অন্য বসন্ত

মৃগাঙ্ক
বাড়ির সামনে রোজ দেখা হয়। রোজ হারিয়ে যায়। একবার মাঘ মাসের শীতে যখন হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছিল তখন আধপোড়া ভালোবাসাগুলো দিয়ে আগামী উৎসবের আনন্দ সাজাচ্ছিল সে। বর্ষার ছড়ানো সবুজগুলো যখন সেই মাঘেই বিবর্ণ হল তখন বালিতে মুখ লোকানো নদীর জলে ভাসিয়ে দিচ্ছিল মনখারাপ করা আদর। ছাইয়ের মত ধুলোকণা গ্রীষ্মের চড়া রোদে উড়ছিল তখনই সে চোখের কোণটা সেই রোদে শুকিয়ে নিচ্ছিল। যাতে রোজ বাড়ির সামনে রোজ দেখতে পারে তাকে।

একটা সময় ছিল যখন বসন্ত আসলেই মন ভাল হয়ে যেত। জোড়ায় ঘোরাঘুরি, ভিড়ের হুড়োহুড়ি, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখা বাকিদের ন্যাকামি, লুকাতে ভুলে যাওয়া উপহার, বারণ না মেনে উড়তে থাকা ধোঁয়ার কুন্ডলী, মোবাইল ভাইব্রেশন মোডে রেখে তুলতে ভুলে যাওয়া আর ক্রমাগত আসা ফোনের জ্বলতে থাকা আলো দেখতে না পেয়ে জমে থাকা মিসড কলের পাহাড় প্রমাণ অভিমান।
অভিমানের অভিযানে নেমে দরজা বন্ধ করে রাত জাগা ল্যাপটপের চ্যাট বক্স আর হোয়াটসঅ্যাপের ই মোজীর প্রাণান্ত প্রচেষ্টা যখন রিলেশনশিপের স্ট্যাটাস ‘ইটস কমপ্লিকেটেড’ থেকে আবার ‘ইন এ রিলেশনশিপ’ হয়, ঠিক তখনই বন্ধ ঘরের দরজার তলা থেকে বেরিয়ে আসা আলোটা বন্ধহয়। আর বাইরে থেকে দরজার তলা দিয়ে টুক করে ঢুকে যায় ভোরের আলোটা।
দরজার তলা দিয়ে ভোরের আলোটা যখন সকালের সীমানা ছাড়িয়ে দুপুরে ঢুকব করত তখনই ধড়াম করে খুলে যেত দরজা। আর তারপর একহাতে টুথব্রাশ আর অন্যহাতে শেভিং ব্রাশ বাকি হাতগুলো এক মহিলার কাছে পার্মানেন্টলি আছে সেই মহিলারি হয়ে। মানে ছেলেদের তো সে সুযোগ হবে না। অগত্যা দুই হাতেই দুঘণ্টার কাজ দশ মিনিটে সেরে, অলিগলি হাঁপিয়ে কলেজে হামলা।
তার আগে ওই বাড়ির সামনে দেখা হওয়া। দুরন্ত গতিতে একে অপরের পাশ কাটিয়ে যাবার সময় বুড়ি ছোঁয়ার মত বাসন্তীরঙের সোচ্চার ভালোবাসা। তার পরেই লাফিয়ে বড় রাস্তায় পড়ে ছুট দে ছুট।

একদিন সেই দুরন্তগতির ছুটই ছুটির কথা জানিয়ে গেল। সেই সকালবেলাতেই। আগের রাতের করা পাক্কা প্ল্যান ঠিকঠাক যাতে হয় তাই সকালথেকে প্রবল উত্তেজনা। এইবারের বসন্ত সবথেকে সুখের আর সব থেকে খুশীর। স্লিং ব্যাগের সাথে আড়াআড়ি করে মিলিয়ে পিঠে ঝোলানো গীটার। দাড়িটা কেত মেরে অগোছালো, তাই নিয়ে তিন ধাপ সিঁড়ি একলাফে পেরিয়ে দুজনের মীটিং পয়েন্টে এসে সবার সামনে হাই ফাইভ প্রথমবারের মত। ছুঁড়ে দেওয়া কথা সজোরে ভেসে এল ‘আজ বিকেল পাঁচটায়, একাডেমীর সামনে’।

সামনে তারপর ছড়িয়ে বসেছিলাম, ভাঙা গীটারের অজস্র টুকরো, স্লিং ব্যাগের থেকে ছিটকে বেরোনো বইখাতার সাথে গানলেখার খাতাটা, শেষ গানটা কিভাবে যেন লালহয়ে গিয়েছে।দুরন্ত বাসেরা বসন্তের ফিরে আসার খবর রাখে না। তাই গতির কাছে চুরমার হয়েযায় গান

তোমার কাছে আগুন হব
ভালোবাসা
পেরিয়ে দেয়াল, উড়ছে খেয়াল
আর আশা
অন্ধকারে একলা রাতে
কোলঘেঁষা

তোমার আমি আদর হব
ভালোবাসা

এরপরে পুরো লাল, অনেক কষ্ট করলে হয়ত পড়া যেত। কিন্তু ভালোবাসায় আর ভালোবেসে পাওয়া কষ্টের পর আর কোনোকিছু তেমন করে দাগ কাটে না।

আমারো কাটে না। তাই আমি দেখি। রোজ দেখি ভালোবাসাকে কষ্ট পেতে। রোজ দেখি ভালোবাসাকে হারিয়ে যেতে। তিনবছর ধরে দেখছি রোজ। আমার ছেলে অনীকের ভালোবাসাকে। অনীকের গীটার জোড়া লাগে নি। খাতায় লেগে থাকা লাল এখনো আছে যাতে সব গানগুলো লেখা আছে আর আছে ওর রেখে যাওয়া ভালোবাসা ‘সৃজনী’। তখন কলেজে পড়া মেয়ে আজ চাকরী করে আর আসা যাওয়ার পথে প্রতিবার একবার করে সেইখানে দাঁড়ায় যেখানে ওরা দুজন একে অপরকে ছুঁয়ে যেত।

আগে এই ছুঁয়ে যাওয়া যখন দোতলা থেকে দেখতাম, তখন প্রাণের ভিতরের বোধনের বাজনা বাজত রোজ। একা মায়ের এর থেকে আনন্দের কি আছে। ভালোবাসাকে ছুঁতে সবাই তো পারে না। আমার অনীক পেরেছিল। আমি আজো দেখি অনীক রোজ ছুঁয়ে যায় সৃজনীকে। আমার এখন রোজ বসন্ত দেখি এখন। বিষন্ন বসন্ত।

আপনার মতামত জানান