পাঁচটি কবিতা

কাজী মেহেদী হাসান
১.
পুরুষ

যুগল পাহাড়ে গেলে পুরুষেরা সোমত্ত হয়ে ওঠে
ত্রিকোণা বেদীতে বড্ড ধুর্ত সাপের ভিড়।
হেঁটে গেলে ব্রাহ্মনিতম্বিনী— পৃথিবীকে গণিকালয় মনে হয়

এই কথা বোললেন সাধক পুরুষ, বোললেন—
এইরূপে প্রেম আসে, করে সিদ্ধি লাভ; পুরুষ শরীর।

যারা মহাকাল লিখে রাখে, লিখে হেলেনের ত্রুটি
( আড়ালে জ্যামিতিক শরীর )
শুনেছি তারাই বলে, সঙ্গমে নারীরা অধিক সুন্দরী
বলে- যুদ্ধ ধ্বংসাত্মক, আরও বেশি নারীর শরীর!

এই বোলে চিরকাল পুরুষেরা উঠে আসে পথের ওপারে
দ্যাখে দাঁড়িয়ে প্রেমিকা এক—
মাংসের গন্ধহীন,
পৃথিবীর মতো করে অপেক্ষা লিখেছে রেখে ভেতর- বাহির।



২.
মদ সংক্রান্ত নয়

আপনার স্ত্রী'কে দেখলাম অন্য লোকের হাসিতে
আসুন মদ খাই
ঐ লোকটার মতো আপনিও চুমু খেতে পারবেন
আসুন স্থির হয়ে বসি
আপনি চাইলে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন
দ্বিধা রাখবেন না
যেহেতু মানুষ অনিশ্চয়তা ভালোবাসে
ভালোবাসে চলে যাবার পথ, অন্তত এক-বার মরে যেতে চায়।

আপনাকে প্রথম দেখেছিলাম প্যারিদাস রোডে
দু' নম্বর লেন
আগুনে পুড়ে যাওয়া বৃক্ষের মতো সিগারেট টানছিলেন;
আপনার স্ত্রী হয়তো আমার কবিতা পড়েননি
নইলে অমন বখে যাওয়া...
— বাদ দিন
— আমি বাদ দিলাম
গ্লাসটা সাবধানে ধরুন—
মদ যথেষ্ট সন্মানীয়,
মানুষের মতো রঙের উৎফুল্লতা নিয়ে কটু বুদবুদ ছড়ায়
আমরা অভ্যস্ত
এক নিঃশ্বাসে বিষাদ গিলে ফেলা; চাট্টেখানি কথা?

— ওটা বিষাদ নয়, বিস্বাদ হবে
চার বৎসরের প্রেম, বুঝলেন?
সিঁথিতে গাঢ় সিঁদুর ছিল
— রঙের কৌটোয় বিশ্বাস থাকে?
আসুন মদ খাই
শুনেছি স্বর্গে মদের নদী থাকবে রীতিমত
প্রতিদিন এক গ্লাস মদ খেলে ডাক্তারের শরনাপন্ন হতে হয় না।

আর এক পেগ
দেখবেন আপনার ভয়ে দেয়াল কাঁপতে শুরু করেছে!
মানুষেরও দেয়াল আছে
আদতে অদৃশ্য অথচ স্থির
বিগত দিনের প্রেমিকাদের নিজস্ব আর্কাইভে রেখে দ্যায়।
তাকে ভুলে গেছি
তোকে ভুলে গেছি
আপনাকে ভুলে গেছি বলে
আপনি যতই চিৎকার করবেন, সে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠবে;
আয়নায় নিজস্ব মুখ সবসময় নিজের হয়ে ওঠে না।

সকলেই মাদকাসক্ত হয় না
শোনা যায় আপনার স্ত্রী চোখে মাদক বহন করতেন
বোধকরি সে জন্যই শুল্ক নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার প্রেমে পড়েছিলেন;
জানেন তো, ভালোবাসা চুম্বকধর্মী
চিরকাল বৈপরীত্যে বিশ্বাসী!
দুঃখ পাবেন না—
দুঃখ নিরর্থক, যদি না সেটা প্রকৃতই 'দুঃখ' হয়।

শীতের প্রারম্ভে মদ উৎকৃষ্ট দাওয়াই হতে পারে
যদি আপনি গ্রীষ্মের প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক হয়ে থাকেন
মানুষের চলে যাওয়া আরও এক অন্তর্গত বিস্ময়
যখন অংশত হৃদপিণ্ড অভিনয় করে জাদুকরের;
যখন আপনি উঠে দাঁড়াতে চান
বিভ্রান্ত হয়ে পরে আমাদের সমগ্র আঙুল,
যখন আপনি ছুটে পালাতে চাইছেন
অথচ পায়ের সমান আকৃতি নিয়ে মগজে দ্যাখেন সমাধিপাথর,
স্নায়ুকে পরিশ্রান্ত করবেন না—
মদের পেয়ালায় রেখে দিন—
মূলত, প্রস্থানের বহুকাল আগেই আমাদের ফিরবার পথ করে রেখে যেতে হয়।


আমাদের জ্যামিতিক ভ্রমণ যতদূরই যাক না কেন
জেনে রাখা ভালো—
দুটো বিন্দু চিরকাল একটি সরলরেখাই হতে পারে।



৩.
অদ্বিতীয়

তোমাকে দেখবো বলে দাঁড়িয়ে ছিলাম একটি সম্পূর্ণ শরৎ
রবীন্দ্র রচনাবলীর মতোই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি
নাকের ঘাম, চোখের পতনের সময়কাল এবং ঘন নিঃশ্বাসের মধ্যবর্তী দূরত্ব।
অথচ, শেষচুম্বনের সময় আমার কাছে কোন হাতঘড়ি ছিল না!

লিখেছিলাম-'রমণীর একই ঠোঁটে তৃষ্ণার জল আর হেমলক থাকে যুগপৎ,
উল্লেখ্য আর ঘৃণাযোগ্য মুখ বলে কিছু নেই।'
কালপুরুষ বলেছিলেন-'কবির এইরূপ দুঃখ থাকা চাই'
দুঃখ?
তাকে আমি দেখেছিলাম ঢাকার জনবহুল রাস্তায়; একা নয়, একাকী।
একটা ট্রেনের মতো ধাবমান
চিরকাল গন্তব্য চেনে নির্ভুল; নিজের নয়, অন্যের!

আমরা হাটছি একটা বৃত্ত ধরে
আমরা হাটছি স্মৃতি থেকে ভবিষ্যৎ
আচমকা দ্যাখা হলে—
তোমার যে হাত ছুঁয়েছিলাম সংখ্যাতত্ত্বের নিয়মের বাইরে
যে হাত মিছিলে যেত আমার হাতের সমান্তরাল
যে হাত ঘুমিয়ে গ্যাছে বহুবার আমাকে ভালোবেসে
সেই হাত—
সেই নাতিশীতোষ্ণ হাত ধরে থাকে যে অন্য লোক
তাকে কুশল জানাবো;
এক সিগারেট দূরত্বে দাঁড়িয়ে বলবো— 'লোকটা সুখী হোক'।


যদিও মানুষের হৃদয় চিরকাল প্রতারক!




৪.
চারু মিত্র

গল্পটা বরং শুরু করা যেতো এভাবে—
এই বোলে কাগজটা দখল কোরে নেয় চারু
পুরোনাম চারু মিত্র—
হেমন্তের রোদ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

'চওড়া ঠোঁটে আপনাকে বড্ড বেমানান লাগে বুঝলেন
ওতে আমার ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন থাকে
সে অবশ্যি আপনি বুঝবেন না'

পাটীগণিতের ফাঁকে আমি ক্যালকুলাস বোঝার সাহস করি না
চেপে যাই—
চারু'দের বাসায় আমার টিউশনির বয়স তিন
চারু'র উনিশ
আর আমার?
ছাব্বিশ নাকি ছত্রিশ?
সময় করে হিসেব করা যাবে একদিন।

সাইকেলে কোরে আসতে হতো আমাকে
দু'কিলোমিটার মাত্র—
অথচ দু'পা দুরত্বে কখনই দ্যাখা হয়নি তাঁর চোখ
জানা হয়নি কোনো শীতে সেখানে আষাঢ়-শ্রাবণ আসে কি না!

বহুদিন অলক্ষে আবৃত্তি শুনেছি
'আবার বছর কুড়ি পরে......'
চারু 'জীবনানন্দ'কে ভালোবাসতো
আর আমি চারু'কে।
( সেসব বলা হয়নি কোনদিন )

সে ফ্রক ছেড়ে সালোয়ার কামিজ পড়তে শুরু করে—
আমার সাইকেলটা দিন দিন পুরনো হতে থাকে;
ব্যাক্তিগত ডায়েরীতে সে কারও নাম লিখতে শুরু করে—
আমি মায়ের জন্য অ্যাসপিরিন আর ইনসুলিন লিখে রাখি;
চারু'র বারান্দায় এক দুর্লভ অর্কিড প্রার্থনা করে আকাশ।
আমার হাতের পরিসীমা সামান্য—
লোকে জেনে ফেললে আমার টিউশনি চলে যাবে
মায়ের ঔষধ চলে যাবে
সাইকেলটা অকেজো হয়ে পড়বে
আমার হাসি-কান্না, আকাশ স-ব চলে যাবে।

তাকে বলা হয় না—
তাকে বলা হয় না তাঁর অসাবধাতাবশত ওড়না সরে গেলে
আমি অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি
বলা হয় না—
আমার বিছানায় শীতকাল চলছে গত এক যুগ ধরে
বলা হয় নি—
বহুদিন গোলাপ হাতে এনে দরজার বাইরে রেখে এসেছি।

আচমকা টিউশনিটা ছেঁড়ে দিতে হলো
চারু মিত্রের সাথে দ্যাখা নেই প্রায় কুড়ি বছর
আরও কুড়ি বছর কেটে যাবে শাদা কাগজটা পৌঁছতে—
'চারু মিত্র' কবিতাটি শেষ করা হয় না।

ঘরোয়া আড্ডায় বন্ধুরা তাকে নিয়ে কথা বলে
বলে কবিতার কথা,
আমি বিব্রত হই না
কিছু কবিতা অশেষ থাকুক।

কবিতাটা শেষ করা হলো না,
এই দুঃখ নিয়ে চারু মিত্র'কে ডেকে আনি ধীরে
রাতের বয়স বাড়লে জীবনানন্দ আবৃত্তি করি
আবৃত্তি করি চারু মিত্রকে—

“সোনালি সোনালি চিল- শিশির শিকার করে নিয়ে গেছে তারে—
আবার বছর কুড়ি পরে......সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে!”




৫.
পরাবাস্তব

সে সমুদ্রে এসেছিল সুসজ্জিত ইয়টের মতো
চুয়ান্নটি সুখের পতাকা নিয়ে অবতরণের পূর্বেই
ডুবে গ্যাছে আমার চোখের ভেতর।
সে এসেছিল ঘুমবিহীন স্বপ্নের লৌকিকতায়
স্পর্শ থেকে আড়াইশো কিলোমিটার দুরত্বেই
রূপান্তরিত হয়েছিল আমার উৎকৃষ্ট কবিতায়।

সে কখনও আসেনি—
যেহেতু আত্মহত্যাপ্রবণ প্রেমিকেরা দু'বার মরে না।

আপনার মতামত জানান