অন্ধকারের উৎস হতে …

শান্তনু মৈত্র
(১)
জলের আড়ালে কে ?
ঝির ঝির করে দুপুর থেকে বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছে, একফোঁটাও থামার নাম নেই। বিকেলের ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই আকাশ কালো করে এল আরো একবার। আকাশের কোথাও একফোঁটা নীল নেই... ধূসর অভিমানী চাদরে মুখ ঢেকেছে আকাশ, থমকে থমকে মেঘনাদের যুদ্ধযাত্রার হুঙ্কার, আবার কখনো হয়তো বা বজ্রদেবতা থরের হাতুড়িতে ঠোকা লেগে ছিটকে আসা চোখ ধাঁধানো বাজের কড়কড়ানি – বেশ একটা বিকেল । কলেজের চারতলার ঘরে বসে সাত পাঁচ এমনি ভেবে যাচ্ছে রুদ্র, কি করে বাড়ি যাবে সে খেয়াল যেন তার নেই । অথচ বিকেলে কলেজের শেষে অনিমেষ বাবুর ক্লাস টাও আছে সেটাও করতে যেতে হবে, কিন্তু অকাল বর্ষায় এই শহুরে ব্ল্যাক আউট নতুন করে তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছে । এমনভাবেই স্থাণুর মত বসেছিল বেশ অনেকক্ষণ, ঘোর ভাঙল নীলাদ্রীর ডাকে।
- কি রে আজ কি কলেজেই রাতের বিছানা পাতবি ভেবে রেখেছিস ??? নাকি ক্লাস কাটার প্ল্যান আছে সন্ধ্যেবেলা !!!
- কোনটাই নয় ... এমনিই একলা বসে ভাবছি এতোল বেতোল, হাওয়াটা ভারি চমৎকার। চশমাটা খুলে মুছতে মুছতে বলল রুদ্র। নাহ, চল এবার ওঠা যাক, ক্লাস টা সেরেই আসি। উঠে হাঁটতে হাটতেই আচমকাই রুদ্র বলে উঠল – কিরে খানিক আগে কেমিষ্ট্রি ল্যাবের সামনের বারান্দায় রোমান্স করছিলি বুঝি!!! প্রথম বৃষ্টির মত প্রেমের ফোয়ারা ফুটেছিল সেটা বিলক্ষণ বোঝা যাচ্ছে। কথা শেষ না হতেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল নীলাদ্রি ... ঠিক রাগে নয়, খানিকটা বিস্ময়ে – এই তুই কি করে জানলি আমি কোথায় ছিলাম ??? নিজে তো মেঘ দেখে মেঘমল্লার লেখার প্ল্যান করছিলে বস খানিক আগেই, তাও আবার চারতলার ক্লাসরুমে। হাই পাওয়ারের চশমায় খানিকটা আদরের মত লেগে থাকা বৃষ্টির ফোঁটার আড়ালে চকচক করছে রুদ্রর চোখ, খানিকটা বেসামাল হাসিতে হকচকিয়ে গেল নীলাদ্রি। উত্তর এল – চোখ আর কান যখন আছে, সেগুলো একটু খোলা রাখলেই সব কথা জানা যায়। এই যে তুই রোমান্স করছিলি তাও আবার বৃষ্টির গন্ধ গায়ে মেখে, সেটা তোর শার্টের ডান দিকের হাতটা দেখলেই খানিকটা অনুমান করা যায়, কেমিষ্ট্রি ল্যাবের সামনের দেওয়ালের ধারের শেষ পিলার টা একেবারে আড়ালে, আর তার ডানদিকে আছে ছোট পাঁচিলটা। তাই পিলারে হেলান দিয়ে দাড়ালে, বৃষ্টির গতিপথ অনুযায়ী ডানদিকটাই ভেজার কথা। সিম্পল ... আরো প্রমাণ চাস !!! তুই ঘড়ি পরিস ডান হাতে, কিন্তু টাইটানের দামি ঘড়ি যাতে জলে না ভেজে, তার জন্য সেটা আজ তোর বামহাতে বাঁধা রয়েছে। আর তার চেয়েও বড়ো প্রমাণ, তোর শার্টের পকেটের ভিতর দিকে হাল্কা কালো একটা স্পট, যা কেবল নতুন কাজল গুলো থেকেই হতে পারে, পুরো দাগ ওঠে না শুনেছি, তবে খানিকটা নিশান রেখেই যায় ... বলেই হাসতে হাসতে সিড়ির দিকে এগিয়ে গেল রুদ্র। কথা বন্ধ হয়ে গেছে নীলাদ্রির, প্রত্যেকটা কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে, আসার আগে তানিয়া যে তার বুকে মাথা রেখেছিল, সেকথাও বুঝে তাকে বেমালুম বোকা বানিয়ে চলে গেল ... সত্যি তিন বছরেও রুদ্রকে চিনে ওঠা গেল না। মাথা নাড়তে নাড়তে ফাঁকা করিডর দিয়ে দৌড় লাগাল নীলাদ্রি, পড়তে যেতে হবে।
আবার এক পশলা বৃষ্টি ভিজিয়ে গিয়েছে কলকাতাকে। সারা দুপুরের পর সারা সন্ধ্যে ... বলাই বাহুল্য আবহাওয়া অফিসের এই নিম্নচাপের জেরে বৃষ্টি কলকাতাকে আরো একবার ভেনিস বানিয়ে দিয়ে গেছে। স্যার খানিক আগেই ছেড়ে দিয়েছেন কিন্তু বৃষ্টির জন্য নীলাদ্রিরা বেরোতে পারেনি । বৃষ্টি থামার পর দুজনে প্যান্ট গুটিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল। খানা খন্দ বাঁচিয়ে চলতে শুরু করল বড় রাস্তার দিকে, বঊবাজার মোড় পর্যন্ত গেলে তবে একটা দুটো বাস বা ট্যাক্সির দেখা মিলতে পারে। কিন্তু এই রাস্তাটা কেমন একটা ঘুরঘুট্টী অন্ধকার, বিশেষ জনমানব নেই... তারপর আবার এক হাটু জলে আর কেউ বিনা প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বেরোতে ইচ্ছাপ্রকাশ করেনি । মোবাইল নিয়ে খুট খুট করতে করতে নীলাদ্রি চলেছে ... আপনমনে চলেছে রুদ্র, দুজনেই অকারনেই চুপচাপ । ছপছপ করে কেবল জল ঠেলে হাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। অনেকদিন আগে এই কলেজ স্ট্রীট সংলগ্ন এই যদুনাথ মিত্র লেন কে লোকজন কুখ্যাত হাড়কাটা গলি বলেই চিনত। যতরকম কুখ্যাত কাজ, খুন জখম রাহাজানি ... পতিতাবৃত্তিও চলেছে অক্লেশে, সেই জীবিকা আজও চলে আছে একই ভাবে, তবে তুলনায় কম। কোন বড়লোক বাড়ির বেসামাল সন্তান শরীরের লোভ মেটাতে হয়তো এই অন্ধকারেই এসে রাজকন্যার ঘরের কড়া নাড়বে, আর কিছু টাকার জন্য আরো একবার অচেনা মানুষের কাছে বিকিয়ে যাবে কোন শরীর। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই অজান্তেই রুদ্র ধাক্কা খেল উল্টো দিক থেকে আসা একটি লোকের সাথে। আনমনে হাটছিল বলেই হয়তো খেয়াল করতে পারেনি, কিন্তু লোকটি বেশ বলিষ্ঠ, রুদ্রর থেকেও বেশ খানিকটা লম্বা ... অন্ধকারে ঠাহর করে তাই মনে হল। কোন রকম বিরক্তি প্রকাশ না করে রুদ্র কে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে গলির অন্ধকারে মিলিয়ে গেল ... আর পিছনে রেখে গেল জল ঠেলে যাওয়ার মৃদু শব্দ। ধাক্কা খাওয়ার সাথে সাথেই চিন্তার ঘোর কেটে গেল রুদ্রর, তখনই নীলাদ্রি ডেকে উঠল – “বড় রাস্তা এসে গেছে রে ... বাস আসছে মনে হয় একটা। চল উঠে পড়ি।” খানিকটা আনমনা হয়েই বাসে উঠে পড়ল রুদ্র আর নীলাদ্রি।

(২)
ওভারকোটের আড়ালে
পরের দিন সকালে ঘুম ভেঙ্গে উঠে আকাশের ভারী মুখ দেখে বেজায় মন খারাপ হল রুদ্রর। আজ কলেজ যাওয়ার তাড়া নেই, কিন্তু এই ঘোর দুর্যোগে কাগজোয়ালাও কাগজ দিয়ে যায়নি ... আলিপুর আবহাওয়া অফিস বলছে আজ এবং কাল ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। তাই বারান্দায় বৃষ্টির টুপটাপ দেখতে দেখতে চেয়ারটায় গা এলিয়ে একটা সিগারেট ধরাল, বাড়িতে কেউ নেই তাই এই বিলাসিতা এখন করাই যায়। হঠাৎ সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শুনে বুঝল নীলাদ্রি এসেছে। বাড়িতে এলে ও এমনই দৌড়ে দৌড়ে সিড়ি দিয়ে ওঠে, অকারণেই। কিন্তু আজ এত সকালে কই কারণে ???
-সকালের কাগজ পড়েছিস ??
-না, কাগজওয়ালা এখনও দিয়ে যায়নি ... কি লিখেছে ?? ওই কোন নেতা কোন মন্তব্য করল এইসব নিয়ে একদম বাজে বকবকানি শুরু করিস না প্লিজ। এই মরশুমের সাথে ওটা খাপ খাবে না। কিন্তু তুই ছুটে আসছিস কোথা থেকে ???
সামনের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসতে যেতেই রুদ্র বলে বসল – আগে বল তো দেখি যে তুই সকাল বেলা বাগবাজারের গঙ্গার ঘাটে কি করছিলি ??? তাও এই বৃষ্টির মধ্যে !!!
হকচকিয়ে গেল নীলাদ্রি – মানে?? সারা সকাল বারান্দায় পড়ে থেকে তুই জানলি কি করে যে বাগবাজারের গঙ্গার ঘাট থেকেই আসছি ... অন্তর্যামী হয়ে উঠছিস যে বড়ো। মুচকি হেসে চশমাটা মুছে নিয়ে রদ্র বলল কালও একবার বলেছিলাম যে চোখ আর কান খোলা থাকলে সব কিছুই জানা যায়। এই যে তোর জিন্সের তলায় যে কাদাটা লেগে আছে, তুই যদি হাতিবাগানের দিক থেকে আসতিস, তাহলে জলের ছিটে লেগে কাদা হত বড়জোর ... কারণ ওদিকে কাদা হয় না তবে জল জমে। কিন্তু তোর জিন্সের কাদাটা সদ্য উঠে আসা গঙ্গামাটির কাদা। বৃষ্টি হলেই গঙ্গার পাড়ের রাস্তায় লাইনের আগে এইরকম কাদা হয়... ছুটে আসায় তোর জিন্সটা রক্ষা পায়নি। এই আর কি ... যাকগে কি বলতে এত হন্তদন্ত হয়ে এসেছিস সেকথা বল।
- সেটা বলব বলেই তো আসা, তার মাঝে তুই এইসব গোয়েন্দাগিরি শুরু করলি। ডিটেক্টিভ বই পড়ে তোর মাথা গেছে সেই সঙ্গে আমারটাও যাচ্ছে আস্তে আস্তে। কাল বৌবাজারে একটা অদ্ভুত চুরি হয়ে গেছে, অনিমেষ স্যারের বাড়ির সামনেই একটা বাড়িতে। কাগজে লিখেছে আবার রহস্যময় চুরি ...
রুদ্র সোজা হয়ে বসে বলল – রহস্যময় চুরি ??? কিরকম !!!
-হ্যাঁ, এই তো লিখেছে দ্যাখ না। বলছে যে বৌবাজার স্ট্রীটে যদুনাথ মিত্র লেন এর কাছে বিখ্যাত সোনার ব্যাবসাদার হিরণ্ময় ঘোষের বাড়িতে চুরি হয়েছে । ঘরের সিন্দুক ভেঙে সেখান থেকে নগদ দুই লাখ টাকা আর ১৫ ভরি সোনার গয়না চুরি গেছে। সিন্দুকের পাশে শুয়েছিলেন দোকানের এক কর্মচারী, তাঁকে বেহুঁশ অবস্থায় পাওয়া যায় কিন্তু তার শরীরে কোন আঘাতের চিহ্ন নেই। সকালে উঠে তাঁকে দেখতে না পেয়ে হিরণ্ময় বাবুরা ঘরের দরজা ভেঙে ঢোকেন এবং দেখেন যে জানলার শিক বেঁকিয়ে চোর এসেইছল এবং সেই পথে কাজ সেরে পালিয়েছে। বৌবাজার থানা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে, এবং এখনি এই বিষয়ে কোন তথ্য তারা দিতে পারেননি। বিগত দুইমাসে কলকাতার বিভিন্ন সোনার ব্যাবসায়ীদের বাড়িতে এই ধরণের চুরির উপদ্রব হয়েছে এবং প্রত্যেকটা চুরি প্রায় একই ধরণের।
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে রুদ্র বলল – কলকাতা শহরটা যত বাজে কাজকর্মের আখড়া হয়ে উঠছে দিনের পর দিন। এটা নিয়ে ৪ নম্বর চুরি। আচ্ছা ২০ তারিখ নাগাদ জানবাজারের দিকে কোন এক সোনার দোকানের মালিকের বাড়িতে এই ধরণের চুরি একটা হয়েছিল না !!! প্রায় একইরকমভাবে ...
- হ্যাঁ, কাগজে পড়েছিলাম তো। কিন্তু তার সাথে এর কি সম্পর্ক??
- হয়তো সম্পর্ক নেই, আবার হয়তো আছেও ... দুটো চুরির ধরণ প্রায় একরকম। এবং তলিয়ে দেখলে সবকটার ধরণই প্রায় এক রকম।
-কিন্তু এ থেকে কি ধারণা হয় তোর ?? ব্যাজার মুখে নীলাদ্রি বলে উঠল।
-ধারনা তেমন কিছুই হয় না, কারণ নিজের চোখে কিছুই দেখিনি আমি । বলেই ইজিচেয়ারে গা ডুবিয়ে দিল রুদ্র, মনের মধ্যে খচখচানিটা কিছুতেই যাচ্ছেনা। কাল রাত ১১টার পর ওরা দুজন হাড়কাটা গলি দিয়ে যদুনাথ মিত্র লেন দিয়েই এসে বাস ধরেছে বৌবাজার থানার সামনে থেকে, কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কিচ্ছু বোঝেনি। কিন্তু যে সময় কাগজে লিখেছে অর্থাৎ রাত ১১টা থেকে১১.৩০টার মধ্যে সেই সময় একটা লোকই ওখানে ছিল ... সেই লোকটা যে ওকে ধাক্কা মেরে জলের মধ্যে দিয়ে নিঃশব্দে চলে গিয়েছিল। একটা রেনকোট গায়ে, উচ্চতায় বেশ খানিকটা লম্বা, এবং ধাক্কা খাওয়ার পর রুদ্র বুঝেছিল লোকটার শরীরে অসম্ভব শক্তি। কিন্তু জমা জলে শব্দ না করে লোকটা এগিয়ে গেল কিভাবে অথবা ওর সামনে এসেছিলই বা কিভাবে ?? এগিয়ে যাওয়ার সময় কিছু শব্দ কি পেয়েছিল নাকি সবটাই মনের ভুল !!! ভাবতে ভাবতেই ফোনটা বেজে উঠল, ছোটমামা ফোন করেছেন ... নিশ্চয়ই কিছু দরকার পড়েছে নাহলে এই ডিউটি আওয়ারসে ছোট মামা সচরাচর ফোন করেনা। ফোনটা কানে দিল রুদ্র ...

(৩)
জানলায় কিসের চিহ্ন
-হ্যালো
- হ্যালো, ছোট হোমস ... ছোটমামা বলছি রে ... খুব ব্যস্ত??
- বুঝতে পেরেছি নম্বর দেখেই ... না না তেমন ব্যস্ততা আর হল কই ?? বলো কি বলবে ??
- না দরকার একটা আছে তবে সেটা ফোনে বলা যাবে না। আমি খানিকক্ষণের মধ্যে আসছি তোদের বাড়ি, দিদিকে বলে রাখিস জলখাবারটা বানিয়ে রাখতে । দরকারী কথা আছে তোর সাথে, আর ভালো কথা সাথে তোর ওই বন্ধু নীলাদ্রিকেও ডেকে রাখিস। প্রয়োজন হতে পারে ...
কট করে ফোনটা কেটে দিল ছোটমামা। চিরকালই এইরকম। ঝড়ের বেগে আসে... আবার ধূমকেতূর মত উড়ে যায়। কলকাতা পুলিশের ডি.সি নর্থ, ভবানী ভবনে বসেন ... লোকে বলে পুলিশ হিসেবে নাকি দোর্দণ্ডপ্রতাপ কিন্তু চটপট সমাধান সূত্র খোঁজায় জুড়ি মেলা ভার। এ হেন পেডিগ্রী ধারী লোকের রুদ্রর সাথে কিসের দরকার থাকতে পারে??? ছোটবেলা থেকেই রুদ্র আর নীলাদ্রি দুই বন্ধু ডিটেক্টিভ গল্পের পোকা। যদিও নীলাদ্রি দেশি গোয়েন্দা র আর শারলক হোমসের বাইরে পা রাখেনি ... কিন্তু রুদ্র ব্যোমকেশ থেকে ফেলুদা, হোমস থেকে মিস মারপল, এরকুল পোয়েরো থেকে মসিয়ে দুপে সবই গুলে খেয়েছে । এবং সেইসঙ্গে বেড়েছে তার অদ্ভুত অনুমান ক্ষমতাও, ভালো করে দেখেই সাধারণ কিন্তু মানুষের চোখের আড়ালে থাকা ছোটখাটো ঘটনা দিব্যি তুলে আনতে পারে, আর সেই কারণেই ছোটমামা ওকে এতো স্নেহ করেন ।
এত বড় পুলিশ অফিসার, কিন্তু রুদ্রর ছোটমামা সুনন্দ ভীষণ খাদ্যরসিক এবং মজার মানুষ। আমোদ আহ্লাদে সারা বাড়ি ভরিয়ে রাখতে পারেন। কিন্তু আজ এসেই তার মুখটা গম্ভীর, অকারণে তিনি চুপচাপ থাকেন না। ইতিমধ্যে জলখাবার পর্ব শেষ, নীলাদ্রি আর রুদ্র এসে হাজির হয়েছে রুদ্রর ঘরে। জানলা দিয়ে একমনে বৃষ্টি দেখতে দেখতে সুনন্দ বলে উঠলেন - আজ খবর টা দেখেছিস আশা করি, কোথায় কিভাবে কি হয়েছে সে সম্পর্কে আর কিছু বলতে হবে না আশা করি ।
- না আমরা সবটাই পড়েছি, আমি জানতাম না, নীলাদ্রি আমাকে কাগজটা এনে শোনালো। নীরবতা ভেঙে রুদ্র বলে উঠল। ঠিক একইভাবে জানলার দিকে চেয়ে আছেন সুনন্দ, চোখ না ফিরিয়েই বলতে থাকেন তিনি
- এই চুরিটাই যে প্রথম নয়, এর আগের মাসেও একই ভাবে দুটো চুরি হয়েছে । কলকাতার ই বিভিন্ন এলাকায়, প্রত্যেকবার ই টারগেট হয়েছেন কোন না কোন স্বর্ণ ব্যবসায়ী। চুরির ধরণ একই রকম – যে ঘরে সিন্দুক বা আলমারি থাকে সেইঘরে প্রত্যেক বাড়িতেই কেউ না কেউ থাকেন পাহারা দেওয়া হোক বা নজরদারির কারণে। তাঁকে কোন আঘাতের চিহ্ন বা ক্লোরোফরম ছাড়াই বেহুঁশ অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে। কুলকিনারা মিলছে না এই রহস্যময় চুরি গুলোর। এটুকু সিদ্ধান্তে আসা গেছে যে প্রত্যেকটা চুরি এক ই দলের কিংবা এক ই লোকের কাজ। তারপরে সবটুকুই অন্ধকার ... এতক্ষণ চুপচাপ ছিল নীলাদ্রি । হঠাৎ বলে উঠল – একটাও ক্লু বা কিচ্ছু পাওয়া যায়নি মামা ??? ওই সিন্দুক বা আলমারি গুলোতে হাতের ছাপ টাপ ... সেগুলোকে নিয়ে ফরেন্সিকে দিলেই তো সমাধান সূত্র পাওয়া যেতে পারে। স্মিত হেসে সুনন্দ বলেন – সেসব কি আর করা হয়নি ??? জানলার নিচে পায়ের ছাপ, সিন্দুকে হাতের ছাপ সব মিলিয়ে দেখা হয়েছে, ক্রিমিনাল রেকর্ডস ঘেটে দেখা হয়েছে- কিন্তু কোন পুরানো আসামীর নাম এতে ঊঠে আসেনি।
- এখন আমাদের কি করতে বলো ??? এইই বিষয়টা তো সবটুকুই আমাদের এক্তিয়ারের বাইরে । সেখানে দাঁড়িয়ে কিছুই তো বুঝতে পারা যাচ্ছে না। চেয়ারের হাতলে বসতে বসতে রুদ্র উত্তর দিল। সুনন্দর কপালে একটা চিন্তার ভাঁজ। তিনি বললেন – দেখ এক্তিয়ার বলে তেমন কিছু হয় না। এক থানা থেকে অন্য থানায় এক্তিয়ার নিয়ে ঝামেলা হয়। কিন্তু এই কেসের সাথে প্রচুর প্রভাবশালী লোক জড়িয়ে আছেন, বহুদিন ব্যবসা করার সুবাদে উপরতলার লোকেদের সাথে এদের চেনাশোনা। আর সেখান থেকেই নিরন্তর চাপ এসেই যাচ্ছে, সেই কারণেই তোদের ডাকা। দেখ রুদ্র। তোরা অনেক কিছু নিয়ে পড়েছিস, পড়িস ও। বলছিনা যে সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে চোর খুঁজে দে। কিন্তু এই ভারসেটালিটি গুলোকে একটু ব্যবহার কর পারলে। হয়তো কোন না কোন ভাবে কিছু সুমাধান সূত্র বেরিয়ে আস্তেও পারে।
- আবার খানিকটা নীরবতা ... নীলাদ্রি ফস করে বলে বসল – কিন্তু করব কি করে ??? পুলিশ তো অকারণে আমাদের ঢুকতেই দেবে না কোথাও । তাহলে আর কি লাভ ... এদিকে রুদ্র গভীর চিন্তায় ডুবে আছে, তার মনে বারবার খচখচানি আর সেই লোকটা ধোঁয়াশার মত এসেও মিলিয়ে যাচ্ছে কোন কুলকিনারা করার আগেই। সে মৌনতা ভেঙে বলল – আমাদের কি কালকের সেই ঘটনার ওখানে একবার নিয়ে যাওয়া যায় ??? যদিও কাজটা প্রোটোকল ভেঙে হবে, তাও !!!
- নিয়ে যাব বলেই এই বৃষ্টির মধ্যে ছুটে এসেছি, দেরি না করে বেড়িয়ে পড়।
ভবানী ভবনের অফিসার এসেছেন শুনে শিবাজী বাবু নিজে এসে তাদের নিয়ে গেলেন উপরে। কিন্তু শশব্যস্ত সুনন্দ সরাসরি বললেন – আমাদের বেশী সময় নেই হিরন্ময় বাবু, যে ঘরটাই চুরি হয়েছে সেটা একবার দেখা গেলে ভালো হত। ও আলাপ করিয়ে দিই ... এরা আমার ভাগ্নে আর তার বন্ধু। আমার সাথে এই কেসের ব্যাপারে একটু সাহায্য করবে বলে এসেছে। আশা করি এই বিষয়ে আপনার কোন আপত্তি নেই ।
- আর আপত্তি মশাই , একরাতের মধ্যে নিঃস্ব করে দিয়ে চলে গেল, আর বাকি কি আছে?? যা পারেন করুন, আমার জিনিসগুলো কোন্রকমে ফেরত পেলেই হল। এখানকার ব্যবসার পাট চুকিয়ে বাইরে চলে যাব ভাবছি, এই শহরে লাভের চেয়ে লোকসান বেশী।
যে ঘরে চুরি হয়েছে সেঘরে ঢুকে চারদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে নিল রুদ্র। সুনন্দ ভাগ্নের গতিবিধি লক্ষ্য করলেন, সেইসাথে হিরণ্ময় বাবুর সাথে রুটিন প্রশ্নোত্তরের কথা গুলোর চালিয়ে গেলেন। সিন্দুকটা নিপাট ভাবে গোল করে কাটা, কম্বিনেশন লক টা না জানা থাকায় নিপুণ ভাবে তালাটা গলিয়ে বা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। সেদিকে চেয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন – আচ্ছা এই সিন্দুক ভাঙ্গার শব্দে আপনাদের ঘুম ভাঙ্গেনি কারো ??? এমনকি যিনি এই ঘরে শুয়েছিলেন তার !!! হিরণ্ময় বললেন – আমার ঘুম খুব পাতলা আর সজাগ, এই ঘরের খাটে একটু সমস্যা হচ্ছে বলে পাশের ঘরে শুচ্ছি দিনকয়েক। কিন্তু কাল রাতে একবারের জন্য ঘুম ভাঙ্গেনি, তার উপর বৃষ্টিতে এমন মিঠে ওয়েদার।
- আপনার যে লোক এঘরে ছিলেন , তিনি কোথায় ???
- হাসপাতালে, আসলে ওর হুশ আসতে দেরি হওয়ায় আর সময় নষ্ট না করে মেডিক্যাল কলেজে পাঠিয়ে দিয়েছি।
-তিনি কাউকে দেখেন নি ??? কতজন ছিল বা আর কিছু ???
- দেখলে তো হয়েই যেত... তার আগেই তো সে বেহুঁশ। এতকিছুর মাঝেও ঘরের মধ্যে চুপচাপ ঘুরে বেড়াচ্ছিল রুদ্র। জানলার পাশে দাঁড়িয়ে সে দেখল, ছটা শিকের মধ্যে এখন দুটো মাত্র অবশিষ্ট রয়েছে, বাকি গুলো দুমড়ে মুচড়ে নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই গরাদ বেঁকিয়ে দেওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়, এর জন্য অনেক শক্তির প্রয়োজন। কিন্তু হঠাৎ জানলার অবশিষ্ট গরাদের একদিকে তার চোখ গেল, সেখানে লেগে আছে কালচে একটা দাগ ... কাছে গিয়ে বুঝল সেটা শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। আর জানলার সামনে দেওয়াল ঘেঁসে ছড়িয়ে রয়েছে অতি সুক্ষ কিছু হাল্কা কাঁচের টুকরো, প্রায় চোখে দেখা যায় না এমন। কালক্ষেপ না করে সুনন্দকে ডাকল রুদ্র এবং সেই জিনিস দুটো দেখাল। সুনন্দ একটা রুমালে সেই কাঁচের মিহি গুঁড়ো আর রক্তের দাগ টা তুলে নিয়ে গেলেন। প্রশংসার চোখে দেখলেন তিনি ভাগ্নের দিকে, বললেন – এই জিনিস গুলো ফরেন্সিকে টেস্ট করাতে হবে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে কিছু বুঝলি কি ?? দেখে তো মনে হচ্ছে চোর পালাতে গিয়ে কোন কারণে আহত হয়েছিল কিছুতে লেগে। আর কাঁচের টুকরো গুলো দেখা যাক টেস্ট করিয়ে। চুপ করে কি একটা যেন ভাবছে রুদ্র, এই ভঙ্গি নীলাদ্রির পরিচিত।। জটিল অঙ্ক সল্ভ করার সময় ঠিক এমনিই চুপচাপ হয়ে যায় ও। নীলাদ্রি বুঝল ঘটনাটার সাথে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছে ওরা। জানলার পাশ থেকে সরে আসার সময় ওর চোখ গেল উল্টোদিকের বাড়ির গাড়ি বারান্দায় ... একটা লোক অম্লানবদনে দাঁড়িয়ে ওদের কার্যকলাপ দেখছিল, চশমার কাঁচটা একদিকে খানিকটা ঘোলাটে ... চোখাচোখি হতেই দ্রুত গলির মধ্যে মিলিয়ে গেল। রুদ্রকে ডেকে দেখাতে যেতেই উত্তর এল
– দেখেছি। এ বিষয়ে ছোটমামাকে কিছু জানানোর দারকার নেই। এখন চুপচাপ বাড়ি যা। বিকেলে আসিস কথা হবে, কিছু জিনিস আগে সিওর হয়ে নিই, তারপর ছোটমামাকে জানাবো ।
(৪)
কেন ??
-কিছু বুঝতে পারলি ??? স্বভাব বশতঃ ঘরে ঢুকেই প্রশ্ন করল নীলাদ্রি। চুপচাপ বারান্দায় বসে আকাশে মেঘ আর হাল্কা রোদের খেলা দেখছিল রুদ্র। অনেক্ষণ ধরে কিছুতেই একটা হিসেব মিলিয়ে উঠতে পারছেনা। তাই নীলাদ্রি র কথা শুনেও না শোনার ভান করে বলল – খানিকটা ।
- কি বুঝেছিস ??? সেই লোকটা কে হতে পারে যাকে জানলা থেকে দেখেছিলাম!!
- কি মুশকিল !! আমি কি করে জানব যে সে কে ?? আমি পুলিশ না দারোয়ান কোনটা ?? যে দাঁড়িয়েছিল তাঁকে নিয়ে ভেবে কি লাভ যেখানে ভাবার জন্য এখানে এতকিছু পড়ে আছে ... প্রশ্নবাণে জর্জরিত হওয়ার আগেই খানিকটা বিরক্ত হয়েছে রুদ্র, তাঁকে দেখে নীলাদ্রিও চুপ করে গেল । খানিক থমকে বলল
- না মানে আমি জানতে চাইছিলাম যে , এই যে তুই আমায় বিকেলে আসতে বলি সেটা কিসের জন্য ??? কি বিশয় জানতে পেরেছিস তুই ???
- দেখ নীলাদ্রি ... কিছু সিওর হওয়ার মত কোন কিছু আমি জানি না, আর আমি বা তুই তেমন কেউ নই যার সাথে পুলিশ তাদের রেকরডস শেয়ার করতে চাইবে। আর এদিকে ছোটমামা কতদূর কি করছে জানি না। তবে ওই শুকিয়ে যাওয়া দাগটা থেকে এটুকু বলতে পারি যেই চুরি করে থাকুক না কেন সে সম্ভবতঃ লেফট হ্যান্ডেড, আর ... কথার মাঝেই তাঁকে থামিয়ে দিয়ে অবাক বিস্ময়ে বলল নীলাদ্রি – তুই জানলি কি করে ???
- তোর মধ্যে এত প্রশ্ন কিসের ??? চুপচাপ শোন না ভাই ... আর না পারলে অবসর সময়ে ওই উর্বর মস্তিষ্কটাকে খাটাও , সুফল আসবে। আমি এই তথ্য টা জাস্ট আন্দাজ করেছি মাত্র। কারণ জানলার যে শিকটা অক্ষত আছে তাতে যে শুকনো লালচে দাগ ছিল সেটা এমন ভাবে লেগেছে যাতে কোন ডানহাতি মানুষ ওইদিক ফিরে দাড়াতে পারবে না ... তাই সেটা একমাত্র বাম হাতি হলেই সম্ভব, আর আমার স্থির বিশ্বাস যে বা যারা চুরি করে থাকুক, তাদের দলএর কারো একজনের বাম হাতে লেখার বা কাজ করার অভ্যেস, এবং সে এই অপারেশনে এসে অল্পবিস্তর জখম হয়েছে। এর চেয়ে বেশী আর কিছু বলা সম্ভব নয়। কিন্তু আমার এখন একটাই করণীয়, সেটা হলো ছোটমামার জন্য অপেক্ষা করা। কারণ সবকিছু অনুমানের ভিত্তিতে চলতে পারে না, প্রমাণের দরকার পড়ে।
একটানা কথা বলে চুপ করল রুদ্র। সেই লোকটার আবছা স্মৃতি ওকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে মাঝে মাঝে। কে সেই লোক আর কেনই বা ঘটনাচক্রে সে ওখানে গিয়ে ঘটনার কয়েক ঘন্টা আগে এসে উপস্থিত হয়েছিল। এই সব আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতেই সুনন্দ ঢুকলেন ঘরে। রুদ্র যেন প্রশ্নের অপেক্ষাতেই ছিল ...
- কি ছোট হোমস আর ওয়াটসন। তোমাদের কি খবর ???
- রিপোর্ট পেয়েছ ???
- হ্যাঁ পেয়েছি কিন্তু দুটো জিনিসের জন্য এত কিছু তার দ্বিতীয়টা একটু সন্দেহজনক।
- কি পেলে ফরেন্সিকে ?? যে লোকটা লেফট হ্যান্ডেড ...
এবার চমকানোর পালা সুনন্দর । অম্লানবদনে মাথা নেড়ে বলেন লোকটা যে সত্যি বাম হাতে কাজ করে ... কিন্তু জানলার গায়ে লেগে থাকা ফিঙ্গারপ্রিন্ট পরীক্ষা করিয়ে দেখা গেছে যে ... তার সাথে রেকর্ড থাকা কোন ক্রিমিনালের নামের মিল নেই। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই চুরি গুলো হচ্ছে কেন ??? কারাই বা করছে ?? কিন্তু পরের যে জিনিস্টা ল্যাবে টেস্ট হয়েছে সেটা আর কিছুই নয় একটা অ্যাসিড বাল্বের টুকরো হওয়া কাঁচ, সম্ভবতঃ সেটার জন্যই ওদের পরিচারক বা দোকানের কর্মীরা অজান্তেই বেহুঁশ হয়ে পড়ছে। ওর ভিতরে কি ছিল আন্দাজ করতে পারিস ... !!!
- কি ?? এমন কোন অ্যাসিড নয় যা প্রাণঘাতী, শুধু বেহুঁশ করার কাজে লাগে এমন কিছু।
-ঠিক তাই ... ছিল দ্রবীভূত বাতাস বা liquified air. কিছুটা সাধারণ বাতাসকে স্বাভাবিক উষ্ণতায় রেখে উচ্চ চাপ প্রয়োগ করলে সেটা তার উপাদানে ভেঙ্গে যায়, তখন তার মধ্যে কিছুটা দ্রবীভূত আরগন মিশিয়ে উষ্ণতা বাড়ালে লিকুইফায়েড বাতাস তৈরি হয়, যা সাধারণতঃ মর্গে বা কেমিক্যাল ল্যাবে ব্যবহার করা হয় ক্রায়ো প্রিজারভেশনের জন্য।
- কিন্তু এক্ষেত্রে এই বাতাস দিয়ে কি সংরক্ষন করা হয়েছে ??? নীলাদ্রি হঠাৎ জানতে চাইল এবং স্বভাবসিদ্ধ সাধারণ ভঙ্গিতে রুদ্রর কাছ থেকে উত্তর এলো – বেহুঁশ করার কাজে। কোন কোন ক্ষেত্রে এটা ক্লোরোফরমের থেকেও দ্রুত কাজ দেয় কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার হলে মৃত্যু অবধারিত।
- ঠিক তাই ... সুনন্দর চোখে প্রশংসার ঝিলিক। ছোট থেকে দেখছেন এই ভাগ্নেটিকে, পড়াশোনা ছেড়ে গোয়েন্দা গল্পের বইতে বুঁদ হয়ে থাকতে থাকতে কখন যে নিজেই আস্ত সত্যসন্ধানী হয়ে ওঠার পথে পা বাড়িয়েছে, তা বুঝতেই পারেননি তিনি। এ ছেলে নিজেকে ধরে রাখতে পারলে পুলিশ প্রশাসনের সম্পদ হয়ে উঠবে। চিন্তা করতে করতেই তিনি বললেন – তাহলে চল আজ উঠি, পুরানো কেসের ফাইল গুলো নিয়ে একটু বসতে হবে, এই ক্লু দুটো ভাইটাল হতে পারে।
- একটা কথা পরিষ্কার যে, যে বা যারা এই কাজগুলোর সাথে জড়িত ... তাদের মধ্যে রাসায়নিক কেউ আছে, বা কেমিস্ট্রির ছাত্র কিংবা প্রফেসর ... কথাটা বলেই চমকে উঠল রুদ্র। একটা নাম মনের মধ্যে ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল ... কিন্তু সত্যিই কি তিনি !! নাকি সবটাই রুদ্রর বোঝার ভুল ???

(৫)
দ্রবীভূত বাতাস
আজ সকাল থেকেই রুদ্রর ক্লাসে মন নেই, ঠিক মন নেই নয়... ক্লাসে থাকতেই তেমন ইচ্ছে করছে না। কিন্তু আজ অনিমেষ স্যারের ক্লাস টাও ছুটির পর আছে সেটা করার জন্য থেকে যেতেই হবে। আসলে এই অদ্ভুত চুরি এবং রহস্যজনক ক্লু গুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে ওর সময় কেটে যাচ্ছে। এর ফাঁকে কখন যে ঘন্টা পড়েছে সে খেয়াল নেই। অনিমেষ স্যারের ক্লাস ... এমনিতে অনিমেষ স্যার মানে প্রেসিডেন্সি কলেজের বায়োকেমিষ্ট্রির প্রফেসর অনিমেষ স্যানাল ভীষণ ফিটফাট মানুষ। সারাক্ষণ নিপাট পোশাক পরে কলেজে আসাই তার ধর্ম ... সাতে পাঁচে থাকেন না, কিন্তু চশমার আড়ালে খেলা করে দুটো বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। নিতান্ত ছাত্রবৎসল এবং ভালো প্রফেসর হিসেবে তাঁকে সবাই চেনে। ইনি ম্যাথস অনার্সের ইলেক্টিভ কেমিষ্ট্রির ক্লাস নেন।
- গুড মর্নিং ক্লাস।
সমস্বরে উত্তর ভেসে এলো ... – গুড মর্নিং স্যার। হঠাৎ ক্লাসের সবার গলার আওয়াজে ঘোর কাটলো রুদ্রর। রুদ্রর অন্যমনস্কতা অনিমেষের চোখে এড়িয়ে যায়নি, হয়তো ক্লাসের সব থেকে ভালো কিছু ছাত্রছাত্রীর মধ্যে রুদ্রকেও তিনি সেই দলে রাখেন তার জন্যই। কাছে এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলেন ...
- কি হয়েছে রুদ্র?? এনিথিং রং ?? খাতার পাতায় এই ঘটনা গুলো সংক্রান্ত কিছু কথা লিখে হিজিবিজি কাটছিলো রুদ্র। দ্রুত খাতা টা বন্ধ করেই স্যারের দিকে তাকালো ... কিন্তু সদা ফিটফাট মানুষটার আজ একি অবস্থা ??? চুল উসকোখুসকো , চোখের তলায় কালি ... যদিও পোশাকে আশাকে পারিপাট্য বজায় আছে। সম্ভবতঃ রাত জাগার ফল। নিজেকে চট করে সামলে নিয়ে রুদ্র বলল – না স্যার কিচ্ছু হয়নি। এভ্রিথিং ইজ অলরাইট ...
- বেশ তাহলেই ভালো ।। বলে ডায়াসের দিকে এগিয়ে গেলেন অনিমেষ এবং নিয়ম মাফিক ক্লাস করাতে শুরু করলেন।
সন্ধ্যের আকাশে মেঘ করে এসেছে আজও , রুদ্রর মনেও। সাত দিন কেটে গেছে প্রায় চুরির পর ... কিন্তু ঘটনার কোন সুরাহা হয় নি। পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতায় মিডিয়া ছিছিক্কার শুরু করেছে ... সেই নিয়ে রাতদিন টিভিতে নানা জল্পনা। নীলাদ্রির সাথে হাঁটতে হাঁটতে যদুনাথ মিত্র লেনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে ... এমন সময় নীরবতা ভেঙ্গে নীলাদ্রি প্রশ্ন করল – হ্যাঁ রে, কিছু বার করতে পারলি ?? আমার মাথায় তো কিচ্ছু আসছে না ... পুরো ব্ল্যাঙ্ক হয়ে আছি।
- না... এখনো কিচ্ছু পাইনি।
- আচ্ছা ছোটমামা র থেকে পুরানো কেসের ফাইলগুলো একবার চাইলে হয় না !!! দেখ আমরা তো পুরানো কেসের রকমফের নিয়ে কিছুই জানি না, তাই অন্ধকারে সাঁতার কেটে মরছি হয়তো। একবার বলে দেখ না ।। যদিও পুলিশের সিক্রেট ফাইল কিন্তু সাহায্য যখন করছি তখন চাইলে পেতেও পারিস হয়তো।
- হু ... মন্দ বলিসনি. আচ্ছা আমি রাতে ফোন করে চেয়ে দেখব । দুজনে অনিমেষ স্যারের ক্লাসে ঢুকল। সব ছাত্রছাত্রীরা আগেই এসে হাজির... নীলাদ্রিটাও চুপচাপ গিয়ে তানিয়ার পাশে আশ্রয় নিল। সেটা দেখে সকলেই মুখ টিপে হেসে উঠল ।। কিন্তু রুদ্র খেয়াল করল অন্যদিনের মতো স্যার সেই হাসিতে যোগ দিলেন না, বরং তার মনে একটা চিন্তার ছাপ ... কিন্তু চোখাচোখি হতেই নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে আজকের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করলেন। অরগানিক কেমিষ্ট্রির একটা চ্যাপ্টার পড়াচ্ছেন ... কিন্তু হঠাৎ করে স্যারের আচরণে কিছুটা অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করল রুদ্র, খানিকটা ব্যস্ততা নিয়েই পড়াচ্ছেন যেন। কিন্তু এমনটা তো সাধারণতঃ হয় না ... কিন্তু অনেক ভেবেও এর পর্যাপ্ত কারণ খুঁজে পেল না। পড়া প্রায় শেষের দিকে ... এমন সময় রুদ্র হঠাৎ প্রশ্ন করল
- স্যার লিকুইফায়েড এয়ার এর কম্পোজিশন্টা ঠিক কিরকম ?? সামান্য চমকে উঠেই নিজেকে সামলে নিলেন অনিমেষ ... তার পর সস্নেহে বুঝিয়ে দিলেন দ্রবীভূত বাতাসের কম্পোজিশন। এর মাঝে রুদ্র আড়চোখে দেখে নিল নীলাদ্রি পড়া ছেড়ে হাঁ করে তার দিকে দেখছে। বোঝানোর মাঝে বার বার ঘড়ি দেখছেন অনিমেষ, কিছুটা অকারণেই ... একটু থেমে তিনি বললেন
- আজ তোমরা বাড়ি যাও। একটু দরকারি কাজ রয়েছে আমার... সেগুলো করতে যেতে হতে পারে।
- কোন সমস্যা হয়েছে স্যার ??? আপনাকে দেখে ঠিক অন্যদিনের মত লাগছে না। নীলাদ্রি প্রশ্ন করল ... কিছুটা হাসি ঠোঁটে আটকে রেখেই অনিমেষ জবাব দিলেন – নাহ তেমন কিছু নয়। আসলে পি.এইচ.ডি র পেপার গুলো লিখতে হবে কয়েকদিনের মধ্যে, তাছাড়া তোমরা তো জানোই যে ম্যাডামের শরীরটাও বিশেষ ভালো নয়, তাই আজ একটু ... বলেই হুড়মুড় করে ঘরের মধ্যে চলে গেলেন অনিমেষ। ছাত্ররাও যে যার মত ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছে ... কিন্তু রুদ্রর মনে একটা খচখচানি থেকেই গেল। এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন স্যার... ম্যাডামের শরীরটা কি বাড়াবাড়ি রকমের খারাপ ???

(৬)
আবার একটা ঘটনা
বাড়ি ফেরার পথে ওরা সুনন্দর বাড়ি হয়ে এসেছিল। আগের ঘটনার তথ্য জানতে চাইতেন সুনন্দ সঙ্গে সঙ্গে ওদের একটা ফাইল দিয়ে দেন যার মধ্যে সব রকম তথ্য জেরক্স করা ছিল... সেটা নিয়ে বেশী কথা না বাড়িয়ে ওরা বাড়িতে ফিরে আসে। সেই থেকে রুদ্র ফাইলের পাতা গুলো নিয়ে পড়েছে ... মা খেতে ডাকছেন সে খেয়ালটাও তার যেন নেই। মা গজগজ করেন ... সারাদিন নাওয়া নেই খাওয়া নেই, এইটুকু বয়সে চোরছ্যাঁচড়ের পিছনে ধাওয়া করে বেড়াচ্ছে। সুনন্দটাও সেই রকম ওকে নাচিয়ে চলেছে ... জানে না তো ক্ষুধার্ত বাঘের সামনে রক্তের গন্ধ ছড়ালে তার ফল কি হয় !!! এ ছেলে এবারে পরীক্ষায় নির্ঘাত গোল্লা পাবে। বাবা রুদ্রকে সাপোর্ট করেন, ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার ঝোঁক খেয়াল করে রুদ্রকে নিজে হাতে কিনে দিয়েছেন দেশ-বিদেশের বইপত্র। তিনি বলেন
- আহা যা করছে করুক না, খারাপ কিছু তো আর করছে না। আর নম্বরের কথা যদি বলো তবে তো কোনদিনই খারাপ রেজাল্ট করেনি, আজই বা করবে কেন ??? বাবা মায়ের এই নিত্য নৈমিত্তিক খুনসুটিতে কান দেওয়ার মত সময় বা মনের অবস্থা কোনটাই তার নেই। আগের তিনটে চুরি ... প্রত্যেকে সোনার দোকানের মালিক এবং বেশ সম্ভ্রান্ত। প্রত্যেকের বাড়িতে চুরি হয়েছে একই কায়দায় জানলার শিক বেঁকিয়ে ঘরে ঢুকে, এবং প্রায় প্রত্যেক কেসেই ঘরে থাকা দেখাশোনা করার লোকটি বা দোকানের কোনো কর্মচারীকে বেহুঁশ করে ঘটনাটা ঘটানো হয়েছে। কেবলমাত্র এর আগের ঘটনায় কেউ আহত বা বেহুঁশ হননি, কারণ সেই মুহূর্তে সেই ঘরে কেঊ ছিলেন না। অথচ ফাইলের বয়ান বলছে সেই ঘরেও জানলার পাশে কাঁচের টুকরো পাওয়া গেছে, এবং একটা অদ্ভুত বিষয় এই যে সেই সব কাঁচের টুকরোর মধ্যে দ্রবীভূত বাতাস নয় ... ছিল হাইড্রোজেন আরসেনাইড যা একধরণের চেতনা নাশক গ্যাস। এইবারেই প্রথমবার অন্যরকম কিছু ব্যবহার করা হলো। জটের পর জট পাকিয়ে যাওয়া এক একটা বিবরণ সাক্ষীদের বয়ান সব মিলিয়ে চোখে প্রায় অন্ধকার দেখছিল রুদ্র, এমন সময় নীলাদ্রির ফোন এলো
- কি শারলক হোমস ... কিছু পেলে ??
- না আপাততঃ নয় ... তবে চেষ্টা করছি। এত রাতে তুই ফোন করছিস যে কি ব্যাপার ???
- না মানে আপনি কিছু পেলেন কিনা সেটাই জানতে চাইছি ... লোকজনের নাম ধরে ধরে মিলিয়ে দেখতে শুরু কর... আমার কাছে যে কপিটা মামা দিয়েছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তাই তোকে বলছি যে তোর ক্ষমতা আছে ভাই ... নাম থেকে শুরু কর, আমি ঘুমানোর চেষ্টা করি। বলেই কটাং করে ফোনটা কেটে দিল নীলাদ্রি, মোবাইলটাকে টেবিলে রেখে বারান্দায় এলো রুদ্র। বৃষ্টির আকাশ লাল মেঘে ঢেকে আছে, আজ সারাদন বৃষ্টি হয়নি... তাই হয়তো সারা রাতে নির্জন কলকাতাকে ভিজিয়ে দিতে চায়। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই টিপটিপ করে বৃষ্টি নেমে এলো। কিন্তু কিছুতেই বৃষ্টিটা উপভোগ করতে পারছে না রুদ্র, হাল্কা হাল্কা বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ... প্রায় অন্ধকার হয়ে আসা গলির মুখে একটা ল্যাম্পপোস্ট, আচমকা বিদুৎ চমকাতেই সেই আলোতে রুদ্র দেখতে পেল সেই ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক, চখের চশমার কাঁচটা আলোছায়ায় মিশে বেগুনি হয়ে উঠেছে ,মুখে একটা উজ্জ্বল হাসি... কিন্তু সেই হাসিতে রয়েছে একটা অস্বাভাবিক ঘৃণা। চোখে চোখ পড়তেই চিনতে পারলো রুদ্র ... সেদিনের সেই লোকটা যে হিরণ্ময়ের বাড়ির উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছিল একইভাবে, পরনে সেই রেনকোট যা চুরির দিন রাতে রুদ্রর সাথে হাড়কাটা গলিতে ধাক্কা খাওয়া লোকটার গায়ে ছিল, তবে এই লোকটাই !!! আবার তাকিয়ে গিয়ে দেখতেই আর লোকটাকে খুঁজে পেল না রুদ্র, ইতিমধ্যে বৃষ্টি বেড়েছে ... আবছা হয়ে আসছে ল্যাম্পপোস্ট টা ... আর রুদ্র মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে চলেছে ... জল ঠেলে চলার শব্দ, একটা শক্তিশালী লোকের ধাক্কা আর আজকের বাজ পড়া আলোতে বেগুনি হয়ে আসা চশমা, সবকিছু একাকার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ করেই খেয়াল হলো ... এই লোকটার দেখা পাওয়ার দিনই একটা চুরি হয়েছিল, এর মাঝে বেশ কিছুদিন কেটে গিয়েছে, আজই পরের চুরির দিন নয়তো !!! আর হঠাৎ মাথায় এলো নীলাদ্রির শেষ কথাটা –“লোকগুলোর নাম ধরে ভাবতে থাক ... আমি ঘুমাই” নিমেষের মধ্যে টেবলে ফিরে এসেই ফাইল্টাকে প্রথম থেকে উলটে পালটে দেখতে শুরু করলো ... খাতায় পেনের সর্পিল বিচরণের সাথে একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছে জানলার বাইরে তুমুল বৃষ্টির শব্দ। বেশ খানিকটা লেখার পর মাথা তুলল রুদ্র, ছোটমামাকে যেভাবেই হোক কথাটা জানাতে হবে ... ফোনটা বেজে যাচ্ছে, কিন্তু এখনও ধরছেন না সুনন্দ। বলতেই বলতেই ফোন ধরলেনন তিনি
- হ্যালো
- আমি বলছি ... রুদ্র।
- হ্যাঁ বল ... এতো রাতে কি ব্যাপার ?? দিদি জামাইবাবুর শরীর ঠিক আছে তো !!!
- সবাই ঠিক আছে ... কিন্তু আমার সেসব নিয়ে বলার ইচ্ছে নেই ছোটমামা। এটুকু বলতে পারি পরবর্তী চুরির দিন খুব সম্ভবতঃ আজ। কেন কিভাবে বলার সময় নেই... কিন্তু আমি একদম নিশ্চিত যে পরবর্তী চুরি আজই হতে পারে। এবং সেটা আমাদের বাড়ির কাছাকাছি মানে আহিরীটোলারদিক থেকে বা বলতে পারো মানিকতলার দিকে কোথাও কিছু ঘটবে, এবং যার বাড়িতে ঘটবে তিনি স্বর্ণ কুটির জুয়েলারসের মালিক জীবন উপাধ্যায় হতে পারেন।
- সে তো বুঝলাম , কিন্তু তুই বলছিস কিভাবে ??? কি প্রমাণ পেলি ???
- আহ !! এত কথার সময় নেই ,ধরে নাও অনুমান, কিন্তু যেভাবেই হোক এই ঘটনা আটকাতেই হবে। পুরানো নিয়ম অনুযায়ী রাত ২.৩০ টের পর চুরি গুলো হয়েছিল, আশা করি ব্যতিক্রম হবে না এক্ষেত্রেও।
- আচ্ছা বেশ বেশ ।। তুই এখন রাখ, আমি ইমিডিয়েট ব্যবস্থা করছি। পরে শুনবো তোর কথা ... কিন্তু এই রাতে একলা তুই কোথাও বেরোবি না, এই চুরিতে বাঁধা পড়লে অনেকের অনেক কিছু ক্ষতি হবেই আর তার ফল যেন তোকে ভুগতে না হয় অন্ততঃ আজ এই অসম্ভব বৃষ্টির রাতে।

(৭)
ছিঁচকে চোরের কান্ড ??
সকাল থেকে ফোনটা বেজে যাচ্ছে রুদ্রর ... কিন্তু সারা রাত বিছানায় এপাশ ওপাশ করে ভোরবেলা চোখটুকু লেগে এসেছিল। তাই অজান্তেই তলিয়ে গেছে গভীর ঘুমে, হঠাৎ ফোনের আওয়াজে ঘুম ভাঙল। ঘুম জড়ানো গলায় রুদ্র ফোনটা ধরল
-হ্যালো ...
- কনগ্রাচুলেশনস ... অসাধ্যসাধন করেছিস প্রায়। এত জলদি যে তুই বের করে নিবি সেটা ভাবতে পারিনি ...
- চোর ধরা পড়েছে !!!
- না তাকে ধরা যায়নি, কিন্তু চুরিটা আটকানো গেছে। এত কথার সময় নেই, তোর বন্ধুটাকে নিয়ে চট করে একবার আমার বাড়ি চলে আয়... আর্জেন্ট। বলেই ফোন কেটে দিলেন সুনন্দ, দেওয়াল ঘড়িতে ৮টা ১৫, আকাশের মুখভার। কিন্তু অপ্রত্যাশিত আনন্দে রুদ্রর চোখ দুটো ঝলমল করছে, তাহলে তার অনুমান ঠিক দিকেই এগিয়ে চলেছে। চট করে তৈরি হয়ে নিয়েই নীলাদ্রিকে ফোন করল এবং ওকে বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করতে বলে বেরিয়ে গেল।
বাস স্ট্যান্ডে তৈরি হয়েই দাঁড়িয়েছিল নীলাদ্রি। রুদ্র যেতেই প্রায় চেঁচিয়ে উঠল
- কি মামা ... চোর ধরা পড়েছে নাকি আবার কোথাও কিছু হলো ??? সাতসকালে ডেকে নিয়ে যাচ্ছিস কোথায় !!
- ফ্লুরিসে ব্রেকফাস্ট করতে ??? যাবি ??
- হ্যাঁ নিয়ে গেলেই যাব ... কিন্তু তুই যে এই সময়ে উত্তর কলকাতা ছেড়ে দক্ষিণে ব্রেকফাস্ট করতে যাবি না সেটা জানা কথা। আসল কথাটা বল ...
- সব জানতে পারবি আগে ছোটমামা র বাড়ি চল, জরুরি দরকার আছে, তার আগে স্পিক্টি নট।
- তথাস্তু।
সুনন্দ ঘরেই ছিলেন... নিজেই দরজা খুলে ওদের ভিতরে ডেকে নিয়ে গেলেন। তার টেবিল ছড়ানো ছিটানো ফাইল ... সারা রাত জেগে কাল ডিউটি করেছেন কিন্তু শরীরে একফোঁটাও ক্লান্তির ছাপ নেই। ওদের ঘরে নিয়ে বসেই জানতে চাইলেন
- কিছু খাবি ???
- হ্যাঁ মানে হলে ভালোই হয় ... নীলাদ্রি বলে উঠল। রুদ্র ওর মাথায় একটা চাঁটি মেরে বলল – এখন খাওয়া দাওয়া কিছু লাগবে না। কি হয়েছে কাল সেটা বলো। সুনন্দ বলতে শুরু করলেন -
তোর কথামত কাল আমরা জীবন উপাধ্যায়ের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম প্রায় রাত ১টা ১৫ তে। কিছু অফিসিয়াল কাজেকরমে দেরি হয়ে গিয়েছিল। ভয় হচ্ছিল যে এর মধ্যে কিছু না ঘটে যায়। গিয়ে জানতে পারলাম যে কিছুই হয়নি ... জীবন বাবুর সিন্দুক অক্ষতই আছে, খানিকটা আশ্বস্ত হলাম কিন্তু সেই বৃষ্টির মধ্যেই সারা বাড়ি জুড়ে পাহারা বসানো হল। তুই বলেছিল ওনার বড়িটা আহিরিটোলার কাছে,ঠিক সেখানে নয়, মানিকতলা থেকে আহিরিটোলার দিকে আসা অটোরিক্সা গুলো যে পথে এসে রবীন্দ্র সরণিতে পড়ে, সেই ক্রসিং এর কিছুটা আগে। এমন এক জায়গায় বাড়ি যেখান থেকে প্রচুর রাস্তা আছে, গলিঘুঁজি তো বটেই সেই সাথে বড় রাস্তাও অনেক। সে যাই হোক ... আমরা কয়েকজন যে ঘরে সিন্দুক আর আলমারি সেই ঘরের দরজার বাইরেই কান পেতে ছিলাম। ঘরে দুজন লোক সাধারণতঃ থাকেন, কিন্তু কাল কাউকে রাখা হয়নি। আন্দাজ ৩টে নাগাদ একটা মিহি শব্দ হল কিছু একটা কাচ ভাঙ্গার ... বুঝলাম সেই একই লিকুইফায়েড এয়ার কিংবা হাইড্রোজেন আরসেনাইড এর বাল্ব। আমরা দরজা ফাঁক করে রুদ্ধশ্বাসে দেখছি, একটা খুব বলিষ্ঠ লোক, চোখে সম্ভবতঃ চশমা ছিল অন্ধকারে বিশেষ বোঝা যায়নি জানলার কারনিশে দাঁড়িয়ে লিঃশব্দে কাঁচের জানলার খানিকটা কাচ খুলে নিল এবং ভিতরের লোহার গ্রিলটা অবলীলায় বেঁকিয়ে দিল। এবং হাতে ধরা সরু জোরালো টর্চের গতিবিধি দেখে বুঝলাম, যে লোকটা লেফট হ্যান্ডেড। আরো একটা তথ্য পাওয়া গেল যে সমস্ত সিন্দুকেই অক্সি- অ্যাসিটিলিন ব্যবহার করে তালা খোলা বা গলানো হয়েছে।
- তাকে ধরতে পারলেন ??? নীলাদ্রি জানতে চাইলো ... সুনন্দ অল্প হেসে বলেন
- ধরতে আর পারলাম কই ??? হাতে পেলে ঠিক পেট থেকে কথা বের করে নিতাম আজ। কিন্তু এই সব কান্ডকারখানা থেকে জীবন বাবুর চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। নিজেকে আর সামলাতে পারেননি, ছাপোষা বাঙ্গালির স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে চোর চোর বলে চেঁচিয়ে উঠলেন এবং সেই মুহূর্তেই লোকটা জানলার কাছে চলে গেল ... আমরা হুড়মুড় করে সেখানে গিয়েই দেখি লোকটা সমারসল্ট খেয়ে নিচে লাফিয়ে পড়েছে ... এবং তীরবেগে ছুট লাগিয়েছে বড় রাস্তার দিকে, পরনে একটা বাদামি রঙের রেনকোট।
- বুঝলাম ... একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্র বলল – ধরতে পারলে সুবিধা হত। কিন্তু ব্যাডলাক ... হঠাৎ সুনন্দ বললেন – আরো একটা অদ্ভুত ব্যাপার কি জানিস ... লোকটা যে পথে দৌড়ে গেল, সেদিকেই নাকি একজন লোক শুয়েছিল, ভিখারী বা এই রকম কেউ হবে, একটা নতুন প্লাস্টিক গায়ে ঢেকে ... সেই প্লাস্টিক্টা কেড়ে নিয়েই দৌড় দিয়েছে।
- তাহলে গয়নার দুঃখটা প্লাস্টিকে মিটিয়েছে বলতে হবে ... বেশ রসিক চোর, কিছু না কিছু চুরি করতেই হবে। হাসতে থাকল নীলাদ্রি ... সুনন্দও হাসছেন। কিন্তু রুদ্র বলল – কিন্তু তাই বলে গয়নাগাটির বদলে প্লাস্টিক কেন হতে যাবে ??? মনে হচ্ছে যে চুরি করেছে বা করতে এসেছে তার চুরিটাই অভ্যাস ... আর নয়তো সে ক্লেপ্টোম্যানিয়াক। কিছু না কিছু চুরি তাকে করতেই হয় রোজ। সেটাই তার শান্তি ... এটা একধরণের রোগ।
- হতে পারে ... রুদ্রকে থামিয়ে দিলেন সুনন্দ। লোক এসে খাবার গুলো দিয়ে গেছে, সেগুলো খেয়ে নিতে বললেন। খেতে খেতেই নীলাদ্রি হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল – এই কাল যে ওনার বাড়িতেই চুরি হবে সেটা জানলি কি করে ??? মা কালীর স্বপ্নাদেশে পেয়েছিলি বুঝি ??? সুনন্দ বললেন – এই কথাটা মার মাথাতেও ঘুরছিল ... কিন্তু কাল তাড়াহুড়য় আর জানতে চাওয়া হয়নি। খানিকটা হেসে রুদ্র বলল
- এর জন্য অনেকটা কৃতিত্ব নীলাদ্রির প্রাপ্য। চমকে উঠলেন সুনন্দ আর নীলাদ্রি দুজনেই ... – আমি কি করলাম আবার ???
- তুই কিছু করিসনি বটে ... কিন্তু মনে আছে কাল রাতে তুই বলেছিলি ফাইলের নাম ধরে ধরে খুঁজতে, মনে পড়ে!!!
- হ্যাঁ তা তো বলেছিলাম, কিন্তু তাতে কি ???
- তাতেই সব কিছু ... সেই নাম ধরে দেখতে দেখতেই সব কটা নাম বেরিয়ে আসবে সেটা তো আর তখন বুঝিনি। জানি বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে, দাঁড়া দেখাচ্ছি ... এই দেখ প্রথম চুরি হয় ৩০শে মে গয়না বিক্রেতা জিয়াউর রহমানের বাড়িতে, পরের চুরি ৮ ই জুন বিভাস দত্ত এবং তার পরের গুলো ১৬ ই জুন দীপক সাহা, ২৪শে জুন ফণীভূষণ পাল এবং যেদিন আমরা খুব বৃষ্টিতে জল ঠেলে স্যারের বাড়ি থেকে ফিরলাম অর্থাৎ ২রা জুলাই হিরণময় ঘোষের বাড়ি। প্রথমে ভেবেছিলাম জায়গার সামঞ্জস্য রেখে চুরি গুলো হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট অর্ডারে। কিন্তু সেখানে গিয়ে আটকে যাই ... তারপর তোর ফোনের পর সেই ভাবে খুঁজতে খুঁজতে আমার চোখে দুটো আলাদা অর্ডার ধরা পড়ে। তারিখ গুল খেয়াল কর ... প্রত্যেকটা তারিখের মাঝে ঠিক ৮দিনের ব্যবধান। সেটা খানিকটা সোজা ... কিন্তু নাম গুলোতেই কিছুটা সমস্যা আসে। প্রত্যেকটা নামের আদ্যক্ষর ধরলে ইংলিশ অ্যালফাবেট অনুযায়ী আসে Z B D F H সেগুলোকে একটু ভালো করে দেখলেই বোঝা যাবে যে প্রত্যেক্টি অক্ষরের মাঝে একটা করে অক্ষর বাদ গেছে, যেমন Z আর B এর মাঝে A নেই। এইভাবে সব কটা প্যাটার্নই একরকম ... তাই পরের হিসেব অনুযায়ী পরের অক্ষর আসে L, কিন্তু কাল রাতে সেই লোকটাকে আমি জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি যাকে আমরা হিরণ্ময় বাবুর জানলা থেকে দেখেছিলাম। নির্বিকার ভাবে বৃষ্টিতে ভিজেই চলেছে ... কেন জানিনা সন্দেহ হলো যে আমাদের কাছাকাছি কোন জায়গায় আজ কিছু ঘটবেই। তাই ইন্টারনেটে এই পাড়ায় L দিয়ে নামের সোনার ব্যবসাদার খুঁজতেই এই লোকটার নাম এলো, দুইয়ে দুইয়ে চার করলাম। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে নীলাদ্রি ... কোন কথা বলার ই ক্ষমতা নেই তার। শুধু সুনন্দ বললেন এখন তোরা বাড়ি যা ... তবে সাবধানে। কাল যে কথাগুলো বলেছি সেগুলো মাথায় রাখবি।

(৮)
অন্ধকারের উৎস হতে ...
রুদ্র সেদিন চলে যাওয়ার পর বাকি ফাইলপত্র নিয়ে বসেছিলেন সুনন্দ, এবং রুদ্রর হিসেব মতো জীবন উপাধ্যায়ের পরবর্তী নিশানার কথাও জেনেছেন তারা যার নামের আদ্যক্ষর L, কিন্তু সেই নামে কলকাতা শহরে প্রচুর সোনার ব্যবসায়ী রয়েছেন যা প্রায় খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার সমান। সেই নিয়েই হিমশিম খাচ্ছেন তিনি এবং তার ডিপার্টমেন্ট। তবুও চেষ্টা করে জেতেই হবে, কারণ অনেকগুলো ঘটনা পর পর ঘটে গিয়েছে শহরের বুকে কোন সুরাহা হয়নি। নিউজ চ্যানেলগুলো দিনের পর দিন সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা তুলে ধরছে সানন্দে। যার ফলে সাধারণ মানুষ আস্থা হারাচ্ছেন তাঁদের উপর থেকে, যা একেবারেই কাম্য নয়।
থার্ড পিরিয়ডের ঘন্টা পড়তেই লাইব্রেরিতে ছুটলো রুদ্র ... অরগ্যানিক কেমিষ্ট্রির বইটা আগেরদিন বলে এসেছিল, সেটা নিয়ে নিতে হবে, সামনেই টেস্ট কিন্তু এই ঘটনাগুলোর ডামাডোলে সেসব মাথায় উঠেছে। তাই যেটুকু সময় পাওয়া যায় নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে রুদ্র। প্রায় দৌড়ে লাইব্রেরিতে আসার পথে আচমকা অনিমেষ স্যরের সাথে ধাক্কা খেল, দুজনেই হকচকিয়ে গেছেন। নিজেকে সামলে নিয়ে সামান্য হেসে অনিমেষ বললেন
- কি হে এতো তাড়া কিসের ??? এখানে নিশ্চয়ই চুরি চামারি হচ্ছে না তা দেখে পথ চলতে হবে তো। কোন্দিন পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটলে ভালো হবে কি ???
- ইয়ে মানে সরি স্যার ... দেখতে পাইনি, আসলে পরেরটা কে.জি.সি র ক্লাস, পরে ঢুকলে আবার রাগ করেন তাই বইটা নিতে এসেছিলাম, খানিক লজ্জিত হয়েই বলল রুদ্র। ধাক্কাধাক্কিতে স্যারের হাতের বইখাতা পড়ে গিয়েছিল, একটা ফাইলের ভেতর থেকে কিছু কাগজ ছিটকে পড়েছিল। সেগুলো সযত্নে গুছিয়ে দিল রুদ্র, মাথায় হাত বুলিয়ে হাসিমুখে নিচে নেমে গেলেন অনিমেষ। বেশ হাসিখুশি আমুদে মানুষ ... বই পাড়তে পাড়তে ভাবছিল রুদ্র। কারো সাতে পাচে থাকেন না, বাইরে থেকে দেখে অতীব নিরীহ মনে হয় ... সেইকারণেই ছাত্রদের কাছে তিনি এত প্রিয়। ওই ফাইল্টায় সম্ভবতঃ স্যারের পি.এইচ.ডি র কাগজ পত্র ছিল ।। হয়তো গোছাতে গিয়ে সব ঘেঁটে গেল কিনা কে জানে ?? সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই ক্লাসের ঘন্টা পড়ল, বইপত্র গুছিয়ে ক্লাসের দিকে পা চালাল রুদ্র।
প্রফেসর কিরণজিৎ চক্রবর্তী সংক্ষেপে কে.জি.সি ম্যাথামেটিক্স ডিপার্টমেন্টের একজন প্রখ্যাত প্রফেসর, সারা কলকাতা জুড়ে বিভিন্ন কলেজের ছাত্র- ছাত্রীরা তার কাছে পড়ার জন্য ছুটে আসে। আজ তিনি ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস করাচ্ছেন... ছেলেরা মুখ নিচু করে লিখেই চলেছে। কেবল অন্যদিকে চেয়ে আছে রুদ্র। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার মাথায় এলো স্যার তখন মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন যে রুদ্র এই চুরির কেসটা নিয়ে রুদ্র নাড়াচাড়া করছে কি না... যদিও স্যারের জানার কথা নয় বিশেষতঃ কারোরই জানার কথা নয় এই বিষয়ে, কিন্তু স্যার জানলেন কিভাবে ??? চমকে উঠল রুদ্র। তার অমনোযোগের ব্যাপারটা কে.জি.সি সম্ভবতঃ খেয়াল করেছিলেন ... রুদ্রকে ডেকে খানিক ধমক দিলেন। সেদিনের মত ব্যাপারটা ভুলে গেল রুদ্র। বাড়ি এসে ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাসের কিছু সমস্যা নিয়ে বসেছিল... নীলাদ্রি খানিক আগেই এসে বাড়ি চলে গেছে কিছুটা গল্প করে। পাড়ায় এই বন্ধুটা আছে বলে তাও কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারে ও ... কারণ ছোট থেকে শুধু স্কুল,পড়াশোনা,টিউশন আর ক্যারাটের ঘেরাটোপে কেটে গেছে আজানুলম্বিত শৈশব। কিন্তু স্যারের ফাইল গুলোতে তো স্যারের নাম লেখা ছিল না ... ললিত সরকার নামে অন্য কারো ফাইল ছিল সেটা। হয়তো কোন ছাতের ফাইল ।। কিন্তু তার মধ্যে সযত্নে এতো নোটস লেখা বা থিসিস পেপারের মতো করে সাজানো কেন ??? থিসিস তো একমাত্র ডক্টরেট করতেই জমা দিতে হয় আর অনিমেষ স্যার আপাততঃ বায়োকেমিষ্ট্রিরই কোন একটা বিষয়ের উপর পি.এইচ.ডি করছেন বলে সকলে জানে। হয়তো কারো রেফারেন্স ফাইল ... কিন্তু নামটা রুদ্রকে বারবার খুঁচিয়েই যাচ্ছে। কে এই ললিত সরকার ??? কি সম্পর্ক এনার সাথে ঐ ফাইলের ??? কোন প্রফেসরই হবেন কিন্তু ... সেই চুরির সময় নামের লিস্ট থেকে উঠে আসা পরের নামের আদ্যক্ষরও L , কিন্তু তারা তো সকলেই সোনার ব্যবসায়ী... এদের সাথে ওনার সম্পর্ক থাকার কথাই নয় !!! একটা নিকষ অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছে রুদ্র যেখানে সামান্য আলোর দিশাও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মুহুরতের মধ্যে সুনন্দকে ফোন করল রুদ্র
- কলকাতায় কেমিষ্ট্রি প্রফেসর হিসেবে ললিত সরকার হিসেবে কাউকে খুঁজে বের করা যাবে কি ??? মানে তিনি কোথায় পড়ান এটুকু জানলেই হবে
- কি দরকার?? পড়বি নাকি ??
- না পড়বো না ... এই কেসের ব্যাপারে তিনি কিছু আলোকপাত করতে পারেন।
- ঠিক বুঝলাম না ... কি বলতে চাইছিস ???
- কলেজে আছি এত কথা বলা যাবে না। আমি টেক্সট করে দিচ্ছি সব কথা।। আর আমাদের প্ল্যান অনুযায়ী পরের ডেট আসার আগে যেভাবে হোক ভদ্রলোককে খুঁজে বের করতেই হবে।
- আচ্ছা বেশ। তুই একবার বিকেলে আসিস ... এই নিয়ে কথা হবে। তবে আজ বাড়িতে নয়, সোজা হেডকোয়াটারসে আসবি। কাজের চাপ আছে ... বলেই লাইন কেটে দিলেন সুনন্দ। কিছুটা নিস্তব্ধতার মধ্যে একটা বিস্ময় মেখে খানিকক্ষণ কেমিস্ট্রি ল্যাবের সামনে দাঁড়িয়ে রইল রুদ্র। হঠাৎ কি মনে পড়েতেই ছোটমামাকে কিছু কথা লিখে একটা এস.এম.এস করে দিল ।
বিকেলে কলেজের শেষে রুদ্র আর নীলাদ্রি ভবানী ভবনের বাস ধরবে বলে মহাত্মা গান্ধী রোডের ক্রসিং এ দাঁড়িয়ে ছিল। চুপচাপ রাস্তার সিগ্ন্যালের দিকে তাকিয়ে রুদ্র কি যেন একটা ভাবছিল... নীলাদ্রি ডেকে বলল – আজ হঠাৎ অন্য জায়গায় কেন ??? নতুন কিছু পাওয়া গেছে ??
- হুম ...
- কি পাওয়া গেছে ??
- পরবর্তী টার্গেট ... কিন্তু কি চুরি হবে সেটাই জানা নেই।
- কি আর চুরি হবে ??? আবার হাজার খানেক টাকা আর কিছু সোনা... নতুনত্ব কোথায় !!!
- তোর দোষ কি জানিস তো ... তুই ক্রিমিনাল ভেবে নিয়ে তার ঘাড়ে ক্রাইমের বোঝা চাপাতে চেষ্টা করিস, সেই বছর খানেক আগে টিভি সিরিয়ালের কেস গুলো পাশাপাশি বসে সল্ভ করার সময়েও তোকে তাই করতেই দেখেছিলাম, আর বদলাবি না ...
- আচ্ছা সে না হয় হলো। কিন্তু পরের ভিক্টিম টা কে ?? তাকে তো জানাতে হবে ।।
- সেই কারণেই জরুরি তলব ... আরে আরে সরে আয় জলদি। কথা শেষ হতে না হতেই রুদ্রর সজাগ চোখ আর হাতের অস্বাভাবিক কো-অরডিনেশনের জোরে বড়সড় একটা দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেল নীলাদ্রি। একটা ফিয়াট সবেগে রাস্তার ধার দিয়ে ছুটে আসছিল ওদের লক্ষ্য করে ... আচমকা সেটা দেখতে পেয়েই রুদ্র ওকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নিজেও অন্য দিকে লাফিয়ে পড়ে। কিন্তু অবস্থাটা পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই একটা প্রচন্ড শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল প্রায়। হ্যারিসন রোডের দিকে টার্ন নিতে গিয়ে সেই ফিয়াটের মুখোমুখি কলিশন হয়েছে এক লরির সাথে ... এবং চোখের পলকে ছোট গাড়িটা দুমড়ে মুচড়ে কদাকার আকার ধারণ করল। হাত পায়ের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে নীলাদ্রি বলল
- বাপ রে বাপ জোর বাঁচা বেঁচে গিয়েছি, তুই দেখতে না পেলে আজ সোজা উপরে যেতাম।
- হুম ... কিন্তু আমাদের মারতে না পারলেও সে নিজে হয়তো উপরে রওনা দিয়েছে।
- মানে ???
- মানে খুবই সাধারণ ... আমাদের মারা কিংবা আহত করার জন্যই এই চেষ্টা, যাতে আমরা কেসের ব্যাপারে না না গলাই এই আর কি। এখন চল ওখানে গিয়ে দেখি কি হয়েছে ... কথা বলে বলতে হ্যারিসন রোডের ক্রসিং এ এসে দাঁড়ালো দুজনে। ইতিমধ্যে লোকে লোকারণ্য... লরির চালক সম্ভবতঃ পলাতক। ভিড় ঠেলে গাড়ির সামনে যেতেই দুজনের চক্ষু চড়কগাছ ... স্টিয়ারিং এর সামনে সিটবেল্ট বাধা অবস্থায় আটকে রয়েছে সেই রহস্যময় ভদ্রলোক যাকে ওরা ক্লেপ্টোম্যানিয়াক বলে অভিহিত করেছিল। শরীরটা নিষ্প্রাণ ... কিন্তু মুখে নিশ্চুপ ইলেকট্রনিক হাসি, আর চোখের থেকে ঝুলছে সেই বেগুনি চশমা, পড়ন্ত বিকেলের আলোয় সেটা অদ্ভুত কুহক সৃষ্টি করেছে যেটা ক্রমাগতঃ রুদ্রর দিকে চেয়ে ছুড়ে দিচ্ছে অসম্ভব বিদ্রুপ আর ঘৃণা। খানিক ক্ষন চেয়ে থেকে রুদ্র অস্ফুটে বলে উঠল - কাজ শেষ না করতে পারার শাস্তি !!!
- কিসের কাজ ??
- এই ভদ্রলোক তার মানে চুরির সাথে খুনখারাপিতেও বেশ পারদর্শী, নাহলে একেই বা কেন পাঠানো হবে!! যা ভাবছিস তার থেকে অনেক সোজা পথে ভাবাই যায় ... আমাদের মারতে এসেছিলেন ভদ্রলোক, কিন্তু উনি ফেল করলে দ্বিতীয় একটা গাড়ি ওনার পরিণতির জন্য অপেক্ষা করছিল। আর সেটাই হলো ... চল এইবার। সবটুকু ঘন অন্ধকারে ঢেকে ছিল ... হাতড়ে মরছিলাম একটা দোটানায়, কিন্তু এই ঘটনা মেঘের আড়ালে রোদ খোঁজার মত কিছু তথ্য অজান্তেই বেরিয়ে এলো একটা সঠিক রাস্তা। হয়তো এই সমাধানসূত্রই ঘটনাগুলোর পথ খুঁজে দেবে।

(৯)
জেলিগনাইট
ভবানী ভবনে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এলো। কিন্তু সেখানে এসেই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে ওদের পা থমকে গেলো মাটিতেই, আর এক পাও এগোতে সাহস পেলো না। ভবানী ভবনের সামনে প্রচুর লোকের ভিড়, লোকজন উদ্ভ্রান্তের মত ছুটোছুটি করছে ... অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশের গাড়িতে ছয়লাপ হয়ে রয়েছে ভবানী ভবন চত্বর। সব পেরিয়ে ছোটমামার ঘরের দিকে যেতেই ওদের বাঁধা দিল ডিউটিতে থাকা কনস্টেবল।
-কোথায় যাচ্ছেন ?? এখন কারো সাথে দেখা হবে না।
- কিন্তু দাদা আমাদের যে দেখা করতেই হবে, নইলে খুব মুশকিল হয়ে যাবে। অম্লানবদনে বলে বসল নীলাদ্রি, বিরক্ত কনস্টেবল বললেন - দেখছেন না, এখানে সমস্যা হয়েছে ।। এখন কেউ দেখা করবে না বললাম তো ... কাল সকালে আসবেন। সে এক বিশাল ঝামেলার সৃষ্টি হয় হয় তখন রুদ্র বলল ডিসি নর্থ সুনন্দ রায়চৌধুরী আমার মামা হন, ওনার সাথেই একটু দরকার ছিল।
- আচ্ছা বেশ যান ... ক্কিন্তু সম্ভবতঃ স্যার এখন ব্যস্ত আছেন।
- সেটা আমরা বুঝে নিচ্ছি ... থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। বলেই দুজনে সিঁড়ির পথে পা বাড়াল ... খবর পেয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন সুনন্দ। রুদ্র খেয়াল করলো তিনি কেমন যেন অন্যমনস্ক, অগোছালো। মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ সুস্পষ্ট ... রুদ্র অস্ফুটে জানতে চাইল ...
- কি হয়েছে গো ??? এত অ্যাম্বুলেন্স কেন এখানে ?? আর এত ভিড় ই বা কিসের??
- আর বলিস না ... আর একটু হলেই মারা পড়ছিলাম আর কি ?? কিন্তু আমাদের একজন ভালো অফিসার আহত হয়েছেন সাঙ্ঘাতিক ভাবে।
- মানে ?? এখানে কেউ অ্যাটাক করেছিল নাকি !!!
- আর না না ।। আজ দুপুরে আমার নামে একটা প্যাকেট আসে, বেশ ভালো প্যাকিং বাক্সে মোড়া। তখন আর অত নাম খেয়াল করিনি ... আমার ড্রয়ারে খোলার মত কিছু ছিল না। তাই সেনগুপ্ত কে দিয়েছিলাম ওটা কেটে আনতে ... তাই প্যাকেট টা নিয়ে অন্যঘরে গেল। খানিক বাদে প্রচন্ড বিস্ফোরনের শব্দ পেয়ে দৌড়ে গেলাম ।। দেখি গোটা ঘর ধোঁয়ায় ঢেকে আছে ... আর পটাশিয়ামের তীব্র গন্ধে নাক জ্বলছে রীতিমতো। আর সবকিছু ছাপিয়ে রক্তের বন্যায় পড়ে কাতরাচ্ছে সেনগুপ্ত। সামনে একজন ডিউটি অফিসার ছিলেন ... তার জবানবন্দী অনুযায়ী প্যাকেটটা খোলার সাথে সাথেই বিস্ফোরণ ঘটে যায় এবং সেনগুপ্তকে অকারণে এই ঘটনার শিকার হতে হলো।
- ভিতরে কি জেলিগনাইট ছিল ?? পটাশিয়ামের গন্ধওয়ালা বিস্ফোরক ... স্ট্রেঞ্জ !!
- হ্যাঁ ভিতরে জেলিগনাইটই ছিল ... যার উপাদানে পাওয়া গেছে পটাশিয়াম নাইট্রেট, হাইড্রোজেন সালফাইড এর পেস্ট আর খানিকটা উডমীল , যা বোমাটাকে ধরে রাখতে সাহায্য করে।
- তোমাকে মারাই যদি কারো টারগেট হয়ে থাকে তাহলে এই কেসের যোগসূত্র থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়। এতক্ষণের নীরবতা ভেঙ্গে নীলাদ্রি হঠাৎ বলে উঠল – এই সব অপরাধীরা বেশ সায়েন্টিফিক প্যাটার্নের আশ্রয় নিচ্ছে দেখছি। চুরি চামারি খুন খারাপি যাই হয়ে যাক না কেন ... সবেতেই ইউরোপীয়ান পধতি অবলম্বন করা হচ্ছে। ভালো ভালো ... এই অভাবনীয় উন্নতি ভালো । -
-বাজে কথা রাখ নীলাদ্রি, ধমকে উঠল রুদ্র। ইয়ারকি ভালো কিন্তু সবসময় সব সিচুয়েশনে সেটা কাজের নাও হতে পারে। ইউরোপীয়ান পদ্ধতি মানুক আর না মানুক, তোর তাতে কি ???
- আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে... এখন বিবাদ করে লাভ নেই, ভুল হয়ে গেছে ভাই ... নীলাদ্রি বলল। এখন কাজের কথা হোক তবে ...
-সেটাই ভালো ... বললেন সুনন্দ। সেনগুপ্ত আশা করি ভালো হয়ে যাবে। আচ্ছা রুদ্র ... তুই হঠাৎ ললিত সরকারের খোঁজ করতে বললি কেন ?? যদিও সমস্ত খবর নিয়েছি আমি তার সম্পর্কে। ভদ্রলোক বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের কেমিষ্ট্রির হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট। ওনার আন্ডারে অনেকে ডক্টরেটও করেন ... করছেন আর কি। ভালো কেমিষ্ট হিসেবে বেশ খ্যাতি ওনার ... দিন কয়েক আগেই কাগজে একটা খবর পড়েছিলি যে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় ওনার রিসার্চ ওয়ার্কের জন্য ওনাকে ফেলোশিপ দিচ্ছে। বড় মাপের শিক্ষাবিদ, বাংলার সম্মান বলা যেতেই পারে।
- হ্যাঁ ... সে তো নিঃসন্দেহে। নিজের মনেই বলে চলেছে রুদ্র, দুইয়ে দুইয়ে সত্যিই চার হল ... কিন্তু কোন মোটিভ খুঁজে পাচ্ছি না কেন??? কি কারণ থাকতে পারে!!! সুনন্দর ডাকে সম্বিৎ ফিরল রুদ্রর – একটা কথা আমায় বল তো খোলাখুলি। তুই কি কাউকে সন্দেহ করিস ??? ধর তোর চেনা কেঊ বা আশেপাশের কাউকে ??? এমন চুরি কলকাতায় প্রথম নয় ... কিন্তু সেক্ষেত্রে দেখা গেছে পুরানো পাপীরাই আবার মঞ্চে নামে কেউ পেট আবার কেউ মনের তাগিদে। কিন্তু এই চুরিটা আপাতদৃষ্টিতে অন্যরকম ... চুরি করছিল একজন ক্লেপ্টোম্যানিয়াক টাইপের মানুষ, সে করতেই পারে। কিন্তু তার মাঝে তোদের উপর আচমকা অ্যাটেম্পট, আমার দপ্তরে অজানা বিস্ফোরক ... কিরকম ধাঁধার মত ঠেকছে।
- ধাঁধা আমারও ঠেকছে ছোটমামা ... কিন্তু কিছুতেই আমি কোন মোটিভ খুঁজে পাচ্ছি না। তাই তোমায় আমি পরিষ্কার করে বলতে পারবো না আমার সন্দেহটা। কিন্তু এটুকু বলতে পারি ... ১৮ই জুলাই যেভাবেই হোক এই ললিত সরকারের প্রোটেকশানের ব্যবস্থা করো। দেখ কিছু হবেই আমি বলছি না ... কিন্তু তাও।
- এইভাবে যার তার বাড়িতে পুলিশ পাহারা বসানো যায় না রুদ্র। কিছু নিয়ম কানুন তো আছে ...
-সেটা আমি জানি। তুমি শুধু ওই ক্র্যাক হওয়া নামের লিস্ট দেখিয়ে আর ডেট দেখিয়ে সিমিলার হিসেবে একটা পারমিশান আদায় করো ... বাকিটা আমি তোমায় বুঝিয়ে বলছি পরে। আর হাতে মাত্র ২টো দিন। এর মধ্যে একবার ললিত সরকারের সাথে কথা বলা প্রয়োজন, তিনি অকারণে পুলিশ পছন্দ না ও করতে পারেন। সময় নেব এই কারণেই ফাইনাল কিছু জিনিস নিয়ে আমার সিওর হওয়াটা খুব দরকার, নাহলে বড়সড় ভুল হয়ে যেতে পারে আমাদের তরফ থেকে।
- আচ্ছা বেশ, যা ভালো বুঝবি ... কিন্তু যা করবি ভেবে চিন্তে করিস। পোস্ট অপারেটিভ কমপ্লিকেশন যেন না আসে। দেখ আমি তোকে জোর করছি না ... কিন্তু আমাকেও জবাবদিহি করতে হয়, ইতিমধ্যেই তোর সাহায্য নেওয়ার জন্যও হয়েছে। তাই লড়াইটা দ্বিমুখী ... যেমন অপরাধীর সাথে, তেমন সিস্টেমের সাথেও। জিততে আমাদের হবেই ... যে করেই হোক।

(১০)
আবিষ্কারের নেশায়
-নমস্কার ...
- নমস্কার – দরজা খুলে ললিত দেখলেন তিনজন ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে, একজন কিছুটা বয়স্ক, বাকিদের বয়স ২০-২২ হবে। তিনি বললেন – কি চাই বলুন। সকালে কাজের সময়ে আমি একদম ইন্টারাপশন পছন্দ করিনা, কিছু দরকার থাকলে চটপট বলে ফেলুন। ব্যাজার মুখে দরজা আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছেন প্রফেসর ... চোখে ব্যস্ততা। নিজের আইডি কার্ড দেখালেন সুনন্দ ... পুলিশের পরিচয় পত্র দেখে তিনি আরো বিরক্ত হলেন।
- আপনাদের কোন উপকারে আমি লাগবো ?? আমার কাছে কিছুই পাবেন না ।। এখন প্লিজ আসুন, আমার অনেক দরকারি কাজ পড়ে আছে। বলেই দরজা বন্ধ করার উপক্রম করছিলেন প্রফেসর। হঠাৎ চাবুকের মত একটা কন্ঠস্বর তাকে চুপ করিয়ে দিল – নিজের প্রাণ সংশয় হলে পুলিশের প্রতি এই বিরক্তিটা দেখাতে পারবেন তো প্রফেসর ??? আমি পুলিশ নই।। কিন্তু আপনার স্টুডেন্টের বয়সী একজন হয়েই এই কথা বলতে বাধ্য হলাম। শুনলে আপনার অপকার হবে না , হ্যাঁ মানছি আপনার গবেষণার কাজে ব্যাঘাত ঘটবে,কিন্তু তার দাম আশা করি আপনার জীবনের থেকে বেশী নয়। চিবিয়ে চিবিয়ে এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলো রুদ্র ... বেশ অনেকটাই অবাক হয়েছেন ললিত, দরজা খুলে ওদের ঘরে ডেকে নিলেন। ঘরে বসেই সুনন্দ বললেন
- ধন্যবাদ ... আপনার বিষয়েই কিছু কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন।
-সে হবেখন ... ললিত বললেন। আগে বলুন কি নেবেন চা- না কফি, নাকি ঠান্ডা কিছু !!!
- কিচ্ছু দরকার নেই ... আচ্ছা আপনি আগে বলুন তো যে, আপনার কোন শত্রু আছে?? মানে আপনার কাজের জগতে ??
- শত্রু ?? হেসে উঠলেন ললিত।। আমার মত আধপাগলা লোকের আবার শত্রু, সেরকম কেউ নেই বলেই তো জানি।
- কিন্তু আপনি কয়েকদিনের মধ্যে বাংলার গর্ব হয়ে উঠতে চলেছেন, বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে ফেলোশিপ দেবে সেকথাও তো ঘোষণা করেছে।সেই দিক দিয়ে দেখতে গেলে আপনার শত্রু থাকাটাই স্বাভাবিক, তাই প্রশ্নটা করেছিলাম।
- কিন্তু স্যার ... আপনি ঠিক কি নিয়ে গবেষণা করছিলেন জানতে পারি কি ??? নীলাদ্রি প্রশ্ন করলো ...
- নিশ্চয়ই পারো ... বলেন ললিত, তোমাদের কি কেমিষ্ট্রি অনার্স?? কোন কলেজ !!
- আমাদের ম্যাথামেটিক্স, কেমিষ্ট্রি পাস এ আছে, প্রেসিডেন্সি কলেজ ... রুদ্র বলল,শুনে ললিত খানিক ভেবে বললেন- আচ্ছা তার মানে অনিমেষ তোমাদের ক্লাস নেয় তো??
- আপনি অনিমেষ স্যারকে চিনলেন কিভাবে ??? একটা ঠান্ডা হাসি ছড়িয়ে গেলো প্রফেসরের মুখে – অনিমেষ আমার পি.এইচ.ডি- র ছাত্র, ও আমার আন্ডারে ডক্টরেট করছে, ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ... এবং কথা বলে বুঝেছি ভালো শিক্ষকও। কি একটা ভাবছিল রুদ্র ... ঘোর ভাঙল নীলাদ্রির কথায়
- তা আপনার গবেষণার বিষয়টা ???
- ত্থারমিট ...
- থারমিট ??? সে আবার কি বস্তু কেমন যেন থারমোমিটারের মত শোনাচ্ছে। হঠাৎ রুদ্র বলে উঠল থারমিট হচ্ছে অক্সি- অ্যাসিটিলিনের কিছুটা উন্নততর রূপ। জার্মান গবেষক জে. গোল্ডস্মিথ এটা আবিষ্কার করেছিলেন লোহা গলানোর পদ্ধতি হিসাবে, খুব উচ্চ তাপ সৃষ্টিতে সাহায্য করে বলে এটা ব্যবহৃত হয়।
- বাহ ... তোমার তো দেখছি বেশ স্টক, ভালো করে পড়াশোনা করো, পড়বার জন্য পড়ো না, প্যাশন হিসাবে পড়তে থাকো ... উন্নতি করবেই। আশীর্বাদ ঝরে পড়ছিল ললিতের গলায়, নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন – ও খানিকটা ঠিকই বলেছে, গোল্ডস্মিথের এই আবিষ্কার সারা পৃথিবীতে সাড়া ফেলেছিল, এটা অক্সি- অ্যাসিটিলিনেরও আগের আবিষ্কার। কিন্তু ওনার পদ্ধতি অনুযায়ী রেড আয়রন কিংবা ফেরাস অক্সাইডের উপর অ্যালুমিনিয়াম ডাস্ট মিশিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দিলে তাপ উৎপাদন হত, এবং সেই তাপে যত শক্ত মেটালই হোক না কেন... দিব্যি গলে যায়। কিন্তু এর অনেক কমতি ছিল, প্রচুর খরচ এই রেড আয়রন জোগাড় করার। তাই কস্ট এফেক্টিভ কিছু ভাবনা চিন্তা করতেই হতো, তাই আমি চেষ্টা করেছি সাধারণ লোহার লীন তাপকে অ্যামপ্লিফায়েড করে তার সাথে সাধারণ উষ্ণতায় থাকা অ্যালুমিনিয়াম চূর্ণ মিশিয়ে বিক্রিয়াটা ঘটাতে, এতে গোল্ডস্মিথের কন্সেপ্টই বিদ্যমান, তার স্বীকৃতি রয়েছে। কিন্তু এই লোহা গলানোর পাশাপাশি যে উষ্ণতা তৈরি হয় গলার সময়, সেই উষ্ণতাকে কাজে লাগিয়ে এনার্জি ক্রাইসিস কিছুটা কমানোর চেষ্টা চলছে। রাইখস্ট্যাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক নরম্যান হাইডেলবার্গ একটা হিট অ্যামপ্লিফিকেশনের যন্ত্র তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে তাপমাত্রা হাজার গুণ বাড়িয়ে নেওয়া যায়, স্বভাবতঃই আমরা চাইছি ফেলোশিপ অনুষ্ঠানের দিন সেই ব্যাপারটা জনসমক্ষে করে দেখাতে, যাতে থারমিটের উষ্ণতাকে বাড়িয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ উত্তাপ ধরে রাখা যায় পরবর্তী ব্যবহারের জন্য, সেই কারণেই এইসব। শুনতে শুনতে থমকে গিয়েছিল ওরা, এনারজি ক্রাইসিসের মত সমস্যার সমাধান সূত্র যে কেউ এইভাবে ভাবতে পারে সেটা কারোর জানা ছিল না । কিন্তু সন্দিহান ললিত প্রশ্ন করলেন – কিন্তু তোমরা কি কারণে এসেছিলে??? সুনন্দ বললেন – দেখুন স্যার।। কলকাতায় কিছুদিন ধরে রহস্যজনক ভাবে চুরি হয়ে চলেছে,বিভিন্ন জায়গায় ... বিভিন্নভাবে।এবার সেটা নিয়ে তদন্ত করতে গিয়েই আমার এই ভাগ্নেদের সাহায্য নিয়েছিলাম। যদিও এরা ডিটেকটিভ নয় ... অপরাধ মনস্তত্ত্ব নিয়ে খানিক ঘাঁটাঘাঁটি করে মাত্র। তা আমার ভাগ্নের মনে হয়েছে যে পরবর্তী চুরির ভিকটিম আপনি এবং সেই চুরি কাল রাতেই ঘটতে পারে বলে আমাদের ধারনা। যদিও এতদিন চুরিগুলো সোনাদনার উপর দিয়েই যাচ্ছিল।। কিন্তু আপনার কাছে যা আছে, তার মূল্য সোনাদানার থেকেও বেশী। তাই আমি ওর অনুরোধ ফেলতে পারিনি স্যার ... তাই আপনার থেকে অনুমতি চাইতে এসেছিলাম যে কাল রাতে যদি আমরা আপনার বাড়িতে থেকে এই সমস্যার সমাধান করতে পারি। আমরা কথা দিচ্ছি যে আপনার কাজের ব্যাঘাত ঘটবে না।
- চুরির ঘটনাগুলো আমিও পড়েছি ... তাহলে তো আপনাদের অনিমেষকেও প্রোটেকশান দেওয়া দরকার, কারণ ও এই ব্যাপারে আমায় সাহায্য করছিল কিছুদিন ... ওর কাছেও কিছু পেপারস আছে সম্ভবতঃ, কিন্তু ...
- কিন্তু কি স্যার ??? অনিমেষ স্যারকে নিয়ে কিছু বলবেন কি ???
- না থাক তেমন কিছু নয় ... আচমকা চিন্তিত হয়ে পড়লেন ললিত। সেটা রুদ্রর চোখ এড়ালো না। কিছু না বলেই বেরিয়ে এলো ওরা বাইরে ...
- কিরে কিছু বুঝতে পারলি ??? সুনন্দ প্রশ্ন করলেন।
-বুঝেছি।। কিন্তু তার ফল ঠিক কোনদিকে যাবে সেটা আন্দাজ করতে পারছি না। খ্যাতি জিনিসটা সত্যিই বড্ড বিড়ম্বনার জিনিস রে নীলাদ্রি। এর জন্য মানুষ কত কিছু করতে পারে ... এমনকি ...
- এমনকি ... কি ?? উৎসুক হয়ে রয়েছে নীলাদ্রি।
- কিচ্ছু না।। কালই এই রহস্যের যবনিকা পতন হবে আশা করি, যা চাইছি সেটা ধরতে পারলে খুব খুশী হব।। কিন্তু সেই জিনিস্টাকে মন থেকে কতটা মেনে নিতে পারবো সেটাই চিন্তার ... আপাততঃ কাল রাতে অপারেশন থারমিট... তার জন্য প্রস্তুত থেকো সকলে। কাল রাতে পাখি ঠিক খাঁচায় এসে ধরা দেবেই আমার বিশ্বাস।
- এই দাঁড়া দাঁড়া... সুনন্দ বলে উঠলেন। তুই আগে খোলসা করে আমায় সবটা বল, তুই যে কাকে সন্দেহ করছিস সেটা আমিও আন্দাজ করতে পারছি আজকের পর... কিন্তু তার সাথে আগের চুরির কি সম্পর্ক??
- তুমি যা ভাবছো ঠিক তাই, এই ধাঁধায় আমিও পড়েছিলাম ... সেদিন মিস মারপলের একটা গল্প পড়তে গিয়ে একটা কোড দেখে কথাটা মাথায় এলো।। সেটা ট্রাই করে দেখলাম।
- কিভাবে পেলি ??? নীলাদ্রি বলল ... রুদ্র বলল – বাড়িতে চলো দেখাচ্ছি। পুরোটা জানলে তোমরাও বিশ্বাস করতে পারবে না নিজের চোখকে।
(১১)
অপারেশন থারমিট
আবার বৃষ্টি নেমেছে সকাল থেকে, থামার নাম নেই... ওপরের ঘরের জানলায় বসে একথা সেকথা ভাবছিল রুদ্র। কিছুতেই মনের মধ্যে খচখচানিটা যাচ্ছে না, যে কথা কিছুতেই মাথায় আনতেই চাইছে না, সেকথাই ওকে বারবার ভাবতে হচ্ছে। হঠাৎ ডোরবেলের শব্দে ভাবনার জালটা ছিঁড়ে গেল ... দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন সুনন্দ। দরজা খুলতেই ব্যস্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন আর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হেঁকে বললেন
- দিদি এক কাপ চা হবে?? একদম ভিজে কাক হয়ে আছি ... একটু চটপট। রকম সকম দেখে হেসে ফেললো রুদ্র, এত জটিল একটা সমস্যা মাথায় নিয়েও কেউ যে এইভাবে চায়ের জন্য ডাকাডাকি করতে পারে, এই একজনকেই দেখে রুদ্র, সবেতেই একটা ভীষণ রুম বেপরোয়া আর ডোণ্ট কেয়ার একটা ভাবের জন্যই এত বেশী শ্রদ্ধা করে রুদ্র সুনন্দকে। রুদ্রর মা চায়ের কাপ টা নামিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন, সেটা খেয়াল করে সুনন্দ বললেন
- কিছু বলবি দিদি? কিছুটা চিন্তিত মুখে রুদ্রর মা বললেন
- নাহ তোদের কি বা আর বলার থাকবে?? যেমন মামা তার তেমন ভাগ্নে, পড়া নেই শোনা নেই ... কি যে এক নেশা হয়েছে তোর পাল্লায় পড়ে এখন বাবু ছুটলেন চোর ডাকাত ধরতে, কিছু হলে কে দেখবে? কথা শুনে সজোরে হেসে উঠলেন সুনন্দ
- তোর চিন্তা অমূলক নয় দিদি, কিন্তু আমি থাকতে রুদ্র কিংবা নীলাদ্রির কারো কিচ্ছু হবে না, এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারিস। কথা শেষ করেই রুদ্রকে ডাকলেন সুনন্দ
- এই কি বলবি বলে ডেকেছিলি?? কি বুঝতে পেরেছিস তুই এই কেস সম্পর্কে পরিষ্কার করে বল দেখি।
- এখন কিচ্ছু পরিষ্কার করে বলতে পারবো না ছোটমামা, আমার মধ্যে কি যে অদ্ভুত একটা লড়াই চলছে তা বলে বোঝাতে পারবো না, কিন্তু আজ রাতে যে করেই হোক প্রফেসর ললিত সরকার আর তার গবেষণাকে বাঁচাতেই হবে, নিলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।
- সে তো নাহয় বুঝলাম, কিন্তু কিভাবে কি করবো সেটাও তো আগে ভেবে রাখতে হবে ... আর আশা করি আগের ব্যবসায়ীদের মতো হতবুদ্ধির মানুষ নন প্রোফেসর, তিনি সাহায্য করবেন বলেই মনে করা যায়। কিছুটা চিন্তিত মুখেই বললেন সুনন্দ – এর আগে এতোটা সিরিয়াস তিনি রুদ্রকে কখনো দেখেননি।
এখন প্রায় রাত সাড়ে এগারোটা, প্রোফেসর ললিত সরকারের স্টাডিতে অন্ধকারে মিশে অসে আছে রুদ্র, নীলাদ্রি, সুনন্দ, প্রোফেসর ললিত সরকার এবং সুনন্দর সহকারী একজন অফিসার। বাইরে অসম্ভব বৃষ্টি ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শহর কলকাতার নিশ্চিদ্র রাতের ঘুম। স্ট্রীট ল্যাম্পের আলোয় নিজেকে নন্তুন ভাবে চিঞ্ছে রাতের কলকাতা, ব্যস্ততা থেকে একলা থাকার বিষণ্ণতার দিকে ক্রমশঃ গড়িয়ে যাচ্ছে রাত, আর সেই রাত ছুঁয়ে জেগে থাকে অশরীরী পায়ের শব্দ। নীলাদ্রি বেশীখণ চুপচাপ থাকতে পারেনা, হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে বলে উঠল
- ভাই এবারের ভাবনা টা মনে হয় ভুল পথে যাচ্ছে, এ বাড়িতে এই অসম্ভব বৃষ্টিতে আর কেউ আসবে না, বড্ড ঘুম পাচ্ছে, চল ফিরে যাই।
- আহ, তুই একটু চুপ করে বসবি ??? কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলে উঠল রুদ্র। কথা শেষ হতে না হতেই দেওয়াল ঘড়ি জানান দিল যে রাত বারোটা বেজে গেল ... আধঘুমে ভেজা শহর মায়াবী আলোয় ভিজতে ভিজতে আরো কিছুটা গভীর ঘুমের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। এই সময় আচমকা নিস্তব্ধতা চিরে একটা শনশন শব্দের সাথে স্টাডির জানলায় আটকে গেল একটা গ্রাপেল হুক সমেত দড়ি, কিছুটা সময় তীব্রতা বজায় রেখে স্থির হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই দড়িতে টান পড়ল, এবং সেটা বেয়ে নিঃশব্দে জানলায় উঠে এল একটা মধ্যবয়সী অবয়ব। সুনন্দর সহকারী পিস্তল বের করে উঠতে যাচ্ছিলেন, তাকে থামিয়ে দিল রুদ্র। সেই ছায়ামূর্তি নিঃশব্দে উঠে এল জানলা বেয়ে এবং ঘরে ঢুকে সটান স্টাডি টেবিলের ড্রয়ার তোলপাড় করতে লাগলো কিন্তু নিঃশব্দে, এত নিখুত তার অনুমান শক্তি যে দেখে মনে হয় সমস্ত ঘরের আনাচ কানাচ তার নখদর্পণে। হাতড়াতে হাতড়াতে কিছু কাগজ পত্র খুঁজে পপেয়ে টর্চের আলোয় সেগুলো এক ঝলক দেখে নিয়েই জানলার দিকে যাওয়ার উপক্রম করতেই রুদ্র সটান উঠে দাঁড়িয়ে বলল
- এত জলদি তো আপনার বাড়ি যাওয়া হবে না স্যার। চেনা গলার আওয়াজে হকচকিয়ে গিয়ে কিছুটা সময় স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে রইল সেই ছায়ামূর্তি, সেই সুযোগে ঘরের আলো জ্বালিয়ে ফেলেই বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলেন প্রোফেসর ললিত সরকার – অনিমেষ তুমি !!! শুধু ললিত নন, রুদ্র ছাড়া ঘরের প্রত্যেকটি মানুষেরই চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার পালা। একতাড়া গবেষণার ফাইল হাতে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন রুদ্রদের কেমিষ্ট্রির প্রোফেসর অনিমেষ স্যার, সকলের বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই সবেগে জানলার দিকে দৌড় লাগিয়েছিলেন অনিমেষ কিন্তু চোখের নিমেষে নীলাদ্রির হাত থেকে ভারী পেপারওয়েটটা ছিটকে গিয়ে অনিমেষের পায়ে লেগে তার দৌড় থামিয়ে দিল।
- সাবাস নীলাদ্রি, মাঠের এক থ্রোয়ে রান আউটের প্র্যাক্টিস টা ভালোই কাজে দিল তাহলে ... বলতে বলতে এগিয়ে গিয়ে পড়ে থাকা ফাইলটা কুড়িয়ে নিয়ে প্রোফেসর সরকারকে ফিরিয়ে দিয়ে অনিমেষ কে টেনে ধরে বসাল রুদ্র।বলেই একটা ছোট্ট প্রশ্ন ছুড়ে দিল
- একটু খানি সম্মান আর বিলেতের কিছু ইউনিভারসিটির ফেলোশিপের জন্য এতকিছু করার কি কোনো দরকার ছিল স্যার ?? আপনার যা কোয়ালিটি তাতে তো আপনি নিজেই একটা যেকোনো রিসার্চ পেপার তৈরি করে জমা করতে পারতেন, সেটাও যে বিশ্ববন্দিত হত না সেকথা কে বলতে পারে ??? তার জন্য এতগুলো চুরি, অ্যাটেম্পট টু মার্ডার এতকিছু তো আপনাকে মানায় না । এতগুলো প্রশেন্র সামনে দুহাতে মুখ ঢেকে চুপচাপ বসেছিলেন অনিমেষ, আলোর বিন্দু গুলো বৃত্তাকারে ঘুরে যাচ্ছিল অনিমেষের ঘড়ির কাঁচে আস্তে আস্তে ম্মুখ তুললেন তিনি, তার দুচোখে যেন আগুন জ্বলছে ... চিবিয়ে চিবিয়ে বলে চললেন
- থারমিট তৈরি হলে সারা দুনিয়ার শক্তি সমস্যার একটা বিশাল সমাধান হতে পারতো। ললিত স্যার ভালোই এগোচ্চিলেন এই কাজ নিয়ে, কিন্তু থারমিট তৈরির শেষ পর্বে এসে তিনি আমার সাহায্য নিতে বাধ্য হন, কারণ থারমিট বানাতে গেলে যে সব রাসায়নিক জিনিস দরকার সেগুলো কেবল মাত্র বায়ো কেমিষ্ট্রির কিছু ফরমূলা দিয়েই বানানো সম্ভব। যে পরিমাণ অবদান আমি রেখেছিলাম এই থারমিট বানানোতে, তাতে খানিকা কৃতিত্ব আমিও দাবি করতে পারি, কিন্তু প্রোফেসর সরকার সেই কৃতিত্ব দিতে রাজি হননি, উপরন্তু তিনি তার সামাজিক প্রতিপত্তির ভয় দেখিয়ে আমাকে আমার প্রাপ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছেন বারবার। কেন চাইবো না আমি এই সম্মান? সারাটা জীবন এই একটা স্বপ্ন নিয়ে চলতে চলতে যদি সেই স্বপ্ন টাও থমকে জেতে থাকে, সেটা কি খুব ভালো লাগে রুদ্র?? আর বিএষ যাওয়ার জন্য আমার দরকার ছিল প্রচুর টাকা, সেই কারণে আমায় এই পথে বেছে নিতেই হয়েছে ... কিন্তু জতটা অপরাধ আমি করেছি তার থেকেও বেশী অপরাধ অরেছে প্রোফেসর সরকার নিজে। রাইখস্ট্যাগ ইউনিভারসিটির প্রোফেসর হাইডেলবার্গের ফরমূলা হাতিয়েই তিনি আজ এত বড়ো গবেষক, এই গবেষণা আসলে প্রোফেসর সরকারের নয় ... এটা ২০০১ থেকে – ব্লপ... কথা শেষ হতে না হতেই একটা রিভলভারের চাপা শব্দে সবাই অবাক হয়ে পিছনে ফিরে দেখে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন প্রোফেসর সরকার, তার হাতে ধরা আছে একটা .৩৮ বোরের জার্মান ম্যাগনাম পিস্তল আর তার মাথার পাশের ছোট ফুটোটার চারপাশে একটা ছোটখাটো রক্তের পুকুর তৈরি হচ্ছে ক্রমশঃ।হাতের পিস্তলটা হোলস্টারে রাখতে রাখতে সুনন্দ বললেন
- একটা সত্যি লুকিয়ে রাখতে গিয়ে কতগুলো লোকের জীবন গেল, কি করেছেন প্রোফেসর সরকার সত্যিই আর জানার প্রয়োজন নেই, কিন্তু বেঁচে থাকলে যেকোনো উপায়েই হোক না কেন এই থারমিট সমস্যার সমাধান হয়তো ত্নি করতে পারতেন। খ্যাতির বিড়ম্বনা বড় বাজে জিনিস রে রুদ্র... বড় বাজে জিনিস। কিন্তু আজকের এই ঘটনাটায় তুই তোদের কলেজের স্যার কে সন্দেহটা করলি কিভাবে ?? খানিকটা আনমনা হয়ে বাইরের জানলা টায় দেখছিল রুদ্র, হঠাৎ ডাক শুনে এদিকে ফিরে তাকিয়ে বলল
- তোমাদের ডিপার্টমেন্টে নিশ্চয়ই মাস্কিং কেসের প্রচলন আছে ?? যদিও এটা একটা ইউরোপীয়ান পদ্ধতি, তাও দেশ বিদেশের নামজাদা অপরাধীরা এই প্রথার বিশেষ অনুরাগী। কিছু নকল অপরাধের আড়ালে আসল অপরাধের উদ্দেশ্য এবং টার্গেট লুকিয়ে রাখাই হল মাস্কিং। যাতে কোনভাবেই তাদের অস্তিত্ব প্রমাণিত না হয়, এখানেও ঠিক তাই হয়েছে খানিক্টা। অনিমেষ স্যারের আসল টার্গেট ছিলেন প্রোফেসর ললিত সরকার, তা ফালতু কিছু চুরির ঘটনা সাজাতে হয় অনিমেষকে, যাতে সাধারণ চুরির শোরগোলে এই চুরির খবরটা ঢাকা পড়ে যায়। সেজন্য তিনি ভাড়া করেছিলেন সেই ক্লেপ্টোম্যানিয়াক লোকটিকে আর নিজে কেমিষ্ট্রির প্রোফেসর হয়ে জানতেন যে মানুষকে কিছুটা সময়ের জন্য বেহুঁশ ক্রতে গেলে কি দরকার, তাই তিনি ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন হাইড্রোজেন আরসেনাইড বাল্ব, যাতে মানুষ মরবে না ... কিন্তু বেহুঁশ হয়ে থাকবে বেশ অনেকক্ষণ। কিন্তু তিনি দেখলেন যে, আমরা আর পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ওই চুরি গুলো নিয়ে খুব তদ্বির করছি, আর সেই সাথে একটা চুরির প্ল্যান বানচাল করি আমরা। তাই আমাদের ভয় দেখাতেই পুলিশ স্টেশনে জেলিগ্নাইট বানিয়ে পাঠিয়েছিলেন, এখানেই প্রথম ভুলটা করেন অনিমেষ, সাধারণ আসামী হলে যে কোন বোমা পাঠাতে পারতো, এত দামি বোমা বানিয়ে মানুষ মারার দরকার পড়ত না তার। এর পরে একদিন কলেজে স্যারের সাথে ধাক্কা খাই, সেদিন কলেজে স্যারের নিজের ফাইলের ভিতর থেকে ললিত সরকারের নাম লেকা কিছু কাগজ দেখতে পাই, খটকাটা আমার সেখানেই লাগে। একটা অনুমান নিয়েই দুইয়ে দুইয়ে চার করতে বেড়িয়ে পড়ি এবং আমার ধারণা অমূলক হয়ে যায়। আর আরো মজার ঘটনা এই যে, ঠিক যেমন ভাবে চুরির দিন আর টারগেটদের একটা ওরিয়েন্টেশনে সাজিয়ে ছিলেন, সেইভাবেই কোথায় কোথায় কোন ঠিকানায় চুরি হবে, সেটাও সাজিয়েছিলেন নিপুণ ভাবে যা বোঝা দুঃসাধ্য ছিল। ভেবে দেখো চুরি গুলো কোথায় কোথায় হয় – আলিপুর, নিমতলা, এজরা স্ত্রীট, হাতিবাগান, মানিক্তলা,ইকবালপুর আর আজ এই এসপ্ল্যানেডের কাছে। প্রত্যেক্টা জায়গার নামের আদ্যক্ষর টা বের করে নিয়ে দেখো A,N,E,H,M,I,S বেরিয়ে আসে, এবার সেটাকে সঠিক ভাবে সাজিয়ে দেখো – ANIMESH ই বেরিয়ে আসে, এখান থেকেই আমার সন্দেহটা আরো জোরদার হয়, আর বাকিটা আমি তোমায় জানাই। আর আমি হাতেনাতে স্যারকে ধরতে চেয়েছিলাম কারণ অন্য কেউ থাকলে আজ হয়তো একটা এনকাউন্টার হয়ে যেত, কিন্তু সমাজের জন্য সেটা কখনোই কাম্য নয়, একটা ভুল হয়তো লোভে পড়ে অনিমেষ স্যার করে ফেলেছেন, কিন্তু একজন গবেষক এবং শিক্ষক হিসেবে সমাজের ওনাকে প্রয়োজন পড়বে বারবার। সবার নিস্তব্ধ দৃষ্টি বারবার জরিপ করছে রুদ্রকে, তাই হুয়তো কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েই – আমি আসি এবার, চল রে নীলাদ্রি ... বলেই নীলাদ্রিকে ডেকে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেল রুদ্র, বৃষ্টি থেমেছে বাইরে ... কারনিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল, আর রাস্তায় জমে থাকা অল্প জলের মাঝে ঝিকমিক করছে পুলিশের হূটারের আলো আর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খানখান করে দিচ্ছে সাইরেনের শব্দ। রুদ্রদের দূরে মিলিয়ে যাওয়ার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে সুনন্দ নিজের মনেই বলে উঠলেন – নাহ রে, আজ এতোদিন পরেও সত্যিই তোকে চিনে উঠতে পারা গেল না। কিছু মানুষ সত্যিই থাকে যারা অপরাধী ধরতে ভালোবাসে... এই যেমন আমরা পুলিশরা এটা ডিউটি মেনে করে থাকি ... কিন্তু অপরাধ থেকে অপরাধীকে আলাদা করে ফেলতে পারে কজন ? হয়তো কেউ পারে না ... কিন্তু সেটাই তো আসল সমাজ, অপরাধীমুক্ত সুসভ্য সমাজ নয়, যেখানে ঘরের আড়ালে মানুষের মনে অপরাধ দানা বেধে থাকে। একটা এমন সমাজ যেখানে অপরাধী হয়তো আছে ... কিন্তু অপরাধীদের করার মত অপরাধ অবশিষ্ট নেই, সেই সমাজ রুদ্রদের খোঁজে ... কখনো পায়, কখনো হয়তো খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে নিজেরাই বিকল্প হয়ে ওঠে। এটাই আসল পরিবর্তন, রঙ নয় ... পতাকা নয়, শুধু কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমাজ গড়ার অঙ্গীকার। এ সমাজ রুদ্রদের ... এ সমাজ নীলাদ্রির, এ সমাজ সকলের।

আপনার মতামত জানান