আপনি তুমি রইলে দূরে

কেয়া মুখোপাধ্যায়
তখন কলকাতার শীত ছিল অন্যরকম। জমাট বাঁধা ভৈরবীর সুর একটু একটু করে পেঁজা তুলোর মতো মিশে যেত ভোরবেলার হাওয়ায়। ভোরের হিমের সঙ্গে ঘাসে মাখামাখি হয়ে থাকত টপ্পার দানা দানা সুর।
দাদা অনেকটা বড়। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখে। তাই সেসব রাতভোর সুরের আসরে তার অবাধ যাতায়াত। ছোট বলে আমার যাওয়ার প্রশ্নই নেই। আমি শুধু সকালবেলা রঙিন লিফ্লেটের ভাঁজ খুলে লম্বা করে নিয়ে ছবি দেখি। পড়তে থাকি শিল্পীদের কথা। দাদার কাছে কখনো শুনি ওস্তাদের খামখেয়ালিপনা। কখনো শ্রোতাদের উচ্ছ্বাস। আর কখনো হিসেবভাঙা গানের তুবড়ি।
তখন রোববারগুলোও ছিল অন্যদিনের থেকে একদম আলাদা। সুন্দর একটা লেসের কভারে ঢাকা থাকত দাদুর আমলের বিরাট বাক্সের মত রেডিওটা। বাইরেটায় বাদামী রঙ, ভেতরটা ক্রীম রঙা। লেসের ঢাকা সরিয়ে, নব ঘুরিয়ে রেডিও চালিয়ে স্টেশন ধরা হত রোববার সকালে। রেডিও চালু হলে ভেতরে জ্বলে উঠত একটা হালকা আলো আর ঠিক স্টেশনটা ধরতে পারলে, সেইখানটায় তিরতির করে নড়ত মেগাহার্ৎজ দেখানোর লাল কাঁটাটা। কাকুর সঙ্গে রেডিওর সামনে বসে পড়তাম আমি। কাকুর হাতে গীতবিতান। সঙ্গীত শিক্ষার আসরে গলা মেলতাম কাকুর সঙ্গে। ওদিকে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত ফুলকো লুচির গন্ধ।
সঙ্গীত শিক্ষার আসর শেষ হতে না হতেই দাদার রেওয়াজ শুরু। কখনও একা আবার কখনও এক বন্ধুর সঙ্গে মিলে। শেষ হবার পরও থেকে যেত সুরের রেশ। লং প্লেয়িং রেকর্ড থেকে ভেসে আসত উস্তাদ বড়ে গোলাম আলি, উস্তাদ আমীর খাঁ, উস্তাদ আবদুল করিম খাঁ সায়েবের অমৃত কন্ঠ। না বুঝেই নাড়াচাড়া করি রেকর্ড। সুরে সুরে ভরে উঠতে থাকে ঘর। সে গানে, সে সুরে মিশে থাকে ভালবাসা।
আশ্চর্য এক একটা ভালবাসার ফুঁ। সেই ফুঁ দিয়েই বিয়ের মণ্ডপ কি শোভাযাত্রা থেকে অলৌকিক স্তরে সানাইকে নিয়ে যাওয়া বিসমিল্লা খাঁ সায়েব। কাজরি, পূর্বী চৈতি থেকে যোগিয়া হয়ে ভৈরবীর সুরে আলো ফোটে খাঁ সায়েবের সানাইতে। হাত থেকে তানের ফুলঝুরি ঝরান বিলায়েৎ খাঁ, রবিশঙ্কর, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়। আলি আকবর খাঁ, আমজাদ আলি খাঁ। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি। ঘর জুড়ে ভেসে বেড়ায় রাগ-রাগিণী। ওইসময়ই পরিচয় ওয়ার্ল্ড মিউজিকের সঙ্গেও। ছুটির দিনে ঘর জুড়ে ছড়িয়ে পড়তো বাখের ব্রান্ডেনবার্গ আর গোল্ডবার্গ, মোৎসার্টের সিম্ফোনী ফর্টি কি পিয়ানো কনসার্টো ২১, অথবা ভিভাল্ডির ফোর সীজনস্।
সুরে সুরে সেই তো প্রেম ও বিরহ, বসন্ত সমাগমের আনন্দ-উল্লাস, কিংবা বর্ষার অম্লমধুর প্রতীক্ষার ক্রমশ ব্যথায় পরিণত হওয়া। নতুন নয়। সবই চিরকালীন। শাশ্বত। তবু অনেক শব্দ লিখেও বোঝানো যাবে না কোন সুর ঠিক কখন, কেন মনে দোলা লাগিয়ে যায়। কখনো ভালোলাগা হয়ে, কখনো প্রেম, আবার কখনো আগুন হয়ে থেকে যায় সঙ্গে।

অনেক বছর পরে আর এক সুরের রাজ্যের দরজা খুলেছিল আমার সামনে। আকাশবাণী। কলেজে পড়ার সময়। সে এক আশ্চর্য দুনিয়া।
রেকর্ড আর্কাইভের বিশাল ঘর। থরে থরে সাজানো সুর। বেজে ওঠার অপেক্ষা শুধু। এফ এম-এ প্রথম অনুষ্ঠানের আগে গান খুঁজতে গেছি। দরজা দিয়েই ঢুকতেই বড় টেবিলের ওপারে খুব গম্ভীর একজন। ‘দেশ’-এর পাতা উল্টোচ্ছিলেন। এক বার তাকিয়ে আবার ডুবে গেলেন বইয়ের পাতায়। জেগে রইল প্রশ্নটাঃ
‘নতুন? এবারের অডিশন?’
‘হ্যাঁ’
‘কবে অনুষ্ঠান?’
‘শুক্রবার রাতে’।
‘আচ্ছা, শুনব আমি। সিনিয়ররা আছে। কিছু জানার থাকলে জিজ্ঞেস করে নিও। কেউ খুঁজে দিতে বলতে না পারলে আমি আছি’।
পাশ থেকে একজন বলে দিলেন, ‘উনি জলিদি। আর্কাইভ এর দায়িত্বে আছেন’।

অনেকটা সময় লেগে গেল। সব গুছিয়ে রেকর্ড আর সিডির লিস্ট করে জলিদির টেবিলে।
লিস্ট দেখে তাকালেন একবার আমার দিকে। টেনে নিলেন রেকর্ডগুলো। দ্রুত হাতে দেখতে দেখতে একটা রেকর্ড বের করে নিয়ে সরিয়ে রাখলেন।
‘এটা তুলে দিও দীপক’।
আমার গলা দিয়ে আর্তস্বর বেরিয়ে এল প্রায়।
‘আমার লাগবে ওই রেকর্ডটা! বিলায়েৎ খাঁ সায়েবের দরবারী’।
‘অন্য কিছু নিয়ে নাও’। হাত তুলে দেখালেন, ‘ওদিকে ওপরে রবিশঙ্কর, ডানদিকে নীচের তাকে নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়’।
\'কিন্তু আমার আমার বিলায়েৎ খাঁর ওই দরবারীটাই লাগবে তো…\'
‘আকাশবাণীর নিয়ম। বিলায়েৎ খাঁ বাজবে না’।
সিনিয়র সিদ্ধার্থদা এসে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে। আমাকে অবাক করে বলল,
‘বিলায়েৎ খাঁ ব্যানড্। আকাশবাণীতে বাজবে না। নতুন তো - তাই জানো না। এগুলো মনে রেখো’।
না, আর কারো দরবারীর রেকর্ড তুলতে পারিনি সেদিন। নতুন তখনো। চেনা-জানা শুরু সবে। সিদ্ধার্থদাকেই ধরলাম দোতলায়।
‘কেন ব্যানড্ বিলায়েৎ খাঁ? এ কী অদ্ভুত নিয়ম?’
‘দিল্লির সার্কুলার গিয়েছিল সব স্টেশনে। সে অনেক বছর আগে। বিলায়েৎ খাঁ বাজানো বারণ আকাশবাণীতে’।
কিন্তু কেন? কেউই ঠিক করে বলে না কিছু। মনের মধ্যে খচখচ্ করে। এমন বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর সুর বাজানো বারণ! এরকমও হতে পারে!

ক’দিন পরে আকাশবাণীর সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। দোতলায় বিশ্বনাথদার সঙ্গে দেখা। সুরের মানুষ। সারাক্ষণ গুনগুন করেন। হৈমন্তী শুক্লার সেই গানটা, ‘এখন সারেঙ্গীটা বাজছে’, ওঁরই লেখা। মিউজিক সেকশন থেকে ড্রামা-তে বদলি হয়েছে কদিন আগে বিশ্বনাথদা। তাই মন ভাল নেই। কিন্তু গানের গল্প শুনতে চাইলে ওঁর জুড়ি মেলা ভার। উঁকি দিলাম ঘরে। এ কথা, ও কথার পর বলেই ফেললাম,
‘বিলায়েৎ খাঁর রেকর্ড বাজাতে পারব না? কেন এই নিয়ম? কেন ব্যানড্! খারাপ লাগে না আপনাদের?’
‘কী বাজাতে চাইছিলে’?
‘দরবারী’।
‘কোন রেকর্ডটা বল তো? শঙ্কর ঘোষের তবলা’?
‘হ্যাঁ- ওটাই’।
‘আহা! দরবারীর সেরার সেরা বাজনা। ওরকম আর হয়নি। হবেও না। একবার কী হয়েছে জান, কোনও এক বিরাট আসরে বিলায়েৎ খাঁ জলদ দ্রুত লয়ে বাজাচ্ছেন। আহা, কী তান ঝরে পড়ছে! একটি তান ওপরের গান্ধারে পেঁছেছে, এমন সময়ে সেতারের ঝুঁটি গেল ঢিলে হয়ে। বিলায়েতের তান কিন্তু ষড়জে ফিরল ওই স্পিডেই। না- একটি পরদাও বেসুরো হল না। যাঁরা সেতার বাজান তাঁরাই বুঝবেন এ কী অবিশ্বাস্য কীর্তি। যন্ত্রের ওপর কতখানি অসাধারণ কন্ট্রোল থাকলে এ ঘটনা সম্ভব। কুমারপ্রসাদবাবু বলতেন, সেতার যেন বিলায়েৎ খাঁ-র হাতে বাদ্যযন্ত্র নয়, ওঁর শরীরেরই একটি অংশবিশেষ’।
‘এমন শিল্পীকে কেন ব্যান করে দিল আকাশবাণী? এও কি সম্ভব!’
‘কতরকম কথা যে এ নিয়ে। তার কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল- কে জানে! বিলায়েত খাঁ-ও তো মেজাজী মানুষ। আজ অবধি কোনও সম্মাননা, কোনও পুরস্কার নেননি সরকারের কাছ থেকে। ফিরিয়ে দিয়েছেন সব। আর মিডিয়া তো চিরকাল রবিশঙ্কর আর বিলায়েতের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝিই বাড়িয়ে গেল!’
‘এখানেও তাই’?
‘একবার আকাশবাণীর সঙ্গীত সম্মেলনে বাজানোর অনুরোধ গেল বিলায়েৎ খাঁর কাছে। তার ঠিক আগেই খবরের কাগজে দুজনের বিরোধিতা নিয়ে কীসব লেখা বেরিয়েছে। খাঁ সায়েবের মেজাজ ভাল নেই। সোজা বলে দিলেন, বাজাবেন না’।
‘সেইজন্যেই তাহলে...’?
‘না না। সেখানেই শেষ নয়। তখন তো আর প্রসার ভারতী হয়নি। দিল্লিরই তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তরের কর্তারা গেছিলেন। উপরোধ অনুরোধ চলতে লাগল। বিলায়েৎ খাঁ-ও বিরক্ত। শেষে বললেন, আচ্ছা বাজাব। কিন্তু রবিশঙ্করের থেকে আমাকে ১ টাকা সাম্মানিক বেশি দিতে হবে। কর্তারা বললেন, সে কী করে হবে! আপনাদের দুজনের তো একই গ্রেড। একই অঙ্কের সাম্মানিক, খাঁ সায়েব বললেন, “ও সব আকাশবাণীর গ্রেড ট্রেড আমি মানি না। ১ টাকা বেশি দিলে বাজাব। নয়তো বাজাবো না। আপনাদের প্রতিষ্ঠান না থাকলেও বিলায়েতের বাজনা থেকে যাবে”।
খুব জেদী লোক তো...! কর্তারা ফিরে এসে বললেন, আকাশবাণীর মত প্রতিষ্ঠানকে অপমান করেছেন বিলায়েৎ খাঁ। ব্যস। সার্কুলার এল কিছুদিন পর – বিলায়েতের বাজনা বন্ধ’।
এসব কথা শুনেছিলাম ২০০০-এ। আর গল্প কি একটা দুটো? গানের গল্প, সুরের গল্প শুরু হলে থামতেই চায় না!
সময়ের একটা সুগন্ধ থাকে। ভারতীয় সঙ্গীতের সেই আশ্চর্য সময়ের সুগন্ধ ঘিরে রেখেছিল সুরের দুই জাদুকরকে। আবার দুই অসামান্য প্রতিভা একই সময়ে সুরের রাজ্যে থাকলে, তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, বিতর্ক বোধহয় অনিবার্য। পণ্ডিত রবিশঙ্কর আর উস্তাদ বিলায়েতের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। নানা বিতর্ক। সেতার নিয়েও নানা গল্প।
এই দু’জনের সুর লাগানোর যেমন ফারাক, তেমনি যন্ত্রের পছন্দও ছিল আলাদা। রবিশঙ্করের সেতার ফুলপাতার মোটিফে সাজানো। সাতটা মূল তার। খরজ-পঞ্চম এবং খরজের ‘সা’ থাকবেই। আর ১৩ টা তরফ। ওপরে থাকত ছোট তুম্বা। আর বিলায়েতের পছন্দ সাজ-বিহীন, ছোট তুম্বাবিহীন, ন্যাড়ামাথা সাদামাটা চেহারার সেতার। বাদ্যযন্ত্র-নির্মাতা ের সাহায্য নিয়ে সেতারের গঠনকে, বিশেষত তবলী আর তারগহনকে বেশ সুদৃঢ় করে তুলেছিলেন বিলায়েৎ খাঁ। যাতে উচ্চ-স্বর পর্যন্ত মীড় দিতে গেলে তারের টানে অন্যান্য তারগুলি না সুর হারিয়ে ফেলে। বাজনার ফাঁকে আবার নতুন করে যাতে তাদের বাঁধতে না হয়। তাঁর সেতারের মূল তার ছ’টা। তরফ ১২টা। বিলায়েত খাঁ চাইতেন গান্ধার-পঞ্চম। সেতারের অন্যান্য কিছু তারকে এমন ভাবে বাঁধেন, যাতে রাগের ফাঁকে ফাঁকে সেগুলো বাজিয়ে ভরাট করা যায় - তানপুরার সহযোগিতা ছাড়াই বাজানো যায়। এভাবে সেতারের দুনিয়ায়ও কবে যেন এরকমই দুটো ধরণে ভাগ হয়ে গেছে। কেউ নিয়েছেন রবিশঙ্করের স্টাইল আর কেউ বা বিলায়েতের স্টাইল।
এ তো গেল বাজনার স্টাইল। বিলায়েৎ খাঁর নিজের স্টাইল-ই বা কম কী? ময়মনসিংহের গৌরীপুরের সেতার ও সুরবাহার বাদক এনায়েৎ খান আর বশিরন বেগমের ছেলেটি মানুষ হিসেবেও ছিলেন অতি শৌখীন, স্টাইলিশ। মনের রঙটা মিশিয়ে দিতেন জীবনের রঙে। আদবকায়দাও রঙিন। দামী গাড়ি, পোশাক থেকে দুষ্প্রাপ্য অ্যান্টিক সংগ্রহ – সবেতেই খরচ করতেন দরাজ হাতে। রোজ সন্ধেবেলায় থ্রি-পিস স্যুট, মুখে পাইপ। সঙ্গে এক টিন ৫৫৫ ব্র্যান্ডের সিগারেটও থাকত। পালা করে চলত পাইপ আর সিগারেট। ঘোড়ায় চড়তে ভালোবাসতেন খুব। পুল খেলা, সাঁতার, বলরুম ডান্স থেকে রান্না করে মানুষকে খাওয়াতে - সবকিছুতেই দারুণ উত্সাহ। প্রতি সন্ধেতে গ্র্যান্ড হোটেলের নাইট ক্লাব। অসাধারণ বলরুম ডান্সার ছিলেন বিলায়েৎ খাঁ। একবার বেলজিয়ামে কী এক নাচের প্রতিযোগিতায় পেয়েছিলেন প্রথম পুরস্কার। আর ছিল গাড়ি চালানো। এক বার তো আফগানিস্তানের রাজা ওঁকে একটা মার্সিডিজ উপহার দিয়েছিলেন। সেটা ওঁর এতই পছন্দ ছিল যে নিজে চালিয়ে মুম্বই থেকে দিল্লি গিয়েছিলেন একটা প্রোগ্রাম করতে। ফুল ফুটুক,না ফুটুক মনে সতত বসন্ত!

কত যে এরকম টুকরো টুকরো গল্প! ফুরোতেই চায় না! আবার এই রঙিন মনের মানুষটাই সেতার নিয়ে বসলে একেবারে অন্যরকম। বড় বড় আসরে সন্ধ্যা থেকে ভোর অবধি তাঁর সুরের মূর্ছনায় সমর্পিত হাজার হাজার সুররসিক। স্টেজে সৃষ্টি হয় একের পর এক অগুনতি হীরের আলো ছড়ানো মুহূর্ত। শুদ্ধ সুরের অলৌকিক অবগাহনে ভেসে যাওয়ার সেই সময়টায় সেতারের তারে তিনি যেন সৌন্দর্যের কারুবাসনা।
আরও ক’বছর পেরিয়ে গেছে। বিলায়েতের বাজনা ছাড়া আর সব সুর বেজেছে আকাশবাণীতে। এফ এমে নানা অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংযোজন হয়েছে সাধারণের কাছে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার চেষ্টায় ‘বিজ্ঞান রসিকের দরবারে’। স্টেশন ডিরেকটর অমিতদা, বিজ্ঞান বিভাগের স্বপ্নময়দা আর মানসদার অসামান্য ভূমিকা ছিল তাতে। মানসদা আর আমি শুরু থেকেই ছিলাম সেই দরবারে। মাসের দ্বিতীয় রোববার রাতে সেই অনুষ্ঠান। ২০০৪ এর ১৪ ই মার্চ রোববার। বেশ সকালে সেলফোনটা বাজল। মানসদা।
‘সকালেই একবার আকাশবাণী যেতে পারবি’?
‘সকালে? কিন্তু আমাদের তো সব রেডি আছে। রাত দশটা থেকে শুরু তো’।
‘নিউজ শুনিসনি এখনো? উস্তাদ বিলায়েৎ খাঁ চলে গেছেন। কাল রাতে। আজ কলকাতায় আনা হবে...। রাত দশটায় আমাদের অনুষ্ঠান শুরু ওঁর বাজনা দিয়ে। প্রথম পঁয়তাল্লিশ মিনিট ওঁকে স্মরণ। পরে বিজ্ঞান রসিক। তুই একবার রশিদ খাঁ আর অজয় চক্রবর্তীকেও ফোন করে বলে রাখ। অনুষ্ঠান চলতে চলতে ওঁদের ফোন করে কথা বলব... কখন যাবি বল। মিউজিক আর্কাইভ খোলার পারমিশন আছে আজ। তোর পছন্দের সব রেকর্ড তুলে নে গিয়ে…।

ছুটির দিনে ওপরতলার বিশেষ অনুমোদনে তালা খুলল আকাশবাণীর মিউজিক আর্কাইভ-এর। ভেতরে আমি... একা।
আকাশবাণীর সঙ্গে মত-বিরোধে তিনি ছিলেন ব্রাত্য। কয়েক দশক ধরে আকাশবাণীতে বাজেনি তাঁর কোনও সুর। থরে থরে সাজানো রেকর্ড। সিডি। প্রথম দিন দরবারীর রেকর্ড বাজাতে পারিনি হাতে নিয়েও। হাত ছোঁয়াতে অদ্ভুত লাগছিল। কত বছর ধরে বঞ্চিত ছিলেন শ্রোতারা! আর আজ শুধু তাঁরই সুর বেছে নিতে পারি! জীবনের সুর থেমে গেছে। এক অলীক নিস্তব্ধতার ভিতর সুর পেয়ে গেছে সে জীবন। এতদিন পরে বিলায়েতের ঊষাকালের ভৈরবী, তাঁর রাতের দরবারীর পৌঁছে দিতে পারব শ্রোতাদের কাছে!

প্রথমে কথা ছিল পঁয়তাল্লিশ মিনিট। পরে বেড়ে এক ঘন্টার অনুষ্ঠান। বিলায়েৎ স্মরণ। অনুষ্ঠান চলতে চলতেই ফোন আসতে লাগল আধিকারিকদের। উস্তাদজীর স্মরণই চলতে থাকুক। বিজ্ঞান রসিক বন্ধ থাক আজ। রাত দশটা থেকে বারোটা আমরা বাজিয়েছিলাম তাঁর আশ্চর্য সুর। অসামান্য সব সৃষ্টি। ফোনের ওপারে বিলায়েত খাঁর কথা বলতে বলতে কাঁদছিলেন উস্তাদ রশিদ খান। উস্তাদজী সম্পর্কে কত স্মৃতি, কত কথা যে বলছিলেন পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী!

গভীর দুঃখের দিন। আমদের পরম সৌভাগ্যেরও। চল্লিশ বছর আকাশবাণীতে বাজেনি যে সব সুর, সেই সব সৃষ্টি খুঁজে এনে সেই সুর শোনাতে পেরেছিলাম শ্রোতাদের। কী নিরর্থক মানুষে মানুষে এইসব তুচ্ছ দ্বন্দ্ব। কালের নিয়মে সবাই হারিয়ে যাব একদিন না দিন। কী মূল্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বলে, কলমের এক খোঁচায় সৃষ্টিকে রসিক জনের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেবার! শিল্পীকে ব্যান্ করার সেসব কাগজপত্তরে সইসাবুদ করেছিলেন যাঁরা- কেউ কি কখনো মনে রাখবে তাঁদের! অমরত্ব পায় শুধু শিল্পীর সুর-তাল-ছন্দ। প্রতিষ্ঠানের সব নিয়ম ভাসিয়ে নিয়ে গেল এক ধ্রুব সত্য। মৃত্যু।

সেদিন স্টুডিয়োর কাচের ঘর ভরে গিয়েছিল সুরে সুরে। কাচের ঘর থেকে অনন্তের পথে ভেসে চলছিল তাঁর সুর। রাতের কলকাতার পথ পেরিয়ে বাড়ি ফেরার সময় সেই সুরেরই অনুরণন সে রাতে। জোছনা-হারানো কমলা চাঁদের হাতছানিতে সেই সুর। টুপ টুপ খসে পরা তারায় ধরা সে সুর। আমার ঘরেও সারারাত তাঁর সুর। চোখ বন্ধ করে দেখতে পাচ্ছিলাম, সে সুরের ধারায় ভিজে যেতে যেতে আর এক প্রতিষ্ঠান- ব্রাত্য শিল্পী হাসি মুখে বলছেন,
‘কইসিলাম না, একজন শিল্পীর আসল জীবন শুরু হয় তার মৃত্যুর পর। ওখানে দল পাকানো চলে না। ক্ষমতা যে দ্যাখাইবা তার উপায় নাই। তখন আগামী দিনের দর্শক শ্রোতারাই শুধু সত্যি। তারাই বিচারক। কিন্তু যার বিচার অইবো, সে পঞ্চভূতে মিলাইয়া গেছে।’

আপনার মতামত জানান