লালজ্যেঠু

ঋতম ঘোষাল
"জ্যেঠু এসেছে... জ্যেঠু এসেছে... "ওনাকে দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলো বল্টু।
"ওমা, দাদা কত্তদিন বাদে এলেন " বল্টুর মা আরো একহাত ঘোমটা টেনে নিলেন। উনি বল্টূর গাল টিপে জিজ্ঞাসা করলেন - "তা বল্টু বাবু, এতদিন কি কি গপ্পের বই পড়লেন শুনি?"
“ সব পড়েছি জেঠু।যা যা তুমি দিয়েছিলে।সাহারায় শিহরণ, বোর্নিওর বিভীষিকা, করাল কুম্ভীর,আর... আর... উম্মম্ম ওই যে যেটায় প্রখর রুদ্রকে সাবমেরিন শুদ্ধু তিমিমাছ গিলে ফেললো,তারপর সেই জঙ্গলের মধ্যে দস্যু কঙ্কালিয়াকে ধরে ফেলল... "
"আচ্ছা আমি অল্প বলে দিছছি।হন্ডুরাসে - "
"- হাহাকার।পড়েছে ।মনে পড়েছে জ্যেঠু " বল্টুর উল্লাস দেখে কে?

"দাদা চা খাবেন তো?" দরজার বাইরে থেকে বল্টুর মা প্রশ্ন করেন। বহুদিন বাদে বল্টূকে হাসতে দেখে নিজের অজান্তেই আঁচলে চোখ মোছেন। বল্টু তখন তার জেঠুর সাথে গল্পে মেতে গেছে।
জ্যেঠু ওদিকে বলছেন "আরে দূর, পারবে তোর প্রখর রুদ্র আমার সাথে? এই তো সেবারে কামচাটকায় দেখা হয়েছিলো, আচ্ছা করে কান মুলে দিয়েছিলাম।ব্যাটা বলে কিনা উটের পাকস্থলিতে জল থাকে। জানিস বল্টু তুই যখন বড় হবি, তখন বইতে পড়বি আসলে উটের কুঁজটা হল চর্বি।
"সে ছাড়ো জেঠু, তুমি এবারে কাশীর গল্প বলো।সেই কবে থেকে বলবে বলবে করছো।কিন্তু বলছোনা।সেই একটা বাজে ডাকাতের সাথে দেখা হয়েছিলো বলেছিলে..."
"হয়েছিলো তো। খুব দুষ্টু মঙ্গোলিয়ান ডাকাত। নাম হল ম্যাঙ্গোনিয়াল ম্যাঙ্গোরাজ।তা তাকে যা জব্দ করলাম না।সে আর কি বলবো। ব্যাটা ভুলে গেছিলো কার জেঠুর সাথে লড়াই করতে এসেছে।তা আমাকে তো একটা বন্ধ ঘরে আটকে রেখে একের পর এক ইলেকট্রিক চাকু ছুঁড়ছে আমার দিকে, বুঝলি। আমিও এক হাতে পরপর চাকু লুফে নিয়ে আবার ওর দিকে ছুঁড়ে দিলাম।তা আমার স্পিডের সাথে পারবে কেন?সেই তোর দেওয়া হজমি গুলিটা খেয়েছিলাম তো,যেটা খেলে গায়ে জোর হয় বলে তোকে ডাক্তারবাবু দিয়েছিলো।মনে নেই?"
বল্টু সাথে সাথে বলে ওঠে "বাঃ, থাকবে না? সেই যে আমি প্রথমে তেতো বলে খেতে চাইছিলাম না।তুমি বললে আমাকেও একটা দে বল্টু।এখন খাবো না,পরে খাবও,তাহলে দস্যু ডাকাত গুন্ডাদের সাথে লড়তে গেলে একটু বেশি শক্তি পাবো।তারপর একটা নিয়ে গেলে।মনে থাকবে না আবার?"
"ঠিক বলেছিস।তা সেটা তো আমি খেয়ে নিয়েছিলাম লড়াইয়ের ঠিক আগেই।তারপর সেই ম্যাঙ্গোনিয়ালের যখন পিঠ ঠেকে গেছে দেওয়ালে আমি একের পর এক ছুরি ছুঁড়ে ওর চারধারে দুগগাঠাকুরের চালচিত্তিরের মতো এঁকে দিলাম।এদিকে পুলিশ এসে যখন ওকে তুলল তখন কি দেখলো বল তো?"
- কি? কি?
"দেখলো ব্যাটা একেবারেই অজ্ঞান হয়ে গেছে।তোর প্রখর রুদ্র পারতো এসব?কিন্তু জ্যেঠু পারে "
"হবেই তো।কার জ্যেঠু দেখতে হবে না।বড় হয়ে আমিও পারবো,বলো জেঠূ? " একগাল হাসি বল্টুর মুখে।
বল্টুর পোলিও হওয়া সরু সরু পা দুটোর দিকে তাকিয়ে উত্তর দিতে ভুলে যান উনি।মুখে শুধু বলেন " আজ উঠি রে বল্টু, আবার রোববার আসবো।"


ঘরের বাইরে এসে বল্টুর মায়ের হাতে কয়েকটা নোট গুঁজে দেন উনি।সদ্য সদ্য আজ প্রকাশকের থেকে আজ একটা চেক পেয়েছেন।বলেন " একটু দুধ ডিম মাংস এনো বল্টুর জন্যে "।বল্টুর বাবার ছবির দিকে একবার তাকান।তাঁর সাথেই এথিনিয়াম ইস্কুলে পড়তেন বল্টুর বাবা প্রতাপ বিশ্বাস।নিজে সংসার করেননি, প্রতাপের পোলিও হওয়া রোগাভোগা ছেলেটাকে বড্ড ভালোবাসেন যে।মিত্তিরমশাইয়ের সাথে ঘুরে ঘুরে যে কটা অভিজ্ঞতা হয় বল্টুকে না শোনাতে পারলে জেঠুর শান্তি হয় না।জেঠুর বড় ন্যাওটা ছেলেটা।মনে মনে বোধয় জেঠুকেই ফেলু মিত্তির-জেমস বন্ড-কর্ণেল সুরেশ বিশ্বাস ভাবে।উনিও বিশ্বাসটা ভাঙতে দিতে পারেন না।আরো লিখতে হবে বল্টুর জন্যে।জীবনে তো হেঁটেচলে বেড়াতে পারবে না ছেলেটা,যতদিন বয়েস থাকে একটু গল্পের বই ই পড়ুক।মিত্তির মশাইকে দিয়ে ফ্যাক্টসগুলো একটু চেক করে নিতে হবে।
ছাতাটা হাতে নিয়ে,ধুতিটা গুটিয়ে জলজমা বল্টুদের গলি পার হয়ে যান পাঁচ ফুট চার ইঞ্চির লালমোহন গঙ্গোপাধ্যায়। সাড়ে ছয় ফুটের একটা লম্বা ছায়া পিছনে রেখে।
সব হিরোদের লম্বা চওড়া হতেই হবে,কে বলল?

আপনার মতামত জানান