বিরিয়ানী

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়



-কি রে… ভর সন্ধেবেলা ঠ্যাং ছড়িয়ে, পোদ ফিরিয়ে বসে কি করছিস?
- অ্যাঁ… নাহ্… তেমন কিছু না।
- কিচু না মানে? পষ্ট দেকচি… মন দিয়ে হিসেব চলচে!
- ওই আর কি... হাতে কতো থাকল হিসেব করছিলুম। মায়ের একটা শাড়ী... বোনের একটা ফ্রক...
- আর তোর?
- বাওয়া! একটা একঘর ব্লু টিসাট দেখে রেখেছি... আর একটা ঝাকাস গগোল্‌স... আর বাকিটা মাল আর বিরিয়ানী।
- মালের ব্যবস্থা আমার!
- ব্যাস্‌... বিরিয়ানী আমার!

ভোট শেষ... দেওয়াল ফেস্টুন ব্যানার শেষ... ভাসানের আগে পর্যন্ত কোনও ক্লাব থেকে ডিউটি দেওয়ার ডাক পড়বে না আর। এ ক’দিন কোথাও ফোরেবাজী করে... কিংবা অন্য কিছু লাইন করে কামানোর চেষ্টা করতে হবে। বড় রাস্তার মার্কেটে ফ্রক-চুড়িদার সেল হয়, ওখানেই খানিক দাঁড়িয়ে গেলে হয় মান্টাদার দোকানে। কিছু সেল করিয়ে দিতে পারলে মাল আসবে। তবে মান্টাদাও ঢ্যামনা হয়ে গেছে... বাচ্চা ছেলেগুলোকে বসিয়ে রাখে। চালু চিজ্‌, বাচ্চারা টাকা বেশি চাইলে থাবড়ে দিতে পারবে। ক্লাবে ক্যারাম পেটানো ছেলেকে সেটা পারবে না। একবার বাপিদাকে চাঁদা নিয়ে অন্য পার্টির নাম নিয়ে কিছু তর্পাতে গিয়ে কান-চাপাটি খেয়েছিল। তারপর থেকে ক্লাবের সবাইকে সমঝে চলে। কিন্তু লক্ষ্মীপুজো পার হতেও এখন বেশ দেরি। ভোটের ডিউটির পর হাতে পাওয়া টাকাগুলো, আর টেলরিং-এর ছিট কাটা টাকাগুলো জড় করে বেশ অনেকটা লাগছিল। কিন্তু, বাড়িতে পাঠানো... মা... বোন... বিরিয়ানী... ভাগ করতে করতে কেমন কম কম হয়ে গেল। হাতের সামনে থেকেও যেন নেই। আবার সেই মান্টা হারামিকে তেল দিতে হবে! টেলারিং-এর মুনীরচাচা সেই মাসের শেষে আবার হাতে যা দেওয়ার দেবে। আর এই মাসে তো সালা পুজোর জন্য কাজও তেমন থাকবে না। টাকাগুলো ভাগ করে রাখতে রাখতেই কেমন থমকে গেল তপন। অবশ্য ওই নামটা চলে না বাজারে... মাধ্যমিকের মার্কশিটেই রয়ে গেছে, গ্রামের ঘরে... খাটের তলায় ট্রাঙ্কের মধ্যে। শহরের এই গলিতে রয়ে গেছে তপা। বিরিয়ানীর শেষে পড়ে থাকা খালিপ্লেটের কথা ভেবে নিজের গালেই চড় মারতে ইচ্ছে করছে এখন। বেকার লোকাল ডিউটি নিতে গেল, বাইকে হিরো হ’তে গিয়ে। এর থেকে ডিস্ট্রিক্ট-এ গেলে হাতে কিছু বেশি মাল আসত। এখন সেই জালি লোকগুলোকে ধরে...
- আরে এ তপা! একেবারে ফিউজ হয়ে গেলি যে...
বিসেনের ডাক শুনে চমকে উঠল তপা। বিরিয়ানীর টাকাগুলো হাত থেকে থপ করে পড়ে গেল মাদুরে। সব আলাদা আলাদা করে গুছিয়ে নিতে নিতে বলল, “না রে… গুছিয়ে রাখি। রোববারের মধ্যে এগুলো সব বাড়িতে সান্টিং করে দিতে হবে। আমার হাতে থাকলেই ছবি!”
বিসেন বাঙালী নয়… ওর নামও আসলে বিসেন নয়। আসল নাম যে কি তা ও নিজেই জানে না। জোড়াবাগানের বসতিতে থাকতে থাকতে কোন চাচা-মামা’র সোহাগ আর লাথি খেতে খেতে নাম বিসেন হয়ে গেছে, নিজেরও মনে নেই। তবে পাক্কা পাঞ্জাবীর মতই চেহারা। চওড়া ছাতি, লম্বা চেহারা, গালে চাপ দাঁড়ি। সর্দার সাজিয়ে দিলে কেউ খুব একটা প্রশ্ন করবে না। বাইকে করে ওর পেছনে বসে ডিউটিতে যাওয়ার রেলাই আলাদা। বুকের বোতাম দুটো খুলে বিসেন যাচ্ছে… পেছনে তপা, কপালে পট্টি, হাতে পার্টির ফ্ল্যাগ… উফ! দাঁড়ি চুলকোতে চুলকোতে মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে পড়ল বিসেন। পায়ের তলায় মাটি জমে আছে… ডিউটিতে ছিল তিনদিন, চানই করে নি। চোখের তলায় কালি। হাই তুলতে তুলতে বলল… “হ্যাঁ… পাঠিয়ে দে। আমাদের হাতে ক্যাশ বেশি না থাকাই ভাল। ফালতু বাওয়াল হোগা, নেহি তো মুন্নি বদনাম হোগি।” গত পাঁচ-ছ’দিন ধরে তপনেরও একটানা ডিউটি ছিল। দুবেলা খাওয়া ভালই পেয়েছে। কিন্তু এই রোদ-বৃষ্টির মধ্যে পাড়ায়-পাড়ায় টোটো করে ঘোরা। বাইকে বসে বসে কোমরের স্ক্রু ঢিলে হয়ে গেছে। আর দাদাদের মুখের ওপর না-ও বলা যায় না। যা টু পাইস হচ্ছে… পাতি বন্ধ হয়ে যাবে। তপার জায়গায় অন্য কেউ হিরো হয়ে যাবে কপালে ফেট্টি বেঁধে। একটা টি-শার্টও দিয়েছে পার্টির ছাপ মারা, যদিও দেখেই বোঝা যায় পুরনো মাল। তাও বেশ জার্সি জার্সি ব্যাপার। আগের পার্টি এত কিছু দিতো না নাকি… ফোকট কাজ করিয়ে নিতো আর্ধেক। “সারি রাত জাগ কর ফেস্টুন বনায়া, অগ্লে দিন মুড়ি-চানাচুর পাকড়া দিয়া!… সালাদের একটা কাজ আর করি না সালা”, বিসেন বলেছিল। কিন্তু ওই কিছু বেশি পেতে গেলে যা হয়… তপন কয়লা হয়ে গেছে ক’দিনে। হাত পা ছড়িয়ে টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল তেলচিটে বালিসটা মাথায় দিয়ে, মাদুরের ওপর। বিসেনের পায়ের তলায় জমে থাকা মাটি দেখতে ইচ্ছে করছে না, তাই সিলিং-এর দিকে চোখ। বিসেন অন্য ডিস্ট্রিক্টে গেছিল, সেখানে কোথায় রড ঢুকল আর কোথায় বাঁশ… সেই নিয়ে নিজের মনে বলে যাচ্ছে। জামা খুলে ঘামে ভেজা শরীরটা নিয়ে ধপাস করে মেঝের ওপর শুয়ে পড়ল পার্টির সবাইকে উদ্ধার করতে করতে। তপনের এসব পোষাচ্ছে না আর। আলোটা বিসেনই নেভাবে, না নেভালে ছেঁড়া গেল। সিলিং-এ তখন শাড়ীর ডিজাইন, ফ্রকের রঙ খুঁজছে তপন। নিচের টিভি সারানোর দোকানটা বন্ধ করে ছেলেটা শাটার নামিয়ে দিয়েছে অনেকক্ষণ আগে। কিন্তু হারামখোর রাতে একা একা কেবিল লাগিয়ে টিভি দেখে… টিভির দোকানে থাকার হেব্বি মস্তি। গান চলছে, “বিজলী থেকে খোকা বিড়ি জ্বালায়… সেই বিড়ির ছাই সবাই হাত পেতে নেয়”। বিজলী… বিজলী… বিজলী… সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঘুরছে। পুজোর মধ্যে একদিন বিজলীর কাছেও যেতে হবে। অনেকদিন যাওয়া হয় নি। তারপর বিরিয়ানী। বিরিয়ানীর সঙ্গে বিজলি মেখে খেতে খেতে ঘুম পায়… বালিশের পাশে পড়ে থাকা ফোকলা মানি ব্যাগ, আর মেঝেতে পড়ে থেকে বিসেন। তপনের তন্দ্রার নিচ থেকে থেকে উঁকি দিয়েছে ওর পরিচয়পত্র, যাকে শহরের বাবুরা ভোটার আইডি বলে।

--- --- --- ---

বিসেনের কোনও ভোটার আইডি নেই। পরিচয় পত্রই নেই। কাকে ভোট দিলো জিজ্ঞেস করলে বিসেন হা হা করে হাসে… বলে “ক’টা দিলাম জিজ্ঞেস কর বেএএএ…” আসলে কে কোথায় জিতল হারল তা নিয়ে বিসেনের কোনও মাথা ব্যথাই নেই কোনওদিন। ও জানে, ওর চেহারায় একটা রেলা আছে… বাইক নিয়ে ঘুরলে বা সামনে দু-পা এগিয়ে এসে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালে অন্যের চোখে ভয় দেখা যায়। পাঁচ ফুটের মালগুলো বিসেনকে দেখেই চুপচাপ পেছনে সরে যায়। আর লিডারদের ডানহাত-বাঁহাতরা এগুলো জানে বলেই বিসেনের ডাক পরে সময় মত। কেশু, বাপ্পি, সেলিম… সবাই থাকলেও, বিসেন একটা আলাদা জোর। দশটা নতুন ছেলেকে নিজের মত কন্ট্রোলও করে নিতে পারে। দূরের ডিস্ট্রিক্টে পাঠিয়ে দিলো তাই… তবে হাতে মাল-করি ভাল এসেছে। চসমখোর নয়। আগের বার ডিউটির অনেকটা টাকা সালাম-এর বউকে দিয়ে দিতে হ’ল। সালাম মুম্বাই পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে ওদের দেখার কেউ নেই… তিন বছরের ছেলেটার হঠাৎ তরকা উঠে গিয়ে যমে-মানুষে টানাটানি। টাকাগুলো খসে গেল প্রায় সব, সামনের নার্সিং হোমে নিয়ে যেতে হ’ল। বিসেন-এর এক ডাকে ছকু আর বিল্টু চলে এসেছিল নার্সিং হোমে। রিসেপশনের সাজুগুজু মামণি সালামের বউ আর বাচ্চাকে দেখে নাক কুঁচকলেও বেশি কিছু বলার সাহস পায় নি। বাচ্চাটা বাঁচতই না, সময় মত বেড-এ না ফেললে। এই যে বিসেন হঠাৎ করেই এত দৌড়-ঝাঁপ করল, সালামের বেওয়া মা-কে পাত্তা না দিয়ে সালামের বউ আর বাচ্চাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল… ডিউটির সব টাকা ঢেলে দিলো; সালামের বউ চুপচাপ দেখল। ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে কাঁদছিল আর আর দোপাট্টা দিয়ে বাতাস করছিল শুধু। অবশ্য পরেও এই নিয়ে কিছু বলনি। বলবেই বা কি? গত বছর ইলেকশনের আগে সালাম হাওয়া হয়ে গেছে, তারপর থেকে কোনও পাত্তা নেই… দেড় বছর হয়ে গেল। পাতি লা-পাতা কেস্। সেলাই মেশিন-এ বোরখা আর সালোয়ার বানিয়ে দু’বেলা চলে এখন। সালাম-এর মা’র রসুলের ওপর ভরসা… রসুল ফিরিয়ে আনবে ছেলেকে ঠিক। কোরান জড়িয়ে বসে থাকে সারা দিন। আর সালামের বউ কে গাল দেয় নষ্টামির জন্য। সালামের বউ শ্বাশুরীকে কিচ্ছু বলে না, যেন শুনতেই পায় না কথাগুলো। সেলাইমেশিনে পা চলতে থাকে আরও দ্রুত। ছেলে নার্সিং হোম থেকে ফেরার পর বিসেন মাঝে মাঝে এসে দেখে যায়। শাপ-শাপান্ত করে সালামের মা, এদিক-ওদিক লোকজন একে-ওকে কনুই দিয়ে গুঁতিয়ে ইশারা করে… “ওই এলো!”; কিন্তু বিসেনের কাছে ঘেঁষতে সাহস পায় না। একবার কেউ একটু বেশি জোরে বলে ফেলেছিল, “এইজন্যেই বলেছিলুম, সালামের মা… ও মাগীকে বাপের বাড়ি ফেলে আয়”। বিসেন তার দিকে তাকাতেই সেখান থেকে টুক করে কেটে পড়ল। ভাল-খারাপ কেউই বিসেন-কে কিছু বলে না। সালামের বউও কিছু বলে না। ও হ্যাঁ, সালামের বউয়ের একটা নাম আছে… বেশ লম্বা নাম, শাশুড়ি থেকে শুরু করে পাড়ার অন্যরা সবাই হাফিজা বলে ডাকা। বিসেন আগে ভাবি বলত, এখন আর তা বলে না। হাফিজা কিছুই বলে না।

তপা সকাল সকাল বেরিয়ে গেছে... নিজের ধান্দায়। কাজের ছেলে, ঘরে বসে থাকে না, আর পার্টির হাওয়ালেও পড়ে থাকে না। অল্প বয়স, মা-বোনের জন্য জান দিয়ে খাটে ছেলেটা... দেখতে ভাল লাগে বিসেনের। জান দিয়ে খাটার কেউ নেই বিসেন-এর। বিন্দাস জীবন। আস্তে আস্তে জিন্সের পেছনের পকেট থেকে টাকার বান্ডিলটা বার করল বিসেন। পাঁচশ একশ মিলিয়ে... ভালই হবে। পকেটটা টাইট হয়েছিল, বের করতে গিয়ে ওপরের একটা নোট একটু ছিঁড়ল। কাল রাতে আর বের করা হয়নি। কাল রাতের কথা মনে পড়তেই তপা’র বিরিয়ানীর হিসেব মনে পড়ে গেল। তখন নেশার ঘোরে কত কি বলেছে বিসেন... মাল, বিরিয়ানী, মাগী। তপা সামনে থাকলে জিজ্ঞেস করত, কি কি বলেছে। বিসেন এমন অনেক কিছু বলে মাঝে মাঝে আউট হয়ে গিয়ে। একবার নাকি এক পার্টির দাদার ওপর খার খেয়ে তাকে টপকে দেওয়ার ফুল প্রুফ প্ল্যান শুনিয়ে গেছিল তপাকে সারা রাত জেগে। পরদিন সকালে তপা ততক্ষণ বসেছিল ঘরে বিসেনের পাশে যতক্ষন না বিসেনের ঘুম ভাঙে... একা ছাড়েনি। ঘুম ভাঙতে বিসেনকে জিজ্ঞেস করেছিল... আগের দিনের প্ল্যানের কথা, বিসেনের কিচ্ছু মনেই পড়ল না। তপাকে খিস্তে সিগারেট মুখে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেছিল... পেটে চাপ পড়ছে বলে। টাকাগুলো হাতে নিয়ে বিসেনেরও তিন ভাগ করতে ইচ্ছে হ’ল... হাফিজা, সালামের... না হাফিজার ছেলে, আর বিরিয়ানী। হাফিজার শাড়ী ভাল লাগে কি না তাও বলেনি। কিছুই বলে না। যেদিন জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছিল বিসেন, সেদিনও চুপ। বারণও করল না, বাধাও দিলো না, খুব একটা সারাও দিলো না। ওই নাগিন শাশুড়িকে কালটি দিয়ে যেদিন বিসেনের সঙ্গে বাইকে করে গেল, সেদিনও খুব একটা কথা বলছিল বলে মনে নেই। বিসেনকে ওপরে সহ্য করতে না পেরে একবার দু’বার হয়ত ‘উহ্‌’ বলেছিল। আর চিৎ হয়ে পড়ে থেকে পাশ ফিরে বিসেন দেখেছিল, হাফিজার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল। এর বাইরে বিশেষ কোনও কথা হয়েছিল কি না মনে নেই। ভাল লাগার কথা সে ভাবে জানাই হ’ল না। হাফিজার কি বিরিয়ানী খেতে ভাল লাগে? যখন নতুন নতুন সোনাগাছির রাস্তা চিনেছিল, কেউ জিজ্ঞেস করলে বলত “বিরিয়ানী খেতে যাচ্ছি”... মনে পড়তে একাই হা হা করে হেসে ফেলল বিসেন। বাইরে অনেক বেলা হয়ে গেছে। ঘরে রোদ এসে পড়ছে। মেঘ ভাঙা রোদ্দুর, শরতের আকাশ, কাশফুল, মহালয়া... এসব বিসেন বোঝে না। চোখের পিচুটি কচলাতে কচলাতে বাসিমুখে হাই তুলে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। বেড়াল-মা’টা তুলোর মত কমলা বেড়াল-ছানাটাকে রোদে বসে জিভ দিয়ে চেটে চেটে পরিষ্কার করে দিচ্ছে। ওদের দেখেও বিসেনের হাসি পেলো... ওর হলুদ টিশার্টের বুকে লেখা বিগ ক্যাট।

--- --- --- ---

বিজলী বলেছিল পুজোর আগে একবার আসতে, কিন্তু হয়ে ওঠেনি। না টাকাটা ব্যাপার নয়... বিজলীর সঙ্গে টাকার রিশ্তা নয়। যদিও রিশ্তা কথাটা শুনলেই বিজলী খিলখিল করে হেসে ওঠে। চুমকি লাগানো বেগুনী শাড়ীর আঁচলের ওপারেও সেই হাসির দোলা লাগে। দু’হাতে সেই দোলা থামায় তপা। এই চুলোর ডিউটিতে ফেঁসে গিয়ে আর অন্য কিছুই পারেনি এই ক’দিন। বাড়িতে টাকা পাঠানোর কাজটা শেষ করে অনেকটা হাল্কা লাগছে। আজ পঞ্চমী, মায়ের শাড়ী আর বোনের ফ্রক সময় মত দেওয়া হয়ে গেছে। পুজোর সময় গ্রামে থাকা হ’ল না বলে মায়ের চোখটা একটু ছল ছল করছিল... মুখের দিকে তাকাচ্ছিল না মা, ভাব দেখাল ঘরের কাজে ব্যস্ত। তার মধ্যে বোনটা ফালতু ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ ঘ্যান ঘ্যান করে ঝাড় খেলো বেকার। কিন্তু পুজোয় শহরে না থাকলে চলবে কি করে? পাড়ায় তো থাকতেই হবে! ক্লাব থেকে ভলেন্টিয়ার হতে হবে, চার দিন হেব্বি ভিড় হবে, ম্যানেজ দিতে হবে সব। নাইটও করতে হতে পারে। তারপর বিরিয়ানি! চন্দননগর পার করে, লোকালে হাওড়ার দিকে ফিরতে ফিরতে লাইনের ধারে একটা বেগুনী রঙের শাড়ী পরা সুন্দরী বউয়ের ছবি দেওয়া বিজ্ঞাপন দেখে কিছুক্ষণ হাব্বা হয়ে রইল তপা। তারপর হাওয়া খেতে খেতে হঠাৎই হিসেবে একটা ভুল আবিষ্কার করল। বিজলীর জন্য তো কিছু কেনা হ’ল না! বিসেনের থেকে শেখা কিছু পশ্চিমা খিস্তি দিলো নিজেকে পর পর, ট্রেনের দুলুনির তালে তালে। আজ হিরোইন আসবে বিকেলে... সন্ধের মধ্যে প্যান্ডেলে ভিড় জমে যাবে, রাতে দেখতে না পেলে পল্টুদা ফালতু বাওয়াল দেবে। বড় হনু হয়েছে, আজকাল পার্টি অফিসে বসছে, সাদা পাঞ্জাবী পরে থাকে। ওর জন্য এখন পার্সেল আসে বিরিয়ানী আর হুইস্কি। বিজলীও বিরিয়ানী খেতে ভালবাসে। তপা খাইয়েছিল একবার। সঙ্গে করে নিয়ে গেছিল। প্যাকেট থেকে গন্ধ বেরোচ্ছিল। গলির মোরে মাসি চোখ মেরে বলেছিল... “একা একা খেতে নেই!” কিন্তু ও বলেছিল, ঘরে বসে না... একদিন বাইরে কোথাও দু’জনে একসাথে খাবে। বাইরে কোথাও... অন্য কোথাও... দূরে। তপা জানে, বিরিয়ানী খাওয়ার টাকা জমানোর থেকেও তা কঠিন কাজ। কিন্তু বিজলীর জন্য যে একটা শাড়ী কেনা হ’ল না... সেই টাকাটা সরিয়ে রাখতে হ’ত... এহ্‌, খুব জালি কাজ হয়ে গেল এটা।

বিসেন মনে করে কিনেছিল শাড়ীটা। পঞ্চমী-ষষ্ঠির হিসেব নিয়ে ওর মাথা ব্যথা নেই। সময় কর কিনে নিয়েছে। শুধু শাড়ীই কিনল, ছেলের জামার মাপটা ঠিক বুঝল না... ওটার টাকা আলাদা করে দিয়ে দেবে। গত দু’দিন মদ খায়েনি, আজ সকালে দাঁড়িটা কামিয়েছে। কেচে ইস্ত্রি করিয়ে রাখা শার্ট-টা বার করে বাইকে উঠে বসল বিসেন। সামনে প্যাকেটটা রেখে। বিসেন কে এত ভদ্দরলোক পাড়ার কেউ আগে দেখেনি। ছেলেটার জন্য একটা কিছু কিনলে ভাল হ’ত… ক্যাবলার মত তাকিয়ে থাকবে। কিন্তু ও নিয়ে বেশি চাপ নিতে পারছে না বিসেন। এমনিতেই সালামের মা’টা বাওয়াল করবেই একটা। যত কম অশান্তি হয় তত ভাল। হাফিজা তো কিছুই বলবে না। বিসেন যদি প্যাকেট দেওয়ার সময় একটু হাসে… তাহ’লে কি হাসবে? যদি বলে পরে দেখো কেমন লাগছে… তাহ’লে? হয়ত শাড়ী পরবেই না। আদৌ শাড়ী পরে হাফিজা? কখনও ওকে শাড়ী পরতেই দেখেনি বিসেন… সেটাও মনে পড়ল এখন, সালামদের পাড়ার কাছাকাছি এসে গিয়ে। সালামদের চালের সামনে পৌঁছতেই থমকে গেল বিসেনের চিন্তাগুলো… বাইকের ইঞ্জিনটা বন্ধ হয়ে গেল। মাথায় ফেজ, চোখে সুরমা টানা। চেহারা দেখেই বোঝা যায় আরব-সাগরের হাওয়া-বাতাস লেগেছে। শিখর খাওয়া দাঁত বের করে হেসে হেসে আম্মির সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে তার বাপজান সালাম। ফিরে এসেছে। সালামের মা সোজা বিসেনের চোখে দিকে তাকালো, একেবারে সাপের মত… ছেলের মতই পান খাওয়া দাঁত বের করে বলল – “রসুলের মেহেরবানী সে মুর্দাও জিন্দা হয়ে যায়… বুঝলি কুত্তা?... থুঃ!” পানের পিকটা পড়ল বাইকের টায়ারে ওপর।
বিসেনকে হাড়ে হাড়ে চেনে সালাম… মা-কে হালকা ধমক দিয়ে চুপ করতে বলে বিসেন এর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, “ক্যায়া হুয়া ভাইজান?” কিন্তু সালামকে দেখতেও পাচ্ছিল না বিসেন। পেছনে সেলাই মেশিনে পা চলছে দ্রুত, হাফিজা সেলাই করে যাচ্ছে এক মনে… একটা কথাও বলছে না। বাইকটা ঘুরিয়ে নিলো বিসেন… প্লাস্টিকে শাড়ী রয়েছে, বেকার জিনিস… পেটো থাকলে কাজে আসত। বাইকটা যতটা জোরে শব্দ করতে পারে করল… সেলাই মেশিনের ওই আওয়াজ অসহ্য লাগছিল বিসেনের।

পঞ্চমীর উদ্বোধন, মাইকের অ্যানাউন্সমেন্ট, ক্লাবের দাদাদের হম্বিতম্বি, ডানহাত – বা’হাতদের পাঞ্জাবীর গন্ধ… হিরোইনের স্লিভলেস ব্লাউসের হলকা আর পারফিউমের ঝটকা কাটিয়ে তপা যখন ঘরে ফিরল, তখন ঘরের দরজা খোলা… ঘরটা অন্ধকার। আলো জ্বালিয়ে দেখল একটা শাড়ী দলা পাকিয়ে ঘরে মেঝেতে পড়ে আছে… এদিক ওদিক ছেঁড়া… ফর্দাফাই। বিসেন নেই... সে তো মাঝেমধ্যেই থাকে না। শাড়ীটা পা দিয়ে ঠেলে শুয়ে পড়ল তপা, ঘরের দরজাটা বন্ধ করে। বিরিয়ানীর গন্ধ নাকে লেগে আছে এখনও... আআআহ্‌!

--- --- --- ---

পুজোর ক’দিন বিসেনের কোনও দেখাই পাওয়া গেল না। পার্টি থেকে এমন কোনও প্ল্যান নেই যে বাইরে ডিউটি পড়বে এই সময়। হ’লে তপনের কানে ঠিক যেতো। মাঝে মাঝে কোথাও ক্যাচাল হ’লে বিসেনকে শেল্টার নিতে হয় অন্য কোথাও। সেরকম কোনও কেস খেলো কিনা কে জানে। কিন্তু তিন-চার জনকে জিজ্ঞেস করে তেমন কোনও কেসের কথা বার করতে পারল না তপা। বিসেন ওর থেকে সিনিয়র। বেশি এসব জিজ্ঞেস করলে নিজেই কেস খাবে, তাই চেপে গেল। আর পুজোর মধ্যে ভুলেও গেল, ওই লাইনের দড়ি নিয়ে হম্বি-তম্বি করতে এখনও একঘর লাগে তপা’র। রোদের মধ্যে হয়রানি নেই, ফালতু বাওয়াল নেই। লোকজনকে যা বলবে একদম ভদ্র ভাবে লক্ষ্মী ছেলের মত শুনবে। থামিয়ে দিলে থেমে যাবে… এগোতে বললে এগোবে। বউদিদের আগে ছেড়ে দিলে একটা সুইট স্মাইল ফ্রি। সত্যিই ঘোরের মধ্যে কেটে যায় কেমন চারটে। রাতের দিকে দু-পেগ খেয়ে ম্যানেজ করতে আরও হ্যাল লাগে… মানে আরও ভাল্লাগে। তবে নবমীর বিরিয়ানীটা খায়নি তপন, অষ্টমীর দিন শুধু খিচুরি আর লুচি-ফুলকপির তরকারি খেয়েছে। বিরিয়ানীটা এরপর বিজলীর সঙ্গেই একসাথে খাবে।
একাদশীর দিন ভাসান হবে বলেই বিকেলের পর পাতলি গলি নিয়ে সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে এলো। টিভি সারানোর দোকানটা নিচে বন্ধ। সন্ধে হয়ে এসেছে, আটটা বাজলেই জেনারেটরের শব্দ শুরু হবে... বোলো দুর্গা মাই কি! দরজাটা খোলা, ভেতরে আলো জ্বলছে। বিষ ছেলে বিসেন, মাল খেতে ঠিক বিসর্জনের সময় হাজির হয়েছে। চটপট সিঁড়ি দিয়ে উঠেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল তপা। মাদুরের ওপর বোতল নিয়ে খালি গায়ে বসে আছে বিসেন... সেই বিশাল চেহারা, সামনে চিলি চিকেনের টুকরো ছড়ানো আর একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট। কিন্তু বিসেন একা নয়, পাশেই বিজলী বসে... চিলি চিকেনের একটা টুকরো এখনও ওর হাতে। মুখ ফেলতে যাবে, তখনই তপা দরজার সামনে এসে গেছে। হাসিটা আসতে আসতে ফিকে হচ্ছে, ঠোঁট দু’টো কাঁপছে। তপা অস্ফুটে শুধু বলল, ‘বিসেন!’। গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছিল না। মাথাও একদম খালি হয়ে গেল। বিসেন ওর দিকে ফিরে তাকালো, তখনও হাসছে। তপনকে দরজার কাছে থমকে যেতে দেখে বলল... “বিসেন... বিসেন কি? মাগীবাজ, বউদিবাজ... না রেন্ডিবাজ?... কি বিসেন?” বলতে বলতেই উঠে দাঁড়ালো বিসেন। উঠতে গিয়ে সামান্য টলে গেল... গলার আওয়াজও জড়ানো। পুরো আউট! আবার খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি ফিরে এসেছে মুখে... চোখ লাল। কোনওরকমে শার্ট-টা গলিয়ে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে এলো। তপাকে হাতের আলগা একটা ঠেলা দিয়ে সরিয়ে দরজার বাইরে এসে দাঁড়ালো বিসেন। সেই আলগা ঠেলাতেও তপা দরজার পাল্লায় ধাক্কা খেল। বিসেনের দিকে তাকিয়ে আছে তপা, বোল্ড হওয়ার পর যেমন ব্যাট্‌সম্যান একবার উইকেট-টা দেখে তারপর বোলার এর দিকে তাকায়। বিসেন ওর পাঞ্জাবী-কড়া পরা থাবার মত হাতটা তপার কাঁধে ফেলে বলল, “তুই বাপের জম্মেও এই মাগীকে ওখান থেকে নিকালতে পারতি না... দম নেই! কেলিয়ে বদন বিগরে দিতো তোমার! বুওয়েচো! আমি মোটা অ্যাডভান্স ফেলে ওঠালাম।” তপন তখনও পাথরের মতই দাঁড়িয়ে ছিল, ওকে ধরে একটা ধাক্কা মেরে ঘরের মধ্যে ঠেলে দিলো বিসেন। হুমড়ি খেয়ে মাদুরের ওপর পড়ল তপন। বুঝতে পারছিল, পার্টির নামে বাইকে করে ঘোরা তপা আসলে এখনও কতটা দুর্বল। “ফাস্ট সোচা সালাম কো খালাস করতে হ্যায়... ফির লগা উস বুড়িয়া কো... ফির সোচা হাফিজা কো হি... সালি ছিনাল! কি জানিস? যাকেই মারি... অগ্‌লে দিন ফির কোনো খানকির ছেলে জাত নিয়ে ভোটবাজী শুরু করবে। আমার ভোট নেই... ভোটার কার্ড নেই। তোদের আছে, তোরা মর!” টলতে টলতে... সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল বিসেন। বিজলী ততক্ষনে তপার কাঁধটা শক্ত করে ধরেছে। তপা কোনওরকমে গলায় জোর পেয়ে বলল “কি হয়েছে... বিসেন? এত লোড নিয়ে ফেললি কেন?” উঠতে যাচ্ছিল তপা, বিঝলী শার্টের কাঁধটা খামচে ধরল, উঠতে দিলো না, চোখের ইশারায় বারণ করল। সিঁড়ির কাছে থমকে দাঁড়িয়ে বিসেন একবার ‘হুঁহ্‌’ করে একটা শব্দ করল... বোধহয় হাসল, তারপর বলল “সবার কামাইয়ের হিস্‌সা হয় না, বুইলি!... প্যাকেটে বিরিয়ানী আছে, একদম গরম! তোরা খা! যত খুশি খা... আমিও আজ বিরিয়ানী খাবো, হুলিয়ে খাবো... হা হা হা হা হা” হাসতে হাসতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল বিসেন। দূরে গোঁ গোঁ করে জেগে উঠল জেনারেটরের শব্দ। মাইক-এর আওয়াজ – “আমাদের পুজো মণ্ডপে... মায়ের বরণ অনেকক্ষণ আগে শুরু হয়ে গেছে...”
তপা কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। কেমন সিনেমার মত লাগছে সবকিছু। বিজলী বিরিয়ানীর প্যাকেটটা এর মধ্যে খুলে ফেলেছে... বিরিয়ানীর গন্ধে চমকটা ভাঙল, খিদে খিদে পাচ্ছে এবার... আআআহ্‌!

আপনার মতামত জানান