পরজীবী

অভীক দত্ত


মেয়েটাকে খুন করার কথা আমার আগে মনে এসেছে। কিন্তু অতটা ভেবে দেখিনি। মনে হয়েছিল ভাবি তারপরেই প্রচুর আলস্য চলে এসেছিল। আলস্য এলে আমি আর কোন কিছু নিয়ে বেশি চিন্তা করি না। সোফায় শুয়ে থেকে ফ্যানটা কিভাবে ঘুরছে মন দিয়ে দেখে যাই।
আসলে আমি বরাবরই কুঁড়ে স্বভাবের। কুঁড়েমি থেকে আমি কোন কালেই মুক্তি পেলাম না। যাক গে আসল কথায় আসি। যেটা বলছিলাম। মেয়েটাকে খুন করার কথা অনেকবার মনে আসলেও কাজে সেটা করা হয়ে ওঠে নি। মাথায় এসেছে। কিন্তু পারি নি।
আচ্ছা আমি কি আবার যথারীতি অসংলগ্ন কথা বলা শুরু করলাম? হতে পারে। অসংলগ্ন কথা বলতেই পারি। আমার মাথা কাজ করে না মাঝে মাঝে। মেয়েটা বলে – তুই কোনদিন নেশা ছাড়তে পারবি না। একটা ইউজলেস তুই। কোন কাজের না। নিজের পেটের ভাত জোটাবার পর্যন্ত ক্ষমতা নেই। তার জন্য বউয়ের শরীর বিক্রি করা টাকা হাত পেতে নিতেও তোর বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয় না।
আচ্ছা বলুন তো দাদারা, এই সব কথা শুনলে কোন মানুষের মন মেজাজ ঠিক থাকে? শরীর বিক্রির টাকা নিতে কষ্ট হবে কেন? শরীরটা আসলে কি? এক মহারাজ বলেছিলেন শরীর তো আসলে হোটেল আমাদের। কয়েকদিন এসেছি, থেকে চলে যাব। তাতে যদি অনাকাঙ্খিত কিছু লোক এসে সেটাকে ব্যবহার করে চলে যায় আর আমার বউকে কিছু টাকা দিয়ে যায়, তাতে কোন শালার বাপের কি? লোক জনের হিংসা খুব। আমার বউয়ের কাছ থেকে টাকা নেওয়া ভারি ঝকমারি সেটা যদি সবাই বুঝত। আমি যখন চোখ লাল করে ফ্যান দেখতে দেখতে মাঝের ঘরের সোফায় ঘুমিয়ে পড়ি তখন আমার বউ হয়ত অনেক রাত করে এল। কোন ছেলে উৎসাহবশত ওর ব্লাউজ ধরে টেনেছে, কেউ লিপস্টিকটাকেই চুষে চুষে ঠোঁটটাকে সাদা করে দিয়েছে। ওর তখন স্নানে যেতে হয়। ব্যাগটা রাখা থাকে বসার ঘরে। আমি যত রাতই হোক, তখন ঠিক উঠি। দরকার মত টাকা ওর ব্যাগ থেকে বের করে নি। ও অবশ্য স্নান সেরে এসেই টাকা চেক করে। কম থাকলেই রাত বিরেতে গরুর মত চ্যাঁচ্যাঁতে শুরু করে। তখনই আমার খুনী হতে ইচ্ছা করে। ঐ কথাগুলি মনে পড়ে যায়... খুন করাটা আমি হিসেব করে দেখেছি খুব কঠিন কিছু না। কিন্তু অনেক কিছু জানতে হবে। স্টেপ বাই স্টেপ। এক দুই তিন করে যতগুলি স্টেপ আছে ততগুলি স্টেপ কাউন্ট করতে হবে। কঠিন কাজ। কিন্তু মজার কাজ। পৃথিবীর সব থেকে চ্যালেঞ্জিং কাজ। কাজটা হয়ে গেলে সেই অনুভূতি হয় যদি ডার্বিতে কোন খেলোয়াড়র ওপর পক্ষের জালে বল জড়াতে পারে।
তারপর যথারীতি যেরকম শুয়ে থাকি সোফায়, সেরকম শুয়ে থাকব। শুয়ে থেকে আমার অনেক চিন্তা মাথায় আসে। বিভিন্ন রকম চিন্তা। সেগুলি নিয়ে ভাবতে থাকি। আমার যেমন মনে হয়েছে টিকটিকিগুলো আসলে ডাইনোসরের বংশধর। এগুলি নিয়ে বউয়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে , কিন্তু ওর সময় কোথায়! মাঝে মাঝে শাড়ি পরার সময় পাড় ধরতে বলে, আমি দেখি মরচে পড়া সায়ায় লেগে আছে কত মানুষের হাত। চরম সময়ে তারা সেগুলি টান মেরে খুলে দেয়। রাগ হলেও আমার কিছু করার থাকে না। করার থাকে না তখনও, যখন কোন বৃষ্টি বাদলার দিনে ও আর বেরোয় না। লোকেরাই আসে। ও ওদের নিয়ে বেডরুমে চলে যায়। আমি ড্রয়িংরুমে সোফাতে শুয়ে টিকটিকি নিয়ে গবেষণা করি। দরজা বন্ধ করে কখনও মদের বোতল নিয়ে বসে ওরা। পেগের ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকে আদিম কাজ। যাবার আগে টাকা গুণে নেয় বউ। আমি টিকটিকি দেখি। আর আড়চোখে দেখতে থাকি ঠিক কত টাকা দিয়ে গেল লোকটা। গাড়ি করে আসা লোকটা। এরা আমাকে কি ভাবে? আমার জেনে কি হবে! মাঝে মাঝে বাজার ঘাটে একা একা ঘুরতে বেরলে এদের সাথে দেখা হয়।বউ বাচ্চা নিয়ে সুখী পরিবার বাজার করতে বেরিয়েছে। আমি হাত মিলাতে এগিয়ে যাই। বলি “দাদা মনে আছে? সেই যে আমার বউয়ের সাথে শুতে এসেছিলেন সেদিন। খুব মদ খেলেন। আমি অন্য ঘরে বসেও আপনার হাসি শুনতে পাচ্ছিলাম। আমার বউকে কেমন লাগল? খাটে ভাল? বউদির থেকেও ভাল?” লোকগুলো আমার দিকে রক্তশূন্য চোখে তাকিয়ে থাকে। কেউ কেউ তাড়া করে। কেউ কেউ এমন ভাব করে কোনদিন চিনতেই পারে নি। এই এসব লোক দেখলে আমার বেজায় মজা লাগে। তবে আমি জানি, খুনের মজা এসবের থেকে অনেক ভাল। খুন করে যে মজা পাওয়া যায়, অন্য কোন কিছু করে সেই মজা পাওয়া যায় না। লোকগুলির বউ আমার কথা শুনে হা হয়ে থাকে। কেউ কেউ বিশ্বাস করে ওখানেই ঝাড়তে শুরু করে দেয়। বাড়ি এলে বউয়ের ঝাড় শুনতে হয়।
-নিজের তো একটাকা কামানোর ক্ষমতা নেই, আমার ব্যবসায় তবে পা এগোচ্ছ কেন? কাপুরুষ একটা।
আমি কিন্তু কাপুরুষ নই। কিন্তু কাপুরুষ ছাড়া আর কোন কিছু শুনলাম না কোনদিন। কাপুরুষ মানে কি! আমি যে তোমার সাথে হোটেলে গিয়ে অন্য ঘরে বসে থাকি, রাতে একা বাড়ি ফিরতে পারবে না বলে বাড়ি পাহারা দিয়ে নিয়ে আসি তখন কাপুরুষ কে থাকে! অদ্ভুত ব্যাপার! টাকা জিনিসটা তো দরকার বেঁচে থাকতে গেলে। সেক্সটাও দরকার। কত বড় বড় পার্টির লোক দেখলাম, আমার বউয়ের পায়ের তলায় গড়াগড়ি খায়। তখন মনে হয় পৃথিবীতে আসলে ঐ ঐটাই আসল। বাকি সব জালি মাল।
বিয়ে হয়েছিল জাঁক জমক করে। অনেকে খেয়েছিল। বউয়ের নাকি চরিত্র ভাল না শুরু থেকে শুনে আসছিলাম। তখন ভেবেছিলাম চরিত্র ধুয়ে কি জল খাব। বউ ভাল হলে বস খুশি, বস খুশি হলে আমি খুশি। বৃত্তটা সম্পূর্ণ হওয়া নিয়ে কথা। কিন্তু সেটা হতে হতেও হল না। কোম্পানিটাই উঠে গেল। কি করব, ই এম আই দিতে হবে গাড়ির বাড়ির। ঐ পাওনাদারদের দিয়েই শুরু করেছিলাম। প্রথম প্রথম খারাপ লাগত বটে কিন্তু তারপর যখন দেখলাম সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে তখন আর বিশেষ চাপ নিলাম না। চাপ নিয়ে তো কিছু হবার ছিল না। আসলে পুরুষ মানেই নিজের বউতে সন্তুষ্ট না। হতে পারে না। কোন শুয়োরের বাচ্চা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না, নিজের বউতে আমি সন্তুষ্ট।
আর আমার বউয়ের মত ফিগার পেলে অনেক ব্রহ্মচারীকেই দেখেছি নড়ে চড়ে বসতে। আমাদের বাড়িতেই কত মাল এল। টিভিতে বড় বড় ভাষণবাজী করে বেড়ায়। এদিকে আমার বউয়ের পেটে নাক ঘষার জন্য সে কি নরম চেহারা। এই মালগুলো অবশ্য জাত শুয়োর। আমার সাথেও ব্যবহার ভাল করার চেষ্টা করত প্রথম প্রথম। জাত খচ্চর তো। সবার কাছেই ইমেজ ঠিক রাখার চেষ্টা জারি রেখের যায়। বউ অবশ্য বলে দিয়েছিল আমাকে দেখিয়ে – এই মালটাকে বেশি পাত্তা দেবার জায়গা নেই। ভেজা বারুদ মাল। এক আনার মুরোদ নেই। মুরোদ নেই... মানে মুরোদ নেই। আমি কি করব। আমার কিছু করার নেই। কেউ কেউ করুণার চোখে তাকায়... আর আমায় মেয়েটা যা নয় তাই বলে চলে, হিজরা শালা, তোর বউকে অন্যলোকে লাগিয়ে যায় আর তুই কি বাল ছিড়িস... আমি ওকে বলে বোঝাতে পারি না তোর টাকাটা আমি কিভাবে দিই সেটা কি জানিস? ...আর তখনই ওকে আমার খুন করতে ইচ্ছে করে... ভুল ভাববেন না, আমার বউকে না... ওকে মারলে আমাকে কে খাওয়াবে বলুন তো?
যেটা বলা হয় নি... আমারও একটা বাঁধা মেয়েছেলে আছে...

আপনার মতামত জানান