বিস্তার

সুবীর বোস


আমি জানালা ভালোবাসি। আমি জানালা দিয়ে অন্যের জানালা দেখতে ভালোবাসি। আমার জানালাপথে এ পাড়ার সব নামি বস্ত্রবিপনির জানালায় আমি দিনের পর দিন চোখ রেখে দেখবার চেষ্টা করেছি কীভাবে পিছলে যায় চাঁদ মেঘের সোমত্ত করিডরে। এভাবেই মনে মনে ক’বে যেন আমি মেঘনা বস্ত্রালয়, নিরুপমা বেনারসী ষ্টোর বা চম্পা চুড়িদার হাউসের খুব ঘনিষ্ঠে পৌছে গেছি।

আজকেও আমি খুব সকাল সকাল বাড়ির সামনের রাস্তায় চোখ রেখে জানালার শিকে তাল ঠুকতে ঠুকতে গলায় আবেগ ঢেলে মান্না দে-র একটা জনপ্রিয় গানে ঢুকে পড়বার চেষ্টা করছিলাম। সে আবেগ যখন সবে আমার খুব প্রিয় লাইন “কখনও বুঝিনি তুমি কী আশা করে”তে প্রবল হবার চেষ্টা করছে – শুনতে পেলাম ইপ্সিতা বলছে, সন্তুদা, খুব কষ্ট হলে থাক না বাবা। ইপ্সিতা যে কখন গুটি গুটি পায়ে আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে আমি খেয়াল করিনি।

ইপ্সিতা আমার থেকে বছর খানেকের ছোট এবং যদিও ও মেয়ে – তবু এ’কথা স্বীকার করতে আমার কোনও দ্বিধা নেই যে ওই আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। তবু ওর কথা শুনে আমার পিত্তি জ্বলে গেল। এই মেয়েটাকে নিয়ে আমার হয়েছে বিপদ। খেয়াল করেছি – যখনই আমি কিছু একটা সিরিয়াস ব্যাপারে ঢোকার চেষ্টা করি, কী করে যেন ইপ্সিতা সে দৃশ্যে এসে পড়ে এবং খুব ক্যাজুয়ালি আমার ভুলগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। এতে কখনও কখনও প্রচন্ড রাগ হলেও আমি ইপ্সিতাকে খুব কড়া কিছু কখনোই বলতে পারি না। কারণ আমি জানি ও ওইরকমই – মনে আর মুখে এক। যা বলে স্পষ্ট বলে। তাই এবারেও তেমন কড়া কিছু না বলে ঠান্ডা মাথায় বললাম, কেন গানটা কি আমি খুব খারাপ গাইছিলাম নাকি? তুইও না পারিস ইপ্সিতা - সবে গানটার বিস্তারে ঢুকছিলাম, দিলি সব মাটি করে।

আমার কথা শুনে ইপ্সিতার ভুরু জোড়া দেখলাম একবার আকাশের দিকে উঠে ফের নেমে এল নিচে। তা দেখে আমি ফের বললাম, ভুরু কোঁচকাচ্ছিস কী? আমি কি কিছু ভুল বললাম নাকি? আমার কথা শুনে ইপ্সিতা এবার হেসে ফেলল। তারপরে বলল, না, ভাবছিলাম – তুমি কী সুন্দর “বিস্তার-টিস্তার” জাতীয় কী সব ভারি ভারি কথা বলছ আজকাল।
- কেন ওটাকে কি বিস্তার বলে না? আমিএকটু রেগেই প্রশ্নটা করি।
- হ্যাঁ, কথাটা বিস্তার-ই বটে। তবে সন্তুদা, তুমি যেটা চেষ্টা করছিলে সেটা আসলে চিৎকার। ইপ্সিতা ফের স্পষ্ট বলে।
- এই হচ্ছে তোর দোষ। গান নিয়ে এমনভাবে কথা বলছিস যেন তুই গানের সব জানিস, সব বুঝিস। কেন আমি ভুলটা কী গাইছিলাম। এই তো কাল বিকেলেই আমার গলায় এই গানটা শুনে মা বলছিল, বাহ, সন্তু দারুণ গাইলি তো গানটা।
- দেখ, মাসিমা তাঁর জায়গায় ঠিক আর আমি আমার জায়গায়।
- আবোল-তাবোল না বকে কী বলতে চাইছিস ঠিক করে বল। আমি ইপ্সিতাকে চেপে ধরার চেষ্টা করি।
- সমস্যাটা অন্য জায়গায়। ওই গানটা তোমার খুব ভালো লাগে আর সে জন্যেই তুমি গুনগুন করতে করতে প্রতিনিয়ত গানটার আরও ভিতরে ঢোকার চেষ্টা কর। ঠিক?
- ঠিকই তো বলেছিস। এতে দোষের কী হল?
- দ্যাখো সন্তুদা তুমি যখন গানটা গাইতে শুরু কর – সাধারণ কেউ শুনলে বলবে, বাহ, সুন্দর গেয়েছ। কিন্তু একটু বোদ্ধা কেউ হলেই তিনি বুঝে যাবেন যে, এটা আসলে একজন মুগ্ধ শ্রোতার গান গাইবার প্রচেষ্টা মাত্র – যে শ্রোতা ভাবছে যে সে ঠিকঠাক গাইছে গানটা। কিন্তু আসলে...

ইপ্সিতাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে আমি গলা তুলে বললাম, তুই থাম তো। সব ব্যাপারে খালি পন্ডিতি করে বেড়ানো।
আমার কথা শুনে ইপ্সিতা দেখলাম ফের হাসল। তারপর বলল, সন্তুদা, জানো তো, এই মুগ্ধ শ্রোতা ব্যাপারটা যখন মুগ্ধ দর্শক হয়ে ঢুকে পড়তে চায় অন্য কারোর চৌহদ্দিতে – তখনই যত বিপত্তি বাধে। ইপ্সিতার শেষ বাক্যে আমি যেন একটু পোড়া গন্ধ টের পেলাম। বুঝতে পারছিলাম না যে ও আমার জানালা-বিলাসের খবর রাখে কিনা। তাই পরিবেশটাকে অন্যমুখী করার জন্য বললাম, তোর কথার আগা-মাথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। ধুর আমি এ ঘর থেকে কাটলাম।

কথা শেষ করে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াব না বলে পা বাড়ানো মাত্র ইপ্সিতা আমার হাত টেনে ধরে বলে, কী হল সন্তুদা, যাচ্ছ কোথায়? চল না একটু বারান্দাতে বসি, একটু গল্প-সল্প করি।
- ও সব করা মানেই তো আবার তোর জ্ঞান শোনা। আমি গলায় অভিমান ঢেলে বলি।
- ঠিক আছে আমি আর কোনও জ্ঞানের কথা বলব না। এখন স্রেফ আড্ডা আর কাওতালি। খুশি?

ইপ্সিতার মুখে আড্ডার কথা শুনে আমার ভিতরের ফূর্তিটা ফিরে আসে। কারণ আমি জানি এই “আড্ডা” মানে অন্য ইপ্সিতা, যে এবার সম্পূর্ণ অন্যভাবে বিকশিত হবে।

আমার ধারণাটাকে ঠিক প্রমাণ করার জন্য “আড্ডা”র শুরুতেই ইপ্সিতা বলল, তোমাকে তো দেখি প্রায় সারাদিন জানালা নিয়েই আছ। সে সময় তোমাকে দেখলে মনে হয় তুমি হাতে জাল নিয়ে তাক করে আছ শিকারের দিকে।

আমি ঠিক এই ভয়টাই করছিলাম। ইপ্সিতার কথায় এটা পরিষ্কার যে ও আমার জানালা-প্রেমের ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে। তবু মৃদু প্রতিবাদ করে বলি, কী যা তা বলছিস।
- কিছুই যা তা বলছি না। যা বলছি ঠিকই বলছি। তুমি এক কাজ কর সন্তুদা, এবার থেকে রোজ নিয়ম করে তোমার শিকার লক্ষ্য করে মনে মনে জাল ছোঁড়া প্র্যাকটিস কর।

এই হল ইপ্সতা! দুম করে সিরিয়াস ব্যাপার থেকে একদম গুলতানির স্টেজে পৌছে যেতে ওর জুড়ি নেই। আমি সেই গুলতানিটা আরও উপভোগ করার জন্য নিরীহ মুখ করে বললাম, কেন? মনে মনে জাল ছোঁড়া প্র্যাকটিস করে কী হবে? আর ওই মনে মনে জাল ছোঁড়ার ব্যাপারটাই বা কী?
- তুমি না সন্তুদা কোনও ব্যাপারই একবারে বুঝতে পার না। সারাদিন জানালায় বসে খালি শিকার দেখে গেলে হবে? চোখ বুজে কাউকে টিপ করো আর মনে মনে জাল ছোঁড়ো, তবে না একদিন কিছু একটা ধরা পড়বে সে জালে।
- তা বুঝলাম। কিন্তু এই মনে মনে জাল ছোঁড়াটা তুই কাকে দিয়ে স্টার্ট করতে বলছিস? ঐশ্বর্য রাই? আমি ইচ্ছে করেই ইপ্সিতাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করি।

ইপ্সিতা দেখলাম এবারেও আমার কথা শুনে একটুও উত্তেজিত না হয়ে খুব ঠান্ডা মাথায় উত্তর দিল, না, এখনই অত দূরে জাল ছুঁড়তে যেও না। প্রথমে নিজেদের পাড়া দিয়ে স্টার্ট কর।
- তা ভালো। কিন্তু পাড়ার কাকে দিয়ে শুরু করব?
- সেটা তুমি নিজেই ঠিক কর। কাউকে একটা দিয়ে শুরু করলেই হল। এমন তো নয় যে তুমি জাল ছুঁড়লে আর সঙ্গে সঙ্গে সেটা কাজে লেগে গেল। এর জন্য অধ্যবসায় লাগে বুঝলে!
- সে নয় হলো, কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা।
- কী কথা?
- আমি ভাবছি এই মনে মনে জাল ছুঁড়তে ছুঁড়তে আবার নিজেই না জালে পড়ে যাই।
- এই শুরু হল তোমার জালি কথাবার্তা। ঠিক আছে তোমাকে ওই জাল-টাল ছুঁড়তে হবে না, তুমি বরং তোমার জানালা নিয়েই থাক।
- হ্যাঁ, তাই থাকব তো। জানালা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। আগে জানালার সে ঋণ শোধ করি – তারপর না হয় তোর জাল নিয়ে ভাবা যাবে।

আমার কথা শুনে ইপ্সিতা দেখলাম হঠাত গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে নিজের ব্যাগ থেকে সুন্দর করে মলাট দেওয়া একটা বই বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, এই বইটা মন দিয়ে পড়তে পারলে তোমার খুব উপকার হবে?
- কী বই এটা?
- রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর। আমি নিশ্চিত বইটা তোমার ভালো লাগবে, লাগবেই।

আমি বইটা হাতে নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখার ফাঁকেই শুনতে পেলাম ইপ্সিতা বলছে, আমি আজ চলি, তবে আমার কথাটা মনে রাখলে তোমার ভালই হবে।

ইপ্সিতা চলে গেল। আমি আবার বারান্দা ছেড়ে আমার প্রিয় জানালাটার কাছে এসে দাঁড়ালাম। দেখি, কালুদার বউ ঝুমা-বৌদি ট্যাক্সি থেকে নেমে তাদের বাসা-বাড়িতে ঢুকছে। একটা নামি কোম্পানির সফটঅয়ার ইঞ্জিনিয়ার কালুদা আমাদের বাড়ির উল্টোদিকের মিত্র বাড়ির একতলায় ভাড়া থাকে। শুনেছি, বছর খানেক আগে বিয়ে করা কালুদার আসল বাড়ি শিলিগুড়িতে এবং কালুদা এখানে ডেরা বেঁধেছে শুধু চাকরির খাতিরে।

এই ঝুমা বৌদি আমার “প্রিয়” তালিকায় আছে। সে জন্যেই ঝুমা বৌদির ট্যাক্সি থেকে নামা বা বাসায় ঢুকে যাবার মধ্যে আমার তরফ থেকে একটা বাড়তি উৎসাহ ছিলই। কিন্তু যেহেতু ঝুমা বৌদি আমার দিকে কখনও ফিরেও দেখে না - আমি আস্তে আস্তে তাই ফের মান্না দের জনপ্রিয় গান, “রাত জাগা দু’টি চোখ”এ ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছিলাম। কী বলব, খুব হৃদয় দিয়ে গাইতে গাইতে “দুটি চোখ”এ এসে অবাক হয়ে দেখি ঘরে ঢোকার আগে হঠাৎ, এই প্রথম ঝুমা বৌদি পিছন ফিরে খুব গভীরভাবে আমার দিকে একবার তাকিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।

ঝুমা বৌদির ওই একটা হাফ টার্ণই আমাকে মান্না দের গান থেকে বাইরে এনে আছড়ে ফেলল ইপ্সিতা এবং তার জালতন্ত্রের উঠোনে। আমি তক্ষুণি আর কিছু না ভেবে মনে মনে আমার প্রথম জালটা ছুঁড়ে মারলাম ঝুমা বৌদিকে লক্ষ্য করে।



আমার “জাল পর্ব” শুরুর ক’দিন পরে এক রাতে একটা বিয়েবাড়ির ভোজ সেরে বাড়ি ফিরছিলাম। তখন বেশ রাত। রাস্তাঘাট মোটামুটি ফাঁকা। বেশ বড় বড় পা ফেলে হাঁটছি হঠাৎ দেখি একদল কুকুর আমার দিকেই দৌড়ে আসছে। সব পাড়াতেই দেখেছি -অন্ধকার নেমে এলেই দিনের বেলায় অত্যন্ত সজ্জন-দর্শন কুকুরগুলো পাড়াটাকে একান্তভাবে নিজেদের মনে করা শুরু করে এবং ওদের ধারালো দাঁত-নখগুলোকে বের করার জন্য ওরা এই সময়টাকেই বেছে নেয়। রাস্তার লেড়ি কুকুরের কামড় খেতে আমি রাজি নই – ফলে কুকুরগুলোকে দৌড়ে আসতে দেখে রাস্তা থেকে কয়েকটা ইটের টুকরো তুলে পজিশন নিলাম। দেখি, কুকুরগুলো আমাকে পেরিয়ে সোজা কালুদার বাসার সামনে গিয়ে বিশাল চীৎকার শুরু করেছে। ব্যাপারটা কী, দেখার জন্য আমিও পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে দেখি কালুদার ঘরের সামনে বেড়িয়ে থাকা এক চিলতে বারান্দায় দামি পোশাকে সুসজ্জিত একটা লোক বসে আছেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না এমন একজনকে দেখে কুকুরগুলো ধেয়ে এল কেন। ঠিক তখনই নজরে এল লোকটার পাশে বেশ নোংরা একটা চটের বস্তা পড়ে আছে। বস্তাটাকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে ওটি মালে ঠাঁসা। বুঝলাম ওই বস্তা দর্শনই কুকুরগুলোকে খেপিয়ে তুলেছে।

লোকটার অমন দামি পোশাকের পাশে পড়ে থাকা বিচ্ছিরি-দর্শন ঝোলাটা আমাকে বেশ চিন্তায় ফেলে দিল। তবে যেহেতু আমার বাড়িটা কালুদার বাসাবাড়ির ঠিক উল্টোদিকেই তাই তেমন ভয় করছিল না। এছাড়া একটু আগে যাদের মনে মনে গাল পেড়েছি – সেই কুকুরগুলোর পাশে থাকাটাও তখন আমার একটা বাড়তি পাওনা বলে মনে হচ্ছিল। সে সময় কুকুরগুলোর একটানা চীৎকার শুনে মনে হচ্ছিল ওরা যেন বলতে চাইছে, ভয় কী রে পাগল, আমরা তো আছি। মূলত সেই “পাগল”এর রক্ষাকর্তাদের ভরসাতেই আমি পকেটে হাত দিলাম মোবাইল ফোনটা বের করব বলে। ঠিক তখনই লোকটা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, একটা সিগারেট হবে? লোকটার অমন নির্বিকার ভঙ্গিতে সিগারেট চাওয়া দেখে আমি বেশ অবাক হলাম। প্রথমে ভাবলাম লোকটার কথার কোনও উত্তর দেব না। তারপর কী মনে হল, বলে দিলাম, আমি সিগারেট খাই না।
- ও হ্যাঁ, মনে ছিল না, তুমি তো আবার সিগারেট খাও না - তা ভালো, তা ভালো। আফটার অল সিগারেট স্মোকিং ইজ ইনজুরিয়াস টু হেলথ। তা, এত রাতে কি নেমন্তন্ন সেরে ফেরা হচ্ছে?

লোকটার কথা বলার ভঙ্গীতে আমার বেশ বিরক্ত লাগছিল। বললাম, হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, নেমন্তন্ন বাড়ি থেকেই ফিরছি। কিন্তু আপনি?
- আমি জানালার হিসেবরক্ষক।
- মানে?
- মানে কিছুই না। এ পাড়া-ও পাড়ার জানালাপ্রেমীদের বায়োডাটা মেনটেইন করাটাই আমার কাজ। মাঝে খবর পেলাম এতদিন মরুভূমির মধ্যে পড়ে থাকা তোমার একান্ত জানালাটা সম্প্রতি কিছু বৃষ্টি-ফোঁটার স্বাদ পেয়েছে – তাই এ পাড়ায় আসা। নইলে আমার এত ব্যস্ততার মধ্যে এ রকম ছোট-খাট পাড়ায় আমার আসার কথা না।

এবারে কিন্তু লোকটার কথা শুনে মনে হল আমি এক পাগলের পাল্লায় পড়েছি। কুকুরগুলোই লোকটার সদ্‌গতি করুক ভেবে বাড়ির দিকে এক পা বাড়িয়েছি – দেখি, লোকটা কুকুরগুলোর দিকে আঙুল তুলে বলল, অ্যাই চুপ, একদম চুপ। কী আশ্চর্য দেখলাম সব ক’টা কুকুর একদম চুপ মেরে গেল। লোকটা কুকুরগুলোকে ওভাবে চুপ করিয়ে দিল দেখে এবার কিন্তু আমি ভয় পেয়ে গেলাম। ভাবলাম পালাই। লোকটা যেন আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই ফের বলল, শোনো সন্তুবাবু, আমাকে দেখে এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তোমার জানালাপ্রেমই আমাকে তোমার কাছে নিয়ে এসেছে।

লোকটার মুখে আমার নাম শুনে অবাক আমি বলে ফেলি, আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?
- আমি পৃথিবীর সব জানালাপ্রেমীদেরই নাম জানি।
লোকটার এবারের উত্তর শুনে আমার মাথা গরম হয়ে গেল। ভেবে দেখলাম, লোকটার অনেকগুলো বাউন্সার হয় হেলমেটে খেয়েছি নয় তো ডাক করেছি - এবার হুক করবই ভেবে বলেই ফেললাম, তখন থেকে কী হাবিজাবি বকে যাচ্ছেন বলুন তো। জানালাপ্রেমী আবার কী?
- জানালাপ্রেমী হল তারাই – যারা দিনের বেশিরভাগ সময়টা নিজের জানালাপথে অন্যের বিশেষ জানালাতে চোখ রাখে।

লোকটার উত্তর শুনে বুঝতে পারলাম যে “তিনি” আমার সম্বন্ধে ভালোই খোঁজ-খবর রাখেন। আরও একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম, আমার প্রশ্ন শেষ হওয়া মাত্র লোকটা উল্টোদিক থেকে বুলেটের গতিতে উত্তর ছুঁড়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছিল আমি যেন দাবার বোর্ডে বিশ্বনাথন আনন্দের উল্টোদিকে বসে আছি। লোকটাকে অন্য বাতাবরণে নিয়ে ফেলতে হবে ভেবে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়ে, মানে আপনার ওই ঝোলাটায় কী আছে?
- সমস্ত জানালাপ্রেমীদের বায়োডাটা।

লোকটার “প্রায়” অপার্থিব কথা-বার্তায় ততক্ষণে আমার ভয় পালিয়ে গেছে। বরং ইচ্ছে হল লোকটাকে নিয়ে একটু মজা করি। তাই বললাম, ইয়ে, সমস্ত বায়োডাটা কি আপনার ঝোলাতে ইনডেক্স মেনটেইন করে রাখা আছে?
- তা তো আছেই। নইলে সময়ে খুঁজে পাব কী করে?
- সে তো ঠিকই। কিন্তু এই একটা মাত্র ঝোলাতে...অত বায়োডাটা...
আমার কথা শেষ করতে না দিয়ে এবারে লোকটা গলাটা বেশ গম্ভীর করে বলল, তুমি আমাকে নিয়ে মজা করার চেষ্টা করছ, তাই তো?
লোকটার পালটে যাওয়া গলার স্বর শুনে আমি একটু থমকে গেলাম। তবু মজার রেশটা ধরে রাখার জন্য বলেই ফেললাম, আচ্ছা আপনার ওই ঝোলাতে প্রথম জায়গা পেয়েছে যে জানালাপ্রেমী, তার নাম কী?
- অমল। লোকটা এক শব্দে উত্তর দিল একটুও চিন্তা না করে।
- অমল? কোন অমল? যা খুশি একটা নাম বলে দিলেন? আমি মজাটাকে ছড়ানোর চেষ্টা করি।
- যা খুশি একটা নাম আমি বলিনি। আমি বলেছি ডাকঘরের অমলের কথা।
- ডাকঘর মানে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘরের কথা বলছেন নাকি আপনি?
- হ্যাঁ, আমি সেই ডাকঘরের কথাই বলছি। আমার এই ঝোলাতে সেই ডাকঘরের অমলের নামই সবার আগে রাখা আছে।

সদ্য ডাকঘর শেষ করেছি আমি। সেই ডাকঘর নিয়েই লোকটার দিক থেকে এরকম একটা উত্তর আসতে পারে আমি সেটা ভাবতেই পারিনি। ফের লোকটার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে টের পেলাম আমার গলা কাঁপছে। সেই কাঁপা-কাঁপা গলাতেই বললাম, অমল জানালার ধারে সারদিন বসে থাকত এটা সত্যি। কিন্তু সে তো অসুস্থ ছিল...জানালা দিয়ে দইওয়ালা...

লোকটা আবার আমার কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠল, হ্যাঁ, দইওয়ালা... দইওয়ালার বোনঝি...থাক না বাপু।
- থাকবে কেন? আপনি স্পষ্ট করে বলুন কী বলতে চাইছেন। আমি ফের কাঁপা গলায় বললাম।

লোকটা দেখলাম আমার প্রশ্ন শুনে একটুও ইতস্তত না করে বলল, শোনো, অমল অসুস্থ ছিল, কোথাও যেতে পারত না, সারাদিন জানালার ধারে বসে থাকত এ’গুলো সত্যি। কিন্তু সে মনে মনে অনেক দূরে জাল ছুঁড়ে মারতে পারত।

লোকটার মুখে ওই জাল ছোঁড়ার কথা শুনে আমার নিজেকেই কেমন পাগল পাগল লাগতে শুরু করল। তার মধ্যেই মনের সমস্ত জোর একত্র করে জিজ্ঞেস করলাম, এই মনে মনে জাল ছোঁড়ার ব্যাপারটা যদি একটু ক্লিয়ার করে দেন তো ভালো হয়।
- ডাকঘর মন দিয়ে পড়েছ? নাকি খালি চোখ বুলিয়ে গিয়ে ভাবছ সব পড়ে ফেলেছি?
- পড়েছি এবং এখনও পড়ে চলেছি। তবে আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে পড়ার অনেক কিছু বাকি রয়ে গেছে।
- খেয়াল করো সন্তুবাবু, অমল নিজে দইওয়ালার গ্রামে কোনোদিন না গিয়েও বলছে, “মেয়েরা সব নদী থেকে জল তুলে মাথায় কলসী করে নিয়ে যায় – তাদের লাল শাড়ি পরা”।
- গ্রাম ভাবলে এমনটাই তো আজও চোখে ভাসে আমাদের সকলের। তাই না? আমি অমলের পক্ষ নেবার চেষ্টা করি।
- ঠিক, ঠিক। এবং এখানে জাল ছোঁড়ার কোনও ব্যাপার ছিল না। কিন্তু গোল বেঁধেছে অন্য জায়গায়।
- কোথায়?
- ওই যেখানে অমল “ঠাকুরদা”কে দইওয়ালা সম্বন্ধে বলছে, ও যে বলেছিল, আমার সঙ্গে তার ছোট বোনঝির বিয়ে দেবে...বলেছিল, সে আমার টুকটুকে বউ হবে – তার নাকে নোলক, তার লাল ডুরে শাড়ি”। এটা কি মনে মনে জাল ছোঁড়া নয়?

আমি বুঝতে পারি যে লোকটার কথায় আমি পুরো সম্মোহিত হয়ে পড়েছি, আমার ঘাড়, মাথা ঝুঁকে পড়ে। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে লোকটা ফের বলে, এই জানালাপ্রেমীদের নিয়ে মুশকিল হল, এরা ভালো যা কিছু তা কেবল জানালা দিয়েই দেখতে পায়। যত্ত সব ঈগল কোথাকার...

লোকটার শ্লেষ ভরা শেষ বাক্যটা আমাকে অবাক করে। আমি জিজ্ঞেস করি, ঈগল কেন?
- কেন আবার – দেখবে বাচ্চাদের ছড়া-ছবিতেও ইঁদুরছানাকে মাটিতে রেখে ঈগলটাকে আকাশে উড়িয়ে দেয়। ভাবটা এমন যেন আকাশে না উড়লে ঈগল পাখি ইঁদুর ছানাকে দেখতে পাবে না। এই জানালাপ্রেমীগুলোও সে রকম – যা কিছু ভালো, যা কিছু সুন্দর – সব ওই জানালাপথে। সে যাক, অনেক রাত হয়েছে এবার বাড়ি যাও।

আমিও বাড়ি যেতেই চাইছিলাম। লোকটাকে ধন্যবাদ দেব বলে সামনে তাকিয়ে দেখি লোকটা নেই, কোত্থাও নেই।




“ডাকঘর” আরও একবার শেষ করে একা একাই তখন বিড়বিড় করছিলাম, “বোলো যে, সুধা তোমাকে ভোলেনি”। ঠিক তখনই ঝড়ের মতো ইপ্সিতা ঢুকল ঘরে। ঘরে ঢুকেই ইপ্সিতা কোনও ভূমিকা না করে সরাসরি আমাকে চার্জ করল, তোমার ব্যাপারটা কী বলো তো সন্তুদা, তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?

ইপ্সিতার এ রকম আক্রমনের জন্য আমি আদৌ তৈরি ছিলাম না। সামান্য ধাতস্থ হয়ে বললাম, কেন, এ কথা বলছিস কেন? পাগলামীর কী দেখলি তুই আমার মধ্যে?
- ছি, ছি, ছি! আমাকে ঝুমা বৌদি আজ সকালে তোমাদের বাড়িটাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা ও বাড়ির ছেলেটার কি মাথায় দোষ আছে?
- হো-য়া-য়া-ট? আমি চিৎকার করে উঠলাম।
- চিৎকার করে লাভ নেই। মাথা ঠান্ডা করো সন্তুদা। ইপ্সিতা আমাকে ঠান্ডা করবার ভঙ্গিতে বলে কথাগুলো।
- কিন্তু ঝুমা বৌদির আমাকে পাগল মনে হবার কারণগুলো জানতে পারি কী?

আমার প্রশ্ন শুনে ইপ্সিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর বলল, হ্যাঁ, বলছি। ঝুমা বৌদি বলছিল, ছেলেটা সারাদিনই জানালায় পড়ে থাকে, একা একা গান গায়...

ইপ্সিতাকে কথা শেষ না করতে দিয়ে প্রবল উত্তেজিত আমি বলি, জানালায় পড়ে থাকা, গান গাওয়া – এগুলো কী পাগলের লক্ষণ নাকি?
- তুমি উত্তেজনা কমাও সন্তুদা। আমিও তোমার মতো এই প্রশ্নগুলোই করেছিলাম ঝুমা বৌদিকে।
- তো, সে শুনে কী বলল?
- বলল, দেখ, ক’দিন আগে ভোর হবার অনেক আগেই আমি আর তোমার দাদা গিয়েছিলাম একটু দক্ষিণেশ্বরে। ওখান থেকে ফিরে যখন ঘরে ঢুকছি – শুনতে পেলাম ছেলেটা গাইছে, “রাত জাগা দু’টি চোখ”...ভাবতে পারো? সে সময় ওই গানটা শুনে এত রাগ হয়েছিল যে, ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, দি’ কিছু একটা বলে। কিন্তু...
- তুই প্রতিবাস করলি না কথাটা শুনে? আর কেউ না জানুক, তুই তো জানিস গানটা আমি অন্তত ঝুমা বৌদিকে লক্ষ্য করে গাইনি।
- হ্যাঁ, বলেছি।
- তারপর?
- তারপর আর কী – উনি এরপর যেটা বললেন, সেটার কোনও ব্যাখ্যা আমার কাছেও নেই।
- কী?

আমার প্রশ্ন শুনে ইপ্সিতাকে দেখলাম নিচের ঠোঁটটাকে একবার একটু কামড়ে ধরল। তারপর বলল, আচ্ছা সন্তুদা, তুমি কি মাঝে এক রাতে একা একা ঝুমা বৌদিদের বারান্দার দিকে তাকিয়ে অমল, দইওয়ালা, লাল শাড়ি, লাল ডুরে শাড়ি – এ সব বলছিলে?
- আরে না, না, আমি ওখানে একা ছিলাম না। একটা লোক...

বলতে বলতে আমি আচমকা থেমে যাই। মনে হয়, ঘটনাটা এতটাই অবিশ্বাস্য যে, এমনকি ইপ্সিতাকেও বিশ্বাস করানো কঠিন। লোকটা নিজে না চাইলে যে তাকে আমি হাজির করতে পারব না, লোকটা যে শেষে কর্পূরের মতো উবে গেছে, সেটাই বা ইপ্সিতাকে বিশ্বাস করাব কী করে ভাবতে ভাবতেও মনে হল, একমাত্র ইপ্সিতাই আমার কথা বুঝলেও বুঝতে পারে এবং সেই বিশ্বাস থেকে পুরো ঘটনাটা দাড়ি-কম সমেত ইপ্সিতার সামনে উপুড় করে দিলাম।

আমার কথা শেষ হবার পর বুঝতে পারছিলাম না যে ইপ্সিতা আমার কথা বিশ্বাস করল কী করল না। কারণ আমার কথা শেষ হবার পরে অন্তত মিনিট দুয়েক দেখলাম ও কোনও উত্তর দিচ্ছে না। তাই গলায় অভিমান ঢেলে বললাম, ইপ্সিতা, তুইও আমার কথা বিশ্বাস করলি না?
- কে বলেছে বিশ্বাস করিনি? আমি বললাম সে কথা? আমি ভাবছি লোকটার ঝোলায় এত নাম এল কী করে।
- আরে সেই ক’বে থেকে নাম জড় করছে লোকটা...
- তাতেও অতটা ভর্তি হবার কথা না। লোকটা আবার অস্কার ওয়াইল্ডের সেলফিস জায়ান্ট, যে জানালা দিয়ে বাচ্চাগুলোকে নজরে রাখত তাকে ঝোলাটার ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়নি তো?
- হতে পারে। আমি কী করে জানব। আমি সাফাই দি’।

এরপর ইপ্সিতা ফের কিছুক্ষণ চিন্তা করতে করতে হঠাত বেশ জোরে জোরে হাসতে হাসতে বলে, হুম্‌ম্‌, পেয়েছি উত্তর।
- কী, কী উত্তর?
- আমি নিশ্চিত, লোকটার ব্যাগ ঘাঁটলে অনেক আধুনিক কবির বায়োডাটা পাওয়া যাবে।
- মানে?
- মানে আর কিছুই না – আধুনিক কবিতায় তো জানালার ছড়াছড়ি। আহা, কী লেখা, জানালা হেলান দিলে মেঘে/ গরাদে আকাশ মেশে কুয়াশার মতো/ চল আজ বৃষ্টিকে পথিক বলে ডাকি।

ইপ্সিতার বলার ভঙ্গিতে আমি হো হো করে হেসে ফেলি। আমি ভুলে যাই ঝুমা বৌদির অনুযোগের কথা, ভুলে যাই ঝুমা বৌদি আমাকে পাগল বলেছিল সেই কথাও। ইপ্সিতাকে দেখেও মনে হল, ও নিজেও ব্যাপারটা নিয়ে আর আলোচনা চায় না।

আমার ধারণাটাকে সত্যি প্রমাণ করার জন্যেই যেন ইপ্সিতা বলল, একটা ব্যাপার খেয়াল করেছ সন্তুদা?
- কী?
- অমল কিন্তু লাল খুব ভালোবাসত। লাল শাড়ি, লাল ডুরে শাড়ি, টুকটুকে বউ...বেশ রোমান্টিক ছিল ছেলেটা, তাই না?
- হ্যাঁ, ব্যাপারটা আমিও খেয়াল করেছি। আমি ইপ্সিতার কথায় সায় দি’।
- আর হ্যাঁ, সন্তুদা, এবারে “ডাকঘর” ফেরত দাও। ইপ্সিতা আচমকা অন্য কথায় ঢুকে পড়ে।

আমিও কথা না বাড়িয়ে ইপ্সিতাকে ওর “ডাকঘর” ফেরত দি’। ইপ্সিতা “ডাকঘর” হাতে নিয়ে বেরিয়ে যাবার পর আমিও আমার অভ্যেস মতো ফের জানালায় ফিরে আসি। জানালার বাইরে চোখ রাখতেই দেখি, কালুদার বাসার সামনে একটা বড় ট্রাক দাঁড় করানো। দেখলাম কালুদার ঘরের সব মালপত্র তোলা হচ্ছে সে ট্রাকে। বুঝতে পারলাম, “ওরা” এ পাড়া ছাড়ছে। খুব খারাপ লাগছিল এ’ কথা ভেবে যে ঝুমা বৌদি নিশ্চিতভাবেই শুধু আমার জন্যেই পাড়া ছেড়ে চলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে গাল পাড়ছিলাম ইপ্সিতাকে, কারণ ওর কথা শুনে মনে মনে জাল ছুঁড়তে গিয়েই তো আমি আমার এক “প্রিয়” জানালা হারালাম!

কালুদাদের মালপত্র তোলা তখন প্রায় শেষ। হঠাৎ দেখি, কালুদাদের বিদায় দৃশ্যে ইপ্সিতা এসে হাজির। আমি দেখছি ইপ্সিতা আমার দিকে পিছন ফিরে ঝুমা বৌদির হাতে-হাত রেখে কথা বলছে। বুঝতে পারছিলাম ওগুলো সব বিদায়কালীন আবেগভরা কথাবার্তা। আমি দেখছি কথা বলতে বলতেই ওরা এগিয়ে আসছে দাঁড় করিয়ে রাখা একটা ট্যাক্সির দিকে। আমি দেখছি আগে আগে ইপ্সিতা আর তার পিছন-পিছন আসছে ঝুমা বৌদি।

আমি জানালাপথে দেখছি ইপ্সিতাকে। এই প্রথম। জানালাপথে পূর্ণাবয়ব ইপ্সিতাকে দেখতে দেখতে আমার শরীরে হঠাৎ যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। এর আগে অন্তত কয়েক শ’ বার আমি ইপ্সিতার সঙ্গে মুখোমুখি বসে আড্ডা মেরেছি, খুনসুটি করেছি, সময় কাটিয়েছি - কিন্তু এই প্রথম ইপ্সিতাকে আমি জানালাপথে এভাবে খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ পেলাম। এবং সেই দেখার আবহে জানালার গরাদ পেরিয়ে আমার চোখ তখন এক অন্য ইপ্সিতার মুখোমুখি। ইপ্সিতাকে সে জানালাপথে যত দেখছিলাম ততই মনে হচ্ছিল যে, ইপ্সিতা ঠিকই বলেছিল, মুগ্ধ শ্রোতা আমি ভুল সুরে দিনের পর দিন শুধু মূল গান থেকে দূরে সরে গেছি আর ভেবেছি আমি সুরে আছি।

আর সময় নষ্ট না করে আমি চিৎকার করে ডাকতে গেলাম, ইপ্সিতা-আ-আ-আ। কিন্তু গলায় আমার তখন আবেগের ঢল, তাই আমার গলা দিয়ে কোনও আওয়াজই বেরল না। আমি দেখছি ঝুমা বৌদির সঙ্গে বিদায় পর্ব সেরে ইপ্সিতা আমাদের বাড়ির দিকেই আসছে।

আমি গলার সমস্ত জোর একত্রিত করে ডাকলাম, ইপ্সিতা-আ-আ-আ...। ইপ্সিতা আমার ডাক শুনে হাসল। বলল, আসছি।

সত্যি বলছি, আমি স্পষ্ট দেখলাম, ইপ্সিতা আসছে – “তার নাকে নোলক, তার লাল ডুরে শাড়ি”।

আপনার মতামত জানান