পদধ্বনি

অদিতি ভট্টাচার্য্য


দিন পালটায়, যুগ বদলায়, তার সঙ্গে বদলায় মানুষও, তার মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক পুরোনো রীতিনীতি, আচারবিচার, নিয়মকানুন কালের গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না, পিছিয়ে পড়তে থাকে, এক সময়ে কালের গর্ভেই বিলীন হয়। এইভাবে হারিয়ে যায় অনেক কিছু, যার মধ্যে ভালো মন্দ দুইই থাকে। তবুও পরিবর্তন প্রকৃতির নিয়ম। পরিবর্তনের ঝোড়ো হাওয়ার ঝাপটা কেউ সইতে পারে, পেরে টিঁকে থাকে, কেউ পারে না। এই চিরায়ত নিয়ম। এই হয়ে আসছে আদিকাল থেকে। কেউ মানিয়ে নিতে পারে এর সঙ্গে, কেউ হাহুতাশ করে কালক্ষেপ করে। গুটিকয় মানুষ এমনও থাকে যারা পারে না যুগ বদলের হাওয়াকে পুরোপুরি আটকাতে কিন্তু পুরোনো ধ্যান ধারণাকে আঁকড়ে ধরে রাখার বিস্তর চেষ্টা করে। কিছুটা পারেও। তাজা হাওয়ার প্রবেশ সেখানে নিষেধ, পুরোন জীর্ণতার সেখানে জয়জয়কার।
ঘিঞ্জি শহরের চতুর্দিকে গড়ে ওঠা বহুতল আবাসনের ছড়াছড়ির মধ্যে বেশ অনেকটা জায়গা জোড়া, উঁচু পাঁচিল ঘেরা ‘নারায়ণ নিবাস’ সেরকমই এক অচলায়তন। সময় সেখানে থমকে আছে বোধহয় একশ বছর আগে। লোহার ভারী গেটটা খুলে ভেতরে ঢুকলেই মনে হয় এ কোথায় এলাম! বাইরে, ভেতরে এ বাড়ির সর্বত্র বিগত যুগের ছাপ। উঁচু পাঁচিল, ভারী লোহার গেট, সেগুন কাঠের সিং দরজা যেন চোখ রাঙায় আগতদের, যেন বলে, ওই বাইরেই ফেলে এসো তোমাদের সব নবীনতা, নতুনত্বকে, তোমাদের এ যুগের ধ্যানধারণাকে, দিন বদলের কাব্যকে – তবেই এখানে ঢুকতে পারবে, নাহলে দু দণ্ডও টিঁকতে পারবে না।
গৃসস্থালীর সুবিধের জন্যে, কাজকর্মের সুবিধের জন্যে কিছু নতুন জিনিসপত্রের প্রবেশ ঘটেছে নারায়ণ নিবাদের অভ্যন্তরে এ কথা ঠিকই, কিন্তু এখানকার বাসিন্দাগুলো ষোলো আনা সেকেলে। তাদের মনের ভেতরে একালের কোন আলো হাওয়া ঢোকেনি, দরজা জানলা একেবারে এঁটে বন্ধ করা। বদ্ধ বাতাস সেখানে গুমরে মরে।
আজকাল সুনন্দার এরকমই মনে হয়। বাইরের লোকের কথা শুনে নয়, সে শোনার অবকাশ তেমন আর পান কই? নিজেরই মনে হয়। আঠারো বছর বয়সে বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে এসেছিলেন। এত বছর হয়ে গেল এখানে রয়েছেন, অথচ তাঁরই আজকাল যেন দমবন্ধ লাগে। খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার – শুধু এই পরিসরে অভ্যস্ত হয়েও যেন হলেন না, তাই তো এখন অতিষ্ঠ লাগে। লোহার ওই ভারী গেটটা আর উঁচু পাঁচিলের ওধারে যে পৃথিবীটা, তাতে কতবার রঙ বদল হল, কিন্তু সে রঙের ছিটে ফোঁটাও লাগল না বাড়ির মানুষগুলোর মনে। দুজন চেষ্টা করেছিল, আঘাত প্রত্যাঘাতে রক্তাক্তও হচ্ছিল। তারা স্কুলে কলেজে যেত, বাইরের জগতে তারা মিশেছিল। নারায়ণ নিবাসের হাজার কড়াকড়ি বিধি নিষেধের মধ্যেও তারা কী করে যেন খাপছাড়া হয়েছিল, তাদের রক্তের জোর ছিল, শেকল ভাঙার ক্ষমতা ছিল। সেই দুজনও আর নেই। কবেই শেকল কেটে উড়ে গেছে। আর সেই ভাঙা শেকলে আরো বেশী করে তাদের মাকে জড়িয়ে রেখে গেছে।
বড়ো দুঃসহ এ ভার। বহন করতে করতে সুনন্দা ক্লান্ত। কিন্তু ভারমুক্ত হওয়ার কোনো রাস্তা নেই, প্রতিবাদ করেও কোনো লাভ নেই। এত বছরের মুখ বুজে থাকার অভ্যেস ত্যাগ করে জানিয়েছিলেন নিজের ইচ্ছে। হয়তো তাঁর মাতৃত্বই তাঁকে এই দুঃসাহস জুগিয়েছিল সোজা প্রতাপনারায়ণকে নিজের মনের কথা মুখ ফুটে বলতে। প্রতাপনারায়ণ কী যেন একটা বই পড়ছিলেন তখন। সুনন্দা যখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন মুখের সামনে থেকে বইটা নামান নি, সুনন্দা যখন কথা বলছিলেন তখনও না। শুধু বক্তব্য শুনে কপালটা একটু কুঁচকেছিলেন। মুখের সামনে বইটা ধরে রেখেই বলেছিলেন, “কমলা এই জ্বর থেকে উঠল, মুখে একদম রুচি নেই বলছিল কাল। ওর খাওয়াদাওয়ার দিকে নজর রেখো। সব কাজ মাইনে করা রান্নার লোক দিয়ে হয় না।”
কী কথার কী উত্তর! আবার একবার বুঝেছিলেন সুনন্দা এ বাড়ির হর্তা কর্তা বিধাতা আসলে কে, কার অনুমতি ছাড়া এখানে একটা পাতাও নড়ে না। আবার একবার দেখলেন নিজের ইচ্ছেকে নস্যাৎ হতে। এসেছিলেন নিজের ছেলেমেয়ের সঙ্গে দেখা করার, কথা বলার অনুমতি চাইতে, উপদেশ শুনলেন বিধবা পিসিশাশুড়ির খাওয়াদাওয়ার যত্ন নিতে। যেন এত বছরে কমলা কখনো অসুস্থ হননি, সুনন্দা কখনো তাঁর সেবাযত্ন করেননি, যা পছন্দ নিজের হাতে তা রান্না করে খাওয়াননি! শুধু কী কমলা, বাড়িশুদ্ধ লোকের জন্যেই কি করেননি? এই তো করে আসছেন এত বছর ধরে। কিন্তু তার কদর আর কে বোঝে!
প্রতাপনারায়নের সঙ্গে সুনন্দার কথা বলার ফল ভালো হয়নি। রাতে আদিত্যনারায়ণ মানে সুনন্দার স্বামী গম্ভীর মুখে বললেন, “তুমি বাবার সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলতে গেছ? আমাকে বলে হল না! আশ্চর্য! আমি ফিরতেই বাবা আমাকে বললেন, ‘বৌমাকে বোলো যতদিন আমি বেঁচে আছি ততদিন একটু কষ্ট করে থাকতে। তারপর যে যা ইচ্ছে তাই চলবে সে তো এখন থেকেই বেশ বুঝতে পারছি। নাহলে তার ছেলেমেয়ের রাস্তায় সেও চলতে পারে।’ আমার মাথা কাটা গেল।”
সুনন্দা ঝাঁঝিয়ে উঠেছিলেন সেদিন, “এতো বড়ো কথা উনি বলতে পারলেন আর তুমি মুখ বুজে চলে এলে!”
“অন্যায় তোমার ছেলেমেয়ে করেছে, বাবা নন। তাই তাদের হয়ে কথা বলতে যাওয়াও অন্যায়। এটা তুমি যত তাড়াতাড়ি বুঝবে ততই মঙ্গল। তোমার পক্ষেই,” আদিত্যনারায়ণের গলা ওঠেনি, কিন্তু তাতে রাগ বিরক্তি বেশ স্পষ্ট ছিল।
এরপর সকাল সন্ধ্যে দুবেলা বাড়ির মন্দিরে কুলদেবতা শঙ্খ চক্র গদা পদ্মধারী নারায়নের প্রস্তর মূর্তির সামনে মাথা কোটা ছাড়া সুনন্দার আর কোনো পথ ছিল না। প্রতাপনারায়ণ আর তাঁর যোগ্য পুত্র আদিত্যনারায়ণকে তো পাষাণই মনে হয় সুনন্দার। তাই কোন পাষাণ আগে গলে, কোনটা তুলনায় নরম সেটা দেখার দরকারও আছে বৈকি।
মন্দিরের প্রস্তর মূর্তির কাছেই মনে হয় প্রার্থনা মঞ্জুর হল। অদ্রি এল একদিন। একেবারেই হঠাৎ। ধূমকেতুর মতো, হঠাৎ ওঠা দমকা হাওয়ার মতো। ভর দুপুরে। আদিত্যনারায়ণ কোর্টে। প্রতাপনারায়ণ এক সহকর্মীর বাড়িতে কী উপলক্ষ্যে যে দ্বিপ্রাহরিক নেমতন্ন রক্ষা করতে গেছেন। কমলা নিজের ঘরে বিশ্রাম করছেন। এমন সময় এল অদ্রি। সোজা এল মার ঘরে। এত বছর পরে ছেলেকে হঠাৎ এভাবে নিজের ঘরে দেখে সুনন্দা স্তম্ভিত, মুখে কথা জোগায় না। আগে থেকে আর খবর কে দেবে? যারা দিত, অদ্রির সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অপরাধে প্রতাপনারায়ণ তাদের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। আর তাঁর ছিন্ন করা মানেই নারায়ণ নিবাসের প্রতিটা মানুষের সঙ্গে তো বটেই, এ বাড়ির কীট পতঙ্গর সঙেও সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া। তা সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের সঙ্গে নারায়ণ নিবাসের যতই গভীর সম্পর্ক থাক। প্রতাপনারায়ণের কথার ওজন এমনই – এক কথায় সব কাটান ছেড়ান। একটা মোবাইল ফোন ছিল সুনন্দার, সেটাতেই আসত ছেলেমেয়ের ফোন। কিন্তু আদিত্যনারায়ণ ধরে ফেলার পর তাও বন্ধ। সুনন্দাকে নিজে ফোন করে অদ্রিকে বলতে হয়েছিল আর কোনোদিন ফোন না করতে, বোনকেও জানিয়ে দিতে। তারপর সে ফোন চলে গেছিল আদিত্যনারায়ণের হেফাজতে। আর হাতে পাননি। পাওয়ার চেষ্টাও করেননি। প্রয়োজনই ছিল না।
আজ এত বছর পরে অদ্রিকে দেখে তাই হতবাক। মার দু চোখ ছেলের সর্বাঙ্গে সস্নেহ দৃষ্টি বুলিয়ে দিতে থাকে। ছেলের চোখও আর শুকনো থাকে কী করে? প্রাথমিক ভাবাবেগ কমলে অদ্রিই সব বলল। এবার এসেছে বেশ কিছুদিনের জন্যে। ওর আর ওর স্ত্রীর দুজনেরই কিছু কাজও আছে এ দেশে। অদ্রি বলতেই থাকে কত কিছু। সুনন্দার কানে কিছু ঢোকে, কিছু ঢোকে না। উনি তখন ছেলেকে নিরাপদে ফেরৎ পাঠাতে পারলে বাঁচেন। যদি প্রতাপনারায়ণ ফিরে আসেন, যদি কমলা জানতে পারেন! সুনন্দার মন খালি যেন বিপদের পদধ্বনিই শোনে।
মার ভয় দেখে অদ্রি বলল, “আজ যদি সবাই বাড়িতে থাকতও তাহলেও আমি তোমার সঙ্গে দেখা না করে যেতাম না।”
“এইটুকু চোখের দেখা দেখা হয়েছে, এই আমার ঢের। কেউ জানতে পারার আগেই এবার তুই চলে যা বাবা। নাহলে অনর্থ হবে,” সুনন্দা বললেন।
অদ্রির কিন্তু চলে যাওয়ার কোনো লক্ষণই নেই, বলল, “মা দাদুর ঘরে একটা বড়ো ছবি ছিল না? হাতে আঁকা? দাদুর বাবার? ছবিটা আছে এখনো? আগেই অবশ্য ওটার অবস্থা খুব খারাপ ছিল। রঙ আবছা হয়ে গেছিল। কিন্তু দাদু ওটাকে সরাতে চাইত না বাবার ছবি বলে। ছবিটা আমার বরাবরই খুব অদ্ভুত লাগত, কীরকম যেন রহস্যময় লাগত। মনে হত যেন দাদুর বাবার ছবি ছাড়াও ওতে আরো কিছু আছে। কতবার দেখতে চেয়েছি কিন্তু দাদু দেখতে দিলে তো! ওটা একবার দেখা যাবে মা?”
“কিছুদিন আগে দেওয়াল থেকে হুট করে পড়ে গেছিল ছবিটা। আর দেওয়ালে টাঙানো হয়নি, কেন কে জানে! তোর দাদুর টেবিলের ওপরেই খবরের কাগজে মুড়ে রাখা রয়েছে। সকালে দেখলাম।”
“চলো দেখি,” অদ্রি উঠে পড়ল দাদুর ঘরের যাবার জন্যে। পেছন পেছন সুনন্দা।
ছবিটার অবস্থা এখন আরোই খারাপ। খবরের কাগজ থেকে বার করে অদ্রি সেই একইরকম মুগ্ধ নয়নে দেখতে লাগল, যেরকম দেখত ছোটোবেলায়।
“মা আমি যদি এই ছবিটা নিয়ে যেতে চাই, দেবে? আবার ফিরিয়ে দিয়ে যাব কয়েক দিন পরেই। কিন্তু............” বলতে গিয়েও থেমে গেল অদ্রি।
এই বাড়ির একটা ধূলিকণার ওপরেও কোনো অধিকার নেই অদ্রির। প্রতাপনারায়ণের আদেশের ফলেই সে অধিকার গেছে। প্রতাপনারায়ণ তো বটেই, আদিত্যনারায়ণেরও মনের কোনোদিন কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। পরিবর্তন শব্দটাই এ বাড়িতে নিষিদ্ধ। কিন্তু ওনারও কি কোনো অধিকার নেই অদ্রিকে কিছু দেওয়ার? টাকা, পয়সা, গয়নাগাটি নয়, শুধু একটা ছবি? হলই বা সেটা ওনার প্রবল পরাক্রমী শ্বশুরমশায়ের বাবার ছবি। সুনন্দার মন আজ বিদ্রোহ করল। হয়তো এত বছর পরে এক বিদ্রোহীকে দেখেই। দিয়ে দিলেন ছবিটা।
“নিয়ে যা তুই এটা,” বলেই ফেললেন সুনন্দা।
“আমি ফিরিয়ে দিয়ে যাব, তুমি নিশ্চিন্ত থেকো। ছবিটা দারুণ, এটাকে আবার আগের মতো করা যায় কীনা দেখব। কিন্তু ততদিন তোমার......”
“আমার কী হবে সে ভাবনা ভাবিস না। যা হয়েছে তার থেকে খারাপ আর কী হবে? এত বছর হয়ে গেল নিজের ছেলেমেয়েকে দেখতে পাই না, কথা পর্যন্ত বলতে পারি না, এর থেকে বড়ো শাস্তি একজন মার পক্ষে আর কী হতে পারে। তুই ভাবিস না, তুই নিয়ে যা ছবিটা।”
অদ্রি চলে গেল, সুনন্দা ফিরে এলেন নিজের ঘরে। কমলা কী করে যেন জানতে পেরে গেলেন।
দুপুরবেলার নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে কমলার কর্কশ কন্ঠ সারা নারায়ণ নিবাসে ধ্বনিত হল, “ছেলে এল আর তুমি গলে গেলে! বলি নিজের শ্বশুরের কথা অমান্যি করলে কোন সাহসে? এত বয়সেও আদিত্য বাপের মুখের ওপর একটা কথা বলে না, বাপের বিরূদ্ধে যায় না। গেলে কী হয় সে খুব ভালো টের পেয়েছে। আর তুমি বাড়ির বউ হয়ে এ কাজ করলে? ওকে বাড়িতে ঢুকতে দিলে, ঘরে বসিয়ে গল্পগাছা করলে? এত বড়ো আস্পর্ধা!”
সুনন্দা চুপ। উত্তর দিয়ে কোনো লাভ নেই। এঁদের কাছে সুনন্দা শুধুমাত্র নারায়ণ নিবাসে বউ, অদ্রি বা সুলক্ষণার মা নয়। এঁদের কখনো বোঝানো যায়?
প্রতাপনারায়ণ তখন সবে বাড়ি ঢুকেছেন, কমলার গলা তাঁরও কর্ণগোচর হল। ছেলে বৌমার ঘরে এলেন, শুনলেন কিন্তু কিছু বললেন না, শুধু খর দৃষ্টিতে সুনন্দাকে দেখে চলে গেলেন। সুনন্দা জানেন এখন কিছু বলবেন না। বলবেন ছেলে কোর্ট থেকে ফিরলে। আদিত্যনারায়ণ আবার তখন বাবাকে কিছু বলবেন না, বলবেন এ ঘরে এসে সুনন্দাকে। এরকমই হয় এ বাড়িতে। এইই দেখে আসছেন সুনন্দা এত বছর ধরে। তাই প্রতাপনারায়ণের আপাত নীরবতাতে আশ্চর্য হলেন না মোটেই।
প্রতাপনারায়ণ কিন্তু আজ ছেলেন্র ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলেন না। নিজের ঘরে ঢোকার অনতিবিলম্বেই তাঁর চিৎকার ভেসে এল, “বাবার ছবিটা এখানে ছিল, কোথায় গেল?”
প্রতাপনারায়ণ যেখানে যে জিনিস রাখেন, তা সে যত তুচ্ছ জিনিসই হোক না কেন, তাঁর বিনা অনুমতিতে সেখান থেকে তা সরানো গর্হিত অপরাধের মধ্যে পড়ে। আর এ তো ওনার বাবার ছবি। সুনন্দা এর জন্যেও প্রস্তুত ছিলেন।
প্রতাপনারায়ণের ঘরে এসে মৃদু গলায় বললেন, “আমি দিয়েছি অদ্রিকে। ছবিটা ওর ছোটোবেলা থেকেই খুব ভালো লাগত। কিছু দিনের জন্যে নিয়ে গেছে, আবার ফিরিয়েও দিয়ে যাবে।”
অদ্রি আর যা বলেছিল সেসব কিছুই বললেন না।
প্রতাপনারায়ণ এক মুহূর্ত থমকালেন। বোধহয় এই মৃদুভাষিণীর দুঃসাহস দেখেই। তারপর সেইরকম উঁচু গলাতেই বললেন, “না বলে অন্যের জিনিস নেওয়া বা কাউকে দেওয়াকে কী বলে আশা করি তুমি জানো। চুরি। রায়চৌধুরী বংশের বৌ চুরি করছে ভাবতেও আমার ঘেন্না করছে।”
প্রতাপনারায়ণের কথা শেষ হল কী না হল সুনন্দার মুখ খুলে গেল। ভগবান জানেন এত সাহস সুনন্দা কোথা থেকে পেলেন। অদ্রিকে দেখেই বোধহয়।
“আমি শুধু একজন মার মন যা বলে তাই করেছি। যে মা কোনোদিন নিজের ছেলেমেয়ের হয়ে কোন কথা বলতে পারেনি আজ সেই মা ছেলেকে একটা ছবি দিয়েছে শুধু। একটা পুরোনো ছবি। তাও সে ছবি কয়েক দিন পরেই আবার যথাস্থানে ফিরে আসবে। রায়চৌধুরী বংশের বৌ হওয়ার সুবাদে না হোক, আদ্রির মা হওয়ার সুবাদে এই অধিকার আমার আছে বলে মনে করি।”
বলে চলে গেলেন আর উত্তরের অপেক্ষা না করেই।
ছিছিক্কারে নারায়ণ নিবাসে কান পাতা দায় হল। সন্ধ্যেবেলা আদিত্যনারায়ণ ফিরে সব শুনলেন, আশ্চর্য হলেন নিজের স্ত্রীর দুঃসাহসে, তারপর তিনিও নিন্দায় মুখর হলেন। বিশ্বাসঘাতিনী, অবাধ্য, উদ্ধত, চোর ইত্যাদি অনেক বিশেষণে ভূষিত হলেন সুনন্দা। অবশেষে ফরমান জারি করলেন প্রতাপনারায়ণ,সুনন্দা যেন তাঁর সামনে না আসেন, তাঁর পক্ষে সহ্য করা কঠিন হবে।
প্রতাপনারায়ণের বয়স হয়েছে, উত্তেজনায় যদি কিছু হয়ে যায়। অতএব আদিত্যনারায়ণও কঠোর হলেন।
“যা করার তো করেছ, দয়া করে বাবার এ কথাটা মেনো। বাবাকে না মারা পর্যন্ত তো তোমার আর তোমার ছেলেমেয়ের শান্তি হবে না মনে হচ্ছে।”
আরো ফরমান আছে। অদ্রি ছবি ফেরত দিতে এলেও যেন তা আর না নেওয়া হয়, নারায়ণ নিবাসে যেন ওকে ঢুকতেই না দেওয়া হয়। যা গেছে গেছে। কিন্তু এই ছুতোয় আবার এ বাড়িতে প্রবেশাধিকার পাওয়ার ফাঁক খুঁজবে তা হবে না। প্রতাপনারায়ণ বেঁচে থাকতে তা হতে দিতে পারেন না। প্রতাপনারায়ণ এতটাই কঠোর, এতটাই অটল।
*****
প্রতাপনারায়ণ রায়চৌধুরী, নারায়ণ নিবাসের প্রতিষ্ঠাতা। সেই কোন ছোটোবেলায় বাবা নিত্যনারায়ণের সঙ্গে এ শহরে এসেছিলেন। সঙ্গে মা এবং আরো কয়েকটি ছোটো ছোটো ভাইবোন। প্রতাপনারায়ণ ছিলেন বড়ো। গ্রামে জমিজমা ভালোই ছিল, নিজেদের বাড়ি ছিল, ভাতকাপড়ের অভাব ছিল না, তাও কেন নিত্যনারায়ণ শহরে চাকরি নিয়ে এসেছিলেন তা বোধগম্য নয়। যাই হোক প্রতাপনারায়ণ স্কুল শেষ করলেন, আইন নিয়ে পড়াশোনা করলেন। হাইকোর্টের উকিল হলেন। পসার ছিল খুব। পসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল প্রতাপ। সেদিক থেকে সার্থকনামা তিনি। জমির দর এদিকে তখন এরকম আকাশছোঁয়া হয় নি। বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে তৈরি করলেন নারায়ণ নিবাস। কুলদেবতা নারায়ণের নামে। শ্বেত পাথরের ছোটো কিন্তু মনোরম একটি মন্দিরে যথাবিধি প্রতিষ্ঠিতও হলেন নারায়ণ। প্রতাপনারায়ণের নজর উঁচু ছিল। নারায়ণ নিবাস শুধু নিজের জন্যে বানান নি। বাবা, মা, ভাইরা সবার স্থান সংকুলানের উপযুক্ত করেই তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ভাইরা কেউই শেষ পর্যন্ত এখানে থাকেননি বা থাকতে পারেননি। অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রতিপত্তিতে বড়ো দাদার সমকক্ষ না হওয়ার গ্লানিতেই হোক বা প্রতাপনারায়ণের অমিত প্রতাপের জন্যেই হোক, একে একে সব ভাইই নারায়ণ নিবাস ছেড়েছিলেন। নিজেদের প্রয়োজন মতো নিজেদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছিলেন ভালোভাবেই। এক ভাই তো গ্রামেই ফিরে গেছিলেন সেখানকার বাড়ি ঘর, জায়গা জমি ঠিক মতো দেখা হচ্ছে না এই অজুহাতে। সঙ্গে নিত্যনারায়ণ আর তাঁর স্ত্রী। যৌবনের আকর্ষণ এই শহর তখন তাঁদের কাছেও কেমন পানসে ঠেকছিল। রয়ে গেলেন প্রতাপনারায়ণ, তাঁর পরিবার এবং প্রতাপনারায়ণের পিঠোপিঠি বোন কমলা। বিয়ের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই যিনি বৈধব্যের মুখ দেখেছিলেন।
প্রতাপনারায়ণের প্রথম সন্তান আদিত্যনারায়ণ। পরে দুই কন্যা। আদিত্যনারায়ণকে নিয়ে প্রতাপনারায়ণের গর্বের শেষ নেই। হবে নাই বা কেন? পিতৃভক্ত ছেলে বলতে যা বোঝায় তাই। বাবার কোনো কথার অন্যথা করেন না। বাবার ইচ্ছে সেও বাবার মতোই হাইকোর্টে প্র্যাক্টিস করুক, ছেলেও নির্দ্বিধায় মেনে নিল। নিজের মতো ছেলের বিয়েও দিলেন অল্প বয়েসেই। তখন তার পড়াও শেষ হয় নি। ছেলে বাবার ওপর কথা বলল না। যাকে বিয়ে করতে বললেন তাকেই করল বিনা বাক্যব্যয়ে। সুনন্দা এলেন এ বাড়িতে। বছর ঘুরতেই তাঁর কোলে এল রায়চৌধুরী বাড়ির বংশধর। অদ্রিনারায়ণ। প্রতাপনারায়ণের আনন্দ দেখে কে। নাতির অন্নপ্রাশনের এলাহি ব্যবস্থা দেখে সবাই বলেছিল, “শুধু কনেরই অভাব, নইলে বিয়ে বাড়িকেও হার মানায়।”
প্রতাপনারায়ণ হেসেছিলেন, বলেছিলেন, “কনে আসার যখন সময় আসবে তখন ঠিকই আসবে। এ আর কী দেখছ, তখন দেখবে প্রতাপনারায়ণ রায়চৌধুরীর নাতির বিয়ে কেমন করে হয়।”
সুনন্দারও তখন খুব ভালো লাগত। তখনো বোধহয় ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেন নি মানুষগুলোকে, নতুন মা হওয়ার আনন্দে অনেক কিছুই ঢাকা পড়ে গেছিল। বয়সই বা কত তখন? যে বয়সে মেয়েরা পড়াশোনা করে, খেলাধুলো করে বেড়ায়, সে বয়সে কচি ছেলের কাঁথা পালটেছেন রাত জেগে। গৃহকর্ম নিপুণা সুশীলা বধূর সব দায়িত্ব পালন করছিলেন। শাশুড়ি হঠাৎ একদিন বিনা নোটিসে চোখ বুঝলেন। দায়িত্ব আরো বাড়ল। সব দিকে নজর রাখার, সব কাজ সুচারুভাবে করার। কাজের লোকজন ছিল যথেষ্ট প্রথম থেকেই, কিন্তু তাদের ওপর নজরদারি করতেও তো একজন দরকার।
অত অল্প বয়স ছিল বলেই কি শিখতে পেরেছিলেন সব কিছু অত তাড়াতাড়ি? পারত এখনকার মেয়েরা এত কিছু মানতে? একে তো বাড়িতে নারায়ণ প্রতিষ্ঠিত আছেন বলে হাজাররকম বিধি নিষেধ, তার ওপর বিধবা পিসিশাশুড়ি, তাঁর আলাদা নিরামিষ হেঁসেল। কমলা থাকেন তো সব সময় জপের মালা হাতে, এ বাড়িতে আসা অবধি দেখে আসছেন সুনন্দা, কিন্তু শ্রবণ শক্তি অতি প্রখর, দৃষ্টিও। সামান্য থেকে সামান্যতম ভুলও নজর এড়ায় না, জোটে কঠিন তিরস্কার। কম বকুনি সুনন্দাই খেয়েছেন? কমলার তীব্র কথার হুলে আহত হয়েছে, কেঁদেছেন, আবার ভুল সংশোধন করে সে কাজ সঠিকভাবে করেওছেন। এর মধ্যেই বাড়িতে আবার নতুন অতিথির আগমন। এবার কন্যা, সুলক্ষণা। অদ্রিনারায়ণ তখন বছর তিনেকের। এক সময় ধুমধাম করে পৈতে হল। অতিথি অভ্যাগততে বাড়ি সরগরম হল। এরকম করেই চলছিল সব। সুনন্দাও মানিয়ে নিয়েছিলেন সব কিছু, না মানিয়ে নিয়ে তো উপায়ও ছিল না।
ভেতরে ভেতরে কিন্তু দুজন তৈরি হচ্ছিল আঘাত হানার জন্যে। সুনন্দা বোঝেন নি একেবারেই। তাঁর স্বপ্নেরও অতীত ছিল যে ওই পুঁচকে ছেলেমেয়েদুটোর এত সাহস। বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ বাড়ির অনেক নিয়মকানুনের প্রতিবাদ করত অদ্রিনারায়ণ। কেন, কী হবে – এসব প্রশ্ন লেগেই থাকত। কিন্তু তা ছেলেমানুষি ভেবে প্রতাপনারায়ণ সস্নেহে বোঝাতেন বা কমলা মৃদু ধমক দিতেন। সুনন্দা ভাবতেন এ যুগের হাওয়া। স্কুলে যাচ্ছে, দশটা ছেলের সঙ্গে মিশছে। এ বাড়ির মতো রক্ষণশীল তো আর সবাই নয়, তাই এসব প্রশ্ন করে। যদিও সুলক্ষণা বললে ব্যাপারটা এত সহজ হত না। যাই হোক তখনো নারায়ণ নিবাস কাঁপিয়ে দিতে পারে, প্রতাপনারায়ণের ওপর দিয়ে নিজের ইচ্ছে, নিজের মতামত জাহির করার মতো কেউ কিছু করে নি। সেই দুঃসাহস প্রথম দেখাল অদ্রিনারায়ণ। নারায়ণ নিবাসের রক্ষণশীলতায়, প্রতাপনারায়ণের আধিপত্যে প্রথম হাতুড়ির ঘা মারল সেই।
মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে। সবাই খুশী। অদ্রিনারায়ণ তার বাপ ঠাকুরদার মুখ উজ্জ্বল করেছে। মেধাবী সে বরাবরই, কাজেই এমন ফলই সবার প্রত্যাশিত ছিল। প্রতাপনারায়ণের বিস্তৃত কপালে ভ্রূকুটি দেখা গেল মার্কশিট হাতে পাবার পর। তাতে নাম লেখা রয়েছে অদ্রি রায়চৌধুরী, অদ্রিনারায়ণ রায়চৌধুরী নয়। প্রতাপনারায়ণ ভাবলেন এ বোর্ডের ভুল। ডাকলেন নাতিকে, জিজ্ঞেস করলেন কেন সে দেখেনি ঠিক করে বা স্কুল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি এ ব্যাপারে।
কী একটা হাতে নিয়ে তখন যেন খুটখুট করছিল অদ্রিনারায়ণ এখন আর সুনন্দার মনে নেই। কিন্তু এটা মনে আছে সেই দিকে তাকিয়েই বেশ হালকা চালে জবাব দিয়েছিল, “ভুল নেই তো। ফর্ম ফিল আপের সময় আমিই অদ্রি রায়চৌধুরী লিখেছিলাম। নাম আর পদবীর মধ্যে একখানা নারায়াণ জোড়া আমার একদম ভালো লাগে না, অকারণ নামটাকে বড়ো করা।”
অদ্রির ছোটো পিসি, পিসেমশাই এসেছিলেন সেদিন। এই ভাইপো, ভাইঝিদুটো বরাবরই ছোটো পিসির খুব আদরের। সুনন্দা ওনাদের জন্যে চা, জলখাবার নিয়ে আসছিলেন। ছেলের কথা শুনে খাবারের ট্রেটা কোনরকম টেবিলের ওপর নামিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়লেন। আদিত্যনারায়ণও ছিলেন, ছেলের আস্পর্ধায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “অদ্রি!”
প্রতাপনারায়ণ হাত তুলে ছেলেকে থামালেন, তারপর গম্ভীর গলায় অদ্রিকে বললেন, “নাম অকারণ বড়ো করার উদ্দেশ্যে নারায়ণ যোগ করা হয় না। নারায়ণ আমাদের কুলদেবতা। আমার ঠাকুরদা আমাদের গ্রামের বাড়িতে নারায়ণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমার বাবার সময় থেকে নামে নারায়ণ যোগ করা হয়ে আসছে। আমি যখন এই বাড়ি করি, তখন বাবার গুরুদেবের পরামর্শে এখানেও নারায়ণ প্রতিষ্ঠা করি। এসব তোমার অজানা নয়। আমার নামে নারায়ণ আছে, তোমার বাবার নামে আছে, আমাদের কোন আপত্তি নেই, তোমার আপত্তির কারণ কী? আমি দেখছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমার নাম আবার ঠিক করে দেওয়া হবে।”
“করো ঠিক। আমি পরে আবার অদ্রি করব। অদ্রিনারায়ণ আমার পোষায় না,” অদ্রির গলায় জেদ স্পষ্ট ফুটে বেরিয়েছিল।
ছোটো পিসি এগিয়ে এসেছিলেন, অদ্রিকে আড়াল করে বলেছিলেন, “ছেড়ে দাও না। নাম তো আসলে অদ্রিই। এখনকার ছেলেরা বড়ো বড়ো নাম পছন্দ করে না, ছোটোখাটো নামই চায় ওরা। শুধু অদ্রিটা কত সুন্দর শুনতে লাগে। অদ্রিনারায়ণ নামটা আমারও বাবা একটু সেকেলেই লাগে।”
জামাই রয়েছে, তাই প্রতাপনারায়ণ শুধু বললেন, “আমি সেকেলে লোক। আর আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন এ বাড়ি সেকেলে নিয়মেই চলবে।”
তখনকার মতো এটুকু বলে ক্ষান্ত হলেন বটে কিন্তু পরে একদিন মেয়েকে একা পেয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন যে তাঁর বাড়ির ব্যাপারে নাক গলানোর চেষ্টা না করাই ভালো। তার সংসারে সে যা ইচ্ছে তাই করুক, সেখানে এসব চলে, কিন্তু নারায়ণ নিবাসে কোনো বেচাল চলবে না।
বলা বাহুল্য অপমানে মেয়ে মুখ লাল করে চলে গেছিল।
এই ‘যা ইচ্ছে তাই করা’র এক গূঢ় অর্থ আছে। অদ্রির ছোটো পিসি রত্না নিঃসন্তান। ওনেক বছর অপেক্ষা করার পরেও যখন সন্তানসুখে বঞ্চিত রইলেন তখন দুজনে দত্তক নেওয়া স্থির করলেন। এক অনাথ আশ্রম থেকে একটি ফুটফুটে বাচ্ছা ছেলেকে নিয়ে এলেন, মাস কয়েক বয়স তার। ও বাড়ির কারুর আপত্তি তো ছিলই না, বরং নতুন অতিথির আগমনে সবাই উৎফুল্ল। রত্না জানতেন প্রতাপনারায়ণ আগে থেকে জানতে পারলে বাধা দেবেন। তাই একদিন হঠাৎ বাচ্ছাটাকে নিয়ে নারায়ণ নিবাসে হাজির হলেন। সঙ্গে স্বামী সুব্রত।
প্রতাপনারায়ণের মুখ গম্ভীর হল। দেখাদেখি আদিত্যনারায়ণেরও। সুনন্দা খুশী হলেন। অদ্রি আর সুলক্ষণা একটা জ্যান্ত পুতুল পেয়ে খেলায় মাতল। এত ছোটো ছোটো হাত পা, এত ছোটো ও, কী করে বড়ো হবে – তা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাও প্রকাশ করেছিল।
কমলা ভাইঝিকে ডকে পাঠেলান ভেতরে। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চাঁচাছোলা গলায় বললেন, “বলি এত অনাচার সইবে? কেউ কিছু বলল না? কার না কার পাপ ঘরে তুললি! অনাথ আশ্রমে কত লোক বাচ্ছা ফেলে যায় জানিস না? কচি খুকি নও যে এসব বোঝো না।”
রত্না পিসিমার স্বভাব জানতেন, তাই হেসে বললেন, “কী যে বলো না তুমি পিসিমা! সোহম এখন আমাদের ছেলে, তোমার নাতি।”
“তোমার যত আদিখ্যেতা করার ইচ্ছে করো। কিন্তু ভুলেও আমার নাতি বলতে এসো না। পরের পাপকে নিজের নাতি ভাবতে আমি মরে গেলেও পারব না। আমার থেকে এবার দূরে দূরেই থেকো, তোমাদের ছেলেকেও রেখো। সব ছুঁয়ে ঘেঁটে ঘুরে বেড়াচ্ছ, তোমাদের ছায়া মাড়ালেও আমাকে স্নান করতে হবে। এই কথাগুলো বলার জন্যেই ডাকা। এবার এসো। নারায়ণ নারায়ণ!”
প্রতাপনারায়ণ এতটা করলেন না কিন্তু নাতির প্রতি কোনোরকম স্নেহও দেখালেন না। এ কাজে যে তাঁর সমর্থন নেই সেটা হাবেভাবে ভালোই বুঝিয়ে দিলেন। শুধু বাড়ির সবচেয়ে ছোটো দুজন সদস্য তাদের খুশী গোপন করতে পারছিল না।
ফেরার পথে সুব্রত বলেছিলেন, “বাবা বাড়ি বটে তোমার একটা!”
দুঃখে অপমানে রত্নার চোখে জল এসে গেছিল।
এরপর থেকে যাওয়া আসা কিছুটা হলেও কমেছিল। সুনন্দাই মাঝে মাঝে ছেলেমেয়েকে নিয়ে যেতেন। এতে প্রতাপনারায়ণের নিষেধ ছিল না, বোধহয় লোকলজ্জার কথা ভেবে। কিন্তু সোহম পারতপক্ষে এ বাড়িতে আসত না। ছোটোবেলায় একবার ভুলক্রমে কমলার ঘরের দরজার কাছাকাছি চলে গেছিল, উনি ওকে কুকুর বেড়ালের মতো দূর দূর করে তাড়িয়েছিলেন। অদ্রি, সুলক্ষণা ফুঁসে উঠেছিল সেদিন। কমলার মুখে মুখে সমানে তর্ক করেছিল।
এর ক’বছর পরে তো অদ্রিনারায়ণ থেকে নারায়ণই ছেঁটে ফেলল নারায়ণ নিবাসের ছেলে। প্রতাপনারায়ণের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ল। কমলা সুনন্দাকে দোষারোপ করলেন। সুনন্দা নিজেও কি অবাক হচ্ছিলেন এদের দুজনকে দেখে? যে আদিত্যনারায়ণ এই বয়সেও বাপের মুখের ওপর কথা বলেন না, এরা তাঁরই সন্তান! এদের তো সব কথাতেই কৈফিয়ত তলব। ‘কেন’ আর ‘না’ তো এদের ঠোঁটের ডগায়। সুনন্দা অবাক হন। নারায়ণ নিবাদের সেগুন কাঠের দরজা জানলায় এত ফাঁক কবে থেকে হল যে হু হু করে বাইরের হাওয়া ঢুকে পড়ছে! নাকি এ অনিবার্য।
অদ্রি ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হল। বাপ ঠাকুরদার মতো আইন নিয়ে পড়ার যে তার কোনো ইচ্ছে নেই সে কথা সে আগেই বলে দিয়েছে। রেজাল্ট দেখে আদিত্যনারায়ণও আপত্তি করেন নি। এই একটা ব্যাপারে সুনন্দা একটু আশার আলো দেখেছেন। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার ব্যাপারে আদিত্যনারায়ণ ওদের ইচ্ছের বিরূদ্ধে খুব একটা যান না।
মেয়ের স্কুল শেষ হয় নি, কিন্তু কমলা ব্যস্ত করে তুলছেন বিয়ের জন্যে। এ মেয়েকে নাকি যত তাড়াতাড়ি পার করা যায় ততই মঙ্গল।
“আঠারো বছরের আগে বিয়ে দিলে জেলে যেতে হবে। আইন আছে। আমি তো আগে তোমার নামটাই বলব পিসিঠাম্মা,” সুলক্ষণা বলে।
“তুই আমাকে আইন দেখাচ্ছিস মুখপুড়ি?”
“বাহ, আমি নারায়ণ নিবাসের মেয়ে আর আমি আইন জানব না! পিসিঠাম্মা তুমি জেলে গেলে ক’ বালতি গঙ্গা জল নিয়ে যাবে?” সুলক্ষণা হি হি করতে করতে গড়িয়ে পড়ে।
ওর হাসির আওয়াজে নারায়ণ নিবাসের বদ্ধ বাতাসও চকিত হয়।
“বংশের কুখে চুন কালি না লেপে এ মেয়ে ছাড়বে না। নারায়ণ নারায়ণ,” কমলা নিজের ঘরে ঢুকে সশব্দে দরজা বন্ধ করেন।
সুনন্দা স্বামীর কাছে নিজের আশঙ্কা ব্যক্ত করেন। কমলার তাড়ায় যদি প্রতাপনারায়ণ কিছু ঠিক করে ফেলেন। ওনার তো খুব একটা অমত আছে বলে মনে হয় না।
“এখন কী! স্কুল শেষ হোক, কলেজে ঢুকুক, কী পড়ে দেখা যাক, তারপর দেখা যাবে,” আদিত্যনারায়ণ বলেছিলেন।
সুনন্দা আশ্বস্ত হয়েছিলেন। এই ক’ বছর বোধহয় সুনন্দার জীবনের সবচেয়ে ভালো সময়। আদিত্যনারায়ণকে বেশ সহজ মনে হত, স্ত্রী ছেলেমেয়ের ইচ্ছেকে মর্যাদা দিতেন। একটু হলেও যেন আদিত্যনারায়ণ বদলেছিলেন। অদ্রি, সুলক্ষণাও তাদের ইচ্ছে পূরণের সুযোগ পেয়েছিল। অদ্রি বিদেশ যেতে চাইল উচ্চ শিক্ষার জন্যে।
প্রতাপনারায়ণ প্রবল আপত্তি করলেন, “কোনো দরকার নেই। এখানে পড়াশোনার যথেষ্ট ভালো সুযোগ আছে। তোমার ছেলে যা, একবার বাইরে গেলে তাকে আর ফিরে পাবে না,” ইত্যাদি হাজার অজুহাত খাড়া করলেন।
“মরার সময় নাতির হাতের জলটুকুও পাব না” বলে কমলা কেঁদে ভাসালেন।
এই প্রথম আদিত্যনারায়ণ বাপের বিরূদ্ধে গেলেন। সামনাসামনি খুব একটা কিছু বললেন না কিন্তু যা করার সবই করলেন। অদ্রির যাওয়ার সব ঠিক হয়ে গেল। যেদিন সে চলে যাবে প্রতাপনারায়ণ কোথায় যেন বেরিয়ে গেলেন দেখা না করেই আর কমলা দরজা বন্ধ করে বসে রইলেন। হাজার ডাকাডাকিতেও সে দরজা খুলল না। মা বাবা আর বোনের সঙ্গে এয়ারপোর্টে গেল অদ্রি। রত্নারাও এসেছিলেন।
বিদেশে গিয়ে কয়েক বছর কেটে গেলেও অদ্রির কোনো বেচাল দেখা গেল না। নিয়মিত ফোন, মেইল আসত। মাঝে ঘুরেও গেছে। বাবার বিরূদ্ধে যাওয়ার যে অল্প বিস্তর গ্লানি ছিল আদিত্যনারায়ণের সেটাও আস্তে আস্তে কেটে গেল, নাহ ছেলে তাঁর মুখ রেখেছে। সুলক্ষণার কলেজ শেষ হল। সেও কীসব পরীক্ষা টরীক্ষা দিয়ে বিদেশে যাবার ব্যবস্থা পাকা করে ফেলল।
প্রতাপনারায়ণ ছেলেকে ডেকে যা নয় তাই বললেন। কমলা চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করলেন। কিন্তু সুলক্ষণাকে আটকানো গেল না। মেয়েকে বিদেশে পাঠানোর ব্যাপারে আদিত্যনারায়ণ খুব একটা ইচ্ছুক ছিলেন না, কিন্তু অদ্রি বুঝিয়ে বাবাকে রাজী করে ফেলেছিল। চলে গেল সুলক্ষণাও।
বাড়ির পরিবেশ থমথমে হল ঠিকই, প্রতাপনারায়ণ ছেলে বৌ-এর সঙ্গে বাক্যালাপ প্রায় বন্ধই করলেন কিন্তু সুনন্দা খুশী ছিলেন। ছেলেমেয়েরা অন্তত ইজেদের ইচ্ছে মতো পড়াশোনা করতে পেরেছে। তিনি মিথ্যেই খালি ভয় পেতেন, খালি ভাবতেন এই বুঝি কিছু হল।
কিন্তু হল সত্যিই। অনেক কিছুই হল। একটা সাধারণ ইমেইলের মধ্যে যে এত বিস্ফোরক লুকিয়ে থাকতে পারে তা কল্পনার অতীত। অদ্রি জানিয়েছে সে ওখানকারই একটি মেয়েকে বিয়ে করতে চায়, নাম এমিলি। এমিলির মা বাঙালি, বাবা ও দেশী। অদ্রির ইচ্ছে বিয়েটা দেশেই হোক, এমিলিদেরও কোনো আপত্তি নেই। হাইকোর্টের তুখোড় উকিল আদিত্যনারায়ণও যেন থ হয়ে গেলেন পড়ে। পাতি বাংলা ভাষাও যেন কেমন দুর্বোধ্য ঠেকতে লাগল। এসব কি অদ্রি লিখেছে? সন্দেহ দূর হল। অদ্রির ফোন এল। সেই একই কথা, একই বক্তব্য। এবার ফেটে পড়লেন আদিত্যনারায়ণ, ফোনেই। গলার আওয়াজ পেয়ে সুনন্দা দৌড়ে এলেন।
শুনতে পেলেন আদিত্যনারায়ণ বলছেন, “এত বড়ো আস্পর্ধা তোমার, তুমি সব ঠিক করে বসে আছ আর বেহায়ার মতো নিজের বাবার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলছ! ওখানের কাজকর্ম, পড়াশোনা সব কিছু ছেড়ে তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখানে ফিরে আসবে। যা বলেছ তা করা তো দূরের কথা, দ্বিতীয়বার মুখে উচ্চারণও যদি করো তাহলে ফল খারাপ হবে। এই করতে তুমি বিদেশে গেছিলে?”
আদিত্যনারায়ণ ফোন কেটে দিলেন। প্রথম থেকে সব না শুনলেও ফোনটা যে অদ্রির ছিল তা বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছিলেন সুনন্দা। আদিত্যনারায়ণ যেন ফুঁসছেন। ওই মূর্তি দেখে সুনন্দার কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস হল না।
আদিত্যনারায়ণ নিজে থেকেই বললেন, “তোমার ছেলের কীর্তি শোনো। এক খ্রিস্টাক মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। সব কিছু নিজেই ঠিক করে ফেলেছে। এখানে এসে বিয়ে করার ইচ্ছে, সে কথা জানানোর জন্যে ফোন করেছিল। এত দুঃসাহস! আমি এখন বাবাকে কী বলি! বাবা হাজারবার বারণ করেছিলেন অদ্রিকে বাইরে পাঠাতে, আমি শুনিনি। এই তোমার জন্যেই এসব হল। ছেলেমেয়ে কিছু একটা বলত আর তুমি নেচে উঠতে! এখন সামলাও। মেয়েও কোনদিন শুনব কিছু করে বসে আছেন! বাবার সামনে আমি এখন কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াই?”
কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াই বললেই হয় না, দাঁড়াতেও হল, বলতেও হল সব পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে, যেরকম অদ্রি বলেছিল। সুনন্দাও ছাড় পেলেন না, যেতে হল তাঁকেও। কমলার প্রখর শ্রবণেন্দ্রিয় আগে থেকে কিছু আঁচ করতে পেরেছিল, উপস্থিত রইলেন তিনিও।
প্রতাপনারায়ণ সব শুনলেন, জ্বলন্ত দৃষ্টিতে দুজনকে দেখলেন তারপর বাঁকা হেসে বললেন, “অবাক হওয়ার মত তো কিছু ঘটেনি। এ যে হবে তা জানাই ছিল। এখন কী করবে ঠিক করছ? ঘটা করে বিয়ের ব্যবস্থা?” কন্ঠস্বরে ব্যঙ্গ স্পষ্ট।
আদিত্যনারায়ণ চুপ। সুনন্দারও শ্বশুরের ব্যঙ্গর সামনে বলতে ইচ্ছে করছে ধরণী দ্বিধা হও মা! অদ্রি কেন তুই এ কাজ করলি বাবা? এ যে এ বাড়ির কেউ মেনে নেবে না তা কি তুই জানিস না? অন্য কারুর কথা ছেড়ে সুনন্দার মনও কি খচখচ করছে না? সুনন্দাও কি নিশ্চিন্ত মনে মেনে নিতে পারছেন বিদেশে বড়ো হওয়া খ্রিস্টান মেয়ের সঙ্গে নিজের ছেলের বিয়ে? অদ্রি তুই তোর মার কথাও ভাবল না।
“এসব তোমার জন্যে হয়েছে বৌমা, ছেলেমেয়েকে লাই দিয়ে একেবারে মাথায় তুলেছিলে। ওই হতভাগী রত্নাটা এসে জুটত কানে ফুসমন্তর দিতে। নিজে তো বাঁজা, কার না কার পাপকে নিজের ছেলে বলে চালাচ্ছে! আর খোকা, বলি তোরও কি জ্ঞান বুদ্ধি লোপ পেয়েছিল যে বাপের কথা অমান্যি করে ছেলেকে পাঠালি?” কমলা খ্যানখ্যান করে উঠলেন।
“তোমরা এর আগেও নিজেদের ইচ্ছে মত কাজ করেছ। আমার কথা শোনার প্রয়োজন মনে করোনি। কিন্তু যদি ভেবে থাকো এ বিয়ে আমি মেনে নেব তাহলে, ঘটা করে এ বাড়িতে বিয়ের ব্যবস্থা করব তাহলে ভুল করছ। আমার বিচার বিবেচনা, আমার রীতিনীতি, আমার ধ্যান ধারণা তোমাদের ছেলের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে না। তোমরা যদি ছেলে নিয়ে আহ্লাদ করতে চাও করো, আমি বাধা দেব না, কিন্তু নারায়ণ নিবাস থেকে নয়। দরজা খোলাই আছে, কাউকেই আমি আটকাব না। এসব অনাচার সহ্য করার চেয়ে বাকি জীবন আমি একা কাটাতে বেশী পছন্দ করব। ধরে নেব কমলা ছাড়া আমার আর তিন কুলে কেউ নেই,” প্রতাপনারায়ণ কঠোর গলায় বললেন।
আদিত্যনারায়ণের পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব হল না, হাঁউমাউ করে উঠলেন একেবারে। বাবার মতের বিরূদ্ধে ছেলেমেয়েকে পড়িয়ে, বিদেশে পাঠিয়ে কিছু গ্লানি তাঁর ছিলই, প্রতাপনারায়ণের মতো অমন পিতৃভক্ত ছেলেরও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। ছেলেমেয়ের ইচ্ছে পূরণের জন্যে বাবাকে কষ্ট দিয়েছেন – এটা বরাবরই খচখচ করত আদিত্যনারায়ণের মনে। আর অদ্রির এই সিদ্ধান্ত তো তাঁকে একেবারে অপরাধী বানিয়ে দিয়েছে।
“তুমি ওভাবে বোলো না বাবা। মানছি আমার অন্যায় হয়েছে, হাজারবার অন্যায় হয়েছে। তখন তোমার কথা শুনলে আজ আর এ দিন দেখতে হত না। কিন্তু আর না। এবার তুমি যা বলবে তাই হবে। তোমার মতের বিরূদ্ধে এ বাড়িতে কোনো কিচ্ছু হবে না,” আদিত্যনারায়ণ বললেন।
“ইদানীং তো তুমি বৌমার কথায় উঠতে, বৌমার কথায় বসতে। বৌমা আমার থেকে বেশী সংসার দেখেছেন, জগৎ চিনেছেন, তাই বৌমার কথা বেদ বাক্য ধরে নিয়ে তুমি সব করতে।ছেলেমেয়েরা ছোটো, তারা বোঝেও না কী উচিত আর কী অনুচিত। তার পর তাতানোর জন্যে মা আছে। আর তুমিও তাতে নাচলে। যা চাইছে তাই করো, নাও এবার ঠ্যালা সামলাও। পরিষ্কার বলে দাও অদ্রিকে যে আমাদের সঙ্গে যদি সম্পর্ক রাখতে চায় তাহলে ও দেশের সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে, বিয়ের কথা মাথা থেকে তাড়িয়ে পত্রপাঠ এখানে ফিরে আসতে হবে। মেয়েকেও ফিরিয়ে আনো। আর কোনো ভরসা নেই কারুর ওপর। অবশ্য জানি না বৌমা কী চান,” হুল ফোটাতে ছাড়েন না প্রতাপনারায়ণ।
এত অপমানের মধ্যেও সুনন্দার হাসি পেল। তাঁর কথায় নাকি আদিত্যনারায়ণ উঠতেন, বসতেন! মাঝের ক’টা বছর শুধু ছেলেমেয়ের পড়াশোনার ব্যাপারে বাপের অমতে গেছেন, তাতেই এই অপবাদ। হা কপাল, সুনন্দাই কি জানতেন অদ্রি এই কাণ্ড করবে!
“সে কথা আমি অদ্রিকে আগেই বলে দিয়েছি, একদম পরিষ্কার করে,” আদিত্যনারায়ণ বাবাকে আশ্বস্ত করলেন।
কমলা গজগজ করতে করতে চলে গেলেন, তাঁর সন্ধ্যা আহ্নিকের সময় হয়েছে।
অদ্রির উত্তর তখনই কিছু এল না, কিন্তু পরের দিন রত্না এলেন। একাই, বাবাকে বোঝাতে। এমিলির পরিচয় নিয়ে, এমিলির ফটো সহ। এমিলির মা বাঙালি, বিদেশে পড়তে গিয়ে এমিলির বাবার সঙ্গে আলাপ। এসব ছাড়াও আরো কিছু তথ্য জানা গেল প্রতাপনারায়ণের জেরার মুখে। রত্না প্রথমেই ফটোটা দেখালেন, যদিও প্রতাপনারায়ণ চেয়েও দেখলেন না, অন্যরা দেখলেন, কমলা বাদে। কমলা রত্নার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলেন। এমিলি ভারতের ইতিহাসের কী কী সব বিষয় নিয়ে নাকি অনেক পড়াশোনা করেছে। রত্না কী যেন একটা নাম বললেন, সুনন্দা বোঝেন নি, সুনন্দার বিদ্যেতে কুলোয় নি। কাজের সূত্রেও এ দেশে এসেছে, তাছাড়া মার দিকের সব আত্মীয়স্বজন তো আছেই, তাদের সঙ্গে যোগাযোগও আছে। তাদের বাড়িতেও আসে। মা বিদেশীকে বিয়ে করলেও নিজের সংস্কৃতিকে ভোলেননি, বাড়িতে বাংলা গানটান শোনার রেওয়াজ বরাবরই আছে। মেয়েও নাকি বাংলাটা কাজ চালাবার মতো বলতে পারে, লিখতে বা পড়তে না পারলেও। নিজের কাজের সূত্রে ভারতের নানান জায়গায় ঘুরেছে, ওই করে হিন্দিটাও মোটামুটি রপ্ত করেছে। রত্না কথা বলেছেন, বলে বেশ ভালোই লেগেছে।
সুনন্দার কষ্ট হল, ছেলে পিসির সঙ্গে কত সহজ! অবশ্য তার জন্যে ছেলেকে দোষও দেওয়া যায় না। এমিলির নাম শুনেই এ বাড়িতে এই অবস্থা, সেখানে মার সঙ্গে কথা বলাবে কী করে?
“বাহ, অদ্রি তো দেখছি ভালো উকিল খাড়া করেছে! তুমি একেবারে কথা অবধি বলে ফেলেছ! অনেক কিছু জানো মনে হচ্ছে। এতক্ষণ তো শুধু মেয়ের গুণগানই করে গেলে, মা বাবার কথা বলো, তাদের গুণপনাও শুনি,” প্রতাপনারায়ণের ব্যঙ্গর হাত থেকে রত্নাও রেহাই পান না।
একটু ইতস্তত করে রত্না বললেন, “এমিলির মার অনেক কাল আগেই ডিভোর্স হয়ে গেছে। এমিলির বাবা আবার বিয়ে করেছেন। এমিলির মা করেননি, মেয়ে নিয়েই থাকেন। ওখান একটা কলেজে পড়ান উনি।”
“চমৎকার! তা এই এমিলিদেবী ক’টি বিয়ে করেছেন এর আগে? কত বয়স ওনার?”
“না না এমিলির আগে কখনো বিয়ে হয়নি,” রত্না ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, “অদ্রির সঙ্গেই অনেকদিনের আলাপ, অদ্রি ওখানে যাওয়ার পরপরই।”
“বয়সটা বললে না তো। এত কিছু জানো আর এটা জানো না তা তো হতে পারে না।”
“অদ্রির থেকে বছর তিনেকের বড়ো,” রত্নাকে বলতেই হয়, না বলে উপায় নেই।
“তোমাদের ছেলে খুঁজেপেতে একটি রত্ন জোগাড় করেছেন!” প্রতাপনারায়ণ ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওখানে যাওয়ার পর থেকেই এই চালাচ্ছেন আর তোমরা ছেলের গর্বে বুক ফুলিয়ে বেড়াচ্ছিলে।”
“এখন আর এসব কোনো ব্যাপার নয় বাবা। এমিলি ভালো মেয়ে। অদ্রির সঙ্গে তো ওর সমকক্ষ, ওর মতো মানসিকতার মেয়েরই বিয়ে হওয়া উচিত, তাই না? তাছাড়া অদ্রির যখন পছন্দ তখন আমাদেরও মেনে নিতে হবে। সুলক্ষণাও বলছিল যে এমিলিকে ওর খুব ভালো লাগে,” রত্না বোঝানোর চেষ্টা করলেন।
“মেনে নিতে হবে?” প্রতাপনারায়ণ গর্জে উঠলেন, “কেন মেনে নিতে হবে কেন? কে ও যে ওর সব কিছু মেনে নিতে হবে? যত দিন আমি বেঁচে আছি তত দিন নারায়ণ নিবাসে এসব বেচাল চলবে না। যার আদিখ্যেতা করার ইচ্ছে সে বাড়ির বাইরে গিয়ে করবে। আমি তো বলেই দিয়েছি বাইরে যাবার দরজা খোলা আছে, আমি আটকাবো না। আর তুমিও শুনে রাখো তুমি যদি অদ্রির সঙ্গে কোনরকম যোগাযোগ রাখো আর ওর হয়ে এরকম ওকালতি করতে আসো তাহলে এ বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে। আজ আমার ঘরে ঢুকতে পেরেছ, পরের দিন দরজা থেকেই ফিরে যেতে হবে।”
এত বড়ো কথার পর আর কিছু বলার থাকে না। রত্নাও বুঝলেন বলে কোনো লাভ নেই। নারায়ণ নিবাস একশো বছর আগেই আছে। এ কালের হাওয়া এখানে ঢুকতে পারেনি। হাল ছেড়ে তিনিও চলে গেলেন।
অদ্রি বিয়ে বিদেশেই করল। কিন্তু তারপর এমিলিকে নিয়ে দেশে এল, সুলক্ষণাও ছিল সঙ্গে। এসে পিসির বাড়িতেই উঠল। পরের দিন সকলে মিলে গেল নারায়ণ নিবাসে। সকলেই, অদ্রি, এমিলি, সুলক্ষণা, রত্না। লোক হাসানো প্রতাপনারায়নের কোনোকালেই পছন্দ নয়, তাই ঢুকতে দিলেন সিংঘদরজা পেরিয়ে নারায়ণ নিবাসের প্রকাণ্ড বৈঠকখানায়। ঢুকতেই দিলেন, বসতেও বললেন না। সবাই চুপ, যেন ঝড়ের পূর্বাভাস। শুধু সুলক্ষণা মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল।
এই অস্বস্তিকর অবস্থা কাটাতে অদ্রি কিছু বলতে চাইল, কিন্তু প্রতাপনারায়ণের ভারী গলা তাকে থামিয়ে দিল।
“তুমি নিশ্চয়ই জানো যে তোমার এ বিয়ে আমরা মানিনি এবং আমরা তোমার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করেছি। এ কথা তোমাকে আগেই জানানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও তুমি এখানে আসার দুঃসাহস দেখিয়েছ। দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে নাটক করা আমার পছন্দ নয়, তাই ঢুকতে দিয়েছি, এই প্রথম এবং শেষবার। এই মুহূর্তে বেরিয়ে যাও। কেউ যদি মনে করে অদ্রির সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে তাহলে সেও যাও এখান থেকে,” তারপর আদিত্যনারায়ণের দিকে ফিরে বললেন, “যেটুকু সর্বনাশ বাকি আছে সেটুকু যদি আটকাতে চাও তাহলে মেয়েকে ভেতরে নিয়ে যাও।”
এটা শোনামাত্রই সুনন্দার কী হল কে জানে, মাথায় আর কিচ্ছু রইল না, ছেলের কথাও নয়, শুধু দেখতে পাচ্ছেন মেয়ের ভবিষ্যতের ওপর রাহুর করাল ছায়া। মেয়ে তখনো মার কাছে ঘেঁষটে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে ফিসফিস করে বললেন, “দাঁড়িয়ে আছিস কেন, চলে যা, চলে যা এখান থেকে। এখানে একবার ঢুকলে জন্মের মতো আটকে পড়বি, আমিও পারব না রক্ষা করতে। যা চলে যা।”
সেই কন্ঠস্বরেই বা কী ছিল কে জানে, সুলক্ষণা ছিটকে সরে গেল দরজার কাছে। তার মুখ চোখেও তখন অজানা আতঙ্কের ছাপ। অদ্রি আবার কিছু বলতে চাইল কিন্তু প্রতাপনারায়ণ আরো জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন, “বেরিয়ে যাও!”
সমস্ত নারায়ণ নিবাসের আনাচে কানাচে যেন ধ্বনিত হল সেই ‘বেরিয়ে যাও।’ চলে গেল সবাই। চোখের জল ফেলতে ফেলতে রত্নাও। তাঁর জন্যেও তো এ বাড়ির দরজা বন্ধ হল চিরদিনের মতো।
সুনন্দা বসেছিলেন পাথরের মূর্তির মতো। তাঁর উদ্দেশ্যে তখন অজস্র বাক্যবাণ বর্ষিত হচ্ছে। কত দোষ তাঁর, কত অপরাধ তাঁর – সেসবের নতুন করে হিসেবনিকেশ হচ্ছে। কিন্তু তাঁর কানে কিছুই ঢুকছে না। শুধু মনে পড়ছে ছেলেমেয়েদুটোর মুখ, আরেকটা মেয়ের হতবম্ব, ভয়ার্ত মুখ। যাকে কত যত্ন করে বরণ করে ঘরে নিয়ে আসার কথা, তার কী অভ্যর্থনাই না জুটল! মনে হচ্ছে এই শেষ দেখা, আর বোধহয় এই জন্মে ছেলেমেয়েকে দেখা হবে না।
এরপরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। সুলক্ষণাও বিয়ে করল ও দেশেই। বাঙালি শুধু এইটুকুই শুনেছেন। রত্নাই খবর দিয়েছিলেন। আগে মাঝে মধ্যে দুপুরের দিকে ফোন করত। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একটা মোবাইলের ব্যবস্থা করেছিলেন সুনন্দার জন্যে। ছেলেমেয়ের ফোন আসত তাতে।কিন্তু আদিত্যনারায়ণ ধরে ফেলার পর তাও বন্ধ। ল্যাণ্ডলাইনও প্রতাপনারায়ণের ঘরে। বাইরে কোথাও গেলে আদিত্যনারায়ণের সঙ্গে ছাড়া যাওয়া যায় না। আসলে তিনি ঠিক কী, নারায়ণ নিবাসের বৌ না নারায়ণ নিবাসের বন্দিনী – আজকাল এ খটকাটা সুনন্দার প্রায়ই লাগে। তারপর এই এত বছর পরে অদ্রির এই হঠাৎ আগমন, ঝড়ের মতো ঢুকে আসা নারায়ণ নিবাসের অভ্যন্তরে। দুচারটে কথা, নিজের আর বোনের ছবিও দেখিয়েছিল। কিন্তু সুনন্দা দেখতে পেলে তো। তাঁর কানে না ঢুকছিল অদ্রির কোনো কথা, না দেখছিলেন কোনো ছবি। দেখছিলেন শুধু ছেলেকে আর শুনছিলেন বিপদের পদধ্বনি। ছেলেকে তখন নিরাপদে ফেরৎ পাঠাতে পারলে বাঁচেন। যেরকম একদিন নিজের মায়া মমতাকে বলি দিয়ে মেয়েকে চলে যেতে বলেছিলেন।
******
নারায়ণ নিবাস থেকে ফেরা অবধি অদ্রি ছবিটা নিয়েই পড়ে আছে। টেবিলের ওপর রেখে মাথা ঝুঁকিয়ে এক মনে দেখে যাচ্ছে।
“এই ছবিটা তোর এত ভালো লাগে জানতাম না তো! কী দেখছিস এত মন দিয়ে? কী আছে ওতে?” রত্না জিজ্ঞেস না করে পারলেন না, কোলের কাছে অদ্রির ছোট্ট মেয়ে গুড়িয়া।
“এতে দাদুর বাবার ছবি ছাড়াও আরো কিছু আছে। আবছা কিন্তু আছে। আজকাল পুরোনো বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ছবি অনেকটাই ঠিক করা যায়। এটা অবশ্য হাতে আঁকা। তাও চেষ্টা করে দেখব, স্ক্যান করে, স্ক্যানড কপিটা থেকে যদি কিছু করা যায়,” অদ্রি সেইরকমই এক মনে দেখতে দেখতে বলল।
“হ্যাঁ রে মাকে কেমন দেখলি?”
“মা?” অদ্রি যেন চমকে মুখ তুলল, তারপর বলল, “মা কেমন থাকতে পারে সে তো আমার থেকে ভালো তুমি বুঝবে ছোটোপিসি। ওখানে কি আর মা ভালো থাকে?”
“এতক্ষণে তো সবাই জেনেও গেছে ছবিটা তোকে দিয়ে দেওয়ার কথা। বৌদিকে শুধু বোধহয় মেরে ফেলতেই বাকি রেখেছে,” রত্না দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন।
“ছবিটা যে এঁকেছিল দারুণ এঁকছিল, তাই না?” এবার এমিলিও বসে পড়ল অদ্রির পাশে।
“কোনো নামকরা আর্টিস্ট দিয়ে বাবা আঁকিয়েছিলেন। আমরা তখন ছোটো। এরপর তো দাদু, ঠাকুমা গ্রামেই ফিরে গেলেন। দাদুর ফটো আছে বাবার কাছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায় কত ভালো আঁকা হয়েছিল। শুধু দাদু ঠাকুমা নয়, বাবার পুরোন অ্যালবামে বাবার ঠাকুর্দার ফটোও আছে। একদম বুড়ো ত্থুত্থুড়ো,” বললেন রত্না।
“ত্থুত্থুড়ো! হোয়াট ইজ ত্থুত্থুড়ো?” গুড়িয়া খেলতে খেলতে জিজ্ঞেস করল।
ত্থুত্থুড়ো কথাটাতে বোধহয় মজা পেয়েছে। সবাই হেসে উঠল ওর কথায়। অদ্রি লাঠি হাতে বুড়োর অভিনয় করে দেখাল ত্থুত্থুড়ো কাকে বলে। গুড়িয়া আরো মজা পেল, খিলখিল করে হাসতে লাগল।
সোহম অবশ্য অদ্রির মতো ছবিটার ব্যাপারে অত উৎসাহী নয়, বলল, “দাদা, তুমি সিওর যে ওতে কিছু আছে? আমার তো পাতি একটা পোর্ট্রেট মনে হচ্ছে। মিথ্যেই তুমি এত সময় নষ্ট করছ।”
অদ্রি হাসল, কী করে বোঝাবে ও কী অস্বস্তি ওর যতক্ষণ না জানছে এটা শুধুই প্রতাপনারায়ণের বাবার ছবি না এতে অন্য কিছুও আছে। সেই কোন ছোটোবেলা থেকেই এ ছবি ওর কাছে এক রহস্য। কত সময় ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছে, বুঝতে চেষ্টা করেছে কী আছে ওতে। কতবার প্রতাপনারায়ণকে অনুরোধ করেছে ছবিটা নামিয়ে ওর হাতে দিতে। অনুরোধ মঞ্জুর হয়নি বলাই বাহুল্য। আজ সুযোগ এসেছে সত্যি মিথ্যে যাচাই-এর। সবই কি ওর নিছক অনুমান না নয়?
ছবিটা স্ক্যান করিয়ে নিয়ে আসা হল। অদ্রি নাওয়া খাওয়া ভুলে সেটা নিয়ে পড়ে রইল। ল্যাপটপে জুম করে বিভিন্ন অংশ দেখতে লাগল, যদি কিছু পাওয়া যায়। এমিলিরও যেন নেশা লেগে গেছে। যখন অদ্রি ওঠে তখন ও বসে। ওর আবার পুরোনো বিবর্ণ ফটো ঠিক করার ব্যাপারে বেশ পারদর্শিতা আছে। ওর মার অ্যালবামের অনেক পুরোনো ফটোকে ও আবার নতুন রূপ দিয়েছে। এটা ওর একটা শখ বলা যেতে পারে।
অবশেষে দেখা গেল অদ্রির ধারণাই ঠিক। আছে আর কিছু ছবিতে। প্রতাপনারায়ণের বাবা নিত্যনারায়ণের পোর্ট্রেটের ব্যাকগ্রাউণ্ডে গাছপালা, আকাশের মাঝে দুজনের আবছা মুখ। বোঝা যাচ্ছে ইচ্ছে করেই আবছা করে আঁকা হয়েছে এবং ব্যাকগ্রাউণ্ডের সঙ্গে প্রায় মিশিয়ে রাখা হয়েছে যেন বোঝা না যায়। কিন্তু কেন? এরা কারা আর কেনই বা এই আড়াল?
সবাই অবাক। অদ্রির ইচ্ছে করল তক্ষুণি মাকে ফোন করে বলতে। কিন্তু সে রাস্তা বন্ধ। ফোন করলেও তো আর সে ফোন সুনন্দা অবধি পৌঁছবে না।
সোহম খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছে, বলল, “এই মুখদুটোকে আরো ব্রাইট, আরো প্রমিনেন্ট করা যায় না? তাহলে হয়তো বোঝা যাবে এরা কারা।”
“তারপর না হয় এসব সুদ্ধ একবার নারায়ণ নিবাসে যাওয়ার চেষ্টা করা যাবে। এই ব্যাপারটা ওখানকার কেউ জানে বলে আমার মনে হয় না,” বললেন সুব্রত।
এবার এমিলি বসল কাজে। এবারই তো ওর আসল কাজ। এ কাজে ওর থেকে দড় এখানে কেউ নেই। পুরো একদিনের চেষ্টায় ঘাড় পিঠ ব্যাথা করে মুখদুটোকে স্পষ্ট আকার দিয়ে তবে ও ল্যাপটপের সামনে থেকে নড়ল। সবাই দেখল দুটো মুখ, একজন পুরুষ এবং স্ত্রী। কারা এরা কেন এদের ছবি নিত্যনারায়ণের ছবির সঙ্গে এরকম আবছাভাবে রয়েছে?
“দেখো ছোটোপিসি তুমি চেনো এদের? দেখেছ কখনো এদের ছবি? দাদুর অ্যালবামে বা অন্য কোথাও?” অদ্রি জিজ্ঞেস করল।
রত্না ভালো করে দেখলেন, তারপর বললেন, “বাবা আমাদের ছবি দেখাতেন, পুরোনো ছবি। সেখানে ঠাকুরদা ছাড়াও ঠাকুরদার বাবা মার একটা ছবি ছিল। একদমই বুড়ো বয়সের। কিন্তু যত দূর মনে পড়ছে ঠাকুরদার বাবার মুখের একদিকে একটা কালো জড়ুল ছিল, মুখের একদিকটা অনেকটাই কালো লাগত। ওটার জন্যে মুখটা কীরকম যেন লাগত। আমি ছোটোবেলায় খুব ভয় পেতাম, দেখতে চাইতাম না আর বাবা রেগে জেতেন। ছুটির দিনে অ্যালবাম নিয়ে বসে ছবি দেখাতেন মাঝে মাঝে।”
“সে তো আমরাও দেখেছি। আমাকে আর বোনকেও দেখাতেন। আমি বড়ো হয়েও অনেকবার দেখেছি। কিন্তু এই দুজনের ছবি কোথাও দেখিনি। কারা এরা?” বলল অদ্রি।
এর কোন সমাধান ততক্ষণাৎ পাওয়া অসম্ভব তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এখন যে ব্যাপারটা শুধু অদ্রির মাথায় ঘুরছে তা নয়, সবাইকেই ভাবিয়ে তুলেছে। একতা সাধারণ ছবির মধ্যে যে কোনো রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে তা কেউই চিন্তা করতে পারে নি।
“তবে একটা কথা মানতে হবে, চোখ বটে তোর অদ্রি,” বললেন সুব্রত রাতে খেতে খেতে, “এই ছবিটা তোর দাদুর ঘরের দেওয়ালে টাঙানো থাকত। তোর বাবা, তোর পিসিরা এই দেখেই বড়ো হয়েছে। আমিও দেখেছি কতবার। কিন্তু কারুরই কিছু মনে হয়নি, একমাত্র তুই ছাড়া। এই একটা ব্যাপারে তুই খোদ প্রবল পরাক্রমী মহামহিম প্রতাপনারায়ণ রায়চৌধুরীও পিছিয়ে পড়েছেন তোর থেকে!”
সুব্রতর কথা বলার ধরণে সবাই হেসে উঠল।
“তা তো হল, কিন্তু এ রহস্য ভেদ করা যায় কী করে?” অদ্রির প্রশ্ন।
“এক কাজ করো। যেটুকু যা পেয়েছ মানে ওই মুখদুটোর ছবি নিয়ে নারায়ণ নিবাসে যাও। সবাইকে চমকে দাও দেখিয়ে। এ কাজ যে এমিলিবৌদি করেছে সেটাও বেশ জোরে জোরে বলো। আমার তো মনে হয় রহস্য ভেদের চেয়ে কম মজা হবে না,” সোহমের বুদ্ধি।
এমিলির জন্যেই যে অদ্রির সঙ্গে অদ্রির বাবা, মা, ঠাকুরদার বিচ্ছেদ সেটা এমিলি খুব ভালো করেই বোঝে। এক বিবাহ বিচ্ছিন্না মার সন্তান ও। যদিও ও দেশে এটা এমন কিছু ব্যাপার নয় কিন্তু তাও বাবার অভাব ও বরাবরই অনুভব করেছে। আরো বেশী করে যখন মার সঙ্গে এদেশে এসেছে, আত্মীয়স্বজনদের দেখেছে। অদ্রির মনের ব্যাথা ওর অগোচরে নেই, সেজন্যে ওর নিজেরও কষ্ট আছে। ওদের মেয়ে দাদু ঠাকুমার স্নেহ ভালোবাসা পেল না – এ কাঁটা খচখচ করেই। সেটা প্রকাশও হয়ে পড়ে মাঝে মধ্যে কথাবার্তায়। তাই এমিলির মন ভালো করতেই বোধহয় সোহমের এই বুদ্ধি। বৌদির কত গুণ তা প্রতাপনারায়ণের সামনে জাহির করা।
কিন্তু সুব্রত আর রত্না ওকে এক কথায় নাকচ করলেন।
“কী অবস্থা হবে কল্পনা করতে পারছিস? আগের বার তবু ভেতরে ঢুকতে দিয়েছিল, এবার গেট থেকে তাড়াবে। অপমানের চূড়ান্ত হতে হবে। বৌদিকেও ছেড়ে দেবে না। এমনিতেই তো ওনার জীবন দুর্বিষহ, আর বাড়ানোর মানে হয় না। আর অদ্রিই বা শুধু শুধু এসব সহ্য করবে কেন?” সুব্রত বললেন।
“যেতে তো আমাকে আরেকদিন হবেই, ছবিটা ফেরত দিতে,” অদ্রি যেন একটু অন্যমনস্ক, “কিন্তু তার আগে পুরো ব্যাপারটা জানতে পারলে ভালো হত। আচ্ছা ছোটোপিসি আমাদের গ্রামের বাড়িতে এখন কারা থাকে? তোমাদের সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগ আছে?”
“গ্রামের বাড়িতে আমাদের আত্মীয়রাই আছেন। সেজকাকা, সেজকাকীমা আছেন, ওনাদের ছেলেরা আছে। যোগাযোগ খুব একটা নেই। তবে বছরখানেক আগে তোর পিসেমশায়ের একটা কাজ পড়েছিল ওদিকে। সেই সময় আমি আর সোহম দু দিন ওখানে ছিলাম। ভালোই লেগেছিল। মিথ্যে কথা বলব না, যত্ন আদর যথেষ্ট পেয়েছিলেম। কিন্তু তুই এসব জানতে চাইছিস কেন? তুই কি গ্রামে যাবি নাকি?” রত্না অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“তাছাড়া তো আর গতি নেই। একটা শেষ চেষ্টা করা যাক। নিত্যনারায়ণ রায়চৌধুরীর তো জন্ম, বড়ো হওয়া সব গ্রামেই। এ শহরে তো অনেক পরে এসেছিলেন। দেখা যাক যদি কিছু জানা যায়।”
“তুই পারবি নাকি ওখানে থাকতে? পারবি না বাবা। মাঝখান থেকে শরীর খারাপ হবে। তাছাড়া জেনেই বা কী করবি? ছবিও তো কেউ ফেরত নিতে চাইছে না, তোর কথা শোনা তো দূরের কথা। হয়তো এর মধ্যেও তোর কোন মতলবের গন্ধ পাবে। আমার বাবাকে আমি ভালোই চিনি অদ্রি। এসব মাথা থেকে তাড়া।”
“না ছোটোপিসি, যেতে আমাকে হবেই। ধরেছি যে কাজ, শেষ না করে ছাড়ব না। অন্তত চেষ্টা তো করবই। ভুলো না আমিও প্রতাপনারায়ণ রায়চৌধুরীর নাতি, জেদে আমিও কিছু কম যাই না,” হেসে বলল অদ্রি, “এমিলি আর গুড়িয়া থাক তোমাদের কাছে। এমিলির ক’টা কাজ আছে, ও সেরেও নিক সেসব। আমি ঘুরে আসি, কাল ভোর ভোরই বেরিয়ে পড়ব।”
অদ্রির এই জেদ রত্নার একেবারেই ভালো লাগল না, উনি এমিলিকে বললেন, “তুই কিছু বলছিস না যে? আটকা ওকে।”
এমিলি কীরকম অদ্ভুতভাবে হেসে বলল, “আটকাব কি? নেহাত মেয়েটা বড্ড ছোটো, নাহলে ওকে নিয়ে আমিও যেতাম। এই ছবিটার কথা অদ্রি আমাকে আগেও বলেছে। ওই দুজন মানুষের সঙ্গে নিত্যনারায়ণ রায়চৌধুরীর কী সম্পর্ক তা জানার কৌতুহল কি আমার কিছু কম? নারায়ণ নিবাসে আমাকে ঢুকতে না দিক, যতই আমাকে দূরে সরিয়ে রাখুক, কিন্তু আমি তো ওই বাড়িরই একজন, গুড়িয়াও। আমারও জানার ইচ্ছা থাকাটাই স্বাভাবিক।”
রত্না এর উত্তরে কিছু বলার মতো আর খুঁজে পেলেন না। এমিলির কথা তো বর্ণে বর্ণে সত্যি।
*****
গ্রামের বাড়ি। ছোটোবেলা থেকে যে গ্রামের বাড়ির কথা শুনে এসেছে। নারায়ণ নিবাস তো পরে। রায়চৌধুরীরা আদি বাসস্থান তো ওখানেই। অদ্রি দু একবার এসেওছে আগে, কিন্তু তখন অনেক ছোটো ছিল। এতই ছোটো যে স্মৃতির ভাঁড়ারে কিছুই জমা হয় নি। গ্রামে পা দিয়ে অদ্রির অদ্ভুত লাগল। এ কেমন গ্রাম, এ তো না গ্রাম না শহর। গ্রাম যেন শহরের দিকে কিছুটা এগিয়ে থমকে গেছে। শহরের কিছু প্রভার পড়েছে কিন্তু নিজেকে পুরো পালটাতেও পারে নি।
রত্নার ফোন এসেছিল তাই এখানে অদ্রির জন্যে সবাই প্রস্তুত ছিল। দাদুর ভাই, কে জানে তাঁর ব্যবহার কেমন হবে, অদ্রির মনে যে একেবারে কোন খচখচানি ছিল না তা নয়। কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ অন্য অভিজ্ঞতা হল। কত বছর পরে দেখা, অন্যত্র দেখা হলে সবাইকে চিনতেও পারত না, কিন্তু সবাই সহর্ষে ওকে অভ্যর্থনা জানাল। ছোটোপিসি ঠিকই বলেছিল এখানকার মানুষের মধ্যে এখনও আন্তরিকতা আছে। সহজভাবেই সবাই জিজ্ঞেস করল, অদ্রি একা কেন, স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে এলেই তারা বেশী খুশি হত। স্নেহ, ভালোবাসার প্রকাশ স্পষ্ট কথাবার্তায়। ছোটোপিসির বাড়ি ছাড়া আর কোথাও এত স্বচ্ছন্দে থাকতে পারবে এ অদ্রি কল্পনাও করতে পারেনি। আর যে বাড়িতে জন্মেছে, বড়ো হয়েছে সে বাড়িতে তো প্রবেশই নিষেধ, বাস করা তো দূরের কথা!
“বড়দা বরাবরই খুব রক্ষণশীল এবং জেদী। যা উনি বিশ্বাস করেন, মানেন তা অন্যদেরও মানতে হবে। দিনকাল বদলেছে, তার সঙ্গে নিজেকেও বদলাতে হয়, অন্তত কিছুটা তো বটেই। ছেলেমেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক কিছু মানিয়ে নিতে হয়। নাহলে এই হয়। আমার সব শুনে সত্যি খুব খারাপ লেগেছে। নিজেও শান্তি পাচ্ছে না, কাউকে শান্তিতে থাকতেও দিচ্ছে না,” বললেন প্রতাপনারায়ণের মেজ ভাই দেবনারায়ণ।
“তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে? ফোন টোন করে দাদু? বা যাও তোমরা? আমাদের ছোটোবেলায় তো মাঝে মাঝে আসতে,” অদ্রি জিজ্ঞেস করল।
“না যাওয়া আর হয় না। বড়ো শহরের ভিড়ভাট্টা আর হট্টগোল আমার কোনোকালেই ভালো লাগে না। তাই তো কবেই এখানে ফিরে এসেছিলাম। এখন অবশ্য এদিকও অনেক পালটে গেছে। সত্যি কথা বলতে গেলে যোগাযোগ বড়দার থেকে বেশী মেজদা আর কমলের সঙ্গে আছে। বড়দার সঙ্গে বরাবরই আমাদের একটা দূরত্ব ছিল। এখন ওই মাঝে মাঝে ফোন করি, খবর নিই। ওইটুকুই। তোরা চলে যাওয়ার পর তো বড়দা আরো গম্ভীর হয়ে গেছে, সারা পৃথিবীর ওপরেই যেন আক্রোশ। ফোনেও বিশেষ কথা বলার আগ্রগ আছে বলে তো মনে হয় না। কেমন আছ, সবাই ভালো আছে তো–র পরেই তো দেখি কথা ফুরিয়ে যায়। আর এই ফোন যন্তরটার ওপারের নৈঃশব্দ বড়ো বেশী অস্বস্তিকর। কোথাও যেন সুর কেটে গেছে। সেটা অবশ্য ......” দেবনারায়ণ কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।
কিন্তু অদ্রি থেমে যেতে দিলে তো, “বলো না সেজদাদু।”
“সেটা আজ নয়, অনেক কাল আগেই হয়েছে। যখন আমরা এক এক করে নারায়ণ নিবাস থেকে আলাদা হয়ে গেলাম তখন থেকেই। বড়দার সঙ্গে থাকা মানে নিজেদের সমস্ত ইচ্ছে বিসর্জন দিয়ে শুধুমাত্র বড়দার ইচ্ছে মতো থাকতে হবে। সেটা কি সম্ভব? একান্নবর্তী পরিবারে সবার কথাই শুনতে হয়। পরিবার ভাঙতই, আগে বা পরে। তবে বাবা মা থাকাকালীনই সবাই আলাদা হয়েছে, বাবা কারণটা বুঝেছিলেন – এটা একদিকে ভালো হয়েছিল। বাবা মা আমাদের সঙ্গেই ছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। বাবা বড়দাকে নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন। শেষদিকে আমাকে বলতেন, ‘যা ভেবেছিলাম তা কিছুই হল না। প্রতাপ একেবারে অন্যরকম হল। ও নিজেও সুখী হবে না, কাউকে সুখী করতেও পারবে না।’ বাবার কথা যে ঠিক ছিল তা তো এখন বোঝাই যাচ্ছে। অদ্রি, একটা কথা সব সময় মনে রাখবি, তোর সেজদাদুর বাড়ির দরজা তোদের জন্যে সব সময়ই খোলা। সত্যি কথা বলতে বৌমা আর নাতনিকে নিয়ে এলেই বেশী খুশী হতাম। পরের বার অবশ্যই নিয়ে আসবি, সুলক্ষণাদেরও আসতে বলবি।”
অদ্রির চোখে জল এল। প্রাসাদোপম নারায়ণ নিবাসে ওদের স্থান নেই, সেজদাদুর বাড়ই ছোটো, কিন্তু ছোটো বাড়ির বাসিন্দা মানুষগুলোর হৃদয় অনেক বড়ো। ছোটোবালেয়ায় মার কাছে একটা কথা শুনেছিল, মনে পড়ে গেল এখন, যদি হও সুজন তেঁতুল পাতায় ন’জন।
এবার আসল কথায় আসতে হবে। বলতে হবে কী কারণে এখানে আগমন তার। বলল সব কিছু বিশদে। ছবিটাও দেখাল। দেখে তো দেবনারায়ণ কিছুক্ষণ একেবারে থ।
তারপর বললেন, “আশ্চর্য, এসব তো আমরা কিছুই জানি না। এই ছবি তো বহুবার দেখেছি নারায়ণ নিবাসে। তখনকার কোনো নামকরা আর্টিস্টকে দিয়ে বড়দা আঁকিয়েছিল। অনেক টাকা নিয়েছিল নাকি। বড়দাই বলেছিল। কিন্তু এরা কারা? এদের তো কখনো দেখিনি।”
“তার মানে এরা তোমাদের আত্মীয় কেউ নয়, অন্তত নিকট আত্মীয় তো নয়ই। হলে তো চিনতে পারতে। কিন্তু প্রশ্ন হছে এ দুজনের মুখ ছবিতে এরকম লুকিয়ে আঁকা কেন? কিছু তো কারণ আছে, কোনো তো সম্পর্ক আছে এ দুজনের সঙ্গে আমার পিতামহের। সেটা জনাতেই আমার আসা।”
“জানতে পারে এক বড়দা। ছবিটা তো সেই আঁকিয়েছিল।”
“আমার মনে হয় না দাদু কিছু জানে বলে। কারণ এ ছবি আঁকার গল্প দাদু আমাকে বহুবার বলেছে। দাদু দাদুর বাবাকে আর্টিস্টের স্টুডিওতে নামিয়ে দিয়ে চলে যেত কোর্টে। দাদুর এত সময় কোথায়? ছবি শেষ হয়ে বাঁধিয়ে যখন এল দাদু নাকি তখন বাড়িতে ছিল না, কোনো কেসের ব্যাপারেই অন্য কোথাও গেছিল। দুতিন দিন পরে দাদু ফিরেছিল। দাদু এত টাকা খরচ করে এত বড়ো আর্টিস্টকে দিয়ে য়াঁকিয়েছে, শেষ হবার পর দাদুরই প্রথম দেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি বলে দাদুর একটু আক্ষেপও ছিল। এসবই আমার দাদুর কাছ থেকে শোনা। আমার তাই মনে হয় এটা দাদুর কীর্তি নয়, দাদুর বাবার কীর্তি। যদিও কারণ কী তা জানি না।”
দেবনারায়ণ তখনও ছবিটা দেখে যাচ্ছেন, দেখতে দেখতেই বললেন, “তুই ঠিকই বলেছিস অদ্রি। ছবিটা আসার মাসখানেকের মধ্যেই বাবা মা নারায়ণ নিবাস ছেড়ে এখানে চলে আসেন। বড়দার মনোঃপূত হয়নি ব্যাপারটা। বাবা হেসে বলেছিলেন, ‘এই তো আমার ছবি রইল। এত চমৎকার ছবি!’ ছবিটা সত্যি একদম জীবন্ত হয়েছিল। কিন্তু কথা হচ্ছে বাবা এই দুজনের মুখ নিজের ছবিতে আঁকাবেন কেন? এদের সঙ্গে বাবার কী সম্পর্ক? নাহ, আমার মাথায় তো কিছুই আসছে না।”
“তুমি ছাড়া আর কে বলতে পারবে? মেজদাদুও কি আর আলাদা বিশেষ কিছু জানবে? আর যারা তোমার বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন তাঁরাও তো আর কেউ বেঁচে আছেন বলে মনে হয় না। আচ্ছা সেজদাদু আমাদের বংশের ইতিহাস কিছু জানো?”
“সেরকম উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। আমার ঠাকুরদা বাড়িতে নারায়ণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাবার জন্ম তার পর বা সেই একই সময়ে। বাবার নাম থেকে বংশের ছেলেদের নামে নারায়ণ যোগ করা শুরু হয়। ব্যাস এই, আর কিছু নয়।”
“ এতো আমিও জানি। নাহ, যে জন্যে এলাম তা সফল হল না,” অদ্রি দৃশ্যতই হতাশ।
দেবনারায়ণ চুপ করে আছেন, কী যেন ভাবছেন। হঠাৎ বললেন, “একটা শেষ চেষ্টা করা যেতে পারে। বাবা দীক্ষা নিয়েছিলেন, ওনার বাড়ই পাশের গ্রামেই। উনি তো আর বেঁচে নেই, কিন্তু ও বাড়ির এক ভদ্রলোক আছেন, তাঁরও অনেক বয়স, গুরুদেবের ভাইয়ের নাতি খুব সম্ভব। পশুপতিনাথ ভট্টাচার্য্য, সবাই ভটচায্যিমশাই বলে। খুব জ্ঞানীগুণী মানুষ। আশেপাশের কয়েকটা গ্রামের ইতিহাস ওনার মুখস্থ। বলতে গেলে এ অঞ্চলের আদিকালের কথা জানেন। কীভাবে এখানে জনপদ গড়ে উঠল, এখানকার হাটবাজার, পুজো পার্বণ, মন্দির – এসব নিয়ে ওনার অনেক লেখালিখিও আছে। এই পোড়া গ্রামেই পড়ে রইলেন বলে কদর পেলেন না। এখানে আর এসব গুণের সমঝদার কই? যাই হোক, এ অঞ্চলের অনেক বংশের ইতিহাসই উনি জানেন শুনেছি। আমার কাছে একবার এসেছিলেন, বলেছিলেন, ‘অনেকটাই জানি আপনাদের বংশের কথা, কিছু কিছু ফাঁক আছে, সেটা ভরিয়ে নিচ্ছি।’ চল কাল সকালে একবার ওনার কাছে যাই, গিয়ে খুলে বলি সব।”
হতাশার অন্ধকারে হঠাৎ আলোর ঝিলিক। অদ্রিও চনমনে হয়ে উঠল। সারা রাত ভালো ঘুম হল না। ছটফট করেই কাটল। একটু ঝিমিয়ে পড়লেই তন্দ্রার ঘোরে হানা দিচ্ছে মুখদুটো, ভেঙে যাচ্ছে ঘুম। পারবে কি অদ্রি জানতে এরা কারা?
ভদ্রলোকের সত্যিই বয়স হয়েছে। চলাফেরা করেন অত্যন্ত আস্তে আস্তে। অদ্রিদের আসার কারণ শুনলেন মন দিয়ে। তারপর বললেন, “অতীতের বিবরে যে কী কী সঞ্চিত থাকে তা ভাবলে অবাক হতে হয়। অনেক সময় মনে হয় টেনে বার না করলেই ভালো, যেখানে চাপা পড়ে আছে, যেভাবে চাপা পড়ে আছে, সেভাবেই থাক। আবার কোনো কোনো সময় হয়তো উপকারও হয়। তোমাদের কী হবে সে আমি বলতে পারি না,” ভদ্রলোক থামলেন, বোধহয় দম নিতে।
অদ্রি আর দেবনারায়ণ পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন। তার মানে সত্যিই কিছু আছে!
“তবে অনেকের অনেক রহস্য জানাও বোধহয় অস্বস্তিকর। অন্তত এই বুড়ো বয়সে তো তাই মনে হয়। আমি মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অনেক তথ্যও বিলীন হবে। তবু ভালো রায়চৌধুরী বংশের কথা আমি যা জানি তা রায়চৌধুরী বংশের লোকেদেরই বলে যাচ্ছি। এসব জানা আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে আমার বড়োদাদুর জন্যে। আমার প্রপিতামহ মানে বড়োদাদুর বাবার খুব খ্যাতি ছিল। আশেপাশের দশটা গ্রামের বহু লোক ওনার শিষ্য ছিল। নানান ব্যাপারে ওনার পরামর্শ নিত, সমস্যার সমাধানের জন্যে আসত। লোকজনের ভিড় লেগেই থাকত। তোমার ঠাকুরদাও এদেছিলেন,” দেবনারায়ণকে বললেন ভটচায্যিমশাই, “বড়োদাদুর তখন অল্প বয়স। তোমার ঠাকুরদাও এলেন গুরুতর সমস্যা নিয়ে, উনিও আমার প্রপিতামহের শিষ্য ছিলেন। ওনার তিন সন্তানের পরপর অকাল মৃত্যু হয়েছে। শেষের ছেলেটি তো বোধহয় এক বছরও পার করতে পারে নি। এরপর তোমার ঠাকুমা শারীরিক, মানসিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েন, সন্তান ধারণ করা ওনার পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। তখন অনেক ভেবে চিনতে আমার প্রপিতামহ দত্তক নেবার বিধান দিলেন। এই গ্রামেরই এক পরিবার থেকে একটি সুলক্ষণযুক্ত ছেলেকে তোমার ঠাকুরদা দত্তক নেন। অনেক কোষ্ঠি বিচার টিচার করেই এসব ঠিক হয়েছিল।”
দত্তক শুনেই অদ্রির বুকে হাতুড়ির ঘা পড়ল। অনেকদিন আগেকার কথা মনে পড়ে গেল, মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, “এই ছেলেটি কি ব্রাহ্মণ ছিল?”
দেবনারায়ণ অবাক হয়ে অদ্রির দিকে তাকালেন।
“না,” বললেন ভটচায্যিমশাই, “মাহিষ্যর ছেলে কিন্তু অতি সুলক্ষণযুক্ত। আমার প্রপিতামহ বলেছিলেন যে এর থেকে রায়চৌধুরী বংশের রমরমা শুরু হবে। তাই হয়েওছিল। সিদ্ধবাক ছিলেন উনি। এই ছেলেই হচ্ছে নিত্যনারায়ণ রায়চৌধুরী। ছেলেকে দত্তক নেবার ঠিক আগেই বাড়িতে নারায়ণ প্রতিষ্ঠা করা হয়, ছেলের নাম রাখা হয় নিত্যনারায়ণ। নিত্যনারায়ণকে যখন দত্তক নেওয়া হয় তখন ওনার বছর পাঁচেক বয়স ছিল। নতুন বাবা মাকে উনি ঠিক মেনে নিতে পারছিলেন না। কিছুটা বড়ো হয়েও এ সমস্যা ছিল। আমার প্রপিতামহ তো তখন আর ইহলোকে নেই। বড়োদাদুই তোমার ঠাকুরদাকে আর নিত্যনারায়ণকে বোঝাতেন। পরে তো নিত্যনারায়ণ বড়োদাদুর কাছেই দীক্ষা নিয়েছিলেন। আমাকে এত সব কথা বড়োদাদুই বলেছিলেন। উনি আবার অনেক কিছু লিখে রাখতেন। সেখানেও এ ঘটনা লেখা আছে। তোমরা চাইলে দেখাতে পারি। এ গ্রামের শেষ দিকে পাঁচকড়ি বিশ্বাসের বাড়ি। পাঁচকড়ির এক ছেলে থাকে শুধু এখন এখানে, বাকি সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। ওই বংশেই জন্ম নিত্যনারায়ণের। ওদের বাড়িতেও অনেকে জানে এসব কথা। এসব তখন হত। অন্যায় তো কিছু নয়। অতগুলো ছেলেমেয়ে, ভালোভাবে মানুষ করতে পারত না, তার থেকে নিত্যনারায়ণ কত ভালো জীবন কাটিয়েছেন।”
দেবনারায়ণ আর অদ্রির বাকশক্তিরহিত। এত বড়ো সত্যি যে ওনাদের জন্যে অপেক্ষা করছিল তা স্বপ্নেও ভাবেন নি কেউ।
কিছুক্ষণ পরে অদ্রিই বলল, “তাহলে এই ছবিদুটো কার হতে পারে?”
“যা মনে হয় নিত্যনারায়ণের জন্মদাতা, জন্মদাত্রীর। সেটাই হওয়ার সম্ভবনা বেশী। দেখেও তো স্বামী স্ত্রী বলেই মনে হচ্ছে,” বললেন ভটচায্যিমশাই।
অদ্রিরও তাই যুক্তিযুক্ত বলে মনে হল। তাই জন্যেই ছবির মধ্যেও আড়ালের প্রয়োজন হয়েছিল।
কৃতজ্ঞচিত্তে ভটচায্যিমশায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দুজনে উঠে পড়লেন।
বাড়ি ফিরে এসে অদ্রি সবাইকে সব কিছু বলল। নিজেদের বংশের এত বড়ো খবর জেনে সবাই বিস্মিত। সবাই এই নিয়েই কথা বলছে কিন্তু দেবনারায়ণ চুপ। ভটচায্যিমশায়ের বাড়ই থেকে ফেরার পর উনি একটা কথাও বলেননি।
অনেকক্ষণ পরে বললেন, “এবার আমি অনেক কিছুর মানে খুঁজে পাচ্ছি। আগে যা ধর্তব্যের মধ্যেই আনিনি, তা এবার বোধগম্য হচ্ছে। বাবা মারা যাবার আগে কয়েকদিন জ্বরে ভুগেছিলেন, সেই সময় একদিন শুনি নিজের মনে বলছেন, ‘সব বলতে চাইলাম কিন্তু কেউ শুনতে চাইলে তো। কোনো ইচ্ছেই নেই।’
আমি জিজ্ঞেস করেছিলেম, ‘কী বলতে চাও বাবা? বলো আমাকে।’
বাবা জ্বরে লাল হয়ে যাওয়া চোখদুটো আমার মুখের ওপর ফেলে বললেন, ‘না আর বলব না। একজনকে বলতে গেছিলাম সে যখন পাত্তাই দিল না তখন আর কাউকে বলব না। যার জানার ইচ্ছে হবে তাকে এবার খুঁজে বার করতে হবে।’
আমি ভেবেছিলাম জ্বরের ঘোরে বাবা ভুল বকছেন। এর দু তিনদিন পরেই বাবা চলে গেলেন। তুই সেই খুঁজেই বার করলি রে অদ্রি! যা বাবা বলতে চেয়েও বলতে পারেননি, তুই তাই করলি।”
“কিন্তু কাকে বলতে গেছিলেন উনি? দাদুকে?” অদ্রি জানতে চাইল।
“হতে পারে। বড়দা হয়তো শুনতেই চায়নি। এরপর কি ছবিটা আঁকানো হয়েছিল? আর বাবা নিরুপায় হয়ে এই রাস্তা বেছেছিলেন? কে জানে! এসব বোধহয় আর কোনোদিনই জানা যাবে না। কিন্তু এ যা জানা গেল তাইই অনেক। এর পুরো কৃতিত্ব অদ্রির। বাবার আত্মা এবার সত্যিই শান্তি পাবে।”
কাজ শেষ করে পরের দিন ফিরছিল অদ্রি। এবার যাবে ও নারায়ণ নিবাসে। অনেক জোরের সঙ্গে অনেক কিছুর জবাব চাইতে। শুধু নিজের ওপর ঘটা অবিচারেরই নয়, সোহমের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের উত্তরও জানতে হবে। কথায় কথায় রায়চৌধুরী বংশের রীতিনীতি, নিয়মকানুন ভাঙার অপরাধী হতে হয়েছে ওকে, সুলক্ষণাকে, ওদের মাকে, রত্নাকে। সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন প্রতাপনারায়ণ। সময় এসেছে প্রতাপনারায়ণের জবাবদিহির। আজ যেন অদ্রির মনে হচ্ছে ও একা নয়। ওর পূর্বজ ওর সঙ্গে আছেন। ছবিতে নিত্যনারায়ণের মুখটা আজ সত্যিই যেন জীবন্ত। আজ এত বছর পরে তাঁর উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে। সে মুখ যেন অদ্রিকে বলছে নারায়ণ নিবাসের সিংহ দরজায় ঘা দিতে। নিত্যনারায়ণও কি গণ্ডীর বাইরে পা দেননি? গ্রামে তো কোনো অভাব ছিল না, একমাত্র সন্তান উনি, জমিজমা, বাড়িঘর সমস্ত কিছুর একমাত্র উত্তরাধিকারী উনি, তাও কি নিজের ইচ্ছেয় শহরে আসেননি? বাবা, মা কে গ্রামেই রেখে? আপত্তি নিশ্চয়ই তখনও উঠেছিল, আটকানোর চেষ্টাও হয়তো হয়েছিল। কিন্তু শুনেছিলেন কি নিত্যনারায়ণ? উনি যদি শহরে না আসতেন হত কি পত্তন নারায়ণ নিবাসের? ভবিষ্যতের সম্ভবনার অঙ্কুর অতীতের গহ্বরেই লুকিয়ে থাকে। এসব জানতে হবে প্রতাপনারায়ণকে, শুনতে হবে অদ্রির কথা। এবার আর ছাড়ান নেই।
অদ্রির মনে যখন এই তোলপাড় চলছে, একই সঙ্গে আরেকজনের মনেও চলছে। তিনি প্রতাপনারায়ণ। নারায়ণ নিবাসের বাসিন্দারা বুঝতেও পারছেন না কীরকম ছটফট করছেন এই বৃদ্ধ। আপাত শান্ত বহিরঙ্গের আড়ালে চলছে তুমুল আলোড়ন। যার খবর কারুর জানা নেই। থাকবেই বা কী করে, এসব জানতে হলে কাছে আসতে হয়। প্রতাপনারায়ণ তো নিজেই সবাইকে দূরে সরিয়েছেন।
অদ্রি জানেও না কাল সন্ধ্যেয় একটা ফোন এসেছিল প্রতাপনারায়ণের কাছে। সে তখন ভাইবোনেদের সঙ্গে গ্রাম পরিদর্শনে আর গল্পগুজবে ব্যস্ত। ফোনটা করেছিলেন দেবনারায়ণ। কী কথা হয়েছিল দু ভায়ে? না, প্রতাপনারায়ণ কোন কথা বলার সুযোগই পাননি। যা বলেছিলেন দেবনারায়ণই বলেছিলেন। শুনতে আশ্চর্য হলেও সত্যি। দেবনারায়ণের কথা এমনই ছিল যে তা প্রতাপনারায়ণকেও হতবাক করেছিল।
ফোনটা প্রতাপনারায়ণই তুলেছিলেন। ভারী গলায় “হ্যালো’ শোনার পর কুশল জিজ্ঞেস করেছিলেন দেবনারায়ণ। ওই উত্তরটাই শুধু দিয়েছিলেন প্রতাপনারায়ণ।
এরপর দেবনারায়ণ এক তরফা বলে গেলেন, “আজ এত বছর ধরে রায়চৌধুরী বংশের রীতিনীতি, আদবকায়দা, গৌরব রক্ষার নামে তুমি তোমার নিজের ইচ্ছে চাপিয়ে এসেছ সবার ওপরে। এ যুগের অনাচার, বেচাল আটকানোর নামে দূরে সরিয়েছো নিজের মেয়ে, নাতি, নাতনিকে। তোমার মতে চলতে না পারলেই নারায়ণ নিবাস থেকে দূরে সরতে হবে। বাবা মাকেও হয়েছিল। ঘটা করে দেখিয়েছ সবাইকে বাবার ছবি, বলেছ কত টাকা খরচ করে কত বড়ো আর্টিস্টকে দিয়ে আঁকিয়েছ, পিতৃভক্তির সুনাম কুড়িয়েছ। কিন্তু সত্যি কতটুকু কী জানো তুমি বাবার সম্পর্কে? কতটুকু জানো আমাদের বংশের ইতিহাস? তোমার থেকে ঢের বেশী জানে আরেকজন, যদিও নিতান্তই অল্প বয়স তার। কিন্তু নিজের জানার ইচ্ছেয় সে জেনেছে।
তার হাত ধরে ঝড় আসছে নারায়ণ নিবাসে আছড়ে পড়ার জন্যে, তোমার সব নিয়মকানুনকে উড়িয়ে দেবার জন্যে। শুনেছি প্রবল ঝড়ে যারা নুয়ে পড়ে তারা অনেক সময় রক্ষা পায়, সটান খাড়া দাঁড়িয়ে থাকলে ভেঙে যাবার সম্ভাবনাই বেশী। তুমি কী করবে সে তুমি জানো।”
ফোন ছেড়ে দিয়েছিলেন দেবনারায়ণ। তখন থেকেই প্রতাপনারায়ণের অশান্তির সূত্রপাত। কে জানে ওনার থেকে বেশী, তাও আবার ওনার বাবার সম্পর্কে? জানেই বা কী আর জানলই বা কী করে? অদ্রি নয় তো? ছবিটা নিয়ে গেছিল তার মানে কোনো মতলবে? কিন্তু আছে কী ছবিটাতে? কিছুই নয়। শুধুমাত্র নিত্যনারায়ণের পোর্ট্রেট। তা থেকে কী জানা সম্ভব যা উনি জানেন না? কিন্তু কিছু তো ব্যাপার আছেই, নাহলে দেবনারায়ণের এত সাহস হত না এভাবে কথা বলার। অদ্রির সঙ্গে দেবনারায়ণের যোগাযোগ হলই বা কী করে? গেছিল ওখানে অদ্রি?
এসব ভাবতে ভাবতেই স্মৃতির অতল থেকে উঠে আসতে লাগল কিছু দৃশ্য।
ছবিটা টাঙানো হয়েছে দেওয়ালে, প্রতাপনারায়ণ গর্বিত হয়ে দেখছেন। পাশে নিত্যনারায়ণও রয়েছেন। হঠাৎ বললেন, “রায়চৌধুরী বংশের ইতিহাস যদি কখনো জানতে চাও, পুরোনো কথা জানতে চাও, তাহলে এ ছবিটা দেখো।”
“রায়চৌধুরী বংশের ইতিহাস তো আমি লিখব। সে ইতিহাস শুরু হবে এই নারায়ণ নিবাস থেকে,” প্রতাপনারায়ণের কন্ঠস্বরে অহংকারের ছোঁয়া, দৃষ্টি ছবির দিকেই।
“নারায়ণ নিবাসকে কেন্দ্র করে তুমি হয়তো ভবিষ্যতে ইমারত গড়বে। কিন্তু সে গড়া সম্ভব হবে তুমি এক মজবুত ভিত পেয়েছ বলে। ভিত মজবুত না হলে ইমারত তো দূরের কথা, ছোটো বাড়িও টেঁকে না।”
“ইমারত তৈরির যার ক্ষমতা আছে সে ভিতও নিজেই তৈরি করে নেয়। পূর্বপুরুষের সাহায্য তার লাগে না।”
এ কথা শুনে নিত্যনারায়ণ আর কিছু বলেননি। এর ক’দিন পরেই গ্রামে চলে গেছিলেন নারায়ণ নিবাস ছেড়ে। প্রতাপনারায়ণ একবারও থাকার জন্যে অনুরোধ করেননি। প্রতাপনারায়ণের স্বভাবই নয় সেটা।
আজ এত কাল পরে আবার এসব মনে পড়ছে। মনে পড়ছে শুধু মাত্র অদ্রিটার জন্যে। কী মতলব আছে হতচ্ছাড়ার তা সেই জানে। কিন্তু তিনিও কি কখনো ছবিটাকে দেখেছিলেন বাবার কথা মতো? দেখেছেন তো অনেকবার, কিন্তু সে নিজের কৃতিত্ব জাহির করার উদ্দেশ্য নিয়ে, নিত্যনারায়ণের কথা মতো অনুসন্ধিৎসা নিয়ে নয়, জানার ইচ্ছে নিয়ে নয়। সবাই আমার কাছ থেকে জানবে শিখবে, আমি অন্য কারুর কাছ থেকে জানতে যাব কেন – বরাবরই কি তাঁর এই মনোভাব ছিল না? সেদিন যদি বাবার কথা মন দিয়ে মন দিয়ে ভেবে দেখতেন তাহলে হয়তো আজ দেবনারায়ণ এত কথা বলার সুযোগ পেত না।
যত এসব মনে হচ্ছে প্রতাপনারায়ণ তত অস্থির হয়ে উঠছে। কী আছে কালের গর্ভে লুকিয়ে? কীসের মুখোমুখি হতে হবে তাঁকে? যা তাঁর অজ্ঞাত অথচ অদ্রি জানে তা স্বীকার করে কি তিনি অদ্রিকে বাহবা দেবেন না তা লুকোতে দ্বিগুণ রূঢ় হয়ে উঠবেন? প্রতাপনারায়ণ নিজেই বুঝে উঠতে পারেন না। কাউকে কিছু ব্লেন না, বুঝতেও দেন না কিন্তু যেন তিষ্ঠোতে পারছেন না।
*****
এল সেই ঝড় অবশেষে। অদ্রির হাত ধরে, অদ্রিই নিয়ে এল তাকে। জলখাবার খেয়ে প্রতাপনারায়ণ সবে খবরের কাগজটার দিকে একটু মন দিতে চেষ্টা করছেন এমন সময় অদ্রির আগমন। একা নয়। রত্নাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। ছুটির দিন, আদিত্যনারায়ণও বাড়িতে। অদ্রির নারায়ণ নিবাসে পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে হাওয়ায় কী দোলাচল হল কে জানে খবর অন্দরমহল অবধি পৌঁছে গেল। প্রতাপনারায়ণের হাঁকডাক ছাড়াই। ছুটে এলেন স্পবাই। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে আদিত্যনারায়ণ, বক্রোক্তি করতে করতে কমলা, ছেলেকে আরেকবার দেখার আশায় এবং একই সঙ্গে আবার একবার ছেলের অপমানিত হবার দৃশ্য মনশ্চক্ষে দেখতে দেখতে আর বিপদের পদধ্বনি শুনতে শুনতে সুনন্দা।
প্রতাপনারায়ণ ইজিচেয়ারে বসে। সামনেই ওনার চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে অদ্রি। সে চোখেমুখে অদ্ভুত কঠোরতা, দৃঢ় সংকল্প। আশ্চর্য, প্রতাপনারায়ণ এখনও “বেরিয়ে যাও” বলে চেঁচিয়ে ওঠেননি তো!
নিত্যনারায়ণের ছবিটা সেন্টার টেবিলের ওপর রাখল অদ্রি, বলল, “ভয় পেয়ো না, নারায়ণ নিবাসে থাকতে আমি আসিনি। ছবিটা ফেরত দিতে এসেছি আর তোমাদের কিছু জানাতে এসেছি। যা এতক্ষণে নিত্যনারায়ণ রায়চৌধুরীর তিন ছেলে, নাতি নাতনিরা সবাই জেনে গেছে, শুধু ওনার বড়ো ছেলেই জানেননি। অথয মজার ব্যাপার হচ্ছে ইচ্ছে করলে উনিই সবার আগে জানতে পারতেন, ছবিটা তো এখানেই ছিল।”
প্রতাপনারায়ণের মুখ খুলল এবার, বললেন, “যা বলতে চাও পরিষ্কার করে বলো। হেঁয়ালি করার দরকার নেই। আর তুমি যা বলবে তা যে বিশ্বাস করতেই হবে এমন কোনো কারণ নেই।”
“অবশ্যই। বিশ্বাস করা বা অবিশ্বাস করা একান্তই তোমার ব্যাপার। কিন্তু আরো একটা ব্যাপার আছে, কেউ একজন বিশ্বাস না করলেই সত্যিটা কখনো মিথ্যে হয়ে যায় না। বরং সেটা তার দুর্বলতা যে সত্যিকে সত্যি বলে মানতে চায় না।”
“অদ্রি!” আদিত্যনারায়ণ চেঁচিয়ে উঠলেন, “তোমার কিছু বলার থাকলে বলো, নাহলে যাও।”
“বলার আছে বলেই তো এসেছি, তবে বিশেষ কিছু নয়। দাদুর বাবার এই ছবিটা দেখে আমার বরাবরই মনে হত যে এটা শুধুমাত্র একটা পোর্ট্রেট নয়, এতে আরো কিছু আছে। তাই ছবিটা নিয়ে গেছিলাম। আমার ধারণাই ঠিক ছিল। ছবিতে আবছাভাবে লুকিয়ে আরো দুজনের মুখ আছে। এই যে তাঁরা। চেনো এনাদের? জানো এনারা কারা?” অদ্রি একটা ছবি বার করে সোজা প্রতাপনারায়ণের হাতে ধরায়।
আদিত্যনারায়ণও ঝুঁকে পড়লেন দেখার জন্যে।
“অনেক বাজে বকেছ। এই দুজনের ছবি যে ওই ছবিতে ছিল তার কী প্রমাণ? থাকবেই বা কেন? এদের সঙ্গে বাবার কী সম্পর্ক?” ছবিটা রাখতে রাখতে প্রতাপনারায়ণ বললেন।
“প্রমাণ তো আছে। ছবিটা ভালো করে দেখলেই বোঝা যায়। ছবিটার বিভিন্ন অংশ জুম করে আমি ল্যাপটপেও দেখাতে পারি। শুধু অতিরিক্ত যেটা করা হয়েছে সেটা এমিলি করেছে। দুটো আবছা মুখকে ছবি থেকে আলাদা করে স্পষ্ট করে তুলেছে। এসব বিদ্যে ওর নখদর্পণে। কিন্তু আমার মনে হয় না আমাকে ল্যাপটপ খুলে এসব দেখাতে হবে বলে, কারণ এর থেকে অনেক জোরালো প্রমাণ তুমি অন্য জায়গা থেকে পাবে। কী সম্পর্ক এই দুজনের সঙ্গে তোমার বাবার জিজ্ঞেস করছিলে না তুমি? এনারা হলেন ওনার আসল বাবা মা মানে জনক জননী যাকে বলে। তোমার ঠাকুরদা তো তোমার বাবাকে দত্তক নিয়েছিলেন গুরুদেবের বিধান মেনে তিন শিশু সন্তান মারা যাবার পরে।”
বজ্রপাতেও বোধহয় এত চমকাতেন না সবাই যত চমকালেন এখন, এই তথ্য জেনে। কমলার মতো মুখরাও নিশ্চুপ। প্রতাপনারায়ণ চুপ। এই ঝড়ের পূর্বাভাসই কি দিয়েছিল সেদিন দেবনারায়ণ ফোনে? এত বড়ো কথাটাও ছেলেটা বলে গেল কী অনায়াসে!
“কী কথা মুখে উচ্চারণ করছ তা তুমি জানো? আমরা কেউ এসব জানি না আর তুমি জানো! সম্ভব কখনো?” আদিত্যনারায়ণই প্রথম কথা বলার ক্ষমতা ফিরে পেলেন।
“ওইটাই তো মজা। শুধু তোমরাই জানো না, বাদ বাকী সবাই জানে। প্রমাণ দেওয়ারও আমার কোনো দায় নেই, চাইলে তোমরা খোঁজো। আমি শুধু জানাতে এসেছি আর ছবিটা ফেরত দিতে।”
কষ্ট করে খুঁজতেও হল না। প্রমাণ যেন সশরীরে নারায়ণ নিবাসে এল। সবাই কি জানত এই সময়েই অদ্রি আসবে এখানে? নাহলে সবাই এই সময়টাই বাছল কেন? বুঝল কী করে সবাই প্রতাপনারায়ণকে ঘা দেবার এটাই মোক্ষম সময়? রাস্তা তো করেই দিয়েছে খোদ প্রতাপনারায়ণেরই নাতি, তাহলে আর কালক্ষেপ কেন? যখন কেউ একক উদ্যোগে এত বড়ো কাজ করে তখন বোধহয় পূর্বপুরুষদেরও তাকে অনুসরণ করতে কোন বাধা থাকে না।
ফোন এল দেবনারায়ণের, আরো দুই ভায়েরও। শুনলেন প্রতাপনারায়ণ কীভাবে গ্রামে গিয়ে নিত্যনারায়ণের গুরুদেবের নাতির সঙ্গে দেখা করে এই সত্য খুঁজে বার করেছে অদ্রি। আদিত্যনারায়ণকেও বললেন তাঁরা, আজ এই কথা বারবার বলতেও কারুর কোনো ক্লান্তি নেই।
সুনন্দা গর্বের চোখে নিজের ছেলেকে দেখছেন। আজ যেন অদ্রিকে সুউচ্চ পর্বতের মতোই লাগছে, দুর্লঙ্ঘ্য সে পর্বত। তাকে অতিক্রম করে কার সাধ্য! এত কষ্ট পাওয়া ওনার সার্থক হয়েছে, সার্থক করেছে ওনার আত্মজ।
“একেই বলে ভাগ্যের পরিহাস! যে নারায়ণ নিবাসে সোহম অবাঞ্ছিত, পিসিঠাম্মা যাকে দূর দূর করে তাড়িয়েছিল একদিন, সেদিন কেউ ভাবতেও পারেনি যে সেই নারায়ণ নিবাসের প্রতিষ্ঠাতার বাবা নিজেই ছিলেন রায়চৌধুরী বংশের দত্তক পুত্র। ছেলেমেয়ের এ হেন ব্যবহারে তিনি ওপরে বসে হেসেছিলেন না কেঁদেছিলেন সত্যিই জানতে ইচ্ছে করে,” অদ্রি বলল।
সবাই চুপ, কমলাও বসে পড়েছেন।
সবাইকে এক নজর দেখে অদ্রি আবার বলল, “আরেকটা কথা জানানোর আছে। সেটা বলেই চলে যাব। নিত্যনারায়ণ রায়চৌধুরী তো নিজের বাবা মাকে ভুলতে পারেননি, তাই সুযোগ পেয়ে এরকমভাবে নিজের ছবির সঙ্গে তাঁদের ছবিও আঁকিয়েছিলেন। আমাকেও মনে হছে এরকম একটা ছবি ভবিষ্যতে আঁকাতে হবে যেটা থেকে একদিন হয়তো আমার মেয়ে খুঁজে বার করবে তার শেকড়কে। যা পরিস্থিতি বর্তমানে তাতে আমার মেয়েকে তার ঠাকুরদা, ঠাকুমা, আমার ঠাকুরদা – কারুকে চেনানো সম্ভব হয় নি। চূড়ান্ত অপমান করা হয়েছে এমিলিকে। শুধুমাত্র তাকে বিয়ে করার তোমরা আমার সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেছ। একই কারণে আমাদের ছোট্ট নিষ্পাপ মেয়েটাকেও তোমরা দূরে সরিয়ে রেখেছ। সে জানলও না কোথায় তার বাবা জন্মেছে, বড়ো হয়েছে, তার বাবার বাবা মা কারা। এত কিছুর পর আমি তোমাদের ছবি ঘটা করে আমার বাড়িতে রাখব সে আশা করাই ভুল। এরকম চললে ভবিষ্যতে কখনো নারায়ণ নিবাসের কথা উঠলে আমিই সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাব। তারপর বুড়ো হয়ে হয়তো এরকম একটা ছবির ব্যবস্থা করব। সুলক্ষণাও হয়তো তাই করবে।
আমি এই ক’দিনে যা জানলাম তার মধ্যে তো অপ্রিয় কিছু ছিল না। তিন সন্তানের মৃত্যুর পর একজন দত্তক নিয়েছেন একটি ছোটো ছেলেকে, মানুষ করেছেন ভালোভাবে। এর মধ্যে খারাপ তো কিছু নেই, বরং মানসিক উদারতার পরিচয় আছে। কিন্তু আমার মেয়ের যদি কখনো নারায়ণ নিবাস সম্পর্কে জানার কৌতূহল জাগে তাহলে সে কিন্তু অনেক অপ্রিয় সত্য জানবে। পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধার চেয়ে অশ্রদ্ধাই প্রবল হবে। এখন কী হবে আর কী হবে না সে ঠিক করার দায়ও তোমাদের। চলো ছোটোপিসি।”
রত্না এতক্ষণ একটা কথাও বলেননি। মূক দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। এখন শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “হ্যাঁ চল। তোর কাজ তুই করেছিস, এবার যার যা করার করুক।”
চুপ, এখনো সবাই চুপ। প্রতাপনারায়ণ মূর্তির মতো বসে। মুখ নীচের দিকে ঝোঁকা। কিন্তু মনের ভাব মুখের ওপর স্পষ্ট ছাপ ফেলেছে। মুখের ওপর ঘটে চলা হাজার কারুকাজ দেখে বোঝা যাচ্ছে ভাঙচুর চলছে প্রতাপনারায়ণের অন্তরমহলে। পারেন নি আটকাতে এই ঝড়কে, আগাম সতর্কবার্তা সত্ত্বেও তছনছ করেছে এই ঝড় তাঁকে। আদিত্যনারায়ণ যতই দেওয়ালের দিকে মুখ করে তাকিয়ে থাকুন, নিজের চোখদুটোর ভেজা ভেজা ভাব গোপন করতে পারছেন না। নিজের ছেলেমেয়েকে অবাধ্য বলেই জানতেন এতদিন, আজ মোক্ষম সময়ে টের পেলেন নিজের মন, চোখদুটো সবই অবাধ্যতা করছে।
সুনন্দা একবার সবার ওপর দৃষ্টি বোলালেন। তারপর এসে অদ্রির হাতদুটো ধরলেন। জলভরা চোখে মাথা নাড়লেন, না, আজ আর চলে যেতে দেবেন না ছেলেকে। জানেন তিনি আজ কেউ তাঁকে আটকাবে না। আজ যে পদধ্বনি শুনছেন তিনি তা বিপদের নয়, তা আশার, আনন্দের, অনেক কিছু ফিরে পাওয়ার।

আপনার মতামত জানান