প্রেম তব চিনিব কী রূপে?

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়
শিব্রাম চক্রবর্তী-র একটি ভূতের গল্প পড়েছিলাম, যা শুরুই হয়েছিল এই ভাবে – “না, আজ কোনও ভূতের গল্প নয়...”। এই রে! ‘প্রেম’ নিয়ে লিখতে বসে হঠাৎ ভূত-অশরীরীর প্রসঙ্গ কেন? না না, ঠিক অশরীরী প্রসঙ্গ নয়... আসলে ওই গল্পটি মনে পড়ল কারণ, একটি ভৌতিক গল্প হওয়া সত্ত্বেও গল্পের প্রথম লাইনটি-ই ছিল ‘না, আজ কোনও ভূতের গল্প নয়...” প্রেম নিয়ে ভাবতে বসে... সাত পাঁচ-চিন্তা, জীবনানন্দ থেকে শ্রীজাত ‘প্রেম প্রেম’ কবিতার সব লাইন ভেবে একটা মৌতাত তৈরী করতে গিয়েও, মন কেন জানি না বিদ্রোহ করে বলে উঠছে “না, আজ কোনও প্রেমের কবিতা নয়...” না না, এটা কোনও ছেলেমানুষি জেদ নয়। আসলে প্রেমের কবিতা এমন এক গোলকধাঁধাঁ, যার ভেতরে ঢুকলে আর বেরোনো সম্ভব নয়। প্রেম নিয়ে কথা বলতে বসে, শুধু একের পর এক কবিতার লাইন আওড়ে যাওয়া। বাস্তবেও কখনও এমন গোলকধাঁধায় পড়তে নেই, শেষে কবিতা বলতে বলতে দেখা গেল, সামনের স্রোতা (যে নাকি প্রেম নিবেদনের পাত্র বা পাত্রী) ঘুমিয়ে পড়েছে, বা এদিক ওদিক চাইছে, অথবা এই হাল আমলে হাতের স্মার্ট ফোনে মগ্ন হয়ে গেছে। জীবনের সব কিছুই তো শেষে গিয়ে মেশে এই কবিতায়, প্রেমও মিশে হয়েছে একাকার, বিরহ, বিচ্ছেদ, প্রতীক্ষা, প্রত্যাখ্যান নামক সখীদের সঙ্গে। সে থাকবে। কিন্তু কাব্যে না গিয়ে আজ এই প্রেম শব্দটার সঙ্গেই গল্প করতে খুব ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে তারও কিছু বলার আছে।

সত্যি বলতে কি, এই ‘প্রেম’ শব্দটা যেন একটা বহুরূপীর মত। কখনও মনে হয় কি সহজ স্নিগ্ধ ছোট্ট একটা শব্দ, আবার কখনও মনে হয় কতই না জটিলতা নিয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে আছে। কখনও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে তার মন-ভারী করা অস্তিত্ব, আবার কখনও শোনায় একটা ক্লিশের মত। যে প্রেম সদানন্দময়, সেই প্রেম শব্দটি বলার সঙ্গেই নিজের অজান্তে বেরিয়ে আসে গভীর দীর্ঘশ্বাস। একদিকে ‘প্রেম’ শুনলেই মনে পড়ে সেই ক্লাস ইলেভেনে পড়া কবি চণ্ডীদাসের ‘পূর্বরাগ’, ‘প্রেম’ শুনলেই মনে পড়ে বৈষ্ণব পদাবলী... বৈষ্ণব পদ-রচয়ীতা শ্রী কৃষ্ণদাস কবিরাজের রেখে যাওয়া গূঢ় জীবন দর্শনের গুরুগম্ভীর পদ –
“আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা, তারে বলি কাম।
কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম।” (চৈতন্য চরিতামৃত)
আবার সেই প্রেম বললেই, রবি ঠাকুরের সেই বুক হু হু করা - “যদি প্রেম দিলে না প্রাণে...” হরিবংসের বৃন্দাবন থেকে নদীয়ার গোরাচাঁদ... রবীন্দ্রনাথ থেকে আধুনিক সাহিত্যের উত্তরসূরীগণ (নাম আর কত জনেরই বা করব?), সকলের মাঝে, সব কিছুর মাঝে যে শব্দ এত প্রবল ভাবে নানা বর্ণে নিজেকে ছড়িয়ে রেখেছে... তার ব্যাপ্তি দু’দিক থেকে জাপটে ধরা কি কোনও মানুষের হাতের কর্ম? অথচ মানুষের ধরা-ছোঁয়ার মধ্যেও সে দিব্যি রয়েছে... ক্লিশে হয়ে। সেই প্রেম, যা ক্রিয়াপদ (হয়ত একটু লঘু হয়েই), যা নাকি ‘করা’ যায়। দু’জন কে নিভৃতে গাছতলায়, অথবা পার্কের বেঞ্চ-এ, অথবা লেকের ধারে বসে থাকতে দেখলে, পথচলতি একজন আর একজনকে হালকা কনুইয়ের গোঁতা দিয়ে যখন বলতে পারে, “ওই দেখ... কেমন জমিয়ে প্রেম করছে!” সেই প্রেম ক্লিশে হয়ে ফেরে জিভে জিভে। কোনও তর্ক-বিতর্ক বা কোনও কিছু ‘ইহাই হইল’ বলে প্রমাণ করার বিষয় নয়... সত্যিই মনে হয় প্রেম আমাদের আশেপাশে ‘বহুরূপে সম্মুখে তোমার’ হয়ে ওঠে প্রতি নিয়ত... প্রেমই যেন ইশ্বর। ঠিক ঈশ্বরের মতই, তাকে চেনার চেয়ে তার রকমফের করেই আমরা জীবন কাটিয়ে দিই।

আচ্ছা, যদি সত্যিই চিনতে চেষ্টা করি, পূর্ণ সততার সঙ্গেই চিনতে চেষ্টা করি লঘু ক্রিয়াপদ ক্লিশের বাইরে এসে? যদি বলি – “সখী, প্রেম তব চিনিব কী রূপে?” অথবা “সখা, প্রেম তব চিনিব কী রূপে?”
আর যদি বলি “প্রভু, প্রেম তব চিনিব কী রূপে?” প্রতিবার কি একটা ভিন্ন উত্তরের সামনে এসে দাঁড়াতে হবে? তাই কি প্রেম পর্যায়, প্রার্থনা পর্যায়ের মাঝে একটা পর্দার সীমানা করে দেওয়া? এই চেনার প্রয়াসই হয়ত কোথাও একটা গিয়ে জীবনের মানে হয়ে দাঁড়ায়। যুবরাজ সিদ্ধার্থ বোধিসত্ত্ব খুঁজতে পথে নামলেন, নরেন দত্ত ‘দেশ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ খুঁজতে পথে নামলেন, প্রেম খুঁজতে পথে কে নামল? মহাপ্রভু নিজেকে প্রেমের আধার বানিয়ে বিলোতে লাগলেন হরির লুঠ, নদীয়া থেকে নীলাচল ওনার পদরেণুতে গড়াগড়ি গেল মানুষ। সেখানে অন্বেষণ কতটা, বিতরণ কতটা? লালন সাঁই তো সার পদার্থ জীবনের কথা বললেন... তাহলে প্রেম? না সখা, না সখী, না প্রভু... তোমরা কেউ পথে নেমে প্রেম খুঁজলে না কেন? ঈশ্বরের অস্তিত্বের মতই মানুষ সরল বিশ্বাসে প্রেমকে চিনল ‘সবার মাঝে আছে... সর্বত্র বিরাজমান’ বলে, তারপর সরল বিশ্বাস থেকে অন্ধ-বিশ্বাস... তত্ত্ব-যুক্তির ভাঙা গড়া, রকম ফেরে জর্জরিত এক লঘু ক্রিয়াপদ। কখনও মনে হয় - হে প্রেম, তোমায় মাপতে যে কবে থেকে উঠে পড়ে লেগেছে তোমার দাস, তা তুমি খেয়ালই করলে না। আবার কখনও ভাবি – যাক ভালই হয়েছে কেউ লোটা-কম্বল ঘাড়ে প্রেম খুঁজতে বেরোয়নি কখনও। শেষকালে ওই পরশপাথর খোঁজা ক্ষ্যাপার মত খুঁজে খুঁজে ফিরত, টেরই পেত না কখন শেকলটা সোনার হয়ে গেছে। আর যখন টের পেত, তখন সেই ফেলে আসা পথের দিকে পেছন ফিরে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিই বার করার থাকে... সত্যিই পাগল হ’ত ঘুরে ঘুরে। তার চেয়ে প্রেম, তুমি জীবনানন্দের বোধ হয়ে থাক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তোমার কস্তুরি-নির্যাস নিজেদের গায়ে ছিটিয়ে নিক।

প্রেমের বীজ যদি অঙ্কুরিত হয়, তা কেবল এবং কেবলমাত্র সম্পর্কের উর্বরা ভূমিতেই। শুধু ‘প্রেম’ শব্দেরই কূল পাওয়া ভার, তার ওপর এলো সম্পর্ক! কিন্তু এই সমযোজী বন্ধনীর মত শব্দটির অস্তিত্ব না থাকলে যে সৃষ্টির মাঝে অনেক কিছুই অধরা থেকে যায়। ওই পার্কে বসে থাকা হাতেহাত রেখে দু’জন, স্কুল বাসের জানলা থেকে বাচ্চা মেয়েটি হাত বারিয়ে যাকে ‘টাটা’ করছে, রবীন্দ্রসদনের সিঁড়িতে একা বসে থাকা কারও দৃষ্টির শূন্যতা, সারাদিন পর ঘরে ফেরা লোকটার সামনে বাড়িয়ে দেওয়া ঠাণ্ডা জলের গ্লাস, আর চারপাশে তার পোষা কুকুরটির ছুটে বেড়ানো, শীতকালে কম্বলের তলায় জোর করে হুলো বেড়ালটার সেঁধিয়ে যাওয়া, এমনকি খাদ্য-খাদ্যক সম্পর্কের ইকোলজিকাল পিরামিডও সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে। প্রেমের অব্যয়-অজর, অ্যাবস্ট্রাক্ট, আলেখ, ব্রহ্ম ইত্যাদি অরূপ অস্তিত্ব থেকে তাকে হাত ধরে টেনে এই সব সমযোজী বন্ধনী, রূপরেখা দিয়ে নানান বর্ণের যৌগরূপে তাকে প্রকট করে তোলে বই কি? একই সঙ্গে জানিয়ে দেয়, ‘করার’ থেকে অনেক বেশি বিস্তৃত অস্তিত্ব এই তেজস্ক্রীয় শব্দটির। এই সকল জাগতিক সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে ইলেক্ট্রনিক ইম্পালসের মত বয়ে চলেছে, হয়ে উঠেছে মহাজাগতিক সত্য–
“তব নাম লয়ে চন্দ্র তারা অসীম শূন্যে ধাইছে-
রবি হতে গ্রহে ঝরিছে প্রেম, গ্রহ হতে গ্রহে ছাইছে।”
প্রেম যদি সত্যিই এক ভুঁইফোঁড় উদ্ভিদ হবে, তো তার বীজ এলো কোথা থেকে? গজালই বা কেন? আর বেড়েই বা উঠবে কোন রোদ-জল-বাতাস পেয়ে? প্রেম থেকে প্রেমের জন্ম, ঠিক একটা জ্বলন্ত মোমবাতি থেকে আর একটা মোমবাতিতে আগুন ছুঁয়ে দেওয়ার মত প্রেমের স্পর্শ পাওয়া একটা মন প্রেমের উৎস হয়ে যায়। সম্পর্কে সম্পর্কে বীজ রেখে যায়। প্রজন্ম দেখবে নিজের মত করে, প্রজন্ম চিনবে নিজের মত করে, সেই বেড়ে ওঠা গাছ, তার ফুল, তার ফল সব কিছুকেই নিজের মত করে নাম দেবে। তা সেই মোমবাতি বা তার আলোর ভাল নাও লাগতে পারে, সেই গাছের প্রতিটি পাতা সরসর করে প্রতিবাদ করে যেতে পারে ঝরে পরার আগে অবধি। কিন্তু কেউই সেই বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়ে লতায়-পাতায় বেড়ে ওঠা, সেই প্রেমের অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে পারে না। সম্পর্কের জোর করে সনাক্তকরণ করে একটা সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করে মাত্র। ঈশ্বর প্রসঙ্গে পরমহংসদেব মাঝে মধ্যেই বলতেন - সাকার আর নীরাকার দুই-ই সত্য। নীরাকার ব্রহ্মকে চেনা, অনুভব করা সকলের পক্ষে সম্ভব নাই হ’তে পারে। তাই বলে কি সেখানে ঈশ্বর চিন্তা থাকবে না? সাধারণ মানুষের একাগ্রতা, মনের জোর নীরাকারকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে না, সাকারের প্রয়োজন সেইখানে। সেইরূপে ঈশ্বরকে দেখে তার মধ্যেই সরল বিশ্বাস নিয়ে তাকে খোঁজার চেষ্টা করে। অবিশ্বাসের থেকে সেই সাকারে ভক্তি ভাল।
এই ওপরের বাক্যগুলিতে প্রেম কে নীরাকার, আর সমস্ত জাগতিক সম্পর্ককে সাকার ধরে নেওয়া গেলেই, আর কোনও কথা বাকি থাকে না। যদি একথা গুলো খুব খটখটে মনে হয়, তাহলে একটা রঙিন ছবি আঁকতে পারি - একটি ছোট্ট মন্দির, সেই মন্দিরের বিগ্রহ বাঁকে বিহারী শ্রীকৃষ্ণ। সেই বিগ্রহর সামনে দোতারা হাতে একজন সাধিকা বসে, গেরুয়া বস্ত্র পরে, কপালে শ্বেত চন্দনের তিলক। সেই সাধিকা চোখ বন্ধ করা কৃষ্ণনামের ভজনা করছে, আর তার দু চোখে অশ্রুধারা। তার থেকে অল্প দূরে দাঁড়িয়ে ভীষণ দর্শন চারজন সশস্ত্র প্রহরী।মহারাণার হুকুম, তাই তাদের অতন্দ্র প্রহরায় এই সাধিকা। কিন্তু ভীষণ দর্শন মুখগুলোরও চোখের কোন যেন চিকচিক করছে। মন্দিরের বাইরে উঁচু প্রাচীর। তার বাইরে থেকে পাঁচিলের ওপারের কিচ্ছু দেখার জো নেই। পাঁচিলের বাইরে, পথ চলতি যে-ই যায়, সেই গান শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। পাঁচিলের বাইরে লোক জমতে জমতে ভিড়। সকলে কেমন মন্ত্রমুগ্ধ অথবা সম্মোহিত হয়ে বসে পড়েছে সেখানে। কারও চোখে জল, কারও কারও মন উদাসী। তারা পাঁচিলের ওপারে দেখতে পাচ্ছে না, শুধু গানের কথা আর সুর ভেসে আসছে তাদের কানে। তারা চেনে কে এই সাধিকা। তাহলে প্রেম ঠিক কোথায় - বিগ্রহে? সাধিকার অন্তরে? গানে? সু-উচ্চ প্রাচীরের বাইরে না ভেতরে? আর দিনের শেষে এত তত্ত্বকথার পরেও, এ কথা তো অনস্বীকার্য যে এই বোধ, অনুভূতি, প্রেমরূপী যাইহোক তাকে আত্মভূতকরার প্রয়াসের সবটাই মস্তিষ্কর অবদান। তো সেই মস্তিষ্ক নিজের সুবিধে মতই মনেরই ভাগ করে নিলো। হিসেবী মনটাকে রাখল নিজের জিম্মায়, আর প্রেমময় যা কিছু সেই মনের দায়ে চাপিয়ে দিলো হৃদযন্ত্রের ওপর, নাম দিলো হৃদয়... আহা, প্রেমের আধার হ’ল হৃদয়, সেখানেই নাকি মন। আসলে মস্তিষ্কই চালাকি করে দোষ দেওয়ার জন্য একটা ‘নন্দ ঘোষ’ খুঁজে নিলো। হয়ত এই প্রেমময় ঈশ্বরের লীলা। এই সহজ কথাটুকু বুঝতে, ফ্রয়েড সাহেবের মত কাউকে বিব্রত করারও কোনও মানে পাই নে। তাই ওই সাকার-নীরাকার ধরাধরির খেলে যাবে মস্তিষ্ক আজীবন, যেমন খেলে আসছে... আর গান গাইবে ‘হৃদয় আমার নাচে রে...’

প্রেম হোক, সম্পর্ক হোক, হোক অরূপ ব্রহ্ম... তাকে সবথেকে বেশি বিব্রত করে বোধহয় আমাদের মনের মাঝে সচেতন-অবচেতনে চলা ময়না-তদন্ত। প্রেম থাকলেই সম্পর্ক, সম্পর্ক থাকলেই প্রেম... প্রেম মানেই কানাকানি, আলোচনা... উচ্চ আসনে বসা শব্দকে জড়িয়ে পেঁচিয়ে নিচে নামতে থাকা। সম্পর্কের ছাই উসকে আঁচ খোঁজার অদম্য কৌতূহলের ঊর্দ্ধে বোধহয় কেউই উঠতে পারি না আমরা। কেমন একটা লোকাচার, প্রবৃত্তির আঁশটে গন্ধ লাগা মন খুঁচিয়ে দিয়ে বলে – “দেখ তো কেস্‌ টা কি? শুধুই কি আলাপ-চারিতা... নাকি...” বৈষ্ণব আখরায় প্রচলিত এক প্রকার সাধন পদ্ধতির উল্লেখ পাওয়া যায়... পরকীয়া সাধন। সরাসরি এই নামেই তার পরিচয়, ‘পরকীয়া সাধন’। তার অনুপ্রেরণা কে? স্বয়ং মধুসূদন। সেই আইহান ঘোষের স্ত্রীয়ের সঙ্গে যমুনা পারে ভাব, তারপর ঘরের বউকে ঘর থেকে বার করে বৃন্দাবনে রাস, হোলি... অবতারের হাতে স্বীকৃতি পেল প্রেম, ডাকনাম পেল পরকীয়া। তারপর থেকে মন্দিরের ভাস্কর্য থেকে অজন্তার দেওয়াল-চিত্র, কবির কল্পনা থেকে রাজপুত-কাংরা আর্ট সব জায়গাতেই প্রেম... প্রেম আর প্রেম। ঢুলু ঢুলু চোখ কখনও কৃষ্ণের কখনও মুঘোল সম্রাটের। যে লজ্জা রাধিকার দৃষ্টিতে, তাই ফিরে আসে শাহজাদার ঘরে ঠেলে দেওয়া রক্ষিতার কুণ্ঠায় অথবা রাজমহিষীর অবগুণ্ঠনের আড়ালে। হাতে হাত ধরে এগিয়ে আসে একের পর এক শতাব্দী। ব্যস্ত জনপদে, ঘরোয়া পুকুরের ঘাটে, বাহিরমহল থেকে অন্দরমহলের অন্তঃপুরে আলোচনা, কানাকানি এক একটা সম্পর্কেরএক একরকম নামকরণ, বিশ্লেষণ আর কাঁটা-ছেঁড়া। সেই ট্র্যাডিশন ছড়িয়ে বিশ্বময়... ‘লাস্ট সাপারে খ্রীষ্টের পাশে ও কাকে বসে থাকতে দেখা যায়?’ ‘জর্জ বার্নার্ড শ আর প্যাট্রিক ক্যাম্বেলের মধ্যে সম্পর্কটা ঠিক কি ছিল?’, ‘শেক্সপিয়ারের ছলনাময়ী লেডি ম্যাকবেথ আসলে কে?’, ‘ক্লিওপেট্রা ঠিক কেমন করে সিজার আর অ্যান্টোনিকে খেলিয়ে তুলেছিল?’, ‘সম্রাট আলেকজাণ্ডারের মনে কি সমকামী প্রবণতা ছিল?’ ‘নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ-র কণ্যা বেগম আজমাত-উন-নিসার নাম হঠাৎ কলেজা-খাকি হ’ল কেন?’ ‘প্রার্থনা অথবা পূজা পর্যায়ের সব গান কি সত্যিই ঈশ্বর কে উদ্দেশ্য করে?’ সম্পর্কের মাকড়সা-জালে জড়িয়ে পড়া প্রশ্নের আর অন্ত নেই! এমন কি, এই বিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদের বাংলাদেশের এক একটি নামকে তুলে তার অন্দরমহলে উঁকি না দিতে পারলে কারও ঘুম হয় না। ব্যক্তির কর্মময় জীবনের থেকেও বেশি সরস যেন তার ব্যক্তিগত জীবনের অধ্যায়গুলি। রবীন্দ্রনাথ- কাদম্বরী দেবী, রবীন্দ্রনাথ- ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, মার্গারেট নোবেল-নরেন্দ্রনাথ, নরেন্দ্রনাথ-সরলাদেবী, নিবেদিতা-জগদীশচন্দ্র.. . উফ! মরেও শান্তি নেই। সম্পর্কের মধ্যে আন্তরিকতা, পারস্পরিক গভীর শ্রদ্ধা... সে তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাদারি-র খেলা দেখা ভিড়ের অন্তরে প্রবেশ করবে না। তারা শুধুই মজা পেতে জানে, কৌতূহলের খিদে মেটাতে জানে। বিগত সময়ে প্রতিটি মুহূর্তের বোধ, নিবিড় চেতনা, প্রতীক্ষা, প্রাপ্তি... সে তো থেকে গেছে সেই সব মানুষের মনে, আমাদের ধরা ছোঁয়ার অনেক দূরে। আমরা তার আভাস পেতে পারি মাত্র, তাও যদি দৃষ্টিতে সততা থাকে। অথচ, প্রেমের নামে সরস গল্প খোঁজার এই প্রবৃত্তির হাত থেকে মানুষের নিস্তার নেই। তাই প্রেম নামতে নামতে লঘু ক্রিয়াপদ। সম্পর্কের বিচারে তার রকমফের, ভালবাসার মুক্ত চেতনা নেই... প্রেমরূপে সংকোচের কুয়াশা ঢেকে রেখেছে যত তৃষিত মন।

প্রেমই চেনালো ত্যাগ, করল অত্যাগসহন, নিজেকে চেনার জন্যই দিলো একাকীত্ব। একাকীত্ব শব্দটার প্রতি অনেকেই দেখি বেশ প্রতিক্রিয়াশীল। কারও কারও একাকীত্ব অন্য একজনকেও হয়ত পীড়া দেয়। তবে কার একাকীত্ব যে কাকে পীড়িত করল, তা বোঝা বড় দায়। এ ব্যাপারে কখনও কিছু আন্দাজ না করে নেওয়াই শ্রেয়। কারও না কারও একাকীত্ব কাউকে হয়ত প্রতিনিয়ত ভাবাচ্ছে। আর এই ভাবনা কেমন, তাও ওই একাকীত্বর অভিজ্ঞতা বা অনুভূতিই নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যক্তিগত অনুভূতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা... এনিয়ে কি কোনও সামগ্রিক মন্তব্য করা যায়? না তা কেউ করতে পারে? তবু কেন জানিনা মনে হয়, বেশির ভাগ সময়েই অন্যের একাকীত্ব দেখে প্রতিক্রিয়াশীল হওয়াটা অনেকটাই নিজের একাকীত্বের প্রতিবিম্ব দেখে প্রতিক্রীয়া দেখানোর মত। কেউ কোনও কারণে মানসিক অবসাদের মধ্যে, অথবা নিঃসঙ্গতার মুহূর্তে আছে দেখে, বা কল্পনা করে যে \\\'আহা\\\'-টা বেরিয়ে আসে, তা অনেক সময়ই নিজের চাপা দীর্ঘশ্বাসের বাইরে বেরিয়ে আসে। যে \\\'আহা\\\'টা শুনলো সেও যেন ভেবে না বসে \\\'আহা\\\'-টা ঠিক তার জন্যই... আর এমনিতেও \\\'আহা\\\'-র পাত্র/পাত্রী হওয়া খুব একটা সুখের কথা নয়। সে যাই হোক, একাকীত্বর মুহূর্ত প্রত্যেকের জীবনে কোন ওনা কোনও সময় আসে, যা কোনও সময় প্রয়োজনীয়, কোনও সময় অভিপ্রেত নয়... এ ব্যাপারে বিশেষ কিছু বলার থাকেনা। তবে এটুকু বলতে পারি, যে নিজের দীর্ঘশ্বাস গুণে প্রহর কাটায়, তার পক্ষে অন্যের একাকীত্বের সুরাহা করা বা তার ঠিকঠিক কারণ অনুভব করা কোনও ভাবেই সম্ভব নয়। এমনকি তার ওই \\\'পাশেথাকা\\\'টাও হয়ে অর্ধ-হৃদয় (বা সিকিভাগও হ\\\'তে পারে) যাসে নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা। যদি পরোক্ষে নিজের একাকীত্বর ছায়াতেই সব কিছু বিচার করে বসলে? তাহলে সমবেদনা, সহমর্মীতা এবং অনুরূপ আরও যা কিছুর অস্তিত্ব; সব যে সেই নিজের একাকীত্বের গণ্ডিতেই আবধ্য হয়ে গেল! নিজেই যদি নিজের গণ্ডিটা চিনে তার বাইরে বেরিয়ে আর একজনের পাশে না দাঁড়াতে পারলে... তাহ\\\'লে আরও খানিকটা ওপর থেকে দেখো, দেখবে তুমি এবং তোমার মতই আরও সকলে এক একটা বানানো গণ্ডির ভেতর কেমন রয়েছে... নিচ থেকে যাকে একাকীত্ব বলে মনে হয়... না, \\\'মনে হয়\\\' নয়... ওটাই একাকীত্ব... যা তোমাকে কষ্ট দিয়েছে... আমাকে কষ্ট দিয়েছে... আর আমাদের আশেপাশে আরও অনেককে... কিন্তু একজনের একাকীত্বের সঙ্গে একাত্ববোধ করতে গিয়ে জীবন কাটালে... আর অন্যজনের টা নজরে পড়লনা... তার মধ্যে তোমার ছায়া দেখোনি বলে। আর অন্যজনের টা নজরে পড়লেও কি বা করবে? নিজেই তো দীর্ঘশ্বাসের গণ্ডি কেটে বসে আছ! প্রেম আছে বলেই না বিরহ আছে, আছে প্রত্যাখ্যান, সব কিছু ছাপিয়ে আছে প্রত্যাশা। হলুদ পাঞ্জাবী পড়া হিমু রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ফেরে একলা আঁধারে, তার ভাল ছেলে হতেও ভাল লাগে না, কারণ “ভাল ছেলেরা কখনও ভালবাসা পায় না, পায় সহানুভূতি”। রোম্যান্টিক কমেডির থেকে ট্র্যাজেডিই যেন আরও বেশি বেশি করে আমাদের মন ছুঁয়ে যায়। জোর করে ‘আর ভাল লাগে না’ বললেও বুঝি... সব প্রেমের মুহূর্ত বেলা শেষে অতীত হয়ে যায়... শুধু বিরহ পাশে থাকে। প্রেমই চিনিয়েছে এই একাত্ববোধ। যে বোধ থেকে ‘ব্যর্থ প্রেমিক’ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলে –
‘আমি এমন ভাবে পা ফেলি যেন মাটির বুকেও
আঘাত না লাগে
আমার তো কারুকে দুঃখ দেবার কথা নয়।’

ক’বছর আগে একটি হিন্দি সিনেমা দেখতে গিয়ে, একেবারে শেষে বড়পর্দায় ক’টা লাইন ইংরাজীতে ভেসে উঠতে দেখেছিলাম –
Out beyond the ideas of
wrongdoing and rightdoing,
there is a field.
I\\\'ll meet you there.
ফারসী ভাষার কবি রুমির একটি কবিতার চারটে লাইন। ওই ভবিষ্যতে দেখা হওয়ার যে অঙ্গীকার... সব ঠিক-ভুলের ঊর্দ্ধে সেই স্থান, যেখানে আবার দেখা হওয়ার আশা... এর মধ্যেই পরোক্ষ হয়ে থাকা একটি শব্দ- প্রতীক্ষা। এক প্রত্যাশা আঁকড়ে ধরে বসে থাকা প্রতীক্ষার সেতু, যার এপারে রয়েছে অপূর্ণতা আর ওপারে পূর্নতা। সেই চলচ্চিত্রর গল্পের বাইরে এসেও ওই চারটি লাইন ভীষণ অমোঘ বলে মনে হয়। সত্যিই তো এক ঈপ্সিত প্রেমময় মুহূর্তের জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করে বসে থাকা যায়। অথচ যেই প্রেম একবার ঢেউয়ের মত ছুঁয়ে গেছিল, অথবা এক পশলা বৃষ্টির মত হঠাৎ ভিজিয়ে গেছিল... সেই ঢেউ, সেই বৃষ্টির ছাঁটের জন্য তৃষিত হয়ে বসে থাকাও তো যায়... বসে থাকি তো আমরা, তাই না? সেই বাপ্পাদিত্যর ঝুলন... সোলাঙ্কী রাজকুমারী... কি আনন্দ! কি আনন্দ! তারপর শুধু অপেক্ষা আর অন্বেষণ... শেষে যখন আবার দু’জন মুখোমুখি হ’লেন তখন একজনের চোখ চিরতরে বুঁজে গেছে। সেদিনের রাজকুমারী আজ সন্ন্যাসিনী, বাপ্পাদিত্যের চিতার পাশে দাঁড়িয়ে সখীদের বলছেন সেই গানটা আবার কর... কি আনন্দ! কি আনন্দ! এই প্রতীক্ষার কোনও নাম হয় না, রূপ হয় না, তাকেও মাপাও যায় না... প্রেমের মতই সেও আকাশের অনেকটা জুড়ে থাকে, প্রেমের রঙেই মিশে। যদি বা মুহূর্তের ফুটে ওঠা প্রেম, এক জলছবি... সে খাঁটি সোনা হয় সেই প্রতীক্ষায়, নিঃশর্ত প্রতীক্ষা... যেন তপস্যারত সাধিকার চোখ রুদ্রাক্ষের বীজের মত ঢেউ গুণে যাচ্ছে একের পর এক। সেই প্রতীক্ষার বারি সিঞ্চনেই প্রেম মহীরুহ! সেখানে ভালো থেকো বলার সঙ্গে সঙ্গে চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে না। অনেকটা, একটা স্টেশনের বেঞ্চের এক ধারে বসে ট্রেনের অপেক্ষা করার মত... যেন এই বেঞ্চে একটু পরেই আর একজন এসে বসবে। সে প্রতীক্ষা কখনও নিভৃতে, কখনও নির্জনে... আবার কখনও শূন্য রাজপথের কোনও লাইটপোস্টের নিচে... অন্ধকার রাতে আলোর বৃত্ত দিয়ে আগলে রাখা প্রতীক্ষা। সে প্রতীক্ষার দৃষ্টি যে কি দেখে, কি দেখতে চেয়েছিল আর কি দেখবে বলে বসে আছে, তা কি কোনও তৃতীয় নয়ন বলে দিতে পারে? সব সময় ভবিষ্যৎ নয়, কত সময় তো শুধুই ফেলে আসা অতীতের দিকেই ফিরে তাকানো। তপন সিংহ পরিচালত হাটেবাজারে সিনেমার একটি ছোট্ট মুহূর্ত – চিকিৎসকের ভূমিকায় অভিনেতা অশোককুমার হঠাৎ ওনার পরলোকগতা স্ত্রীর লেখা কুড়ি বছর আগের একটি চিঠি হাতে পেলেন। তারপর শুধু ওনার স্ত্রীর কণ্ঠস্বর আর ওনার চোখের অভিব্যক্তি। সত্যিই মানুষ ভালবাসার ভিখারি, নির্লজ্জের মত চেয়ে থাকতে পারে তার দিকে, দু’হাত পেতে চাইতে পারে... আর যখন কিছু থাকে না, থেকে যায় প্রতীক্ষা। অপেক্ষা করতে করতে কোথায় যেন একটা অভিমান তৈরী হয়। কত কথা বলার ছিল, বলা হয়নি... বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারলাম কই? কখনও খুব অভিযোগ করতে ইচ্ছে হয়, তর্জনী তুলে দেখাতে ইচ্ছে হয় কাউকে না কাউকে... তর্জনী ঘুরে ঘুরে একবার কোনও ব্যক্তির সামনে, একবারে আকাশের দিকে, একবার আয়নার সামনে... নিজের মনের হতাশাই আয়নার সামনে যেন অন্য কাউকে বলে ওঠে –
“তুমিই তো অসময়ে অন্ধকারে
অন্তরের আরতির ঘৃতের আগুনে পুড়বে নির্জনে।

আমাকে পাবেনা খুঁজে, কেঁদে-কেটে, মামুলী ফাল্গুনে।”

কিন্তু সেই প্রতীক্ষা বা বীরহের অন্তর্দহন, সেই দরজার সামনে দু’হাত পেতে মাধুকরী চাওয়ার তৃষিত চোখ, বহমান নদীতে এক বুক জলে দাঁড়িয়ে বুক ফাটা তৃষ্ণা নিয়ে ভাবা এখনও ডুবে যাইনি কেন? এর সব কিছুই তো সেই আশায় গিয়ে মেশে... আজ কৃষ্ণপক্ষের অদৃশ্য চাঁদের বিদ্রূপ আমায় দেখুক, সেই ঠিক-ভুলের উর্দ্ধে যে প্রসস্ত মরুদ্যান, সেখানে আমরা বোঝাপড়া করে নেবো অন্য কোনওদিন... ঠিক দেখা হবে, তুই দেখিস।

তবু ডুবে গেলে চলবে না, ভেসে গেলেও চলবে না। প্রেমের হাত ধরেই অনেক দূর হেঁটে যাওয়া যায়, ফিরে আসা যায়। যে প্রেম শব্দে দুনিয়া তোলপার, সেইপ্রেম শব্দটিকেই মাঝে মাঝে কেমন সোনার হরিণের মত লাগে – তাকে ধরি ধরি মনে করি, ধরতে গেলে আর পেলেম না। অথচ তার অন্য একটি প্রতিশব্দ (নাকি রূপ? নাকি অবতার?) ‘ভালবাসা’ যেন মাটির অনেক কাছাকাছি। প্রেম বললেই চাপা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসে ‘অপ্রেম’ (নেহাত কবির ভাষা তাই না?); কিন্তু ভালবাসার উলটো দিকে কাকে রাখব? ‘মন্দবাসা’? সাহিত্যে গ্রহণযোগ্য হবে? কোনও কবি স্বীকৃতি দেবেন এই শব্দকে? ‘ভাল’, ‘বাসা’... ‘ভালবাসা’ কেমন একটা স্বপ্ন মাখা সমাসের মত। ক্লিশে নয়, গূঢ় জীবনদর্শনের তত্ত্ব নয়। ভেসে যাওয়া মেঘের মত, বেসামাল হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া পাহাড়ী নদীর মত, অমল-ধবল পাল তোলা নৌকার মত... আরও অনেক কিছু... অনেক কিছু। ‘প্রেম’ হয়ে যা সিংহাসনে বসে থাকে, সেই একই বোধ যেন ভালবাসা নামে পথের ধূলোয় মেশে। যে শব্দ ফুসফুস ভরে বাতাস নিয়ে বলতে পারে ‘কাশির দমক থামলে কিন্তু বাঁচতে ভালবাসি!’। ‘প্রেম’-এর উল্লেখ যে কৌতূহলের জন্ম দেয়, ভালবাসার প্রলেপ সেই কৌতূহলকে কিছুটা হলেও প্রসমিত করে। অর্থ হয়ত একই, কিন্তু শব্দের ইন্দ্রজাল, ভালবাসা শব্দেই সেই যাদু। যেন দু’হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা খ্রাইস্ট দ্য রিডিমার, ভালবাসা যাকে ক্রুশবিদ্ধ হ’তে দেয়নি। যে প্রেম ঈশ্বরস্বরূপ, দর্শন, শিল্প, সাহিত্যর রসদ... সেই প্রেমই ভালবাসা নামে বেঁচে থাকার অক্সিজেন, জীবনের আদর, নবজাতকের নিষ্পাপ হাসি। প্রেম সম্পর্কে পরমহংসদেবের একটি অদ্ভুত উক্তি পাওয়া যায় শ্রী মহেন্দ্র গুপ্ত রচিত শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃততে –
\\\"তোমরা ‘প্যাম’ ‘প্যাম’কর; কিন্তু প্রেম কি সামান্য জিনিস গা? চৈতন্যদেবের ‘প্রেম’ হয়েছিল। প্রেমের দুটি লক্ষণ। প্রথম -- জগৎ ভুল হয়ে যাবে। এত ঈশ্বরেতে ভালবাসা যে বাহ্যশূন্য! চৈতন্যদেব বন দেখে বৃন্দাবন ভাবে, সমুদ্র দেখে শ্রীযমুনা ভাবে। দ্বিতীয় লক্ষণ – নিজের দেহ যে এত প্রিয় জিনিস, এর উপরও মমতা থাকবেনা, দেহাত্মবোধ একেবারে চলে যাবে।\\\"
ঈশ্বর দূরস্থ, ঈশ্বর সরিয়ে যদি মানুষও নিয়ে আসি, তাহলেও এই দু’টি লক্ষণ কত জনের মধ্যে দেখা যাবে কর্তা? আবার, সেল্ফ-কণ্ট্রাডিক্ট না করেই যদি বলি, প্রেমই ঈশ্বর - তাহলে? তাহলে সেই প্রেমের জন্যও কি সত্যিই কেউ জগৎ ভুলে যাবে? দেহাত্মবোধ লুপ্ত হবে কারও? প্রেমের জন্য বাউণ্ডুলে হয় কয় জনা? দেবদাস মুখুজ্যে হওয়া কোনও কাজের কথা নয়, শরৎবাবু বাঙালি প্রেমিকের শিরদাঁড়াটাই ভেঙে দিয়ে গেলেন ওই দেখিয়ে। বাঙালির ছেলে পার্বতী কে হারিয়ে দেবদাস হয়, চন্দ্রমুখীকেও চিনতে ভুল করে। আর পৃথ্বীরাজ চৌহান ঘোড়া ছুটিয়ে সংযুক্তাকে তুলে নিয়ে আসে! একই ভাবে হাসি নিয়ে বলতে হয়, “প্রেম কি সামান্য জিনিসগা?” ধূলি-ধূসর সংগ্রাম ভরা জীবনে এক আদরের স্পর্শ ভালবাসা, সব জটিল তত্ত্বের বাইরে এই ভালবাসা নামেই থাকুক। নিঃস্বার্থ, নিঃস্বর্ত ভালবাসা সব হিসেব নিকেশের উর্দ্ধে মেঘের ভেলার মত ভেসে থাকে। ভালবাসা খুব কাছ থেকে পাওয়ার সেই মুহূর্তে নিশ্চিত মনে হয়, “এটুকু ছাড়া আর কী বা চেয়েছিলাম... আর কীই বা চাওয়া যায়?” স্টেশনে বেঞ্চের এক পাস আগলে বসে থাকা, বাদল-দিনের প্রথম কদমফুল হাতে নিয়ে ঢেউ গোণা, অথবা ব্যস্ত মহানগরের ব্যস্ততম অঞ্চলের বাসস্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে বার বার হাতঘড়ির দিকে তাকানো... সবই তো ওই একটা স্পর্শর নামে! সেই মরূদ্যান – ভালবাসা... ভাল... বাসা...
এই ভালবাসার শপথ নেওয়া সুরই আমাদের কানে ভাসুক –
“গীর্জার ঘণ্টায়
মিলে যাওয়া ভোরের আজান
প্রতি আহ্বানে খোঁজা
তোমার যোগ্য কোনও গান
যে গানে শ্যামের সুর
রাধিকার বীরহে মানায়
খোদার কসম জান
আমি ভালবেসেছি তোমায়”

কথার পিঠে কথা, হালকা হাসি-ব্যথা... পেতে পেতে হারানো, হারাতে হারাতে খোঁজা... বলতে বলতে কেমন ঘোর লেগে যায়।প্রেম নিয়ে বলতে বসেছি... এবার সত্যিই মনে হচ্ছে পাগলের কাজ। সমুদ্রের ঢেউ গুনছি, না পারে বসে বালির দানা গুনছি... জলে নুন খুঁজছি না ঝিনুকে মুক্ত খুঁজছি, নিজেরই ঠিক করে ঠাওর হয় না। আমি সামান্য নাগরিক, নিজের সমস্ত মনের জোর এক করে বলতে পারি ‘জীবন প্রেমহীন নয়’। কোনরকম প্রতিশ্রুতির প্রত্যাশা না করেই হয়ত বলতে পারি – ভালবাসার বোধ নিজের অজান্তেই মনের বাইরে, সীমিত মনের আধারকে উপেক্ষা করে, ছলাৎ ছলাৎ করে চলকে পড়ে। সে ভালবাসাই মনকে বলে, অনেকটা জমে গেছে, এবার কিছুটা বিলিয়ে দেওয়া যাক। শুধু কিছু পাওয়ার প্রতীক্ষা নয়, অকাতরে বিলিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে। সেই ইচ্ছার রকমফের হয় না, নাম হয় না। আমরা কেবল সহজাত চেষ্টায় মনকে মুখোশ পড়িয়ে রাখি। কারণ আমাদের সংকীর্ণতা কানে ফিসফিস করে শিখিয়ে দিয়েছিল, “প্রেমের সঙ্গে শরীর আসে, আসে যৌনতা। সৃষ্টির পরম সত্য এই যৌনতাকে উপেক্ষা করে সম্পর্ক থাকবে কি করে? নিজের সঙ্গে লুকোচুরি খেলো না!” হায় প্রেম, তুমি কেন এমন শরীরময়... ভালবাসা তো এমন থাকেনি কখনও। কাম নয়, শরীর নয়, ব্যাভিচার নয়, পরকীয়া নয়... সৃষ্টির চরম সত্য প্রেম নিজে, আর তার শাশ্বত জাগতিক ভালবাসা রূপ। এই ভালবাসায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার আকুতি আছে বলেই কেউ বলতে পারে ‘তোমাকে কেন দিইনি আমার সকলকে শূন্য করে’... আবার কেউ এই ব্যস্ত শহরের এক কোনে গিটার হাতে নিজের মনে গাইতে পারে –
কি আছে আর?
গভীর রাতে নিয়ন আলোয়
আলোকিত যত রেস্তোরাঁ।
আর সব থেকে উঁচু ফ্ল্যাট বাড়িটার
সব থেকে উঁচু ছাত,
তোমায় দিলাম আজ।

পারব না দিতে
ঘাসফুল আর ধানের গন্ধ,
স্নিগ্ধ যা কিছু দু’হাত ভরে আজ ।
ফুসফুস খোঁজে পোড়া ডিজেলের
আজন্ম আশ্বাস,
তোমায় দিলাম আজ।

শহরের কবিতা, ছবি, সবই
তোমায় দিলাম আজ।
আর কী বা দিতে পারি?...

ওহ হ্যাঁ, কথা প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, শুরুতে যে শিব্রাম চক্রবর্তীর সেই ভূতের গল্পটির কথা বলেছিলাম, সেই গল্পের শেষে লেখক বুঝতে পারবেন, তাঁর বন্ধু জনার্দন, যে এতক্ষণ তাঁকে ভূতের গল্প শোনাচ্ছিল... নিজেই অশরীরী।

আপনার মতামত জানান