সপ্তমীর বার্তা

অংশু প্রতিম দে
১)
জগিং থেকে ফিরে খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে অবিনাশ বাগানে বেতের চেয়ারে গিয়ে বসলেন।
-“গুড মর্নিং কাকু” সুনয়না মোবাইলে কথা বলতে বলতে নিজের ঘরের জানালা থেকে হাত নাড়ল। মেয়েটা খুব সকালে উঠে পড়ে। অবিনাশের বাল্যবন্ধু অনিন্দ্যর মেয়ে। প্রেসিডেন্সীতে বাংলা অনার্সের ছাত্রী, সেকেন্ড ইয়ার।
আজ মহাসপ্তমী! পূজোর আমেজে সকালটা বেশ অন্যরকম হলেও অবিনাশের প্রাত্যহিক নিয়মাবলীর কোনো ব্যতিক্রম নেই। কঠোর নিয়মনিষ্ঠা, পরিশ্রম আর সময়মত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার জোরেই সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের অবিনাশ আজ কলকাতার নামকরা বিজনেস ম্যাগনেট। নিজের বোধবুদ্ধি অনুযায়ী নেওয়া সিদ্ধান্তে সবসময় অটল থেকেছেন অবিনাশ। তার সুফলও পেয়েছেন জীবনের নানা ক্ষেত্রে। কিন্তু ঋকের ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে জীবনে প্রথমবার হেরে গেলেন অবিনাশ!
অবিনাশ আর সুতপার একমাত্র সন্তান ঋক। ইনফরমেশন টেকনলজি নিয়ে পড়ছে, এবছরই ফাইনাল ইয়ার। ঋকের কলেজের বন্ধুদের গ্রুপটাকে ভালো লাগেনা অবিনাশের। পুনম নামের একটা অবাঙ্গালী মেয়েকে মাঝে মাঝেই বাড়িতে আসতে দেখেন! লম্বা, জিরো ফিগারসুলভ শুকনো চেহারা, গায়ের রঙ চাপা, মুখে একটা সবজান্তা ভাব। মিষ্টত্বর লেশ মাত্র নেই।
-“আপনাকে দেখে মনেই হয়না যে ঋক আপনার ছেলে! ইউ হ্যাভ মেইনটেন্ড ইয়োরসেলফ।“ প্রথম পরিচয়ের দিনই পুনম অবিনাশকে যেভাবে কথাটা বলেছিল, ওর ভালো লাগেনি। ঋক বলে, ওরা স্রেফ বন্ধু। অবিনাশের মনটা খচখচ করে। লক্ষ্মী প্রতিমার মত সুন্দরী মেয়েটাকে কেন যে ঋকের মনে ধরল না!

এক বছর আগে অনিন্দ্যর অনুরোধে সুনয়নাকে ওর দেশের বাড়ি থেকে এবাড়িতে এনে তুলেছিলেন অবিনাশ। যদিও বেশ প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাঁকে।
-”বন্ধুর কথাতে মেয়েটাকে একেবারে নিয়েই চলে এলে! আমার মতামত নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করলে না?” সুতপা বেশ অসন্তুষ্ট।
-“কলকাতায় আমার বাড়ী থাকতে অনিন্দ্যর মেয়ে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করবে! এটা আমি মেনে নিতে পারবো না, তপা।”
-“এই বয়সটাই ত সাংঘাতিক। কার না কার সাথে জড়িয়ে পড়বে, তার দায় আমাদের ওপর এসে পড়বে।” সুতপার এই আশঙ্কাকে আমল দেননি অবিনাশ।
বছর ঘুরতেই সুতপার মনোভাবও একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেছে। এখন মেয়েটাকে চোখে হারায়। কিন্তু ঋক সুনয়নার অস্তিত্বটা এখনও মেনে নিতে পারছে না। এই দুজন বছর দুয়েকের ছোট বড় বলে অবিনাশ ভেবেছিলেন, সুনয়নার সাথে ঋকের একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠবে। কোথায় কি! ঋক মাঝেমাঝেই সুনয়নার সাথে এমন ব্যবহার করে, যে মেয়েটা ঋকের সামনে কেমন যেন গুটিয়ে থাকে। এই ত কিছুদিন আগে বন্ধুদের সাথে পার্টির শেষে বেশ রাত করে বাড়ী ফিরেছিল ঋক। সবসময়ের লোক জগাইদা ঘুমিয়ে পড়েছিল। অনেকক্ষণ ধরে বেল বাজানোর পরে সুনয়না দরজা খুলে দিয়েছিল। দরজার অপরপ্রান্তে সুনয়নাকে দেখে ঋক ত ফায়ার!
-“একি! জগাইদা কই?” চড়া গলা ঋকের।
-“জগাইদা ঘুমিয়ে পড়েছে, খুব জ্বর বিকেল থেকেই।” নীচু অথচ স্পষ্ট স্বর সুনয়নার।
-“তুমি! জেগে আছো যে?” অপ্রকৃতস্থ ছিল বলেই হয়ত ঋকের গলার স্বর নামছিলই না সেদিন। আওয়াজে অবিনাশের ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল।
-“আমি পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করতে জেগেইছিলাম, তাই ভাবলাম দরজাটা......”
-“না। এত রাতে দরজা খুলতে তুমি কখনো আসবে না। বলে দিলাম।”

সুনয়নার প্রতি প্রচণ্ড অপত্য স্নেহবশে অবিনাশ ভেবেছিলেন, ঋকের সাথে বিয়ে দিয়ে মেয়েটাকে নিজের করে নেবেন। তবে ঋকের হাবভাব দেখে মনের ইচ্ছার সাথে সমঝোতা করে নিয়েছেন। তাই সুনয়না যখন জানালো যে ঋকদাকে ও রাখী পড়াবে, তখন অবিনাশ ওকে উৎসাহই দিয়েছিলেন। গোঁয়ার ছেলেটা আটিচুড না দেখিয়ে ভালোয় ভালোয় রাখী পড়েও নিয়েছিল।
দুজনের জন্যই গ্রীন-টি নিয়ে সুনয়না অবিনাশের পাশে বসল। স্নান সেরে তাঁতের শাড়ি পড়েছে। মেয়েটা বেশ পরিপাটি থাকে সবসময়! করিমপুরে ওদের গ্রামের পুজোর গল্প করছিল সুনয়না অবিনাশের সাথে। এমন সময় সুতপার হাঁকাহাঁকিতে সুনয়নাকে ভেতরে চলে যেতে হল।
এই যাহ! ফোনটা ফেলে গেছে মেয়েটা। এদিকে ওর ফোনে একটা কল এসেছে, ফোন বাজছে। তবে সুনয়নার কানে ফোনের আওয়াজ যাচ্ছেনা। মোবাইলের স্ক্রীনে অপরিচিত ছেলের নাম দেখে কৌতুহল হল অবিনাশের। ব্যাপারটা কি? সুতপার আশঙ্কাই কি সত্যি হল তাহলে! সুনয়না ডুবে ডুবে জল খাচ্ছে! সুনয়না মোবাইলে খুব কথা বলে আজকাল, অবিনাশ লক্ষ্য করেছেন সেটা। বিশেষ করে রাখীর পর থেকেই এই পরিবর্তনটা দেখছেন। কলেজের কাউকে মনে ধরেছে হয়ত! তাই ঋক কে দাদা বানিয়ে নিল। যাতে অদূর ভবিষ্যতে ঋকের তরফ থেকে কোনোরকম কনফিউশনের উদয় না হয়। বাহ, বেশ জটিল বুদ্ধি আছে ত মেয়েটার। সুনয়নার বুদ্ধির তারিফ করলেও ফোনের অপরপ্রান্তের ব্যক্তির ব্যাপারে কৌতুহল দমন করতে পারছেন না অবিনাশ। কিন্তু ফোনটা রিসিভ করতেও ওর এথিক্সে আটকাচ্ছে। তবে বন্ধুর মেয়ে মানে ত তাঁরই মেয়ে। কলকাতায় নিজ দায়িত্বে এনে রেখেছেন। তাই সুনয়নার ভালমন্দর ব্যাপারে অবিনাশের খোঁজখবর ত রাখাই উচিৎ। এইসব ভেবে দোনোমনো করতে করতে ফোনের রিসিভ বাটন প্রেস করেই দিলেন অবিনাশ। কিন্তু উনি হ্যালো বলার আগেই অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এল, -“কথাটা তখন শেষ হলনা সু। বাবার সামনে রাখী পরে নিলেও তোমার থেকে ভাইফোঁটা আমি কিছুতেই নিতে পারব না। সেরকম বুঝলে আমি ওইদিন তোমার সামনেই আসবো না” গলাটা যে খুব চেনা! কর্কশতার লেশমাত্র নেই, যেন মধু ঝরছে। সপ্তমীর সকালটা সত্যিই স্পেশাল হয়ে উঠলো অবিনাশের কাছে।

আপনার মতামত জানান