অন্ধকারে তুমিই বিগ্রহঃ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা কবিতাকে একটা অন্য দিশা দেখালেন

রঙ্গীত মিত্র
এক

খবরের কাগজের দেওয়ালে, অসন্তোষ স্লোগান লিখে যায়। আবার অনিদ্রা-ওড়ানো অনিশ্চয়তার মূর্তিও ক্ষয়ে যায় দূষণে।আসলে মানুষ এগিয়ে যেতে যেতে,নিজেদের ভিতরকেও বদলে ফেলছে।তাই এখানে জীবন ও সময়ের দূরত্বের নৌকায়, পরিচয় যেন ভেসে যাওয়া গাছের পাতা।
অন্যদিক দিয়ে ভাবতে গেলে এখন সব এক-রকম হয়ে যাচ্ছে। সব ঋতু তাদের বৈশিষ্ট্য,বৈচিত্র হারিয়ে যেন যক্ষপুরীতে আবদ্ধ। কেবল অন্ধকারের জয়গান তারাদের কোমল শরীরকে ক্রমশো নির্জন করে দিচ্ছে।তাই রাত ১০টা হলেই আমার শহর, কলকাতার ঘুম পায়। তখন কিছু যান্ত্রিক শব্দ নিয়ে খেলে যাওয়া কুকুরেরা , অশরীরি অস্তিত্বের পিছু ধাওয়া করে...।

দুই

বিপন্নতা তার শাখা-প্রশাখা বাড়িয়ে দিয়েছে । যুদ্ধের খবর ছুটে আসছে সিরিয়া থেকে। কিয়েভের কোনো আহত সৈনিকের চীৎকার, অর্থনীতির পিছু ধাওয়া করছে । কখনো বা শিল্পায়ন আর কৃষির বিতর্ক হাঙরের মতো সব মাছ খেয়ে যাচ্ছে । এইভাবেই বড়ো হয়ে উঠছে আমার শহর,আমার সংস্কৃতি। তার গায়ে নিয়ন্ত্রনের প্রলেপ, অধিকারবোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সবাই যেন দৌড়াচ্ছে।একটা যান্ত্রিক দৌড়।এই দৌড়াতে দৌড়াতে মানুষের ভিতরটা যেন রোবোট হয়ে যাচ্ছে। সে ভুল যাচ্ছে তার সংস্কৃতিকে।সে ভুলে যাচ্ছে তার বেঁচে থাকার বোধকে। এইরকমই এক অস্থির সময়,সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখে যাচ্ছেনঃ
লুঠ হয়ে গেছে শিরা ও ধমনী
দু’চোখের বিষ,নয়নের মণি
ভাঙনের মুখে ব্রিজ এসে থমকালো

থমকাতে যদি নাই পারত সে
অতলে তলিয়ে যেতো বিনা দোষে
স্মৃতিতে বাঁচত কালো-সাদা-সাদা-কালো

লপচপাচ্ছে মঙ্গল -বুধ
আসল অল্প,অনেকটা সুদ
শোধ দিতে হবে ধার নেওয়া দিনকালও
তোমাকে দখল করে নিয়ে আমি
নিজেকে বলেছি অন্তর্যামী
অন্ধ গলিতে ঝলসাচ্ছিল আলো...

ঘুঙুর কি তবে বাইজির চেয়ে ভালো?
( অন্ধকারে তুমিই বিগ্রহঃ প্রতিপ্রশ্ন )


কবি তো সমাজকে পথ দেখাবেন । বিশেষ করে যখন চারপাশে এতো উত্তাপ, মানুষে মানুষে এতো বিভেদ, যেখানে কোয়ালিটি আর কোয়ান্টিটির দন্দ্বে সময়ের মজলিশ,বিমুখ হয়ে আছে ।
এইবার কবিতাটি যদি পাঠক আমরা আবার পড়তে আরাম্ভ করি তাহলে দেখবো কবি কবিতাটির শুরু দিকের থেকে কাব্যিক- অনুসন্ধান চালিয়েছেন।তার সেই যাত্রাপথে তিনি দেখছেন শিরা,ধমনী লুঠ হয়ে গেছে... ‘দু’চোখের বিষ’ ই হয়ে যাচ্ছে ‘নয়নের মণি ‘।অথচ এই অনিশ্চয়তা, বিশৃঙ্খলতার ধ্বংসলীলায়ও কবি সত্যের সমর্থক।তাই তাঁর বোধ-দৃষ্টি দেখাচ্ছে, “ভাঙনের মুখে ব্রিজ এসে থামলো ।” অর্থাত ধ্বংসের শেষে আবার মিলনের শুরু । সেজন্যে গতিময়তার রথে অগ্রসর হতে হতে কোথাও গিয়ে একবার “থমকাতে’ই হয়। না হলে, নতুন জার্নির সূত্রপাত হবার আগেই, সময়ের ঘূর্নিতে তলিয়ে যেতে হবে।তখন তার রংহীন স্মৃতিতে সাদা কালো ছাড়া আর কোনো অনুভূতিই থাকবে না। আবার পাঠক, চলুন আমরা কবিতার কাছে ফিরে যাই। কবি লিখছেন , “ লপচপাচ্ছে মঙ্গল-বুধ/আসল অল্প,অনেকটা সুদ/শোধ দিতে হবে ধার নেওয়া দিনকালও ” । কবির মাথার ভিতর যন্ত্রনা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেটা কখনো তাঁর নিজের একার নয়;ফলতঃ সমাজের,সময়ের প্রত্যেকটা মানুষের সাফারিংস ফুটে উঠছে বিনায়কবাবুর লেখায়। যেমন দেখুন , তিনি লিখছেন যে আসল অনেক কম কিন্তু সুদ অনেক বেশি দিতে হবে এবং মানুষের লোভ এতোই বেড়ে গেছে যে তাকে ‘ শোধ দিতে হবে ধার নেওয়া দিনকালও।”
প্রায়-ভঙ্গুর অশান্তির ভূকম্পনে দুলন্ত রুক্ষ সমাজের ছটফটানির এক সিনেমা ফুটে উঠেছে এই লেখায়। পাঠক আপনি যতই এই লেখাটির ভিতরে প্রবেশ করবেন,বুঝতে পারবেন প্রকৃতির নরম হাত আপনাকে ধরে রেখেছে। আপনি সহজেই উপলব্ধি করবেন,অজানা বিচারক আপনার মাথায় তার বিচারদণ্ডের স্পর্শে বুঝিয়ে দিতে চাইছেন, কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল । কিন্তু কবি সরাসরি কোনো নিদৃষ্ট কনক্লুসানের কথা বলছেন না। তিনি শুধু সময়ের ছবিগুলোকে তুলে ধরেছেন। যেমন “ তোমাকে দখল করে নিয়ে আমি/ নিজেকে বলেছি অন্তর্যামী/অন্ধ গলিতে ঝলসাচ্ছিলো আলো.../ ঘুঙুর কি তবে বাইজির থেকে ভাল ?”
সমস্ত সিস্টেমই যেন করাপটেড।সমস্ত সিদ্ধান্তের পিছনে যেন প্রলোভন। আর নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ন্ত্রনের পিছনের সত্যের লুকোনো মুখ, যেন ডেড-এণ্ড হয়ে যাওয়া রাস্তার হাইওয়ে হয়ে যাওয়ার বিভ্রান্তি।আমরা সেই বিভ্রান্তির প্রেমে পড়ে হারিয়ে যাচ্ছি। তাই কবি পাঠকের কাছে প্রশ্ন করেছেন , ‘ঘুঙুর কি তবে বাইজির থেকে ভাল ?’ এইবার পাঠক কবি,সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিগনেট থেকে সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘অন্ধকারে তুমিই বিগ্রহ’-এর আর একটি কবিতার দিকে আমরা নজর দেবো।
সর্বনাশকে স্বাগত,
চাই না মাঝামাঝি কিছু হোক
বিক্রি করব নয়তো কিনব,
দেবো না তো বন্ধক

ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে দেব চোখ আর
দাঁতে কামড়াব ঠোঁট
নষ্ট করতে পারবে না দেশ
আমার একটা ভোট

আমার পিছনে তুমিও রয়েছ,
চিহ্নে মারতে ছাপ
পোড়ামাটি হলে তুমিই প্রতিমা,
কাঁচা হলে সন্তাপ

চলো উঁচুদিকে ঠেলে দিই জল
ঝড়বন্যার শেষে
বিষ খেয়ে যদি বেঁচে আছি তবে
মরব না ভালবেসে

( অন্ধকারে তুমিই বিগ্রহ ঃ বিকল্প )
পাঠক এই কবিতাটি পড়ে বুঝতে পারছেন, কবি সময়কে অন্যরকম ভাবে দেখতে চাইছেন।কখনো খুব আন্তরিকভাবে তিনি নিজের হৃদয়ের কাছাকাছি এনে, বুঝতে চাইছেন সভ্যতার দিক-নির্দেশের অভিমুখের চাবিকাঠি। তিনি লিখছেন , “সর্বনাশকে স্বাগত ,/চাই না মাঝামাঝি কিছু হোক / বিক্রি করবো নয়তো কিনবো,/দেব না তো বন্ধক ”
কবি শেষ পর্যন্ত নিজে জমি আকঁড়ে থাকার লড়াই-এর কথা বলছেন।বলছেন সর্বনাশ আসুক। তার মুখোমুখি হতে তিনি প্রস্তুতও। তিনি আর মাঝামাঝি কিছু চান না। কারণ কবি , হার আর জিতে মাঝের ভাসমান মানুষদের মতো নন। তিনি বুঝতে পারছেন, এই শেষ সুযোগ,এখন রুখে না দাঁড়ালে, অন্যকেউ কেড়ে নেবে সব কিছু। কিন্তু সে যুদ্ধে কবি একমাত্র ভালবাসাকে সঙ্গী করে লড়তে চাইছেন।তাই লিখেছেন , “ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে দেব চোখ আর/দাঁতে কামড়াব ঠোঁট/ নষ্ট করতে পারবে না দেশ /আমার একটা ভোট” । ভালোবাসার চুম্বন তিনি ছড়িয়ে দিতে চাইছেন। আর প্রেম ছাড়া তো কবির বিতরণ করারও, কিছু নেই। কারণ তিনি তো ক্ষমতা চান না,অর্থ চান না,সুনাম চান না। তিনি তো ঈশ্বরের প্রতিনিধি।
কবি, সত্য ও সুন্দরের গনতন্ত্রে বিশ্বাসি এক অসাধারণ মানুষরূপি, দেবদূত। সেখানে প্রাপ্তি পোড়ামাটি হলেও সেটা তাঁর নিজের। বরং তাঁর স্বপ্ন, সবাইকে নিয়ে অগ্রগতির সেই সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা।তাই অনাচারিদের বিরুদ্ধে তাঁর ঘোষণা “চলো উঁচুদিকে ঠেলে দিই জল/ ঝড়বন্যার শেষে / বিষ খেয়ে যদি বেঁচে আছি তবে/ মরব না ভালবেসে” । কবি এখানে আবার সবাইকে (একসাথে) নিয়ে, এগিয়ে যাবার অমোঘবানীর কথা বলছেন। ইতিহাসের হাত ধরে মানুষকে আবার সমাজবব্ধ হয়ে বেঁচে থাকাটা, শিখে নিতে বলছেন।বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া নীতিকে তিনি বর্জন করে বলে উঠছেন,প্রেমই মানুষকে নির্বান দেবে। উদ্ধার করবে ঋনাত্বকতা থেকে । তাই অন্ধকার বিষ প্রবাহে ভালবাসার পতাকা নিয়ে কবি, সজীবতার আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন। আমাদের সেই আলো অনুসরণ করে জীবনের সঠিক নিরবাচন করাই উচিত।
তিন
সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'অন্ধকারে তুমিই বিগ্রহ' নামক কাব্যগ্রন্থটি এইসময়ের দলিল।তিনি শুধু এইসময়েকে তাঁর কবিতায় চিত্রকল্পের মাধ্যমে প্রকাশিত করেননি,অন্যদিক তিনি দেখিয়েছে এক অন্য বেঁচে থাকার রাস্তা। এই কাব্যগ্রন্থটি পাঠকদের কাছে জীবনের অদেখা এক নীল জানলা খুলে দেয়, সেখানে সন্ধ্যা রমনী তাঁর মায়াবী বাউল সুর গেয়ে যান। সেইসব স্বর্গীয়মুহুর্ত - উজ্জ্বল এই বইটিতে বাস্তব আর কল্পনা ছাড়াও উঠে এসেছে এক আয়না,যার সামনে দাঁড়ালে পাঠক আপনি নিজেকে চিনতে পারবেন ।
বইটি দুই অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশটির নাম, “ বন্ধ দরজা তোমার জন্মভূমি , আর অপর অংশটির নাম , ‘নিজের বিরুদ্ধে যাওয়া চাই ’ । ‘বন্ধ দরজা তোমার জন্মভূমি’তে রয়েছে ২৪টির বেশি কবিতা আর ‘ নিজের বিরুদ্ধে যাওয়া চাই’তে রয়েছে ৭টার বেশি কবিতা। সমস্ত কবিতাই অন্যরকম ও অসাধরণ। তাছাড়া প্রত্যেকটি কবিতাতেই, কবি আলাদা আলাদা ভাবে নিজেকে ও তাঁর সময়কে লিখে গেছেন। এই কাব্যগ্রন্থে, তাঁর অপূর্ব লেখনী পাঠকে কখনো উত্তেজিত করে আবার কখনো বিষাদ-সমুদ্রে জিজ্ঞাসার জাহাজে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু কবি কখনো পাঠকের হাত ছাড়তে চান না।তাই তিনি সব সময়ের শিকড়ের পূজারী। তাঁর লেখায় প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর যেমন থাকে তেমনি থাকে দৈববানী। মানুষের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাই তিনি,মুক্তিরূপে প্রবেশ করেন।কারণ মানুষের সমস্যা তাঁকে দগ্ধ করে,বিচলিত করে।তাই তাঁর সময়-রসে নিমজ্জিত লেখায়, দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি,ধর্ষণ, শোষণ,সন্ত্রাস , সেনসেক্স পতন, শিল্পহীনতার পাশাপাশি হরোপ্পা - মহেঞ্জোদড়ো, পদ্মা নদীর কথা ইত্যাদি ফুটে ওঠে।কবি তাই গ্রাম-শহর,অতীত-বর্তমান -ভবিষ্যত, সব কিছুকেই নিজের ভিতরে নিয়ে আসেন। কিন্তু তিনি কারুর সাথে বিযুক্তির কথা বলেন না।
কখনো শেয়ালদা,কখনো রাইটার্স ইত্যাদির আধুনিকতার ভিতর ফুলুরির গন্ধ পান কবি। আবার ক্ষোভে তিনি বলে ওঠেন, “আমাকে বাঁচাতে মারা গেছে ঈশ্বর।”কখনো বাস্তবের পৃথিবীর, লোভ-কাম ইত্যাদি কবিকে দংশন করে। কিন্তু তিনি তো চুড়ান্ত আন্তর্জাতিক।ফলতঃ অভিনয় তাঁর ধাতে নেই। তাই তিনি লেখেন , “ তোমার পায়ের ধুলোকে নিজের রক্তে করেছি কাদা / তারপর ও শুধু চাকর , দেবে না মানুষের মর্যাদা ?”
আধার কার্ড,বিরিয়ানী, আলফানসো ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেও, কবি বহমান সময়কে,পরিহাস করে সমালোচনা করেছেন।কিন্তু কবি তো গভীরতার কথা বলেন। তাই তাঁর যাত্রাপথ রেখা, জীবনের নিউক্লিয়াসের দিকে নিয়ে যায়। তাও কবিকে কঠোর হয়ে বলতে হয় , “ প্রকৃতি যাকে এত রস দিয়ে পাঠিয়েছে/ মানুষ তাকে ছিবড়ে করে মারবেই !” অথবা “পায়ের তলার এই পৃথিবী /নাড়িয়ে যেতে চাই.../” কিম্বা তাঁর এই কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতা , “কাঠপুতুল”-এর শেষ লাইন চারটে পাঠক মন দিয়ে পড়ুন,সেখানে কবি লিখেছন , “ একটা হাত রাখতে পারি হাতে / একটা চুমু থাকতে পারে ঠোঁটে/ গলায় যদি না এঁটে বসে দড়ি/ বলতি যদি জলের থেকে ওঠে ।” তাহলে পাঠক বুঝতেই পারছেন কবি জীবনবোধ আর প্রেমের জয়গান গেয়েছেন তাঁর চিত্রকল্প,অলঙ্কার আর ছন্দের অসাধারণ ব্যবহারে।তারফলে এই কাব্যগ্রন্থটি বাঙলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ । আমার ধারণা, এই গ্রন্থটি বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থদের অন্যতম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে ।
প্রকাশঃ কলকাতা বইমেলা,২০১৫
প্রকাশকঃ সিগনেট
দামঃ একশো টাকা

আপনার মতামত জানান