নিজস্বী

সরোজ দরবার


জামার ভিতর হাত ঢুকিয়ে রুমাল দিয়ে খসখস করে বগল ঘসছে লোকটা। খসখস শব্দটা যে অদিতি শুনতে পাচ্ছে তা নয়। হয়ত হচ্ছেও না। কিন্তু কানে বাজছে। এরকম কাজ কি সে নিজে কখনও করেছে। বাসে নয় অবশ্যই। বাড়িতে। ছেঁড়া ঘুমে। কিংবা টিভি দেখতে দেখতে, আনমনে। নয়ত এই খসখস শব্দটা তার মনে হচ্ছে কেন। অদিতি কিন্তু মনে করতে পারল না এরকম সে কবে করেছে বা আদৌ করেছে কি না। জীবনে কত কিছু যে মনে থাকে। এই তো বিয়ের তারিখটা দিব্যি মনে আছে। বাপনের জন্মদিনটাও। আর বাপন কেন, খেয়াল করল অদিতি, বাপনের বাবার জন্মদিনটাও মনে আছে। দিনক্ষণ ডিটেইলসে মনে আছে, অথচ প্রতিদিনের কতকিছু যে বেমালুম ভুলে যাচ্ছে। যেমন এই ব্যাপারটা।
কেন যে ঘড়ঘড়, খড়খড় নয়, খসখসই মাথায় এল জানে না অদিতি। কিন্তু এতক্ষণে তার গা ঘিনঘিন করছে। এসি বাস। জানলাগুলো বন্ধ। বাটির মতো ফ্যানগুলো চলছে, একটা তার মাথার উপরেই, তবু যেন সাফোকেটিং লাগছে। লোকটা এবার ডান বগল থেকে হাত বের করে, রুমালটাকে বাঁ হাতে নিয়ে, ফের জামার ভিতর হাত ঢোকাল। আবার খসখস। ভদ্রলোকের মুখোমুখিই বসে আছে অদিতি, কিন্তু ওঁর তাতে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। এমনিতে জানলার বাইরের দিকেই তাকিয়ে আছে অদিতি। কিন্তু দৃষ্টিরও একটা পরিধি থাকে। তার ভিতর সবকিছু নজরে আসে, অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলেও। ম্যাজিসিয়ানরা এটাকে কাজে লাগান। হাতের কারসাজিগুলো তাঁরা এর বাইরেই করেন। ফলে সামনে তাকিয়েও মানুষ কিচ্ছু দেখতে পায় না। কিন্তু লোকটা আর তার কীর্তি অদিতির নজরে দিব্যি আসছে। আচ্ছা বগল চুলকানো বা ঘসা, হোয়াটএভার মে বি, ওটাকে কি কীর্তি বলা যায়? কে জানে বাবা! গিনেস বুকে এরকম ক্যাটেগোরি আছে বলেও তো সে কস্মিনকালে শোনেনি। তবে সব কীর্তি যে গিনেসবুকে থাকতে হবে, তারই বা কে মাথার দিব্যি দিয়েছে!
কিন্তু ওই অন্যদিকে চেয়েই অদিতি দেখতে পাচ্ছে, লোকটা এবার যা করছে তা নিঃসন্দেহে কীর্তিই বটে। লোকটার জামার বুকের একটা বোতাম এতক্ষণ খোলাই ছিল। এবার বাকি বোতামগুলোও খুলে ফেলছেন। জামাটাই খুলে ফেলবেন নাকি? হ্যাঁ তাই তো। খুলেই ফেললেন। ভেজা সপসপে জামা। পরিপাটি করে মেলে দিলেন সিটের পিছনে। তারপর গা এলিয়ে উপরের দিকে মুখ করে হাওয়া খেতে লাগলেন। কলপ করা চুলগুলো ফরফর করে উড়ছে। কীরকম পুরনো অমিতাভ বচ্চনের স্টাইলে চুল কাটা। বয়স কত হবে, অদিতির অনুমান, খুব বেশি হলে পঞ্চাশ। আচ্ছা লোকটার কি কোনও অসুখ আছে? হার্টের রোগ! হয়ত অনেকটা দৌড়ে এসে বাস ধরেছেন। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ভাবতে ভাবতে দৃষ্টি ফেরাল অদিতি। ফেরাতেই চোখাচোখি হয়ে গেল আর এক মহিলার সঙ্গে। তিনি ভদ্রলোকের সিটের ঠিক উপরেই বসেছেন। এসি বাসগুলো এমন গড়ন, মনে হচ্ছে যেন মহিলা সিংহাসনে বসে আছেন। আর তার চরণতলে ভদ্রলোক বধ হওয়ার পূর্বে অসুরের মতো চোখ বুজে পড়ে আছে। অদিতির হাসি পেল। বুঝল, পুজো শপিংয়ে যাচ্ছে তো, তাই দূর্গা, অসুরের উপমাটাই মনে পড়ে গেল। আচ্ছা তার ঠোঁটে কি একচিলতে হাসি খেলে গেল এ একথা ভেবে? নইলে উপরের ভদ্রমহিলার চোখে অমন কৌতুক ঝিকঝিকিয়ে উঠল কেন? আচ্ছা ভদ্রমহিলা লোকটির বউ নয় তো?
চোখ নামিয়ে নিল অদিতি। তখনই টের পেল, এই এসির মধ্যে বসে কখন যেন সে ঘামতে শুরু করেছে সে। ফ্যানগুলোয় হাওয়া হচ্ছেনা নাকি? নাকি সিন্থেটিক মেশানো সালোয়ার পরাটাই ভুল হয়েছে। ইনারের ভিতর সরু ঘামের স্রোত টের পেল সে। কিন্তু কিছু করার তো নেই। সে তো আর লোকটার মত ফস করে জামার ভিতর হাত ঢুকিয়ে খসখস করে রুমাল ঘসতে পারবে না। আর জামা খুলে ফেললে...। নিজের আজগুবি চিন্তাতে নিজেই হেসে ফেলল অদিতি। মনে মনে। হাসিটা নির্ঘাৎ মুখেও ফুটে উঠেছে। দেখল, উপরের ভদ্রমহিলাও হাসি গোপন করে মুখ ঘুরিয়ে নিল। ভাগ্যিস লোকটা চোখ বুজে আছেন। নইলে যে কী ভাবত!
২)
সানি লিওনের নামটাই শুধু জানে বাপন। কী একটা সিনেমার পোস্টারে দেখেছিল। একবার হইচইও হয়েছিল, মনে থেকে গিয়েছে। সিনেমার নামটা কী, এই মুহূর্তে মনে করতে পারল না। ছবির বাকি মহিলাগুলোর নাম সে জানে না। চশমা চোখে মহিলা বিগ বসে আসবে বলে একবার নেটে দেখেছিল বটে। এর নামটাও মনে নেই। আর নাম দিয়ে হবেটাই বা কী। চটপট ছবিগুলোকে সে খাতার ভিতর থেকে বাইরে বের করে ফেলল। তারপর এক এক করে সাজাতে লাগল বিছানার উপর। সাজাতে সাজাতে একটু একটু হাসল বাপন। এরা সব কোন দেশে থাকে কে জানে। চন্দনও জানে না। এসব ওরই কালেকশন। ব্যাটা বলে কী, নেট থাকলে আজ কী না হয়। বাপন জানে, কী ছাতার মাথাটি হয়। তাদের বাড়িতে নেট আছে। তাতে কী আর এসে গেল! সে কি সবকিছু ব্রাউজ করতে পারে, ডাউনলোড তো দূরের কথা। একটা অ্যান্টিভাইরাসেই কেল্লাফতে। সব বাবা-মা’র বেছে দেওয়া সাইট। কতকিছু নিয়ে প্রটেস্ট হয়, মুভমেন্ট হয়, প্যারেন্টাল কন্ট্রোলের মতো এরকম ইম্পোজ ব্যাপার নিয়ে কেন যে কিছু হয় না! কান্ট্রি ডেমোকেট্রিক তো নাকি রে বাবা! ওহ, বাপনের মনে পড়ল, সে তো এখনও ভোট কাস্ট করে না। সে ডেমোক্রেসির পার্টই তো নয়। ধুর ছাতা! আপাতত তাহলে তার কিচ্ছু দেখার জো নেই।
অথচ চন্দনের ঘরে কিন্তু সব সাইট খোলা। ওর বাড়িতে গিয়েই এক আধবার ভিডিও দেখেছে সে। ছোট্ট ক্লিপ। চন্দনটা একেবারে ফ্রি। দাদার প্রিন্টার থেকে ছবিগুলো কালার প্রিন্ট বের করেছে। যদিও কালি খরচ ধরতে পাড়লে দাদা ‘কেলাবে’, চন্দন বলছিল, কিন্তু তার আগে তো ব্যাপক ফান। বাপনের কপালে সে সুখ নেই। এই চন্দন একদিনের জন্য দিয়েছে এই যা! তবে হ্যাঁ, নিউজ সাইটগুলো তো আর আটকানো নেই। মা-বাবাই দেখে। ফাঁক পেলেই বাপন এন্টারটেইনমেন্ট ক্যাটেগোরিতে ঢুকে পড়ে। সব হট পিকস। সব্বার। একটাও নিউজ দেখে না সে। কী হবে ওসব পড়ে। সে শুধু টুকটুক করে গ্যালারি ঘুরে বেরিয়ে আসে।
এখন বাপনের সিঙ্গল খাট জুড়ে ছড়িয়ে আছে সব মহিলারা। সব ন্যুড, নয় সেমি ন্যুড। তাদের ব্রেস্টের দিকে তাকাল বাপন। এতটা ফ্ললেস সার্কল সে খালি হাতে আঁকতে পারত না। ন্যুড মহিলাদের ব্রেস্টগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে সে। তারপর দৃষ্টি নামাল নীচের দিকে। পেলভিক হেয়ারের ব্যাপারটা চন্দন বলেছিল। ওটাও নাকি ডেমোক্রেসির মতো, বড় না হলে অ্যাচিভ করা যায় না। আর সে তো মোটে ক্লাস সিক্স। বাইরে দুপুর পড়ে আসছে। বাপন মনে মনে ভাবল এখন যদি পাড়ার রাস্তায় এই মহিলারা হেঁটে যায়, তবে কেমন হয়! ধুর এরা কী করে হেঁটে যাবে? এরা তো কোন না কোন দেশে থাকে। পাড়ায় কে হাঁটতে পারে? টুকটুকিদি, শ্রীপর্ণাদি, জিতুর মা, শ্যামলি আন্টি, সুলেখা আন্টি, তানিয়াদি, খিল্লিদি। বাপন বুঝে নিল, ওদেরও প্রত্যেকের এরকম ফ্ললেস বিগ সার্কলের মতো ব্রেস্ট আছে। গারমেন্টসের উপর থেকে বোঝা যায় না। খুলে দিলে এরকমই হত। ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে সে সেটা কল্পনাও করে নিল। আসলে যা হচ্ছে, মুখটাই টুকটুকিদির থাকছে, ফিগারটা হাতে ধরা একটা ছবির মহিলার, যার নাম জানে না বাপন। অতএব সে তার নাম দিয়ে দিল টুকটুকিদি। এরকম করে খিল্লিদি, তানিয়াদি সবাইকেই ভেবে ফেলল সে। ভেবে বিছানায় একবার গড়াগড়ি দিয়ে নিল। তারপর ছবিগুলোর উপর শুয়ে পড়ল। সেদিন গ্যালারি ভিজিট করতে গিয়ে কোনও একটা সিনেমার বোল্ড সিনের নিউজে যেরকম পোজের ছবি দেখেছিল সে, সেরকম করেই ছবিগুলোর উপর শুয়ে পড়ল। মা আজ শপিংয়ে যেতে বলছিল, ভাগ্যিস যায়নি। এইভাবে শুয়ে পড়ায় কেন যে এত আনন্দ হয়! চন্দন বলছিল, এটা আরও ভাল রিয়েলাইজ করা যাবে, কিন্তু সেই বড় হওয়ার চক্কর। চন্দন যে এত কী করে জানে! আসলে, বাপনের মনে হল, সব সাইট দেখতে পায় কি না, জানবেই তো। তার তো আর সেই অপশন নেই।
ভাবতে ভাবতে একটু বেখেয়ালই হয়ে গিয়েছিল বাপন। কখন যে সন্ধে নেমে গিয়েছে। ঘরে আলো জ্বালায়নি সে। কিন্তু তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে দেখছে, সব ঘরে আলো জ্বলছে। কিন্তু কেসটা হল বেল বাজছে। হ্যাঁ, অনেকক্ষণ। বেলের শব্দেই চমক ভেঙেছে তার। কেস খেয়েছে। তড়িঘড়ি ছবিগুলো খাতায় পুরে, কোনওরকমে খাতাটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দরজার দিকে দৌড় দিল সে। মা। মা গো...
৩)
সব ঘর অন্ধকার। কম্পিউটরটা ড্রয়িংরুমেই থাকে। গেম খেলবে বলেই বাপন শপিংয়ে গেল না। অথচ সে বস্তুটি অন অবধি হয়নি। ছেলেটা নির্ঘাৎ কিছু একটা করছিল। ভাবতে ভাবতে অদিতি বাপনের ঘরের দিকেই পা বাড়াল। আলো জ্বালাতেই চোখে পড়ল, ব্যাগের ভিতর ঢোকানো খাতাটা। চেন আঁটতে ভুলেছে। একটা ছবি উঁকি দিচ্ছে। যতটুকু বেরিয়ে আছে, আর অদিতি যতটুকু দেখতে পাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট ওটা কোনও ন্যুড মহিলার ছবি। বাপন যে কী করছিল, বুঝতে বাকি রইল না তার। ছেলেকে বলল, একটু ঠান্ডা গরমে মিশিয়ে জল খাওয়াবি রে? বাপন চলে গেল। ওর চোখেমুখে স্পষ্ট ভয় দেখল অদিতি। ডাইনিংয়ে গ্লাসে জল ঢালার শব্দ হচ্ছে। সেই ফাঁকে বিদ্যুৎ গতিতে খাতা ফাঁক করে অদিতি যা দেখার দেখে নিল। বাপন জল নিয়ে আসতে, বলল, জানিস আজ বাসে দেখলাম, একটা লোক জামাই খুলে ফেলল। কী কান্ড বল দেখি!
অদিতি এমন করে বলল, যেন এ ঘরের হালহকিকৎ সে কিছুই জানে না।
বাপন আর কী করে, মায়ের হাসি শুনে, পাঁচনগেলা মুখ করে, সেও একটু হাসল।
৪)
অণ্বেষকে রাতে এ কথা বলতে সে তো হেসেই খুন। বলে, বলো কি গো ছেলে আমাকেও ছাপিয়ে গেল?
-মানে?
-মানে আমি তো ক্লাস সেভেনে প্রথম দেখেছিলুম। এ ব্যাটা তো এক কাঠি বাড়া।
-তুমি মজা করছ?
-আরে, এই বয়স থেকে ছেলেপিলেরা একটু ওমুখো হয়। তা নিয়ে অত ভাবার কি আছে? কেন, মেয়েরা পানু দেখে না নাকি?
-আহ, দেখার কথা হচ্ছে নাকি? সবাই দেখে। কিন্তু একটা ভুল ধারনা তৈরি হবে তো। আমাদের হয়েছে। ছেলেরও হবে। সারাজীবন মেয়েদের নিয়ে ভুলভাবে ফ্যান্টাসাইজ করে যাবে।
-মানে ছবিতে পামেলা, আর ঘরে ঝামেলা তাই বলছ তো?
বলে খ্যাক খ্যাক করে হাসতে থাকল অণ্বেষ। সিগারেটে সুখটান দিচ্ছে। অদিতি কী একটা বলতে যাচ্ছিল, অণ্বেষ মুখে হাত চাপা দিয়ে বলল, চুপপপ অত প্রশ্ন করতে নেই ম্যাডাম।
অদিতি রাগ করে উঠে পড়ল। অণ্বেষকে ন্যাপকিন কিনে আনতে বলেছিল। কালো প্ল্যাস্টিকের মোড়কটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা। প্যাকেটটা বের করে নিয়ে, প্ল্যাস্টিকটা দুমড়ে মুচড়ে ডাস্টবিনে ফেলতে ফেলতে বলল, যেমন বাপ ছেলে তো তেমনই হবে, উচ্ছন্নে যাকগে, আমার কী...

৫)
‘আয় বাপন সেলফি তুলি একটা,’ ছেলেকে কাছে ডাকল অদিতি। আহ্লাদে হাসতে হাসতে আসছে বাপন। আসলে কাল কিনে আনা পুজোর জামার একরাউন্ড টেস্ট সেশন চলছে। মা-ছেলের খচখচ করে পাঁচটা ছবি একসঙ্গে উঠল। ভেজা চুল একদিকে সরিয়ে ছেলেকে কাছে টানল অদিতি। একটা করে ছবি স্ক্রল করছে। বাপন এক একটা দেখিয়ে বলছে, এটা ডিলিট করো, ওটা রাখো। শেষটা দেখে বাপন বলল, এটাই বেস্ট। বাকিগুলো সব ডিলিট করে দাও।
আঙুল সরালো না অদিতি। পরের ছবিটা আনতে এক মুহূর্ত দ্বিধা হয়েছিল বটে। এক লহমা। বাপন উসখুশ করেও উঠেছিল। অদিতি আর সময় নেয়নি। যা ভেবেছে সেটা করে ফেলতেই হবে। ফট করে সোয়াইপ করে দিয়েছিল।
বাপনের চোখের সামনে তখন একজোড়া ব্রেস্ট। বাপন থতমত খেয়ে দেখল, না চন্দনের ছবিতে নয়, মায়ের হাতে ধরা মোবাইলের স্ক্রিনেই। ফ্ললেস সার্কেল নয়। একদম আলাদা। মনে হয় শরীর থেকে যেন ফলের মতো ঝুলছে। বাপন চকিতে লাফিয়ে মায়ের হাত ছাড়াতে যেতেই, অদিতি টেনে বসাল তাকে। বলল, ‘পালাচ্ছিস কেন, তুই তো এই ছবি দেখতে ভালোবাসিস, তাই না? কাল দুপুরে তো এগুলোই দেখছিলি। এই কারণে আমাকে মিথ্যে বললি, বললি গেম খেলব। কই খেলিসনি তো? কমপিউটর অনই করিসনি। দরজায় কতবার বেল দিলাম, তবে গিয়ে খুললি। এগুলোই তো দেখছিলি তাই না?’ যেন মুরগীকে চেপে ধরা হয়েছে, এমন করে ছটফটিয়ে ওঠে বাপন। পালাতে চাইছে সে। কিন্তু ছাড়ছে না অদিতি।
এত সাফোকেটিং জীবনে আর কক্ষণও লাগেনি বাপনের। একে তো মা জেনে গিয়েছে। তার উপর ব্রাইট স্ক্রিনে একজনের ব্রেস্টের ছবি। তাও সুন্দর নয়। ছবিগুলোর মতো নয়। জঘন্য দেখতে। কোনও ছবিতে এরকম খারাপ ব্রেস্ট দেখেনি সে। নিউজ সাইটের গ্যালারিতে অনেক এজেড অ্যাকট্রেসকে এক্সপোজ করতে দেখেছে, তাও এরকম নয় মোটেও। চোখের সামনে এটাকে যাস্ট নেওয়া যাচ্ছে না। মুখেও একটা কথা বেরচ্ছে না তার। তার কল্পনাগুলো সব ভেঙে যাচ্ছে। সেই যে টুকটুকিদির মুখের সঙ্গে এক মহিলার বিগ ব্রেস্টকে জুড়ে দিয়েছিল, খিল্লিদির সঙ্গে আর একজনের... সব চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সব রিপ্লেস করে দিচ্ছে ওই ঝুলে পড়া ব্রেস্টদুটো। এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে ছবিগুলো সব ফলস? আর্টিফিসিয়াল? তাহলে খিল্লিদি, টুকটুকিদিও রিয়ালি এরকমই? উফফ... আর ভাবতে পারছে না বাপন। স্ক্রিন তো ছাড়, সে আর নিজের দিকেই তাকাতে পারছে না। অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে সে শুধু মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। অদিতি বলল, ‘আর দেখবি?’ কোনরকমে ঘাড় নাড়ল বাপন, না, প্লিজজ। তবু মা সোয়াইপ করছে। মানে আরও একটা ছবি দেখতে হবে? সেটা দেখেই চোখে হাত চাপা দিল বাপন, তারপর একদৌড়ে পালিয়ে গেল নিজের ঘরের দিকে।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছবিদুটোকে নিজেও একবার ভালো করে দেখল অদিতি। তোলার আগে অনেক ভেবেছিল সে, অনেক। ছেলে পর্ন দেখবে তা যতই স্বাভাবিক বলুক অণ্বেষ, কিন্তু মেয়েদের শরীর নিয়ে ভ্রান্ত কল্পনা করাটাকে কিছুতেই যুক্তিযুক্ত মনে হল না তার। কই সে তো কখনও ভাবেনি যে, তার স্বামীর পুরুষাঙ্গ ওই পর্ন ভিডিওর ছেলেগুলোর মতো হবে। কিংবা সেক্সটা ওরকম রাফ হবে। অথচ অণ্বেষ যে ভেবেছে, তা ওর কথাতেই স্পষ্ট। ছেলেটাও তাই ভাববে। পানু দেখে ভাববে বেজায় স্মার্ট হয়েছে, এদিকে ছাপোষা ন্যাপকিন আনতে কালো প্ল্যাস্টিক! আচ্ছা বাপনের যে গার্লফ্রেন্ড হবে, সে বেচারিও এই ফ্যান্টাসির পাল্লায় পড়বে নির্ঘাৎ। জানবেও না তার কী দোষ। হয়ত প্রেমিকের মন পেতে একদিন ব্যর্থ হবে সে। না ওই বাচ্চা মেয়েটার ক্ষতি করতে পারবে না অদিতি।
নেটে পড়েছিল, এক মা ব্লগে লিখেছিলেন, সন্তানদের সামনে ন্যুড হয়ে সন্তানদের নারীশরীর নিয়ে অমূলক কল্পনাকে ভেঙে দিতে চান তিনি। মনে মনে সেই মহিলাকে থ্যাংকস জানিয়ে ভেবেচিন্তেই সেলফিগুলো তোলে অদিতি। প্রথমে ভেবেছিল শুধু ব্রেস্টটাই দেখাবে। তারপর ভাবল না, নিজের মাকেই দেখুক। এই অবস্থায়। সব খারাপ সমেত দেখুক। আসল শরীর কেমন হয় খানিকটা জানুক। তাহলে ফালতু ফ্যন্টাসাইজ করবে না কখনও। কী জানি এখন কাউকে করে কি না, ভেবেছিল অদিতি। তবে আদৌ ছেলের সামনে এ কাজ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে ধন্ধেই ছিল সে। শেষমেশ যা হোক পেরেছে।
ছেলেটা ঘরে ঢুকে গিয়েছে। আপাতত খানিকক্ষণ শকেই থাকবে, আঁচ করে নেয় অদিতি। শকটা জরুরিও। মনে হতেই, বেশ ফুরফুরে হাওয়া খেলে গেল যেন গায়ে। কাল বাসের লোকটার কথা মনে পড়ে গেল। লোকটাও জামা খুলে হাওয়া খাচ্ছিল। শুধু নিজে। অদিতি কিন্তু টের পাচ্ছে তার শরীরে লাগা ফুরফুরে এই হাওয়া আগামী কোনও যুবতীর খোলা গায়েও লাগছে। বাপনের গার্লফ্রেন্ড, তাকে এখনও দেখেনি অদিতি।
সোফায় গা এলিয়ে দিতে দিতে ভাবল, বাপন আর একটু বড় হলে পিরিয়ডসের ব্যাপারটাও খোলসা করে বলে দেবে। আর যাই হোক বাপের মতো যেন না করতে হয় ছেলেকে। বাপনের বাবার কথা মনে হতেই একটা আইডিয়া খেলে গেল তার মাথায়। মুখ ছাড়া শুধু ব্রেস্টের তোলা সেলফিটা অণ্বেষকে পাঠিয়ে দিল হোয়াটসঅ্যাপে। কয়েক সেকেন্ড পরে উত্তর এল,
- হোয়টস দিস? হুজ?
- পামেলা নাকি তোমার বউ, আইডেন্টিফাই?
- মানে
অদিতি একবার ভাবল লিখবে, ‘সে কি এত ঘাঁটাঘাঁট, আর চিনতে পারছ না?’ পরক্ষণে ভাবল, না বরং লিখবে, ‘বাড়ি ফেরো, বোঝাচ্ছি।’ অবশ্য শেষমেশ এ সব কিছুই লিখল না সে। কাল বাসে বসে লোকটার কীর্তি দেখতে দেখতে যা মনে হয়েছিল, আজ হুবহু সে কথাই আরও একবার মনে হল অদিতির, সব কীর্তিই যে গিনেস বুকে থাকবে তারই বা কে মাথার দিব্যি দিয়েছে!সব মানে যে সবাইকে বুঝতে হবে তার তো কোনও মানে নেই।
ধীরেসুস্থে অণ্বেষকে সে লিখে পাঠাল, ‘চুপপপ, এত প্রশ্ন করতে নেই স্যার।’

আপনার মতামত জানান