জীবন যে রকম

রক্তিম তমাল গাঙ্গুলী


ঘরের জানালা দিয়ে দমকা বাতাস কখনো অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করে না । প্রেম অনুমতি নেয় না ।মৃত্যু অনুমতি নেয় না ।কিছু মানুষ ও যেমন অনুমতির পরোয়া করে না ।.চিত্রা তাদের মধ্যে অন্যতম ।

বৈশাখী দুপুর ।বাইরে পিচগলা রৌদ্দুর ।আমার ছোট্ট ঘরে হাতল ভাঙা চেয়ারে বসে,নিঃসঙ্গ আমি । হাতের নিঃশেষ হয়ে যাওয়া সিগারেট টা,আ্যশ ট্রে তে গুঁজে,সবে একটু ভাত ঘুমের তোড়জোড় করছি ।হঠাৎ করে সশব্দে দরজাটা খুলে চিত্রার আগমন ।
ঠিক কালবৈশাখী ঝড়ের মতন ।
দুম করে ঘরে ঢুকলো ।,প্রথমে খাটে ছুড়লো হাতের ভ্যানিটি ব্যাগ টা ।তারপর নিজেকে ।
নেহাত পিতার আমলের তৈরী,একালের হলে,আজই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতো। “খাটের ঘাটে গমন”যাকে বলা যায় ।

চিত্রার ধরনটাই অদ্ভুত । অন্তত আমার সঙ্গে ।আমরা একই পাড়াতেই বড় হয়েছি।
এক মাষ্টারমশায়ের কাছে পড়াশোনা ।আমার অভাগার কপাল ।কলেজ জীবনে বাবা-মাকে একসঙ্গে হারালাম ।
টিউশানি হল জীবনের উপার্জনের পথ । চিত্রা পেয়ে গেল সরকারি স্কুলে চাকরি । তাই প্রতিমাসের শেষে আমার চিত্রার কাছে হাত পাতাটা অনেক টা নিয়ম মাফিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল ।যেমন শীতে wrapper ।

প্রতি মাসের শুরুতে শোধ । শেষে ধার ।
এদিকে আমার খাটে চিত্রা টান টান । ঘুমিয়ে পড়লো !!
আমার ভাতঘুমের দফারফা । চিত্রার ক্লান্ত মুখের দিকে তাকালাম ।হবেই তো ।
এই বৈশাখের দুপুরে স্কুটি চালিয়ে সোজা আমার এখানে এসেছে ।
এ রকম মাঝে মাঝেই করে । ঘন্টা খানেক রেস্ট নিয়ে এক কাপ চা খেয়ে চলে যায় ।
সেই বিকেল গুলো আমার ভীষন ভালো লাগে ।
মনে মনে ভাবি,এরকম বিকেল যদি রোজ আসে,কিন্তু ভাবনাটাকে ভাবনার স্তরেই রাখি ।
চিত্রার সামনে প্রকাশ করার সাহস আমার কোনোদিনই হবে না । সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি ।
এই যে আমি চিত্রার ঘুমন্ত মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছি,সেটা যদি ও টের পেত ,আমার গালের চামড়া-
গরম করে দিত চড়িয়ে । স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের গায়ে হাত না তুলতে পারার রাগটা আমার ওপর প্রয়োগ করে ।

ঘড়ির দিকে তাকালাম ।প্রায় ৫টা বাজতে যায় ।সন্ধ্যে ৬টায় আমার টিউশানে যেতে হবে ।
দু কাপ চা বানিয়ে,ঘরে ঢুকে গান ধরলাম “তোমার ওই দেহ খানি তুলে ধরো,আমার এই দেবালয়ের প্রদীপ করো”!
চিত্রা উঠে পড়ে বললো “যে গুরুদেবের গান নিয়ে ইয়ার্কি করে তার জীবনে কিছু হয না,তোর-ও হবে না” ।
আমার হাত থেকে চায়ের কাপ টা নিয়ে বললো “নববর্ষের গিফ্ট টা তোকে,গুডফ্রাইডের দিন দেব,আর তোর এখানে দুপুরে-
খাবো । চিকেন বানাস ।ও কে”।
চট করে হিশেব করে নিলাম,কত খরচ হবে ।
পরে মিনমিনে গলায় বললাম “ও কে,তাই হবে । মহাজন বলে কথা” ।
“এবার কিন্তু চড় খাবি,অনেকেই খাচ্ছে আজকাল” ।
আমি ভয় পেয়ে একটু দূরে সরে গেলাম ।
চিত্রা খাট থেকে ব্যাগটা তুলে নিল,তারপর এ.টি.এম কার্ডটা আমাকে দিয়ে বললো “হাজার পাঁচেক টাকা তুলে আনিস,আমার লাগবে” ।
“তোর টাকা আমাকে কেন বারবার তুলে দিতে হবে বলতো”?
“যা বললাম সেটাই কর,আমার পাসওয়ার্ড মনে থাকে না” !
চিত্রা আর আমি একসাথে ঘর থেকে বের হয়ে,দু-জন দুদিকে রওনা হলাম ।

সবে মাত্র আমার ছাত্রের বাড়ি ঢুকবো,এমন সময় মোবাইল টা বেজে উঠল।
আমার বন্ধু বরুন;আমি ‘হ্যালো’বলার আগেই ও বললো ‘যত তাড়াতাড়ি পারিস
থানায় চলে আয় । চিত্রার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে ।একেবারে স্পট ডেড’।
আমার ভীষন রাগ হয়েছিল ।থানায় ছুটে গিয়েছিলাম-
উন্মত্তের মতন ।যন্ত্র দানব টা দাঁড়িয়েছিল,থানার এক কোনে ।একটা ইঁট তুলে-
সেটার দিকে ছুঁড়ে মারবো,এমন সময় কেউ কানের কাছে ফিস ফিস করে বললো-‘না,এটা তোকে মানায় না’।
আমি ইঁট টা দুরে ফেলে দিয়ে,নিজের জামা দিয়ে সেই দানব টার চাকায়-
লেগে থাকা ধূলোর দাগ,রক্তের দাগ যত্ন করে মুছে দিলাম ।
আজ আমার কাছে কিছুই নেই । কেবল মনে আছে পাস-ওয়ার্ডটা ।
চিত্রা এতদূর চলে গেছে ; সেখান থেকে ওকে ফিরিয়ে আনার পাস-ওয়ার্ডটা যদি জানতাম!!!

আপনার মতামত জানান