কাউয়াম্যান প্যারাডক্স

রোহণ কুদ্দুস



১৮ই মে, ১৯৭৪

সূর্যের তাপ বেশ বেড়েছে, অথচ দীর্ঘচঞ্চুর পেটে এখনও কিছু পড়েনি। এই বালির সমুদ্রে খাবার জোটা এমনিতেই খুব শক্ত। কিন্তু তবু এদিক-ওদিক যদি কোনও ছোট ইঁদুর মরে পড়ে থাকে বা নিদেনপক্ষে কিছু পোকামাকড়। তেমন কিছুই নজরে আসছে না। কিছুক্ষণ ওড়াউড়ি করে ক্লান্ত হয়ে দীর্ঘচঞ্চু মাটিতেই নেমে এল। গরম বালিতে বুক-পেট পুড়ে যাবার উপক্রম। তাই লাফিয়ে উঠতে গিয়েও একটু অবাক হয়ে সে আবার বালিতেই বসল। এই জায়গার বালি একটু অন্যরকম। যদ্দূর চোখ যায়, বালির সোনালি ঢেউ। কিন্তু দীর্ঘচঞ্চু যে জায়গায় এসে বসেছে, সেখানে বৃত্তকারে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে ভূমি সমান। ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে সে তার চঞ্চু দিয়ে ঠুকরে দেখল বালিতে। সামান্য একটা দাগ পড়ল। দ্বিতীয়বার ঠোকরাতেই জমি কেঁপে উঠল। অবাক দীর্ঘচঞ্চু শুনতে পেল বালির অনেক নিচে গম্ভীর একটা গুমগুম শব্দ ভেসে আসছে। একটা দৈত্য যেন গুমরে উঠেছে রাগে। বিস্ময়ভাবটা কেটে যেতেই উড়ে যেতে চাইল দীর্ঘচঞ্চু। কিন্তু ততক্ষণে বালির মধ্যে থেকে সেই দৈত্যটা লাফিয়ে উঠেছে। একটা প্রবল ঝটকায় ছিটকে পড়ল সে।
কতক্ষণ দীর্ঘচঞ্চু বালিতে পড়েছিল কে জানে। বিকট একটা আওয়াজে তার চেতনা ফিরল। মনে হচ্ছিল আর একটা দৈত্য আকাশ থেকে তার ডানার ঝাপটায় বালি উড়িয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘচঞ্চু এর আগে মরুঝড় দেখেছে। এমন একটা মরুঝড়েই লোকালয় থেকে বেশ কিছুদিন আগে সে পথ ভুলে এসে পড়েছে এই মরুভূমিতে। কিন্তু এ ব্যাপারটা অন্যরকম। পিঠের নিচে গরম বালি তার পালকগুলো পুড়িয়ে দিচ্ছে। তবু ওঠার চেষ্টা করতে গিয়েও পারল না। চোখ খুলে অস্পষ্ট দেখতে পেল দৈত্য নয়, একটা বড় পাখি ঘুরে বেড়াচ্ছে মাটির সামান্য ওপরে। ধরাশায়ী অবস্থাতেই সে স্পষ্ট দেখতে পেল পাখিটার পেটে বসে আছে কয়েকটা দোপেয়ে। দোপেয়েগুলো বড্ড ভালো হয়। দীর্ঘচঞ্চু আগে যে গ্রামে ছিল, সেখানকার দোপেয়েগুলোর জন্যে তার খাবার অভাব হত না। তাদের বাসার বাইরে একটু খুঁজলেই খাবার পাওয়া যেত।
ততক্ষণে ওপরের বড় পাখিটা আওয়াজ করতে করতেই মুখ ঘুরিয়েছে অন্যদিকে। দীর্ঘচঞ্চু বুদ্ধিমান, তাই বুঝল দোপেয়েগুলো যে পাখিটার পেটে বসে আছে, সেটা আসলে পাখি নয়। সেটা কী, তা সে জানে না। কিন্তু ওই জিনিসটা দোপেয়েগুলোকে তাদের গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছে। আর এখন ঐ জিনিসটাই আবার তাদের গ্রামে ফেরত নিয়ে যাবে। গ্রামে ফিরতে পারলে আর খাবারের অভাব হবে না। শরীরের কষ্ট ভুলে প্রাণপণে দীর্ঘচঞ্চু উঠে বসল। পাখা থেকে বালি ঝেড়ে নিয়ে উড়তে চাইল। সামান্য ওপরে উঠে পড়ে গেল। আবার চেষ্টা করল। ২-৩ বারের চেষ্টায় সে আকাশে উঠল। তারপর একটু দূরত্ব রেখে দোপেয়েগুলোর বড় পাখিটাকে অনুসরণ করল।


অনাদির গলার অসুখ

লজ্জায় আসল কারণটা কাউকে বলা যাচ্ছে না, কিন্তু গতকাল দুপুর থেকে গলার ব্যথায় চোখের জলে নাকের জলে অবস্থা। বিকালে থানা থেকে ফেরার সময় অনাদি পাড়ার মোড়ের হোমিওপাথটাকে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু সে ওষুধে কিছুই কাজ হচ্ছে না। ডাক্তারের কাছে রোগের আসল কারণ চেপে রাখলে রোগ সারার কোনও সম্ভাবনা নেই। তাই শেষ পর্যন্ত কালীজ্যাঠার কাছে যাওয়াই স্থির করলেন অনাদি। কালীজ্যাঠা আয়ুর্বেদ চিকিৎসা করে থাকেন। এমন বিদ্ঘুটে রোগের চিকিৎসা নিশ্চয় আয়ুর্বেদে আছে। যদিও অনাদির ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তেমন ঘটনা হয়ত শুশ্রুত-চরকের আমল থেকে মানব-ইতিহাসে এই প্রথম। কিন্তু কালীজ্যাঠার কাছে মন খুলে কথা বলা যায়। বিজ্ঞজন, তাই গুরুত্ব দিয়ে সমস্ত কথা শোনেন। ছোটবেলায় মাকে হারানোর পর অভিভাবকসুলভ গাম্ভীর্যে বাবা সমস্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে মানসিক দূরত্ব ববারবরঅই থেকে গিয়েছিল পিতা-পুত্রের। সেই কারণেই বাবা মারা যাওয়ার আগে থেকেই থেকে যে কোনও পরামর্শ বা উপদেশের প্রয়োজন হলেই অনাদির প্রথম ভরসার জায়গা বাবার দূর সম্পর্কের দাদা কালীজ্যাঠা। এই একটা মানুষের জন্যেই অনাদির নিজেকে কখনও অনাথ মনে হয়নি।
সাইকেলটা কালীজ্যাঠার উঠোনে দাঁড় করিয়ে অনাদি গলার ব্যথাটা বাঁচিয়ে ডাক দিলেন – “জ্যাঠামশাই আছেন?” ভিতর থেকে আওয়াজ এল – “উঠে এসো।” কালীজ্যাঠা সন্ধ্যা-আহ্নিক করে বসে আছেন তাঁর তক্তপোশের উপর। ঘরের মধ্যে একটা হ্যারিকেন জ্বলছে। গ্রামের এই দিকটাতে এখনও ইলেক্ট্রিকের ব্যবস্থা নেই। অনাদি তক্তপোশের একদিকে বসে হাত বাড়িয়ে প্রণাম করলেন। কালীজ্যাঠা প্রশ্ন করলেন – “শরীর ভালো?” অনাদি মাথা নেড়ে বললেন – “কাল থেকে গলায় দারুণ ব্যথা।” কালীজ্যাঠা চিন্তিত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন – “কারণটা কী? এটা তো গলা ব্যথার হওয়ার সময় নয়। দিনরাতের তাপমাত্রা তো এখন যথেষ্ট স্থির।”
কথাটা ঠিক। গলা ব্যথা বা সর্দি-কাশি হওয়ার সময় এটা নয়। বসন্তকাল এখন। কিন্তু সেই হয়েছে কাল। বসন্তের অন্যান্য দুপুরের মতই অনাদির বাড়ির উঠোনের কৃষ্ণচূড়াটায় বসে কোকিল কুহককুমার কুহুরবে তার সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছিল। প্রকৃতির বিচিত্র খেয়াল। কুহককুমারের সেই ডাক গিয়ে পৌঁছাল দীর্ঘচঞ্চুর কানে। কাকের কান হয় কিনা জানা নেই। কিন্তু কুহককুমারের এমনতর আহবানে দীর্ঘচঞ্চুর মন চঞ্চল হল। রাজস্থানের রুক্ষ-শুষ্ক মরুভূমি থেকে প্রায় দু বছরের দীর্ঘ উড়ানে সে এসে পৌঁছেছে বাংলার শ্যামল বাতাবরণে। এখন শরীর চায় বিশ্রাম। এমনিতেই ঋতুরাজ বসন্তের প্রচ্ছন্ন প্ররোচনায় মন উড়ু উড়ু। তার ওপর এমন আকুল ডাক। দীর্ঘচঞ্চু কুহুরব লক্ষ্য করে তীব্রগতিতে ধাবিত হল কৃষ্ণচূড়া গাছের দিকে।
অনাদি তখন দুপুরের খাবার সেরে থানায় ফিরে যাবার জন্যে সাইকেলে উঠতে যাবেন। এমন সময় মাথার ওপর কৃষ্ণচূড়া গাছে ঝটপট আওয়াজে মুখ তুলে তাকালেন। দীর্ঘচঞ্চু কুহককুমারের সঙ্গে ছেড়খানিতে মত্ত। যদিও পাখিদের দুনিয়ায় সমকামিতা বিরল নয়। কিন্তু একটা পুরুষ কাক আর একটা পুরুষ কোকিলের ওপর জবরদস্তি করার ব্যাপারটা নেহাতই অভূতপূর্ব। অনাদি গাছের নিচ থেকে সাদা চোখে দেখলেন দুটো পাখি ঝটপটি করছে। পুলিশমানুষ, তাই যে কোনও মারপিট দেখলেই উতলা হন। ব্যাপারটা বুঝতে চাইলেন তাঁর পুলিশি যুক্তি দিয়ে।
কোকিলটা নিশ্চয় কাকটার বাসায় গিয়ে ডিম পেড়ে এসেছিল আগে। তারপর ডিম ফুটে বাচ্চা হওয়ার পর কদিন পর থেকেই কাক কর্তা তার গিন্নির ওপর হম্বিতম্বি আরম্ভ করল – “আমার বাচ্চারা খ্যাঁ-খ্যাঁ না করে কুহু-কুহু করে কেন? এগুলো কার বাচ্চা? হারামজাদী ঠিক করে বল, নইলে এক্ষুণি এই নখ দিয়ে তোর চোখ উপড়ে দেব।” কাক গিন্নি এমন অন্যায় অপমানে চোখের জলে ভাসেন – “প্রাণ কালা রে। তোর জন্যে এ দুনিয়ার আর সবাইকে পর করলাম। আর তুই শেষে এই অপবাদ দিস?” অভিমানে কাক গিন্নি তার কুহু-বাচ্চাদের নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেল। সন্দেহবাতিক কাক কর্তা নিজের শূন্য বাসায় বসে দিলীপকুমারের মত হাঁড়িমুখ করে মাল টানছিল। এমন সময় দূর থেকে কুহুরব শুনে জেগে উঠল তার প্রতিহিংসার আগুন। বুঝতে পারল তার গিন্নির সঙ্গে আসলে কার ফস্টিনস্টি চলছিল এ্যাদ্দিন। আর তারপর শুরু হল এই মারপিট।
অনাদি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে এহেন অসাধারণ একটা কেস খাড়া করছেন; ওদিকে গাছের ওপর দীর্ঘচঞ্চু তার চরম মুহূর্তে এসে উপস্থিত হল। বাংলার নিপাট ভদ্র কোকিল পারবে কী করে জয়সলমীরের কামোন্মাদ কাকের রাগরস ধারণ করতে। বেশ কিছুটা বীর্য সরাসরি এসে ছিটকে পড়ল গাছের নিচে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা অনাদির মুখের ভিতর। অনাদি তখনও মনে মনে ঠিক করছিলেন কাকটাকে ধারা ৩০২ লাগাবেন নাকি কোকিলটাকে ৪২০ – এমন সময় কিছু একটা মুখের ভেতর পড়েই সড়াত করে গলায় চলে গেল। অনাদি বিষম খেয়ে কাশতে আরম্ভ করলেন। তাঁর বিকট কাশির আওয়াজ পেয়ে ঘরের মধ্যে থেকে তাঁর স্ত্রী বিনোদিনী এক গ্লাস জল এনে প্রায় জোর করেই খাইয়ে দিলেন। অনাদি কিছু বলারই সুযোগ পেলেন না।
ধরা গলায় অনাদি উপসংহার টানলেন – “জ্যাঠামশাই আমি বোধহয় কাকের পায়খানা খেয়ে ফেলেছি। বা কোকিলটার। আর তাই থেকেই গলার এমন অবস্থা।” কালীজ্যাঠা মাথা নেড়ে বললেন – “নাহ! বিষ্ঠা নয়। তাতে গলায় ব্যথা হবার কথা নয়। বড়জোর পেট নামতে পারে। তোমার যা হয়েছে তার ব্যাখ্যা এখনই আমার কাছে নেই।” রোগটা ঠিক কী তা ধরতে না পারলেও কালীজ্যাঠা অনাদিকে চারটে গুলি দিলেন। তুলসীপাতা, বাসকরস, মধু আর লবঙ্গ দিয়ে বানানো। গরম দুধের সাথে খেলে গলার ব্যথার কিছুটা উপশম হলেও হতে পারে। অনাদিকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফেরার সময় বললেন – “কাল সকালবেলা তোমার কোষ্ঠীটা দিয়ে যেও। যদ্দূর মনে পড়ে এই বয়সে তোমার কোনও অশুভ যোগ আছে দেখেছিলাম। বিকালে বাড়ি ফেরার পথে একবার দেখা করে যাবে। দেখি কী করা যায়।”


পাগল লোকটা

দরজার পাল্লা দুটো বন্ধ করে হাপরের মতো নিশ্বাস নিতে থাকল বিহান। সিঁড়ি থেকে আওয়াজ আসছে কি? প্রাণপণে নিজের নিশ্বাসের শব্দ চেপে রেখে বিহান কান পাতল। ধুপধাপ শব্দে লোকটা ওপরে উঠে আসছে না? কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিহানের আশঙ্কা সত্যি করে আওয়াজটা আছড়ে পড়ল তার দরজায়। দুমদাম শব্দে পাগলটা ধাক্কা দিচ্ছে। একটা জান্তব গরগর বেরিয়ে আসছে প্রতিটা ধাক্কার সঙ্গে। যেন কোনও আদিম জন্তু তার শিকারকে গর্ত থেকে বের করে না আনতে পারার আক্রোশে গজরাচ্ছে।
বিহান ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করার চেষ্টা করল। কী করনীয় তার এখন? পুলিশে ফোন করবে? সেটাই বুদ্ধিমানের মতো কাজ হবে। কিন্তু পাগলটার ধাক্কায় তার মোবাইল ফোনটা হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেছে রাস্তায়। গাড়িঘোড়ার চাকা বাঁচিয়ে সেটা যদি এখনও অক্ষত থাকে, তাহলেও ফোনটা উদ্ধার করতে হলে দরজা খুলে পাগলটার সামনে থেকেই তাকে যেতে হবে। তাহলে উপায়? চেঁচাবে প্রাণপণে? আশেপাশের ফ্ল্যাট থেকে কেউ যদি এসে তাকে উদ্ধার করে। অন্তত পুলিশেও যদি খবর দেয়? বিহান চেঁচাতে শুরু করল – “খুন! খুন! পুলিশ! বাঁচাও!” তিন-চারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এই শব্দগুলোই তারস্বরে আওড়ানোর পর একটু অপেক্ষা করে বোঝার চেষ্টা করল কেউ কোথাও থেকে আসছে কিনা। কিন্তু তেমন কিছুই কানে আসছে না। খুব সত্যি বলতে কী, আসার মতো কেউ কাছাকছি থাকলে দরজার ওপর পাগলটার দুমদাম ঘুঁষির আওয়াজেই এসে হাজির হত। আজ একে শনিবার, তার ওপর বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ভারত-বাংলাদেশ মুখোমুখি হচ্ছে। এমন দিনেও কি লোকে কাজে কর্মে বাড়ি থেকে বেরোয়? বিহান সামান্য অসহায় বোধ করল। প্রতিবেশীদের নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন বোধ করেনি সে এতদিন। ব্যাঙ্গালোর থেকে কলকাতায় ট্রান্সফার নিয়ে আসার পরে দু কামরার এই ফ্ল্যাটেই সে নিজের মতো করে গত দু বছর আছে। সকাল নটার মধ্যে বেরিয়ে যায়, ফিরতে ফিরতে রাত নটা। কেউ তার খোঁজ নেয় না, সেও অন্যের ব্যাপারে নাক গলায় না। ওঠানামার পথে কারোর সঙ্গে দেখা হলে ওই হাই-হ্যালোটুকুই যা হয়। প্রথম দশকের আদর্শ নাগরিক সে। তার ফ্ল্যাটের দু পাশে সমকোণে আরও দুটো ফ্ল্যাটের দরজা। ডানদিকেরটায় একটা পরিবার থাকে, তারা আগের সপ্তায় দু-তিনটে ঢাউস ব্যাগ নিয়ে কোথাও গেল। বেড়াতে গেছে নিশ্চয়। অন্যটা গত ছ মাস ধরে বন্ধ। তারই বয়সি একটা ছেলে থাকত। গলায় ঝোলানো ট্যাগ দেখে বুঝেছে সেও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। অনসাইট গেছে হয়তো। এই পাঁচতলা ফ্লাটবাড়ির ওপরে-নিচে আরও দুটো করে ফ্লোর। কোনও ফ্ল্যাটেই কি কেউ নেই?
এখন উপায়? বাইরে পাগলটা মুখ থেকে বিচিত্র আওয়াজ করতে করতে পায়চারি করছে। অপেক্ষা করছে বিহানের বাইরে আসার। এবার সে একটু থমকাল। এখনই তার বাইরে যাওয়ার কোনও দরকার নেই। সত্যি বলতে কী, শুক্রবার রাতে ফ্ল্যাটে ঢুকে আবার সে বাড়ি থেকে বের হয় একেবারে সোমবার সকালে। কখনও নিজেই কিছু বানিয়ে নেয় খাওয়ার জন্যে। কখনও পিজ্জা অর্ডার করে। আজকাল কিছু কিছু ওয়েবসাইটে অর্ডার করলেও কাছাকাছি রেস্তোঁরা থেকে বাড়ি বয়ে খাবার দিয়ে যায়। আজও দুপুরে চিকেন বিরিয়ানি খেয়েছে সে। হাত ধুয়ে খেয়াল হল ফ্রিজে কোনও সফট ড্রিংক্স নেই। বায়বীয় বা তরল কোনও নেশাই তার নেই বটে, কিন্তু এই একটা জিনিসের প্রতিই সে বেশ দুর্বল। তাই ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই চটজলদি মোড়ের দোকান থেকে একটা দু লিটারের বড় বোতল নিয়ে ফিরছিল সে। ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতেই ফোনটা এল। কোনও ক্রেডিট কার্ড কোম্পানির ফোন। বিরক্ত মুখে ফোনটা কেটে দিয়ে পকেটে ঢোকানোর আগেই কোত্থেকে এই পাগলটা এসে দারুণ জোরে ধাক্কা দিল। পানীয়র বোতলটা সামলে ধরতে গিয়ে বেখেয়ালে রাস্তার ওপর গিয়ে পড়ল ফোনটা। পাগলটা তার গলাটা টিপে ধরার চেষ্টা করছে তখন। বিহানও আকস্মিক আগাতের বিস্ময় কাটিয়ে ক্রমাগত বাধা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সুবিধা করতে না পেরে এবার পাগলটা তার ময়লা হাত দুটো দিয়ে হাঁচড় পাঁচড় করে বিহানের টিশার্ট মুঠো করে ধরে তার গলা লক্ষ করে কামড়াতে এল। হাতের বোতলটা দিয়ে লোকটার মাথায় মরিয়া একটা আঘাত করে তার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বাড়ির দিকে দৌড় দিল বিহান।
এতক্ষণে হাতের বোতলটার দিকে নজর গেল তার। কিচেনের সিঙ্কে গিয়ে বোতলটা বাইরে থেকে একটু ধুয়ে নিল। নোংরা জামাকাপড় গায়ে রাস্তায় শুয়ে থাকা ওই পাগলের গায়ে মাথায় লেগেছে ওটা। তারপর দু-তিন ঢোক পানীয় গলায় ঢেলে বিহান মাথা নাড়ল। মোবাইলটা গেল বোধ হয়। এতক্ষণে কেউ না কেউ তুলে নিয়েছে। সিমটা ব্লক করতে হবে। কিন্তু তার থেকেও বড় সমস্যা দরজার বাইরে একটা পাগল অপেক্ষা করছে তার জন্যে। কিন্তু কতক্ষণ? বিহান না বের হলে, ঘণ্টাখানেক পরে লোকটা নিশ্চয় নিজে থেকেই চলে যাবে। তাছাড়া অন্যান্য ফ্ল্যাটের মানুষজন দেখতে পেলে নিশ্চয়ই ওকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করবে। বিহান টিভি চালাল। খেলা শুরু হয়ে গেছে। ভারত ব্যাট করছে। ভেতরে টিভির আওয়াজ পেয়ে পাগলটা বাইরে থেকে আবার দুমদুম করে কয়েকবার ধাক্কা দিল। তারপর শুরু হল করকর করকর শব্দ। মনে হল নখ দিয়ে দরজার গায়ে আঁচড়াচ্ছে। বিহান টিভির আওয়াজ আরও বাড়িয়ে দিয়ে বাইরের শব্দটা চাপা দিতে চাইল।


কালীজ্যাঠার কোষ্ঠীবিচার

কালীজ্যাঠার সঙ্গে দেখা করার পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে অনাদি গলার যন্ত্রণায় কথা পর্যন্ত বলতে পারছেন না। তবু যেহেতু জ্যাঠামশায় বলেছেন, তাই বাবার পুরানো তোরঙ্গ থেকে লাল শালুতে মুড়ে রাখা কোষ্ঠীটা নিয়ে হাজির হলেন কালীজ্যাঠার বাড়ি। কালীজ্যাঠা বাড়ি ছিলেন না। পাশের পাড়ায় রোগী দেখতে গেছেন। অন্যসময় বাড়িতে আর কেউ থাকে না। কিন্তু গতকাল রাতে কালীজ্যাঠার ছেলে সস্ত্রীক কোলকাতা থেকে এসেছে গ্রামের বাড়িতে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল অনির্বাণ, মানে কালীজ্যাঠার ছেলে, সকালে উঠেই গ্রাম দেখতে বেরিয়েছে – অনেক দিন পর ফিরেছে কিনা। তা বাড়িতে আর কেউ নেই দেখে কালীজ্যাঠার পুত্রবধূ অনুরাধার হাতেই কোষ্ঠীটা দিয়ে অনাদি কোনওরকমে বললেন – “এটা জ্যাঠাকে...” গলার যন্ত্রণায় কথা বলতে পারছেন না ঠিক করে। তাই সোজা বাড়ির রাস্তা ধরলেন। গলায় পুলটিস লাগালে আরাম হতে পারে। সঙ্গে আদা-চা। আজ আর থানায় যাওয়া হবে না।
দুপুরবেলা একটু গলা-গলা খিচুড়ি খেয়ে চোখ বুজে ঝিমোতে ঝিমোতে একটা অদ্ভূত স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করলেন অনাদি। কালকের সেই কোকিলটা তাঁর কাছে এসে অনুনয়-বিনয় করছে – “খুব মেরেছে স্যার। এই দেখুন ডান চোখে ঘুঁষি মেরে কালশিটে ফেলে দিয়েছে।” এমন সময় বদখৎ কাকটা কোত্থেকে এসে রামায়ণপালার রাবণের মত হাসতে আরম্ভ করল – “এবার কে বাঁচাবে তোকে? এই সং সাজা খাকি পুলিশ? ওর তো গলার ব্যথা এখন।” সামান্য কাকের এত স্পর্ধা! অনাদি হুংকার দিয়ে উঠলেন – “খবরদার।” কিন্তু খবরদারের শেষ র-এর নিচে পুটকি পড়েছে কি পড়েনি; কাকটা অবিকল কালীজ্যাঠার গলায় ডেকে উঠল – “অনাদি, আছো? অ বৌমা, অনাদি কি খেয়ে আবার থানায় চলে গেল?” হাঁকডাকে অনাদির দিবানিদ্রা চটকে গেল।
নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন অনাদি, কালীজ্যাঠা নিজে এসেছেন তাঁর বাড়ি! গতিক সুবিধের নয়। বিনোদিনী ততক্ষণে কালীজ্যাঠাকে একটা চেয়ার টেনে বসতে দিয়েছে। কালীজ্যাঠা অনাদিকে দেখে বললেন – “না বৌমা। বসতে আসিনি। অনাদির সাথে একটু দরকার ছিল। ওর গলার সমস্যাটা নিয়ে দু-একটা নিদান দিয়েই চলে যাব।” তারপর বিনোদিনীকে একপ্রকার পাশ কাটিয়েই অনাদিকে বগলদাবা করে নিয়ে কালীজ্যাঠা শোওয়ার ঘরে ঢুকে এলেন। কালীজ্যাঠার হাতে অনাদির কোষ্ঠীটা। সেটা বিছানার একপাশে রেখে নিজেও বসলেন। তারপর নিচু গলায় অনাদিকে জিজ্ঞাসা করলেন – “তোমার কোষ্ঠী আগে আর কেউ দেখেছেন আমি ছাড়া?” অনাদির কোষ্ঠী এর আগে কালীজ্যাঠাই দেখেছিলেন বছর পাঁচেক আগে। আর আগে আর কেউ কখনও দেখেছেন বলে অনাদি জানেন না। ওটা বাবার তোরঙ্গেই তোলা থাকে সবসময়। অনাদি তাই মৃদু গলায় বললেন – “আপনি ছাড়া আর তো কেউ...” তাঁকে থামিয়ে দিয়েই কালীজ্যাঠা এবার একটা বেমক্কা প্রশ্ন করে বসলেন – “বৌমা কি অন্তঃসত্ত্বা?” অনাদি ফস করে বললেন – “জানি না তো।” এই চার মাস মাত্র তাঁর বিয়ে হয়েছে। এর মধ্যে বিনোদিনীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার মত কোনও কারণ ঘটেনি। কালীজ্যাঠা অসহিষ্ণু গলায় জিজ্ঞাসা করলেন – “জানো না মানে কী? তুমি যদি না জানো তো কে জানবে?” অনাদি দারুণ অস্বস্তিতে পড়লেন। সেটা কাটিয়ে উঠতে একটু অপ্রতিভ গলায় প্রশ্ন করলেন – “কিন্তু আপনি কেন জানতে চাইছেন?” কালীজ্যাঠা এক মুহূর্ত থামলেন। মনের ভেতর কথাগুলো গুছিয়ে নিলেন যেন।
“তোমার কোষ্ঠী রচনা করেছিলেন মহারাজ অকালসৎসঙ্গ নিজে। গতবছর মহারাজ কাশীতে সলিল সমাধি নিয়েছেন। নাহলে আমি নিজে গিয়ে ওনার সাথে আরও একবার গণনা মিলিয়ে আসতাম।” একটু দম নিয়ে কালীজ্যাঠা বললেন – “কিন্তু আমি নিশ্চিত আমার গণনা অভ্রান্ত।” অনাদি একটু কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলেন – “কোনও খারাপ ব্যাপার দেখছেন নাকি জ্যাঠামশায়?” কালীজ্যাঠা চোখ বন্ধ করে একটু গম্ভীর স্বরে বললেন – “আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তোমার মৃত্যু যোগ আছে।” তারপর চোখ খুলে অনাদিকে ব্যাপারটা হজম করার সময় না দিয়েই বললেন – “বিনোদিনীর গর্ভস্থ সন্তান তোমার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে।” অনাদির মাথা গুলিয়ে গেল – “গর্ভস্থ মানে? গর্ভে থাকা অবস্থায়?” কালীজ্যাঠা মাথা নেড়ে বললেন – “কিছুই বুঝতে পারছি না। সেটাই তো রহস্য। কিন্তু তোমার কোষ্ঠীর এই বড় ধাঁধার মর্মোদ্ধার করার সাধ্য আমার নেই। যিনি কিছু আলোকপাত করতে পারতেন। তিনি জলের গভীরে।” একটু থেমে দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন – “অবশ্য সেটা একটা ভালো খবরও বটে।” অনাদির দিকে ঝুঁকে ষড়যন্ত্রসংকুল গলায় বললেন – “তোমায় সে হত্যা করার আগেই, আমরা তাকে হত্যা করব।”


বিহানের পুলিশি জেরা

খেলা দেখতে দেখতে সোফাতেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ দারুণ একটা আওয়াজে বিহান উঠে বসল। আওয়াজটা দরজা থেকে আসছে। পাগলটা কি এখনও যায়নি? বাইরে সন্ধ্যার অন্ধকার। বাংলাদেশ ব্যাট করছে। দরজায় আবার তীব্র আঘাতের শব্দ, সঙ্গে কেউ যেন কিছু বলছে। বিহান এবার টিভিটা মিউট করল। এবার কে যেন অধৈর্য হাতে কলিং বেল টিপছে। বিহান গলা তুলে প্রশ্ন করল – “কে?” ওদিক থেকে ভারী গলায় উত্তর এল – “পুলিশ। দরজা খুলুন।” বিহান থতমত খেয়ে গেল। পুলিশ! কেন? পাগলটার সঙ্গে কিছু যোগসূত্র আছে? বিহান দরজার আই হোলে চোখ রেখে দেখল। দুজন মানুষ তার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। একজনের গায়ে পুলিশের পোশাক। অন্যজন ফর্মাল শার্ট-প্যান্টে। সিঁড়ির মুখ দাঁড়িয়ে আছেন আরও তিন-চারজন। এরা অবশ্য এই ফ্ল্যাটবাড়িরই বাসিন্দা। দুরুদুরু বুকে বিহান দরজা খুলল।
বিহান দরজা খুলে বেরোতেই সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের মধ্যে একটা মৃদু গুঞ্জন শুরু হল। আই হোল থেকে তিন-চারজনকেই দেখতে পেয়েছিল বিহান। আদতে আরও বেশি লোক জড়ো হয়েছে। পুলিশের ইউনিফর্ম পরা বেশ মোটা গোঁফওয়ালা অফিসার জিজ্ঞাসা করলেন – “নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন? আর এদিকে আপনার দরজার বাইরে মানুষ খুন হয়ে পড়ে আছে খবর রাখেন না?” তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে বিহান যা দেখল, তাতে তার মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল। পাগল লোকটা গুটিসুটি মেরে বাঁদিকে ফ্ল্যাটটার দরজার পাশে পড়ে আছে। তার নাক থেকে থেকে সরু রক্তের শুকনো ধারা বেরিয়ে এসেছে ঠোঁটে আর এলোমেলো দাড়ি-গোঁফে মাখামাখি হয়ে গেছে। পাশে একটা চপ্পল পড়ে। বিহানের। পাগলটার তাড়া খেয়ে দ্রুত দরজা খুলে ঢুকতে গিয়ে ওটা পা থেকে খুলে গিয়েছিল। একজন মানুষ একটা ক্যামেরা দিয়ে পাগলটার ছবি তুলছিলেন। তিনি এবার এগিয়ে এসে বললেন, “স্যর, বডি তুলতে বলি?” তার দিকে না তাকিয়েই গুঁফো মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তারপর বিহানকে জিজ্ঞাসা করলেন, “লোকটাকে চেনেন?” বিহান এতক্ষণ পাগলটাকে দেখছিল। মরা মাছের মতো চোখ। মুখটা সামান্য হাঁ হয়ে আছে। ঠোঁটের কষ থেকে ফেনা বেরিয়ে এসেছে। বিষ খেলে নাকি এমন হয় শুনেছে বিহান। মুখে দাড়ি গোঁফের জঙ্গল। গায়ে ধুলো-ময়লামাখা প্যান্ট-শার্ট। আগে চোখে পড়েনি। এখন দেখল, লোকটার কাঁধে একটা ময়লা শান্তিনিকেতনী ব্যাগ। আগে কী রঙ ছিল বোঝার উপায় নেই, এখন সেটা বাদামি। কেন জানে না, কিন্তু বিহানের মনে হচ্ছে দারুণভাবে এই লোকটাকে চেনে সে। গুঁফোর প্রশ্ন শুনে সে সম্বিত ফিরে পেল। ঘাড় নেড়ে বলল, “না। চিনি না।” পরের প্রশ্ন, “আপনার দরজার সামনে কী করে এল জানেন?” বিহান ততক্ষণে প্রাথমিক আঘাতটা কাটিয়ে উঠেছে। তাই যে কৌশলে বাঘা বাঘা ক্লায়েন্টদের সামলায়, সেই একই কায়দায় চটজলদি উত্তর দিল –“বারবার আমার দরজা বলছেন কেন? লোকটা তো ওই ফ্ল্যাটের দরজার পাশে পড়ে আছে।” গুঁফোর পাশের ফর্মাল শার্ট এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। এবার তিনি মুখ খুললেন – “ওই চপ্পলটা আপনার?” সত্যি বলা উচিত হবে কিনা চিন্তা করতে করতেই বিহান বলে ফেলল – “হ্যাঁ।” তারপর তিনি বিহানের দরজার দিকে দেখালেন – “এটা আপনার লেখা?” বিহান দেখল দরজায় আঁচড় কেটে লেখা আছে – ‘কাউয়াম্যান’। দেখে মনে হচ্ছে ছোট ইঁটের টুকরো দিয়ে কেউ ঘষে ঘষে লিখেছে। তার মানে তখন যে শব্দটা নখের আঁচড় মনে হচ্ছিল, সেটা আসলে এই শিল্পকর্মের ফল। কিন্তু কাউয়াম্যান মানে কী?
নিরুত্তর বিহানকে পাশ কাটিয়ে দুই পুলিশ অফিসার ঢুকে পড়লেন বিহানের ফ্ল্যাটে। এদিক-ওদিক দেখে ফর্মাল শার্ট গুঁফোকে বললেন – “অনেক করে ফেলল তো ওরা!” গুঁফো ফোঁত করে নাক থেকে একটা আওয়াজ ছাড়লেন – “করতে দিন স্যর। ৩৭০ তাড়া করলে ২৭০ তো যে কেউ করে ফেলবে।” তারপর হঠাৎই বিহানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “হ্যাঁ, আপনি যেন কী বলছিলেন... লোকটা কী করে আপনার দরজায় এসে পৌঁছাল?” বিহান ততক্ষণে উৎসুক পড়শিদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। গুঁফোর দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল – “আমি দোকানে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে এই লোকটা আমায় ধাক্কা মারে। তারপর কামড়াতে যায়। আমি কোনওরকমে পালিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিই।” ফর্মাল শার্ট এবার প্রশ্ন করলেন, “তাহলে লোকটা মরল কী করে? দেখে তো মনে হচ্ছে বিষ দেওয়া হয়েছে। অল্পবিস্তর মারধোরও করা হয়েছে মনে হয়।” বিহান এবার সত্যিই ভয় পেল। সে টেবিলের ওপর বসানো সফট ড্রিংক্সের বোতলটা দেখিয়ে বলল, “লোকটার হাত থেকে বাঁচার জন্যে আমি ওই বোতলটা দিয়ে তার মাথায় মেরেছিলাম।” তার উত্তরে গুঁফো ঘোঁত করে একটা আওয়াজ ছাড়লেন নাক দিয়ে। একবার তাঁর দিকে আর একবার ফর্মাল শার্টের ভাবলেশহীন মুখের দিকে তাকিয়ে বিহান বলল, “আস্তেই মেরেছিলাম। তারপর আমায় ধাওয়া করে লোকটা এখানে এসে পৌঁছায়। দরজায় খুব জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছিল বলে আমি দরজা বন্ধ করে টিভি চালিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আপনারা এসে ডাকতে ঘুম ভাঙল।” ফর্মাল শার্ট ততক্ষণে সফট ড্রিংক্সের বোতলটা খুলে এক ঢোঁক পানীয় গলায় ঢাললেন। তারপর বোতলের ছিপি আঁটতে আঁটতে বললেন, “আপনাকে আমাদের সঙ্গে থানায় আসতে হবে।” বিহান হতাশ স্বরে বলল, “আমায় কি এ্যারেস্ট করছেন? বিনা ওয়ারেন্টে এভাবে আমাকে এ্যারেস্ট করতে পারবেন না কিন্তু।” গুঁফো এবার একটা ধমক দিলেন – “ওসব নাটুকে ডায়লগ ছাড়ুন তো। থানায় চলুন, একটা জবানবন্দী দেবেন। ছেড়ে দেব।” বিহান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “যেতে পারি একটা শর্তে। পাগলটার ধাক্কায় আমার মোবাইল ফোনটা রাস্তায় পোড়ে গিয়েছিল। ফোনটা আমার খুব দরকার। সেটা খুঁজে দিতে হবে।” গুঁফো তেরিয়া হয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি মুখ খোলার আগেই বিহান বলল, “আমার বাবা পুলিশে ছিলেন। তিনি বলতেন, কলকাতা শহরে একটা ছুঁচ হারিয়ে গেলেও পুলিশ খুঁজে দিতে পারে। পুলিশের অসাধ্য কিছুই নেই।” ফর্মাল শার্ট বললেন, “আপনার মোবাইল নাম্বারটা বলুন। ভাগ্য ভালো থাকলে পেয়ে যাবেন। তবে ভাববেন না, আমাদের সঙ্গে থানায় আসছেন বলে এটা খোঁজার চেষ্টা করছি।” একটু থেমে গুঁফোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “চলো।”
ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে দেখা গেল পাগলটার মৃতদেহ সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে তার বিশেষ কোনও চিহ্ন নেই, তবু বিহানের মনে হল একটা বড় শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে জায়গাটাতে। সিঁড়িতে, ফ্ল্যাট বাড়িটার মূল ফটকের সামনে কিছু লোকের ইতিউতি ভিড়। পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে বিহানকে দেখে সবাই চুপ করে গেল। বোঝাই যাচ্ছে, নিস্তরঙ্গ জীবনে এমন মুখরোচক ঘটনায় সবাই-ই মনে মনে বেশ উত্তেজিত। আলোচনার উপাদান পেয়ে কেউ কেউ বেশ খুশিই বোধ হয়। এক প্রৌঢ় ফিসফিস করে পাশের জনকে বলছেন শোনা গেল – “ভাবা যায়? দেখে বোঝার উপায় নেই!” বিহানরা একটা পুলিশ জিপে উঠল। ফর্মাল শার্টের ইশারায় ড্রাইভারের পাশে গিয়ে বসলেন গুঁফো। পেছনে বিহানের সঙ্গে তিনি বসলেন। গাড়িটা ফ্ল্যাট বাড়ির চৌহদ্দি ছেড়ে গলি রাস্তায় পড়তে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন – “এঁদের সঙ্গে আপনার তেমন আলাপ পরিচয় নেই, না?” বিহান মাথা নাড়ল। বুক পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে ফর্মাল শার্ট বিহানের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন। সে ইশারায় ‘না’ বলল। ফর্মাল শার্ট নিজে একটা সিগারেট বের করে প্যাকেটটা যথাস্থানে রাখতে রাখতে বললেন, “এঁদের একজন স্থানীয় কাউন্সিলরের শালা। তিনি রিপোর্ট করেছেন বলেই আমায় আসতে হল।” তারপর গুঁফোর থেকে লাইটার চেয়ে নিয়ে সিগারেটটা ধরাতে ধরাতে বললেন, “কিন্তু এখানে এসে তাঁকে পেলাম না। কী একটা জরুরি কাজে বেরিয়ে গেছেন নাকি। বাকি জিজ্ঞাসাবাদ করেও তো তেমন কিছুই পাওয়া গেল না। কেউই কিছু দেখেনি।” তারপর নিজের মনেই বললেন, “এসব ক্ষেত্রে কেউই কিছুই দেখে না।” তারপর প্রসঙ্গ বদলাতে সিগারেটে টান দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “আপনার বাবা পুলিশে ছিলেন বললেন, রিটায়ার করেছেন?” বিহান ঘাড় নাড়ল – “না, আরও কয়েক বছর সার্ভিস ছিল। বাবা মারা গেছেন। ক্যানসার। ন বছর হয়ে গেছে।” ফর্মাল শার্ট মাথা নেড়ে বললেন, “স্যাড।” একটু থেমে সিগারেটে আবার একটা টান দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “নাম কী?” বিহান বলল, “অনির্বাণ চক্রবর্তী।”


অনাদির কলকাতা যাত্রা

কালীজ্যাঠা অমন অলক্ষুণে খবর শুনিয়ে যাওয়ার পরে সে রাতে অনাদির ঘুম এল না। তাঁর শরীর ঘেঁষে অঘোরে ঘুমোচ্ছেন বিনোদিনী। গত দু-তিনদিন অনাদি গলার যন্ত্রণার জন্যে তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ছিলেন। কিন্তু আজ বাড়ির সমস্ত কাজ সেরে রান্নাঘর বন্ধ করে বিনোদিনী বিছানায় আসার পরও তাঁকে জেগে থাকতে দেখে, জিজ্ঞাসা করলেন – “আজ ঘুমোওনি যে? গলায় খুব কষ্ট হচ্ছে?” প্রশ্ন এড়াতে একটা সংক্ষিপ্ত “হুঁ” দিয়েই অনাদি পাশ ফিরে শুলেন। বিনোদিনী মশারির ভেতর ঢুকে নিজের জায়গায় শুয়ে একহাত রাখলেন অনাদির পিঠে। মৃদুস্বরে ডাকলেন – “শুনছ?” কিন্তু স্ত্রীর এই আহ্বানকে অগ্রাহ্য করে ঘুমের ভান করে অনাদি নড়লেন না। কোনও সাড়া না পেয়ে বিনোদিনী ঘুমিয়ে পড়লেন সারাদিনের শ্রান্তিতে। কিন্তু অনাদির চোখে ঘুমে নেই।
কালীজ্যাঠার কথাগুলো ধাঁধাঁর মত লাগছে। তাঁর স্ত্রীর গর্ভস্থ শিশু তাঁকে হত্যা করবে – এমন কথা তাঁর কোষ্ঠীতে লেখা আছে? বিয়ে হয়েছে এখনও চার মাস পূর্ণ হয়নি। এত তাড়াতাড়ি সংসারবৃদ্ধির কোনও ইচ্ছে অনাদির নেই। সেই মত উপযুক্ত ব্যবস্থাও তিনি নিয়েছেন স্ত্রী সংসর্গের সময়। কিন্তু তবু আজ এই রাতের অন্ধকারে একা একা আশংকিত জেগে রইলেন। মাঝে একবার তন্দ্রা এল। অনাদি স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করলেন – গেরুয়া বসন পরে বনের মধ্যে একটা কুটিরের সামনে তিনি ধ্যানস্থ। একটা অস্পষ্ট আওয়াজে সরু করে চোখ খুলে চোখের কোণ দিয়ে দেখলেন একটা বাচ্চা ছেলে তীর আর ধনুক হাতে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। অনাদি ধ্যান-ট্যান ছেড়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন – “কাকে চাই বৎস?” বাচ্চাটার খালি গা, পরনে একটা ধুতি, মাথা ন্যাড়া, কপালে একটা লাল তিলক। সে তার তিরটা ধনুকে চড়িয়ে তাক করল অনাদির দিকে – “তোমার প্রাণ চাই আমি।”
অনাদি গোঁ-গোঁ করছেন দেখে বিনোদিনী ঠেলে তাঁর ঘুম ভাঙালেন – “জল খাবে?” বাইরের বারান্দার ঘড়িতে ঢং-ঢং শব্দে ৩টে বাজল। জল খেয়ে অনাদি নিচু স্বরে বিনোদিনীকে জিজ্ঞাসা করলেন – “আজ কালীজ্যাঠা জিজ্ঞাসা করছিলেন, আমরা খোকাখুকুর ব্যাপারে কিছু ভেবেছি কিনা।” তারপর যোগ করলেন – “তুমি কিছু ভেবেছো বিনু?” বিনোদিনী লজ্জায় লাল হয়ে চুপ করে রইলেন। তারপর অনাদির গলা জড়িয়ে কানে কানে বললেন – “জানি না যাও।” এই জাতীয় উত্তরে অনাদি দারুণ দিশেহারা হয়ে যান। তাই মনে মনে জেরার ধরন পালটে ফেলে প্রশ্ন করলেন – “তুমি চাও না?” বিনোদিনী আরও লজ্জাজড়িত কন্ঠে উত্তর দিলেন – “তুমি যে বলেছিলে, এখনই নয়...” অনাদি শেষমেশ প্রশ্নটা করেই ফেললেন – “এখনও কিছু হয়নি তো?” কিন্তু তাতে জটিলতা রয়েই গেল। কারণ বিনোদিনী আবারও পুরানো উত্তরে ফিরে গেলেন – “জানি না যাও।” অনাদি এরপর শুয়ে শুয়ে একের পর এক চারটে-পাঁচটা-ছটা বাজতে শুনলেন। কিন্তু একফোঁটা ঘুমও আর হল না।

পরদিন দুপুরে কালীজ্যাঠার ছেলে অনির্বাণ এবং পুত্রবধূ অনুরাধার নেমন্তন্ন ছিল অনাদির বাড়িতে। গত কয়েকদিন গলার যন্ত্রণায় থানায় নিয়মিত যেতে পারছিলেন না বলে সেদিন সকালে একবার হাজিরা দিয়ে এসেছেন বটে, কিন্তু সব মিলিয়ে খুবই বিক্ষিপ্ত ছিল অনাদির মন। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে কর্তব্যে অবহেলা করার মত মানুষ তিনি নন। এর আগে জ্বর গায়েও একাধিকবার তিনি থানায় গিয়ে বসে থেকেছেন, চোর-ডাকাতের পেছনে ছুটেছেন। কিন্তু এবার এমনভাবে ব্যথাটা তাঁকে কাবু করে ফেলেছে যে, তিনি মানসিকভাবে দারুণ অসহায় বোধ করছেন। অতিথিদের সঙ্গে কথাবার্তাও বলতে পারছেন না ওই ব্যথার জন্যেই। কোনওরকমে হুঁ-হাঁ এবং আকার ইঙ্গিতে কথা বলছিলেন ভদ্রতার খাতিরে। অনির্বাণ কলকাতা পুলিশের পদস্থ অফিসার, অনাদির থেকে বেশ বছর পাঁচেকের সিনিয়ার। চাকরির শুরুতে কলকাতার অলি-গলিতে ঘুরে ঘুরে কীভাবে পকেটমার আর চোরগুলোকে শায়েস্তা করেছেন, খেতে খেতে সেই গল্প বলছিলেন। বিনোদিনী সেগুলো শুনতে শুনতে মুচকি-মুচকি হাসছিলেন। অনাদির থেকেও এগুলো কম শুনতে হয় না তাঁকে। অনুরাধাও মাঝে মাঝে টীকা-টিপ্পনি যোগ করছিলেন। শুধু অনাদি মাদুরের একদিকে বসে প্রায় নিঃশব্দে তাঁর খিচুড়ি গলাধঃকরণ করছিলেন।
অনির্বাণ তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন – “অনাদি, তুমিও কিছু শোনাও। এদিকে মাঠ ভেঙে, বন-বাদাড় ঠেঙিয়ে তোমাকেও তো এদিক-ওদিক ছুটতে হয়।” অনাদি যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলেন, অনির্বাণের প্রশ্নে সেই চটক ভেঙে একটু অপ্রস্তুত হাসলেন। তারপর কিছু একটা বলার চেষ্টা করতেই বিষম খেলেন। তাঁকে জলের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে, পিঠে আলতো চাপড় দিয়ে বিনোদিনী বিব্রত মুখে বললেন – “আসলে ওনার গলার ব্যথাটা এমন বেড়েছে... কী করে যে হল?” অনুরাধা চিন্তিত মুখে বললেন – “ঠিক মতো ডাক্তার দেখাচ্ছেন না কেন, বুঝতে পারছি না। এগুলো কিন্তু অবহেলা করা মোটেও উচিত নয়।” তারপর স্বামীর দিকে ঘুরে জিজ্ঞাসা করলেন – “তোমার সঙ্গেই চাকরি করতেন সেই যে কী যেন নাম... বিশ্বম্ভর না?” অনির্বাণ মাথা নেড়ে বললেন, “না, ন, বিশ্বম্ভর কেন হতে যাবে? বিলোচনের কথা বলছ তো? হ্যাঁ, খুব বাজে ব্যাপার হয়েছিল।” জানা গেলে, অনির্বাণের সহকর্মী বিলোচনের প্রথমে গলায় ব্যথা হত মাঝে মাঝে। ঠান্ডা লেগেছে ভেবে সেভাবে পাত্তা দেননি। কয়েক মাস পরে ব্যাপারটা সামান্য বাড়াবাড়ির পর্যায়ে যেতে ডাক্তার দেখালেন ঠিক করে। জানা গেল গলায় ক্যান্সার। তারপর মাস ছয়েক বেঁচেছিলেন ভদ্রলোক। অনির্বাণ বিষণ্ণ মুখে বললেন, “বাচ্চা একটা ছেলে আছে। ওদের যে কী কষ্টে চলছে এখন! বউদিও তেমন একটা লেখাপড়া করেননি, যে কিছু বিলোচনের জায়গায় কিছু চাকরি পাবেন।” তারপর অনাদির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখানে ডাক্তারপাতি কেমন পাবে জানি না। আমরা পরশু ফিরছি। তুমি বরং আমাদের সঙ্গে কলকাতায় চলো। সঙ্গে বউদিও আসুন। আমাদের বাসায় তোমাদের দুজনের থাকতে কিছুমাত্র অসুবিধা হবে না। ভালো করে ডাক্তার দেখিয়ে নাও। কলকাতায় ঘুরে বেড়াও।”
ঠিক করে কথা না বলতে পারলেও অনাদি আপত্তি করতে শুরু করলেন। তাঁর ভাঙা ভাঙা শব্দগুলো জুড়ে বোঝা গেল, কলকাতায় যাওয়ার মতো ছুটি তিনি পাবেন না। থানায় ফাইলপত্রের অনেক কাজ জমে আছে, সেগুলো সামনের সপ্তার মধ্যে শেষ করতে হবে। কিন্তু বিনোদিনীর মাথায় তখন বিলোচনবাবুর কথা গেঁথে গেছে। তাই অনাদির ঘড়ঘড়ে প্রতিবাদ ধোপে টিকল না। ঠিক হল, অনির্বাণরা কলকাতা পৌঁছে ভালো ডাক্তারের খোঁজ জানিয়ে টেলিগ্রাম করলেই অনাদি এবং বিনোদিনী তাঁদের বাসায় গিয়ে উঠবেন।

অনাদির বাড়িতে জোরকদমে কলকাতা যাত্রার প্রস্তুতি শুরু হল।


ডুপ্লিকেট বিহান

সেদিন থানা থেকে রাতে ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাবার পরিচয় দেওয়ার পর বিহানকে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। বরং ফর্মাল শার্ট বেশ নরম সুরেই কথাবার্তা বলছিলেন। দুপুরে যা ঘটেছিল, সেটার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ একটা ফুলস্ক্যাপ কাগজে লিখিয়ে নিয়ে বিহানকে দিয়ে সই করিয়ে গুঁফোকে দিয়ে বিহানকে রাতে এগারোটা নাগাদ বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। থানা থেকে বেরোনোর আগে বিহানকে বলেছিলেন, “দেখুন, আপনি হয়তো নির্দোষ। কিন্তু কেউ বা কারা একটা লোককে খুন করে আপনার দরজার কাছে ফেলে রেখেছিল। তাই সময়-অসময়ে আপনাকে হয়তো বিরক্ত করব।” তারপর বিহানের দিকে তার হারিয়ে যাওয়া মোবাইলটা বাড়িয়ে ধরে ঝকঝকে হেসে বলেছিলেন, “আপনার বাবা ঠিকই বলতেন। পুলিশের অসাধ্য কিছুই নেই।” বিহান হাতে নিয়ে দেখল, ছিটকে পড়ার জন্যে ফোনের ওপর দু-চারটে আঁচড় পড়েছে এদিক-ওদিক। এছাড়া আর কোনও ক্ষতি হয়নি।
সেদিন রাতে থানা থেকে ফেরার সময় সন্ধেবেলার জটলাটা আর ছিল না। তাই রবিবার দুপুর নাগাদ ঘুম থেকে উঠে এক প্যাকেট ম্যাগি উদরস্থ করে বিহান গিয়ে বসেছিল তাদের ফ্ল্যাটবাড়ির সামনের বাঁধানো রকে। উদ্দেশ্য ছিল, সবাইকে দেখিয়ে দেওয়া যে, পুলিশ তাকে ফাটকে পোরেনি। কিন্তু রবিবারের দুপুরের ভাতঘুম থেকে উঠে কে-ই বা আর নির্দোষ বিহানকে দেখতে আসছে। শুধু একজন মধ্য-চল্লিশের এক টেকো ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হল। বিহান এর আগে কয়েকবার তাঁকে দেখেছে, নাম জানে না। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনাকে এ্যারেস্ট করেনি তাহলে?” তাঁর বক্তব্যে বোধ হয় সূক্ষ্ম আশাভঙ্গের সুর ছিল কোথাও। তাই নিজেকে তাড়াতাড়ি শুধরে নিয়ে বললেন, “দ্যাটস্‌ গুড! কোথাকার কে, এসে মরে পড়ে আছে। তাতে আপনার কী? পুলিশ দেখবেন নিরীহ লোকদেরই ঝুট ঝামেলায় জড়ায়।” বিহান মাথা নেড়ে বলল, “তা ঠিক। কাল থানায় বলছিল, আবার এসে এ বাড়ির প্রতিটা ফ্ল্যাটে জেরা করবে। যতই হোক, খুন তো।” টেকো মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেলেন – “এসব ঝামেলার কোনও মানে হয়?”
কিছুক্ষণ পরে সেখান থেকে উঠে নিজের ফ্ল্যাটে ঢোকার সময় বিহানের চোখে পড়ল কালকের সেই লেখাটা। কাউয়াম্যান। মানে কী শব্দটার?

এর পরের কয়েকদিন অফিসে কাজের চাপে ঘটনাটা ক্রমশ আবছা হয়ে যাচ্ছিল বিহানের কাছে। হঠাৎ করেই বৃহষ্পতিবার সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ফর্মাল শার্টের ফোন এল। “একবার থানায় আসতে পারবেন?” বিহান একটা প্রোপোজালের খসড়া বানাচ্ছিল, তাই বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “এখন?” ফর্মাল শার্ট সেই বিরক্তিটা পড়তে পেরেছেন মনে হল। তাই বললেন, “ হাতের কাজ শেষ করে আটটার মধ্যে চলে আসুন। বেশ ইন্টারেস্টিং কিছু খবর আছে।” তারপর একটু থেমে বললেন, “রহস্য বেশ ঘনীভূত।” কৌতূহল দমন করেই বিহান নিজের কাজে ফিরে গেল।
সল্টলেক থেকে থানায় পৌঁছতে প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেল। ফর্মাল শার্ট সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে বললেন, “আপনার দেরি হচ্ছে দেখে ভাবছিলাম, আপনার অফিসেই গিয়ে একবার ঢুঁ মেরে আসি।” তারপর বিহানের সন্ত্রস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভয় নেই, কখনও গেলে পুলিশ জিপে যাব না। কেউ টেরও পাবে না।” সামান্য হেসে যোগ করলেন, “যতক্ষণ না আপনি অপরাধী হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছেন।” বিহান এবার কাঁধ ঝাঁকাল, “দেখুন, আমি যা বলেছি, তার মধ্যে একটুও মিথ্যা নেই।” ফর্মাল শার্ট টেবিলের ওদিক থেকে বিহানের দিকে সামান্য ঝুঁকলেন, “যা বলেছেন, তা হয়তো সত্যি। কিন্তু যা বলেননি তার মধ্যেও তো কিছু সত্যি থাকতে পারে?” বিহান কথাটার মানে বুঝতে না পেরে চুপ করে রইল। আবার প্রশ্ন এল – “আপনি আমাদের কিছু একটা বলছেন না। কী সেটা?” বিহান বুঝল, তাকে চাপে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাই সে প্রাণপণে শান্ত থাকার চেষ্টা করে ঘাড় নাড়ল – “আমি যা বলেছি, ততটুকুই জানি।” ফর্মাল শার্ট এবার বললেন, “যে লোকটা খুন হয়েছে, তার সঙ্গে একটা ব্যাগ ছিল।” বিহানের মনে পড়ে গেল সেই শান্তিনিকেতনী ব্যাগটার কথা। “ওই ব্যাগে একটা নোটবুক ছিল।” টেবিলের ওপর রাখা ফাইল ট্রে-র ওপর একটা সবুজ রঙের জায়গায় জায়গায় ছাল-ওঠা রেক্সিনে বাঁধানো খাতা দেখিয়ে ফর্মাল শার্ট বললেন, “এই নোটবুকের শুরুতে আমরা একটা নাম পাচ্ছি। অনুরাধা চক্রবর্তী। ঠিকানা যেটা পাচ্ছি...” বিহানের বুকের মধ্যে দ্রুম-দ্রুম দামামা শুরু হল। তার মায়ের নোটবুক কী করে ওই পাগল লোকটা পেল? কী সম্পর্ক ছিল তাদের পরিবারের সঙ্গে লোকটার? তাহলে কি ও তাদেরই কোনও আত্মীয়? ফর্মাল শার্ট ঠিকানাটা পড়তে হৃদ্‌স্পন্দন আরও বেড়ে গেল। ৩০ এ শান্তিনিবাস রোড – বিহান তার ছোটবেলার অধিকাংশ সময়টা কাটিয়েছে। সে অস্ফুটে বলল, “আমাদের বাড়ির ঠিকানা।” ফর্মাল শার্ট মাথা নেড়ে বললেন, “ঠিক তাই। আমি পুরোনো রেকর্ড মিলিয়ে দেখেছি। কোনও কারণে অনির্বাণ চক্রবর্তী পুলিশ কোয়ার্টারে জায়গা পাননি। তাই দু কামরার ওই ছোট্ট ফ্ল্যাটে সংসার পেতেছিলেন স্ত্রী অনুরাধার সঙ্গে। মাসিক ভাড়া ছিল কুড়ি টাকা। ডায়েরিটা আপনার মায়ের বলেই মনে হচ্ছে। ছোটবেলায় দেখেছিলেন কখনও এটা?” বিহান মাথা নাড়ল। তারপর বেশ বুদ্ধিমানের মতোই প্রশ্ন করল – “কিন্তু এই ঠিকানার সঙ্গে আমার মায়ের নাম দেখে কী করে রেকর্ড মেলালেন? আমি তো সেদিন মায়ের নাম বলিনি। তাহলে হঠাৎ করেই বাবার সার্ভিস বুক ধরে ঠিকানা মেলাতে গেলেন কেন?” ফর্মাল শার্ট মুচকি হেসে বললেন, “আপনাকে দেখে মনে হচ্ছিল, থানায় বসে বেশ ঘাবড়ে গেছেন। সম্ভবত জীবন প্রথমবার থানায় এসেছেন। কিন্তু মাথাটা ঠিকই কাজ করছে। গুড।” তারপর একটা হলদেটে কাগজ বের করলেন ডায়েরির মধ্যে থেকে – “আপনার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। তার আগে এটা দেখুন তো। কাকে লেখা, কে লিখেছেন, সেসব কিছুর উল্লেখ নেই।” বিহানের হাতে চিঠিটা তুলে দিলেন – “খুবই ইন্টারেস্টিং একটা চিঠি।”
চিঠির আকার খুব বড় নয়। ‘প্রিয় দিদিভাই’ সম্বোধনে চিঠিটা শুরু হয়েছে। যে ভদ্রমহিলা লিখেছেন, তিনি অনুরোধ করেছেন, তাঁর মৃত্যুর পর পত্রের প্রাপিকা যেন তাঁর সদ্যোজাত শিশুপুত্রের ভার নেন। জানা গেল, পত্রের লেখিকা খুব শীঘ্রই এই ধরাধাম থেকে বিদায় নিচ্ছেন। কারণ স্পষ্ট করে কিছু লেখা নেই। চিঠি পড়ে মনে হয় অনিচ্ছাকৃত কোনও হত্যার অনুশোচনায় আত্মহত্যা করতে মনস্থ করেছেন তিনি। ‘তোমার অভাগিনী বোন’ দিয়ে চিঠি (বা সুইসাইড নোটটা) শেষ হয়েছে। চিঠির ওপরে তারিখ আছে ১২ বৈশাখ, ১৩৯১। বিহান মনে করার চেষ্টা করল এখন বাংলার কত সাল। মনে করতে পারল না। বঙ্গাব্দের হিসাব রাখার দরকার পড়ে না। সে চিঠিটা ফর্মাল শার্টের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল – “এই চিঠির সঙ্গে আমি আমাদের পরিবারের কোনও ঘটনা রিলেট করতে পারছি না। খুন, আত্মহত্যা... আমি অন্তত কখনও শুনিনি এমন কিছু, আমাদের চেনাজানা কেউ কখনও সুইসাইড করেছিলেন বা এরকম কিছু। মাকে জিজ্ঞাসা করলেন পাওয়া যেতে পারে। চিঠিতে যে তারিখ আছে, সেটা ইংরাজিতে কত সাল?” ফর্মাল শার্ট বললেন – “ওটা দেখে নেব আমরা। দরকার হলে আপনার মায়ের সঙ্গেও কথা বলা যাবে। কিন্তু তার আগে সেই জিনিসটা আপনাকে দেখাই, যেটা দেখে আমি ক্লিন বোল্ড হয়ে গেছি।” একটা ছোট কাগজের টুকরো বিহানের হাতে তুলে দিয়ে ফর্মাল শার্ট বললেন – “এটা দেখুন। একটা রেজিস্ট্রি চিঠির রসিদ। ১৯৮৩-র ২৯শে জুন পাঠানো হয়েছে।” বিহান বিবর্ণ কাগজের টুকরোটা হাতে নিয়ে দেখল প্রাপকের জায়গায় হাওড়া জেলার বকুলপুর নামের একটা গ্রামে কালীপদ চক্রবর্তীর নাম লেখা আছে। প্রেরকের নামের জায়গায় লেখা আছে অনির্বাণ চক্রবর্তী। ঠিকানা সেই একই, যেটা সবুজ খাতাটার শুরুতেই লেখা ছিল।
কালীপদ চক্রবর্তী তার ঠাকুর্দার নাম। বকুলপুরে সেই কোন ছোটবেলায় গিয়েছিল। বাবা চলে যাওয়ার পর থেকেই কলকাতা ছেড়ে মা চলে গেছেন সেখানে, তাদের পুরোনো বসতবাড়িতে। বিহান ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরে এল মাকে কাছে রাখবে বলেই। কিন্তু মা রাজি হন না, বলেন – “অনেকগুলো মানুষের স্মৃতি আগলে এখানে বসে আছি। সেসব ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়।” কিন্তু... বিহান আবার বর্তমানে ফিরে আসে। তার বাবা তার দাদুকে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে রহস্য কোথায়? তবে হ্যাঁ, এর থেকে এটা বোঝা যায় ফর্মাল শার্ট কী করে তার মায়ের খাতায় লেখা ঠিকানা থেকে তার বাবার যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু কাগজটার দিকে তাকিয়ে বিহান স্তম্ভিত হয়ে গেল। একদম নিচের দিকে ছোট্ট করে তার নিজের হাতের লেখায় তার নাম সই করা – বি চক্রবর্তী। কিন্তু এ তো অসম্ভব! ১৯৮৩ মানে বিহানের জন্মেরও আগের ঘটনা। আর সে এই প্রথমবার এই কাগজের টুকরোটা দেখছে। কোথায় যেন অসম্ভব কিছু একটা ধরে ফেলতে গিয়েও ফসকে যাচ্ছে। ফর্মাল শার্ট রসিদটা বিহানের হাত থেকে নিয়ে বললেন, “সইটা খেয়াল করেছেন তো? আমিও প্রথমে বি চক্রবর্তীটা ধরতে পারিনি। কিন্তু আগের দিন আপনার দেওয়া জবানবন্দীর কাগজটা গুছিয়ে রাখতে গিয়ে গত পরশু হঠাৎই আপনার সইটা চোখে পড়ে। আমি সিগনেচার এ্যানলিস্টদের কাছে দুটো সই-ই পাঠিয়েছি। কিন্তু আমার খালি চোখে দেখে যা মনে হয়েছে, আর আপনার চোখমুখ বলে দিচ্ছে... আমার, আপনার দুজনেরই বিশ্বাস ওই রসিদের ওপর সইটা আপনার সইয়ের হুবহু নকল।” উত্তেজিতভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি এবার। তাঁর ছোট চেম্বারের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বললেন, “আমি গত দুদিন দিনরাত এই চেম্বারে বসে রেকর্ড ঘেঁটে দেখেছি। বি ফর বিহানই হতে হবে এমন কোনও কথা নেই। কিন্তু সই দুটো হুবহু এক, তাই কৌতূহলের বশেই খুঁজেছি। আন্দাজে ঢিল মারা বলতে পারেন। বিহান চক্রবর্তী নামে এক অপরাধীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল ১৯৮৪-র জানুয়ারিতে। কিন্তু মাস চারেকের মধ্যেই মানসিক রোগী হিসাবে তাকে এ্যাসাইলামে ভর্তি করা হয়ে। তারপর সেখান থেকে কোনওভাবে সে পালিয়ে যায়। এরপর বিস্তর খোঁজাখুঁজি করেও কোনওভাবেই তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্টও পেয়েছি আমরা। আর সেটা...” নাটকীয়ভাবে বিহানের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে একটা হাত রেখে বললেন, “খুন হওয়া লোকটার আঙুলের ছাপের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। ফরেনসিক এক্সপার্টরা তেমনই বলছেন আর কী।”
বিহানের পেটের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে একটা গোলকধাঁধার মধ্যে তাকে জোর করে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন এই পুলিশ অফিসার। তার সঙ্গে মজা করছেন বোধ হয়। হয়তো এর পেছনে আরও গভীর কোনও ষড়যন্ত্র কাজ করছে। অন্যায়ভাবে তার সই নকল করে ফাঁসিয়ে দিতে চাওয়া হচ্ছে। ফর্মাল শার্ট তার সামনাসামনি আবার চেয়ারে এসে বসলেন – “ব্যাপারটা যেটা দাঁড়াচ্ছে, সেটা এরকম। আপনার মায়ের ডায়েরি পাওয়া গেছে আপনারই এক নেমসেকের থেকে, যে কিনা একজন দাগী অপরাধী। পাগল। তার ওপর ফেরার। ছিল। যার শুধু নামই নয়, সইও আপনার সঙ্গে মেলে। আর সেই লোকটা আপনাকে খুঁজে বের করে আপনাকে আক্রমণ করেছিল। এখন কথা হচ্ছে...” বিহানের এবার পুরো ব্যাপারটা অসহ্য মনে হচ্ছিল। সে সটান চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল – “আপনি মিথ্যে বলছেন।” তারপর হিসহিস করে উঠল তর্জনী উঁচিয়ে – “এ সব মিথ্যে কথা। মিথ্যে প্রমাণ দেখিয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন।” ফর্মাল শার্ট একটু অবাক হয়ে তাকালেন তার দিকে। তারপর কেটে কেটে বললেন – “যে লোকটা মারা গেছে, সে কে আমি জানি না। কিন্তু এই রহস্যের খাসমহলে ষড়যন্ত্র কোথায় দেখলেন মশাই? আপনিও যেমন সব সত্যি বলছেন। আমিও তেমন কিছুই মিথ্যে বলছি না। তবে...” একটু থেমে তিনি টেবিলের ওপর থেকে একটা বোতল থেকে এক চুমুক জল খেয়ে যোগ করলেন – “আপনি যদি কোনও সত্য গোপন করে থাকেন, তাহলে সেটা এখনই স্বীকার করার উপযুক্ত সময়। একজন পুলিশ অফিসারের চোখ দিয়ে দেখলে আপনার বাড়ির দরজায় খুন হয়ে পড়ে থাকা একজন মৃত মানুষের সই হুবহু নকল করেছেন আপনি। তার নামটাও নিজের বলে চালিয়ে যাচ্ছেন। আপনি হয়তো এই নামে পাসপোর্ট, প্যান কার্ড, মার্কশিট এসব এনে হাজির করবেন। কিন্তু ওসব ডকুমেন্ট বানানো এমন কিছু কঠিন ব্যাপার নয়। আপনি চাইলে আমিও বিহান চক্রবর্তী নামে নিজের ছবি দিয়ে পাসপোর্ট এনে দেখাতে পারি। এক ঘণ্টাও লাগবে না। দেখতে চান?” নিজের চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে বিহানের হাত ধরে টেনে এনে জোর করে চেয়ারে বসালেন – “ভাবুন। আপনি দাবি করছেন, আপনি পুলিশ অফিসার অনির্বাণ চক্রবর্তীর ছেলে। সেটা কিন্তু এখনও প্রমাণিত নয়।” বিহান এবার জোর দিয়ে বলল, “আমার মা...” ফর্মাল শার্ট তাকে হাত দেখিয়ে থামিয়ে দিয়ে কুটিল হাসলেন এবার – “যাকে আপনার মা বলে পরিচয় দিচ্ছেন, তিনিই আসল অনুরাধা চক্রবর্তী কিনা তার প্রমাণও তো দরকার।”
এক নিমেষে এভাবে পুরো ব্যাপারটা তার বিরুদ্ধে ঘুরে গেছে দেখে বিহান হতভম্ব হয়ে গেল। সে দুহাতে মাথার দুটো শিরা টিপে ধরে টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলল – “দেখুন, আমার মায়ের ফোন নাম্বার দিচ্ছি। আপনি কথা বলুন। দরকার হলে আমাদের গ্রামের বাড়িতে যান, দেখা করুন। আর সবাইকে জিজ্ঞাসা করুন। সবাই আমাদের ফ্যামিলিকে চেনে সেখানে।” ফর্মাল শার্ট বিহানের পেছনে দাঁড়িয়ে আবার তার ডান কাঁধে হাত রাখলেন – “আর ওই সই? ওই নাম? ওগুলো আসলে কার?” বিহান এবার ঘাড় ঘুরিয়ে কাতর অনুনয় করল – “প্লিজ আমায় বাড়ি যেতে দিন। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি কোনওদিনও কারও সই নকল করিনি। এমনকী স্কুলের মার্কশিটে অনেকে বাবার সই নকল করত। আমি তাও করিনি। বিশ্বাস করুন।” শেষদিকে তার গলাটা কান্নায় ধরে এল। ফর্মাল শার্ট এবার তার দিকে ঝুঁকে বললেন – “বাড়ি তো আপনি যাবেনই। এখনই আপনাকে আটক করে রাখতে চাই না।” দুর্বল পায়ে বিহান উঠে দাঁড়াল। “আপনার মায়ের ফোন নাম্বার দিয়ে যান। আর কলকাতা ছেড়ে কোথাও যাওয়ার চেষ্টা করবেন না।” ফর্মাল শার্ট বাঁকা হাসলেন – “আপনি তো জানেনই, পুলিশের অসাধ্য কিছুই নেই। পালিয়ে পার পাবেন না।”
বিহান কোনও রকমে টলতে টলতে থানা থেকে বেরিয়ে এল।


কাউয়াম্যান

কলকাতায় পৌঁছে অনাদিকে দেখেই ডাক্তার ভর্তি হয়ে যেতে বললেন হাসপাতালে। যদিও সরকারি জায়গা, তবু তিনি নিজে নজর রাখবেন বলে কথা দিলেন। অনাদির সঙ্গে অনির্বাণও এসেছিলেন। তাঁর দিকে কাতর চোখে তাকালেন অনাদি। অনির্বাণ সাহস জোগালেন – “আরে আমরা তো রোজ দেখতে আসব। এখানে থাকলে ডাক্তারবাবু যেসব টেস্ট দিয়েছেন, সেগুলো খুব সহজে হয়ে যাবে। আর তাছাড়া এখানে তোমার বিশ্রামও হবে একটু। অত ভেবো না।”
সত্যিই চিকিৎসাব্যবস্থা এখানে ভালো। অনাদির কোনও রকম চিকিৎসাই হচ্ছিল না ধরতে গেলে। এখানে এসে চিকিৎসার সঙ্গেই ওষুধপথ্যে গলার যন্ত্রণার অনেকটাই উপশম হল। বিনোদিনী রোজই তাঁকে দেখতে আসেন। প্রথম-প্রথম অনুরাধাও সঙ্গে আসতেন। এখন কলকাতার রাস্তা অনেকটাই সড়গড় হয়ে গেছে। তাই বিনোদিনী একাই আসেন। একদিন তাঁর কপালে হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “এখন সুস্থ লাগছে?” এই একটা প্রশ্নেই অনাদির চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। আহ! কতদিন এভাবে তাঁর কপালে হাত বুলিয়ে দেননি বিনোদিনী। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর আর দেওয়া হল না। এখন খাওয়ার সময় গলায় সামান্য ব্যথা হলেও কথা বলার শক্তি একেবারেই নেয় অনাদির। কিছু বলতে গেলেই গলা থেকে ঘড়ঘড় করে কিছু অর্থহীন শব্দ বের হয়। তাই অনাদির চোখের জল বিনোদিনীর অনুরাগে নাকি তাঁর কথার উত্তর না দিতে পারার বেদনায় – সেটার মীমাংসা হল না।
এক সময় অনির্বাণকে ডেকে ডাক্তার অনাদিকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করতে বললেন। অনাদির চেহারা দিন-কে-দিন শুকিয়ে দড়ি পাকিয়ে যাচ্ছে। গায়ের রঙ আগে এমন কিছু ফর্সা ছিল না। কিন্তু এখন গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ – এককথায় যাকে কালোই বলা যায়। গলার ব্যথাটা পুরোপুরি সেরে গেছে এখন। কিন্তু অনাদি আর কোনওভাবেই কথা বলতে পারছেন না। রক্তপরীক্ষা বা অন্যান্য আরও কিছু পরীক্ষা করে শরীরে রোগব্যাধি সেভাবে কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু শরীরের ওজন দারুণভাবে কমে গেছে। চিন্তিত মুখে তাঁর চিকিৎসক অনির্বাণকে বললেন, “এভাবে বেশিদিন চললে এই রুগী বাঁচবে না। বাড়ি নিয়ে যান। স্বাভাবিক পরিবেশে রাখুন। শাক-সব্জি, ফলমূল খাওয়ান। তাতে যদি শরীরের উন্নতি হয়।”

অনির্বাণ ছুটি করিয়ে নিয়ে অনাদিকে সঙ্গে করে হাসপাতালের চৌহদ্দির বাইরে পা রেখেছেন কি রাখেননি, অভাবনীয় একটা ব্যাপার ঘটে গেল। এক মাড়োয়ারি ভদ্রলোক হাসপাতালের গেটের সামনে ট্যাক্সি থেকে নেমে ভাড়া মেটাচ্ছেন। একটা সিড়িঙ্গে মার্কা লোক তাঁর হাতের পেটমোটা ব্যাগটা কেড়ে নিয়ে দৌড় লাগাল। একটা বাস সামনের স্টপেজ থেকে সবে নড়তে শুরু করেছে। বোঝা গেল, সিড়িঙ্গের লক্ষ্য সেই বাসটা। একবার সেটা ধরতে পারলেই সে পগারপার। মাড়োয়ারি হইচই শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তার মধ্যেই জ্যা-মুক্ত তিরের মতো অনির্বাণের পাশ থেকে দৌড় লাগালেন অনাদি। হাঁ হয়ে সবাই দেখল, একটা রোগা কালো লোক অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটে যাচ্ছে সিড়িঙ্গের দিকে। ছুটছে তো না, যেন উড়ছে মাটির ওপর দিয়ে। সিড়িঙ্গে বাসের হাতল ধরার আগেই ক্যাঁক করে তার ঘাড় ধরলেন অনাদি। তারপর পথচলতি গাড়িঘোড়া বাঁচিয়ে তাকে নিয়ে গিয়ে ব্যাগসমেত আছড়ে ফেললেন হাসপাতালের পাঁচিলের লাগোয়া ফুটপাতে। ততক্ষণে মাড়োয়ারির সঙ্গে অনির্বাণ এবং আরও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ছুটতে শুরু করেছেন সেদিকে। কিন্তু সিড়িঙ্গের প্যাঁচ-পয়জার তখনও শেষ হয়নি। নিমেষে সে পকেট থেকে বের করেছে একটা পেনসিল ছুরি। তার হাত লক্ষ্য করে অনাদি একটা জোর লাথি কষালেন। ছুরিটা ছিটকে পড়ল একদিকে। এবার তাকে দারুণ ধমক দিলেন। কিন্তু গলা থেকে শুধু বের হল – “কঃ!” ততক্ষণে সবাই গিয়ে সিড়িঙ্গেকে পাকড়াও করে গণপ্রহারের ব্যবস্থা করতে শুরু করেছে। অনির্বাণ নিজের পুলিশ পরিচয় দিয়ে কোনও রকমে তাদের ক্ষান্ত করলেন। তারপর মোড়ের মাথায় মোতায়েন একজন ট্রাফিক পুলিশের জিম্মায় সিড়িঙ্গেকে রেখে অনাদিকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। দু পা এগিয়েছেন, পেছন থেকে ডাক এল – “ও ভাই। ও কাউয়া ভাই।” অনাদিকে ডাকছেন সেই মাড়োয়ারি। নিজেই কিছুটা দৌড়ে, কিছুটা হেঁটে কাছে এলেন – “তুম তো সুপারহিরো ভাই। সুপারম্যান কি মাফিক। ইকেবারে কাউয়াম্যান। হ্যাঁ!” জানা গেল ভদ্রলোকের ছেলে কমিকস্‌-পাগল। তাঁর এক ভাই ‘ফরিনে’ থাকেন, তিনিই ভাইপোর জন্যে সুপারম্যান, ‘ইয়ে-ম্যান’, ‘উও-ম্যান’ – এইসব ছবিছাবার বই পাঠান। মাড়োয়ারি একটা একশ টাকার নোট বের করে অনাদির হাতে গুঁজে দিলেন – “হামার বড় নুকশান বাঁচিয়ে দিলে বাবু। ইয়ে লেনাই পড়েগা।” টাকাটা যদিও শেষ পর্যন্ত অনাদি নিলেন না। যতই কেউ বাহবা দিক, কিন্তু গায়ের রঙ বা গলার আওয়াজের কারণে কেউ যদি তাঁকে কাকের সঙ্গে তুলনা করে, তাহলে কোনও মতেই ভালো লাগার কথা নয়। সেটা খানিকটা বুঝতেই পেরেই অনির্বাণ ভদ্রলোককে তাড়া দিলেন – “আপনি ওই কনস্টেবলের কাছে গিয়ে নিজের নাম-ঠিকানা এসব লিখিয়ে দিন। লোকটা যে আপনার থেকে ছিনতাই করার চেষ্টা করেছিল, সেটা রিপোর্ট করা দরকার।”


হরকরা

বিহান থানা থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি দাঁড় করাল। ট্যাক্সিতে উঠেই মায়ের নাম্বার ডায়াল করল সে। ওদিকে ফোন বেজে যাচ্ছে, কেউ ধরছে না। বিহান ঘড়ি দেখল। প্রায় পৌনে দশটা। এতক্ষণে মা বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছে নিয়মমাফিক ওষুধ খেয়ে। ফর্মাল শার্টও নিশ্চয় মাকে ফোনে চেষ্টা করবে। না পেলে? গিয়ে হাজির হবে বকুলপুরে? কিন্তু তার আগেই কতগুলো প্রশ্ন তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। কে এই অন্য বি চক্রবর্তী? মা কি অন্য কোনও বিহানকে চিনতেন? কিন্তু ওই সই মেলার ব্যাপারটা। নানা অদ্ভুত আশঙ্কা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল।
বাড়ি ফিরেই ভেবেছিল বিছানায় গা এলিয়ে দেবে, খাওয়ার রুচি বিশেষ একটা ছিল না। কিন্তু আলোটা নিভিয়ে শুয়ে পড়েও খুব একটা স্বস্তি বোধ করল না। মাথায় রাজ্যের চিন্তা ভিড় করছে। আচ্ছা, বিহান হঠাৎ উঠে বসল, পুলিশ মায়ের কাছে যাওয়ার আগে সে গিয়ে হাজির হলে কেমন হয়? একটা ট্যাক্সি ধরে হাওড়া স্টেশন হাজির হতে পারলে এখনও লাস্ট ট্রেনটা ধরে ফেলা যাবে। তারপর ফুলেশ্বরে নেমে দেখা যাবে। সেখান থেকে কিছু না পাওয়া গেলেও দরকার হলে হেঁটেই মেরে দেবে বাকিটা রাস্তা। কিন্তু পুলিশ যে তাকে কলকাতা ছেড়ে কোথাও যেতে বারণ করেছে? নিকুচি করেছে পুলিশের! সে তো কোনও অপরাধ করেনি, তাহলে তার ভয় কোথায়? কিন্তু যে মানসিক টানাপোড়েনে সে আছে, তা দুর্বিষহ হয়ে উঠছে প্রতি সেকেন্ডে।
চটজলদি জামাটা গায়ে গলিয়ে নিচে গিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরল বিহান। কিন্তু সামান্য পরেই বুঝল ফর্মাল শার্টের কথা না শোনাটা বোকামিই হয়েছে। ট্যাক্সিটা তাদের ফ্ল্যাটবাড়ির বাইরের গলি রাস্তাটা পেরিয়ে বড় রাস্তায় পড়েনি তখনও, অন্যদিক থেকে এসে হাজির হল একটা বড় এস ইউ ভি। সেটা থেকে একটা হুমদো মতো পুলিশের উর্দি পরা লোক নেমে এসে বিহানকে ধমক দিলেন – “আপনাকে বলা হয়েছিল না কোথাও যাবেন না? আসুন।” বিহান বাধ্য ছেলের মতো ট্যাক্সি থেকে নেমে এল। তারপর লোকটাকে কিছু বুঝতে না দিয়েই চকিতে উলটোদিকে মরিয়া দৌড় লাগাল। হুমদো তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন – “তোদের দিকে যাচ্ছে। ধর।” কে ধরবে? এদিকটায় স্ট্রিট লাইটের আলো আবছা। বিহান ঠাহর করতে পারার আগেই দুজন মানুষ এসে তাকে জাপটে ধরে। একজন মাথার ওপর একটা থলে জাতীয় কিছু পরিয়ে তার মুখ চেপে ধরে টেন-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে তুলল একটা গাড়িতে। বিহান বুঝল, এরা সবাই পুলিশের লোক। বোকামিটা সে-ই করেছে। এখন নিয়ে গিয়ে হয়তো সোজা লক-আপে ফেলবে। বিহানের মনটা নিজের হঠকারিতাতেই তিক্ত হয়ে উঠল। কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত!
কিছুক্ষণ চলার পরে গাড়িটা থামল। থানা এসে গেছে কি? বিহানকে টানতে টানতে লোকগুলো গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে গিয়ে হাজির হল একটা ঘরের মধ্যে। ঘড়ঘড় করে একটা ভারী ধাতব দরজা খুলে গেল। বিহানের মনে এবার একটা নতুন আশঙ্কা উঁকি মারল। চারপাশে যা শুনতে পাচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে তাকে এরা থানায় আনেনি। এরা আদৌ পুলিশ তো? একজন তার মাথা থেকে থলেটা সরিয়ে নেয়। বিহান চোখ সইয়ে নিতে নিতে দেখে একটা ছোট ঘর। মাঝে একটা টিনের ফোল্ডিং চেয়ার। তাকে রেখে লোকদুটো আবার সেই ভারী দরজাটা বন্ধ করে চলে গেল। বিহান কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একবার চেয়ারটার দিকে দেখল। বসবে? হঠাৎ কোথা থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে এল। চেয়ার বসতে গিয়েও পারল না সে। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। বিহান মেঝের ওপরেই এলিয়ে পড়ল।

কতক্ষণ সে ঘুমিয়ে ছিল জানে না। হঠাৎ মনে হল তাকে চ্যাঙদোলা করে কেউ বা কারা নিয়ে যাচ্ছে কোথাও। বিকট সুরে ঘটঘট করে একটা আওয়াজ হচ্ছে। হঠাৎ মনে হল সে ধুলোর ঝড়ে ঢুকে পড়েছে। সে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্যে গা ঝাড়া দিল একবার। কিন্তু কোনও কাজ হল না, তাকে শক্ত করে পাকড়াও করেছে লোকগুলো। বিহান পুরোপুরি চোখ মেলে দেখার চেষ্টা করল। মনে হল, একটা হেলিকপ্টার দাঁড়িয়ে আছে। সামান্য দূরে। বিহান আগে চাক্ষুষ হেলিকপ্টার দেখেনি। কিন্তু টিভিতে, সিনেমায় এতবার এতভাবে দেখেছে যে, বুঝল এটা হেলিকপ্টার। তাকে হেলিকপ্টারের দরজার কাছে নামিয়ে দিয়ে একটা মৃদু ধাক্কা দেওয়া হল। বিহান বুঝল তাকে ওর মধ্যে উঠতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। বিনা বাক্যব্যয়ে সে উঠে পড়ল। এত দ্রুত এতকিছু ঘটে চলেছে যে, সে চিন্তাভাবনা করা বন্ধ করে দিয়েছে। বিহানের সঙ্গে আরও দুজন উঠল। ভেতরে যথেষ্ট জায়গা আছে – একটা ছোটোখাটো কেবিন যেন। নরম গদি-আঁটা মুখোমুখি দুটো আসন। পাইলটের বসার জায়গাটা দেখা যাচ্ছে না। হেলিকপ্টারের ভেতরটা এরকম, সেটা জানা ছিল না। দরজা বন্ধ করে দিতেই বাইরের শব্দ আসা বন্ধ হয়ে গেল। এতক্ষণ পাখার যে ঘটঘট শব্দ কানে আসছিল, সেটা আর নেই। বিহানের মুখোমুখি যে ভদ্রলোক বসে আছেন, তিনি মাথা নাড়লেন – “এটা হেলিকপ্টার নয়।” একটা মৃদু ঝাঁকুনিতে বোঝা গেল হেলিকপ্টারটা (বা যানটা, যেটা হেলিকপ্টার নয়) মাটি থেকে ওপরে উঠল। বাইরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না যদিও।
বিহান একবার উলটোদিকের ভদ্রলোককে আর একবার তার পাশে বসা ভদ্রলোককে দেখল। নির্লিপ্ত মুখে দুজন বসে। সাধারণ পোশাক-আশাকের আপাত-সাধারণদর্শন এই লোকদুটো যে কী করতে চায় সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। তাই বিহান জিজ্ঞাসা করেই ফেলল – “আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? আপনারা কারা?” উলটোদিকের ভদ্রলোক বিহানকে বললেন – “আমরা হরকরা। আপনাকে সেখানে নিয়ে যাচ্ছি, যেখানে এই মুহূর্তে আপনাকে দরকার।” এমন অদ্ভুত উত্তর শুনে বিহান বুঝল প্রশ্ন করে লাভ নেই। তবুও আবার জিজ্ঞাসা করল – “কোথায় দরকার আমাকে?” ভদ্রলোক একটু অসহিষ্ণু গলায় বললেন – “দেশ-কাল সন্ততির একটা বিশেষ বিন্দুতে। যে জিনিসটা যেখানে থাকা দরকার, আমরা সেখানে সেটা পৌঁছে দিই।” বিহান একটু থেমে প্রশ্ন করল – “পাগল লোকটা, মানে অন্য বিহান চক্রবর্তীকে আপনারাই খুন করেছেন?” ভদ্রলোক কোনও উত্তর না দিয়ে অন্যজনকে চোখে ইশারা করলেন। আচমকা সেই লোকটা একদিকের দরজা খুলে কলার ধরে বিহানকে বাইরে ছুঁড়ে দিলেন। ব্যাপারটা এমন আচমকা ঘটল যে, কিছু বোঝার আগেই বিহান দেখল কলকাতার রাস্তাঘাট দ্রুত তার দিকে ধেয়ে আসছে। শেষ মুহূর্তে মানুষ কী ভাবে? তার সমস্ত জীবনের ঘটনাগুলো নাকি ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ফিরে ফিরে আসে? কিন্তু বিহানের মাথায় সেসব কিছুই এল না। মাটির একেবারে কাছাকাছি এসে তার পতনের গতি অনেকটা কমে গেল বটে। কিন্তু তাতে লাভ কিছুই হল না। তার মাথায় ভারী একটা কিছু লাগল। কংক্রিটের ফুটপাতের ওপর শুয়ে বিহান বুঝল তার মুখের একটা পাশে গরম একটা তরলে ভিজে যাচ্ছে – তার নিজের রক্তে।

জ্ঞান ফিরতে বিহান অনুভব করল, তার মাথায় দারুণ যন্ত্রণা হচ্ছে। তন্দ্রার ঘোরের মধ্যেই বুঝল কারা তার চারপাশে কীসব বলাবলি করছে। বিহান আবার ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গেল। এভাবে বেশ কয়েকবার ঘুম আর আধো-জাগরণের মধ্যে দিয়ে বিহান আস্তে আস্তে অনুধাবন করল, সে একটা হাসপাতালের কেবিনে শুয়ে আছে। একজন নার্স তার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে একটা ক্লিপবোর্ডে কিছু লিখছিলেন। সে চোখ মেলে তাকাতে নার্সটি গম্ভীর স্বরে বললেন – “এখন আপনি অনেকটাই সুস্থ, তাই আপনাকে জেনারেল ওয়ার্ডে শিফট করা হবে দুপুরের পর।” তারপর একটু থেমে বললেন, “আপনার বাড়ির লোকের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। আপনি বাড়ির ঠিকানা বা ফোন নাম্বার দিলে আমরা খবর পাঠাব।” বিহান মনে করার চেষ্টা করল। বাড়ির নাম্বারটা কী যেন? ছোটবেলায় কত ফোন নাম্বার মনে রাখতে পারত। এখন এই মোবাইল এসে সব বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। বাড়ির নাম্বারও সব সময় মনে আসে না। মাথার যন্ত্রণাটা আবার বাড়ছে। আস্তে আস্তে মাথায় হাত দিয়ে ব্যান্ডেজের খসখসে কাপড়ের স্পর্শ পেল। অস্ফুটে জিজ্ঞাসা করল – “আমার ফোন?” নার্স ভুরু কুঁচকে তাকালেন। বিহান এবার বুঝিয়ে বলল, “বাড়ির নাম্বার আমার মোবাইলে আছে। আমার মোবাইলটা দরকার।” নার্স ভদ্রমহিলা একটু বিরক্তির সুরেই বললেন, “মনে করার চেষ্টা করুন।” তারপর ঘরের বাইরে চলে গেলেন। একটু পরে বিহান শুনতে পেল নার্সটি কাকে যেন বলছেন – “ডক্টর, তিন নম্বর কেবিনের পেশেন্ট এখনও বোধ হয় কিছু মনে করতে পারছে না। বাড়ির ঠিকানা চাইতে কী যে বলল কিছুই মাথায় ঢুকল না।” একটা পুরুষ কণ্ঠ উত্তর দিল – “আসলে ইনজুরিটা মাথায় তো। একটু সময় লাগে এসব ক্ষেত্রে।” বিহান আবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।
দুপুরের খাওয়া হয়ে যাওয়ার পরে একটা স্ট্রেচারে করে বিহানকে জেনারেল ওয়ার্ডে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। সরকারি হাসপাতাল। বিহান আগে কখনও হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে ভর্তি হয়নি, তাই পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে নতুন। তার একপাশে দেওয়াল। অন্যদিকে যে ভদ্রলোক আধশোয়া হয়ে কাগজ পড়ছেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে লাভ হল না। একবার বিহানের দিকে তাকিয়ে আবার কাগজে মুখ ডুবিয়ে দিলেন। বিহান এক ঝলক কাগজের দিকে তাকিয়ে প্রথম পাতার অংশবিশেষ দেখতে পেল। বড় বড় করে ‘বিশ্বজয়’ কথাটা বোঝা যাচ্ছে। নিচে কপিলদেবের সেই বিখ্যাত ছবিটা – লর্ডসের ব্যালকনিতে বিশ্বকাপের ট্রফি নিয়ে। ভারত কি তাহলে আবার জিতল? কিন্তু ধোনিদের ছবি নেই কেন? নাকি ভারত জিতবে কি, জিতবে না সেই নিয়ে ফলাও করে রিপোর্টাজ। বাংলা কাগজগুলো পারেও বটে। গোঁফে কাঁঠাল, গাছে তেল। হঠাৎই বিহান থমকাল। তার মাথায় পুরোনো চিন্তাগুলো লাইন দিয়ে ফিরে আসছে আবার। সে এখানে কতদিন পড়ে আছে? কীভাবে যেন সে এখানে এসেছিল? এটুকু মনে আছে বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল। কিন্তু আর কিছু মনে পড়ছে না কেন? সে একটা অফিসে চাকরি করত মনে আছে। আবছা মনে পড়ছে একদিন তার বাড়ি পুলিশ এসেছিল। কিন্তু তারপর? বিহান চোখ বন্ধ করে প্রাণপণে খুঁজতে চেষ্টা করে। তার বাবা, তার মা – আবছা কিছু ছবি মাথায় আসছে। কিন্তু পরিষ্কার হচ্ছে না।
“আপনার নাম কী ভাই?” এক ভদ্রমহিলার ডাকে সম্বিত ফিরল বিহানের। পাশের বেডের ভদ্রলোকের কেউ হবেন হয়তো। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। বিহান নিজের নাম বলতে গিয়ে আবারও অসহায় বোধ করল। সে মনে করতে পারছে না। নিজের নাম সে মনে করতে পারছে না। এমনটা গল্পে পড়েছে, সিনেমায় দেখেছে। কিন্তু সে মনে করতে পারছে না। তার পাশের বেডের ভদ্রলোকের হাতের ধরে রাখা খবরের কাগজের ছবিতে হাসিমুখ চওড়া গোঁফের লোকটা কপিলদেব এটা সে জানে, তার মনে আছে। কিন্তু নিজের নাম তার মনে নেই। তার মোবাইল ফোনটা কোথায়? সেটা পেলে হয়তো কাজ হত। বিহান অসহায়ের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ভদ্রমহিলার দিকে, তারপর অনেকটা আন্দাজেই যেন উত্তর দিল, “বিহঙ্গ। আমার নাম বিহঙ্গ।” ভদ্রমহিলা মুখ টিপে হাসলেন – “বাহ! বেশ নাম তো।” তারপর হাতের ব্যাগ থেকে একটা প্লেট বের করে তার বেডের পাশে টেবিলে রাখলেন। তারপর পাশের বিছানার একধারে বসে ছুরি দিয়ে একটা আপেল কাটতে শুরু করলেন। বিহান এই ভদ্রমহিলাকে কোথাও দেখেছে কি? নিশ্চয় দেখেছে, কিন্তু মনে করতে পারছে না। বিহান খুব অবাক হয়ে দেখতে লাগল। ফল কাটার ওই ভঙ্গি – আস্তে আস্তে আপেলের খোসা ছাড়িয়ে রাখা, তারপর সেগুলো তিনকোনা করে কাটা – খুব চেনা যেন। প্রায়-চল্লিশের এই ভদ্রমহিলার সঙ্গে কার যেন এসব দারুণ মিলে যায়। পাশের বেডের ভদ্রলোককে থালাটা বাড়িয়ে দিলেন তিনি। তিনি কাগজ সরিয়ে রেখে বাবু হয়ে বসে এক টুকরো ফল তুলে নিলেন। এবার ভদ্রমহিলা প্লেটটা বিহানের দিকে এগিয়ে দিলেন – “আপনিও নিন না ভাই।” বিহান একটা টুকরো তুলে নিয়ে ছেলেমানুষের মতো গাল মেলে হাসল।


৩০ এ শান্তিনিবাস রোড

প্রথমবার চিকিৎসার পরে অনাদি কলকাতা থেকে গ্রামে ফিরে গেলেও, কথা বলতে না পারার কারণে এবং তাঁর শারীরিক অবনতির কারণে পুলিশের চাকরিটা ছাড়তে বাধ্য হলেন। গ্রামে তাঁর বেশ কিছুটা পৈতৃক জমিজমা ছিল। কালী জ্যাঠাই মূলত সেগুলোর দেখাশোনা করতেন। বিনোদিনীর সঙ্গে সময়ে সময়ে সেই নিয়ে আলোচনাও করতেন। কিন্তু অনাদি সেসব শোনার কোনও রকম আগ্রহ প্রকাশ করতেন না। সারাদিন একটা কাঠের চেয়ার নিয়ে বারান্দায় বসে থাকতেন। গ্রামে খবরের কাগজ আসে বেশ বেলায়। সেটা হাতে পেলে আর কোনওদিকে তাকাতেন না তিনি। সময় মতো খাওয়াদাওয়া, ঘুম আর খবরের কাগজ। মানুষটার দিকে তাকালে বিনোদিনীর মায়া হত, মাঝে মাঝে বিরক্তি জাগত – একটা জলজ্যান্ত মানুষ সারাদিন ছায়ার মতো ঠায় বসে আছেন, কোনও কাজকর্মে আগ্রহ নেই। একা হাতে সংসার, বিষয় সম্পত্তি সামলানো – এসব করতে করতে বিনোদিনী হাঁফিয়ে উঠছিলেন মনে মনে।
অবশ্য মাঝে মাঝে এই একঘেয়ে প্রাত্যহিকতায় বদল আনতে দারুণ অসুস্থ হয়ে পড়েন অনাদিনবাবু। কী যে কষ্ট হয়, তা বোঝা যায় না। কিন্তু সারা শরীর ঝাঁকি দিয়ে ওঠে তাঁর। বোঝা যায় দারুণ যন্ত্রণা হচ্ছে সারা শরীরে। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেন না। এই সময়গুলোতে কালীজ্যাঠা কলকাতায় খবর পাঠান। কখনও অনির্বাণ এসে নিয়ে যান। তিনি কোনও কারণে আসতে না পারলে বিনোদিনী নিজেই নিয়ে ভর্তি করে দিয়ে আসেন হাসপাতালে। দু-একদিন অনির্বাণের বাসায় কাটিয়ে ফিরে যান গ্রামে। কয়েক সপ্তা পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান অনাদি। তখন আবার তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেন অনির্বাণ। বা নিজে এসে নিয়ে যান বিনোদিনী। সাত-সাতটা বছর এভাবে কেটে গেল। প্রথম প্রথম দারুণ কষ্ট হলেও এখন বিনোদিনী স্বামীর অসুস্থতার জন্যে মনে মনে দিন গোনেন। ওটাই এখন তাঁর একমাত্র ছুটির আনন্দ।
এবার অনির্বাণ নিজেই নিয়ে এসেছিলেন অনাদিকে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার কথা কাল-পরশুর মধ্যেই। রাতে খাওয়ার পরে অনুরাধা রান্নাঘরের কাজ গুছিয়ে এসে বিছানার একপাশে বসে স্বামীকে বললেন, “আমার একটা আবদার আছে। রাখতে হবে।” অনির্বাণ একটা বই পড়ছিলেন। সেটা থেকে মুখ না তুলেই তিনি বললেন, “বলো।” অনুরাধা আবদারের সুরে বললেন, “বইটা সরাও, বলছি।” অনির্বাণ মৃদু হেসে বইটা সরিয়ে বললেন, “গুরুতর কিছু?” অনুরাধা তাঁর বুকের কাছে সরে এলেন এবার – “অনাদির পাশের বেডে যে ছেলেটি আছে, সিস্টার বলছিল সে নাকি কিছুই মনে করতে পারছে না – বাড়ির ঠিকানা, ফোন নাম্বার। সেদিন নাম বলল, বিহঙ্গ। সেটাও ঠিক কিনা কে জানে। তুমি তো পুলিশে আছ। ওর বাড়ির লোকদের খুঁজে বের করে দাও না। ছেলেটাকে দু-একদিনের পরেই ছেড়ে দেবে বোধ হয়। তারপর সে কোথায় থাকবে?” অনির্বাণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, “একদিন থানায় এসো, দেখবে ফাইলের পর ফাইলের স্তূপ জমে আছে এরকম কেসের। সারা পৃথিবীর চিন্তা করো ছাড়ো। তুমি-আমি না থাকলেও কারোর কিছু আটকাবে না।” তিনি আবার নিজের বইয়ে ফিরে গেলেন। অনুরাধা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধরা গলায় বললেন, “ছেলেটিকে দেখলে আমার বাবুর কথা মনে পড়ে।” বাবু অনুরাধার ছোট ভাই। কীভাবে যেন হারিয়ে গিয়েছিল খুব ছোটবেলায়। বিকালে খেলতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। পাড়ার লোকে বলত ছেলেধরায় নিয়ে গেছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোনও লাভ হয়নি। নিঃসন্তান অনুরাধার বাৎসল্য স্নেহ তাই সেই কৈশোরে হারিয়ে যাওয়া বাবুকে কেন্দ্র করেই এখনও ঘুরপাক খায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতের বইটা একদিকে মুড়ে রাখলেন অনির্বাণ।

দুদিন পরে হাসপাতালে গিয়ে হাজির হলেন অনির্বাণ। অনাদির ছুটি হচ্ছে। আজকাল অনুরাধা একাই এসব সামলে নিতে পারেন। কিন্তু তাঁরই অনুরোধে আসতে হয়েছে অনির্বাণকে। অনাদির পাশের বেডের বিহঙ্গ নামের সেই ছেলেটার বাড়ির সন্ধান তাঁকে এনে দিতেই হবে। অনুরাধা জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছেন। ছেলেটি সেদিকেই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। অনির্বাণ তার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আলাপ করার চেষ্টা করলেন – “আমার নাম অনির্বাণ চক্রবর্তী। শুনলাম আপনি নাকি বাড়ির ঠিকানা মনে করতে পারছেন না।” ছেলেটি অনুরাধার থেকে চোখ সরিয়ে অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে উঠল – “অনির্বাণ চক্রবর্তী। অনির্বাণ চক্রবর্তী।” তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠল – “ঠিকানা ৩০ এ শান্তিনিবাস রোড।” অনুরাধা হতবাক অনির্বাণের হাত ধরে টান দিলেন – “এদিকে এসো।” একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বললেন, “ও আমাদের সঙ্গে আসবে।” অনির্বাণের চমক তখনও কাটেনি, তাই স্ত্রীর কথাটা ঠিক বুঝতে পারলেন না – “আসবে? কেন?” অনুরাধা বিরক্ত স্বরে বললেন, “আমি তোমায় আগেই বলেছি। এ তো বাবুও হতে পারে। নাহলে আমাদের ঠিকানা জানল কী করে?” অনির্বাণ হেসে ফেললেন, “তোমার ভাই অত আগে থেকে জেনে বসেছিল বিয়ের পর তুমি কোথায় থাকবে?” তারপর অনুরাধার আহত চোখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, “ছেলেটা চিটিংবাজও হতে পারে। কোনও কারণে আমাদের বাড়িতে ঢুকতে চায়। তাই দুর্ঘটনার নাটক করে অনাদির পাশের বেডে এসে জায়গা নিয়েছে। এখন আমাদের ঠিকানা বলে চমকে দেওয়ার চেষ্টা করছে।” অনুরাধা মরিয়া হয়ে বললেন, “মানছি, এ বাবু নয়। কিন্তু একটা মানুষ তো। তুমি অমন একটা ছেলেকে চিটিংবাজ বলতে পারলে?” অনির্বাণ দেখলেন, আশেপাশের বেড থেকে রোগীরা তাঁদের দিকে উৎসাহের সঙ্গে তাকাচ্ছেন। তাই গলার স্বর নামিয়ে রণে ভঙ্গ দেওয়ার আগে শেষ চেষ্টা করলেন, “কিন্তু একে রাখবে কোথায়?” অনুরাধা দৃঢ় গলায় বললেন, “এটা তোমার থানার লকআপ নয় যে, জায়গার অকুলান হবে।”
অনির্বাণ বাধ্য হয়েই নিজের পুলিশি পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে হাসপাতাল সুপারের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। জানা গেল, তিনি এখন দারুণ ব্যস্ত। সরকারি হাসপাতালে একটা বেড খালি হবে। তাই ছেলেটিকে বাড়ি নিয়ে যেতে চান জেনে কেউ খুব একটা আপত্তিও করলেন না। মেট্রন একটা বড় রেজিস্টারে বিহঙ্গ নামের পাশে অনির্বাণের ঠিকানা লিখে নিলেন। ফলে আধ ঘণ্টার মধ্যেই ছেলেটি অনির্বাণ, অনুরাধা আর অনাদির সঙ্গে একই ট্যাক্সিতে উঠল। ছেলেটি এতক্ষণ কোনও আপত্তি করেনি। শুধু ট্যাক্সিতে উঠে বললেন, “আমরা কোথায় যাচ্ছি?” সামনের সিটে বসা অনির্বাণ নীরস গলায় বললেন, “৩০ এ শান্তিনিবাস রোড। যেখানে তুমি যেতে চাইছ।” তাঁর দিকে একটা দৃষ্টিশেল হেনে অনুরাধা মিষ্টি হেসে বললেন, “আমরা বাড়ি যাচ্ছি।”

সবুজ খাতা

সকালে ঘুম থেকে উঠে বিহানের শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগল। গতকাল বিকালে এখানে এসে ওঠার পর কিছু কিছু জিনিস খুব অদ্ভুত ঠেকেছে। যেমন এদের বাড়ির সবকিছুই কেমন পুরোনো আমলের। ব্যাপারটা ঠিক কী সেটা সে বুঝিয়ে বলতে পারবে না। কিন্তু মনে হচ্ছে বহুদিন আগের কোনও পুরোনো সাদা কালো ছবিতে এসব আসবাব যেন দেখেছে সে। এমনকী বসার ঘরে টেবিলের ওপর গুছিয়ে রাখা বই সেই কোন আমলের – শংকর, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, বিমল কর। এখনও এসব বই কে পড়ে? সেই কোন ছোটবেলায় দেখেছে তার মা এসব পড়ত। একপাশে একটা দেশ পত্রিকা পড়েছিল। সেটাও মান্ধাতা আমলের। তখন দেশে শেষের দিকে অরণ্যদেব বের হত। সেটা খুঁজে বের করে একটা নির্মল আনন্দ পেল বিহান। ছোটবেলায় হাতের কাছে দেশ পেলে সে এই পাতাটা খুলে পড়ত। সে যখন পত্রিকাটা দেখছিল, তখন অনুরাধা চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়েছিলেন। বিহান পত্রিকাটা একদিকে রেখে কাপটা হাতে নিল। অনুরাধা জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি দেশ পড়ো ভাই?” হাসপাতালে কদিনের আলাপে আপনি থেকে তুমি-তে নেমেছে সম্বোধন। বিহান সামান্য হেসে বলল, “এটা তো পুরোনো।” অনুরাধা নিজের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন – “এ মাসের পত্রিকাটা এখনও দিয়ে যায়নি।” বিহান চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগল। এদের চায়ের কাপটা পর্যন্ত পুরোনো ছাঁদের।
কিন্তু যতই পুরোনো জিনিস ঘরে তুলে রাখুক। মানুষ হিসাবে এরা বেশ ভালো। বেশ আদর-যত্ন করছে কাল থেকে। মূলত এই অনুরাধাদিই – তাকে বলে দিয়েছেন ‘দিভাই’ ডাকতে। অবশ্য এখানে সে কেন এসেছে, সেটা বিহান মনে করতে পারল না। হয়তো হাসপাতাল থেকে তার আর যাওয়ার কোনও জায়গা ছিল না, সেটাই একটা কারণ। দোতলার ছোট বারান্দায় এসে দাঁড়াল সে। ফুরফুরে বাতাস দিচ্ছে সকাল-সকাল। রোদটাও বেশ নরম। বারান্দার এক কোণে মেঝেতে বসে আছেন অনাদি। খবরের কাগজ পড়ছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে লাভ নেই। হাসপাতালে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিল সে। ‘কঃ’ ছাড়া কোনোও শব্দ শোনেনি সে ওঁর মুখে। হাসপাতালে আড়ালে সবাই তাই ডাকে কাউয়াম্যান – কাকের মতো চেহারায় কাকের মতো গলার স্বর। কাল ওঁর সঙ্গেই শুতে বলছিল দিভাই। কিন্তু অচেনা একজনের সঙ্গে এক বিছানায় শুতে মন চায়নি। সে ড্রয়িংরুমেই মাদুরের ওপর কম্বল পেতে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
এমন সময় ভেতর থেকে অনুরাধা ডাকলেন – “ভাই, জলখাবারটা খেয়ে যাও।” ধূমায়মান লুচি আর সুজির সামনে বসে উদাস হয়ে গেল বিহান। এ যেন তার কোন শৈশব থেকে তুলে আনা খাবার-দাবার। আনমনে খেতে শুরু করল। অনুরাধা একটা কাগজ রাখলে টেবিলের ওপর – “খেয়েদেয়ে এটা পোস্ট করে দিয়ে এসো। তোমার জামাইবাবু ভুলে গেছেন নিয়ে যেতে।” তারপর পোস্ট অফিসের পথনির্দেশ দিতে শুরু করলেন – “সামনের মোড় থেকে...” তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বিহান বলল, “দুটো গলি ছেড়ে রাস্তার বামদিকে।” অনুরাধা একটু অবাক হয়ে তাকালেন। বিহান লুচি মুখে পুরতে পুরতে বলল – “আমার বাড়ি বোধ হয় কাছাকাছিই কোথাও। তাই এই জায়গাটা চেনা-চেনা লাগছে।”

রাস্তায় নেমে বিহানে একটু অবাক হল। সত্যিই এই জায়গাটা চেনা-চেনা লাগছে। আগে বোধ হয় এসেছে কখনও। পোস্ট অফিসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে একটা দোকানের গায়ে একটা সাইনবোর্ড দেখে অবাক হল – বড় করে লেখা ক্যাম্পা কোলা। এখনও এটা পাওয়া যায় নাকি? বহু আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল না? নতুন করে আবার ব্যবসা শুরু করছে নাকি? পোস্ট অফিসে পৌঁছে বিহান কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল – “রেজিস্টার্ড পোস্ট করব।” কাউন্টারের ভদ্রলোক একটা লেফাফা এগিয়ে দিলেন – “চিঠিটা এতে ভরে ঠিকানা লিখে আনুন।” বিহান একপাশে রাখা রাইটিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে অনুরাধার দেওয়া খাতাটা থেকে চিঠিটা বের করল। তারপর সেটা খামে ঢুকিয়ে পাশে রাখা গদের শিশি থেকে একটু আঠা নিয়ে খামের মুখ বন্ধ করল। ঠিকানা খাতাতে লেখাই ছিল। সেটা খামের ওপর লিখে বিহান আবার কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাত থেকে খামটা নিয়ে ভদ্রলোক একটা মোটা খাতা বের করে রসিদ লিখতে শুরু করলেন। মিনিট খানেক পরে খাতাটা বিহানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এইখানে সই করুন।” বিহান দেখিয়ে দেওয়া জায়গায় ছোট্ট করে নিজের সইটা করেই চমকে উঠল। এই ঘটনাটা আগেও ঘটেছে, দেজা ভু যেন। কাউন্টার থেকে কাঁপা কাঁপা হাতে রসিদটা নিয়ে সে চমকে উঠল। এক কোণে তারিখ লেখা – ২৯.০৬.১৯৮৩। আর নিচের দিকে তার সই – বি চক্রবর্তী। টলে পড়ে যেতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিল বিহান। এ কেমন করে সম্ভব!
রসিদটা সবুজ রেক্সিনে বাঁধানো খাতার মধ্যে ঢুকিয়েই তড়িঘড়ি বেরিয়ে এল পোস্ট অফিস থেকে। তারপর প্রায় দৌড়তে দৌড়তে গিয়ে হাজির হল অনুরাধাদের ফ্ল্যাটে। কলিংবেলের আওয়াজ শুনে দরজা খুলে অনুরাধা একটু অবাক হলেন। বিহান তখন হাঁপাচ্ছে, চোখমুখ লাল। কোনও রকমে একটু দম নিয়ে বলল – “দিভাই, আমার নাম মনে পড়েছে।” অনুরাধার কৌতূহলী চোখের দিকে তাকিয়ে বলল – “বিহান। আমার নাম বিহান।” অনুরাধা উৎসাহের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন – “আর ঠিকানা?” বিহান ফিসফিসিয়ে উত্তর দিল – “৩০ এ শান্তিনিবাস রোড।”


বিনোদিনী ও বিহান

একটা তদন্তের কাজে অনির্বাণকে কলকাতা পুলিশের একটা টিম নিয়ে দিল্লি রওনা দিতে হবে। সেই নিয়েই ব্যস্ত তিনি। তাই অনাদিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে চিঠি দিয়ে বিনোদিনীকে কলকাতায় আসতে বলা হয়েছিল। বিনোদিনীকে হাওড়া স্টেশান থেকে আনার জন্যে বিহানই গেছে। এই দু-তিনদিনে সে দারুণ একটা ধাঁধার সমাধান করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার যতদূর মনে পড়ছে এবং সে জানে সে ঠিক জানে, কিছুদিন আগেও সে ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ দেখেছে। এক দুপুরে তার দরজায় কে যেন ইঁটের টুকরো দিয়ে কিছু লিখেছিল। আচমকা ফোটোগ্রাফের মতো তার মাথায় আসে – ‘কাউয়াম্যান’। কিন্তু তার চারপাশের সমস্ত উপাদান তাকে বলছে, সে আছে ১৯৮৩-তে। এটা কীভাবে সম্ভব? বিহান এই জিগশ পাজলের অনেকগুলো টুকরো খুঁজে পায় না। সে বুঝতে পারছে না, আসলে সে কি ১৯৮৩-র বাসিন্দা যে কিছু সময়ের জন্যে ২০১১-তে বাস করেছে? কিন্তু এসব কথা কাউকে বুঝিয়ে বলা যাচ্ছে না। সবাই ধরেই নেবে সে পাগল। একে স্মৃতিভ্রষ্ট, তার ওপর যদি এমন সব কথা সে বলতে শুরু করে, তাহলে আবার তাকে ফিরে যেতে হবে হাসপাতালে বা অন্য কোথাও। অনুরাধার এমন নিশ্চিন্ত আশ্রয় থেকে সে কোথাও যেতে চায় না।
বাসটা রবীন্দ্র সেতুর ওপর দিয়ে ছুটে চলেছে। বিনোদিনীর এলোমেলো চুল উড়ে আসছে ইতিউতি। সেদিকে তাকিয়ে বিহান সামান্য শান্তি পেল যেন। তার এই বদলে যাওয়া ভাঙাচোরা সময়ের মধ্যে যেন ছোট্ট একটা জানালা। বিনোদিনী বিহানের অমন মুগ্ধ দৃষ্টি অনুসরণ করে বিনোদিনী লজ্জা পেলেন সামান্য। বিহানও তা বুঝতে পারল। অস্বস্তি কাটাতে বিনোদিনী প্রশ্ন করলেন, “আপনি কি অনুরাধাদির আত্মীয়?” বিহান ঘাড় নেড়ে বলল, “আমি ভাই হই।” কেমন ভাই, কীরকম এসব বিস্তারিত তথ্যে গেলেন না বিনোদিনী। হঠাৎ দূরে আঙুল দেখালেন। ওই মেঘটা দেখুন, কীরকম তালপাতার সেপাই না? বিহানও আকাশের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থেকে বলল, “আমার তো ফুটবল পায়ের মারাদোনা মনে হচ্ছে। কেমন কোঁকড়ানো চুল না মাথায়?” বিনোদিনী উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “মারাদোনা কে?” উত্তর দিতে গিয়ে বিহান নিজেকে সামলে নিল। সে আনমনে বলল, “আমার এক বন্ধু।” তারপর প্রসঙ্গ বদলে বলল, “আপনারা কবে ফিরছেন?” বিনোদিনীর সব উৎসাহ হঠাৎ যেন এক ফুঁয়ে নিভে গেল। নিষ্প্রভ মুখে বললেন, “দেখা যাক, পরশু বোধ হয়।”

কিন্তু পরশু ফেরা হল না। অনুরাধা বললেন, “তোমার দাদা দিল্লি যাচ্ছেন। বাড়িটা ফাঁকা লাগবে। আর তাছাড়া তোমরা থাকলে বিহঙ্গেরও বেশ সময় কাটবে।” অনুরাধা বিহানকে ‘বিহঙ্গ’ নামেই ডাকেন। আর বিহানও আর কাউকে নিজের আসল নামোটা জানায়নি। যাই হোক, অনুরাধার প্রস্তাবে অনির্বাণ স্বস্তিই পেলেন। ওই নতুন ছোকরার কী মতলব তা তিনি জানেন না। তাই বাড়িতে অনুরাধার সঙ্গে আর দুটো মানুষ থাকলে তিনি স্বস্তিতেই থাকবেন। বিনোদিনীও এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। শুধু অনাদি বিরক্তমুখে ‘কঃ’ বলে নিজের আপত্তি জানাতে চাইলেন। কিন্তু সে কথায় কেউ বিশেষ পাত্তা দিল না।
অনুরাধা বিনোদিনীকে বললেন, “বিহঙ্গের সঙ্গে তুমি বরং এইবেলা কলকাতাটা ঘুরে দেখে নাও। কখনও সুযোগ তো পেলে না। সঙ্গে অনাদিকেও নিয়ে যাও। খোলা হাওয়ায় ও একটু প্রাণ খুলে বাঁচুক।” অনাদি যেতে রাজি হলেন না। অকাল বার্ধক্য গ্রাস করেছে মানুষটাকে। বিনোদিনীও খুব একটা জোর করলেন না। অনুরাধার কথা রাখতে বিহান একদিন তাঁকে নিয়ে মেট্রোরেলে চড়িয়ে আনল। তার পরের দিন জাদুঘর। তারপর চিড়িয়াখানা। বিনোদিনীকে এক উচ্ছল ছেলেমানুষী পেয়ে বসেছে। বিহানের অদ্ভুত কথায় দারুণ মজা পান তিনি। সব যে বুঝতে পারেন, এমন নয়। কিন্তু শুনতে ভালো লাগে। সারাজীবন একজন মেয়ে হিসাবে যে সীমার মধ্যে সময় কাটাতেন, বিহানের সঙ্গে সেই সব সীমানা ধুয়েমুছে গেছে কবে। বিহান প্রথম প্রথম নিজেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখলেও পরে বুঝে নিয়েছে বিনোদিনী জানার জগতটা খুব ছোট্ট। তাই গাভাস্কারের বদলে শচিন, বা নীল আর্মস্ট্রং-এর জায়গায় রাকেশ শর্মার গল্প করলে, বা ইন্টারনেটে কীভাবে তথ্য আদানপ্রদান হয়, সেসব শোনালে বিনোদিনী আলাদা করে কিছুই বুঝতে পারেন না। সবই তাঁর কাছে নতুন তথ্য। বিহানের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকেন। প্রথম প্রথম অস্বস্তি হত ঠিকই। কিন্তু এখন এই ব্যাপারটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। বিনোদিনীর সঙ্গে গল্প করার সময় অন্তত বিহানের মনে হয় সে সত্যি করেই ২০১১-তেই বাস করছে। একটা সাময়িক দুঃস্বপ্নের মধ্যে আছে সে, যে কোনও সময় ঘুম ভেঙে যাবে।
সেদিন ওরা বাড়িতেই ছিল। অনাদি ভেতরের ঘরে শুয়ে আছেন। অনুরাধা স্থানীয় লাইব্রেরিতে গেছেন একটা বই ফেরত দিতে। বিহান আর বিনোদিনী বসার ঘরের সোফাতে বসে গল্প করছিল। বিনোদিনী পড়ন্ত দুপুরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “আচ্ছা বিহঙ্গ, তোমার মনে হয় আজ থেকে কুড়ি-তিরিশ বছর পরে মানুষের কাছে একই রকম সময় থাকবে ঘুরে বেড়ানোর, গল্প করার?” বিহান একটু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল – “কেন তোমার এমন মনে হচ্ছে?” বিনোদিনী তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, “এই যে ধরো কাজ আছে বলে তোমার দিদিকে ফেলে জামাইবাবু একা-একা দিল্লি চলে গেলেন। এমন ব্যস্ততা তো আরও বাড়বে পরে। ধরো আমার বাবা-কাকাদের হাতে কাজ করে সময় থাকত। এখন আর সেসব কই?” বিহানের আবছা মনে পড়ে সে একটা উঁচু বাড়িতে রোজ উদয়াস্ত পরিশ্রম করত। সপ্তায় দু-একবার মায়ের সঙ্গে কথা হত। বন্ধু-বান্ধবের বৃত্ত কলেজ ছাড়ার পরেই সংকুচিত হতে হতে প্রায় শূন্যে দাঁড়িয়েছিল। আলাদা করে নিশ্চিত কিছু মনে পড়ে না। তবু সে বিনোদিনীকে বলল, “ভালোবাসার জনকে মানুষ ঠিকই মনে রাখে, তার জন্যে সময় খুঁজে নেবে যতই ব্যস্ততা থাক।” বিনোদিনী কাতর চোখে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি চলে যাওয়ার পরেও মনে রাখবে আমায়?” বিহানের খুব কাছে, বিপজ্জনক দূরত্বে বিনোদিনীর চোখ, তাঁর নাসাগ্রের স্বেদবিন্দু, তাঁর তিরতির কাঁপতে থাকা ঠোঁট। এই আহবান উপেক্ষা করার মন্ত্র জানা নেই বিহানের। প্রথমার দিকে এগিয়ে গেল সে। তীব্র আশ্লেষে ভেসে গেল দুজন মানুষ। যেন প্রথম পুরুষ আর নারী এক হয়ে যাচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক একটা নদীর তীরে। দীর্ঘকাল স্বামী-সংসর্গে বঞ্চিতা বিনোদিনী বিহানকে আশ্রয় করে অশান্ত সমুদ্রের মতো ফুঁসে উঠেছেন। আর বিহানের জন্যে এই রোমাঞ্চকর স্খলন একেবারেই অনাস্বাদিত। কতক্ষণ কেটেছে কারোরই মাথায় নেই, হঠাৎ বিহানের মনে হল কেউ যেন তাদের লক্ষ করছে। সোফা থেকে মুখ তুলে সে দেখল শোবার ঘরের দরজা থেকে বিস্ফারিত দৃশ্যে তাদের দিকে তাকিয়ে আছেন অনাদি। সে দৃষ্টিতে রাগ-ঘৃণা-যন্ত্রণা জ্বলজ্বল করছে। বিনোদিনীও অনাদিকে দেখতে পেয়েছেন। এক মুহূর্ত দেখেই সোফা থেকে উঠে গায়ের শাড়িটা টেনে নিতে যাবেন, এমন সময় একটা হুংকার দিয়ে তাঁর দিকে তেড়ে গেলেন অনাদি। বিহান বাধা দিতে গেল, কিন্তু হাতের এক ধাক্কায় সে ছিটকে পড়ল মেঝেতে। এরকম হাড় জিরজিরে মানুষের গায়ে এমন আসুরিক শক্তিতে অবাক হয়ে গেল বিহান। কিন্তু তাতেও সে হাল ছাড়ল না। বিনোদিনীকে বাঁচাতে সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল অনাদির ওপর। নিজের আব্রু ঢাকতে ঢাক্তে বিনোদিনী দেখলেন দুই পুরুষ আদিম এক লড়াইয়ে মেতেছে। পুরাকাল থেকে যে কারণে তারা একে অন্যের রক্তপানে উদগ্রীব – ভূমি, নারী, প্রভূত্ব।
বিহানের দম ক্রমশ ফুরিয়ে আসছিল। তার বুকের ওপর চড়ে তার গলাটা দু হাতে টিপে ধরেছেন অনাদি। চার হাত-পা চালিয়েও সে বিশেষ সুবিধা করতে পারছে না। হঠাৎ অনাদির মুখ থেকে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। তার হাত দুটো শিথিল হয়ে এল। বিহান দেখল অনাদির পেছনে শিলনোড়ার নোড়াটা আবার মাথার ওপর তুলেছেন বিনোদিনী। আবার একটা ভোঁতা আওয়াজ। আবার একটা আর্তনাদ। বিহান অনাদির শরীরের নিচ থেকে পিছলে বেরিয়ে এল। কিন্তু বিনোদিনীর তাতেও থামার কোনও লক্ষণ নেই। একের পর এক আঘাত নেমে আসছে অনাদির মাথা লক্ষ্য করে।

অনুরাধা যখন ফিরলেন, তখন সোফার ওপর বিস্রস্ত পোশাকে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে আছেন বিনোদিনী। মেঝেতে রক্তের স্রোতের মধ্যে পড়ে আছেন অনাদি। আর তাঁর থেকে সামান্য দূরে খালি গায়ে কোলে রক্তাক্ত সেই নোড়াটা নিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে বসে আছে বিহান।


শেষ সাক্ষাত

অনুরাধা বিহানের হাতে হাত রাখলেন – “আমি আর আসতে পারব না রে ভাই। তোর জামাইবাবু জানতে পারলে আমার মুখ দেখবেন না আর। জেলে যেতে ওরা বলল তোকে এখানে নিয়ে এসেছে। অনেক কষ্টে অনেকদিন খুঁজে এই হাসপাতালটা খুঁজে বের করেছি।” তারপর বিহানের থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া না দেখতে পেয়ে বললেন – “আমি এই ব্যাগটা রেখে যাচ্ছি। ওর মধ্যে কিছু ফল আছে। খাস।” বিহানের বেডের পাশের ছোট ড্রয়ার-কেবিনেটের ওপর রাখা একটা ঝোলা ব্যাগ দেখিয়ে বললেন – “আমার একটা খাতাও আছে ওতে। সেটা দেখিস।”
অনুরাধা চলে যাওয়ার অনেক পরে বিহান ধীরে ধীরে ব্যাগ থেকে সবুজ রেক্সিনে বাঁধানো একটা খাতা বের করল। তার থেকে টুপ করে একটা চিঠি খসে পড়ল। বিহান আলগোছে সেটা টেনে নিল।

১২ বৈশাখ, ১৩৯১


প্রিয় দিদিভাই,

প্রণাম নিও। আশা করি তুমি ভালো আছ। এ চিঠি যখন পাবে, তখন আমি অনেক দূরে চলে গেছি। অনেকবার এ কথাগুলো তোমায় বলতে চেয়েও বলতে পারিনি, তাই লিখে যাচ্ছি। আজীবন মেয়েমানুষ হিসাবে কাটিয়ে দেওয়া আর একজনের কথা হয়তো তুমি বুঝবে।
আর কদিন পরেই আমার সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে। তাকে তুমি নিজের কাছে রেখো। দেখো তার প্রতি কোনওদিন অবহেলা না হয়। অনেক ভালোবাসায় তার বীজ গাঁথা হয়েছিল। তাই একটা প্রাণ শেষ করে দেওয়ার পরেও বহু চেষ্টাতেও আর একটাকে হত্যা করতে পারিনি। এ জীবনে আর কোনও কিছুর জন্যে আমার কোনও অনুশোচনা নেই। আশা করি, কিন্তু দুর্ঘটনাবশত যে অপরাধ আমি করেছি, নতুন একটা প্রাণের জন্ম দিয়ে তার প্রায়শ্চিত্ত হবে।
তোমরা ভালো থেকো। ইতি।

তোমার অভাগিনী বোন



চিঠিটা পড়ে বিহান পুরোটাই যে বুঝতে পারল, এমনটা নয়। অনেক শব্দেরই অর্থ আজকাল সে বুঝতে পারে না। অনেক ঘটনা চোখের সামনে দেখেও সে অনুধাবন করতে পারে না। এই যেমন আজ বিকালে দিভাই কী বলে গেল তার পুরোটা সে বুঝতে পারেনি। জামাইবাবু কে এবং কেন তিনি দিভাইয়ের মুখ দেখবেন না, সেটা তার বোধগম্য হল না। তবু সে সযত্নে চিঠিটা আবার তুলে রাখল খাতার মধ্যে। তারপর খাতাটা ঢুকিয়ে রাখল ব্যাগে।

রাত তখন কটা বাজে সে জানে না। মনে হল তার খাটের পাশে কারা যেন ঘোরাফেরা করছে। বিছানার ওপর উঠে বসে সে ভালো করে দেখতে গেল, তার আগেই কে যেন তার মাথার ওপর একটা ছোট থলি পরিয়ে দিল। তারপর তার মুখটা চেপে ধরে চ্যাংদোলা করে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি ধরে নিচে নামতে শুরু করল। হঠাৎ বিহানের কান একটা ফটফট আওয়াজ এল। খুব চেনা। তার মাথার ওপর থেকে থলিটা খুলে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে তাকে সামনের দিকে ঠেলে দিল কেউ। বিহান চিনতে পারল। একটা হেলিকপ্টার। সে আগেও দেখেছে।


১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১

বিহানের সামনে বসে একজন হরকরা। পাশে আর একজন। বিহান মুখ খোলার আগেই পাশের জন তার ঘাড়ে একটা ছুঁচ ফুটিয়ে দিলেন। বিহান প্রতিবাদে ফুঁসে উঠে কিছু বলতে গেল, কিন্তু তার গলা থেকে ঘড়ঘড় করে একটা আওয়াজ বের হল কেবল। তার ঘাড়ে দৃঢ়ভাবে হাত রেখে বসে আছেন পাশের জন, নড়চড়ার কোনও উপায় নেই। সামনের জন এবার মুখ খুললেন – “আমাদের ওপর রাগ করবেন না। এটাই আমাদের কাজ। আপনার মনে আছে নিশ্চয়, এই ঘটনা আগেও ঘটেছে।” বিহানের মনে পড়ে যাচ্ছে, এই দুটো লোক তাকে হেলিকপ্টার থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। এদের জন্যেই আশ্চর্য এক ধাঁধার মধ্যে প্রায় পুরো একটা বছর সে ঘুরপাক খেয়েছে। বিহান নিস্ফল আক্রোশে চেঁচিয়ে উঠতে চাইল। আবারও গলা থেকে একটা জান্তব ঘড়ঘড় বেরিয়ে এল। সামনের জন নিজের কব্জির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার হাতে মিনিট চল্লিশ সময় আছে। তার মধ্যে বিহান চক্রবর্তীকে শেষ করতে না পারলে আবার দেখা হবে আমাদের।” তারপর পাশের জনকে চোখে ইশারা করলেন।

এবার উচ্চতা বোধ হয় কম ছিল। তার ওপর বিহান এসে পড়েছে একটা বড় আস্তাকুঁড়ের ওপর। ময়লা পলিথিন ব্যাগ, সব্জির খোসা, ছেঁড়া কাপড়ের ছোটখাটো একটা পাহাড়। তার ওপর থেকে গড়িয়ে পড়ার পর উঠে দাঁড়াতে গিয়ে ডান পায়ে তীব্র একটা ব্যথা অনুভব করল সে। কিন্ত হঠাৎই চোখে পড়ল কিছুটা দূরে এক যুবক হেঁটে আসছে। ওই টিশার্ট-পাজামা তার চেনা। এক হাতে একটা বোতল। ওই তো পকেট থেকে মোবাইল বের করল সে। আশু বিপদ সম্পর্কে তাকে সতর্ক করার জন্যে একটা জান্তব চিৎকার করে বিহান ছেলেটির দিকে ছুটে গেল।



চিত্রসূত্রঃ ইন্টারনেট

আপনার মতামত জানান