আমি জীবনানদ দাশের স্ত্রী বলছি

মারজিয়া প্রভা
জীবন,
আমার এখনও দিব্যি মনে আছে তুমি যখন ১৯৫৪ সালে ২২ শে অক্টোবর ঘর থেকে বেরোলে তখন তোমার মুখটা পাংশু লাগছিল আমার কাছে। ভিতরে তোমার কি হচ্ছিল বুঝি নি! জানি নি! জানতে চাইও নি! কারণ আমি জানতে চাইলে তুমি বলতে না আমাকে। তোমার আমার সম্পর্কের শীতলতা আমি কাটিয়ে উঠতে পারিনি কখনই। তাই তুমি তোমার ঝোলা ব্যাগ হাতে বেরিয়ে গেলে যখন, আমি শুধু মনে মনে দুর্গা জপছিলাম, অজানা আশঙ্কা লাগছিল। কিন্তু দেশপ্রিয়পার্কের কাছের রাস্তায় ট্রামের নিচে অ্যাকসিডেন্ট হবে বুঝি নি ! ইচ্ছে করেই ট্রামে পড়েছিলে গো? ট্রাম তো বড় শব্দ করে , ধীরে ধীরে আগায়। তারপরেও ট্রামের নিচে পড়ে অ্যাকসিডেন্ট হওয়া কি আত্মহত্যা নয়? আপনভোলা মানুষ তুমি ট্রামের শব্দ শুন নি, লোকে তাই বলে। কিন্তু সকালে তোমার যে মুখ দেখেছিলাম, তা কিন্তু অন্য কথাই বলে।
আট দিন ছিলে ওই অ্যাকসিডেন্টের পরেও। আমি দেখতে গিয়েছিলেম মাত্র একবার। লোকে এ নিয়ে প্রচুর কথা বলেছে। যেদিন গিয়েছিলাম, বড্ড জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হচ্ছিল, কেন এইভাবে মরতে গেলে? পারি নি। খালি হাত চেপে ধরেছিলাম, তুমি তাকিয়ে ছিলে নির্বাক। কি ভাবছিলে ? জানা হল না!
আচ্ছা আমি মরছি শেষ দিনের কথা জানা হল না বলে! কিন্তু আমি কি সত্যিই তোমাকে জানতে পেরেছি সারা জীবন ধরে। এক ছাদের নিচে, একই বিছানায় বসবাস করে, তোমার দু বাচ্চার মা হয়েছি আমি তাও কি জেনেছি তোমাকে! তুমি কবি, তুমি বড় আপনভোলা! ওইটুকুর বাইরে তোমার অস্তিত্ব ছিল কি এই জীবনে?
তোমাকে যখন বিয়ে করি আমি, তখন তোমার অসচ্ছল জীবন। আমার বাবা ছিল না, জেঠামশাই তোমার বিদ্যেবুদ্ধির জোর দেখে আমাকে বিয়ে দিয়েছিল। আমি সচ্ছল পরিবারের মেয়ে। তোমার বাড়িতে এসে খাপ মিলাতে পারতাম, হয়ত সময় লাগত, তবুও পারতাম, শুধু তুমি যদি আমার পাশে থাকতে। কিন্তু বিয়ের ফুলশয্যা পেরোতেই শুনি, তোমার আর তোমার ওয়াইয়ের গপ্প। তোমার কাকার মেয়ে শোভনার ডাক নাম ছিল বেবি, তুমি ডাকতে বি-ওয়াই, আরও ছোট করে ওয়াই। তোমার “ঝরা পালক” উৎসর্গ করেছিলে তোমার প্রাণপ্রিয় ওয়াইয়ের নামে। “বাসর রাত” গল্পে তোমার নায়িকা মনিকাকে দেখিয়েছ দুর্ব্যবহার করতে দেবতাসম নায়কের সঙ্গে। আমি কি জানি না , মনিকা আসলে আমার মত করে বানানো তোমার নায়িকা ? কিন্তু সুচাতুরে তুমি গোপন করেছিল কেন মনিকার এই দুর্ব্যবহার।
তুমি শোভনাকে ভুলতে পার নি। এর আগেও লীলাময়ীর সঙ্গে প্রেম করেছিলে, তারও আগে মনিয়া। কিন্তু শোভনা তোমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। খুড়তুতো বোনকে বিয়ে তোমাদের ব্রাহ্ম সমাজ মেনে নেয়নি। শোভনার মায়ের জন্য তোমাদের প্রেম সফল হয় নি। এটা ঠিক, খুব চতুরভাবে তোমার বিয়ের পর তুমি আলগোছে আড়াল করে রেখেছিলে শোভনাকে ! তাই কি ? আমাদের বিয়ের এক বছর পূর্তি হবার পরে, একদিন তোমার ডায়েরি দেখেছিলাম। ১৯৩১ সালে, আগস্টের কোন মাসে, লেখা সেখানে “ওয়াই : তার খবর কী? ... কোনো চিঠি নেই, কিছু নেই...একটা রোমান্টিক পরিবেশে তাকে কল্পনা করতে পারি আমি: চুমু এবং সে রকম কিছু— এমনকি দুই বছর আগেও (সে) আমার কাছে ছিল জীবনমৃত্যু: কিন্তু এখন !’ আমি থ হয়ে গিয়েছিলাম তোমার এই লেখা দেখে। এক বছর পরেও তুমি বলছ এই কথা ! কোথায় জানি লিখেছিলে, ওয়াই এর মতো গ্রাম্য মেয়ের ভালোবাসা তোমাকে ভরিয়ে দিতে পারত, হল না সমাজের নিয়মে পড়ে।
গ্রাম্য মেয়ে বলেই, ওয়াই ( শোভনা) ছিল তোমার কাছে আকর্ষণীয়। আমি তখনকার দিনে ইডেন কলেজে পড়তাম, গান গেতাম। অথচ সেগুলো গুণ কোনদিনই তোমার কাছে দাম পায় নি। আমি তোমার ঘরোয়া জিনিষের মতই আটপৌরে ছিলাম। “মাংসের ক্লান্তি” র হেম কে যে আমার মতো করেই সৃষ্টি করেছিলে, আর ঘেন্না করে বলতে কুরুপা, সূতিকা রোগী, কৃমির মতো। কতটা অসম্মান করলে বউ কে অমন ধারা বলতে পারে?
এড়িয়ে গেছ অনেক সত্য! বল নি, সারাদিন কাজ শেষে বাড়ি যখন ফিরতে , যেদিন ইচ্ছে হত আমায় বিছানায় ডেকে আদরে ভরিয়ে দিতে। রতিক্রিয়ার আগে এক মানুষ ছিলে, আর তার পরে ছিলে আরেক মানুষ। কবি তো তুমি! মুড বদলানো তো তোমার স্বভাব! কত রাত বসে বসে তুমি ক্যাম্পে, আট বছর আগের একদিন, মহালোকের পরে, এখানে আকাশ নীল , লিখে চলেছ, আর আমি ওইদিকে ছটফট করেছি বিছানায় । তুমি আসো নি ।
সংসারে কোনদিন খেয়াল রাখ নি। নিজের মতো কবিতা লিখেছ, লেখা ছাপিয়েছ, লোকে “ গণ্ডার কবি” বলত , তা নিয়ে হতাশা করেছ, জবাব দিয়েছ। এই নিয়ে ছিল তোমার জীবন। রাত্রি ১২টার আগে ফেরার নাম ছিল না। টাকা পয়সা নিয়ে কোন চিন্তাভাবনা ছিল না। সন্তান দুটোকে কীভাবে বড় করছি আমি তা নিয়ে ভ্রুক্ষেপ ছিল না। তোমার কবিতা লেখাতে আমি কখনও হ্যাম্পার করি নি, সংসারের প্রয়োজনীয় কাজে কখনও তোমাকে নিযুক্ত করি নি, চালটা ডালটা কিনতে নিজেই বাইরে গিয়েছি। তাই তো নিবিষ্ট মনে কবিতা লিখেছ, পেট ভরিয়েছ, যৌনক্ষুধা মিটিয়েছ। আর কি চাই বল? বউ কি করছে, কেমন আছে, কেমন লাগছে এই সংগ্রাম ! নাহ! এ নিয়ে তর্ক করে কি লাভ ?
তার চাইতে বরং বলি বনলতার গল্প, তুমি ওর কাছে শান্তি পেতে ! সংসারের চাপে পড়ে সবসময় মন থাকত না তোমার দিকে। বিছানায় শুয়ে আমিও ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। ঘরঘর করে নাক ডাকতাম। তুমি তাই খুঁজে নিয়েছিলে বাইরের রমণীকে। বনলতাকে। নাটোরে যার জন্য মাঝে মাঝেই ছুটে যেতে তুমি। অথচ আমার সাথে একটু মাসির বাড়ি যাবার সময় তোমার হত না।
যেদিন তোমার বনলতা কবিতা পড়েছি আমি রাগে গা জ্বলছিল। আমি জানি না ওর সঙ্গে তোমার শরীরের সম্পর্ক হয়েছিল কি না ! জানতে চাইও না। অনুমান করেছিলাম “ দু দণ্ড শান্তি” পাবার কথা শুনে। যদি সত্যি হয় তো আমার কি করা উচিত ছিল!
আমি দূরে চলে যাচ্ছিলাম ধীরে ধীরে। তুমি কবি মানুষ, তোমার মা ও কবি। কুসুমকুমারি দাশ। তোমাদের সাথে কি আমার পড়ে?? আমি ছাপোষা বাঙালি মেয়ে। বুঝি না কি অত! তোমার মা তো তাই বলতেন আমাকে।
কবি বলেই তোমার হাজার নারীসঙ্গ থাকবে। আমি বাঁধা দেবার কে! সরেই গেলাম তোমার কাছ থেকে তাই। অথচ তখন তুমি উদাসীন হয়ে গেলে। আত্মহত্যার কথা ভাবতে লাগলে। “অর্থ নয়, বিত্ত নয়, আরও এক বিপন্ন” বিস্ময় খেলা করছিল তোমার মাঝে। প্রতিটা গল্পে উঠে আসছিল, নিপীড়িত স্বামীর চরিত্র। কিন্তু সে কি আমার দোষ ? শুধু শরীরের সম্পর্কের দেনা শোধ করতে হবে আমাকে? শুধু “ যদিদং হৃদয়ং মম, তদিদ্রং হৃদয়ং তব” বলেছি বলে তোমার ভিতরে বাহিরে হাজার নারীসঙ্গ মেনে নিতে হবে আমাকে? পারি নি আমি। পারতাম না!
মঞ্জু, তোমার বড় মেয়ে, তার মায়ের এই শীতল আচরণ মেনে নিতে পারে নি। বাবা ঘরে থাকে না, উদাসী হয়ে ঘুরে বেড়ায়, ফ্রাস্ট্রেট থাকে। সব মায়ের দোষ! তুমি বাড়ি ছিলে না একদিন, এই নিয়ে লেগেছিল প্রচুর। আমি শুধু বলে ছিলাম “ বড় হও বুঝবে”। সমুটা বুঝত হয়ত কিছু, বলত না কিছু! তোমার মৃত্যুর পর খালি বলেছিল “ বাবা কেন এমন করল”। মঞ্জু কিন্তু কখনই আমাকে বুঝে নি। তোমার মৃত্যুর পুরো দায়টাই আমার উপর চাপিয়েছে।
তোমার মৃত্যুর আগে আগে আমি ফিল্মের দিকে মন দেই। ছবি বানানোর জন্য একটু ডিরেকশন শেখাশেখি শুরু করি। ভেবেছি একটু নাম হোক। কতদিন আর জীবননান্দ দাশের বউ , এই পরিচয়ে থাকব। বিছানা আলাদা হয়েছে অনেক আগেই, ফিল্মের দিকে মন দিতে গিয়ে, কথা বলাও প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। তাই বুঝেই উঠি নি অমন কাজ করে বসবে তুমি!
তুমি মারা যাবার পর, লোকে এসে তোমার ট্র্যাঙ্ক উজাড় করল। কত কত গল্প কবিতা বেরিয়ে আসল। যারা এককালে গণ্ডার কবি বলেছে তোমায়, তারা তোমার প্রশংসা শুরু করল। তুমি নাকি বাংলা আধুনিক কবিতার জনক, অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। আমি হেসেই দিলাম। এরা কোথায় ছিল বলত এতদিন ? যখন তুমি আমি সকাল বিকাল খুচরা পয়সা নিয়ে ঝগড়া করছি ?
তোমার কবিত্ব নিয়ে আমার সন্দেহ নেই। আমি তোমাকে নিয়ে গর্ব করি। যেসব কবিতা পড়ে, তোমার মৃত্যুর পর লোকে প্রশংসায় ফেনা তুলছিল, সেগুলো অনেক আগেই আমি পড়ে ভেবেছিলাম “ ওগুলো তুমি ছাড়া কেউ লিখতে পারবে না”। আমি জানতাম তুমি অনেক নাম করবে, যশস্বী হবে। লোকে তোমার মনে রাখবে।
কিন্তু লোকে মনে রাখবে না লাবণ্যপ্রভা দাশকে। তোমার নামের আড়ালে আমি ফানুস হয়ে উড়ে গিয়েছি আজীবন । তুমি থাকাকালীন, তুমি চলে গেলেও। ফিল্মেও আমি নাম করতে পারি নি গো। আসলে কেউ মেনে নিতেই পারে নি, জীবনানন্দ দাশের স্ত্রীর আর আলাদা পরিচয় থাকার দরকার আছে। এই তো ঢের!
তুমি নিজেও তো তা ভাব নি! লোকের কথা বলে আর কি করব ! শুধু শরীরের প্রয়োজন ছাড়া, লাবণ্যের অস্তিত্ব ছিল না তোমার কাছে। সুজাতা, সুরঞ্জনা, শ্যামলী, সুদর্শনা, বনলতা চিরকাল তোমাকে বিমোহিত করে রেখেছে। তোমার লাবণ্য কোথায় সেখানে গো !
ট্রাম অ্যাকসিডেন্ট শুনে আমি আসলে যেতেই চাই নি। অভিমান না, কষ্ট ও না। আসলে কি অধিকারবোধে যাব বুঝছিলাম না। বেড শেয়ার করেছি এই অধিকারবোধে ? তাহলে একদিনই কি যথেষ্ট নয় ? স্ত্রী হলে না হয় আরও বেশী যেতে পারতাম।
লাবণ্যদাশ প্রভা আসলে এই জীবনে কিছু পেতে আসে নি, তাই তোমার লেখনী নিয়ে যখন পোস্টমর্টেম হয়, সবাই বলে জীবনানন্দ দাশ নিজের ব্যাক্তিগত জীবনে, প্রচণ্ড দুঃখী ছিলেন। স্ত্রী ছিল তার অত্যাচারী। এই জন্য যত গল্প , কবিতা লিখে গেছেন তিনি ,তাতে ঘর থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, ট্রাজেডির ছাপ।
লাবণ্যকে তুমি সকলের সামনে আউটরেজ করে দিয়ে গেলে জীবন। হয়ত তোমার অজানা ছিল, তোমার প্রতি তার ডেডিকেশনের কথা, অনুরাগের কথা, ভালোবাসার কথা, অভিমানের কথা! দূরে সরাটা দেখলে জীবন, কেন গেলেম সেটা বুঝার চেষ্টাও করলে না।
সবশেষে, তুমি আজ বিখ্যাত। সবাই তোমাকে মনে রাখবে আজীবন। আমি সেখানে নাই থাকলাম। যতজন রিসার্চ করে বনলতাকে খুঁজে, তার এক তৃতীয়াংশও খুঁজে না লাবণ্যপ্রভাকে।
তোমার প্রতি আমার আজ আর অভিমান নেই। অনুরাগও নেই। শুধু হাহাকার! কি অমানুষিক জীবনই না পার করলাম একসাথে! মুক্তি পেয়ে ভালো আছো জানি, ভালো থাকো, ওপারের পৃথিবীতে।
ইতি
লাবণ্য

আপনার মতামত জানান