সমঝোতা

সংগীতা দাশগুপ্ত রায়


"আজ ডিম করেছ?"
"মাছ তো হয়ইনা । মাঝে একদিন একটু ডিম হলে ছেলেমেয়েদুটো খুশি হয়"
"তাহলে শুধু ওদের জন্য করলেই তো পার "...
কথা না বাড়িয়ে থালায় ভাত বাড়তে থাকে জয়া
"মা, এ’মাসে কালিকাকার বিয়ে তো! আমরা যাব?"
জয়া তিলকের দিকে তাকায়। বাল্বের আলোতে জীর্ণ মানুষটাকে আরও বয়স্ক দেখাচ্ছে। গায়ে একটা মাড় শুকোনো গন্ধ। লোহার ইস্ত্রি চালিয়ে চালিয়ে আঙ্গুলগুলোতে কড়া পড়ে গেছে । এত খেটেও দুবেলা চারটে পেটে টান লাগে মাসের শেষে । এর মধ্যে বিয়েবাড়ি...
"যাব রে মা যাব" তিলক থালার শেষ ভাত ঝোলটুকু কাচিয়ে নিয়ে মুখে তোলে
মেয়ের মুখে হাসি ঠিকরোয় "বিয়ে বাড়িতে মাংস খাওয়াবে, না?"
"হুঁ, চাটনি আর মিষ্টিও .."
"হ্যাঁ মা। অনেক খাব সেই ময়নাপিসির বিয়ের মত" টুকুনও লাফায়
চোখে জল আসে জয়ার। খিদের আর লোভের মধ্যে তফাৎ করতে পারে না বাচ্চাদুটো।
"কিন্তু মা, আমার সেই ভাল জামাটা তো ছিঁড়েই গেছে । কি পরে যাব?"

শুয়ে শুয়েও কথাটা ঘুরতে থাকে জয়ার মাথায়
"হ্যাঁগো, বিয়েতে দেওয়ার একটা কিছু তো তবু জোগাড় করব। কিন্তু মেয়েটার তো ভাল জামাও নেই। সেও কিনতে হলে..."
"হবে, সব হবে" তিলক ঘুমে তলিয়ে যায় ।
...
একদম ওপরের তাকে কেউ বহুদিন নিতে আসেনি এমনি জামাকাপড় রাখা আছে । আজ বৃষ্টিতে খদ্দের নেই। ওপর থেকে প্যাকেটগুলো নামায় তিলক। খুলে খুলে দ্যাখে। কল্কাপেড়ে শাড়ি, মিহি জমির ধুতি, একটা শার্ট। খুঁজতে খুঁজতে প্যাকেটটা পেয়ে যায়। ধুলো ঝেড়ে বার করে একটা চাঁপা রঙের ফ্রক, গলায় লেসের কাজ খয়েরি সুতো দিয়ে, কোমরে খয়েরি স্যাটিনের বেল্ট। প্রায় চিনিরই সাইজ। প্যাকেটের বিল নাম্বার মুছে গেছে। কার জামা? কেনই বা তারা এতদিন ধরে অবহেলায় ফেলে রেখেছে এটা দোকানে? ভুলে গেছে বুঝি অনেক আছে বলে? যারই হোক সে খুকিও কি এদ্দিনে বড় হয়ে যায়নি? তাছাড়া বাড়ির লোকের তো হুঁশই নেই জামাটার...
সারা দিন ধরে তিলক জামাটা বার বার খোলে আর গুছোয়। তারপর আটটা বাজতে ঝাঁপ ফেলে প্যাকেটটা নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা দেয়। একবারই তো, তারপর না হয় ধুয়ে কেচে আবার অপেক্ষা করবে জামাটা তার মালকিনের।

আপনার মতামত জানান