তুতন আর তার দাদুভাই

রাহুল ঘোষ

তুমি তুতনকে চেনো?
আরে সেই যে নেহারীপাড়ার গলির মুখে ‌একটা দুইতলা বাসা,সেই বাসাটার ব্যালকনিতে সারা বিকেল গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা পিচ্চি ছেলেটা,কে.জি টু-তে পড়ে।
যাক,চিনেছ তাহলে।
জানো, তুতনের কোন খেলার সাথী নাই!তাদের বাসার মস্ত বড় সদর দরজাটায় ইয়া বড় একটা লোহার তালা ঝুলানো থাকে সারা দিন,সেই তালা খোলার চাবিটা তুতনের কাছে নাই। তার সমবয়েসী কেউ তাদের সাড়ে পাঁচ-পুটি কাঁচ-গাথা পাঁচিলটা ডিঙিয়ে তার সাথে খেলতে আসার সাহসও করতে পারে না।তার খেলনা আর খেলার সাথী বলতে শুধু একটা জিনিসই আছে।তাদের বাড়ির পাকা উঠোনের এক কোণায় অনেকদিন ধরে পড়ে থাকা একটা পরিত্যক্ত মোটর গাড়ি। বিকেলের ব্যালকনিতে অনেকটা সময় বাদুড়-ঝুলন ঝুলার পর ,তার হঠাৎ করে সেই গাড়িটা কথা মনে পড়ে। তখন এক দৌড়ে গুণে গুণে আঠারোটা সিঁড়ি মাড়িয়ে সে উঠোনে নেমে আসে,বসে পড়ে সেই গাড়িটার ড্রাইভিং সিটে। মুখে,ঠোঁটে,জিভে অদ্ভুত শব্দ করে করে সে গাড়িটা স্টার্ট দেয়।হয়ে যায় দুনিয়াদারির রাজা!এই পরিত্যক্ত মোটরগাড়িটাকে মাঝে মাঝে তার পক্ষীরাজ ঘোড়া মনে হয়। হোক না গাড়িটার চুপসে যাওয়া টায়ার-টিউব,ছানি পড়ে যাওয়া দুইটা হেডলাইট,চটে যাওয়া শরীরের রং।তার মাঝে মাঝে এই ভেবে অবাক লাগে যে গাড়িটা স্টার্ট দিতে তার কোন চাবি লাগে না,চোখ আর মনের ইশারা পেলেই কখনো মাটিতে,কখনো বাতাসে উড়ে চলে তার পক্ষীরাজ গাড়িটা।চাবি সে অনেক খুঁজেছে,পায় নি,তার বাবা সেই চাবিটা হারিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই,কোন এক বাঁকা পথের মোড়ে।কারও কোন আফসোসও নেই সেই চাবিটা খুঁজে না পাওয়ায়,শুধু মাত্র তুতন ছাড়া।তার বাবা সেই গাড়িটাকে কবে শহরতলীর একটা গ্যারেজে বেচে দিতে চেয়েছিলেন।বাবার বন্ধুরা বাসায় বেড়াতে এলেই তার বাবাকে বলতো,উনি কেন এই আবর্জনাটাকে এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন,উঠোনের কি অবস্থা এই বাজে মালটার কারণে!কিন্তু তার বাবা অনেক চেষ্টা-চরিত্র করেও গাড়িটাকে বেচে দিতে পারে নি,একমাত্র তুতনের কারণেই।গাড়িটাকে গ্যারেজে রেখে আসার কথাটা উঠলেই তুতনের দুই চোখ জলে ভরে যায়,মা-বাবার সাথে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় তার,একমাত্র খেলার সাথীটাকে হারানোর ভয়ে তার নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।একমাত্র ছেলের এই অবস্থা দেখে তুতনের মা-বাবাও আর উল্টো কিছু করার সাহস পায় না।সেই সাথে গাড়িটাও থেকে যায় তুতনদের পাকা উঠোনের এককোণে,তুতনের ভালবাসায়,বাকি সবার অবহেলায়।

তুতনের দাদুভাইয়ের আজ জন্মদিন।ঘরের সবাই জানে,কিন্তু কেউ যাপন করছে না সেই উৎসবটা,একমাত্র তুতন ছাড়া।কিচেনের কোন এক মাকড়সার জাল মোড়ানো কোণ হতে সে যোগাড় করেছে একটা আধজ্বলা মোমবাতি।তার স্কুল ব্যাগের চোরা পকেটে আছে একটা মিল্কি লজেন্স।আজকে সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বলবে, মোমবাতি নিভবে।মিল্কি লজেন্স ভাগাভাগি হবে পরম্পরার হাত ধরে।তুতনের বুড়ো দাদুভাইটাও হয়তো তার অনেক খোঁজা একটা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন আজকে - এই নিরাসক্ত,বিচূর্ণ আশিতে পৌঁছেও উনি কেন নিজের শেষ গন্তব্যটা খুঁজে পাচ্ছেন না ? থাক গন্তব্যটা দূরেই থাক,ঐ নিঃসঙ্গ পিচ্চি ছেলেটার একমাত্র খেলার সাথী হয়ে বেঁচে থাকাটাও নেহাৎ কঠিন না।তবুও খুনসুটির ফাঁকতালে কখনো–সখনো বেজে ওঠে বাউরি ব্যথার সরোদ –ঐ পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়া মোটরগাড়িটার সাথে তুতনের বুড়ো দাদুভাইয়ের কি অসম্ভব মিল!

আপনার মতামত জানান