জন্মদিন,ফেসবুক ও স্মার্টফোন

ঋজু ঘোষ
লোকাল ট্রেনটা এমন সব জায়গা দিয়ে যায় না, সিগনালটা মাঝে মাঝেই গায়েব হয়ে যায়। অথচ এই টেলিফোন কোম্পানিগুলি এত বিজ্ঞাপন দেয়, আজ এখানে কাল ওখানে। সেই দেখে সুমিত গতমাসেই সিমটা চেঞ্জ করল। প্রথমে চেষ্টা করেছিল যাতে নাম্বারটা বজায় রাখা যায়। হোল না। আইন থাকলেও এক কোম্পানীর সাথে আর এক কোম্পানীর কোন সমঝোতাই নেই। অগত্যা বদলাতেই হোল এই আশায় যে আগের থেকে ইন্টারনেটের স্পীডটা বেশি হবে। ছয়মাস আগেই সে একটা স্মার্টফোন কিনে স্মার্ট হবার চেষ্টা করছে। স্মার্টফোন মানেই ইন্টারনেট। এই ইন্টারনেট শব্দটা শুনলেই তাঁর শিলাজিতের সেই “ইন্টারনেটে বেচাকেনা হয় ছাগলের মেটে” গানটার কথা মনে পড়ে যায়। এই ইন্টারনেট স্পীডটার জন্যেই মূলত সীমটা বদল হোল। “যাহা বাহান্ন, তাহাই তিপ্পান্ন”। আগেরমত সেই একই স্টেশনের কাছাকাছি এলেই সিগনালটা ড্রপ করে যায়।
আজই সুমিতের জন্মদিন। তিরিশতম জন্মদিনের বাড়ির থেকে দূরে কীই বা করার আছে, তাই অফিসের পথেই চলেছে। আগে যখন বাড়িতে থাকত তখন মা পায়েস বানাত, সঙ্গে থাকত লুচি আর তরকারি। তারপর স্কুলের পথে যাত্রা। এখনকার মত স্কুলের বন্ধুদের লজেন্স দেবার রীতি ছিল না। তাই কেউ জানতই না কবে কার জন্মদিন। কারও কারও বাড়িতে জন্মদিন উপলক্ষে নেমন্তন্ন করা হ’ত। সাধারণত সন্ধ্যেবেলায় জমায়েত হ’ত সকলে। খাওয়া দাওয়ার পরে হই হই করে বাড়ী ফেরা। এইরকম কোন নিজের জন্মদিনের স্মৃতি নেই সুমিতের। গতবার স্বাতী আমেরিকা চলে যাবার আগে একটা এইরকম ট্রীট দিতে চেয়েছিল। সুমিত আগ্রহ দেখায় নি। স্বাতী পাঁচ বছরের জন্যে আমেরিকা চলে গেছে, রিসার্চ করবে বলে। সুমিত জানে স্বাতী আর ফিরে আসবে না। স্বাতী মাঝে মাঝেই সুমিতকে সবকিছু ছেড়ে চলে আস্তে বলে। সুমিত এখনও ঠিক করে উঠতে পারে নি কী করবে। তার পক্ষে মাঝে মাঝে সেখানে যাওয়া সম্ভব না। স্বাতী আসতে পারবে না বলে দিয়েছে। একে তো অ্যাসাইনমেন্টের চাপ তার উপর স্কলারশিপের টাকায় প্লেনভাড়া যোগাড় করা মুশকিল। সুমিতেরও সঞ্চয় তেমন কিছু নয়। স্বাতীর ভিসা, ফর্ম ফিলাপ বাবদ অনেক টাকা বেড়িয়ে গেছে। বড়সড় ধাক্কা। তাই এইমূহুর্তে সুমিতে কাছে বিদেশভ্রমণ একধরণের বিলাসিতা।
কাল রাতে সুমিত স্বাতীর সাথে স্কাইপে চ্যাট করেছে। স্বাতী আবদার করেছিল সুমিতকে জন্মদিনের পোশাকে দেখবে বলে। সুমিত তেমন গা করেনি। স্বাতী বুঝতে চায় না সুমিতকে। ওর কাছে সব কেমন জানি ছাড়া ছাড়া। গতবছর জন্মদিনের আগেই সুমিতের বার্থডেটা আপডেট করে দিয়েছিল স্বাতী।
বলেছিল, ‘মজা দেখ, এমন সব লোকেরা তোমায় উইশ করবে তাদের তুমি কোনদিনও দেখনি। নিজেকে সেলিব্রিটি মনে হবে।‘
সুমিতের এইসব কোনদিনই তেমন ভালো লাগে না। কিন্তু স্বাতী চলে যাবার পর সুমিত ফেসবুকে বেশ অ্যাক্টিভ হয়ে উঠেছে। কয়েক’শ বন্ধুর থেকে এখন হাজার খানেক বন্ধু হয়েছে তার। কারও কারও সাথে গভীর রাত পর্যন্ত চ্যাট করেছে। আগে অফিস থেকে বাড়িতে ফিরে এলেই চ্যাটগুলি করা যেত এখন স্মার্টফোনের দৌলতে সারাক্ষণ ধরেই চলে। নেশার মত হয়ে গেছে। কয়েকজন কলেজপড়ুয়াও আছে এর মধ্যে। যারা আবার নাকি সুমিতের লেখার ভক্ত। সুমিত লেখে ঠিকই কিন্তু সেইরকম অর্থে লেখক নয়। মাঝে মাঝে এখানে সেখানে লেখা বের হয়। ইদানিং সে তা ফেসবুকে শেয়ার করছে। কয়েকটা লাইক, কিছু মন্তব্য। কার না ভালো লাগে। এক-দুজন আবার আলাদা করে মেসেজ করে দেখাও করতে চেয়েছে। অফিসের পর এতটা পথ ফিরতে হয় বলে সুমিত তেমনভাবে উৎসাহ দেখায় নি। মাঝে মাঝে সুমিতের মনে হয় তিরিশটা এমন কিছু বয়সই না। নইলে এইসব কচিকাঁচারা ভীড় করবে কেন।
গত বছর তেমনভাবে কেউই উইশ করে নি। এবছর সুমিত আশা করছে বেশকিছু লাইক পাবে। সেই আশায় সে ফোনটাকে খুলেছিল। নেটওয়ার্কটা এইসময়েই গায়েব হোল। সক্কালবেলা অফিস যাবার আগে সুমিত নিজের প্রোফাইলটা চেক করেছিল ফেক প্রফাইলের মাধ্যমে লগ-ইন করে। তাতে একটা উইশও করে রেখেছিল। তারপর নিজের প্রোফাইলে লগ- ইন করে একটা মেসেজ করে দিয়েছিল,
“আমার জন্মদিনে আজ আমাকে অনেকেই উইশ করেছেন, বন্ধুরা ইনবক্সে মেসেজ করেছেন। আমি সকলকে আলাদা করে ধন্যবাদ দিতে পারিনি বলে দুঃখিত। আপনাদের সকলের আশির্বাদে আমি ধন্য।“
আসল কথাটা হোল তখনও পর্যন্ত কেউই উইশ করে নি। হয়ত ফেসবুকীয় প্রাণীরা ঘুমকাতুরে হয়, সকালবেলায় উঠতে পারে না। তাই নিজের প্রোফাইলে লগ-ইন করে নিজেয় একটা আপডেট দিয়ে রেখেছিল। অফিসে গিয়ে সেরকম কোন লাল নোটিফিকেশন দেখতে না পেয়ে তাতে নিজেই একটা লাইক দিয়ে দেয়, যদি কারও নজরে পড়ে।
আজ অফিসের কাজ ভালোই ছিল। আগামী মাসে ইন্সপেকশন হবে। তাই সবকিছু ঠিকঠাক করা চলছে। প্ল্যান আছে ফেরার পথে যদি তেমন লাইক বা কমেন্ট না পড়ে, তবে একটা গুগুল থেকে কেকের ছবি নিয়ে আপডেট দেবে,
“থ্যাঙ্কস ফর দা অসাম বার্থ ডে, ইয়ু অল হ্যাভ মেড মাই ডে স্পেশাল”
এইটা তার সর্বভারতীয় বন্ধুদের জন্যে যারা বাংলা জানে না। সুমিতের বিশ্বাস এতে আরও কিছু লাইক বা কমেন্ট পড়বেই।
এইসব ভাবতে ভাবতেই নামার স্টেশনটা এসে গেল। নাহ্‌, আজ তো কিছু কেনার নেই। চারপাশ অন্ধকার লাগছে। মনে হয় লোডশেডিং। এই এক শুরু হয়েছে। আজ মনে হয় ভোগাবে। এই গরমে সারারাত যদি লোডশেডিং হয় তাহলে ঘুমের বারোটা বাজবে। যাইহোক কাল অফিস ছুটি আছে। মণিলাল কলেজের ওই মেয়েটা দেখা করবে বলছিল। ভাবল ব্যাপারটা কালই করলে কেমন হয়। এইসব ভাবতে ভাবতে সে যখন স্টেশন থেকে বেরোচ্ছে তখন ঠিক সরু গেটটার উল্টোদিক থেকে বেশকিছু মহিলা পুরুষ দ্রুত স্টেশন-এর দিকে ঢুকছিল। অন্ধকার বেশ ভালোই জমে উঠেছে। সুমিত একটা কোনে দাঁড়িয়ে ওদের পথ করে দিচ্ছিল। একটা চাপ যেন ঝড়ের মত পার হয়ে গেল।
রিক্সায় বসে ভাবতে লাগল, রাতে খাবার তো সকালেই মাসি বানিয়ে গেছে। আজ কিছু স্পেশাল খেলে কেমন হয়। তাহলে তো খাবারগুলি নষ্ট হবে। তারচেয়ে বরং কাল মণিলাল কলেজের মেয়েটার সাথে ট্রিটটা করলে কেমন হয়? স্বাতী যেমন ওর কলিগের সাথে লাঞ্চের ছবি লাগায়? সুমিত লাগালেই বা দোষ কি? সুমিতের এই নতুন মোবাইলের ক্যামেরাটা বেশ ভাল। এখন আর আলাদা করে ডিজিটাল ক্যামেরাটার দরকার হয় না।
এইসব ভাবতে ভাবতে সুমিত তার পকেটে হাত দিল। নাহ্‌ নেই। ডান পকেটেই তো রেখেছিল। বা পকেটেও নেই। জামার পকেটও হালকা। তাহলে কি ট্রেনেই পকেটে ঢোকাতে গিয়ে পড়ে গেছে? না ওই ভীড়েই কেউ উঠিয়ে নিল? মাত্র ছ’মাস আগে কেনা? এখনও পুরো টাকাটা শোধ করা হয়নি।
রিক্সায় বসে অন্ধকার চেনা গলিতে যেতে যেতে মানসচক্ষে সুমিত তার ফেসবুকের লাল নোটিফিকেশনগুলি দেখতে পাচ্ছে।
এক- দুই- তিন করে তারা কয়েকশ ছাড়িয়ে গেছে।

আপনার মতামত জানান