বিরাট কোহলির কভার ড্রাইভ

সরোজ দরবার
চোখের পলকে বল বাউন্ডারিতে। হতবাক বোলার। এমনিতে আজকাল আর ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে তেমন উত্তেজনা নেই। কিন্তু এশিয়া কাপের এক আপাত নিরীহ ম্যাচে যে এরকম ছবির মতো কভার ড্রাইভ দেখা যাবে কে জানত! এই না হলে বিরাট কোহলি! সাধে কি আর সৌরভ গাঙ্গুলি অবধি তাঁকে অলটাইম ক্লাস প্লেয়ার বলছে। এরকম কভার ড্রাইভ দেখে লাফিয়ে ওঠা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। তাই করল সায়ন। অনুষ্কা বড় পারফর্মার নাকি বিরাট, এরকম একটা বাজে তর্কেও রাতের পর রাত অনেকটা সময় নষ্ট করেছে সে। ‘এনএইচ টেন’ দেখে লিপি বলেছিল, দেখ পারফরম্যান্স কাকে বলে। এখন লিপিকে পালটা সে কথাটাই বলতে ইচ্ছে করছে। টুক করে লিপির নম্বরটা ডায়াল করল সে।
অটোয় ড্রাইভারের পাশে পারতপক্ষে বসে না লিপি। এদিন বাধ্য হয়েই বসেছিল। টের পাচ্ছিল ফোন বাজছে। ভাবল পরে দেখবেখ’ন। ‘ফির লে আয়া দিল’ একবার পুরো বেজে বন্ধ হয়ে ফের বাজতে শুরু করল। জরুরি কিছু তাহলে? সাঁপুইপাড়ার মুখে অটোটা সিগনালে দাঁড়াল। ফোনটা বের করতে যাবে, ব্যাগের সামনের চেনটা সবে খুলছে, অমনি বিশ্রি ব্যাপারটা ঘটল। একটা বাইককে কাটিয়ে ডানদিকে গাড়ি রাখতে যাচ্ছিল অটোওলা। এমনভাবে কনুইটা বাঁকাল, বিচ্ছিরিভাবে লিপির বুকে ঠেকে গেল।
অবশ্য শরীর শরীর কোনও বাতিক নেই লিপির। সায়নের সঙ্গে সে রাতও কাটিয়েছে। আর রাত না কাটেলেই বা কী! ভিক্টোরিয়ায় লুঠতরাজের সেই সন্ধে নামার আগের মুহূর্তগুলো তা উবে যাচ্ছে না। তাছাড়া অফিসে প্রজেক্ট ম্যানেজার সৌম্যদা যে কায়দা করে কাঁধে-পিঠে হাতটা কেন রাখে, তা কি আর জানে না সে। কিন্তু ওই ছুঁয়ে থাকায় উন্নতি লুকিয়ে। অতএব কত কী যে সয়ে যেতে হয়! আর এই ছুঁয়ে যাওয়াটা বিচ্ছিরিমার্কা। একেবারে বুকে। একটা গা ঘিনিঘিনে ব্যাপার। হয়ত নেহাতই কাকতালীয়। অটোওলা ছেলেটার বাজে কোনও ইনটেনশন ছিল না। সারাদিন কত মহিলা প্যাসেঞ্জারই তো এখানটায় বসে। এরকম করলে ড্রাইভারি করা লাটে উঠত নির্ঘাৎ।তবু টাইট টি-তে লিপিকে দেখে ছেলেটা ইচ্ছে করেই কি কনুইটা ওভাবে বাঁকাল? ওঠার আগে, যখন বাইপাস থেকে অটোর লাইনের দিকে আসছে সে, তখনও তো জুলজুল করে তাকিয়ে ছিল। কী দরকার ছিল ওর বাইককে কাটানোর? আর কাটালই যদি সাবধান হল না কেন? লিপি নিশ্চিত, ইচ্ছে করেই ছেলেটা এই কাজ করেছে। আর যতবার এই কথাটা মনে হচ্ছে ততোবার গা ঘিনঘিনিয়ে উঠছে। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই শহীদনগর এসে গেল। ঝনাৎ করে কয়েকটা খুচরো অটোওলার হাতে ছুঁড়ে দিল। ওর হাত থেকে আজ একটা টাকাও ফেরত নিতে বাধছে। হনহন করে উলটো দিকে হাঁটা দিয়ে লিপি শুনতে পেল, অটোওলা ডাকছে, ও দিদি...আপনার ফেরৎটা, ও দিদি...
২)
উইকএন্ড ছাড়া বিরিয়ানি তেমন খায় না লিপি। কিন্তু আজ কিনল। রেগে গেলে তার খুব খেতে ইচ্ছে করে। ওই যে ‘দিল ধড়কনে দো’তে শেফালি শাহ যেরকম চকোলেট কেক খাচ্ছিল, সেরকম। চকোলেটটা অবশ্য খায় না। এমনিই দিনভর বসে বসে ভুঁড়িটা বাড়ছে। টি-শার্ট যেন তেমন মানাচ্ছে না আর আজকাল। কিন্তু বিরিয়ানির লোভটাও সামলানো যায় না। সঙ্গে কোক। ভাড়মে যায়ে ফিগার কনসাসনেস। এখন তার দোতলার পিজির রুমটায় একা হয়ে এগুলো না গিলতে পারলে যেন শান্তি নেই।
বিছানায় খেতে দেখলে মা খুব বকাবকি করে। একবার পিজিতে এসে তার খাওয়ার ধরন দেখে সে কী চিৎকার- অ্যাঁ মাছ মাংস সব বিছানায়, ছ্যা ছ্যা ছ্যা... কেন নীচে বসে খাওয়া যায় না রে? একলা জীবনের এই তো সুখ কালীদা! এই যে বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে দেওয়া, এক চামচ চামচ করে বিরিয়ানি মুখে পোরা, আর ল্যাপটপ খুলে ফেসবুকে এর ওর সঙ্গে চ্যাট। এর মজাই আলাদা। মায়েদের দুনিয়া ছোঁয়াছুঁয়ি মেনে মেনেই গেল।
মাটনের একটুকরো মুখে পুরেই মেজাজটা নরম হয়ে গেল লিপির। কী তুলতুলে রে! একটু আগের রাগ রাগ ব্যাপারটা হাপিস। ল্যাপটপটা কোলে টেনে নিয়ে ফেসবুকে নিজের পুরনো একটা প্রোফাইল খুলল সে। সায়নের সঙ্গে প্রেম করার আগে এটা ওপেন করেছিল। এখন তো আর প্রায় খোলাই হয় না। মাঝেমধ্যে টুকটাক চেক করে। আগে এই প্রোফাইল থেকে কত চ্যাট করেছে। নিজের নামে অবশ্য নেই। প্রোফাইল নেম দেওয়া আছে ‘মেঘে ঢাকা তারা’। কত ছেলে যে ভিড় করত আলাপ জমাতে। এখন স্টেডি রিলেশনশিপে চলে যাওয়ার পর ওইসব মেসেজ দেখতে বেশ মজা লাগে লিপির। আজও দেখল একগাদা মেসেজ, নোটিফিকেশন জমে আছে। এখন আর এন্টারটেইন করে না ওসব। শুধু মাঝেমধ্যে খুলে দেখে। একবার ভেবেছিল প্রোফাইল ডিলিট করে দেবে। দেয়নি। আসলে সায়নের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগের জীবনের অনেকখানির সাক্ষী এই প্রোফাইলটা। ডিলিট করবে করবে করেও তাই আর করতে পারেনি। তবে ঠিক করে নিয়েছে, গায়ে পড়া পাবলিকের সঙ্গে একদম চ্যাট নয়।
সকালে এক কলিগ হলুদ পলাশ এনেছিল। ছবি তুলেছিল লিপি। মোবাইল থেকে ছবিটা ট্রান্সফার করে প্রোফাইল পিকটা পালটে দিল।
সত্যি, বিরিয়ানিটা আজ দারুণ করেছে। একটুও তেল চিপচিপে নয়। ঝরঝরে। মনে মনে না-দেখা শেফের তারিফ করছে লিপি, এমন সময় টং। ছবিতে লাইক এল। লিডে উঁকি দিয়ে দেখল, লাইকাল তুতুন চৌধুরী।
ভুরুটা একটু কোঁচকাল লিপির। মাসখানেক আগে এই প্রোফাইলে যখন অন হয়েছিল, তখন একমাত্র এই ছেলেটার সঙ্গেই কথা হয়েছিল। বেশ বকবকিয়া ছেলেটা। এমনিতে এদের পাত্তা দেবে না ঠিক করেছিল, আজ ইচ্ছে করল ছেলেটার সঙ্গে কথা বলতে। অটো থেকে নেমে সায়নকে ফোন করতে গিয়ে দেখেছিল সায়নেরই মিসড কল। সেই থেকে ওর উপর মাথাটা গরম। এদিকে অটোর ঘটনাটা কাউকে না বলেও যেন শান্তি নেই। ছেলেটা শুনে প্রথম দিকে ‘এ বাবা’, ‘ইসসস’ এইসব বলছিল, হঠাৎ বলে, তা তোমাকে ছুঁতে তো ইচ্ছে করতেই পারে... কার না এরম ইচ্ছে হয়!!
মটকা ফের গরম হয়ে গেল লিপির। টুক করে চ্যাট অফ করে দিল। এইজন্যেই এদের পাত্তা দিতে নেই। ছেলেটা তখনও মেসেজ করেছে, ছোঁয়ায় দোষ নেই...টং...কোথায় গেলে?...টং...আহা, ছোঁয়ার বুঝি ইচ্ছে হতে নেই...। প্রোফাইল লগ আউট করতে করতে লিপি গরগর করে বলল, ন্যাককাআ...।


৩)
প্রেমিকাকে ফোন করে এমন বাউন্সার, গুগলি পাবে ভাবেনি সায়ন। বাপরে বাপ মেজাজ নয় তো, যেন পাকিস্তানের পেস বোলিং। চার ওভারেই এমন আগুন ঝরাবে যে পুরো টি-টোয়েন্টি খতম। ভাল মুখে আজ বিরাট কোহলির কভার ড্রাইভের কথা বলতে গিয়েছিল, তা উত্তর এল, যাও বিরাট কোহলির সঙ্গে তাহলে কথা বল গিয়ে...আমার সঙ্গে কেন? বোঝো! মিনিট পাঁচেক কথা বলেই সায়ন বুঝল, আজ আর ইনিংসে টিকে থাকা যাবে না। অগত্যা ফোন রেখে দিল সে। মেসেজ করে জানিয়ে দিল- কাল সকালে অফিস যাওয়ার সময় দাঁড়িও, আমি আসব।
সায়নের ফোনটা রাখতে রাখতে লিপির মনে হল, এতটা রাগ না দেখালেও হত। বেচারা সায়ন! তখন ফোন করেছিল, হতচ্ছাড়া অটোওলার উপর রাগ করে কলব্যাক করা হল না। এখন আবার সাধ করে বিরাট কোহলির কোথা বলতে এসেছিল, মানে নির্ঘাৎ সেই বিরুষ্কার ঝগড়া, তাতেও কেস খেল। আজ অবশ্য খেলা ছিল। কী রেজাল্ট হল কে জানে! ভাবতে ভাবতে ফেসবুকে নিজের প্রোফাইলটা অন করল সে। হ্যাঁ ইন্ডিয়া জিতেছে। ওহ বিরাট কোহলিই ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছে।এটাই তাহলে বলতে চেয়েছিল সায়ন! ইসস অনুষ্কাটা যে কেন ভালো ভালো সিনেমা করছে না! এক ‘এনএইচ টেন’ দিয়ে আর কদ্দিন সায়নের সঙ্গে তর্ক চালাবে সে? এর মধ্যেই আবার অফিসের পিঙ্কি পিং করল। সদ্য প্রেমে পড়েছে। রসিয়ে রসিয়ে নিজের প্রেমের কাহিনি খানিক শোনাল। এই এক জ্বালা! এত ঢাক পিটিয়ে প্রেম করার কী আছে রে বাবা! যুগে যুগে মানুষ প্রেম করে আসছে। ‘হুম হুম’ করে খানকতক রিপ্লাই দিয়ে লিপি বলল, চল গুডনাইট রে, ঘুম পাচ্ছে।
সত্যিই ঘুম পাচ্ছিল। লগআউট করে ল্যাপটপ বন্ধ করতে গিয়ে একবার তুতুন চৌধুরীর কোথা মনে হল। ছেলেটা কী আর কিছু বলল? ফট করে প্রোফাইলটা অন করল। হ্যাঁ যা ভেবেছে তাই। তুতুনের গোটা পাঁচেক মেসেজ। কী সব লিখেছে ছেলেটা, ছোঁয়াটা শরীরের নয়...মনের...আসলে মনই তো ছুঁতে চায়, শরীর তার মাধ্যম... যেমন...
চোখ বড়বড় করে তুতুনের মেসেজগুলো পড়ে ফেলল লিপি।
৪)
সাড়ে নটা নাগাদ লিপি অফিসের জন্য বেরোয়। একটু আগেভাগেই চলে এসেছিল সায়ন। একটা সিগারেট শেষ হয় হয়, দেখল লিপি আসছে। দুটো কথা বলেই বুঝল নাহ রাগ এখনো পড়েনি। মুখ ভার।

-কী হয়েছে, কাল থেকে এমন বাজে ব্যবহার করছ কেন?
-মনমেজাজ ভাল নেই। খুব বিরক্ত লাগছে।
- আরে হয়েছেটা কী বলবে তো?
- একটা অটোওলা কাল এমন বিশ্রীভাবে কনুই দিয়ে...ইয়ে
-কী করেছে শুয়োরের বাচ্চা?
লিপি চোখের ইশারায় দেখিয়ে বোঝাল। বলল, তখন থেকে গা ঘিনঘিন করছে। অদেখা অটোওলাকে গালিগালাজ করতে করতে সায়ন বলল, শালা ছোটলোকের জাত...
লিপি ঘাড় কাত করে বলল, ছোটলোক বলছ?
-না তো কী? কোনও ভদ্রলোকে এরম কাজ করে?
- তাই তো? তবে মেয়ে দেখলে ছুঁতে চাওয়া কী আর এমন অভদ্র কাজ বলো?
-মানে? যাকে দেখবে তাকেই ছুঁতে চাইবে? ইতরামি পেয়েছে?
- না দেখলেও তো ছুঁতে ইচ্ছে করে। মানে মনটাই তো আসল, তাই না? শরীরটা তো স্রেফ মাধ্যম। বিরাটের ব্যাটে যে বলের ছোঁয়া...সেটাই তো সব নয়, আসল তো স্কিল আর বাউন্ডারিটা...ঠিক কি না বলো?
ততোক্ষণে প্রায় ভূত দেখার মতো চমকে গেছে সায়ন। ওই ফেক প্রোফাইলটা লিপির!
‘সন্দেহ করেছিলাম। তুতুন নামে তো কেউ তোমায় ডাকে না। এক তোমার ছোটমাসি ছাড়া। তাও তুমি আমাকে তো আর বলোনি, কাকিমার থেকে একদিন শুনেছিলাম। সে আর তুমি জানবে কোত্থেকে। ডাকনাম খাটিয়ে কী সুন্দর ধর্মেও আছ, জিরাফেও আছ, তাই না?,’ একদলা ব্যঙ্গ ছেটাতে ছেটাতে বলল লিপি।
কোনওরকমে ম্যানেজ করতে চেয়ে সায়ন উত্তর দিল, তুমি মানে কী বলছ...আমি তো...
ঝাঁঝিয়ে উঠে লিপি বলল, বেশ বুঝতে পারছ। দেখ, ফেক প্রোফাইল থাকা ইজ নট আ ইসু। আমারও আছে। তোমারও থাকতে পারে। বাট আফটার বিয়িং ইন আ রিলেশনশিপ, এতকিছুর পর, এখনও অন্য মেয়েকে ছুঁতে চাইবে তুমি? এই সম্পর্কের অনেস্টি? তোমার সঙ্গে ওই অটোওলার কোনও তফাৎ তো করতে পারছি না...সরি...
ধরা পড়ে গিয়েছে সায়ন। একেবারে যাকে বলে রঙ্গে হাত পাকড়াও। তবু মরিয়া হয়ে আমতা আমতা করে বলল, ওটা যে মানে...ইয়ে আমারই প্রোফাইল...তার কোনও...
তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে লিপি বলল, প্রমাণ চাইছ? বিরাট কোহলির কভার ড্রাইভ যা করার করে দিয়েছে সায়ন। বাউন্ডারি হয়ে গিয়েছে। এখন আর হাতকামড়ে কী লাভ?
বিরাট কোহলি! ইসস ওই কভার ড্রাইভটা যেন কাল চোখের সামনে ভাসছিল। কে যেন বলেছিল, হোয়াট আ স্মুদ টাচ। ছোঁয়া নিয়ে বলতে গিয়ে বেটার কিছু আর পায়নি। কেস যা খাওয়ার খেয়ে গিয়েছে। তবু পালটা খেলে বলল, তুমিও তো ফেক প্রোফাইল থেকে কাউকে এরকম কথা বলতে পার? আমি কি জানতে গিয়েছি? না গোয়েন্দাগিরি করেছি? এটা যাস্ট তুমি জেনে গেছ বলে সিন ক্রিয়েট করছ...
দাঁতে দাঁত চেপে লিপি বলল, বলতে পারতাম, হাজারবার পারতাম। কিন্তু শোনো, নিজে তো জানি বলিনি, তাই তোমার উপর যাস্ট ঘেন্না হচ্ছে। এনিওয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। এই রিলেশনশিপ আমি আর ক্যারি করতে চাই না।
একটা ‘৪৭বি’ আসছিল, সায়নকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে, হাত দেখিয়ে টুক করে উঠে পড়ল লিপি।
৫)
রাত প্রায় পৌনে দশটা। শেষ ট্রিপের জন্য প্যাসেঞ্জার ডাকতে গিয়ে অটোওলা দেখল সেই মেয়েটা আসছে। মেরেছে, কাল যা বিশ্রি ব্যাপার হল! এরকম টাইট মেয়ে দেখলে কার না ভাল লাগে? আর এই বাড়ি ফেরার সময় পাশে কোনও মেয়ে বসা মানে তো লাগ লটারি। আর যাই হোক বেলাশেষে ঘামগন্ধ ব্যাটাছেলেকে যেন কিছুতেই পাশে সহ্য হয় না। কালও বসেছিল মেয়েটা। বাইকটাকে কাটাতে গিয়ে হাতটা যেন নিজের অজান্তেই একটু বেশি বেঁকে গিয়েছিল। শালা মনটা হারামি হলে, হাতের আর কী দোষ! কী যে ভাবল মেয়েটা কে জানে! পয়সাও ফেরত নেয়নি কাল। ভাবতে ভাবতেই ওর সামনে চলে এল মেয়েটা। অটোওলা সিওর, ও মেয়ে তার অটোতে উঠবে না। কিন্তু কী আশ্চর্য, মেয়েটা এসে বলল, যাবে তো? ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল অটোওলা। মেয়েটা একবার পিছু ফিরে তাকাল। একটা সিট এখনও ফাঁকা, তবু বসল ঠিক ড্রাইভারের পাশের সিটেই। তাও ঘুরে কাত হয়ে নয়, বরং একটু ভিতরে চেপেই। এ কী আজকে কেস খাওয়াবে ঠিক করেছে? কোনওভাবে গায়ে হাত লেগে গেলে চিল্লিয়ে প্রেস্টিজের গ্যামাক্সিন করে দেবে? ভয়ে অটোওলাই ডানদিকে একটু সরে গেল। আর মেয়েটা তক্ষুণি বলল, চালাতে অসুবিধে হবে? তারপর তার দিকে তাকিয়ে হাসল মিষ্টি করে।
টুনি আলো লাগানো রাস্তা ধরে বাইপাসকে পিছু ফেলে এগোচ্ছে অটো। সেই আলোছায়ার ভিতর অটোওলাকে ভীষণই এক পুরুষ মনে হল লিপির। বদমাইশি যদি কাল ছেলেটা করেও থাকে, লুকিয়ে করেনি। লুকিয়ে নোংরামি করেও তো কেউ কেউ আবার প্রমাণ চায়...উফফ...গোপনে অন্য মেয়েকে ছুঁতে চাইবে, আর প্রেমিকার সামনে ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে থাকবে, এরকম ডাবল স্ট্যান্ডার্ড অন্তত নয় এই ছেলেটা। আজ তো ওর দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছিল না। ভুল যদি করেও, মানুষের এটুকু ভুলস্বীকারের ক্ষমতা থাকবে না! সায়নের উপর রাগটা ফের চিড়িক মেরে উঠল লিপির মাথায়।
‘এই পার্টি অফিসের সামনে দাঁড়াতে বললাম যে, বাঁধো বাঁধো’, পিছন থেকে এক বয়স্ক ভদ্রলোকের কথা শুনে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল অটোটা। আর তার মধ্যে, ওই তীব্র ঘ্যাঁচ আওয়াজ সত্ত্বেও, লিপি স্পষ্ট শুনল, কে যেন বলল- সরি।
অটোওলা? নাকি সে নিজেই মনে মনে বলে ফেলল? ঠাহর করতে পারল না লিপি। একটা ‘সরি’ শুধু ততোক্ষণে হাওয়ায় উড়তে উড়তে পেরিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছুর সীমানা, বিরাটা কোহলির কভার ড্রাইভে অভিমুখ ঘুরে যাওয়া লাল বলটার মতোই।

আপনার মতামত জানান