তোমাকে,

মনীষা মুখোপাধ্যায়


তোমাকে,

সেদিন হাওয়া হয়েছিল মুহু মুহু। কে যেন ভেসে এসে বলল, জরুরি কথায় আছে, বলতে চাই। হাওয়া বইছে শিরশিরিয়ে, এর মাঝেই জরুরি কথা...! তবে কি যে টুকরো সুর- ধ্বনি ক'দিন ধরেই হাওয়ায় ভেসে এসে লুটোপুটি খাচ্ছে, জরুরি কথা তেমনই কিছু? হাওয়াও কিছু বলছে নাকি? কত কথা যে তখন ফিসফিসিয়ে আসে-যায়... কিছু শুনি না, কত কিছু শুনে ফেলি আচমকা। সে এক ত্রস্ত নীলিমায় ঘোর লাগার গপ্পো। সংশয়, ভয় ছাপিয়ে একবগ্‌গা একটা ধুকপুকুনি টের পাই শুধু। বুঝলাম ভালবাসা জমেছে পাঁজরে। তখনও দেখাটুকু ছবিতেই আটকে, আর ফোনে গলা শুনে মনে মনে একটা স্কেচ চলছে। কার যেন বলে, চোখে না দেখলে ভালবাসা হয় না! যত্তসব বা...জে কথা! তার পর আর কি! নিরন্তর এক ভেসে চলার মতো দিন কাটে। মন লাগে না কাজে। গুণগুণ করে যায় জট পাকানো যত কথা- কথা কাটাকাটি-ফিসফাস।

তার পর দস্তুরমতো দেখা হল একদিন। ট্যাক্সিটা পার্কস্ট্রিটের মোড় বেঁকতেই হু হু করা সুখ কোত্থেকে যে ধেয়ে এল! তেজপাতা রঙের প্রায়- বিকেলে দেখা হল দুজনের। আদতে কলকাতার যতগুলো রাস্তার নিজস্ব জৌলুস আচে তার মধ্যে পার্ক -স্ট্রিট একটা। ওই ফুটপাত ধরে হাঁটতে যে আমার কি ভাললাগে এখনও! কিন্তু এখন আর তেমন হাঁটার সুযোগ কই? সে যাই হোক, সেই পার্ক -স্ট্রিট দিয়ে শুরু। কি নরম করে আমার চোখে চোখ রেখেছিলে তুমি! আমি সোজা তাকাতেই পারছিলাম না। অমন একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি বুঝি? কত কথা হল সেদিন, ঘোর- ঘোর, ধোঁয়া -ধোঁয়া। রবি ঠাকুর সেদিন আমাদের দেখেছিলেন কী? নাহলে তার পর থেকেই 'প্রভু তোমা লাগি আঁখি জাগি' শুনে তুমি -আমি কেউই চোখের জল আটকাতে পারি না কেন? তোমায় একদিন জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, কেন বলোতো, এমন হয়? কানে কানে বললে, প্রেম হলে এমনটাই হয়। তখন সব প্রভুতেই মনের মানুষ লেগে থাকে যে! আবার শিরশিরানি। এই এক হয়েছে! মাঝেমাঝেই নিজের অজানে কেঁপে উঠি, কে যেন লাউডগা বুলিয়ে দেয় পিঠে, ঘুমের মধ্যেও টের পাই। হাঁসফাঁস করে উঠে বসি। ঘুম ভাঙলেই তো তোমার মুখ। কেন বলোতো? প্রেমে এমনও হয় বুঝি? তার পর থেকেই তো নিরালার খোঁজ শুরু। মনে মনে আর পায়ে পায়ে আমরা কাঁহা কাঁহা যে গেছি! এমন নিরুদ্দেশের জন্য হাঁটার যে কি আরাম! ব্যারাকপুর বড় মোলায়েম জায়গা আমাদের। কি মমতায় অন্ধকার ঘনিয়ে আনে বল? মিলিটারি ব্যারাক পাশে রেখে কী নিপুণ দক্ষতায় চাঁদের ডিম ভেঙে তুমি কুসুম বের করে এনেছিলে মনে পড়ে? আর কী এক অমোঘ অনুভবে আমাদের জিভ- ঠোঁটের মণিকাঞ্চনে ভেস্তে যাচ্ছিল সব সাঁজোয়া শাসন। কানের কাছে মুখ নামিয়ে কত কিই বলছিলে... শুধু কানে এসেছিল, 'যদি গুলি করে?' চকিতে সজাগ। মিলিটারি রাস্তা, কতশত নিয়ম। সেখানে গোপনীয়তা খুঁজে নিলেও গুলি করবে! এত সাহস! পিঠ আঁকড়ে বললুম, 'বললেই হল! তোমার যত ভয়! গুলি করবে? আমি আছি না।' যদিও আমি থাকলে গুলি করার বাধা ওথায় তা আমি জানতাম না। ফেরার সময় আরও দু'জন রাস্তায় ইতিউতি ছড়িয়ে। ওরাও কি অন্ধকার খুঁজছিল? ফিসফিসিয়ে বললাম, 'যাও না, ওদের ফাঁকা রাস্তাটা বলে দাও...' হাতে আলতো চাপ দিয়েই বললে, 'যে যার রাস্তা নিজেই খুঁজে নেয়...।'

তার পর থেকেই রাস্তা খোঁজা শুরু। এসব কথা তোমার জানার কথা নয়। জানানোর মতোও নয়। মামাতো ভাই ছোটন নাকি অনেকবার তখন খোঁজ করেছিল তোমার। পায়নি। পরে শুনেছিলাম হঠাৎ সিদ্ধান্তে তুমি বিলেতে পড়তে গেছ, এতটাই হঠাৎ যে আমিও জানতে পারিনি! কী করে যে এমনটা হল কি জানি! এ উত্তর আমি আজও হাতড়ে বেড়াই। যাই হোক, তোমার পুরোনো সব নম্বর বদলেছে। বাড়ির মানুষরা তো আমায় তেমন চিনতেন না, তবু ছোটন গিয়েছিল খোঁজ করতে।
জানা গেল, তখনও তুমি স্থায়ী নম্বর পাওনি। বুথ থেকে ফোন করে বাড়িতে কথা বল। কই! আমার কাছে তো বুথ থেকে আর ফোন আসেনি! আর কখনওই আসেনি। মিলল না নম্বর। তখনই বুঝেছিলাম, জীবনে আর কিছুই মিলবে না। আর একবার বুঝেছিলাম এমন। যেদিন বড় হয়ে জানলাম আমার মা-বাবা কেউই নিজের নয়। আর এই কিছুই মিলবে না- টুকু ভাবার সময়টাই জীবনে সবচেয়ে কঠিন জানো। কী হবে এর পর -- এই রহস্যই মানুষের টাকরার টকের স্বাদ। আমারও এবার কী হবে, ভাবলে দম আটকে আসত আগে। হাত-পা পাকিয়ে আসত। মনে হত, পালাতে হবে। হবেই। কে যেন আমার সবটুকু জেনে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গেছে সব। তাই এমন এক জায়গায় যেতে হবে যেখানে তোমার- আমার কোনও দাগ লেগে নেই।
এ শহর ছেড়ে পালাতে গিয়ে অজান্তেই ঢুকে পড়লাম এক অন্য শহরে। আলো -রোশনাই-মাংসের শহর। আমি এখন যে মহল্লায় থাকি তার গায়ে সারি সারি আলো। রোজ রাতেই একজন আসে। তবে প্রতিদিনই অন্য অন্য একজন। আমি খানিক মুখের দিকে চেয়ে থাকি, কেউ কি তোমার মত দেখতে? কেমন দেখতে হয়েছে তোমাকে এখন? আগের মতোই? হালকা দাড়ি-গোঁফে তোমায় কিন্তু বেশ মানাত। জানো, এখানে একজন আসে মাঝেমধ্যে। খানিক তোমার মতোই হালকা দাড়ি-গোঁফ... একদিন ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে বলল, আগে একগ্লাস জল খাওয়াবে? কত কত দিন আগের স্বর যেন মহাসমুদ্রের পাড় ভেঙে কাছে এল। বুকের মধ্যে ঢেঁকি পড়ার সোয়াদ এসব জায়গায় থাকে না। থাকতে নেই। তিরতির করা আনন্দ আর হাউহাউ বিষাদে মিশে জল দিলাম ওকে। হাত একটুও কাঁপল কী!
আচ্ছা তুমি এখনও ট্যাংরা মাছের জন্য বাজার উজিয়ে ফেল? আর মেটে চচ্চরি? দেশে ফিরেছো আর? আমায় খুঁজেছ ফিরে? ওখানে মেলে ট্যাংরা? এখানে না রোজই মাছ -মাংস। ঘরে -বাইরে মাংস। মাঝেমাঝে মনে হয়, কত পাপ আমি করেছিলাম বলতো? আগের জন্মে বোধ হয় অনেক পাপ ছিল জানো, না হলে বল, সম্পর্ক তো কতই ভেঙে যায় কিন্তু নিদেন কার সঙ্গে থাকো, কোথায় -- সেসব কিছুই জানতে পারলাম না আমি!
এই তোমার মনে পড়ে, সমস্ত শরীরে বাঁশি বাজার কথা বলেছিলে একদিন। মন নাকি সেই বাঁশিতে ফুঁ দেয়। আরও কত কিই যে বলতে তুমি... প্রতিরাতে এখানে আমায় পসরা সাজাতে হয়। সাজাতেই হয়। কিন্তু কই বাঁশি বাজে না তো! কী এক তীব্র বেসুর শুধু ছড়িয়ে পড়ে পাড়াটায়। তবে জানো, আমার আর তেমন কষ্ট হয় না। আগ হত। শরীরের চেয়েও মনে। কত রাত কেঁদেকেটে এককোণে পড়ে থাকতাম। একবার পালানোর চেষ্টা করেছিলাম। ধরে ফেলল। খুব মারল জানো। জায়গায় জায়গায় দাগড়া, কালশিটে।

শিকার আর শিকারীর পৃথিবীতে থাকি। তবু কী নির্লজ্জ দেখো, এখনও প্রতিটা একান্ত অনুভবে শুধু তোমার মুখটাই যে কেন... প্রতি রাতে তীব্র চোখমুখ শুধু ঝুঁকে পড়ে, বাজারের সবজির মতো পরখ করে, বাছাবাছি হলে তার পর রান্না বান্না। আর সেইসব নখ-দাঁত-মুখের আমি শুধু বাঁশির আওয়াজ খুঁজি। তুমি কি জানতে না, বাদক বদলালে বাঁশি আর বাজে না! বলো না... জানতে না? তাহলে কেন অমন করে চলে গেলে! কেন একবারঅ আমায় জানালে না সব!
দ্যাখো দিকি, তখন থেকে কতসব এতোলবেতোল লিখছি। এই নিয়ে ১১৭টা হল। আমার একটা হালকা গোলাপী ট্রাঙ্ক আছে জানো। ওতে সব জমানো থাকে। কী করব, তোমার ঠিকানা জানি না যে, পাঠাবো কি করে? আর এমনিতেই আজ কত বছর হয়ে গেল! কত কি বদলে গেছে! এ চিঠির দামই বা কতটুকু? যে রাতে খুব কষ্ট হয়, তখন তোমাকে লেখা চিঠিগুলো পড়ি। কি করব বল, আমার তো আর কিছুই নেই। কেউ নেই। এই চিঠিগুলোই আমার আত্মীয়, স্বজন, আত্মজ। চিঠি লেখায় তোমার ভারি অনীহা ছিল। কতবার নানাভাবে চেয়েছি, রাগ দেখিয়েছি! ধুর! তুমি দিলেই না। দিলে বেশ হত জানো। আমাদের যা হয়নি ওদের তা হত। চিঠিতে-চিঠিতে বিয়ে দিতাম। ওরা কাছে আসত... আদর... বল না, বাঁশি বাজত না ওদের?
বাজাতে না?

আপনার মতামত জানান