বটু সিরিজ -১

বংপেন (তন্ময় মুখোপাধ্যায়)


রিভলভারের নলের মুখটা কপালে ঠেকতেই অবশ হয়ে পড়লেন দীপা। স্বামী অজিত আর বারো বছরের ছেলে নীলয়ের মুখটা বারবার ভেসে উঠছিল চোখের সামনে। পাশে দাঁড়ানো জানোয়ার গুণ্ডা দু’টোর অট্টহাসি যেন দীপাকে ঘৃণায় ভিজিয়ে দিচ্ছিল বারবার।
“এই ভালো”, দীপা ভাবলেন, “এদের দাবী মত দু’কোটি টাকা জোগাড় করতে হলে অজিত সর্বস্বান্ত হত, ছেলেটার ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যেত; এর চেয়ে এই ভালো”।
ট্রিগারে আঙুল স্পর্শের শিরশিরে শব্দ কানে যেতেই দীপার মনে হচ্ছিল তিনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন। ঠিক তক্ষুনি ম্যাজিকের মত তিনি দেখলেন গুণ্ডাটির হাত থেকে বন্দুক ছিটকে গেছে আর সে মুখে হাত দিয়ে মাটিতে পড়ে “উফ মরে গেলাম...মরে গেলাম” বলে ছটফট করছে। এমনকি তার অন্য স্যাঙ্গাতটারও একই অবস্থা; দু’জনেই লুটোপুটি যাচ্ছে যন্ত্রণায়।
“অজ্ঞান হবেন না প্লীজ, জ্ঞান ফেরাতে সে অনেক হ্যাপা। দশটা চল্লিশের লোকালটা মিস্‌ হলে পরের ট্রেন আবার সেই সাড়ে এগারোটায়”, মাঝারি হাইটের থলথলে ভালোমানুষ গোছের একজন তখন দীপাকে এসে সামলে ধরেছেন। তার এক হাতে একটা বিশাল রসগোল্লার হাঁড়ি; সম্ভবত ফাঁকা।
-“আপনি...আপনি কে? পুলিশ?”, দীপা অবাক হয়ে জানতে চাইলে।
-“পুলিশ হাফ পাঞ্জাবী আর পাজামা পরে আসে না দীপাদেবী, আমি ইয়ে...আমি বটকেষ্ট মুখার্জি। ওরফে বটু গোয়েন্দা”।
-“গোয়েন্দা?”
-“কথায় কাজ নেই দীপাদেবী, আগে চলুন বেরিয়ে যাই। এদের মুখের জ্বালা কমতে বেশি দেরী নেই। ওদিকে রাধামোহন দাঁড়িয়ে আছে”।
-“রাধামোহন? কলকাতার রিক্সা-বন্ড”।
-“রিক্সা-বন্ড?”
-“রিক্সা চালানোর হাতটা চমৎকার; এই আর কি”।

****

- “এই লোকটা তোমায় রেসকিউ করেছে?”, অজিতের গলায় অবিশ্বাস।
- “হ্যাঁ গো”, দীপা তখন স্বস্তিতে ভাসছে, “একেবারে সুপারম্যানের মত! ভদ্রলোক ডিটেকটিভ”।
- “ভুঁড়ি দেখেছো? গায়ে একটা ফতুয়া, তাও ময়লা। আরে হাতে মাটির হাঁড়িটা যে কেন আছে তা তিনিই জানেন। ও গোয়েন্দা এটা আমায় বিশ্বাস করতে বলছো?”
- “আস্তে, পাশের ঘরেই বসে। শুনতে পাবে। তোমার কী একটুও কৃতজ্ঞতা বোধ নেই? তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখা করে থ্যাংকস বলো আর ফিসের ব্যাপারটা...”।
- “বেশ”।

****
- “নমস্কার বটকেষ্ট বাবু”, অমায়িক হাসলে অজিত।
- “নমস্কার”, গোয়েন্দা মাত্রই একটা একপেশে হাসি থাকার দরকার। বটু আজকাল প্র্যাকটিস করে সে ব্যাপারটা।
- “আপনাকে যে কী বলে কৃতজ্ঞতা জানাবো বটকেষ্টবাবু...আগে কী খাবেন বলুন”।
- “খাওয়ার পাট থাক। বড্ড তাড়ায় আছি।আর ইয়ে, আমায় ক্লায়েন্টরা বটু বা বটুবাবু বলেই ডেকে থাকেন”।
- “ক্লায়েন্ট?”
- “মক্কেল। এই যেমন আপনি”।
- “ও আচ্ছা। সত্যিই আপনি না থাকলে যে কী হত। কিন্তু আপনি যে কেমন করে...”।
- “রাধামোহন, সেই খবর দিলে যে দীপাদেবী আটক আছেন”।
- “রাধামোহন?”
- “রিক্সা বন্ড”।
- “রিক্সা বন্ড মানে?”
- “মানে ওই; রিক্সাটা খুব ভাল চালায় আর কি”।
- “দীপা কিডন্যাপ হয় গত পরশু। নিউ মার্কেট থেকে। ওদের ফোন আসে আমি যেন পুলিশে খবর না দিই আর দীপার জন্য দু’কোটি টাকার র্যাননসমের ব্যবস্থা করি। আমার ওই ছোটখাটো একটা ব্যবসা। দু’কোটি টাকা কোথায় পাব বলুন? অগত্যা আজ পুলিশের শরণাপন্ন হতেই হল”।
- “আর সেইজন্যই আপনার স্ত্রীকে ওরা আজ গুলি করে খুন করতে যাচ্ছিল। ভাগ্যিস রাধামোহন সময়মত খবর দিয়েছিল আমায় যে তেঁতুলতলার পোড়ো বাড়িটায় সাসপিশাস কিছু ঘটছে”।
- “আপনি যে ভাবে নিজের প্রাণের মায়া না করে দীপার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বটুবাবু...”।
- “লাইফ রিস্ক? একদমই না। দু’জনকে শায়েস্তা করতে অস্ত্রটি অতি মোক্ষম। কখনো ফেল করেনি আগে,” বটু মিচকি হাসলেন।
- “অস্ত্র? কিন্তু আপনি রিভলভার-টিভলবার তো কিছু চালাননি”।
- “রিভলভার পকেটে থাকে”, বটুর ভুরূ তখন এক অদ্ভুত কার্ভেচারে, “তবে আমার হাতে এতরকম অস্ত্র থাকে, ওসব গুলিগোলার প্রয়োজন বেশি হয় না”।
- “তাই নাকি?”, অজিত বেশ আগ্রহ বোধ করছিল, “দীপা বলছিল যে আপনি ওদের মুখ তাক করে কিছু ছুঁড়েছিলেন...অ্যাসিড বা কেমিক্যাল কিছু?”
- “রসগোল্লার রস”।
- “রসগোল্লার রস?”।
- “টগবগে ফুটন্ত গরম রসগোল্লার রস। তাতে অল্প শুকনো লঙ্কাগুঁড়ো আর অনেকটা মরিচ”।
- “মাই গড”।
- “হেঃ, অ্যাসিডের মত নৃশংস নয় অথচ ভারী কাজে দেয় বুঝলেন”।
- “তাই আপনার হাতে এই রসগোল্লার হাঁড়ি?”
- “এগজ্যাক্টলি। রাধামোহনই এনেছিল; আগুন গরম রসগোল্লা। এক্কেবারে স্পঞ্জ, বুঝলেন। দীপাদেবীকে পনেরো মিনিট আগেই উদ্ধার করতে পারতাম। তবে আমার আর রাধামোহনের তো আর সেই আগের বয়স নেই। সত্তরটা রসগোল্লা খেতে একটু সময় লাগলো। তারপর তাতে মরিচ আর লঙ্কাগুঁড়ো মিশিয়ে সে পোড়ো বাড়িতে ঢুকলাম। পকেটে কয়েকটা চায়ের ভাঁড় রাখাই ছিল। সুবিধে মত জায়গায় দাঁড়িয়ে দু’ভাঁড় ভর্তি রস-বোমা একসঙ্গে ছুঁড়লাম দু’জন গুণ্ডার মুখের দিকে”।
- “একসঙ্গে? দু’হাতে ছুঁড়লেন?”
- “নিজেকে সব্যসাচী বলে প্রচার একটু লজ্জা পাই বুঝলেন। তবে কথাটা খাঁটি সত্যি। আমার মামাবাড়ি ছিল মানকুণ্ডুতে। মামাদের পেল্লায় আমবাগান। সব এক্কেবারে গুড়ের মত হিমসাগর বুঝলেন। দু’হাতে নিখুঁত টিপে ঢিল ছুঁড়ে আম বৃষ্টি নামাতাম। এসব নিজের মুখে বলতে চাই না। তবে আমার তপেশ নেই কী না”।
- “ওহ। বুঝলাম। তাহলে আপনার ফীজ...”।
- “ফীজের এখন হলটা কী। আসল ঘটনাই তো আপনাকে জানানো হয়নি অজিতবাবু”।
- “আরও ঘটনা আছে না কি?”?
- “আলবাত আছে। দশটা চল্লিশের ট্রেনটা মিস্‌ করার রিস্ক নিলাম কেন তাহলে বলুন”।
- “ট্রেন?”।
- “শেয়ালদা থেকে, টুওয়ার্ডস বারুইপুর”।
- “সে চিন্তা করবেন না। আমি ট্যাক্সির ব্যবস্থা করে দেব বটুবাবু”।
- “ট্যাক্সি? মানে ইয়ে...ভাড়াটা...”।
- “এটুকু আমায় করতে দিন বটুবাবু। প্লীজ ভাববেন না”।
- “থ্যাঙ্ক ইউ। তবে ইয়, ফিসটা কিন্তু আলাদা”।
- “নিশ্চয়ই, এবার বলুন কী বলছিলেন”।
- “হ্যাঁ, এটাই বলতে এলাম যে আপনার দাদা মানুষটি সুবিধের নয়। এটা আপনার সম্পূর্ণ অজানা হতে পারে না। এবার তাকে আগাগোড়া এগিয়ে চলুন”।
- “আমার দাদা? সে কোথা থেকে এলো? আর তার সঙ্গে আপনার আলাপই বা কোথায় হল?” হঠাৎ একটু বিব্রত বোধ করলেন অজিতবাবু।
- “আলাপ?”, বটু আকাশ থেকে পড়লেন, “আলাপ হয়নি তো!”।
- “তবে এই যে আপনি বললেন বটুবাবু, দাদাকে অ্যাভয়েড করতে”।
- “দেখুন মশাই, যে মানুষ টাকার লোভে কাউকে গুণ্ডা দিয়ে কিডন্যাপ করাতে পারে, প্রয়োজনে তাকে খুন করতে পারে, তাকে এড়িয়ে চলাই ভালো নয় কী?”।
- “বটুবাবু, আপনি কী উলটোপালটা বকছেন?”
- “সহজ সত্যিটাকেও জোয়ানের আরক দিয়ে হজম করতে হবে অজিতবাবু?”, বটু গোয়েন্দার কণ্ঠে তখন দূর্বার শ্লেষ, “যে পোড়োবাড়িতে দীপাদেবীকে গুণ্ডারা নিয়ে গিয়ে উঠেছিল, সেখানে আমি এইটে খুঁজে পাই”। পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের পাউচ বের করে অজিতবাবুর চোখের সামনে নাচালেন বটু গোয়েন্দা।
- “আধচেবানো পান?”
- “কারেক্ট, অজিতবাবু। তবে যে-সে পান নয়। আধচেবানো। মিষ্টি পান, তবে বড় অদ্ভুত ভাবে তৈরি মিষ্টি পান। গুলকন্দ দেওয়া নেই এতে, রয়েছে আমসত্ত্ব। আমসত্ত্ব দেওয়া পান শুনেও আপনি অবাক হবেন না কারণ আপনারও সে অভ্যাস আছে। এমন অদ্ভুত পানের শখওলা দু’টো মানুষ তো খুব একটা দেখা যায় না, অজিতবাবু। এ পান ওই গুণ্ডাগুলোর চেবানো ছিল না, এমন হাই কোয়ালিটি মিঠে পান তাদের জর্দা জিভে রুচবে না। সে বেশ টের পেয়েছি। তবে কার এ সদ্য ফেলে যাওয়া আধ চেবানো পান? নিশ্চয়ই এদের হোতার। আপনি পুলিশের কাছে গেছেন শুনে উত্তেজিত হয়ে দীপাদেবীকে খুন করার হুকুম দিতে এসেছিলেন তিনি । পোষা গুণ্ডাদের সাথে কথা বলার উত্তেজনায় মুখের পান ফেলে দেন। চেবানো পানের নেচারটা দেখেই বুঝেছি যে এ পান যার মুখে ছিল তার মাড়ির পিছনের দিকে বেশির ভাগ মোলারই নেই, ফার্স্ট আর সেকেন্ড মোলার তো ডেফিনিটলি দুদিকেই নেই। পানের গায়ে ক্যানাইনের বাড়তি প্রয়োগ সে কারণেই। আর সে কারণেই হয়তো পানে উনি সুপুরি এক বিন্দুও খান না। বয়স ষাটের ঘরে। অযত্নে চেবানো পান ফেলে দেওয়া ধরন দেখে পুরুষ বলে বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না। ফেরার পথে রাধামোহনের রিক্সায় বসে আপনার স্ত্রীর কাছে শুধু জানতে চেয়েছি যে আমসত্ত্ব দেওয়া আম খায়, এমন ক’জনকে তার চেনা। যখন উনি বললেন যে আপনি ও আপনার দাদা অমিয়বাবু এই পান খেতে অভ্যস্ত, তখন স্রেফ জেনে নিলাম আপনাদের দুজনের ডেন্টাল হেল্‌থের সম্বন্ধে। ব্যাস! আর ইতিমধ্যে রাধামোহন ব্যাটা আপনার দেবতুল্য দাদা অমিয়বাবুর ব্যাপারে সমস্ত খবর যোগাড় করে আমায় এস এম এসে জানিয়ে দিয়েছে। ওই পোড়োবাড়িটা আপনার দাদারই এক চাঁদপানা বন্ধুর মালিকানায় আছে। গুণ্ডাগুলোর সম্ভবত সেই বন্ধুবরেরই। আর ইদানীং অমিয়বাবুর অ্যালুমিনিয়ামে ব্যবসা লাটে ওঠার জোগাড় হয়েছে। রাধামোহন থাকতে মশাই খবরের চিন্তা করতে হয় না”, এক নিঃশ্বাসে বলে পায়ের ওপর পা থুলে সোফায় গা এলিয়ে দিলেন বটু গোয়েন্দা।
- “রাধামোহন মানে...”, অজিতবাবুর মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছিল।
- “ওই যে, রিক্সা-বন্ড। ওর জবাব নেই। মগজ আর রাধামোহন; এ দু’টো আছে বলেই তো...”।
- “রিক্সা-বন্ড...ও হ্যাঁ...রিক্সা-বন্ড মানে কী যেন বললেন?”
- “ওই মানে, দারুণ রিক্সা চালায় আর কী। ফাস্টেস্ট অ্যান্ড শার্পেস্ট ইন সাউথ অ্যান্ড সাউথ ইস্ট এশিয়া। তবে রাধামোহনের গুণের শেষ নেই। যেমন ধরুন সে যা লুচি বেলে...কী বলবো অজিতবাবু...”।
- “আমার দাদা? শেষ পর্যন্ত...”, বিহ্বল হয়ে পড়ছিলেন অজিতবাবু, “আপনি কী নিশ্চিত?”
- “বটু গোয়েন্দা পাঁঠা ছাড়া বিরিয়ানি খায় না আর নিশ্চিত না হয়ে কোন কথা বলে না”, বটুর গলা তখন ইস্পাত কঠিন।
- “আমি কী পুলিশে যাব বটুবাবু?”, অজিতবাবুর গলা তখন কাঁপছে।
- “লাভ নেই, আমসত্ত্ব মাখা চেবানো পানের প্রুফে পুলিশ কিস্যুটি করবে না, আপনার কর্তব্য এখন সাবধানে থাকে।তবে বটুর গুঁতো একবার যখন খেয়েছেন, তিনি এ দুঃসাহস আর সহজে করবেন না। ইয়ে...যাক! এবার তবে আমার দক্ষিণা আর ট্যাক্সি ভাড়াটার কথা হয়ে যায়। এ সিজনে ইলিশের যা দাম চলছে মশাই, টু পাইস না এলে বর্ষার রাতগুলো ঠিক ম্যানেজ করতে পারছি না”।

আপনার মতামত জানান