বাজীকরের খেলা

সীমা ব্যানার্জী-রায়


রূপনারায়ণ নদী বয়ে চলেছে আজও। তার পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল বকুল গাছ বিস্তীর্ণ ডালপালা ছড়িয়ে। সেই নদীর জলে বকুল ফুলের নাচানাচিও কমেনি একটুও। তবে তার গা ঘেঁষে যে ধবলদেব বর্মন-দের রাজবাড়ি। সেই প্রাসাদ আজ প্রাণহীণ-ইতিহাস মাত্র।
এখনও ছায়া দেয় সেই মস্তবড় বকুল গাছ। যার তলাটা পাথর দিয়ে বাঁধানো গোল করে। দুপাশে দুটো ছোট ছোট টালির চালা। পাশ দিয়ে -সাত আটটা সিঁড়ি উঠেছে দুটো শিব মন্দিরে। মাঝে মাঝে টালির চালা দুটোতে সাধুরা আসে, গাছের শুকনো ডালপালা দিয়ে ধুনি জ্বালে। কখনও কখনও ওই মন্দিরের চাতালে ফুটো এ্যালুমিনিয়াম- এর বাটি সামনে রেখে বসে থাকে কোন ভিখারী।
বকুলতা ছিল ঐ রাজবাড়ির অপরূল সুন্দরী এক মেয়ে। তার প্রাসাদের বাইরে যাওয়া মানা ছিল। কিন্তু দিদিমা যখন আসত তাঁর সাথে নদীর ঘাটে যাওয়া মানা ছিল না। সেই ঘাটে দিদিমার সাথে যেতে আসতে একটি সুদর্শন যুবকের সাথে তার দৃষ্টি বিনিময় হত। একদিন দিদিমাকে প্রতিবেশিনীদের সাথে এগিয়ে যেতে দেখে সে একটু পিছিয়ে বিরক্ত মুখে জিগ্যেস করলো যুবক-কে …
-কি দেখো অমন করে?
- তোমায়
-কেন?
-আমি দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছি। আর দেখতে পাবো না কোনদিনও। তাই পৃ্থিবীর যা কিছু সুন্দর সব আমার চোখের ক্যানভাসে এঁকে রাখছি। বাকী জীবনে সেইগুলো যাতে না হারায়।
কিসের এক দুঃসহ বেদনা নিয়ে ফিরে এল বকুলতা।
দিদিমা আবার ফিরে গেলেন। বকুলের ঘাটে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গেল। এক নিদারূণ মনোবেদনায় দিন কাটতে লাগল। তার মনে শুধু সেই গানটা বাজতে থাকলঃ “ যত ভাবি ভুলে যাব, মন মানে না আআ...মন মানে না।”
কিছুদিন পর প্রাসাদ সেজে উঠল অপরূপ সাজে। ভোর হল নহবতখানায় সানাইয়ের সুরধুনীতে। দধিমঙ্গল হল আর বেজে উঠল বিদায়ের ভৈ্রবীর সুর। নিঃশব্দে বেরিয়ে এল প্রাসাদের বাইরে বকুলতা -সে যে কিছুতেই ভুলতে পারছে না ঘাটে দেখা সেই যুবককে আর তার কথাগুলোকে। এক দুর্নিবার আকর্ষণে ছুটে চলল সে ঘাটের দিকে। দেখতে পেল সেই দৃষ্টিহীণ যুবককে। তার হাত দুটো তুলে নিল নিজের হাতে। হঠাত বকুলতা দেখল হাতে জলের ফোঁটা। আর তার চোখের জলে ঝাপসা হয়ে গেল বকুলতার চিরপরিচিত চেনা বাড়ি। যুবকের হাতদুটো শক্ত করে ধরে এগিয়ে চলল বকুল গাছের তলা দিয়ে। মিলিয়ে গেল এক নতুন জনস্রোতেরদিকে।
শ্রাবণের দমকা ঝড়ে আজও নিঃশব্দে বকুলগাছের শান বাঁধানো তলায় ঝরে পড়ে বকুল ফুলেরা। পাশ দিয়ে হেঁটে যায় বকুলের দল। এখনও গেলে দেখা যায়--কেউ না কেউ ঘাটের সিঁড়িতে বসে গান গাইছে......
-”ও মন কোথায় শুরু কোথায় বা শেষ কে জানে!
ও যে বাজীকরের খেলা রে ভাই, যার খেলা সেই জানে।”


আপনার মতামত জানান