনের হাতে ক্রিকেটের ব্যাট বল। চিলতে গলির এককোণায় চলতে থাকে ভদ্রলোকের খেলা। জীবনযুদ্ধে ক্রমাগত পরাস্ত হতে থাকা অরুণের হাতে ক্রিকেটের ব্যাট যেন অসির মতো ঝলসাতে থাকে মুহূর্মুহূ। মনে রাখতে হবে এই ছবির সমসাময়িকতাকে। ৩০ এপ্রিল ১৯৭১ রূপবাণী, অরুণা ও ভারতী হলে একযোগে মুক্তি পেয়েছিল ‘এখনই’। সেক্ষেত্রে ছবিতে প্রদর্শিত কালপর্বটুকুকে ১৯৭০-৭১ সন্ধিক্ষণ ধরে নেওয়া যায়। মনে রাখতে হবে, আজকের মতো সার্বজনীন ধর্মের চেহারায় ভারতবর্ষের অলিগলিতে তখনও আত্মপ্রকাশ ঘটেনি ক্রিকেটের। সুনীল গাভাসকার নামক জনৈক ভারতীয় ব্যাটিং নক্ষত্রের আন্তর্জাতিক অভ্যুত্থান তখনও সময়ের গর্ভে নিহিত। উপরন্তু এই খেলার সর্বাঙ্গে তখনও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার ছাপ। পাতৌদি-উমরিগরদের সেই বনেদি যুগে আসমুদ্রহিমাচল গোটা ভারতবর্ষেই ক্রিকেট ছিল আভিজাত্যের এক অন্যতম সরণি। ‘এখনই’ ছবির গোড়াতেই সেই ক্রিকেটের ব্যবহারে অরুণ, বিমান বা ঊর্মিদের বিশেষ শ্রেণিচরিত্রটুকু আপামর দর্শকের চোখে বেশ সুস্পষ্টভাবেই ফুটিয়ে তোলেন তপন সিংহ। বেকারত্বের ভ্রূকুটি সত্ত্বেও সেই শ্রেণিচরিত্র আপন ডায়ালেক্টে বরাবর এক সযত্নচর্চিত ব্যবধান বজায় রাখে ‘রাজা’-য় প্রদর্শিত সেই নিম্ন মধ্যবিত্ত সমাজের থেকে। পেডিগ্রির নিরিখে একমাত্র টিকলুই বেশ খানিকটা পিছিয়ে বাকিদের তুলনায়। তার নেশাখোর বাবার (চরিত্রায়নে বঙ্কিম ঘোষ) কথায়,
আমি হচ্ছি মিস্তিরি। আমার বাবাও ছিল মিস্তিরি, আমার ঠাকুরদাও ছিল মিস্তিরি, শালা। তাই বলে, তাই বলে পুরো তিনটে জেনারেশনই কি মিস্তিরি হবে, অ্যাঁ? একটা সেঞ্চুরি চলে যাবে খালি শালা লেবার হয়ে...
তাই এই ছবিতে টিকলুর ডায়ালেক্টও আচমকা আচমকা বেখাপ্পা হয়ে গেছে অরুণ, সুজিত অথবা বিমানদের তুলনায়। আবার অরুণের কথাও সময় সময় দার্শনিকের বাণীর মতো দুর্বোধ্য ঠেকেছে টিকলুর কানে।
সেই তুলনায় একেবারে নিম্নবিত্ত সমাজের অন্তস্থল থেকে উঠে আসা রাজার। যে সমাজের কাঠামোয় মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম সম্মানটুকুও বজায় থাকে না। যে সমাজের অলিগলিতে অহরহ অন্ধকার জগতের হাতছানি। যে সমাজের রূঢ়তা স্মরণ করিয়ে দেয় নীহাররঞ্জন গুপ্তর কিরীটী সিরিজের ‘ছোরা’ গল্পটির উলঙ্গ বাস্তবকে। যে সমাজের শৈশব ফাদারের (চরিত্রায়নে অনিল চট্টোপাধ্যায়) ক্লাস থেকে, ফুটবলের (এবারে আর ক্রিকেট নয়) মাঠ থেকে হারিয়ে যায় দ্রুত। অপরাধমূলক কাজে কর্মেও যাদের ব্যবহার করা হয় অবলীলায়। তপন সিংহের ছোটদের ছবি সম্পর্কে এক বিশেষ নিবন্ধে তপন সিংহ ফাউন্ডেশনের সহ-সম্পাদক সৌমেন্দু দাশমুন্সীর মূল্যায়ন ছিল,
ছোটদের ছবি করতে তিনি বহিরঙ্গে যতই অ্যাডভেঞ্চার -ফ্যান্টাসি নিয়ে আসুন না কেন... পরিচালক তপন সিংহ কিন্তু শেষপর্যন্ত আগামী দিনের ‘বড়’দের ‘খোলামেলা মনস্তত্বে’ বিশ্বাস রেখে শোনান উন্নততর জীবনবোধেরই কথা।
কিন্তু ‘রাজা’-য় প্রদর্শিত সেই শৈশবকে সাক্ষী রেখেই অক্লেশে চলতে থাকে কদর্যতম ভাষাভঙ্গির সাংসারিক কলহ।
রাজার বিধবা বউদি (নিজের ছোটমেয়ের হাত ধরে রোয়াকের ধারে টেনে এনে): এগুলো বাপের বাড়ি থেকে সঙ্গে এনেছিলাম না? এ পঙ্গপাল তোদের এখানে এসে হয়েছে।
রাজা: হ্যাঁ, আমার জন্যে হয়েছে।
বউদি: তোর জন্যে না হোক তোর দাদার জন্যে হয়েছে।
রাজা: তাহলে দাদাকে দিয়ে ধর, সে চালাবে।

এই পরিবেশে বেড়ে ওঠা শৈশবের দিকে তাকিয়ে যদি উকিলবাবুর (চরিত্রায়নে নির্মলকুমার) মনে হয় যে এরা হাসবে না কাঁদবেও না নির্বিকারে ছুরি চালাবে তবে তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না।
ডায়ালেক্টগত দৃষ্টিকোণের বিচারে ‘আপনজন’, ‘এখনই’ এবং ‘রাজা’-র তুলনামূলক পাঠের এই দিকটুকু বাদে ভাববস্তুর নিরিখেও একটা ক্রম বিবর্তনের আদল মেলে ছবি তিনটিতে। কামতাড়িত অসুস্থ যৌবনের ছায়া স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে হতে উলঙ্গ রূপ নেয় ‘রাজা’-য় এবং অনেক পরে নির্মিত ‘অন্তর্ধান’ ছবিতে ধরা থাকে তার বীভৎস প্রকাশ। এই বিকৃত ভোগবাদের অতি সহজতম ভিকটিম বরাবরই হয়ে ওঠে উন্মার্গগামী যৌবন। হয়ত শ্রেণিগত কিছু তারতম্য থাকে, কিন্তু কলাবাগানের ছেনোগুণ্ডা থেকে বিত্তবান পরিবারের সন্তান ঊর্মি অথবা নিম্নবিত্ত সংসারের মেয়ে ননীর বোন—এক সুতোয় গাঁথা পড়তে থাকে একখানা সামগ্রিক প্রজন্ম।
ফিরে আসি পূর্বতন প্রসঙ্গে। খতিয়ে দেখার চেষ্টা করি ‘আপনজন’ বা ‘এখনই’-র কায়দায় কোনও উত্তরণের গল্প শোনায় কিনা ‘রাজা’। তপন সিংহের মতে,
... রাজা আমাকে ভাবিয়েছে বেশি। এ ছেলেটির মধ্যে বেপরোয়া ভাব আছে, খারাপ কাজও সে করে—আবার এর মধ্যেই পুরোনো ভ্যালুজগুলো এখনও বেঁচে আছে। সময়ে সময়ে সেগুলো উঁকি দেয়।
উঁকি যে দেয় তার সাক্ষ্য ছবিতে ছড়িয়ে থাকে অহরহ। সাঙ্গোপাঙ্গোদের কথায় রেল ইয়ার্ডে অ্যাকশনে যেতে সে রাজি থাকে খালি এই শর্তে যে প্রাপ্ত অঙ্কের ভেতর আহত হয়ে পড়ে থাকা ননীরও (চরিত্রায়নে ভীষ্ম গুহঠাকুরতা) একটা ভাগ থাকবে। জয়াকে ‘নরক’ থেকে বাঁচাতে সে এমনকি রমলার (চরিত্রায়নে আরতি ভট্টাচার্য্য) দেওয়া ভরসাজনক অর্থের নিরাপত্তাপূর্ণ কাজের সুযোগকে নিয়েও ছিনিমিনি খেলতে থাকে। যেরকম নুন আনতে পান্তা ফুরনোর দশা তার সংসারের তাতে ‘হাতের লক্ষ্মী’-কে এইভাবে পায়ে ঠেলতে পারার জন্য অতি অবশ্যই একধরনের মূল্যবোধের আবশ্যক। এবং শেষ অবধি জয়াকে বাঁচাতে গিয়েই এক আচমকা দুর্ঘটনায় পুলিশের গুলিতে তার প্রাণ যায়।
অরুণের আত্মত্যাগের সঙ্গে পারস্পরিক তুলনায় কোনও অংশে কম নয় রাজার আত্মাহুতির মহিমা। কোনও প্রথাগত শিক্ষাদীক্ষা নয় এক প্রচ্ছন্ন মূল্যবোধই ‘রাজা’-র রাজকুমার দত্তের এই মানসিক উত্তরণের ইন্ধন। প্রশ্ন উঠতে পারে এই চারিত্রিক মূল্যবোধের শিকড় কোথায়? সে কি নিছক বায়ুভূত শূন্যগর্ভ? এক্ষেত্রে উত্তর খুঁজতে আমাদের পুনরায় হাতড়াতে হবে সেই অতীত ইতিহাসের পাতা। রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দের দেশে বঙ্গীয় রিনেইস্যঁস আপাতদৃষ্টিতে সমাজের অভিজাত সম্প্রদায়ের ভেতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকলেও তার গভীর রেশ ছড়িয়ে পড়েছিল সমাজ শরীরের বিবিধ অঙ্গে প্রত্যঙ্গেও। রামমোহন বা বিদ্যাসাগরের সংস্কার আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল সামগ্রিক হিন্দু সমাজ। নেতাজিও কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র অথবা জাতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট পদ ‘অলঙ্কৃত’ করেই নিবৃত থাকেননি। সমসাময়িক বেকারত্বের ভ্রূকুটিতে, স্বাধীন দেশের প্রশাসন তথা রাষ্ট্রযন্ত্রের উদাসীনতা তথা (প্রাক মনমোহন জমানার দেশীয় অর্থনীতিতে সেই লাইসেন্স রাজের অন্তঃসারশূন্যতার দলিলও ধরা আছে ‘রাজা’-য়—লোহার কালোবাজারি রামলোচন শর্মার সঙ্গে রাজার কথোপকথনের মারফৎ) দুর্নীতিতে সেই সাবেক ঐতিহ্যের অণ্বয় দ্রুত ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে এলেও সমাজ শরীরের কোনও কোনও লুপ্তপ্রায় অঙ্গে যেন স্বাধীনতার আঠাশ বছর পরেও লুকোচুরি খেলত উক্ত সনাতন মূল্যবোধের ছায়ারোদ্দুর।
এভাবেই ফিরে ফিরে আসে অতীতের কুহক। নুটুবিহারীর পরিশীলিত হাহুতাশ থেকে সত্তরের অশীলিত যুবসমাজের অস্থিরতার পথ বেয়ে। এই হাহুতাশ এই অস্থিরতায় মিশে থাকে চলচ্চিত্রকারের ব্যক্তিগত জীবনাদর্শ। সাবেক আভিজাত্যমণ্ডিত একটি জাতির, স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্য বহনকারী একটি রাজনৈতিক দলের ক্রমিক অবক্ষয়ের চিত্র অনেকটা দর্শকের অজ্ঞাতসারেই আঁকা হয়ে চলে পর্দায়। যে সময়পর্বে ‘আপনজন’, ‘এখনই’ বা ‘রাজা’-র মতো ছবি নির্মিত হয়ে চলেছে একের পর এক, অতীতের আদর্শবান জাতীয় কংগ্রেসের অবস্থা তখন অনেকটাই ফোঁপরা। সেই বিপর্যস্ত কংগ্রেসের ছবি পাওয়া যাবে তপন সিংহের ‘কিছু ছায়া কিছু ছবি’-র পাতায় পাতায়। বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর বাংলার রাজনৈতিক আকাশে ঘনিয়ে আসা সেই উড়োমেঘ। অজয় মুখার্জির কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে স্বতন্ত্র্য দল গঠন। যুক্তফ্রন্ট সরকারের পত্তন ও পতন। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের শাসনকালীন সেই অরাজক বাংলার সামাজিক পরিবেশ। আজীবন কংগ্রেসি মনোভাবাপন্ন হয়েও (সূত্র ‘নিউ থিয়েটার্স, মোহনবাগান আর রবীন্দ্রনাথ’, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৫ জুলাই ২০০৬) শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ সিরিজের ‘বেণী সংহার’ কাহিনির মকরন্দ চরিত্রটির বিনির্মাণের মতো কোনওরূপ একদেশদর্শিতার পথে হাঁটে না তপন সিংহের সত্যসন্ধানী দৃষ্টি। নিজের লেখায় যে আন্তরিক সহমর্মীতায় নকশাল দমন পর্বের বীভৎসতাকে বিবৃত করতে দেখা গেছে তাঁকে হুবহু সেই কাহিনিকেই রচনা করে চলেন তিনি চলচ্চিত্রের পর্দায়।
‘রাজা’ ছবির মূল কাহিনির গতিবিন্যাসের স্রোতে বারে বারে যেন যতিবিন্যাসের আদলে প্রক্ষিপ্ত হয় একাধিক উপকাহিনির ঘটনাক্রম। হরতালমুখর নগর কলকাতা, ব্যস্ত রাজপথ অবরুদ্ধ করে এগিয়ে চলা জনতার মিছিলের ছবি ফিরে আসে মুহূর্মুহূ। কর্মহীন যুবকদের দেখা যায় নৌকায় চেপে, মেলায় ঘুরে, হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গেয়ে বেড়াতে। এই সমান্তরাল প্রক্ষেপণই ছবির ক্লাইম্যাক্সে একাকার হয়ে যায় মূল কাহিনির স্রোতে যখন পরিস্থিতির চাপে বেপরোয়া হয়ে ওঠা জনৈক বেকার যুবক (চরিত্রায়নে সন্তু মুখোপাধ্যায়) সন্দেহে পুলিশ রাজাকে গুলি করে। প্রসঙ্গত ছবির কৌশলগত বিচারে সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ (১৯৬২), মৃণাল সেনের ‘ক্যালকাটা ৭১’ (১৯৭২) বা ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর (১৯৭৩) আদলে তপন সিংহের ‘রাজা’-ও প্রথম যুগের বাংলা ‘হাইপারলিঙ্ক সিনেমা’ হিসেবে গণ্য হওয়ার দাবি রাখে এই সমান্তরাল প্রক্ষেপণমালার সূত্রেই।
ছবির সূচনায় মিছিলের পুরোভাগে হাঁটতে থাকা এবং অন্তিমে রিভলভার হাতে পালিয়ে বেড়ানো সেই যুবকটিকে কি নকশাল হিসেবে চিত্রিত করেন তপনবাবু? ভাবার চেষ্টা করতে থাকে দর্শক। ক্রমশ চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টি, অন্তরের স্বকীয় বোধশক্তি ঘুলিয়ে যেতে থাকে তার। যুবকটির রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নটুকুই মুখ্য হয়ে ওঠে। বেকারত্বের জ্বলন্ত সমস্যাটুকুর দিক থেকে মনোযোগ যায় হারিয়ে। আর এমনটাই তো চিরকাল চেয়ে এসেছে আমাদের বাংলার পরিচিত রাজনীতির কারবারিরা। গাড়ি চেপে ঘুরে বেড়ানো অজ্ঞাত পরিচয় সেই রাজনৈতিক নেতাটির সঙ্গে তাঁর অধস্তনের কথোপকথনের ভাষা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে বাজতে থাকে দর্শকের কানে।
নেতা: বেকার ছেলেদের প্রসেশন বেরিয়েছে শুনেছ?
অধস্তন: আজ্ঞে না স্যার।
নেতা: তা শুনবে কেন? আমাদের পার্টির ছেলেরা কী করছিল? তাদের নিয়ে গভর্নমেন্ট হাউসের সামনে ধর্ণা দেওয়ার কথা ছিল না?
অধস্তন: আজ্ঞে সে তো আমরা ৫-ই মে দিন স্থির করে রেখেছি স্যার। হরতাল ডেকে সারা পশ্চিমবঙ্গের নিঃস্ব নিপীড়িত যুবকদের নিয়ে আমরা প্রসেশন বার করব।
নেতা: কিন্তু তার আগেই যে এরা দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে পড়েছেন।
অধস্তন: তাহলে বোধহয় স্যার এরা সত্যি সত্যিই বেকার।
নেতা: তোমাদের উচিত ছিল একটা প্রসেশন বার করা কিংবা এমন কিছু করা যাতে পুলিশ এন্টারফেয়ার করে।

তপন সিংহের ছবির ক্ষেত্রে রাজনীতির এই ধুরন্ধর ভাষা ভঙ্গি নেহাত বিচ্ছিন্ন কোনও দৃশ্য তো নয়ই বরং এক উল্লেখযোগ্য পরম্পরা। মনে পড়ে ‘আপনজন’ ছবিতে ছেনোকে বলা হারু চক্রবর্তীর সেই কথাগুলো,
... ইতিহাস যদি পড়ে থাকো দেখবে, রাজা মহারাজাদের সরাল কারা? না, তাদেরই অমাত্যবর্গ মানে জমিদারেরা। জমিদারদের সরাল কারা? ক্যাপিটালিস্টরা। ক্যাপিটালিস্টদের সরাবার চেষ্টা করছে কারা? আমরা... এইবার, আমাদের সরাবার চেষ্টা করছে কারা? তোমরা, মানে গুণ্ডারা।
রাজনীতির ক্রম-দুর্বৃত্তায়নের ইঙ্গিত অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় হারুর কথায়। এবং এই ক্রমিক দুর্বৃত্তায়নেরই অত্যন্ত বীভৎসতাময় ছবি ‘আতঙ্ক’।
১৯৮৬-র ৩ অক্টোবর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আতঙ্ক’-র বাস্তবতা আজ প্রায় তিন দশক পরেও সমান প্রাসঙ্গিকতায় অনুভূত হয়ে চলে এই অপশাসিত বঙ্গের সমাজ শরীরের সর্বাঙ্গে। সেই পঙ্কিল ক্লাব সংস্কৃতিকেই আজ খুল্লমখুল্লা তোষণ চলে রাজনৈতিক মদতে। সেই সন্ত্রাস আর হিংসার আবহকেও চিনে নিতে অসুবিধে হয় না। রাজনৈতিক হত্যা সংঘটিত হয়ে চলে এমনকি শিক্ষানিকেতনের অন্দরেও। পুলিশ প্রশাসন পরিণত হয় শাসক দলের মোসায়েবে। তিন দশক আগেকার সেই ছবির মতোই মূল অপরাধীকে আড়াল করতে সরকারি চেয়ারে বসে থানার ওসিই আর আজ একা নন খোদ জেলা পুলিশের সুপারও চালিয়ে যান নির্লজ্জ মিথ্যাচার। পথেঘাটে বাজার দোকানে ট্রামে বাসে সব দেখেও চুপ করে থাকে সাধারণ মানুষ। পাড়ার মোড়ে পথ আটকে চেয়ার জুড়ে বসে থাকা রাজনৈতিক দাদা দিদিদের হিমশীতল চাহনি প্রতি মুহূর্তেই নীরব হুমকি দেয় তাদের, ‘আপনি কিছুই দেখেননি’। আর এই যাবতীয় মাৎস্যন্যায়ের প্রত্যক্ষ শিকার হয়ে চলে এই জাতির যুবসমাজ—নিহত অথবা হন্তারক উভয় রূপেই। প্রয়োজন ফুরোলে তৃণ স্তর থেকে উঠে আসা এককালের গুরুত্বপূর্ণ পার্টি মেশিনারিকেও সেই ক্ষমতার মূল রাজনীতি নির্দ্বিধায় শুনিয়ে দেয়, ‘আমাদের পার্টি তোমাকে কলেজ ছাড়তে বলেছিল?’
তবুও চলচ্চিত্রকারের আগ্রহ মানবিক সত্তার উত্তরণে। ছবির নির্মাণপর্বে জাতীয়তাবাদী অথবা শ্রেণিতত্ত্বের প্রভাষক কারও প্রতি আনুগত্যেই তাঁর প্রবল অনীহা। মতবাদ হিসেবে তাও যদি ছবির কোনও দৃশ্যে চলচ্চিত্রকারের কিঞ্চিত শ্রদ্ধা অর্জনে সমর্থ হয় মতাদর্শবিশেষ (সূত্র ‘সাগিনা মাহাতো’, কলকাতায় শ্রমিক সঙ্ঘের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অনুপম দত্ত বলেন সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী মন কখনওই প্রশ্রয় দিতে পারে না অনিরুদ্ধর ভ্রষ্টাচারকে) ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতি আজীবন বজায় রেখেছেন তিনি অত্যন্ত ক্ষমাহীন অবস্থান। তাই একদিকে যেমন কংগ্রেসি আমলে মুক্তি পেতে পারে ‘আপনজন’ আবার যাবতীয় ‘রক্ত’চক্ষুর রোষ উপেক্ষা করে বামফ্রন্টের শাসনপর্বে নির্মিত হয়ে ওঠে ‘আতঙ্ক’। স্রষ্টার এই রাজনৈতিকতা নিরপেক্ষ বিশিষ্ট মনোভঙ্গির কল্যাণেই যেন ছবির পর্দায় প্রদর্শিত সেই বিপথগামী যুবমানসেও বারে বারে প্রতিভাত হয়ে ওঠে উত্তরণের ইন্ধন। যার ব্যতিক্রম ঘটে না ‘আতঙ্ক’ ছবিতেও। ক্লাইম্যাক্স পর্বে পুলিশ আসার ঠিক আগে ক্লাবঘরের ভেতর ‘তুই অ্যাসিড মারলি কেন?’ বলে চিৎকার করতে করতে হেবোকে (চরিত্রায়নে ভীষ্ম গুহঠাকুরতা) মিহিরের (চরিত্রায়নে সুমন্ত চট্টোপাধ্যায়) সেই উন্মাদ প্রহারের মধ্যে যে অনুশোচনা যে নিষ্ফল ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ তা দৃষ্টি এড়ায়নি দর্শকের।
‘আতঙ্ক’-র মিহির কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিমাত্র নয়। এবং তার উন্মার্গগামীতার উৎসমুখটুকুও পর্দায় চিহ্নিত হয় স্পষ্টভাবেই। মানুষের বিপদ আপদে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া নিউ আলিপুর নিবাসী (ভৌগোলিক অবস্থানেই তপন সিংহের প্রতিবেশী) সেই সাহসী যুবকটির (চরিত্রায়নে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়) জবানিতেই থেকে যায় এই সামাজিক অসুস্থতার শিকড়ের খোঁজ। যখন ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির বিষয়ে তাকে মন্তব্য করতে শোনা যায়, ‘ওটা ইউনিভার্সিটি না কোনও পার্টি অফিস!’ কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের দোকান চালানো সেই সাধারণ যুবকটির কথাবার্তায় ক্ষণে ক্ষণে উঠে আসতে থাকে নাগরিক কলকাতার অস্তিত্বের আধুনিকতম সঙ্কটের ছবি, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জর্জরিত এক প্রেতনগরীর প্রসঙ্গ বা বাঙালির নিজের বইপাড়া থেকে মননশীল বাংলা সাহিত্যের উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়ার ইতিবৃত্ত। এই সূত্রেই মনে পড়বে ‘অন্তর্ধান’ ছবির প্রফেসর মুখার্জিকে (চরিত্রায়নে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)। টেলিফোন বিকল হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে তাঁর যথাযথ মন্তব্যকে, ‘উই নো লঙ্গার লিভ ইন এ সিভিলাইজড সোসাইটি’। ‘আতঙ্ক’-র উক্ত যুবক এবং অতি অবশ্যই সেই বৃদ্ধ মাস্টারমশাই (চরিত্রায়নে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) বা ‘অন্তর্ধান’-এর প্রফেসর মুখার্জির মতো চরিত্রগুলি নিঃসন্দেহে ছবিতে প্রদর্শিত সেই ক্রম দুর্বৃত্তায়িত সমাজের অভ্যন্তরে ক্রিয়াশীল এক একখানা বিপ্রতীপ প্রক্ষেপণ। মধ্যবিত্ত ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে উঠে যারা সত্যি করে ভাবা প্র্যাকটিস করে। নিয়ত চিন্তা করে পচনশীল সমকালের গতি প্রকৃতির বিষয়ে। স্বভাবগত চিন্তাশীলতার তাড়নায় যারা বলে ওঠে, ‘আমার বাবা খুব কেঁদেছিলেন, যেদিন ওই বিরাট বিরাট থামওয়ালা সিনেট হল ভাঙা হয়’ অথবা ‘এরা ভুলে গেছে টেলিফোন একটা লাক্সারি আইটেম নয়, এসেন্সিয়াল মিনস অফ কম্যুনিকেশন’।
‘আতঙ্ক’-র মিহির বা ‘অন্তর্ধান’-এর অরুণরাই (চরিত্রায়নে অর্জুন চক্রবর্তী) সেই অর্থে তপন সিংহের ছবিতে প্রদর্শিত যুবসমাজের একমাত্র মুখ নয়। এই শহরের পুলিশ ডিপার্টমেন্টেও থেকে যায় লোহিত রায়ের (চরিত্রায়নে সব্যসাচী চক্রবর্তী) মতো তরুণ ইন্সপেক্টর। ‘অমৃত’-য় প্রকাশিত সেই পূর্বোল্লিখিত নিবন্ধেই তপন সিংহকে মন্তব্য করতে দেখা গিয়েছিল,
আমি মনে করি আজ চারদিকে যে হতাশা আর বেদনা তা ক্ষণিকের... আমার ছবির চরিত্রগুলো তাই এই ভেঙে পড়া সমাজের মধ্য থেকে এলেও আশার কথা বলে, হতাশায় ভেঙে পড়ে না, ভ্যালুজগুলোকে হারিয়ে নিরালম্ব হয়ে তারা বাঁচে না...
তপন সিংহের ছবিতে তাই রাজনীতির নাগপাশে বিনষ্ট হতে বসা সামগ্রিক যুবসমাজের কোনও এক কোণ থেকেই আসে প্রতিবাদ নিদেনপক্ষে বিপ্রতীপ কন্ঠ। অনেক মূল্য দিয়ে এমনকি নিজের জীবন দিয়েও তাদের কেউ কেউ প্রতিপন্ন করে যায় জীবনের সার্থকতা। এক অনিবার্য মানবিক উত্তরণের ক্ষীণ রূপরেখাটুকু অন্তত আঁকা হয়েই চলে ‘আপনজন’, ‘এখনই’ বা ‘রাজা’ থেকে ক্রমশ ‘আতঙ্ক’ বা ‘অন্তর্ধান’-এর অন্তরঙ্গ ব্যেপে। হয়ত তাই নুটুবিহারীর উত্থাপিত প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে একদিন ডাক্তারবাবু যেভাবে বলেছিলেন, ‘এত বড় জাত কি এত সহজে নষ্ট হয় নুটুবাবু? ... হয়ত কিছু ঘটবে, এটা তারই প্রস্তুতি’—কালের দুস্তর ব্যবধান পেরিয়েও সেভাবেই এক অপ্রতিহত আশাবাদ পুনঃ পুনঃ ছায়ারোদ্দুর ফেলে যায় ১৯৬৮ পরবর্তী তপন সিংহের ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র সেই যুবসমাজের ছায়াচ্ছন্ন অস্তিত্বের বহিরঙ্গে।

আপনার মতামত জানান