দ্য ম্যাজিশিয়ান

সুমন্ত চট্টোপাধ্যায়
(১)

সাল ১৯৭২। দীর্ঘ ১৬ বছর বুকে করে বয়ে বেড়ানো একটা স্বপ্ন যে কোনোদিন সত্যি হবে, ভাবিনি! তা-ও নিজের দেশ থেকে এতদূরে, ইটালির প্রাণকেন্দ্র ভেনিসে। গত একসপ্তাহ ধরে ভেনিসের রাস্তায়-রাস্তায়, গলিতে-গলিতে শোভা পেয়েছে সেই রঙচঙে পোস্টার। তবুও বিশ্বাস হয়নি, মনে হয়েছিল প্রথম শো’এ সেরকম লোক হবেনা। আজ সন্ধ্যেয় যখন শুনেছি, শো হাউসফুল হতে চলেছে তখনও ব্যাপারটা আঁচ করতে পারিনি। “ইল ইনকান্তো”র মত এত বিশাল একটা প্রেক্ষাগৃহ যে এত তাড়াতাড়ি ভরে যাবে, শুধু আমি কেন, অ্যালহেইডও ভাবতে পারেনি। তবে ওর বিশ্বাস ছিল। সেই বিশ্বাসে ভর করেই তো স্বপ্নের রাস্তায় পা রেখেছিলাম।

কয়েক হাজার মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে আছে। দুরুদুরু বুকে আমি এসে দাড়ালাম তাদের সামনে। উত্তেজনা উপচে পড়া গলায় ধন্যবাদ জানিয়ে শুরু করলাম শো। প্রথমে ছোটোখাটো ট্রিক। সামান্য কিছু করতালি নিয়েই আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হলাম, ছড়াতে শুরু করলাম নিজেকে। বহুবছর আগের শেখা কৌশলগুলো মানুষ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলো। এভাবেই যে কতক্ষণ পেরিয়ে গেছিল, ঠিক বলতে পারবো না, আমিও একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। একেবারে শেষে এলো ইন্দ্রজালের চূড়ান্ত অ্যাক্ট। অনুশীলনের মতই অ্যালহেইড এলো হাসিমুখে। আমি ওর কপাল থেকে থুতনি অবধি হাত বুলিয়ে ওকে অচেতন করে দিলাম, আস্তে আস্তে শোয়ালাম লম্বা টেবিলটার ওপর। তারপর পাঁচটা চকচকে, ধারালো তরবারি এক এক করে ওর গলা, বুক, পেট আর দু’পায়ের হাঁটুতে গেঁথে দিলাম।
দর্শকাসন থেকে বেশকিছু চাপা শিহরণের শব্দ কানে এলো। এবার পাঁচটা তরবারির তলা থেকে দেহের কাটা প্রত্যঙ্গগুলোকে সরিয়ে নিলাম এক এক করে। সবাই বাকরুদ্ধ, আমার মুখে হাসি। কয়েকমূহুর্ত এভাবেই থাকার পর, কাটা প্রত্যঙ্গগুলোকে আগের জায়গায় এনে জুড়ে দিলাম, তুলে নিলাম তরবারিগুলো খুব মসৃণভাবে। তারপর অ্যালহেইডের কপাল থেকে থুতনি অবধি আগের মত হাত বোলাতেই সে উঠে বসলো আস্তে আস্তে। করতালিতে ফেটে পড়লো “ইনকান্তো”। আমরা দু’জন এগিয়ে গিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে দু’হাত ছড়িয়ে দিলাম। মখমলের লাল যবনিকা নেমে এলো।
“আমি ভগবান অ্যালহেইড, আমি ভগবান!”, বলে জড়িয়ে ধরলাম অ্যালহেইডকে। ও-ও জড়িয়ে ধরলো আমায়, বোধহয় আমার বুকের ভেতর বেগবান নদীর মত হৃৎস্পন্দনগুলোকে বুঝতে চাইলো, বললো, “আমি জানতাম তুমি পারবে।”
সত্যিই ও জানতো। সেইজন্যই গত কয়েকমাস ধরে রাতের পর রাত জেগে যখন অনুশীলন করতাম, ও কেমন অকাতরে নিজেকে সঁপে দিত আমার হাতে! ছোটো ছোটো হাতের কারসাজি দেখেই ও বুঝেছিল, আমি এটাও পারবো। দুর্ঘটনার ভয় বা দুশ্চিন্তার লেশমাত্র দেখিনি কোনোদিন ওর মুখে। এই অ্যাক্ট’টার পুরো কৃতিত্ব অ্যালহেইডের, আমার নয়।
সেদিন রাতে ঘুমোতে পারিনি। নানা চিন্তা মাথায় এসেছে। সেই কবে, ১৬ বছর আগে, বার্লিনে পড়ার সময় শিখেছিলাম। বন্ধুরা বারণ করেছিল সেই অচেনা বুড়োর কাছে যেতে, কাউকে জানাইনি। রটে গেছিল, প্রাচ্যদেশ থেকে আসা ঐ বুড়ো নাকি কালাজাদুর গোপন ভাষা জানে। আমার তখন টগবগে যৌবন। কোনোরকম জাদু-টাদুতে বিশ্বাস করিনা। তাই সাহসে ভর করেই গেছিলাম। বুড়ো কেমন একটা পরিবেশে থাকতো। আমার প্রশ্নবাণে জর্জরিত বুড়ো মাঝেমাঝে একটা করে জাদু দেখাতো আর বিদখুটে ভাষায় গান গেয়ে উঠতো। প্রথমে বিরক্তিকর লাগতো, তারপর বুড়ো একদিন শেখাতে লাগলো। আগ্রহ সহকারে শিখলাম। বুড়ো প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিল, খুব প্রয়োজনে না পড়লে, না দেখাতে। সেইমত, কাউকেই দেখাইনি। দেখিয়েছিলাম অ্যালহেইডকে। জানিনা কেন মনে হয়েছিল, ওকে দেখানো দরকার।
সকালে উঠেই আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম ভেনিস ভ্রমণে। রাস্তা থেকে আমার ম্যাজিক শো’এর বেশকিছু পোস্টার খুলে নেওয়া হয়েছে, রয়ে গেছে কিছু। আমরা দু’জন সোজা গিয়ে উঠলাম একটা গন্ডোলায়। অ্যালহেইডকে আজ একটু বেশীই সুন্দর দেখাচ্ছিল, হয়তো আমার মনের কারণে। গ্র্যান্ড ক্যানেলের ওপর কিছুক্ষণ ভাসার পর ও বললো—ইনকান্তো’র মালিক নাকি কাল রাতে খুশী হয়েছেন। বলেছেন সপ্তাহে একটা করে শো পাবো আপাতত।
কথাগুলো শুনলাম। তবে আমার চোখ তখন রিভা ডেই স্কিয়াভোনি, দজের প্রাসাদ ছুঁয়ে চলে গেছে পিয়াজেত্তা’র দিকে। চোখ নামাতেই দেখলাম ছোকরা গন্ডোলাচালক আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। দুপুরে আমরা গেলাম ললিত শিল্পকলার অ্যাকাডেমী “Academy delle Belle Arti”-তে। বেশকিছু তেলরঙে আঁকা ছবি অবাক হয়ে দেখলাম। তারপর চলে এলাম রাস্তার ধারের একটা রেস্তোরায়। কিছু অর্ডার করার পর অ্যালহেইড জিজ্ঞেস করলো আমায়—কেমন আছেন হের আর্মব্রুস্টার? ঘোর কেটেছে?
আমি বললাম—জীবনটাই তো একটা ঘোর, মিস ইপস্টিন।
—তোমার মনে আছে, এখানেই আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল?
—এখানে!
—হ্যাঁ। তুমি একটা আকাশী শার্ট পরে হেঁটে যাচ্ছিলে। আর আমি দেখছিলাম, তুমি ফ্যাশন সম্পর্কে কিস্যু জানোনা।
—জার্মান আর ফ্যাশন!
—হাঃ হাঃ, বিষয়টা জার্মানদের বলে এড়িয়ে যেওনা। বহু জার্মান দেখেছি যাদের ফ্যাশন-সচেতনতা রীতিমত ঈর্ষণীয়।
—হুম, আমি কিছুটা পাগলাটে কবি ধরনের। বাহ্যিকতা আমার কাছে তেমন গুরুত্ব পায়না।
—কোনো কবিতা লিখেছো কোনোদিন?
—না, লিখিনি। তবে লিখবো তোমায় নিয়ে...
—তাই নাকি! আমি ধন্য হবো কোনো ম্যাজিশিয়ানের হাতের শব্দ হয়ে উঠতে পারলে।
প্রায় একবছর হতে চললো, দু’জন অচেনা এত কাছাকাছি চলে এসেছি। দেশ ছেড়ে ইটালী এসেছিলাম বোনের মৃত্যুর দুঃখ ভুলতে। খুব ভালোবাসতাম ওকে। মেরী মারা যাবার পর ফাঁকা বাড়িতে একদম ভালো লাগতো না। ইটালীতে এসে ভেনিস গেছিলাম। জায়গাটা আমাকে হাল্কা করছিল ধীরে ধীরে। ইতিমধ্যে অ্যালহেইডের সাথে আলাপ। প্রাণবন্ত আমেরিকান যুবতী, ভেনিসে এসেছিল ভবিষ্যত বানাতে, অর্থ উপার্জন করতে। ও-ই জানতে চেয়েছিল আমার কাছে, কি এমন পারবো আমি যা এই মানুষের ভিড় পারবে না। বুড়োর শেখানো ট্রিকগুলো দেখিয়েছিলাম হোটেলের ঘরে। বাকিটা আমার অনুশীলন আর ওর জেদের গল্প। তবে আমরা এখন নিজেদের খুব ভালোমত চিনে গেছি। ভেনিসের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো অনেক প্রেমিক-প্রেমিকার থেকে আমরা একে-অপরকে গভীরভাবে জানি। অথচ আমরা বন্ধু এবং সেই বন্ধুত্বটাকে আমরা চাপহীন, খোলামেলাভাবে উপভোগ করি। হোটেলে দুটো আলাদা কামরায় থাকি, যাতে রাতবিরেতে “প্রেম” এসে আমাদের দামী সম্পর্কটাকে নষ্ট না করে!
এভাবে বেশ ভালোই কাটছিল দিনগুলো। সপ্তাহে একটা করে শো আর ঘুরে বেড়ানো, সামুদ্রিক খাবার খাওয়া, অপেরা দেখা আরো কত কি! মাঝেমাঝে কতটুকু স্বপ্ন আর কতটুকু বাস্তব আলাদা করতে বসলে অ্যালহেইড বকতো। বলতো—পুরোটাই জীবন। এভাবে ভাগ করা কেন!
বুঝলাম একটা পরিবর্তন আসছে। রাস্তাঘাটে মানুষজন আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। দোকানে, রেস্তোরায়, গন্ডোলায়, এমনকি অপেরা চলার সময় দর্শকাসনেও। প্রথমে অস্বস্তি হত, মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় কয়েকটা মাস কেটে গেল। এবার আর পারা গেলনা। যুবতী থেকে বৃদ্ধা, যেখানেই মুখোমুখি হই, এগিয়ে আসে পেন আর কাগজ, অটোগ্রাফের আবদার। নাহলে পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার অনুরোধ।এতদূর অবধি মেনে নেওয়া যেত, কিন্তু শিশুদের মা-বাবারা প্রায়ই অনুরোধ করতেন এক-আধটা “ট্রিক” তাদের ছেলেমেয়েদের দেখিয়ে দিতে। অ্যালহেইড বেশ বুদ্ধি করে সামাল দিত ব্যাপারগুলো, কিন্তু শেষমেষ ও-ও হাল ছেড়ে দিল। বাইরে বেরোনো বন্ধ হয়ে গেছিল, বেরোলেও খুব সাবধানে। সকাল থেকে বিকেল অবধি অ্যালহেইডের ঘরে চলে আসতাম, সন্ধ্যায় ও আসতো আমার ঘরে। চলতো প্রচুর গল্প, প্রচুর আড্ডা। এরকমই একটা সন্ধ্যেতে অ্যালহেইড এসে গল্প জুড়েছিল। কথাপ্রসঙ্গে বললো—এর আগেও বহুবার জানতে চেয়েছি, এড়িয়ে গেছ। তোমার পরিবারে কারা আছেন?
—কেউই নাই।
—মানে? মা-বাবা...
—মা...বহুবছর আগেই মারা গেছে। বাবাও কয়েকবছর আগে। একটা বোন ছিল, মেরী, সে-ও...
—ওফ, স্যরি!
—না, ঠিক আছে। জীবন থাকলে মৃত্যু তো থাকবেই। তবে মেরীর মৃত্যুটা খুব ভুগিয়েছিল আমায়। খুব ভালোবাসতাম ওকে। মেরী চাইতো বার্লিনের রাস্তায় ভবঘুরের মত না ঘুরে ছোটোখাটো একটা কাজ করি। আসলে ঠিক করেছিলাম, করলে বড়োসড়ো কিছু একটা কিছু করবো, নয়তো করবোই না।
—ভেনিসে আসাও কি সেইজন্যই?
—না, তা নয়। শুনেছিলাম ভেনিস খুব বর্ণময় শহর। মনে হয়েছিল ওখানে গেলে হয়তো ভুলে যাবো মেরী’কে...
কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপ রইলাম। তারপর আমিই বললাম—এমনিতে তোমার পরিবার সম্পর্কেও কিছু জানতে চাইনি। আসলে নিজেরটা বলতে অসুবিধা হয়...
—মা আছে বাড়িতে। দু’জন দাদা। বাবার খবর জানিনা।
—জানোনা মানে?
—এতদিনেও খোঁজ মিললো না, মারাই গেছে নিশ্চয়। অবশ্য মা মানতে চায়না, বলে, ঠিক কোনোদিন ফিরে আসবে।
—মানে? কোথায় ফিরে আসবে?
—আমাদের কাছে, আমেরিকায়। আগে আমরা জার্মানীতে থাকতাম।
—তারমানে তুমিও জার্মান?
—না, ইহুদী। যুদ্ধ শেষ হওয়ার বছরেই আমার জন্ম হয়। মা আমাদের নিয়ে চলে আসে ওখান থেকে।
—আর তোমার বাবা?
—বড়দাদা বলে বাবাকে ওরা কনশেনট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে গেছিল। সেখানেই মেরে ফেলেছে। মা মানতে চায়না।
চুপ করে যাই। রাতে একসাথে খাওয়া-দাওয়ার পর অ্যালহেইড নিজের ঘরে চলে গেলে জানালায় এসে বসি। একটা খাপছাড়া ধরনের অস্বস্তি জেঁকে বসে। আনচান করতে থাকে শরীর, মাথাটা ভারী হয়ে আসে। ড্রয়ার থেকে ওয়াইনের বোতল বার করে ঢালি একটা গ্লাসে। নীলাভ রাত। মায়াবী পরিবেশ সামনে রেখে চুপচাপ বসি নিদ্রাহীন। কেউ যেন বহুযুগের চেপে রাখা একটা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ খুলে দিয়েছে। মনের ভেতর “দ্য ওয়েস্টল্যান্ড” কবিতার শেষ লাইনটা আঁকতে থাকি, বারবার, বারবার, বারবার ...

(২)
দিনের আলো ফুটলে রাতের তারারা আর চোখে পড়েনা। কিন্তু তারা রয়ে যায় সেভাবেই, আঁধার অবধি, তাদের মুখ দেখাবে বলে। সকালে হোটেলের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছিলাম নিজেরই একটা কাট-আউটের মুখোমুখি। সত্যি, পুরো দুনিয়ায় এই একটাই মানুষ আছে, যাকে আমি পুরোপুরি চিনি। অ্যালহেইড, কে এই অ্যালহেইড, একটা ইহুদী মেয়ে, যে আমাকে ব্যবহার করছে টাকা উপার্জনের জন্য। মনের কোনো একটা চোরাগলি দিয়ে বিষ ঢুকছে, খাঁটি আর্যরক্তের বিষ, লাল আর সোনালী মিলেমিশে যাচ্ছে ঈগলের শিরায় শিরায়। অ্যালহেইডের কাছে গেলাম না, ও-ও আসলো না। বিকেলে একটা ওয়েটারকে দিয়ে জানিয়ে পাঠালো, “প্রস্তূতি নিতে; শো শুরু হতে চলেছে।”
শো শুরু হল। আমি যথারীতি সেই স্বাভাবিক ছন্দে, কাউকে বুঝতে দোবোনা, কোথায় কি হয়ে চলেছে। কিন্তু ভারসাম্য রাখা গেলনা। শেষ অ্যাক্টে অ্যালহেইড এলো একইরকম, হাসিমুখে। ওকে অচেতন করে তরবারি আনলাম, কিন্তু বিঁধতে পারলাম না একটাও। সব ঝাপসা মনে হল, হলুদ তারা, মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে কিছু শরীর, রক্তের সরু স্রোত আমার পায়ের আঙুল ছুঁয়ে ফেলবে, লুগার হাতে ওটা কে দাঁড়িয়ে, আমি নই...আমি নই! সব কেমন যেন...বিস্বাদ রঙের...তলিয়ে যাচ্ছি...
“ক্যাসপার, ক্যাসপার!”, চমকে উঠে বসতেই দেখলাম একটা ফাঁকা ঘর, আমারই ঘর, অ্যালহেইড, এত উদ্বিগ্ন কেন!
অ্যালহেইড আমার পিঠে হাত রেখে বললো—তোমার কি হয়েছে? কাল সারাদিন দেখা করোনি, রাতে “ফাইনাল অ্যাক্ট” করতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলে!
একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম—কিছু না। বোধহয় frutti di mare জিনিষটায় ঠিক সায় দিচ্ছেনা পেট। তারওপর শো’এর আগে শ্যাম্পেন...ঠিক হয়নি!
অ্যালহেইড কোনো কথা বললো না। মনে হল বিশ্বাস করেছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর উঠে চলে যাবার সময় বলে গেল—বিশ্রাম নাও। দরজা ঠেসিয়ে যাচ্ছি, দরকার পড়লে ডেকো।
শুয়ে শুয়ে ভাবলাম, একবার দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, আর হবেনা ওরকম। কাজেই অ্যালহেইডকে বলবো না। কেমন এসে মেকি সহানুভূতি জানিয়ে গেল! সত্যি, টাকার জন্য এরা কি-ই না করতে পারে! কোটের গোপন পকেট হাতড়ে একটা কার্ড বার করলাম, তাতে লেখা, “ক্যাসপার আর্মব্রুস্টার”। সেটাকে উল্টাতেই দেখলাম স্বস্তিকার চিহ্ন, আপন মনে হেসে উঠলাম যেন...
কিন্তু না, ওটা একদিনের দুর্ঘটনা ছিলনা। পরের শো’তেও “ফাইনাল অ্যাক্ট” করতে পারলাম না। অচেতন অ্যালহেইড আর ঝকঝকে তরবারি রেখেই স্টেজ ছাড়লাম। অ্যালহেইড বুঝতে পারলো, কোথাও কিছু একটা অসুবিধা হচ্ছে। ওর অসংখ্যবার জিজ্ঞাসা সত্ত্বেও চুপ করে রইলাম। চাইলাম প্রসঙ্গ বদলাতে। পরের সপ্তাহেও একইরকম হতেই দেখলাম আমার বেশকিছু পোস্টার খুলে ফেলা হচ্ছে। হাউসফুল হওয়া বন্ধ হয়ে গেছে, মানুষ আর আমার ম্যাজিক শো দেখছে না। সেদিন সন্ধ্যেয় অ্যালহেইড হুড়মুড়িয়ে এসে ঢুকলো আমার ঘরে। বললাম—বসো।
রাগত স্বরে অ্যালহেইড ফিরিয়ে দিল—বসতে আসিনি। কিছু কথা বলতে এসেছি। আর কোনো শো দেওয়া হচ্ছেনা আমাদের। লাভের তিরিশ শতাংশ নিয়ে “ইনকান্তো” ছাড়তে বলেছে ওরা। এখনো কি তুমি বলবে না, তোমার কি হয়েছে?
আমি আর পারলাম না, চিৎকার করে উঠলাম—কিছুই হয়নি! তোমার মত অশুদ্ধ, সুদখোর ইহুদীদের জন্যই দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধে আমাদের কিছুই হয়নি! স্যাক্সন-টিউটনদের বংশধর আমরা, বিশুদ্ধ আর্যরক্তের যোদ্ধা...অথচ ভার্সাই চুক্তি চাপানো হল আমাদের ওপর, বার্লিনের প্রাচীর, একশো মাইল ধরে, জার্মানীকে নষ্ট করে দিল ওরা...কেবল তোমাদের মত শয়তানের উপাসকদের জন্য! কিছুই হয়নি...
অ্যালহেইড চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। কিচ্ছু বললো না। খুব আস্তে আস্তে মাথাটা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। শান্তি পেলাম।
পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতেই দেখলাম রুম সার্ভিসের এক যুবক বার্তা দিয়ে গেছে। অ্যালহেইড পাঠিয়েছে, বেরোতে হবে। শার্ট-প্যান্ট বদলে বেরিয়ে এলাম হোটেলের বাইরে যেখানে আসার কথা ছিল। তারপর শুরু হল যাত্রা, বুঝতে পারলাম ভেনিস ছাড়ছি। পুরো রাস্তায় একবারই ওর সাথে কথা বলেছিলাম, জানতে চেয়েছিলাম কোথায় যাচ্ছি, গম্ভীরভাবে উত্তর এসেছিল, “টাস্কানি”।
টাস্কানির সেই বিখ্যাত রাস্তা, দু’পাশে উঁচু উঁচু গাছ, তারপাশে ঢেউখেলানো উপত্যকা জুড়ে শুধুই আঙুরক্ষেত। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হেঁটে চলেছি দু’জন। অ্যালহেইড ক্লান্ত হয়ে গেছে বুঝতে পারি, ভাবি ওর ব্যাগটা নোবো কিনা। আরো কিছুক্ষণ হাঁটার পর দেখলাম ও পিছনে রয়ে গেছে, ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। কিন্তু ও জল খেয়ে রাস্তাতেই বসে পড়লো। অবাক কান্ড! পিছিয়ে এসে বললাম—কি হল?
ক্লান্তির সাথে উত্তর এলো—পারবো না।
—কেন?
—ইহুদী কিনা।
—এখানে আসার মানে?
—বাবা। বাবার স্বপ্ন ছিল টাস্কানির এই রাস্তাটায় হাঁটবে। এখানে হাঁটলে নাকি দুনিয়ার সমস্ত বোঝা হাল্কা হয়ে যায়।
—তো?
—সেকারণেই আসা। তোমার তো আবার রক্তও তোমার বোঝা।
—আমার পকেটে জার্মান-মেড পিস্তল আছে। কাজেই সহ্যের সীমা ছাড়িওনা।
—আচ্ছা, আচ্ছা। এখানে খানিকক্ষণ বসতে তো পারো, যদি যোদ্ধা পূর্বপুরুষদের অপমান না হয়?
কথা না বাড়িয়ে বসলাম চুপচাপ। কিন্তু অ্যালহেইড বলেই গেল—এখানে আমায় মেরে দিলে মা জানতে পারবে না। বাবার মতই হবে, বলবে, ফিরে আসবে। আচ্ছা, তুমি কি নাৎসি?
কোনো উত্তর দিলাম না। একটা সিগারেট ধরালাম। অ্যালহেইড থামলো না—শুনেছি নাৎসিরা ইহুদী দেখলেই মেরে দেয়। তুমি আমাকে প্রথমদিনই মারলে না কেন, ভেনিসের রেস্টুরেন্টে? পরেও তো মারতে পারতে! এখনই বা মারছো না কেন? ম্যাজিশিয়ান হওয়ার স্বপ্নপূরণ করেছি বলে?
বললাম—দ্যাখো, তুমি যদি এখানে আমায় বদলাতে এসে থাকো, তাহলে ভুল করেছো।
—কে বললো বদলাতে এসেছি! আমি শুধু জানতে চাই তোমার অসুবিধাটা কোথায়। ধরো আমার জায়গায় কোনো আর্যরক্তের জার্মান মেয়ে ঐ “ফাইনাল অ্যাক্ট”-এ আসবে, তুমি পারবে?
—না।
—কেন? সে তো তোমার জাতির!
—আমি আর ম্যাজিকই দেখাবো না।
—কেন? কত মানুষ মনোরঞ্জন পায়!
—কিসের মনোরঞ্জন! আমি একটা মেয়েকে কেটে ফালাফালা করে দিই, আর ওরা হাততালি দেয়!
—সে তো তুমিও চাও। তফাত কোথায়? আর ওটা তো ম্যাজিক, সত্যি নয়।
—সন্ধ্যে নামছে।
—নামুক, আজ সন্ধ্যেটা আকাশের তলাতেই কাটাবো।
—চোর-ডাকাত।
—ভয়ের কিছু নাই। নাৎসি ক্যাসপার আর্মব্রুস্টার রয়েছে আমার সাথে, তার সাথে পিস্তল।
—পিস্তল নাই আমার কাছে।
—তাই নাকি?
—হুম, আমি নাৎসি-ও নই।
—তবে তোমার অসুবিধাটা কোথায়?
—কেন জানতে চাইছো?
—কেননা আমরা খুব ভালো বন্ধু।
—শোনাটা কি খুবই দরকার?
— খুব...
—আমার বাবা গেস্টাপো বাহিনীর সৈন্য ছিল। গ্রে হাউন্ড নিয়ে ধাওয়া করতো ইহুদীদের। বহু মানুষ মেরেছে, বহুজনকে ক্যাম্পে পাঠিয়েছে। মা এসব মেনে নিতে পারতো না, বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। খুব দুঃখ পেয়েছিলাম, কেঁদেছিলাম লুকিয়ে লুকিয়ে, সামনে কাঁদার অনুমতি ছিলনা। বাবা বলতো, দুর্বলেরা কাঁদে। রাশিয়ানরা যখন বানের জলের মত বার্লিনে ঢুকেছিল, বন্দুকও ধরেছিলাম, তখন আমি খুব ছোটো, ভুলে যেতে চাই সেসব...
—হুম, আমি জানি তুমি ওরকম নও।
—সন্ধ্যে নামছে। এখানে থাকাটা আর ঠিক হবেনা।
— চলো, সামনের ফার্ম হাউসটাতে দুটো ঘর বলে রেখেছি আগেই।
ফার্ম হাউসে ভালো আতিথেয়তা পেলাম। খাওয়া-দাওয়া করে, পোশাক বদলে আমাদের আবার দেখা হল। বললাম—কি হল, হাসছো?
—ফার্ম হাউসের মালিক আমাদের স্বামী-স্ত্রী ভেবেছেন। অথচ দুটো ঘর নিতে দেখে তিনি অবাক।
—সেটাই স্বাভাবিক।
—কাল আমরা চললাম সিসিলি।
—আচ্ছা, আমরা কি ইটালী ভ্রমণে বেরিয়েছি?
—একদম। তুমি বোনের দুঃখ ভুলতে আর আমি টাকা কামাতে।
—আর সুস্থ হয়ে পারফর্ম না করা অবধি তুমি আমায় ছাড়ছো না, তাইতো?
—মানে?
—মানে তোমরা ইহুদীরা টাকা ছাড়াও কি কিছু বোঝো! আমি যেহেতু সোনার ডিম দেওয়া মুরগী ...
অ্যালহেইড হাসতে লাগলো। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। হাসতে হাসতেই ও বললো—তারমানে তুমি নিজেকে মুরগী ভাবো! হাঃ হাঃ, নিজের সম্বন্ধে এত স্বচ্ছ ধারণা এর আগে কারো দেখিনি, হাঃ হাঃ!
—কথা ঘুরিও না! তুমি আমাকে ব্যবহার করছো, নিজের স্বপ্নপূরণের জন্য।
—একই কথা আমিও বলতে পারি। দ্যাখো, আমাদের দুজনেরই দুজনকে দরকার। তুমিও কোনো অন্য কোনো মেয়েকে নিয়ে ফাইনাল অ্যাক্ট করতে পারো, আমিও অন্য কোনোভাবে টাকা উপার্জন করতে পারি। কিন্তু অন্যপথে গেলে আমাদের আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে।
—আমি আর ম্যাজিক শো করবো না।
—তবে কি করবে? মানুষ খুন? ইহুদী শিশু মারবে? স্যাক্সন-টিউটনদের মত রক্তের বন্যা আনবে? আমরা যদি শুধু টাকা বুঝি, তো তোমরাও রক্ত ছাড়া কিছু বোঝোনা। ভালো কিছু করে যাও দুনিয়াতে, থেকে যাবে। তুমি ক’টা মানুষ মেরেছো কেউ গুনবে না, কিন্তু সামান্য কয়েকটা কবিতা লিখলেও মানুষ পড়বে, জানবে।
—জ্ঞান ভালো লাগছে না।
—হুম, কোথায় কি বলছি! মানুষের ভালোবাসায় বেঁচে থাকো ক্যাসপার, ঘৃণায় নয়।
—আমাকে একা ছেড়ে দাও।
অ্যালহেইড আর একটাও কথা না বলে বেরিয়ে চলে গেল। ও যা বলছে, খারাপ বলছে না। কিন্তু আমি আর পারবো না। আমি হাল্কা হতে চাই, বাতাসের মত; মুক্ত হতে চাই পাখির মত।
সকালে আবার বেরিয়ে পড়লাম। সিসিলি। আজ অ্যালহেইড কথা-ই বলছেনা, আমার অস্বস্তি হচ্ছে। ভাবছি বলেই ফেলি, ম্যাজিক বাদে অন্যকিছু করবো। কিন্তু জ্ঞান দিতে আরম্ভ করলে! সিসিলে পৌঁছে ও নিজেই বললো—একটা ঘর ভাড়া করেছি। টাকা ফুরিয়ে আসছে।
বললাম—অসুবিধা নাই। আমি সোফায় শুয়ে যাবো।
অ্যালহেইড ঘুরে তাকালো আমার দিকে, আমার চোখে। ইতস্তত বোধ করলাম। বললো—সমুদ্রের ধারের ঘরে সোফা থাকেনা। তোমাকে বালির চরে ঘুমোতে হবে।
আমতা আমতা করে বললাম—তাই-ই হবে।
—তবুও তুমি ম্যাজিকে ফিরবে না, তাইতো?
—পোশাকটা বদলে আসি।
—যাও, কিন্তু প্রসঙ্গটা নয়।
পোশাক বদলে এসে দুজনেই গিয়ে বসলাম সমুদ্রের ধারে। পাড়ে ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ। স্বচ্ছ নীল জল আঁধারের সাথেই কালো হয়ে এলো। একটা সিগারেট বার করতেই অ্যালহেইড সেটা কেড়ে নিল, আগুন জ্বালিয়ে টান দিল। আমি আরেকটা বার করলাম। ও বললো—ম্যাজিকে ফিরছো না?
—ইচ্ছা নাই আর।
—কেন?
—অন্যকিছু করলে হয়না?
—কেন?
—ম্যাজিক ভালো লাগেনা।
—কেন?
—বারবার “কেন কেন” কোরোনা তো! ফাইনাল অ্যাক্টটা করতে ভয় পাই। অনেক রক্ত দেখেছি।
—কিন্তু ওটাতে তো রক্ত ঝরেনা! ওটা তো ম্যাজিক।
—জানি। কিন্তু ভয় হয়। এই হাত দিয়েই। গুলি মেরেছি তিনজনকে। দু’জন রাশিয়ান। শৈশবে।
—তৃতীয় জন?
—একটা গোটা ব্যাটেলিয়নকে বাঁচানোর জন্য মেডেল পেয়েছিলাম। ফ্যুয়েরার নিজে হাতে দিয়েছিলেন আমায়। দশ কি বারো বয়স তখন...
কোটের খুপরি পকেট থেকে ধাতব জিনিষটা বার করে অ্যালহেইডের হাতে দিলাম। ও নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলো। বলতে থাকলাম—রক্তের স্রোত এসে আমার পা ভিজিয়ে দিয়েছে, মা খুব কাঁদতো, ভয়ে কিছু বলতে পারতো না, কত কত ইহুদীকে চোখের সামনে লুটিয়ে পড়তে দেখেছি, হলুদ ব্যাজ পরা লাশ, তবুও ওরা ছুটে আসতো, লকলকে গ্রে হাউন্ডগুলোর জিভ আর ঐ পাষণ্ডগুলোর চোখে রক্তের লোভ, আমি ওদের মত নই...আমি ওদের মত নই!
—ক্যাসপার, ক্যাসপার!
—হ্যাঁ! বহুদিন ভেবেছি মেডেলটা ছুড়ে ফেলে দোবো। এটা গৌরব নয়, কলঙ্ক!
অ্যালহেইডের হাত থেকে মেডেলটা কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিই। ও অবাক হয়ে যায়। শান্ত হই আস্তে আস্তে। বলতে থাকি—মেরীকে বাবা একদম ভালোবাসতো না। হয়তো দুর্বল মেয়ে ছিল বলেই। খুব মারতো। সেদিন রাতে বাবা ওকে মেরেই ফেলতো! আমি চাইনি বাবার লুগারটা বাবার দিকে করেই ট্রিগার টিপতে, কিংবা হয়তো চেয়েছিলাম। শয়তানটা অনেকক্ষণ ছটফট করেছিল আর রক্তের স্রোত এসে আমার পায়ে ঠেকেছিল! মেরী খুব কাঁদছিল, আমি কাঁদিনি একটুও, শক্তিশালী কাঁদেনা...
অ্যালহেইড অবাক চোখে তাকিয়ে শুনছিল। সমুদ্র অশান্ত, চাঁদ উঠতে চলেছে, একফালি। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম তারপর আবার শুরু করলাম—ন্যুরেমবার্গ বিচার শেষ হল। উঠলো দেওয়াল। দুজন অনাথ কাকার বাড়িতে এসে উঠলাম। তখন থেকেই আমি কেমন যেন হয়ে গেলাম, যা মন হত করতাম। সবসময় চাইতাম মৃত্যু আসুক, আসতো না। যেখানেই বিপদ, সেখানেই আমি। ম্যাজিকটাও শিখেছিলাম ঐসময়। তারপর কাকা মারা গেল, বন্ধুরা ছেড়ে গেল, ফ্যাকাসে বোবা পাথর। রাস্তায় অন্যায় দেখেও কিছু বলতে পারতাম না, আমি নিজে কি! মেরী বোঝাতো। বোঝানোর সময়টুকু বুঝতাম, তারপর ভুলে যেতাম। মেরির ক্যান্সার হয়েছিল জানতাম না, যখন জানলাম তখনও কিছু করতে পারলাম না। তিল তিল করে বোনটাকে মরতে দেখলাম চোখের সামনে...ছোটোখাটো কিছু করে বাঁচানো যেতনা ওকে, তাই...
কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই বুকেই ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো, চুপ করে গেলাম। চোখ ছলছল করে উঠতেই অ্যালহেইড জড়িয়ে ধরলো আমায়, কেঁদে ফেললাম। ও বললো—এগুলো না বললে কিকরে বুঝতাম বলোতো! অকারণ চাপ দিচ্ছি তোমায় প্রথম দিন থেকে। আর ম্যাজিক শো নয়, আমরা নতুন কিছু করবো।
সমুদ্রের কাছেই একটা ছোট্টো কটেজ। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর সেখানেই ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ গল্প-গুজবের পর টেবিল থেকে হুইস্কির বোতল আর একটা গ্লাস তুলে নিয়ে বললাম—ঠিক আছে, তুমি ঘুমোও, আমি চলি বালুচরে রাত কাটাতে।
অ্যালহেইড অবাক। চোখ বড়ো বড়ো করে বললো—ওহো, ওটা তো মজা করে বলেছিলাম।
—আমি কারোর সহানুভূতি চাইনা। (হাসলাম)
—সহানুভূতি! আমার বয়েই গেছে!
—তবে?
বিছানা ছেড়ে উঠে এলো অ্যালহেইড। চোখে চোখ রেখে আমার সামনে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ উসখুস করার পর জড়িয়ে ধরলো আমায়, তারপর ঠোঁটে চুমু রাখলো। আমি হতবাক! কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে গেল, “ভালোবাসি”। বলার মত কোনো শব্দ পেলাম না, তবুও আপ্রাণ চেষ্টা করে বললাম—কিন্তু, আমরা যে ঠিক করেছিলাম, ভালোবাসা নয়...
অ্যালহেইড হাসলো। আমার হাত থেকে বোতল আর গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বললো—নিয়ম ভাঙার নামই তো জীবন। আজ রাতে এই বিছানায় তোমার ম্যাজিক দেখবো।
হাসলাম। পকেট থেকে নাৎসি পরিচয়পত্রটা বার করে বাইরে ছুড়ে ফেলে দিলাম। তারপর দরজাটা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে দিলাম।
সকালটা খুব প্রশান্তিময়। বহুযুগ যেন বুকে পাথর বয়ে বেড়াচ্ছিল কেউ, আজ মুক্ত হয়েছে। পাশে তাকাতেই দেখলাম অ্যালহেইড তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে। কালো চুলের রাশি ছড়িয়ে পড়েছে অনাবৃত সাদা ঘাড় আর কাঁধে। আস্তে আস্তে বললাম—খুব ভয় হত তরবারিগুলো তোমার নরম শরীরে বিঁধতে...
—জানি। তুমি তখন থেকেই ভালোবাসতে আমায়।
—হয়তো...
—আর কোনো ভয়?
—নাঃ, আর কিচ্ছুনা। হিংসা, রাগ, ক্ষোভ, বিদ্বেষ, ঘৃণা সব থেকে মুক্ত আমি। আচ্ছা, আমরা বিয়ে করতে পারিনা?
—একজন ইহুদীর সাথে?
—একজন মানুষের সাথে।
অ্যালহেইড জড়িয়ে ধরলো আমায়। চুমু খেল অজস্র। বন্ধ জানালার ফাঁকফোকর দিয়ে যে সামান্য একটু আলো ঢুকছিল, সেটাকে আঙুল দিয়ে ধরে বললো—বিয়ে আমরা করবো, তবে কয়েকমাস পর।
—কয়েকমাস পর কেন?
—এই মুহুর্তে আমাদের হাতে টাকা কম ক্যাসপার।
—তবে?
—ম্যাজিক শো বাদ দিয়ে...অন্য কোনো শো। অপেরা গাইলে কেমন হয়?
—ম্যাজিক শো বাদ কেন?
—ফাইনাল অ্যাক্ট! উফফ...তুমি না!
—পারবো এবার।
—পারবে? নিশ্চিত?
—হ্যাঁ।
—দ্যাখো, আগেরবারের মত হলে কিন্তু মার খেতে হবে এবার!
—না, পারবো। আর কোনো অসুবিধা নাই।
—ব্র্যাভো! তাহলে আজই আমরা ভেনিস যাবো। “ইনকান্তো”-য় শো। শো থেকে টাকা। টাকা দিয়ে বিয়ে।


(৩)
ভেনিস, সেই পুরোনো ভেনিস। আমরা সময় নষ্ট না করে কাজে লেগে পড়লাম। কথা বললাম “ইনকান্তো’’-র মালিকের সাথে। তিনি রাজী হলেন অনেক টালবাহানার পর। আবার সেই প্রথমবারের মত রাস্তায়-রাস্তায়, গলিতে-গলিতে আমার পোস্টার, কাট-আউট, ফেস্টুন ছেয়ে গেল। শো-এর আগেরদিনই জেনে গেছিলাম “হাউস ফুল” হতে চলেছে। উত্তেজনায় ফুটতে শুরু করেছিলাম আবার!
শো-এর সন্ধ্যা এসে উপস্থিত হল। আমি স্টেজের পিছনে মেক-আপ রুমে বসে রোম্যান্টিক কবিতা পড়ছিলাম। অ্যালহেইড এসে ঢুকলো, বললো—সব রেডী?
—একদম, মহারানী।
—একটা ট্রিকও কিন্তু প্র্যাকটিস করোনি!
—ছোটো শিল্পীরা প্র্যাকটিস করে, বড়ো শিল্পীরা পারফর্ম।
—আচ্ছা?
—সিসিলিতে যে ট্রিকগুলো দেখিয়েছিলাম, কোনোদিন প্র্যাকটিস করিনি।
অ্যালহেইড হাসে। ওর চোখেমুখে শয়তানির ঝিলিক খেলে যায়। আমার ডানহাতটা ধরে বসে কোলের ওপর, ঘনিষ্ঠ। ওর উষ্ণ শ্বাসগুলো এসে পড়তে থাকে আমার কপালে। বাঁ-হাতে কবিতার বইটা দেখে জিজ্ঞেস করে—কি পড়ছিলে?
—এইকেনডর্ফ।
—শুনেছি উনি খুব নরম কবিতা লিখতেন?
—তোমার থেকে নরম নয়।
দুজনেই হেসে উঠি। আর চুম্বনের শব্দে মাতোয়ারা হয়ে যায় মেক-আপ রুম।
শো শুরু হয়। অসংখ্য মানুষের আগ্রহী চোখ সামলানো আমার কাছে খুব সহজ মনে হতে থাকে। প্রথমে ছোটোখাটো ট্রিক, হাততালি বাড়তে থাকে আস্তে আস্তে। ক্লাইম্যক্সের দিকে এগিয়ে যাই ধীর গতিতে। বুঝতে পারি প্রথমবারের মত হৃদয় না লাগালেও চলবে, এইকেনডর্ফের কবিতার মত বয়ে যায় প্রতিটা অ্যাক্ট, মসৃণভাবে। অ্যালহেইড আসে স্টেজে, চঞ্চল হরিণীর মত, সহজাত হাসি। ওর পাতলা, নরম শরীরটাকে দেখতে থাকি, টাইট নীল পোশাক আর পিছনে বেঁধে রাখা কালো চুলের রাশি। মনে হয়, স্টেজেই জড়িয়ে ধরে চুম্বন করি একবার! পৃথিবীতে এত সুন্দরী মেয়ে হয়তো আর কোথাও নাই! ওর ফিসফিসে ইশারাতে সম্বিৎ ফিরতেই ওর কপাল থেকে থুতনি অবধি হাত বোলালাম, ও অচেতন হয়ে গেল। পুরো শরীরটা এসে পড়লো আমার দুহাতে। আস্তে আস্তে সেটাকে টেবিলে শোয়াতেই নজর গেল ওর বুকে। এই ছোট্টো বুকে এত ভালোবাসা ছিল যে আমার সমস্ত ঘৃণা, সমস্ত ভয়, সমস্ত কলঙ্ক সমুদ্রের মত শুঁষে নিল! অনিচ্ছা সত্ত্বেও চোখ ফিরিয়ে নিয়ে গেলাম তরবারি আনতে। পাঁচটা তরবারি। এক এক করে গেঁথে দিলাম মসৃণভাবে। তারপর কাটা প্রত্যঙ্গগুলোকে আলাদা আলাদা করে সরিয়ে নিলাম। হতবাক বিস্ময়ের হাততালিতে ফেটে যাচ্ছে ইনকান্তো’র প্রতিটা দেওয়াল। আমিও স্বভাবসিদ্ধ হাসি হাসলাম প্রত্যঙ্গগুলোকে জুড়বার জন্য এগিয়ে যেতেই দেখি, আমার হাতের সাদা দস্তানাদুটো লাল হয়ে গেছে।
হাততালির আওয়াজ থামেনি।

আপনার মতামত জানান