গণৎকার

মৃগাঙ্ক মজুমদার
গত চল্লিশ বছর ধরে এক জায়াগায় বসে কাজ করে যাচ্ছে রামু। দোহারা চেহারা, চোখে চশমা, মাথা ভর্তি কাঁচাপাকা চুল, হালকা একটা গোঁফ, দাড়ি নিখুঁতভাবে কামানো. শুরুর দিকে ধুতি পাঞ্জাবী পরত বাবার দেখাদেখি কিন্তু তার কিছু বছর পরেই শার্ট প্যান্টে বদলে নেয় নিজেকে।

কিন্তু তার বসার জায়গার বদল সে আজ অবধি করে নি মোটামুটি জনবহুল একটা চৌমাথার পূর্ব দিকের রাস্তার ধারের একটা গাছের নীচে সে বসে। কখনো ভ্যানরিক্সা নিয়ে কখনো মাটিতে। রোজ বসার আগে ব্যাটারিটাকে চার্জ দিয়ে আনতে হয়। কারন সারাদিন ওই ব্যাটারীর জোরেই তার পাশে রাখা ছোট্ট বক্সের ভিতর থেকে রেকর্ডেড ভাষণ বেরিয়ে আসে সবার জন্য আর সে সারাক্ষ্ণ ধরে টুকটুক করে একটা আংটিকে সঠিক আকার দেওয়ার চেষ্টা করে।

" এই বিভিন্ন ধাতুর মিশ্রণে তৈরী আংটি আপনার জীবনে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনবে, আপনার শরীর থেকে রোগজ্বালা, জ্বরব্যাধি দূর করবে। আসুন একবার এগিয়ে আসুন, আপনার সমস্যার সমাধানের জন্য পা বাড়ান, ছোট ছোট সমস্যা থেকে নিজেদের মুক্ত করন। আমাদের এই আংটি অনেক বিপদ আপদ থেকে আপনাকে বাঁচিয়ে দেবে। এগিয়ে আসুন, দেখুন আর বাড়ি নিয়ে যান আপনার সৌভাগ্যকে, আপনারই হাতে করে"।

সপ্তাহের একদিনও বাদ দেয় না রামু, খালি ওই চত্বরে সবচেয়ে বড় মেলাটা হয় কালীপূজার সময় মিউনিসিপ্যালিটির মাঠে তখন সে ওই মেলার ঢোকার গেটের আগে একটু দ্দূরে মেলার মাইক বাঁচিয়ে বসে। ব্যাটারীওয়ালা বক্সের জোর বুঝে সব তোড়জোড়।

রামু এর মধ্যে একটা কাজই করে কোনদিকে না তাকিয়ে যে কোনো একটা আংটি নিয়ে তার চারিপাশে ঠুক ঠুক করে যাওয়া যতক্ষ্ণ না কেউ এসে উবু হয়ে বসছে সাজিয়ে রাখা আংটি গুলোর সামনে।

মাঝে মধ্যে টুকটাক আওয়াজ খায় রামু,, কখনো পথচলতি মানুষের থেকে কখনো আশেপাশের দোকানদার, রিক্সাওয়ালা আর ভ্যানওয়ালাদের কাছ থেকে। তাদের মধ্যে কিছু আবার রামুর কাছে আসে যখন খুব প্যাঁচে পড়ে আর রামুও চুপ করে তাদের কথা শোনে আর সেই মত আংটি বানায় তাদের আঙুলের মাপ ধরে। মাঝে মধ্যে বলেও দেয় কোন আঙুলে ধারণ করা উচিৎ। রামু কাউকে জোর করে না, গলা উঠিয়ে কথা বলে না, তর্কের ধারেকাছে যায় না। ওর হয়ে যা বলার সেটা ওই সাউন্ডবক্সের থেকে বেরোনো আওয়াজই বলে দিচ্ছে ।

আসলে অনেক কষ্টে লোকটাকে ধরা গিয়েছিল মানেযার গলা আর কি! লোকটা আগে নাকি নাটক করত । পাড়া, এলাকা ছাড়িয়ে শহর ছাড়িয়ে অনেক দূর অবধি লোকটার নাম ছিল। তবে বয়স হওয়ার পর ওই বিজ্ঞাপণের ক্যাসেটে একটানা বলে গিয়েছে গলাটাকে একই মাত্রায় রেখে। টানা শুনলে একটা ঝিম ধরে যায়। সবাই মুক্তির পথ খোঁজে এক রামু ছাড়া। তার কাছে মুক্তি আর যুক্তির কোন দাম নেই। সে দাম বোঝে খালি ওই পড়ে থাকা আংটিগুলোর ওপরে।

আংটিগুলো লোক বুঝে বাড়তে কমতে থাকে আর রামু মাঝে মাঝে এক একটা তুলে আবার তাদের নিজের আকারে ফিরিয়ে দেয়। কাউকেই বেশি বাড়তে দিতে নেই। রামু সেটা জানে বলেই আংটি গুলোকে কড়া নজরে রেখেছে। এমনিতে সে যেহেতু কাজের বাইরে কারোর সঙ্গে কথা বলে না তাই আংটিগুলো সঙ্গ দেয়। আংটিগুলো রামুর হিসাব রাখে। আসলে ওদেরই যে সবচেয়ে জোর বেশী সেটা তারা আস্তে আস্তে বুঝতে শিখেছে আর রামুর হাতে পড়লে যে ওদের দর বাড়ে সেটা ওরা ভালো করে জানে। তাই রামুকে ওরা বাধা দেয় না। ওদের মূল প্রতিযোগিতা দক্ষিণের সোনার দোকানটির সাথে। ওখানে এক বিশাল গণৎকার বসে। কিন্তু রোজ বসে না। সারা মাস আর সপ্তাহ ধরে সে রাজ্যের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ায় আর উপদেশ দেয়। কামাই বেশ ভালোই আর ভীড় ও ভালো হয়। এখন তো আবার ২ সপ্তাহ আগে থেকে নাম লিখিয়ে রাখতে হয় দেখা করার জন্য। সে যখন গাড়ি থেকে নামে গলায় গাদাগুচ্ছের রুদ্রাক্ষ আর কি কি পরে তিলক কেটে তখন তাকে ছোটবেলায় পড়া বিশে ডাকাতের থেকে কিছু কম লাগে না। কানে জবাফুল টা গোঁজা নেই এই যা।

রামু দূর থেকে দ্যাখে আর ভাবে বিশে ডাকাতের থেকে কম কিসে? চার ঘণ্টার জন্য আসে আর সবার কাছ থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নেয় সাথে আবার রঙিন পাথরগুলোকে গলাকাটা দামে ব্যাচে। এতে অব্শ্য সোনার দোকানের সাঁটও আছে। ওদের দোকান থেকেই কিনতে হয় সব পাথর। তার চেয়ে রামুর আংটি অনেক অনেক কম দামের আর গুণাবলীর জা ফিরিস্তি তাতে বাকিদের হার মানিয়ে রেখে দেবে যে কোনো দিন। তাও রামুর গাড়ি চড়া হয় না। রামুর সাইকেল ভ্যান বা সাইকেলই ভরসা। টিভিতেও কোনদিন ওই গণৎকারের মত মুখও দেখাতে পারবেনা। রামুর মুখ দেবে যে কেউ আংটি কিনবে না সেটা রামু বুঝে গিয়েছে । তাই রাস্তার ধারের গাছতলাটা আরামের আশ্রয়। রামুর কোন পার্টনারশিপ লাগে না। সে একা একা টুকটুক করে ঠুকে ঠুকে ভাগ্য তৈরী করে। অন্যের ভাগ্য।

বদলে গেল খালি সেই দিনটা যেদিন গনৎকার এর গাড়ি ভাঙচুর হল, রাস্তায় টানতে টানতে ফেলে মারতে মারতে রামুর দিকে এগিয়ে আসছিল ভীড়টা পুলিশ এসে গণৎকারকে উদ্ধার করে জেলে না পুরলে সেইদনই মারা যেত। রামু কাণাঘুষো শুনলো কোনো এক মহিলার ছেলে হবে বলে যজ্ঞের নামে বহু লাখ টাকা নিয়েছিল, সাথে ভুল পাথর গছিয়েছিল। আরো বড় খবরটা ভ্যানওয়ালাগুলো বলছিল নিজেদের মধ্যে। ওই সোনার দোকানের নিজের চেম্বারের মধ্যে বসে বশীকরণের নামে সেই মহিলার সারা শরীর জুড়ে হাত মেরেছিল। তার কিছুদিন পরেই আজ এই।

রামুর মনের খবরটা এত কিছুর পরেও মুখের ওপর ভেসে উঠল না। সে আস্তে করে স্পীকারের ভ্ল্যুমটা বাড়িয়ে দিল, " এগিয়ে আসুন না , দেখুনই না একবার, আমাদের প্রত্যেকটি আংটি যাচাই করা। আমাদের অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার ফসল এই আংটি। হাতে ধারণ করলেই আপনার শরীর আর ভাগ্য বদলে যাবে, ভাল দিন এগিয়ে আসবে। আমাদের কাছেই পাবেন আপনার ভাগ্যের চাবি। আসুন নিজে হাতে বদলে দিন আপনার নিজের ভাগ্য"।

রামু একমনে একটা আংটি নিয়ে ঠুক ঠুক করে যেতে থাকে।

আপনার মতামত জানান