দুটি কবিতা

প্রশান্ত সাহা
স্বপ্নপূরণ
ময়লা শার্ট পরা ছেলেটার কলার ছেঁড়া,
অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সে পার করে চলেছে
একের পর এক সারি-
হাতের ঝোলাতে চিপসের প্যাকেট ভর্তি ;
সিনেমাহলের মধ্যে ইন্টারভেলের সময়টুকু তার ব্যবসার 'পিক আওয়ার'!
প্যান্টের পকেটে টাকা রাখতে রাখতে
সে স্বপ্ন দেখে বোম্বেতে গিয়ে হিরো হওয়ার,
একদিন নিশ্চয়ই এই হলেই তার সিনেমা চলবে,
দর্শক উৎসাহে সিটি মারবে তার এন্ট্রি দেখে!!
শহরের অভিজাত শপিংমলের ডিউটি সেরে
ভিড় ট্রেনে করে বাড়ি ফেরে মেয়েটা,
তখন তার গালে প্রসাধনের চিহ্নমাত্র থাকে না।
ঘামে ভেজা চুড়িদারের মধ্যে দিয়ে
পরিষ্কার বোঝা যায় অন্তর্বাসের উপস্থিতি!
অস্বস্তিকর গুঞ্জন শুরু হয়ে যায় পুরুষ সহযাত্রীদের মধ্যে-
ওড়না দিয়ে কপালে জমা হওয়া ঘাম মুছতে মুছতে
মেয়েটা স্বপ্ন দেখে বিধবা মায়ের ট্রিটমেন্টের জন্য
টাকাটা জোগাড় হয়ে যাবে খুব তাড়াতাড়ি!!
ছাপাখানায় বই বাঁধাই করতে করতে কোন কোনদিন
নিজের টিফিনটা অবধি খেতে ভুলে যায় মাঝবয়সী লোকটা।
নতুন বইয়ের গন্ধে ভরপুর থাকে পেট,
খিদেটা তেমন চাগাড় দিয়ে ওঠে না।
কাজ করার সময় বেশ কিছুটা লেখা পড়ে ফেলেন তিনি।
মাধ্যমিক ফেল মানুষটা বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে স্বপ্ন দেখেন-
তার ছেলেটা অনেক লেখাপড়া শিখে একদিন নামী লেখক হয়ে উঠবে,
সে পরম যত্নে বাঁধাই করে দেবে তার ছেলের বই !!
ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে গিয়ে
Accident-এ স্বামীর ডান হাতটা কাটা যায় -
অগত্যা সংসারটা বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে
বউটা চপের দোকান দিলো।
বিকেল থেকে রাত্রি অবধি ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে
কড়াই ভর্তি ফুটন্ত তেলে সে ভেজে চলেছে
আলুর চপ, বেগুনি, পিঁয়াজী..
বাড়িতে ফিরে হেঁশেলে রাতের রান্না করতে করতে
বউটা স্বপ্ন দেখে একদিন তার ব্যবসাটা অনেক বড়ো হবে,
তার স্বামীকে নিয়ে ট্রেনে করে সে ঘুরতে যাবে
দার্জিলিং, সিমলা, কাশ্মীর!!
স্বপ্ন দেখছে সবাই, চোখ খুলে, প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত।
তা সফল করতে উদয়াস্ত খেটে চলেছে।
এই বিশ্বাসে যে একদিন তাদের স্বপ্নপূরণ হবে।
মর্যাদা পাবে তাদের পরিশ্রম,
দূর হবে মনের মধ্যে জমে থাকা ক্লেদ;
হাসি ফুটবে তাদেরকে ঘিরে থাকা মানুষগুলোর মুখে...

ঘরছাড়া
রাত হয়েছে অনেক,
রবিবার আজ, রাস্তাঘাট প্রায় শুনশান।
সিগন্যাল বাতিগুলোও ক্রমাগত রঙ বদলাতে বদলাতে ক্লান্ত!
সবজে আলোয় চোখের আরাম হয়।
বাসস্টপে একটা ভিখারী শুয়ে আছে,
মুখ ভর্তি জংলা দাড়ি,
পরনের পোষাক শতচ্ছিন্ন -লজ্জা নিবারণটুকু হয়েছে মাত্র!
দু'চোখে নিশ্চিন্ত ঘুমের প্রলেপ মাখানো,
যার কিছু নেই, তার হারানোর ভয় নেই!!
ল্যাংড়া কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে বার দুয়েক ডাকলো,
তারপর চেনা হাতের আদর পেতেই বিগলিত প্রাণ।
উচ্ছ্বাসে চেটে দিলো পায়ের পাতা,
পকেটে হাত ঢোকালাম,
নাহ, আজ খাওয়ানোর মতো কিছুই নেই;
তবুও সে ছেড়ে গেলো না আমাকে- নি:স্বার্থ আনুগত্য!!
গলির পিছনের চায়ের দোকানটা এখনো খোলা-
দু'জন লোক বসে আছে অলসভাবে,
হাতে অফুরন্ত সময়।
দোকানি চায়ের কাপে চিনি গুলছে সশব্দে।
আমিও হেঁটে চলেছি,
কিসের ঘোরে জানি না, উদ্দেশ্যহীনভাবে।
ঘরছাড়া মানুষের ঘরে ফেরার তাগিদ থাকে না, কখনোই.....

আপনার মতামত জানান