এক পশলা বৃষ্টি

সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়


খোয়াইয়ের হাটে দেখা হয়ে গেল শিঞ্জিনীদির সঙ্গে। দূর থেকে দেখছিল রীতায়ন, এক সুন্দরী মহিলা লক্ষ্মণ বাউলের সামনে বসে গান শুনছে, মনে হচ্ছিল শিঞ্জিনীদি, সিওর হতে পারছিল না। কাছে যেতেই বুঝলো, হ্যাঁ, শিঞ্জিনী চ্যাটার্জীই বটে। ‘আরে শিঞ্জিনীদি, কেমন আছো? চিনতে পারছো, নাকি নাম বলতে হবে?!’ – বলে উঠল রীতায়ন। শিঞ্জিনী প্রথমে চোখ বড় বড় করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠলো – ‘আরে! রীতায়ন! উফফফ, কঅঅঅতদিন পর! আই কাণ্ট বিলিভ দিস! কেমন আছিস? কোথায় আছিস?!’ শিঞ্জিনী আর রীতায়ন এক পাড়ায় থাকতো বছর বারো আগে, তারপর যেমন হয়, পাড়াগুলো মাল্টি-স্টোরিড হয়ে যায়, বিদেশ চলে যায় লোকে, সম্পর্কের দলিল হারায়, তেমনটাই ঘটেছিল এ ক্ষেত্রে। খোয়াইয়ের হাটের মাথায় ঘন, কালো বর্ষার মেঘ, মনে হয় বৃষ্টি নেমে যাবে এক্ষুনি। রীতায়ন বললো – ‘তুমি ঠিক আগের মতই আছো, শিঞ্জিনীদি, সেরকমই...’ শিঞ্জিণী বললো ‘কী রকম, শুনি...’ রীতায়ন হেসে বললো ‘বিয়ে-ফিয়ে করেছো? বর কী করে?’ শিঞ্জিনী একটা মার্লবোরো লাইট্‌স ধরিয়ে বললো ‘করেছিলাম। টেকেনি। তোর কথা বল। সেই যে আমরা কলকাতা ছেড়ে ব্যাঙ্গালোর চলে গেলাম, তারপর আমি আমেরিকায় পিএইচডি করে আবার ফিরেও এলাম, এর মাঝখানে তোর কী কী ঘটলো... তুই বিয়ে করেছিস?’ রীতায়ন দেখছিল, শিঞ্জিনীর নাকছাবির ফুটো দিয়ে এক বিন্দু ঘাম গড়িয়ে পড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল... একটু অন্যমনস্ক হয়ে বললো – ‘নাহহ, বিয়ে করিনি, আর করবোওনা হয়ত... বম্বেতে একটা পার্সি মেয়ের সঙ্গে লিভ-ইন করতাম, সেটা কেটে গেছে। আর আজকে তোমাকে দেখার পর তো বিয়ে আরোই করা হবে না বোধ হয়!’ শিঞ্জিনী নকল রাগের ভঙ্গিমা করলো – ‘এক মারবো! ভুলে যাসনা, তুই আমার থেকে চার বছরের ছোট! দিদিদের সঙ্গে ফ্লার্ট করার হ্যাবিটটা গেল না... তাই না?!’ ‘কেন যে দিদি বলে ফেলেছিলাম ছোটবেলায়! আচ্ছা এসব কাটাও। আজকে সন্ধ্যায় কি করছো? আমি উঠেছি আমাদের পূর্ব্বপল্লীর বাড়িতে, চলে এসো, একটা গানের প্রোগ্রামের আয়োজন করেছি, ভালো লাগবে। একটা রাশিয়ান ভদকা আছে, খাওয়াবো’ – এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে রীতায়ন শিঞ্জিনীর চোখে চোখ রাখলো। শিঞ্জিনী বললো – ‘আমি আর মা আমার মামার বাড়িতে উঠেছি পিয়ার্সন পল্লীতে। খুব একটা প্ল্যান নেই, যেতেই পারি তোর সঙ্গে কিছুক্ষণের জন্যে। তবে গেলে তোর সঙ্গেই যাব, একা যেতে পারবো না, আর ফেরার সময় আমাকে ড্রপ করে দিতে হবে।’ রীতায়ন বললো ‘গ্রেট! চল তবে এগোই, বৃষ্টি আসছে... গাড়ি আছে, চল...’ ‘গাড়ি-ফাড়ি না... ড্রাইভার থাকলে, তাকে চলে যেতে বল। রিকশায় যাব, কতদিন রিকশা চড়িনা’ – শিঞ্জিনী কথা শেষ করতেই, বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল, লোকজন এদিক ওদিক দৌড়তে শুরু করলো... রীতায়ন বললো ‘ছাতা নেই... চল শিঞ্জিনীদি ওই রিকশাটা ধরি... চলে এসো, ড্রাইভারকে ফোন করে ছেড়ে দিচ্ছি...’ শিঞ্জিনী কিছুক্ষণ চোখ বুজে, দু হাত দুদিকে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলো বৃষ্টির নিচে... ‘অত তাড়াহুড়ো করিস না রীতায়ন... এক পশলা বৃষ্টির জন্যেই তো...’ – কথা অসম্পূর্ণ রেখে শিঞ্জীনী রীতায়নের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো ‘ব্যর্থ প্রেমিকদের মত দাড়ি রেখেছিস কেন? তবে কাটিসনা ভালো লাগছে... চল, কোথায় নিয়ে যাবি চল...’ রিকশায় উঠে রীতায়ন হাত বাড়িয়ে দিল, শিঞ্জিনী উঠে এল।

ভেজা, রাঙা ধূলোপথ বেয়ে রিকশা এগিয়ে চললো পূর্ব্বপল্লীর দিকে। এক পশলা বৃষ্টির পরে ঠাণ্ডা হাওয়া দিলো। সেই হাওয়া কলকাতা অবধি গেল বোধহয়। বা গেল না। তবু বৃষ্টিদাগ মুছে ফেলা গেলনা কখনও।

আপনার মতামত জানান