রূপকথার মতো

জয়ন্ত দেবব্রত চৌধুরী
এবার তবে শীতঘুমে যাও রাজকন্যে, কয়েক বছর আর
বুড়ো রাজাকে ভুল বুঝো না, ওকে ডাইনি বশ করে রেখেছে
ওষুধের ঘোর কেটে গেলেই আবার সে ক্ষমাপ্রার্থী হবে তোমার
সাত দাদার ওপর অভিমান রেখো না, বনে একলা ফেলে যাবার জন্য
ওদের রক্তের উচ্ছ্বাস কমে গেলেই অনুতাপে ছুটে আসবে তোমার খোঁজে
বিষের আপেলে তো কামড় দিতেই হয় এই জীবনে কখনো না কখনো,
তুমিও না হয় খেলে; চেহারা বড়ো মলিন হয়েছে আমার অদর্শনে,
এই অবসরে সুযোগ পেলে; একটুখানি ঘুমিয়ে নাও তো সোনা
জেগেই বা কী দেখবে? এই রুক্ষ মরশুমে ঝরে যায় পাতা ক্ষণে ক্ষণে
কাঠে কাঠে ঘষা লেগে অহেতুক জ্বলে ওঠে দাবানল, এ দৃশ্য কুৎসিত
এ নিষ্ফল ঋতু তোমার পদ্মনয়নে লেগে থাকা বিস্ময়ের যোগ্য না
বসন্ত আসুক, তখন তোমায় জাগিয়ে দেবো, ফুরোবে শাপের শীত
আমি আজ ভোর হতেই পূব বরাবর রওনা দিয়েছি হেঁটে একলাই
আমার প্রিয় পক্ষীরাজ এখন টাঙ্গাগাড়িতে উদয়াস্ত ভাড়া খাটে, তাই
কোঁচড়ে রয়েছে বাঁধা মুড়িমুড়কি, সাথে রয়েছে তিন তিনটে জাদুর প্রশ্রয়
সেই যখন হেসে উঠে কপালের হতে সরিয়েছিলে মসিকৃষ্ণ কেশদাম,
চাঁদের থেকে মেঘ সরাবার মতো করে, সেইটা আমার প্রথম জাদু
যখন রক্তগোলাপ দাঁতের ডগায় কেটে নতমুখে এগিয়ে দিয়েছিলে
আমার পানে, সেই টকটকে লাল স্মৃতিই আমার দ্বিতীয় জাদু
যেবার রাজকীয় সভাশেষে ফুলঝরা কোনও সন্ধ্যাপথে, দু’ধারে জল,
হেঁটেছিলে আমার আঙুল ধরে, সেটাই আমার তৃতীয় তথা শেষ সম্বল
আমি পূবের জঙ্গলের শেষে ঠিক একটা কোনো বর্ধিষ্ণু গ্রাম পাবো
সেখানে কোনো যোগীর দয়ায় বা অযাচিত এক দৈব কৃপায় প্রচণ্ড
বলীয়ান হয়ে মেষপালক কিশোরের হতে বুঝিয়েসুঝিয়ে নিয়ে ফিরবো
পাহাড়ের কোন আদিম গুহায় কুড়িয়ে পাওয়া অলীক দুই মায়াবী দণ্ড
কাঁচের শয্যায় শুয়ে তুমি, নিঃস্পন্দ; আমি পর্যায়ক্রমে বুলিয়ে দেবো
সোনার কাঠি, রুপোর কাঠি— তোমার ওই দুধসাদা শীর্ণ কপালে
এঁকে দেবো সুদীর্ঘ চুমো, তোমার দু’গাল তখন রাঙা হয়ে উঠবে

আবার তবে শীতঘুমে যাও রাজকন্যে, আমি জাগিয়ে দেবো বসন্তকাল এলে
আর নইলে ব্যর্থ আমিও তোমার হাত জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকবো তোমার কবরে
আদিমধ্যঅন্তকাল ধরে।

আপনার মতামত জানান