অলির কথা

তাপসকিরণ রায়


গ্রামের মেয়ে অলি। ভোমরার গান খুব ভালো লাগে তার। আগানে বাগানে জঙ্গলে যেখানেই ফুল ফোটে, ভোমরা সেখানেই হাজির হয়। আর এক ফোঁটা মধু মুখে লাগলো কি না লাগলো অমনি ভ:.অ.অ.অ.তার গলা থেইক্কা গান বাইরৈলো। অলির খুব ভালো লাগে সেই গান শুনতে, ডালপালা ছাওয়া গাছের ছায়ায় বইয়া সে গান শোন, কি গান গাও গো ভোমরা!.. আমার মন প্রাণ যে কাঁদে তোমারি লাগিয়া গো, অলি মৃদু গান ধরে ভোমরার সঙ্গে গলা মিলায়, আর ছোটে, ছোটে তার পিছে পিছে। কোথায় যাও গো ভোমরা! আমারে লয়ে যাও সাথে, হা হা হা আনন্দে আট খানা অলি।
অলি আর তার মা বাবা তিন জনের সংসার। ছোট্ট গ্রামে থাকে, খিদির পুর তার নাম। পূর্ব বাংলার ঢাকা জেলার মনোহরদী থানার অন্তর্গত ছোট এই খিদির পুর গ্রাম, হ্যাঁ, পনের ঘরের বাস মাত্র। গ্রাম ছাড়ালে চোখ যতদূর যায় মাঠ আর মাঠ, খেত আর খেত। শুকনায় খা খা মাঠ- আবার ফসলের সময় ঢেউ খেলা মাঠ যেন নদীর সবুজ জল নিয়ে বুকে তার কাঁপন তুলছে! কি সুখ যে লাগে তহন! অলির ভোমরার তখন মজাই মজা, ফুলে ফুলে ঘোরে আর গান গায়।
- অমল দা, ওই ধানের ফুলেও মধু আছে গো, যেখানেই দেখবা ফুল, সে খানেই মধু, আর সে খানেই জোটে মৌমাছি আর ভোমরা!
অমল খিদির পুর গ্রামের ছেলে। বয়স বেশী হলে বার হবে। অলি আর আমল দুটিতে খুব ভাব। যখনি ঘর থেকে একটু ছুট পেল অমনি অমলকে ডেকে নিয়ে অলি চলে যায় দূরে, আরও দূরে। কত বন বাদার জঙ্গল, যার পাশ দিয়ে নদী ঝর্ণা বয়ে যাচ্ছে। বন জঙ্গলে কত রকম ফুল ফোটে, কত তার রং, কত তার ধরণ, আর আর রং- বেরঙের পাখনা ওয়ালা প্রজাপতি দেখবে বলে ছোটে। আর আছে ভোমরার গান, পাখীর গান, কত রকম গান টি টি টি, চিক চিক চিক, টুই টুই টুই, ইষ্টিকুটুম, বৌ কথা কও! ওরা যখন কথা কয়, ওরা যখন গান গায়, কি মজা, কি সুন্দর অমল আর অলি দুই জনে চুপ করে শুনতে থাকে। ইষ্টিকুটুম পাখী যখন ডেকে ওঠে, অলির মন তখন নেচে ওঠে, বলে, অতিথি আইবো অমল দা, হয় তোমাগো ঘরে, না হইলে আমাগো ঘরে, আর তা না হইলে গ্রামে কুনো নতুন বৌ আইবো! এই সব মনে ক’রে অলির পরানডা জুড়াইয়া যায়!
বসন্তের হাওয়া আসে, গাছের পাতা ঝরে, আবার নতুন পাতা গজায়, জঙ্গলের আনাচে কানাচে চেনাজানা ফুল ছাড়াও ফুটেছে আরও কত রকম ফুল। ছোট, বড়, মাঝারি, কত রকম না তার রং বৈচিত্র্য! ছোট্ট একটা ফুল নিয়ে অলি ব্যকুল ছিল। ছোট্ট, পিদ্দুসা, কিন্তু মন লাগাইয়া দেখলে তারে চেনা যায়, তার সুন্দরতা দেহা যায়! অলি মনে মনে বলে, আহা কি সুন্দর গো তুমি! আসলে যার মন সুন্দর তার কাছে সব সুন্দর, সমস্ত পৃথিবী সুন্দর!
অলি ভাবে এখন অমল দা যদি থাকত মনের কথা কওয়া যাইত। ফুলডা কত যে সুন্দর তারেও দেহানো যাইত। তার চোখেও নিশ্চয় খুব ভালো লাগত!
অলি নয় বছরের মেয়ে, দেখলে আরও ছোট লাগে তারে। ঘর ছাইড়া বন বাদাড়ে ঘোরা ফেরার মানা এখনো আসে নাই, তবে হ্যাঁ, কখন যে বাপ মা তাকে কইবো, বড় হইছস অলি, ঘরের বাইরে অত যাইস না! তহন, অলি কি করবো! সারাদিন ঘরে বান্দা থাকা তো তার কাছে বন্দি -শালা লাগব! এ কথা বেশিক্ষণ ভাবতে পারে না অলি।
অমল জানে অলি নিশ্চয় ঘরে নাই, সে মাঠে, তার অপেক্ষায় সময় গুনতাছে। অমল ঘর ছাইড়া বাইরে যাইতে গেলেই মায় বাধা দেয়, কি রে অমল, পড়া শুনা হইছে ? ঘরে কাম আছে, এহন বাইরইস না যেন!
বেরোতে গিয়েও থামে আমল, খুব সকালে ওঠে ও, পড়া -লেখায় তার ফাঁকি নাই। তবে ঘরের কাজকর্ম করতে তার মন নাই। মাঠে, বনবাদাড়ে ঘুরতে যত আনন্দ, পড়া লিখায় কি তত আনন্দ আছে? মায়ের চোখের আড়ালে সে বেরিয়ে পড়ে। সুযোগ পেয়ে দে দৌড়-- একেবারে ধান জমিনের পারে যেখানে খেত আর খেত আরম্ভ তার ধারে। খেত শুরুর আগে হাল্কা জঙ্গল। আম কাঁঠালের গাছ, সজনে গাছ, বেল গাছ, ঘর বাড়ি আর ফসলের জমির মাঝখানে বাঁশের ঝাড়ও আছে। বাঁশের ঝাড়ের পাশে পুকুর, পুকুর পার ধরে একটু নেমে গেলে ধান খেত। অমল জানে এখান থেকে মাইল দুই দুরে আছে বিল-- নাম তার উবাকুরির বিল। সে নাকি বিরাট জলাশয়। বেশির ভাগ কচুরি পানায় ভরা, সে খানে মাছ ধরার নৌকা চলে। বড় বড় মাছ আছে, লোকে বলে মানুষের চে নাকি বড় মাছ! বিলের জল নাকি কালো, খুব গভীর তো তাই নাকি কালো! একশ হাতের বেশী নাকি জলের গভীরতা! রাতের বেলার উবাকুরির বিল নাকি অন্য রাজ্য! ভূত পেত্নী ঘুইরা বেড়ায়, আশেপাশে ঘর বাড়ি কিম্বা লোকালয় নাই। এ সব কথা অমল তার বাপের কাছে শুনছে।
অমল খেয়াল করল, ওই যে দূরে দেহা যায় অলিরে, বইয়া কি যেন করতাছে, কিছু দেখতাছে মনে হয়! অমল দূর থেকে হাত উঠিয়ে তার উপস্থিতি জানায়।
অলি বলে, তাড়াতাড়ি আসো!
অলি দাঁড়িয়ে পড়ে আনন্দে, এবার দুজনে মিলে ফুল, পাখী দেখবে ওরা। প্রজাপতি ভ্রমরার পিছে ছুটবে, কি আনন্দ,কি আনন্দ! অলি সেই পিদ্দুসা ফুলটা দেখাল অমলকে, দেহ, দেহ কি সুন্দর ফুল! কাছে আইয়া দেহ।
অমল কাছে যায়। বসে পড়ে ফুলের কাছে। কাছে থেকে না দেখলে ভালো করে দেখা যাবে না ফুল, এত ছোট! বেগুনি রঙের ফুল, ভিতরে হলুদ শিরা জাগানো, তাতে বুটি বুটি হলুদ রঙের ছিটা। বোধ হয় ওগুলি ফুলের কোরক।
- চলো, এবার ঘুরতে যাই, নাচের ভঙ্গি নিয়ে বলে ওঠে অলি।
আজ বেশীক্ষণ থাকতে পারুম না রে, বলে অমল, দুকান যাইতে হইবো, মায়ে কইছে।
-- ঠিক আছে, এহন তো চলো! অমলের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে ছুটতে ছুটতে এগোয় ছোট বড় ঝোপ ঝাড় জঙ্গলের দিকে।
-- ওই দেহ, ওই দেহ অমলদা, কত প্রজাপতি উইড়া যাইতাছে, পাখনা দেহ, কত রং ছাপা তাতে-- মাঝে কেমন চক্ষুর মত গোল গোল চক্কর কাটা! অলি ছুটে যায় প্রজাপতিদের কাছে। অমল অলির পিছে পিছে ছোটে। অলি, প্রজাপতি, প্রজাপতি বলে নাচতে থাকে। প্রজাপতিরা ওপরে উড়ে যায়, যেখানে বড় কোন অজানা গাছের হলুদ ফুল ফুটে থাকে। তারই পাশে উড়ে বেড়ায়।
অমল আর অলি গাছের নীচে দাঁড়িয়ে সব দেখতে থাকে। কিছু সময় পরে অলি বলে, অমল দা একটা গান গাও না!
-- আমি গান জানি না রে অলি, গাইতে পারুম না, বলে আমল।
-- সেই দিন যে কৈছিলা, হর বৈরাগীর গান তোমার খুব ভাল লাগে! অলি বলে যায়,গাও অমল দা, দুই লাইন তো গাও!
অমল হর বৈরাগীর গানের লাইন ধরে--
আমি ঘর বাঁধিনু যাহারও লাগিয়া, সে যে ঘরে নাই রে... পরাণ... সে যে ঘরে নাই...তাই তো পথ আমার ঘর হইলো রে..খুঁজিয়া তারে না পাই রে...না পাই রে...পরাণ!..
গলা চড়িয়ে গান গেয়ে ওঠে আমল। উদাসী হাওয়া সুরো বেসুর গানে ভাসতে থাকে। অলি এ সব গানের অর্থ ঠিক যেন বোঝে না, তবে ভালো লাগে তার। কোথাও যেন পরাণ আছে, বসন্তর হাওয়ার মত ফুর ফুর আমেজ আছে! না ঠাণ্ডা, না গরম এমনি মিঠাস লাগে তার। গান থামলেই অলি অমলের হাত ধরে ঝাঁকিয়ে বলে, বাঃ, বাঃ, খুব ভালো গান গাও তুমি! ঠিক যেন হর বৈরাগীর মত!

হর বৈরাগী অনেক দিন হল গ্রামে আসে না। মাসে দুই তিন বার আসে। পথে পথে বাড়িতে বাড়িতে সে গান গায়, বৈরাগ্যের গান, সে যে বৈরাগী!
লোকে বলে বৈষ্টবী ছিল তার। ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে থাকত দুজনে। একবার বৃন্দাবনে ঘুরতে যায় দুই জনে, ছয় মাস পড়ে একা হর বৈরাগী ফিরে আসে। সঙ্গে বৈষ্ণবী নাই! সবাই জিজ্ঞেস করে, কি গো বৈরাগী! তুমার বৈষ্ণবী কোই গেছে?
হাসে হর বৈরাগী, বলে, হারাইছি গো তারে, বৃন্দাবনের জনারণ্যে!
-- একি কথা! খোঁজো নাই তারে ? গাঁয়ের লোক জিজ্ঞেস করে।
-- কত খুঁজ্জি গো তারে, পাই নাই, বলে হর বৈরাগী গান ধরে,
আছে সে পরাণে... বাহিরে না পাই খুঁজিয়া গো ...
আছে সে গোপনে, হৃদির মাঝারে গো
বাহিরে না পাই খুঁজিয়া গো,
সে যে বৃন্দাবনের জনারণ্যে
লুকায়ে রোল, গেলো হারায়ে গো!
গান গাইতে গাইতে হর বৈরাগী তার আপন পথে পা বাড়ায়।
অমলের ভালো লাগে হর বৈরাগীকে, ওর গলার গান যেন প্রাণ ছুঁইয়া যায়। গানের রেশ যেন আকাশে বাতাসে ভাইসা বেড়ায়। অলির হর বৈরাগীকে ভালো লাগে, তার গান আর ভ্রমরার গানের তানের মধ্যে কোথায় যেন মিল আছে! তবে হর দার গানের সুর যেন এহন পাইলটা গেছে, সেই সুর এহন অনেক বেশী করুণ হইছে।
অমল, অলি গ্রামের সকলে জানে। বৈষ্ণবীকে হারাইয়া হর দা বড় দুখী! হর দা জানে অমল আর অলি তারে ভালবাসে, তার গান ভালবাসে। তাই যখনি সে আসে অমল, অলির সঙ্গে তার দেখা হয়।
অমল অলি তার কাছে ছুটে যায়, তার গান শোনে, সময় থাকলে তার সঙ্গে গান শুনতে শুনতে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘোরে।
-- কেমন আছো গো হর দা? অলি হর দাকে জিজ্ঞেস করে।
-- ভাল আছি অলি মা, দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে হর দা বলে, তুমি কেমন কও দেহিন ?
আমি ভালো, খুব ভালো, ব’লে অলি হাসে।
-- তোমার জোড়ি কোই গো? হর বলে।
--জোড়ি! অবাক হয় অলি, বোঝে না যে অমলের কথা কয় হর দা।
--হর হেসে বলে, ওই যে গো বৃন্দাবনের ননী চোরা, কি যেন নাম তার, অমল, অমল কোই গো রাধিকা ?
তুমি কি যে কও না হর দা! ও তো আমার সাথী, আমার বন্ধু, সরল হাসি ঝরিয়ে নম্র অলি বলে ওঠে।
--ওই হইলো গিয়া, চলি গো অলি, আইজ বড় ব্যস্ত, বলে হর।
--না, না, একটা গান সুনাও, তারপর যাইবা, অলি আবদারের সুরে বলে।
--তা হইলে চলো, আমার লগে দুই চার ঘর, দুই চারটা গান শুনতে পাবা ক্ষণ, বলে হাঁটতে থাকে হর বৈরাগী। অলি তার পিছন নেয়। হর গান ধরে--
তুমি নাই, ব্রজ অন্ধকার তাই
পথে পথে একা ঘুরি, আমি যে বিবাগী, হরি!
বিরহ অনলে পুড়ি, হেথা হোথা ঘুরে মরি
মনের কথা তুমি ছাড়া, আর জানেন অন্তর্যামী....
গানের সুর ভাসে আকাশে বাতাসে। ভাসতে ভাসতে যায় অমলের কানে, সে কি আর ঘরে থাকতে পারে! হর দা এসেছে, হর দা এসেছে, বলে ছুটতে থাকে হর দার খোঁজে। পিছে থেকে তার মা ডাকে, কি রে অমল দুকানে গেলি না! আর দুকান, ততক্ষণে আমল পৌঁছায় হর দার কাছে। এসে দেখে অলিও এখানে। এমনটা প্রায়ই হয়। হর দা যখন আসে, আকাশ বাতাস মুখরিত হয় গানে। অমল আর অলি ঘরে কিম্বা মাঠে যেখানেই হোক না কেন, থাকতে পারে না, ছুটে চলে আসে হর দার গান শুনতে।
অমল বলে, হর দা, আর একটা গান গাও না!
--গামুরে গামু, গান না গাইলে চলব কেমনে ক ? খাওন জুটবো কি কইরা ক ? হর বলে ওঠে। হর অলিদের ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে গান ধরে:
ফুলের সৌন্দর্য দেখি, সবাই মনো মুগ্ধ দেখি,
প্রজাপতি ভোমরার দল, আনন্দে হয় যে উতল
বলে চল, চল চল চল রে...ফুল-সখী ডাকে যে আমারে,
মধু লয়ে হৃদি মাঝে, সেজেছে নতুন সাজে...
বলে চল, চল চল রে...
আপন মনে অমল অলির দিকে চেয়ে হর গান গেয়ে চলে। ভাবতে থাকে ফুল যদি অলি, তবে ভোমর প্রজাপতি নিশ্চয় অমল হবে। অমল আর অলি বড় সরল, ফুল প্রজাপতি ভোমরের খেলার সাথী, নয় তো নদী বন সবুজ মাঠ, ঢেউ খেলানো দীঘির জল, প্রকৃতির মাঝে ওরা খেলে বেড়ায় কেন!
অলি অমল ওদের কাছে বাইরের সব লোকের মাঝে সবচে আপন হর দাকে লাগে। তার সাদা সিদা চেহারা, তার চলন বলন, তার উদাসী গান, খুব, খুব ভাল লাগে ওদের।
--আচ্ছা অমল দা, হর দার খুব দুঃখ তাই না! বলতে বলতে অলির মুখে দুঃখের ভাব ফুটে ওঠে।
--হ্যাঁ রে, তার বৈষ্টবী হারাইয়া গেছে রে! দেখিস না এহন সে একলা, আগে কখনও সহনও সঙ্গে উমা বৈষ্টবী থাকত।
--ওরা কি বর-বৌ নাকি গো অমল দা ? অলি কৌতূহলী প্রশ্ন করে।
--ওদের নাকি বর বৌ বইলা কিছু নাই। সাথী, সারা জীবন সঙ্গে থাকতে পারে, আবার নাও থাকতে পারে। বিয়া হয় না, ভলোবাসলো তো থাকলো! অমল অলিকে বলে যায়।
--তবে, ভালবাসার পরও বৈষ্টবী কেন হারাইল ? অলি আশ্চর্য হয়।
--শুনছি দুইজন দুই জনরে খুব ভালোবাসতো, কাশী বৃন্দাবনের ভিড়ে সে হারাইয়া গেলো, অমল বলে যায়।
--বাপ রে, হরি দার খুব দুঃখ, সেই জন্যে গেরামে আসা কম করছে, কেমন যেন চুপ কইরা গেছে, বলে অলি।
--দুঃখ তো আছেই, বৈষ্টবীরে খুব ভালোবাসতো শুনছি, বলে অমল।

এমনি করে দিন কেটে গেল অনেক। ছটা বছর দেখতে দেখতে ফুরিয়ে গেলো। হর বৈরাগী আর বৈষ্টবীকে খুঁজে পায় নাই, মনের তাড়নায় আরও দুই বার সে বৃন্দাবনে গেছে, এক এক বার পনের দিনের উপর সেখানে ছিল। বৃন্দাবনের অলি-গলি, এ-ঘর ও-ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেছে। কোথায় তার বৈষ্টবী, সে নাই, সে নাই! মনে বড় দুঃখ হরর। আর নয়া, বৈষ্টবী সে চায় না, নতুন যোগানোর ইচ্ছা তার নাই।
সকালে একটু কিছু মুখে দেয় হর, তার পরই বেরিয়ে যায় পথে পথে, গ্রামে গ্রামে, গঞ্জে গঞ্জে। অমল অলির গ্রাম তার খুব ভালো লাগে। সেখানে খুব খাতির যত্ন পায়। অলির ঘরে গেলে তো কথাই নাই। বসাইয়া, গান শুইনা, খাওয়াইয়া তবে ছাড়ে। অলির প্রতি তার বড় মায়া। নিজের মাইয়া থাকলে প্রায় এতডাই বড় হইত। হর তা হইলে এত ঘুইরা ঘুইরা বেড়াইত না। কিছু না কিছু করত, গিরস্থি ছাড়াও গ্রাম গঞ্জের কোন কাজ যোগার কইরা নিত। হর বৈরাগী ঘুরতে ঘুরতে অলিদের ঘরে ওঠে, কোই গো মা অলি, কোই গেলা!
ইতিমধ্যে অলির মা মারা গেছে, বাবা আবার নতুন মা আনছে। অলির নতুন মা বেরিয়ে আসে, বলে, আরে হর, তুমি তো এ গেরামে ঘন ঘন আসা শুরু করছ! ব্যাপার কি কও দি?
--হর বলে, না গো, তুমাগো ঘরে কিছু নিতে আসি নাই, ভালো লাগে, তাই অলি মারে একটু দেইখা যাই, একটু থেমে নিয়ে হর ডাক দেয়, অলি মা, কোথায় গো?
অলির মা মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, ওর এত সময় নাই, ঘরের কাজকম্ম করতাছে--ওরে বিরক্ত কইরো না তুমি!
হর জানে, অলি মা এহন ভালো নাই। অলির মা দুই বছর আগে মারা গেছে। তার এক বছর পর অলির বাপ আবার বিয়া করছে। সৎ মা অলিরে ভালো দেহে না—বহাজহা করে। মারে, সব সময় খাটাইয়া মারে। হর গান ধরে:
এ ভবে আমি একা এসেছি ওগো,
যাবার বেলা একাই যাবো গো,
সাথে রবে না কেউ...ওগো পরাণ...
গানের মাঝে অলি বেরিয়ে আসে, মুখে তার ম্লান হাসি। মাঝ পথে গান থামায় হর, বলে, কেমন আছ গো অলি মা?
অলি বলে, হর দা, তুমি আর এত ঘন ঘন আইস না গো! মায়ে তুমারে যা না তাই কয়, আমার ভাল লাগে না, হর দা, যে গান শুরু করছ, শেষ কর তো তাড়াতাড়ি!
হর হাসে, আবার গান ধরে,
হরি, ঘুরতে গেলাম বৃন্দাবনে
এই ছিল কি তোমার মনে!
তাই তো আমি হারাই আমার প্রিয়জনে!
মন হইলো মোর ঘর ছাড়া
এহন,আমার না আছে ঘর, না আছে বার
তোমারই তরে হরি, হর বৈরাগী হল গৃহহারা!....
অলির মনে হল, হর বৈরাগী গান গায় না, কান্দে কে জানে! অলির মন খুব খারাপ হয়ে গেল। হর চলে যায় অন্য ঘরে, অমলের ঘরে সে তো যাবেই। অলির অনেক ইচ্ছা হল হর দার পিছে পিছে যায়। অমলের ঘরে যায়, হর দার আরও গান শুনতে ইচ্ছা হয়। আর তার ইচ্ছা হয় অমল দারে দেখার। আগের মত আর অমলের সঙ্গে তার দেখা হয় না। আগের মত ওরা ঘুরতে পারে না--সেই মাঠে ঘাটে, জঙ্গলে, ফুলের রাজ্যে ঘুরতে পারে না। ফুল ফোটে, প্রজাপতি ভোমরা ওড়ে। পাখীরা ভোমরা আকাশে আকাশে গান গাইয়া ফেরে। সব কিছু আগের মত আছে কিন্তু অলি বড় হয়ে গেছে। যেখানে সেখানে তার যাবার অধিকার নাই।
নতুন মায়ের জন্য সে অমলের সঙ্গেও দেখা করতে পারে না, লুকিয়ে ছাপিয়ে কখনো সখনো ক্ষণিকের জন্য দেখা হয়ে যায়। অমল আর বেশী সময় পায় না, পড়ালেখা নিয়ে থাকে, ও পড়তে যাবে ঢাকা শহরের কলেজে। অলির আর পড়া লেখা হয় নাই, মা তার দুই বছর হল মারা গেছে, ঘরের সমস্ত কাজ, যা যা তার মা করত সব এখন তারে করতে হয়। ক্লাস এইট পাশ করে অলি, তারপর পড়া ছেড়ে দেয়--স্কুল বন্ধ করে। নতুন মা আসার পর এক মাস ভাল চলছিল। নতুন মা আমলকে দুচোখে দেখতে পারে না, আমলকে ঘরে আসতে মানা করে দেয়, তবু অলি ফাঁক পেলেই অমলের সঙ্গে দেখা করে, কথা বলে, মনের কথা, ঘরের কথা, দুঃখের কথা। অমলের ঘরে অলিকে সবাই ভালবাসে। অমলের বাবা, মা সবাই অলিকে ভালবাসে। সব সময় অলির কথা বলে, এমন কি আলিকে ঘরের বৌ হিসাবে পাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করে। তবে অমলের সামনে এখন অনেক কঠিন পথ। পড়া শুনা শেষ করতে আরও চার পাঁচ বছর লেগে যাবে।
অলির নতুন মা আসায় তার ভাবনাতে ছেদ পড়ে, নতুন মা বলে, কাজ কর্ম ছাইড়া কি ভাবতে বৈইছ? যখন দেহ, ঘরের কাজে ফাঁকি দেওয়ার মন, গতর খাটাও, কাজকর্ম শিহ, না হইলে কেডা তোমার লগে বিয়া বইব!
অলি ঘরের ভিতর যায়। অনেক কাপড় চোপড় আছে তার জন্য ভিজানো, সব কাচতে হইবো এখন। নতুন মা এহন পান চিবাইব। খাটে বইয়া ছোট ভাইডারে লইয়া আদর করবো, তার লগে কথা কইবো। আর কিছু কাজ নাই তার!

অমল পড়তে যাবে শহরে। দশ গ্রামের মধ্যে যে বড় স্কুল আছে তা থেকে অমল টুয়েলভ পাশ করেছে। এবার ওকে আরও পড়তে শহরে যেতে হবে। সেখানে ওকে তিন বছর পড়তে হবে। তারপর আবার ফিরে আসবে গ্রামে। বড় চাকুরীর জন্যে আমলকে যেতে হবে বড় কোন শহরে। আমলকে যে অনেক বড় হতে হবে।
অমল দা চলে যাবে শুনেছে অলি। ওর হাত পা বাঁধা, যখন তখন যেখানে সেখানে সে যেতে পারে না। তবু সময়ের ফাঁক ফোকরে অমল দার সঙ্গে ও দেখা করে, বা দেখা হয়ে যায়। অলি ভাবে অমল দার শহরে যাবার আগে একবার দেখা করবে, মার চক্ষুরে ফাঁকি দিয়া কেমনে সে যাবে অমল দার সঙ্গে দেখা করতে! নতুন মায়ের দু চোখের শূল ও, এই তো সে দিন শরীর ভালো ছিল না, সকালে উঠতে একটু দেরী হয়ে গেল। নতুন মা আইয়া কথা নাই বার্তা নাই তার চুল ধইরা টাইনা হেঁচড়াইয়া উডাইলো। মুখের তো তার লাগাম নাই, রাইত দিন ঘুমাইবি তুই, এত ঘুম তোর আসে কইত্তে? হ্যাঁ, ঘরের এত কাম পইড়া আছে, কেডা করবো শুনি! তোর মরা মা আইবো করতে?
নতুন মার কথা শুনে অলির কান্না পায়, সে ও কিছু কইতে যায়, মরা মার কথা কও কেন?...
বাকী কথা শেষ হয় না, নতুন মার দুই থাপ্পড় অলির দুই গালে এসে পড়ে। ও কাঁদতে কাঁদতে উঠে যায় ঘরের কাজে। আলি দেখে দরজার কোনে দাঁড়িয়ে আছে তার বাবা, অসহায়ের মত অলির দিকে তাকিয়ে আছে। বাবার চোখের দিকে চোখ পড়তেই বাপ তার চোখ নামিয়ে সরে যায়। অলি জানে তার বাবার কিছু করার নাই। প্রথম প্রথম ওর পক্ষে দুই চার কথা বলেছে, তাতে ঘরের অশান্তি বাড়ছে বই কমে নাই ! এখন তার বাবা আর কিছু কয় না।
নতুন মার বড় হিংসা, অমল আর অলির ভাব দেইখা তার সহ্য হয় না। অলির ভাল দুই চখখে দেখতে পারে না সে। অমল বড় ঘরের ছেলে, তার সঙ্গে অলির বিয়ে সে কখনো হইতে দিতে চায় না। অলি আর অমলের দেখা না হয় তার দিকে নতুন মার তীক্ষ্ণ নজর। দুই বার এমনি হয়েছে, ধরা পড়ে গেছে অলি। নতুন মার ধমক আর থাপ্পড় খেতে হয়েছে অলিকে। তবু মন থেকে অলি কোনও দিন অমল দাকে মুছে ফেলতে পারবে না। অমল দা কি পারবে তা? মনে তো হয় না ওর।
এইত দুদিন আগেও দেখা হল ওদের, স্কুল থেকে কোন কাজ করে ফিরছিল অমল। দূর থেকে অলি দেখতে পায়, আশপাশ দেখে নিয়ে নতুন মার চোখ এড়িয়ে অমল দার কাছে পৌঁছে গেল সে, এখনও ও ভালো ছুটতে পারে।
--কি অলি! কি খবর? অলিকে ছুটে আসতে দেখে অমল বলে।
হাঁপাতে হাঁপাতে অলি পিছন পানে একবার দেখে নিয়ে বলে, তোমার লগে দেহা করতেও আমায় চুরি কইরা আইতে হয়, অমল দা! তুমি ভালো রেজাল্ট লইয়া পাশ করছ শুনছি, এহন আর কি করবা কও?
অমল বলে, দেহি বাবা যা কয় তাই করন লাগব, তবে ঢাকা পড়তে যাইতে হবে, আমি তা জানি। তারপর একটু হেসে বলে, আর কি করুম, তরে লইয়া জঙ্গলে ছুটাছুটি করমু? প্রজাপতি দেখমু, ভমরের গান শুনমু, তুই আর আমি কেমন! ভালো হইব না?
অলির মুখ দিয়ে কথা বের হয় না, ছোটো বেলার কথা তার মনে পড়ে যায়, সেই সব ছুটাছুটির দিনগুলি, ভ্রমরের গান শোনার দিন গুলি, চোখের জল আটকাতে পারে না অলি। নীরব কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। অমল নির্দ্বিধায় কাছে টেনে নেয় ওকে। পকেট থেকে রুমাল বের করে অলির চোখ মুছিয়ে দেয়। অমল যেন বোবা হয়ে যায়, দুটি প্রাণী পরস্পর দুজনের নীরব ভালবাসা চুপচাপ শুধু অনুভব করে।
অমল জানে অলি ভালো নাই, তার নতুন মার তার প্রতি অত্যাচারের কথাও শুনেছে। কিন্তু তার তো কিছু করার নাই, প্রতিবাদের ক্ষমতা নাই, তার সামনে আগামী ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সে পড়া শুনা করে আরও বড় হবে, তারপর অলিকে সে গ্রহণ করবে। মনের গভীরে অলি ছাড়া তার আর কেউ নাই।

এরপর অলি আর অমলের অনেক দিন দেখা হয়নি। শুনেছে অমল শহরে পড়তে যাবে। অলির মনটা হুহু করে--এক মহা শূন্যের মত, যে খানে বাতাস কম, গুমোট, যেখানে সবুজের সমারোহ নাই, গাছপালা, ধান খেত, নদী, ঝর্ণা, ফুল, পাখী, প্রজাপতি কিছু নাই। ভোমরার গান নাই...অমল দার সঙ্গে দেখা যে করেই হোক করতেই হবে, অলির তো অমল দা ছাড়া আর কেউ নাই। হ্যাঁ, আর একজন তারে স্নেহ করে, সে হইলো হর দা, হর বৈরাগী, যে তার মনের সব কথা জানে, তার মনের সুখ দুঃখের অনেকটা বুঝতে পারে। মার কথা মনে পড়ে তার, স্তব্ধ কান্না তার বুকে জমাট বেঁধে থাকে। সুযোগ খোঁজে অলি, পালিয়ে একদিন অমল দার সঙ্গে তার দেখা করতেই হবে।
অমল অলির বাড়ি আসতে পারে না। কারণ নতুন মা, সে চায় না অমল আর অলির মিলন হোক।
তাদের একাত্ম আনন্দময় ভাবনা নতুন মায়ের সহ্য হয় না। হিংসার কাঁটা বেঁধে গায়ে তার। তাই একদিন অমলকে তাড়াবার জন্যই নতুন মা বলে ছিল, অমল, ঘন ঘন এমন সমত্ত মেয়ের ঘরো আসা ভালো না, লোকে নিন্দা করে, আর তুমি আইবা না এইহানে।
এরচে বেশী আর কি বলতে হয়! সে দিন অমল অলির মুখের দিকে একবার তাকিয়ে ছিল। অলির মুখ ফুটে ওঠার সামান্যতম ক্ষমতা ও অধিকার হারিয়েছে। কেবল করুণ ভাবে অমল দার দিকে সে তাকিয়ে থেকেছে। অমল ধীরে ধীরে অলির ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। আর আসেনি।
অলি জানালা দিয়ে অমলের পথ চেয়ে থাকে, ওই দূরের রাস্তা দিয়ে যদি কখনো অমলকে যেতে দেখে, একটু দেখার আশ মিটাবার জন্য চাতক পিপাসায় দু চোখ তার লেগে থাকে দূরের সদর রাস্তার দিকে।
এমনি একদিন সন্ধ্যে বেলায় হর বাউলের গান কানে আসে অলির। হর দার গানে যাদু আছে, সব সময় সে গান তারে টানে। ছোটবেলা থেকে শুনে শুনে সে মধুর সুরের টানে ভালো লাগার অভ্যাস লাগা থাকে। অলি থমকায়, সন্ধ্যা প্রদীপ দিয়ে প্রণাম করে সে দেখে, নতুন মা ঘরে নাই, কোথায় গেছে কে জানে! আপাতত জানার দরকার নাই, সে ছুটে হর দার গান শুনতে। ঘর থেকে সদর রাস্তা, বেশী দূর না, হর দা সেখানে দাঁড়িয়ে গান গাচ্ছে। হর দার অলিদের ঘরে আসা অনেকদিন আগেই নিষেধ হয়ে গেছে।
নতুন মার ফরমান, হর, তুমি এই বাড়ি আইবা না, এহানে গান শুনাইয়া কাজের সময় খারাপ করার মত সময় কারও নাই। আর শুনো, পাগলীরে আরও পাগলী বানাইও না, বলে নতুন মা অলির দিকে কটাক্ষ করে, তোর ঘরে কাম নাই, এত কাম ফেলাইয়া তুই হরর গান শুনতে আইছস!..হারামজাদী!...
এ ঘটনার পর থেকে হর বৈরাগী আর অলির ঘরে আসতে সাহস পায় না। তবু সে অলি মার জন্য গান গায়, ওর গান ওর নিজেরই লেখা। ও তারপর থেকে যখনই এই গ্রামে আসে ঐ সদর রাস্তায় দাঁড়াইয়া গান ধরে:
হরি, যে চায় তারে দেও না,
আর যে চায় না তারেই সব দেও তুমি!
আমি হর তুমি হরি, আমি কেবল তোমার চরণ ধরি
আর তো কিছু চাই না আমি...
যে চায়, তারে আমিও যে চাই,
বল কেমনে তা বুঝাই!
যারে আমি চাই তারেই তো হারাই...
আর, আমর কিছুই চাওয়া নাই গো...
গান শেষ হয়, হরি চেয়ে দেখে বুঝদার শ্রোতা তার উপস্থিত, আর কি চাই তার!
--যে বোঝে গানের মর্ম, গান শোনা তো তার ধর্ম, কি গো অলি মা, ভালো তো ? কুশল মঙ্গল জিজ্ঞেস করে হর বৈরাগী।
--আমার আর ভালো মন্দ, আছি কোন মত বাইচ্চা আছি, করুণ ভাবে বলে অলি।
তার করুণ অবস্থায় দুঃখ পায় হর, অনেক কষ্টে চোখের জল সামলায়, বলে, তোমারে খুব মারে নতুন মায়, না ?
হরর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না অলি, শাড়ির ভাঁজ খুলে পীঠ দেখাতে পারে না অলি--যে থানে দাগের কালো চড় জমে আছে--থাপ্পড়, চড়, লাঠির বাড়ি, অবশেষে গরম খুন্তির সেঁকা--আর কি চাই! চুল অর্ধেক তো টেনে তুলে ফেলেছে, মাথার শিরা উপশিরায় সুঁইচ বিন্ধানো ব্যথা তার!
--কি অলি মা! চুপ কেন গো! হর প্রশ্ন করে, অলি জবাবের বদলে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে। হর বৈরাগী অলির মাথায় হাত বুলায়, সান্ত্বনার সুরে বলে, আমি অনুমান করতি পারি গো মা, কি যাতনা তুমি ভুগতাছ, আমি অনুভবে আনতি পারি গো মা। আমি কমু, অমলেরে কমু তুমার কথা ভাবতে। আমি তো অমল আর তুমার কথা সব জানি গো মা! মনে হল হরর গলাও আবেগে এক সময় চুপ হয়ে গেলো!
অমলের সঙ্গে অলির আর দেখা হয় নি, তবে হর দা এসে বলেছে, অমল নাকি তারে কথা দিছে--তিন বছর পর শহর থেকে এসে অলিকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। হর বৈরাগীর প্রচেষ্টায় অমলের সঙ্গে অলির যোগাযোগ এখনও চলছে।
এমনি করে সময় দিন মাস বছর, তিন বছর কেটে গেল। ইতিমধ্যে হর বৈরাগীর সঙ্গে কয়েক বার দেখা হয়ে ছিল অলির। প্রথম দিকে হর বৈরাগী খবর দিয়েছে, সব ঠিক আছে গো অলি মা, অমল তোমারই আছে। তারপর গত তিন মাস আগে হর দা অলিকে খারাপ সংবাদটা দিলো, হরি দা বলে ছিল, অলি মা একটা খারাপ খবর আছে গো, অমল অন্য জাগায় মৈজেছে গো!--তার কলেজের কোন মাইয়ার সঙ্গে--তারে নাকি সে বিয়া করবো গো! অমলের মা-বাপ যাইবো হেই মাইয়ারে আশীর্বাদ করতে...
হর দার আর কোন কথা অলির কানে যায় নাই, সে দুঃস্বপ্ন দেখার মত ভয় বিহ্বল দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিল হর দার মুখের দিকে, তার মনের স্বপ্ন সৌধ আচমকা ভূকম্পের ধাক্কায় চুরমার হয়ে গিয়েছিল। চোখের সামনে অন্ধকার দেখছিল অলি।
অমল দার কথা খুব, খুব মনে পড়তে লাগল। কি করে পারলো আমল দা এমনি করে অলিকে একা রেখে স্বার্থপরের মত ফেলে যেতে! চোখের সামনে বিষণ্ণ ছায়া ঘিরে আছে অলির। প্রকৃতির সমস্ত রঙ একাকার হয়ে কালো ছায়া রেখে গেল তার মনে। হতাশ বিষণ্ণ কালশিটা পড়া মেয়েটার মন আজ মরে গেল।
দিনরাত ঘরের কাজে সে ব্যস্ত থাকে। রাতে তার ঘুম আসে না। ভাবনাগুলি যেন ছেঁড়া ছেঁড়া তালি মাড়ার চেষ্টাতেও জুড়তে চায় না! তার বাঁচার পাথেয় আর তো কিছু নাই!
বাবা থাকা না থাকা তার কাছে সমান, সে তো মন থেকে আধমরা হয়ে থাকে। তার কাছে কি চাইবে অলি! কিছু ক্ষমতা তার নেই অলিকে কিছু দেবার মত, তবে সে বাঁচবে কি নিয়ে, কার জন্য? এ পৃথিবীতে কে আছে তার, যার জন্য তার বেঁচে থাকা!

গভীর রাত, ঘুম নেই অলির চোখে। শুধু ভাসা ভাসা অনুভব, স্মৃতি নেই মনে ,সব কিছু শূন্যতায় ভাসমান। অলি কি বেঁচে আছে, সে নিজের অস্তিত্ব ভালো ভাবে অনুভব করতে পারছে না! এমনি ভাবে নিজের ঘোরে সে হাঁটতে লাগে, পথ ধরে...যে পথ সে চিনতে পারছে না, তবু এগিয়ে যাচ্ছে সে...তাকে যেতে হবে দূরে অনেক দূরে--সে যে মহাপ্রস্থানের পথ!
অনেক দূর অলি হেঁটে এসে গেলো, তখন সকালের সূর্যের আভা ফুটতে লেগেছে চারিদিকে। অনেক গ্রাম, অনেক মাঠ, অনেক বন পেরেয়ে এসেছে সে। হঠাৎ আবছা আলোয় দূরে চোখে পড়ল একটা গ্রাম। সেখানেই কি তার যেতে হবে! জানে না সে, তবে যেতে হবে বহু দূরে, বহু দূরে কোথায়? অলি জানে না।
সকাল থেকে মাটিতে লুটিয়ে আছে অলির অচৈতন্য দেহ, কোন অজানা গ্রামের প্রান্তে। দুচার জন লোক জমায়েত হতে লেগেছে সেখানে। একজন স্ত্রীলোক এগিয়ে গিয়ে নিরীক্ষণ করে দে’খে, দেহে এখনো প্রাণ আছে। কিন্তু অলিকে কেউ চেনে না, কেউ সাহস ভরে ঘরে নিয়ে গিয়ে ওর প্রাণ বাঁচাবার চেষ্টা করে না। বেলা বারটার কাছাকাছি হয়ে গেলো, অলির দেহ তেমনি জ্ঞানহীন নির্জীবের মত পড়ে আছে। গাঁয়ের লোকদের অনেক চেষ্টা চরিত্র চলছে তার জ্ঞান ফিরিয়ে আনার। কেউ মাথায় মুখে ঘাড়ে জলের ছিটা দিচ্ছে, আবার কেউ ওর শরীরকে রোদের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য শতরঞ্চি টানিয়ে দিয়েছে মাথার ওপর। সবার মনের ইচ্ছা মেয়েটার জ্ঞান ফিরে আসুক। হাজার প্রশ্নবাণ তাদের নিজেদের মনেই আটকে আছে, যার উত্তরের প্রত্যাশা মেয়েটির জ্ঞান ফিরলে, সুস্থ হলে, তবেই পেতে পারবে! কোথাকার মেয়ে, কি হয়েছে, এখানে কেন এলো, কিভাবে বিতাড়িত হল, কাউকে খুঁজে ফেরার অভিলাষ, অথবা নির্যাতিত কোন মেয়ে! ব্যাভিচারিতার কোন পরিণাম ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্নগুলি অনেকের মনেই বদ হজমের আকার নিতে চলেছে। এমনি সময় বহু দূর থেকে একটা গানের সুর হাওয়ায় ভেসে আসতে লাগলো, কারু বুঝতে বাকী রইল না যে হর বৈরাগী গ্রামে এসেছে। সে সুর ক্রমশ: কাছে ভেসে আসতে লাগলো। অলির অবচেতন কানে কি সে সুর পৌঁছল! না হলে কেন তার শরীরে মৃদু কম্পনের আভাস ফুটে উঠছে! মনে হচ্ছে খুব ধীরে ধীরে তার চেতনা ফিরে আসছে।
জটলা পাকানো গ্রামের স্ত্রী পুরুষ বাচ্চা কাচ্চারা ঝুঁকে পড়ল অলির মুখের উপর, একজন বলল, আরে, জ্ঞান ফিরতাছে গো! নৈড়া চইড়া উঠলো মনে হয়, কাছে গিয়া দেহ তো মনুর মা!
মনুর মা কাছে গেল, দেখল, হ্যাঁ, অলি নড়েচড়ে উঁ আঁ শব্দ করে ওঠে। জটলা পাকানো লোকগুলো বেশ নড়েচড়ে দাঁড়ায়, অনেকের মনে স্বস্তি আসে, কে একজন গ্লাসে করে গরম দুধ নিয়ে আসে। হরর গানের সুর অনেক কাছে মনে হতে লাগলো, ও নিশ্চয় এদিকে আসছে।
হর বৈরাগী ভিড় দেখে এগিয়ে আসে, কি ঘটনা গো হারুর মা! বলতে বলতে অলির কাছে এসে পড়ে হর আর তার গলা থেকে চীৎকারের মত আওয়াজ বেরিয়ে আসে, আরে এযে আমার অলি মা গো!...ঝুঁকে পড়ে হর অলির মুখের ওপর।
অলি জ্ঞান ফিরে প্রথম চোখ মেলে হর বৈরাগীকে দেখে, গলা থেকে অস্পষ্ট স্বর বের হয় ওর,...তুমি...দুর্বলতার কারণে বাকী শব্দগুলি আর শব্দ হয়ে ফুটে উঠতে পারে না। উঠে বসে অলি, হারুর মা দুধ খাইয়ে দেয় তাকে, গাঁয়ের লোকের হাজার প্রশ্নের জবাবে, হর বৈরাগী অলির জীবনের সমস্ত কাহিনীর গিট খুলে শোনায়, সবার মন অলির প্রতি সহানুভূতিতে ভরে যায়। হর বলে, বল, গো অলি মা! শরীর কেমন লাগছে এহন? হাঁটতে পারবা? ঘরে যাইতে হইব তো?
অলি উত্তেজিত হয়ে ওঠে, না, না, না, আমি ঘরে যামু না, আমার কোন ঘর নাই, আমার কেউ নাই গো, হর দা! মরণ ছাড়া আমার গতি নাই! অঝরে কাঁদতে লাগে অলি।
অলির মাথায় হাত রাখে হর, বলে, তা কৈলে হয় গো মা জননী! ঘর বিনা কেউ থাকতে পারে না গো, আর যতই দুঃখ হোক, মরণ তো নাই গো, বলে হর নিচা গলায় সুর ধরে, আমায় দুঃখ এত দিলা যখন...মরণ কেন দিলা না! উঠে দাঁড়ায় অলি, বলে আচ্ছা, হর দা, তোমার ঘর কোথায়?
--কেন, আমি তো বাউল বৈষ্ণব, আমার ঘর, নামে মাত্র ঘর, পথই আমার ঘর অলি!
--আমি তোমার ঘরে যামু হর দা, অলি বলে ওঠে।
--না, না, সে আমি পারুম না, আমি আইজ এই হানে, কাইল ঐহানে, দেশে দেশে আমার ঘর গো!
--আমি তোমার ঘরে যামু হর দা! না হইলে আমি মরুম হর দা, অলি বড় করুণ ভাবে বলে ওঠে, আমি মরুম।
--ঠিক আছে না হয় চলো, একটা দিন না হয় বিশ্রাম নিবা।
রাস্তা ধ’রে হর আর অলি চলতে থাকে। হর আবার গান ধরে, পর আমার আপন হইলো,
যে আপন ছিল, আপন না রোল
আমার কিবা আপন, কিবা পর!
আমার কিবা পথ, কিবা ঘর!
আমি পথে পথে ঘুরি, আমি হর বৈরাগী!
কেহ নাই মোর, সবাই আমার,
আমি যে তোমারই অনুরাগী!
একটা মাত্র লড়বড়ে ঘর, মাটির দেওয়ালে খড়ের চালে ছাওয়া। জোরে হাওয়া দিলে কাঁই কুঁই শব্দ হয়! ঝড় আসলে এ ঘর না জানি কোথায় উড়িয়ে নিয়ে ফেলবে! তিন মাটির ঢেলায় তৈরি উঁনান, হর বৈরাগীর বিছানা পত্রের মধ্যে ছেঁড়া কম্বল, কাঁথা, দুইটা ময়লা চাদর। বাসনকোসনের মধ্যে--কত দিনের ভাঙা কালো পোড়া হাড়ি, হাতলহীন লোহার কড়াই, তার চারিদিকে ঘিরে আছে পোড় ময়লা! দেওয়ালে গোঁসাইয়ের পোশাক টানানো, তাও ময়লা জর্জর, আর আছে ডুগডুগি, একতারা যেগুলি হর বৈরাগীর সর্বদার সঙ্গী।
একদিন থেকেই অলির চলে যাবার কথা ছিল, কিন্তু অলি যায় নাই, সে যাবে না বলেছে। ঘর, যেটা তার কাছে নরক বৈ অন্য কিছু নয়, সেখানে সে যেতে পারবে না। হর দা যদি তার সাথে থাকতে দিলো ভালো, না হলে সে আত্মঘাতী হবে এটাই তার পণ !
হর কি করবে ভেবে পায় না, মহা সঙ্কটে পড়েছে সে। বাধা বন্ধন জীবন যে তার নয়, তার ছুট্ট একটা মাত্র ঘরে অলিকে কি করে রাখবে! শত হলেও অলি সমত্ত মেয়ে, তার ঘরে থাকলে লোকে কি বলবে? অপবাদ অপমানে সে তো নিজের কাছেই কলঙ্কিত হয়ে উঠবে! হর বলে, তা হয় না অলি, আমি তোমায় কি কইরা রাহী কও! একটা মাত্র ঘর, তার মইধ্যে থাকুম কেমনে? লোকে কি কইবো?
--কেন থাকতে পারুম না! লোকে জানব যে আমি তোমার বৈষ্টবী, আমি বাউলের সহগামিনী হইতে পারি না কি, হর দা? অলি বোলে চলে, হর দা আমি কোত্থাও যামু না, আমি তোমার লগে থাকুম, আমি তোমার লগে ঘুরুম, আমি তোমার লগে গান গামু, অলি হর দার হাত দুটি তুলে নেয় নিজের হাতে।
আবেগে গদগদ হয়ে যায় হর, বলে ওঠে, হ্যাঁ, মা জননী, কয় দিন থাহ, তিন চার দিন পরে তুমারে ঘরে পৌঁছাইয়া দিমু।
--না আমি কোত্থাও যামু না, আমি তুমার ঘরে থাহুম, নাইনে আমি মরুম, তুমি কি আমার মরা মুখ দেখতে চাও, হর দা? অলি কথা কটি বলে করুণ ভাবে হর দার দিকে তাকায়।
হরর বিষণ্ণ মুখ, দু-বিধ সমস্যা তার সামনে। একে তো নিজের চালচুলা নাই, তারপর একটা সমত্ত মাইয়ারে এহানে কি কইরা রাহে! বৈষ্টবীর কথা মনে পড়ে যায় তার, সে তো তার সাথী ছিল, তারে লইয়া কিছু বাছ বিচার ছিল না। তারে সব মনের কথা, প্রাণের কথা খুইলা কইতে কোন দ্বিধা ছিল না। এক সঙ্গে ঘুরত, এক সঙ্গে গান গাইত, এক বিছানায় শুইত, অনেকটা স্বামী-স্ত্রীর মত। তবে হর তার গভীর শরীরে কোন দিন প্রবেশ করে নাই, উভয়ে উভয়ের শরীরের বহিরঙ্গের তরঙ্গ অনুভব করছে, খুশি হইছে, তাতেই তৃপ্ত হইছে। তারচে বেশী যখন মন চাইছে গলায় গান ধরছে, মনের অতলান্তের সে গান মনেরে শান্ত কইরা দিছে। কিন্তু এ মাইয়ারে কেমনে তার ঘরে রাহে ভাইবা কুল কিনারা পায় না হর!
--হর দা, হর দা, অলির ডাকে হরর অন্যমনস্কতা ভাঙে, কি এমন ভাবনায় পড়লা তুমি ?কও তো আমি এক্ষুণি চইলা যাই, তোমায় আমি কষ্ট দিতে চাই না গো হর দা! বড় করুণ শুনায় অলির গলা।
অলির অমল দা ছিল মন প্রাণ জুইড়া, হর দা কি তার জীবনের কোন অংশ জুড়ে ছিল? হ্যাঁ, ছিল, এক উদাসী বাউল বৈষ্ণব, যার ভাবনা ছিল অমলিন স্বচ্ছ, যে ছিল নিঃস্বার্থ, যে কারো সাথে পাছে ছিল না, যার চাল চুল নাই, কারও প্রতি খারাপ চিন্তার যোগদান নাই। এমনি উদাসী একটা মানুষকে সবাই চায়, সবার প্রিয় সে হতে পারে। অলির সবচে ভালো লাগত হর দার গান, খোলা আকাশের নীচে বাতাস খেলা খোলা জাগায় হর দা যখন উদাসী গলায় গান ধরত, তখন মনে হত আর কেউ না, একমাত্র হর দাই তার মনের মানুষ। সেখানে আর কেউ নাই, এমন কি অমল দাও নাই, হ্যাঁ সেখানে প্রকৃতি আছে, ফুল ফোটা আছে, ফুলের মোহে প্রজাপতির আনা গোনা আছে, ভ্রমরের তান আছে, আকাশ আছে, বাতাস আছে, সুদূরের বিছানো মাঠ আছে...
অলি হর দার হাত ধরে শরীরের সঙ্গে আরও ঘন হয়ে মৃদু বলে উঠলো, আমি তোমায় ভালোবাসি, তোমায় ভালোবাসি হর দা!
--হ্যাঁ মা জননী, আমি জানি, তুমি আমারে ভালোবাসো, অলি মা, আর আমার মনে কোন দ্বিধা নাই গো! তুমি যতদিন খুশি এখানে থাক, আমি আর তোমারে না, কমু না। ওরা নিজেরাও বুঝতে পারে না, কখন তাদের চোখ সিক্ত হয়ে আসে।

চলতে থাকে এমনি জীবন। এক ঘরে থাকে অলি আর হর, এক চুলায় রান্না হয়। এক বিছানায়, না, এক বিছানায় ওরা শোয় না। ওদের স্বাভাবিক মন নিয়ে তৈরি দুই বিছানা। হর দা গান ধরে, সঙ্গে অলি গলা মিলায়। অলি দেখেছে, হর দার সঙ্গে দুতিন দিন গুনগুন করার পর একটা দুটো গান সম্পূর্ণ সে গাইতে পারে!
আজকাল হর বৈরাগীর গ্রামে গঞ্জে যাতায়াত খুব কমে গেছে। অলিকে ঘরে রেখে দূরে কোথাও যেতে পারে না। পেটের তাড়নায় আশপাশের গ্রামে তাকে যেতে হয়। আগে ছিল একখান পেট, আর এখন আরেক পেটের যোগারও তো তাকে করতে হয়! মানুষের পেট বড় শত্রু, হে কারও কথা শোনে না, সময় হইলে চড়র-মড়র কইরা উডে!
গ্রামের লোক কিছু দিন খুব বিরক্ত করে, অলিকে নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে থাকে। হরর জবাবে অনেকে সন্তুষ্ট হয়, আবার অনেকে হয় না। অনেকের সন্দেহের চোখ নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে চলতে থাকে।
--পেটের খিদা তো মিটাইতে পারো, কিন্তু শরীরের খিদা মিটে কেমনে! --টেটন ধুরন্ধর লোকেরা প্রশ্ন করে।
--আমাগো পেটের খিদাই বড় খিদা গো, বাকী খিদা তো গানের মধ্যে প্রকৃতির মধ্যে থেইক্কা মিইটা যায়।
কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করে, ঘরের মাইয়াডারে বিয়া করছ নাকি?
--না, না, ও তো আমার মা জননী! এমনডা হইতে পারে না গো, হর বলে।
--দুনিয়াতে কত দেখলাম, সবই হইতে পারে, বলে ওঠে গ্রামের মাতব্বর।
চলতে থাকে দিন। এক রাতে, চাঁদনী রাতে, অলির চোখে ঘুম নাই, অলি জানে না কেন!
তবে তার অবচেতন মন হয়ত বলতে পারে। খাটো গলায় সে গান ধরে:
আমার ঘর আছে, আমার বাইর আছে গো
আছে যে সব কিছু, তবু কেন মন মানে না!
সুখের জুয়ার কোথায় লয় রে আমায় ভাসাইয়া!
হরর ঘুম ভেঙে যায়, এই গান হরর সুরে বান্দা, সেও গলা মিলায়। রাত গভীর হয়, চাঁদ ডুবে যাবে এখন--আকাশ বেয়ে অনেক নীচে ও নেমে গেলে, চারিদিক আলো আঁধারের মায়াপুরীর মত লাগবে! অলি হরর দিকে তাকিয়ে গান শেষ করে। তারপর কিছু সময় দু জনে চুপ করে বসে থাকে। এক সময় নীরবতা ভঙ্গ করে হর, তুমি আমায় ভলোবাসো অলি?
--হ্যাঁ, হর দা, তোমায় আমি ভালোবাসি, মন থেইকা, প্রাণ থেইকা, আবেগের সঙ্গে বলে ওঠে অলি।
হর দা অলির বিছানার পাশে এসে বসে। কিছু সময় চুপ করে দুজনে বসে থাকে। তারপর হঠাৎ হর অলির দুই হাত টেনে নেয় নিজের কোলে, নির্নিমেষে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, অলির মুখ টেনে নেয় কাছে, আর একের পর এক চুম্বন খেতে থাকে।
অলি চোখ বুজে থাকে, স্বপ্ন রাজ্যের এক সবুজ ভালবাসা অনুভব করে। কিন্তু ক্রমশ: সে সবুজ রং ছুটে যাবার উপক্রম হয়, হরর শ্বাস প্রশ্বাস বেড়ে যেতে থাকে। সে ক্রমশ: অলিকে নিবিড় করে জড়িয়ে ধরতে থাকে। এমনি সময় অলি ছিটকে দূরে সরে যায়। তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, হর দা, একি! একি করছ তুমি! আমি যে তোমার অলি মা, মা জননী!...
যেন সম্বিত ফিরে আসে হরর, নিজেকে সে নিবৃত্ত করে। চুপ করে নিজের বিছানায় গিয়ে বসে থাকে কিছু সময়। তারপর জোরে জোরে বাচ্চা ছেলেদের মত শব্দ করে কেঁদে উঠে। মনে হয় কোন নতুন গানের করুণ সুর বাঁধার চেষ্টা করছে হর!
অলি নিজের বিছানা থেকে বলে উঠে, হর দা, ঘুমাইয়া পড়ো, না হইলে তোমার শরীর খারাপ করবো।
হর স্বাভাবিক শান্ত জবাব দেয়, হ্যাঁ, অলি মা! মা জননী!
ওরা এক ঘরে দুই বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে।



আপনার মতামত জানান