কৈশোরের ঝরা পাতা

তাপসকিরণ রায়


শৈশবের পাতা ঝরে যাচ্ছিল। কৈশোরের ছোঁয়া টের পাচ্ছিলাম দেহে ও মনে। রংবেরঙের স্বপ্ন এসে মন জুড়ে বসছিল।
আমি আর দেবাশীষ ছিপ নিয়ে মাছ দরতে গিয়েছিলাম চুর্নী নদীতে। হঠাৎ পাশ থেকে ধুপ ধাপ আওয়াজ এলো-এতটা লক্ষ্য করিনি, কারা যেন ঝুপ ঝাপ আমাদের পাশটিতে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল। খিলখিল খলখল হাসির শব্দে বোঝা গেল অল্প বয়সের মেয়েদের দল স্নানে নেমেছে।
দেবাশীষ রেগে গিয়ে বলল, এই তোরা অন্য জাগায় যা না!
--কাঁহি কি রে ? তুরা যা না অন্য জাইগায় ! স্নান করতে করতে একটা মেয়ে বলে উঠল--আর সঙ্গে সঙ্গে অন্য মেয়েরা দমক নিয়ে নিয়ে হেসে উঠলো। ওরা অবাঙ্গালী হবে। সাঁওতাল বা আদিবাসী কিম্বা ভিনদেশী শ্রমিক শ্রেণীর হতে পারে।
দেবাশীষও বলে ছিল, আমরা মাছ ধরছি দেখছিস না ?
সেই মুখর মেয়েটাই হবে, বলে উঠলো,কত মাছ ধরেছিস রে বাবুরা ? আবার মেয়ের দল সুর করে হেসে উঠলো।
মেয়েদের প্রায় সব কজন ছিল শ্যামবর্ণা। পরনে লাল নীল সবুজ রঙের সস্তার সাড়ি জড়ানো। অন্তর্বাস কিছুই নেই । ওদের মধ্যে একটি মেয়ে সামান্য ধীর স্থির শান্ত। ওর মুখে হাসির রেখা বারবার ফুটে উঠছিল বটে কিন্তু সেই খলবলি হাসি না। সামান্য বুঝ অবুঝের মাঝে নম্রতা ওকে ঝুঁকিয়ে রেখে ছিল। মেয়েটির চোখে আমার চোখ পড়ে গেল। বাঃ, খুব সুন্দর ! একেই কি টানা টানা চোখ বলে ?—ঘন, কালো দুটি উজ্জ্বল চোখ--কালো হরিণ চোখ ? ওদের সবার হাতেই কাঁচের চুড়ি ছিল। যতবার হাত নাড়ছিল, টুং টাং, রিনীঝিনি শব্দ হয়ে বেজে উঠছিল। নদীর জলের তিরতির স্রোতের সঙ্গে সুন্দর এক রণন ধ্বনি হয়ে উঠছিল।
চারদিকের চকচকে সূর্যের আলো নদীর জলে প্রতিফলিত হচ্ছে। ঝকঝকে রুপালী জল উচ্ছলিয়ে ওরা স্নান করছে। না, ওদের মনেও ছিল সরলতা--যেটুকু উচ্ছলতা সেটুকু তো বয়সের ধর্ম। ওদের গায়ের কাপড় শরীর লিপ্টে ধরে ছিল। অনেকেই নিজেদের সাড়ি সামলাতে ব্যস্ত হচ্ছিল--টেনেটুনে উন্নত বন্ধুর জাগাগুলিকে ঢেকে নেবার চেষ্টা চলছিল। সেই মেয়েটি আগেই নিজের লজ্জার জাগাগুলি পরিপাটি করে ঢেকে নিয়েছে। জল বিন্দু তার কপাল গাল কপোলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সূর্যের আলোক আভায় মতি বিন্দুর মতই সেগুলি জগমগ করে চলেছে ! মনে হচ্ছিল মেয়েটির মুখ কোন উৎসব সজ্জায় কারুকার্য মণ্ডিত হয়ে আছে। সমস্ত দেহের অন্ধিসন্ধিতে জ্বলজ্বল মুক্তালঙ্কার ঔজ্জ্বল্য এক দেবকন্যার মত তাকে মহিমান্বিত করে তুলেছে ।
মেয়েগুলি ছুটে চলে যাচ্ছে--হা হা, হি হি হাসির লহর নিয়ে নদীর বালুচরি তীর ধরে উঠে যাচ্ছে। সেই মেয়েটি সবার পেছনে, ওর চোখে চোখ পড়ে গেল। মেয়েটির মুখে আলতো হাসির রেখা! কালো মায়াময় সেই চোখ--আয়ত চোখের পত্রপাপড়ি--সূক্ষ্ম চোখের জোর ভ্রূতে ও যেন আমায় নিভৃত আলোকপাত করে গেল !
মুহূর্তে আঃ, একটা শব্দ কানে এলো। দেখলাম, মেয়েটি মাটিতে বসে পড়ল। আমি উতলা হয়ে পড়লাম, ছুটে গেলাম মেয়েটির দিকে। সত্যি ও ব্যথাতুর মুখ নিয়ে বসে আছে। আমি, কাঁটা, বলে ওর পাশটিতে বসে গেলাম। ও একটু সংকোচ করে সরে বসার চেষ্টা করল। আমি সে দিকে নজর দিলাম না--দেখলাম ওর পায়ে বড় একটা কাঁটা ফুটেছে! নীরবে আমি এক হাতে ওর পা ধরে অন্য হাত দিয়ে কাঁটা চিপে ধরে এক টানে তুলে নিলাম। আঃ, করে ব্যথায় কুঁকড়ে গেল মেয়েটি। পা নিজের দিকে টেনে নিলো। এ বার পা থেকে রক্ত ঝরতে দেখলাম। আমি নিজের অজান্তেই মেয়েটির পরনের কাপড়ের এক কোনা টেনে নিয়ে চেপে ধরলাম। এবার আমাদের উভয়ের হুঁশ এলো। মেয়েটি চট করে দাঁড়িয়ে গেল। এত সময় ওর গা আমার গায়ে বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছিল। আমরা কেউ সেটা অনুভব করতে পারিনি। ও এবার আমার দিকে তাকাল, আমিও ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
হঠাৎ মেয়েদের কোলাহলে আমাদের সম্বিত ফিরল।
--ব্যথা কমেছে তোমার ?
ও হেসে মাথা নাড়ল।
মেয়েরা এসে যাচ্ছে।
--তোমার নাম কি ?
ও মাথা নিচু করে বলল, যমুনা।
আমি আবৃত্তি করলাম, যমুনা, যমুনা !
এদিকে মেয়েদের ঝাঁক এসে আমাদের ঘিরে নিলো। উতলা হয়ে কোন শঙ্কিত ঘটনার ইঙ্গিতে ওরা এক সঙ্গে অনেক প্রশ্ন করে গেল। আমার দিকে আড় চোখে তাকাল।
মুহূর্তের মাঝে ওরা জেনে গেল ঘটনা। আমার আর যমুনার সান্নিধ্যের ব্যাপারটা আন্দাজ করে নিয়ে ওরা মুখ টিপে হেসে নিলো।
ওদের যাত্রা পথের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে ছিলাম। যমুনা পা খুঁড়িয়ে হাঁটছিল, তার মাঝে ফিরে তাকাচ্ছিল বারবার। এক সময় নদীর পার ছাড়িয়ে ওরা আমার চোখের বাইরে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আপনার মতামত জানান