একটি অবান্তর গল্প

সার্থক মজুমদার
বাড়িটা রাস্তার একেবারে শেষে। বড় রাস্তা থেকে একটা সরু গলি পথ সোজা ঢুকে গেছে, একটা রিকশা ঢুকতে পারে বড়জোর, সেই গলিটা সোজা এসে শেষ হওয়ার আগে একটা ছোট্ট মীড়ের মতো বাঁক নিয়েই হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে বাড়িটার সামনের গেটে। গেট মানে কোন মস্ত কিছু নয়, সস্তা লোহার গ্রিলের একটা গেট, কোমর সমান, এইরকম সরু একটা রাস্তার সাথে মানানসই, কালো রঙ করা হয়েছিল কোন কালে, আস্তে আস্তে মরচে পরে গেছে। গেট পেরিয়ে ঢুকেই কিন্তু অবাক হতে হয়। চারপাশে শ্যাওলা ধরে যাওয়া দেওয়াল দিয়ে ঘেরা বেশ অনেকটা জায়গা। দুপাশে বড় বড় গাছ, বকুল, আম, কালোজাম, আর বেশ কয়েকটা নারকেল গাছ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এখানে ওখানে পাঁচিলের ধার ঘেঁসে। মাঝখান দিয়ে পায়ে চলা রাস্তা গিয়ে উঠেছে একটা একতলা বাড়ির উঠোনে।
বাড়িটা ছিল আমার বাবার মামাবাড়ি। কোলকাতা শহরের প্রায় বুকের উপর এতোটা জায়গা নিয়ে একটা বাড়ি কি করে প্রোমোটারদের চোখ এড়িয়ে টিকে গেছে সেটাই একটা আশ্চর্য ব্যাপার। বাড়িটায় মানুষ বলতে ছিল দু’জন মাত্র। বাবার মামিমা মানে আমাদের ভালোদিদা আর তার ছেলে সরোজকাকু। মামাদাদু মারা গেছেন বহুদিন হল।
আমাদের ছোটবেলায় এই ভালোদিদাদের বাড়িতে যাওয়া হত বছরে দুবার কি তিনবার। একবার অবশ্যই পুজোর পর বিজয়ায়, এছাড়া মাঝে মধ্যে মালদা থেকে আমার ঠাকুমা এলে তিনি দেখা করতে যেতেন তাঁর বৌদির সাথে, আমিও যেতাম সাথে। বাড়িটা সবসময়ই ভীষণ অদ্ভুত লাগতো আমার। বিরাট বড় বড় ঘর, একটু অন্ধকার অন্ধকার, সন্ধ্যেবেলা আলো জ্বালালেও যেন অন্ধকার পুরোটা যায়না। উঁচু উঁচু চৌকাঠ প্রতিটি ঘরে, এতটাই উঁচু যে সেগুলোর উপর থেকে লাফ দিয়ে দিয়ে খেলা করতে পারে বাচ্চারা। বাড়ির পিছনদিকে বিশাল বাঁধানো পাতকুয়ো, তার ধারেকাছে যাওয়া আমার বারণ, কুয়োর পরে আবার অনেকটা জায়গা, আগাছা জঙ্গল, ঝুপসি আমগাছে ঢাকা। ওইসব জঙ্গলে সাপ রয়েছে অনেক আর বেঁজিও। ভালোদিদার ঘরে বিশাল বড় পালঙ্ক আর বাকি ঘরটা জুড়ে ঠাকুরের সিংহাসন, আর তাতে কত যে ঠাকুর দেবতার অধিষ্ঠান গুনে শেষ করা যাবেনা। সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হল যখনই যাও ঠাকুরের প্রসাদ বাতাসা আর নকুলদানা পাওয়া যাবেই। আমি বলতাম তাবাসা।
তা ভালোদিদার এই এত ঠাকুর দেবতারা কিন্তু সরোজকাকুর তেমন কোন হিল্লে করতে পারলো না। চাকরি বাকরি কিছুই করলো না সরোজকাকু। কোন চেষ্টাই করলো না কোন চাকরি জোটানোর। কেউ কেউ ধরে বেঁধে কোন চাকরি জোগাড় করে দিলে, কিছুদিন গিয়ে তারপর এক সময় ভালো লাগছে না বলে ছেড়ে দিত। কাকু ছাত্র ভালো ছিল, কলেজ ইউনিভার্সিটি সবই শেষ করেছিল ভালোভাবে, ছবি আঁকার হাত ভালো ছিল কাকুর, বাবাকে একটা কোলাজ তৈরি করে দিয়েছিল সেটা এখনো রয়েছে আমাদের বাড়ির বসার ঘরে, কিন্তু চাকরিতে কিছুতেই আর তার মন লাগলো না। কাকু থাকতো নিজের মতো। তার ঘরে তক্তপোষের তিনভাগ জুড়ে বই আর খবরের কাগজে ঠাসা। একধারে কাকু একটু জায়গায় দিনের বেলা বসে পড়াশোনা করে, রাতে সেখানেই শোয়। সেই ঘরে যে কত রাজ্যের বই তা বলে শেষ করা যাবেনা, আর তার উপর খবরের কাগজ ফেলেনা বা বিক্রি করেনা কাকু। কাজেই ঘর জুড়ে খবরের কাগজের একরকম সংগ্রহশালা। তার মধ্যে আবার কিছু কিছু বিষয়ে কাকুর বিশেষ আগ্রহ ছিল, সে সমস্তর সংগ্রহও তেমনি বিশেষ, যেমন নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য। নেতাজির বিষয়ে যত খবর কাগজে ছাপা হত তা কেটে কেটে কাকু ফাইল করে রাখতো, একেবারে তারিখ দিয়ে গুছিয়ে। এরকম দু-তিনটে ফাইল ছিল কাকুর। এ সমস্ত অবশ্য বিশেষ কেউ জানতো না, সকলে কাকুর ঘরে শুধু খবর কাগজের জঞ্জালের স্তুপই দেখতে পেত। তবে যে কোন কারণেই হোক আমার কাছে কাকু তার এইসব সংগ্রহের কথা প্রকাশ করেছিল। ততদিনে আমি কিছুটা বড় হয়েছি, ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ি। ঠাকুমার সাথে গেলেও দুই ঠাকুমার গল্পে আর তেমন কোন আগ্রহ পাইনা, বরং আমি এসে বসতাম কাকুর কাছে, এটা সেটা প্রশ্ন করতাম খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে। কাকুর গল্প বলার ধরণটা ছিল ফুটো ভিস্তির মতো, প্রথমে কিছুই বলতে চাইবে না, তারপর প্রশ্ন করতে করতে এক সময় গল্পের স্রোত এসে পরবে, তখন কাকু আর থামবে না, এমনকি আমি থামাতে চাইলেও না।
কাকুর ঘরে দুনিয়ার বই পত্র ছাড়া আর একটা জিনিস ছিল। একটা আস্ত ঈগল পাখি, ট্যাক্সিডারমি করে রাখা। কোন বন্ধুর কাছ থেকে জোগাড় করে ঘরে এনে রেখেছিল কাকু। আমার ঠাকুমা বলতো, ওই ঈগল পাখিটাই নাকি সব দুর্ভাগ্যের কারণ, ওটাই নাকি ঘরের অলক্ষ্মী। আমাদের পরিবারের সকলেই কমবেশি শিক্ষিত, চাকরি বাকরি করে স্বচ্ছল অবস্থা। এমন পরিবারে কাকুকে কেউই বিশেষ ভালো চোখে দেখত না, কোন ছেলে মেয়ে পড়াশোনা ভালো করে না করলে, পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে কাকুর তুলনা দিয়ে বলা হত, ওর মতো হবি দেখতে পাচ্ছি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, পারিবারিক সম্মেলনেও এই অবহেলার ব্যাপারটা দিব্যি টের পাওয়া যেত। একটা মানুষ, সুস্থ সবল শিক্ষিত, সে চাকরি বাকরি কিছু করেনা এটা কেউই ঠিক মেনে নিতে পারতো না। কাকুর যদিও এতে বিশেষ কোন হেলদোল ছিল না। যে কোন অনুষ্ঠানে কাকু আসতো অনেক দেরী করে, অবধারিত ভাবে এর ওর বকুনি, হালকা খোঁচা ইত্যাদি শুনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকতো আড্ডার একপাশে, সবার সব গল্প শুনত আর মিটিমিটি হাসত। বাড়ির বাচ্চারা কাকুর কাছে বিশেষ ঘেঁষত না, তাদের মায়েদের বারণ ছিল, এরকম অকর্মণ্য, অসফল একজন লোকের সাথে মিশলে তারাও যদি ওরকম হয়ে যায়। নেহাত আমি একটু বয়ে যাওয়া ধরণের আর আমারও জীবনে কিছু হবেনা এরকম একটা প্রচলিত ধারণা থাকায় আমার কাকুর সাথে মিশতে কোন আপত্তি ছিল না।
সত্যি বলতে কি কাকু আমার কাছে বেশ একজন হিরো গোছের মানুষ ছিল, যে কারুর চাকর নয়, নিজের মর্জিতে খায় দায় থাকে, পড়াশোনা ভালোবাসে, তাই করে, কারুর সাতে পাঁচে থাকে না, কারুর দয়ার পাত্র নয়, নিজেই নিজের সম্রাট। বাড়িতে কাকুকে নিয়ে এটা সেটা আলোচনার মধ্যে একদিন এটা বলতে গিয়ে বাবা মায়ের কাছে প্রবল ঝাড় খেয়েছিলাম, নেহাত স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ি তখন তাই মারধোর খাইনি। আমার নিজেরও মাঝে মাঝে মনে হত, কাকুর মতো হতে পারলে কেমন হয়! কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক, স্কুলের মাঝারি গোছের ছাত্র আমি, যার ভবিষ্যৎ নিয়ে কারুর তেমন কোন উচ্চাশা ছিল না, সেই আমি স্কুল শেষের পরীক্ষায় রীতিমতো ভালো রেজাল্ট করে, সেইসঙ্গে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়ে বাবা-মা থেকে শুরু করে যাবতীয় চেনা পরিচিত সকলকে ঘাবড়ে দিয়ে মেডিক্যাল কলেজে গিয়ে ভর্তি হলাম। বাড়ি ছেড়ে অন্য শহরে গিয়ে কলেজের হোস্টেলে থাকতে শুরু করলাম। বাড়িতে আসা যাওয়া, আত্মীয় স্বজনদের সাথে যোগাযোগ কমে এলো। কাকুর সাথেও বহুদিন আর দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। মাঝে মাঝে বাড়িতে এলে শুনতে পেতাম, কাকু আজকাল আরও বেশী ঘরকুনো হয়ে পড়েছে, কোন অনুষ্ঠানে বা নিমন্ত্রণেও সবসময় আসে না।
ইতিমধ্যে ভালোদিদাও মারা গেছেন। কাকু এখন সারা বাড়িতে একাই থাকে। নিজেই রান্নাবান্না করে খায়। ঘরের কাজও সব নিজেই করে। বাবা মাঝে মধ্যে কোন কাজে ওদিকে গেলে একটিবার দেখে আসে কাকুকে। এখনো স্বভাবসিদ্ধভাবে বকাঝকা করে কাকুকে, কাকু চুপ করে থাকে, হাসে।
থার্ড ইয়ারের পরীক্ষার পর ছুটিতে বাড়ি ফিরলাম আমি, তখন গরম কাল। স্কুলের মতো কলেজগুলিতেও গরমের ছুটি। বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে আড্ডায় দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। এর মধ্যেই একদিন সকালে এক ভদ্রলোক এসে হাজির। এনাকে আমি চিনি। কাকুদের পাশের বাড়িতে থাকেন। এঁর ছেলে তুতান আমার বয়সী, ছোটবেলায় ওখানে গেলে একসাথে খেলেছি অনেকসময়। ভদ্রলোক জানালেন, কাকুকে বেশ কিছুদিন ধরে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনিতেও কাকুকে খুব একটা দেখতে পাওয়া যায় না, দু-তিনদিনে একবার হয়তো বেরোয় কাকু বাজার করার জন্য, কিন্তু বেশ কিছুদিন সেটুকুও দেখতে না পেয়ে ওরা গিয়ে দেখেন বাড়ির দরজায় তালা। ওঁরা ভেবেছিলেন হয়তো কাকু কোন আত্মীয়ের বাড়িতে এসে থাকবেন, কিন্তু আজ বেশ কিছুদিন হল কাকুর পাত্তা নেই দেখে আমাদের বাড়ি এসেছেন খোঁজ খবর নিতে।
তখনই ফোন করা হল অন্য সব আত্মীয়দের বাড়ি বাড়িতে, যেখানে যেতে পারে কাকু। স্বাভাবিকভাবেই কোন খবর নেই। শেষে ঠিক করা হল পরেরদিন রবিবার সকালে সকলে মিলে কাকুদের বাড়ি গিয়ে সরেজমিনে দেখা যাবে। সেই মতো পরদিন সকালে একটা ছোট দঙ্গল জড়ো হল কাকুদের বাড়ির উঠোনে। বাবা, আমি, বাবার আরও কয়েকজন মামাতো ভাই, পাশের বাড়ির তুতানের বাবা, পাড়ার আরো কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ।
গাছের পাতায় ঢেকে রয়েছে উঠোনটা, বোঝা যায় অনেকদিন ঝাঁট পড়েনি। আমগাছটা কাঁচা পাকা আমে ভরে আছে, আশ্চর্য এ পাড়ায় কি বাচ্চা ছেলে মেয়েরা নেই! উঠোন পেরিয়ে বাড়ির সদর দরজায় একটা মাঝারি সাইজের তালা, খুব শক্ত পোক্ত গোছের নয়। কিছুক্ষণ আলাপ আলোচনার পর ঠিক হল তালাটা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখা হবে। একটা থান ইট জোগাড় করে কয়েক ঘা দিতেই দরজা খুলে গেল। ঘরের ভিতর অন্ধকার, সব দরজা জানলাগুলি খুলে দিয়ে দেখা গেল, ঘর রীতিমতো গোছানো অবস্থায় রয়েছে, যেন আমরা এতজন লোক আসব কাকু জানতো বলেই, ঘর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে রেখেছে। বাইরের ঘর পেরিয়ে মাঝের বড় ঘরটিতে পা দিয়েই চমকে উঠলো সকলে। ঘরের পশ্চিমদিকের দেওয়ালে মামাদাদু আর দিদার বাঁধানো ছবির পাশেই সরোজকাকুরও একটা বাঁধানো ছবি। প্রতিটা ছবিতেই চন্দন পড়ানো, প্রতিটি ছবিরই গলায় প্লাস্টিকের রজনীগন্ধা ফুলের মালা। সারা বাড়ি খুঁজেও আর কিছু পাওয়া গেল না, না কোন চিঠি, না অন্য কিছু। আমি একফাঁকে কাকুর ঘরে গিয়ে খুঁজে দেখলাম, সবকিছু তেমনই রয়েছে, খবরের কাগজের রাশি, বইপত্র। শুধু দুটো জিনিস নেই, নেতাজী অন্তর্ধান রহস্যের সেই ফাইল আর সেই ঈগল পাখিটা।

আপনার মতামত জানান