ঘর

অনির্বাণ ভট্টাচার্য
মেঘ নীচে নামে না। একটু ওপরে ওপরে ঘোরে। আকাশের কাছাকাছি। আকাশ সারাবছরই নীল সাদা। শুধু বৃষ্টি হলেই একটু কালচে টাইপের। এদিকে পাহাড়ও আছে। সিরিয়াস। মেঘের স্বভাব হলো পাহাড়ে গেলে আর পায় কে। তখন কুয়াশা আর মেঘকে আলাদা করা যায় না। তবে কুয়াশা, সে যেন কিছুতেই আর কলকাতা ছেড়ে বেরোতে পারছে না। কলকাতা। একদিন তিলোত্তমা ছিল। আজ নেই। যতীনদা লোক ভালো। তবে একটু পাগলাটে। সেদিন বলল ‘চল, আমাদের নিয়ে লিখবি’। - ‘তোমাদের নিয়ে? ধুর, ওই তো সেই রকের খিস্তি’, - ‘আরে নারে ওসব আর করি না’, - ‘তাহলে চায়ের দোকানের সিপিএম-কংগ্রেস’, - ‘ধুর কবে ছেড়ে দিয়েছি’, - ‘তবে?’ যতীনদা নিয়ে গেছিল। কলকাতা থেকে কাছেই। একটা হোম। ‘হোম?’ - ‘কিসের?’ - ‘চ’ না, দেখবি’। বৌদি বছর পাঁচেক হল গেছে। মেঘনা বৌদি। সবাই দুগগা দুগগা করত। শেষদিকটায় কী হল কে জানে। কাপপ্লেট ছুঁড়ত। বাচ্চাটার ওপর এফেক্ট পড়বে। পড়েছিল। যতীনদা বলল নোট রেখেও যায়নি। মুক্তোর মত ছিল। হাতের লেখা। রেখে গেলে, খুলে খুলে পড়ত। সময় কাটত। যতীনদার ভয় করত। বাড়িটা ফাঁকা। থাক। এরকমই। আরও অনেক মেঘনা আসবে। যতীনদা আর বিয়ে করেনি। ছেলেমেয়েগুলোর বয়েস বেশী না। আপার লিমিট খুব বেশী হলে ২০ হবে। চারদিকে কাতারে কাতারে চরিত্র। বসে পড়লাম। নস্করবাড়ির বাচ্চা ছেলেটা হাফস্পুয়েল্ট ছিল। টিউশনি থেকে ফিরতে গিয়ে মাথায় লাগল। কমিউনিকেট করে না আজকাল। যতীনদা ওকে ওপরের ঘরে রাখে। নীচে নামে না সচরাচর। দেবলীনা। ওটাই তো নাম। ফুলের মত। অথচ কথা বলে না। টিউশনি থেকে বেরিয়ে ছেলেটা একদিকে গেল। মেয়েটা অন্যদিকে। দূর থেকেই আওয়াজ। মেয়েটা পিছু ফিরেছিল। ট্রাকের ধাক্কা। ছেলেটা ফেরেনি। সেই দেবলীনা। নস্করদের বাচ্চাটা ওর কাছেই ভালো থাকে। ওদের কেউই কথা বলে না। অথচ অদ্ভুত শান্ত থাকে। প্রথমদিকে গিয়ে ছ্যাঁক ক’রে লেগেছিল। নিতাইদার বাবা-ই যা একটু দলছাড়া। চুপচাপ লোক। রগচটা ছিল। নিতাইদা নেই। রেলে কাটা গেল বছর পাঁচেক। ছোটটা দেখে না। এখানেই আসে মাঝে মধ্যে। আর এলেই নস্করদের ছেলেটা। ‘দাদু, কী এনেছ’। আর একজন থাকে। আব্দার করে। নিবিড়। কে নাম রেখেছিল। যতীনদা বলেছিল ‘ওর মা। দেখ, আমি তো ওর মা’কে কষ্ট দিয়েছিলাম, তাও ছেলেটা কেন আমার ন্যাওটা হল?’ থাকে এদের সঙ্গেই। বাবার সঙ্গেই। দ্যাখে। দেখাশুনো করে। ওই বয়সেই। এত চরিত্র। নস্করদের বাড়ির ছেলে। মেঘ। ওপরের ঘরে থাকে। দেবলীনা। আকাশ। বৃষ্টির দিনেই অ্যাকসিডেন্টটা হয়েছিল। ওইদিন একটা ঘিয়ে ঘিয়ে ড্রেস পড়ে থাকে। ছাড়তে বললেও ছাড়ে না। নিতাইদার বাবা। পাহাড়। বয়সে বেমানান। মেঘ, কুয়াশাদের আশ্রয়। নিবিড়। কুয়াশা। যতীনদার ছেলে। সবার সঙ্গে আছে। মা নেই। মিশে যেতে পারত তো অন্য কোথাও। তবু এখনও দিনের পর দিন বাবা বলতে অজ্ঞান। বাবা। যতীনদা। কলকাতা। মেঘনা বৌদি। তিলোত্তমা। একদিন বিষ খেল। কলকাতা ছেড়ে চলে গেল। অথচ কুয়াশা কেন যে কলকাতার এত ন্যাওটা? আমি লিখতে বসি। লোকাল কিছু মেণ্টালি চ্যালেঞ্জড মুখ-চোখ জোগাড় ক’রে প্রানপনে বেঁচে থাকা। হোম। ঘর। প্লট। চরিত্র। ‘থ্যাঙ্কস, যতীনদা’।

আপনার মতামত জানান