অন্তর্গত খেলা

অবিন সেন


“থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন” ।


কলকাতায় এবারে ঠাণ্ডাটা তেমন ভাবে পড়েনি, তারই মধ্যে আজ একটু বেশী শীত মনে হচ্ছে। উত্তরে বাতাস দিচ্ছে। সুতরাং ছুটির দিনের সকালটা একটু বেশীই আলসেমি করে কাটাবে ভেবেছে প্রবাল। তনুকা তখনো লেপের ওমের আদরে গুটি সুটি মেরে শুয়ে আছে। প্রবালের দু-একবার ঠেলায় মুখের মধ্যে ‘উমমম’ করে একটা বিরক্তির শব্দ করে সে পাশ ফিরে শোয়। মাথা পর্যন্ত লেপটা টেনে দেয়।
অগত্যা প্রবাল আর তাকে বিরক্ত করে না। সকালে উঠে সে আধ ঘণ্টা যোগ ব্যায়াম করে। ব্যায়াম সারতে সারতে আজ প্রায় আটটা। বাথরুম থেকে ফ্রেস হয়ে তনুকা আর নিজের জন্যে দু কাপ চা বানায় । তারপর তনুকার সঙ্গে আবার খানিক আমোদ করে সে । তনুকা চা শেষ করে বাথরুমে গেলে, প্রবাল ড্রয়িং রুমে টিভি চালিয়ে বসে।
খবরের চ্যানেলে টিউন করেতেই তার মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে আসে
উরিব্বাশ, সকাল সকালই ধামাকা !
টিভি তে দেখাচ্ছে, ‘দক্ষিণ কলকাতার এক ধনী এলাকায় বোমা বিস্ফোরণে এক কলেজ ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। দু জন আহত। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তদন্তে নেমেছে। প্রাথমিক ভাবে পুলিশের অনুমান কোনও পার্সেল বক্সে বুবি ট্র্যাপ করে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। কোনও জঙ্গি নাশকতা এর মধ্যে জড়িয়ে আছে কিনা পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে’।
প্রবাল মনে করতে পারছে না, স্মরণ-কালের মধ্যে কলকাতায় এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি না! তখনি তার মোবাইল ফোনটা বাজল। সে তড়িৎ বেগে মোবাইলের দিকে হাত বাড়ায়। দেখল অর্ক। সে যেন এই ফোনটারই অপেক্ষা করছিল। অর্ক মিত্র, IPS অফিসার।কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের, ও.এস.ডি. পদে আছে। অর্ক মিত্র সেই ছেলেবেলা থেকে প্রবাল সেনের বন্ধু। রহস্যভেদ প্রবালের নেশা। অর্ককে সঙ্গে নিয়ে অনেক জটিল রহস্যের সে সমাধান করেছে।
ও দিক থেকে অর্ক কিছু বলার আগেই প্রবাল বলল
খবরে, দেখছিলাম। আমি যাব?
রহস্যের গন্ধ পেলে প্রবাল আর নিজেকে আটকে রাখতে পারে না।
অর্ক বলল
গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। তুই এখুনি চলে আয়।
অর্ক আর কথা বাড়ায় না।

দো-তলা বাড়িটা পুরানো। আশেপাশের বড় বড় ফ্ল্যাট বাড়ির মাঝে নিতান্ত সাধারণ বাড়িটা যেন খানিক বেমানান ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির চার পাশে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে বাগান, অপরিচর্যার ফলে আগাছায় অপরিষ্কার হয়ে আছে। পুরানো বাড়ি বলে বিস্ফোরণে ক্ষতিটা যেন বেশী হয়েছে। ঘটনা ঘটেছে দোতলায়। জানালার কাচ সব ভেঙে গিয়েছে। দরজার একটা পাল্লা ছিটকে বেরিয়ে এসে ছিটকে পড়েছে বারান্দায়। নীচের তলায় সিলিঙের প্লাস্টার ধ্বসে পড়ে বাড়ির মালিক নির্মলবাবু আর তাঁর স্ত্রী মালবিকা আহত হয়েছেন।
ডেঞ্জার টেপের বেড়া টপকে প্রবাল গিয়ে দেখল অর্ক আর তার টিম দোতলার ঘরে ভাঙা চোরা মাঝে কি যেন অনুসন্ধান করছে।
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলে সামনেই এক চিলতে টানা বারান্দা। বারান্দার দু পাশে দুটি ঘর । ঘর দুটি বেশ বড়। দুটি ঘরেরই লাগোয়া চানঘর। সে দুটিও বেশ বড়। দক্ষিণ দিকের জানালার সামনে আরও একটুকরো ঝোলা বারান্দা। একদিকের একটি ঘরে সোমা বিশ্বাস পেয়িং গেস্ট হিসাবে ভাড়ায় থাকত। অপর দিকের ঘরটি ফাঁকাই পড়ে ছিল।
সোমা ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের ছাত্রী।
সমস্ত ঘরটি প্রায় একটি ধ্বংসস্তূপের মতো হয়ে গিয়েছে।
সোমার দেহটি প্রায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। তবে বিস্ময়কর ভাবে মুখটি প্রায় অবিকৃত ছিল। পুলিশ ছিন্নভিন্ন মাংসপিণ্ড এককাট্টা করে পোস্টমর্টেমের জন্য নিয়ে গিয়েছে। সমস্ত ঘরের বাতাস পোড়া কটু গন্ধে যেন বিষাক্ত হয়ে আছে।
প্রবালকে দেখে অর্ক বলল
খুব পেশাদারি ভঙ্গিতে ঘটনাটা ঘটানো হয়েছে।
প্রবাল জানতে চাইল
কি ভাবে ?
বিস্ফোরণের ধরন দেখে মনে হচ্ছে স্বল্প ক্ষমতার গ্রেনেড। একটা ছয় ইঞ্চির মতো সাইজের প্যাকিং বাক্সের ভিতর বুবি ট্র্যাপ করে গ্রেনেডটি রাখা ছিল। বাক্সটি ওপেন করার পরেই বিস্ফোরণ ঘটে ।
কখন ঘটেছে?
গতকাল রাত সড়ে দশটা নাগাদ। মনে হয় সোমা রাত্রের খাওয়া দাওয়ার পরে পার্সেলটা খুলতে গিয়েছিল।
পার্সেলটা কখন এসেছিল।
বাড়িওলা নির্মলবাবু বলেছে, সন্ধ্যার দিকে এক কুরিয়ারের লোক এসে বাক্সটা দিয়ে যায়।
কোন কুরিয়ার সেটা নির্মলবাবু বলতে পারেননি।
প্যাকিং বাক্সটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে। চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা একটা একটা পোড়া ছেঁড়া কাগজ কুড়িয়ে রাখছিল এক তদন্তকারী অফিসার।
প্রবাল ঘরের চার পাশটা ভালো করে চোখ বোলায়। দরজা দিয়ে ঢুকেই ঘরের ডানদিকে সিঙ্গেল খাট। দেওয়ালের গা ঘেঁসেই। বিছানার উল্টোদিকে ওয়াল ফার্নিচার, আলনা, টিভি। সেসবের একপাশে অ্যাটাচ বাথরুমের দরজা। বিছানায় আগুন লেগে গিয়েছিল, বিস্ফোরণে। মনে হয় সোমা বিছানায় বসেই পার্সেলটা খুলেছিল। বিছানায় ল্যাপটপ ছিল। সেটির অবস্থাও খারাপ। মোবাইল ফোনটা মোটামুটি ঠিক আছে।
প্রবাল হাতে দস্তানা পরে নেয়। ল্যাপটপটা নিয়ে নেড়ে চেড়ে দ্যাখে। হার্ড-ডিক্সটা ঠিক আছে বলে তার মনে হয়।
অর্ক বলল
একজন কলেজ ছাত্রীকে খুন করার জন্য এই রকম একটা স্মার্ট পদ্ধতিতে বুবি ট্র্যাপ হিসাবে একটা গ্রেনেড ব্যবহার করা হল। তাও কলকাতার বুকে। জাস্ট ভাবতে পারছি না। কলকাতার অপরাধ কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে !
কথাটা শেষ করে সে কাঁধ ঝাঁকায়। যেন তার বিরক্তি, বিস্ময় একসঙ্গে প্রকাশ করছে।
প্রবাল বলল
তোর হতাশ হবার খুব একটা প্রয়োজন নেই। কারণ এই ধরনের অপরাধ কালেভদ্রে ঘটে। এরা ঠিক অপরাধী নয়। নিজেদের এরা আর্টিস্ট ভাবে।




“তুমি তা জান না কিছু, না জানিলে,”


নির্মলবাবু, কুরিয়ারের ছেলেটি কখন এসেছিল ?
প্রবাল সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে জিজ্ঞাসা করল।
বাড়ির মালিক নির্মলকান্তি দত্ত ছোট খাটো মানুষ। রোগা পাতলা নিরীহ চেহারা। আলাদা কোনও বিশেষত্ব নেই।
যখন বিস্ফোরণ ঘটেছিল তখন নির্মলবাবু আরাম চেয়ারে বসে টিভি দেখছিলেন। সিলিং থেকে একটা বড় প্লাস্টারের চাঙড় ভেঙে তার পায়ের উপর পড়েছিল। পায়ে চোট লেগেছে ভালো। ব্যথা বেদনায় আর দুঃখে তিনি মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন। বালিশে পিঠ দিয়ে তিনি বিশ্রাম করছিলেন।
প্রবাল বিছানার পাশে একটি চেয়ারে বসেছিল।
প্রবালের প্রশ্ন শুনে ম্লান চোখে তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন, তার পরে মৃদু গলায় বলেন
তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। আমাদের গলির আলোটা আবার খারাপ। ঘড়ি দেখিনি, তবে সন্ধ্যা ছটার পরই হবে।
তার মুখ নিশ্চয়ই ভালো করে দ্যাখেননি?
না ! অন্ধকার ছিল, তার উপর মাথায় ছিল মুখ ঢাকা হেলমেট।
পিঠে ব্যাগ ছিল?
ছিল । তবে এখন মনে হচ্ছে সেই ব্যাগ কুরিয়ার বয়দের ব্যাগের মতো অতো বড় ছিল না।
উপরের ঘর থেকে নেমে এসে অর্ক আর একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল প্রবালের পাশে। প্রবাল তার দিকে সিগারেটের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিতে অর্ক একটা সিগারেট ধরায়।
প্রবাল আবার বলল
ছেলেটি কি নামে ডাকছিল? নিশ্চয়ই কারো নাম ধরে ডাকছিল?
নির্মলবাবু মাথা নাড়লেন
না, না, বাইকের হর্ন দিচ্ছিল। অনেকবার হর্ন দিয়েছিল। হর্ন শুনে আমি দরজা খুলে বাইরে বের হই। সে আমাকে দেখে শুধু একটা কথাই বলেছিল, ‘সোমা বিশ্বাসের নামে একটা পার্সেল আছে’। তার পরে হাত বাড়িয়ে আমাকে পার্সেলটা দেয় ।
কোথাও সই সাবুত করায়নি?
অর্ক জানতে চাইল।
নির্মলবাবু আবার মাথা নাড়লেন।
না।
বাইকের রঙ কি ছিল?
কালো।
অর্ক প্রবালের দিকে ফেরে। তার পরে বলল
গ্রেনেডের টুকরো গুলো দেখে মনে হচ্ছে চাইনিজ মেড । এই ধরনের জিনিস আজকাল নেপাল বর্ডার দিয়ে চোরা পথে ভারতে ঢুকছে। চোরা বাজারেও এর ভালো দাম আছে।
এই ধরেনের গ্রেনেড কি সহজলভ্য?
অর্ক বলল
না। একেবারেই না। এই লাইন যাদের জানা নেই তাদের পক্ষে জোগাড় করা বেশ শক্ত।
প্রবাল আবার নির্মলবাবুর দিকে ফিরে বলল
সোমা বিশ্বাস কতদিন আছে এখানে?
তা প্রায় এক বছর হবে।
কি ভাবে ওর সঙ্গে আপনাদের যোগাযোগ হয়?
চেনা পরিচয়ের সূত্রে এসেছিল।
নির্মলবাবু আর ভেঙে বললেন না।
প্রবাল বলল
অর্ক, সোমার বাড়ির লোকজন কখন আসছে ?
সোমার বাড়িতে শুধু সোমার মা আর এক ছোট ভাই আছে। মা সামান্য টাকা পেনশন পায়। তার ভাই এখনো কলেজে পড়ছে। ভাই আসছে আলিপুরদুয়ার থেকে। আসতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।
প্রবাল আবার নির্মলবাবুকে জিজ্ঞাসা করল
সোমা, কেমন মেয়ে ছিল?
খুব চাপা স্বভাবের ছিল। চুপ চাপ থাকত। নিজের মতো থাকত। আমার সঙ্গে বা আমার স্ত্রীর সঙ্গে তেমন করে মেলা মেশা করত না।
বন্ধু বান্ধবরা আসত ?
না, সে রকম কাউকে আসতে দেখিনি। অবশ্য আমি তো বাড়িতে সারাদিন থাকি না। ব্যবসার কাজে বাইরে বাইরে ঘুরতে হয় ! আমার স্ত্রীও বলেছে সোমার কোনও বন্ধু বান্ধব আসত না।
একেবারেই কেউ আসত না ?
নির্মলবাবু ঘাড় নাড়লেন।
না, যতদূর শুনেছি একেবারেই কেউ আসত না !
নির্মলবাবুর অর্ডার সাপ্লাইয়ের ব্যবসা আছে। বিভিন্ন অফিসে, সরকারি দপ্তরে না না রকম জিনিসের সাপ্লাই দিয়ে থাকেন। রসিকতা করে বলেন, ‘তিনি আলপিন থেকে হাতি সবকিছুরই সাপ্লাই দিয়ে থাকেন’। বেশ চালু ব্যবসা। যদিও ব্যবসাটা তিনি তাঁর শ্বশুরের কাছ থেকে পেয়েছেন। এখনও কাগজপত্রে ব্যবসার মালিক নির্মলবাবুর স্ত্রী মালবিকা। মালবিকা সময় কাটাবার জন্যে একটা ছোটদের স্কুলে পাড়ান। তাঁদের কোনও সন্তানাদি হয়নি। এখন আর হাবার সম্ভাবনাও বোধহয় নেই। নির্মলবাবুর বয়স পঞ্চাশের দোরগোড়ায় আর মালবিকার বয়সও পঁয়তাল্লিশ পেরিয়েছে।
মালবিকার চোট সামান্য লেগেছিল। তাঁর কাছ থেকে বিশেষ কিছু জানা গেল না। কোনও একটা কারণে তিনি খুব অপছন্দ করতেন সোমাকে। দু একটা দরকারি কথা ছাড়া অন্য কোনও কথা তিনি সোমার সাথে বলতেন না।

অর্ক বলল
আমাকে ভাবাচ্ছে এই হ্যান্ড গ্রেনেড । এই ধরনের চায়না মেড গ্রেনেড একটি বিশেষ টেররিস্ট অর্গানাইজেশন ব্যাবহার করে। সুতরাং এই ধরনের গ্রেনেডের সঙ্গে কলকাতার কানেকশান আমাকে ভাবাচ্ছে।
প্রবাল মাথা নাড়ল।
সোমার সমস্ত গতিবিধি আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। তার বন্ধু কারা। কাদের সঙ্গে ছিল তার বেশী মেলামেশা, তাদের সবার গতিবিধি আমাদের অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। এই ঘটনা সোমার পরিচিত কেউই ঘটিয়েছে।
অর্ক তার কথায় সায় দিল।
প্রবাল আবার বলল
আজ বাড়ি চললাম । দু এক দিন পরে তোর অফিসে গিয়ে পার্সেল বক্সের ছেঁড়া, পোড়া টুকরোগুলো দেখব। দেখি ওর মধ্যে কিছু পাই কিনা ! ততদিনে তুই সোমার বিষয়ে, ওর বন্ধুদের বিষয়ে ইনভেস্টিগেশন করে রাখিস । এক জন অফিসারকে ওর ইউনিভার্সিটিতেও পাঠিয়ে দিস।




“সেই সব ধূসর হাসি, গল্প, প্রেম”



অর্কর অফিসে সোমার কয়েকজন বন্ধু বান্ধবীকে ডাকা হয়েছিল কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ।
ধূমায়িত কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে প্রবাল বলল
তুমি তো অন্য ডিপার্টমেন্টে পড়ো, তোমার সঙ্গে সোমার কিভাবে পরিচয় হয়েছিল?
অর্পণ সাহা, যাদবপুর থেকে মেকানিক্যালে এম.টেক করছে। রোগা পাতলা চেহারা। এক মুখ দাড়ি , মাথায় বড় বড় চুল রুক্ষ এলোমেলো। হাওড়ার কদমতলায় বাড়ি । বাড়ি থেকেই কলেজে যাতায়াত করে। সে মুখ নিচু করে বসে ছিল। প্রবালের প্রশ্নে মুখ তুলে তাকায়। একটু রুক্ষ গলায় বলে
ঠিক মনে নেই। আমাদের মধ্যে কিছু কমন বন্ধু ছিল।
বন্ধুরা বলেছে আপনার সঙ্গে সোমার মেলামেশা একটু গভীর ছিল।
সে কাঁধ ঝাঁকায়।
হু, কেয়ারস্ !
প্রবাল এবার শীতল আর গভীর গলায় বলে
আমরা কেয়ার করি ! স্পষ্ট কথায় উত্তর দাও।
অর্পণ আবার মুখ তুলে তাকায়। গলার ভিতর কেমন এক অসন্তোষের শব্দ করে বলে
বাসতাম ।
সোমা আপনাকে ভালো বাসত ?
অর্পণ ঘাড় নাড়ে।
জানি না।
জানতে না ?
অর্পণ আবার মাথা নাড়ে।
না।
কিন্তু তোমাকে পাঠানো সোমার SMS অন্য কথা বলছে।
অর্পণ চুপ করে থাকে।
প্রবাল আবার বলে
হাওড়ার বেশ কিছু কুখ্যাত ছেলেদের সঙ্গে তোমার মেলামেশা আছে। তাদের মধ্যে অনেকের তো পুলিশের খাতায় নাম আছে ।
আমার অনেক বন্ধু। তাদের মধ্যে ভালো খারাপ সকলেই আছে। আই ডোন্ট কেয়ার।
আর কোন কোন ছেলেদের সঙ্গে সোমা বেশী মেলামেশা করত ? খবর আছে তার অনেক ছেলে বন্ধু ছিল। তাদের মধ্যে কতজনকে তুমি চেনও?
অর্পণ আবার রুক্ষ-ভাবে বলে
এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না।
প্রবাল তার দিকে কঠিন চোখে তাকায় ।
ঠিক আছে তুমি এখন আসতে পারো ।

সে চলে গেলে প্রবাল একটা সিগারেট ধরায়। সিগারেট টানতে টানতে সে অর্কর জন্য অপেক্ষা করছিল। অর্ক আর একজন অফিসার পাশের দুটো ঘরে সোমার আরও কয়েকজন পরিচিত অমলা, নির্ঝর, পূবালী, কাঞ্চন, বিধান আর মিজানুরকে জেরা করছিল।
প্রবাল ভাবছিল, একাধিক পুরুষের সঙ্গে সোমার সম্পর্ক ছিল। প্রেম ছিল কি ? সে কি কাউকে ভালবাসত? তার হত্যার পিছনে কি এই সব সম্পর্কের জটিলতা না অন্য কিছু ? প্রতি হিংসা না ব্যর্থ প্রেম ?
এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বার করতে হবে। তা ছাড়া যে ভাবে এক জটিল পদ্ধতিতে তাকে হত্যা করা হল, সে কাজ তো যে সে লোকের কর্ম নয় !
সোমার ল্যাপটপের হার্ড-ডিক্সটা ভালো ছিল। সেটা অন্য ল্যাপটপে লাগিয়ে প্রবাল চেক করেছে। খুব একটা কাজে লাগার মতো কিছু পায়নি। কিছু সিনেমা, গান , ই-বুক, পড়াশুনার নোট ইত্যাদির বাইরে কিছু নেই। প্রবাল তার ফেসবুক প্রোফাইল হ্যাক করিয়ে চেক করে দেখেছে। ফেসবুকে সে খুব একটা অ্যাকটিভ ছিল না।
সোমার ভাই বলেছে সোমা কয়েক মাস থেকে বাড়ির টাকা নিত না বরং বাড়িতে ভালো টাকা পাঠাত। ভাইকে সে বলেছিল সে পার্টটাইম একটা কাজ করে। কিন্তু সোমা কয়েকটি টিউশানি করত। এখানেই একটা খটকা। টিউশানি করে তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এত টাকা কোথা থেকে এসেছে। তদন্ত করে দেখা গেছে ক্যাশ টাকা সে নিজে ব্যাঙ্কে জমা করেছে। মাসের বিভিন্ন সময়ে সেই টাকা জমা হয়েছে। সে অন্য কোনও কাজ করত কিনা সে বিষয়ে এখনো কিছু জানা যায়নি।
প্রায় ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করার পরে অর্ক আর একজন অফিসার সুপ্রকাশ এসে অর্কর চেম্বারে ঢোকে। ততক্ষণে গোটা চারেক সিগারেট শেষ করেছে প্রবাল। তাদের দিকে ফিরে প্রবাল বলল
জেরা করে পজিটিভ কিছু পেলি ?
অর্ক মাথা নাড়তে নাড়তে একটা সিগারেট ধরায়
সোমা হয়ত অনেককে নিয়েই খেলছিল। সত্যিকারের ভালোবাসা হয়ত ছিলনা। নির্ঝর আর বিধানের সঙ্গে সোমা বিশ্বাসের সম্পর্ক যেন একটু বেশী অন্তরঙ্গ ছিল।
কার কার কালো রঙের বাইক আছে ?
দু জনেরই আছে ।
ঘটনার দিন সন্ধ্যাবেলা কে কোথায় ছিল ? অ্যালিবাই আছে ?
না, স্ট্রং আ্যালিবাই কিছু নেই। ভাসা ভাসা উত্তর দিয়েছে সাবই।
সবার মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ওদের জবানবন্দীর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
সুপ্রকাশ মাথা নাড়ল। সে অলরেডি প্রসেস শুরু করে দিয়েছে। সে বলল
গলির মুখে মেন রাস্তার উল্টোদিকে একটা সি.সি. ক্যামেরা দেখেছিলাম। ট্রাফিক কন্ট্রোল-রুমে গিয়ে একবার ওদিনের ফুটেজ চেক করব ভাবছি।
প্রবাল তার ভাবনার তারিফ করল। জিভের ডগায় চুক চুক শব্দ করে বলল
ঈশ, কি কাণ্ড। এটা আগে দেখা উচিত ছিল। একে বারেই ভুলে মেরে দিয়েছিলাম।
অর্ক ট্রাফিক কন্ট্রোল-রুমের কাকে যেন ফোন করে ব্যাপারটা বলল। তার পরে সুপ্রকাশকে বলল
তুমি তা হলে দুপুরে লাঞ্চ করেই চলে যাও। আমি বলে দিলাম দাশগুপ্তকে । আর হ্যাঁ, ইনফর্মারদের কাজে নামিয়ে দাও, কতগুলো এই ধরনের হ্যান্ড গ্রেনেড স্মাগলিং করা হয়েছে, কে কে কিনেছে সব খবর চাই।
প্রবাল বলল
সোমা বিশ্বাসের রোজগার পাতি বিষয়ে কিছু জানা গেল?
অর্ক যেন অবাক হয়, বলল
মানে ?
সোমা বিশ্বাসের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট চেক করছিলাম, দেখলাম প্রতি মাসে মোটা টাকা সে ইনকাম করত। কিন্তু কি ভাবে ?
ওহ ! অমলা বলেছে সোমা কোনও একটা কাজ করছিল কয়েক মাস ধরে। কি ধরনের কাজ সে জানে না।
প্রবাল চিন্তামগ্ন ভাবে কি যেন বলে, অর্ক তা শুনতে পায় না। তারপর সুপ্রকাশের দিকে ফিরে বলে
আমাকে সোমা বিশ্বাস আর তার সব বন্ধুদের গত এক মাসের ফোন কলের রেকর্ড পাঠিও আজ রাতে। ভালো করে খুঁটিয়ে দেখব। যদি কিছু পাওয়া যায় ! আর হ্যাঁ, প্যাকিং বক্সের ছেঁড়া খোঁড়া টুকরোগুলো আমার কাছে নিয়ে এসো।
সুপ্রকাশ উঠে যেতে অর্ক বলল
কি বুঝছিস ? মোটিভ কি ? প্রেম ? ব্যর্থ প্রেম ?
প্রবাল সায় দেয়
তাই মনে হচ্ছে। প্রেমে পাগল কে ছিল আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে ।
সুপ্রকাশ একটা পলিথিনের প্যাকেটে ছেঁড়া পোড়া প্যাকিং বক্সের টুকরোগুলো নিয়ে এলে প্রবাল সে গুলো খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। দেখছিল আর ভাবছিল। মনে মনে সে একটা সম্পূর্ণ প্যাকিং বাক্স কল্পনা করে। এমন বাক্স কি সে কোথাও দেখেছে ? সে ঠিক মনে করতে পারছে না।
অর্ক ফোনে কথা বলতে বলতে বাইরে গিয়েছিল। ফিরে এসে বলল
পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এসেছে। একটা টুইস্ট আছে এখানেও। সোমা বিশ্বাস আট সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট ছিল।
প্রবাল তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

রাত প্রায় নটার দিকে অর্ক আবার প্রবালের বাড়িতে আসে। তনুকা ভালো রান্না করেছিল। ডিনারের পরে তাদের আড্ডা বসে। অর্ক বলে
আজ রাতে কয়েকটা জায়গায় রেড করা হবে। কয়েকজন আর্মস স্মাগলারকে তোলা হবে। দেখি ওদের কাছ থেকে কিছু পাই কিনা।
প্রবাল মন দিয়ে সোমা বিশ্বাসের ফোন কলের হিস্ট্রিটা দেখছিল। সে এতটাই ভাবনায় ডুবে ছিল যে অর্কর কথা তার কানেই যায় না।
তনুকা বলল
কে এই ধরনের বোমা কিনেছিল সেটা যদি ট্রেস করতে পারো তা হলেই তো কেস শলভ হয়ে যাবে।
অর্ক যেন বিমর্ষ ভাবে ঘাড় নাড়ে
অতটা সহজ নয় মাই ডিয়ার সিস্টার। এই ধরনের ব্যবসা এমনি চেন ওয়াইজ চলে যে সেই চেনের কোনটা শুরু আর কোনটা শেষ সেটা খুঁজে পাওয়া খুব শক্ত।
প্রবাল ফোন কলের লিস্টটা রেখে একটা সিগারেট ধরায়। এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলে
যদি খুঁজেও পাওয়া যায় তা হলেও প্রমাণ করা যাবে না যে ওই বোমাটা দিয়েই সোমাকে মারা হয়েছে। দুঁদে উকিল আরামে অপরাধী কে খালাস করিয়ে দেবে।
অর্ক বলল
তবে তুই কি ভাবছিস?
প্রবাল বলল
আমরা যদি অপরাধীকে চিনতেও পারি তবে তার অপরাধ প্রমাণ করব কি ভাবে? পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ কিছু নেই। অপরাধীর হাতের ছাপ পায়ের ছাপ, রক্তের ছাপ, ইত্যাদি কিছুই এখানে খাটবে না।
অর্ক গুম হয়ে বসে থাকে।
প্রবাল আবার বলল
তই এক কাজ কর, সোমার বন্ধু বান্ধব সবার বাড়ি, হোস্টেল এক বার খানাতল্লাশি করা। দ্যাখ কিছু ক্লু পাওয়া যায় কি না।
অর্ক মাথা নাড়ল।





“এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে”



শীতের দিনে রাত্রি দশটাকেও গভীর রাত্রি মনে হয়। গত কয়েকদিন থেকে ঠাণ্ডা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। উত্তরে হাওয়া যেন জ্যাকেট ভেদ করে চামড়ার উপর কেটে কেটে বসে যাচ্ছে। ক্ষিদিরপুর এলাকার একটা শান্ত কানা গলি । গলির মুখে আলোটা বেশ ঝাপসা । তার উপরে কুয়াশা নামছে।
ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে একটি লোক পুরানো বাড়ির ভাঙা দরজার সামনে দাঁড়ায়। তার পরনে কালো কোট। মাথায় হনুমান টুপির মতো একটা টুপি। তার চোখ দুটি শুধু খোলা। পিঠে একটা কালো ব্যাক-প্যাক।তাকে দাঁড়াতে দেখে অন্ধকার ফুঁড়ে আর একটি লোক উদয় হয়।
প্রথম লোকটি ফিস ফিস করে বলে
বিল্লু সেখ ?
দ্বিতীয় লোকটি অন্ধকারে মাথা নাড়ে
হ্যাঁ। এনেছেন ?
প্রথম জনও মাথা নাড়ে। তার পরে পিঠের ব্যাগটা খুলে ব্যাগ থেকে একটা পার্সেল বক্সের মতো বাক্স বার করে। সেই বাক্সটা বিল্লু সেখ এর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে
তুমি কিন্তু ঠিক করলে না।
বিল্লু সেখ বলে
তুমিও মেয়েটাকে মেরে ঠিক করনি। তুমি তার সঙ্গে বিট্রে করলে ।
প্রথম লোক হিস হিস করে বলে
মেরেছি বেশ করেছি। তুই ও মরবি।
বিল্লু সেখ হি হি করে হাসে।
প্রথম লোকটি খেয়াল করেনি অন্ধকারের আড়ালে আরও কয়েকজন জড়ো হয়েছে তাদের চারপাশে।
প্রথম লোকটি কিছু বলার আগেই অন্ধকারের ভিতর থেকে প্রবাল বলে
নির্মলবাবু আপনার খেলা আপাতত এখানেই শেষ।
চারপাশ থেকে চার পাঁচটা টর্চ জ্বলে ওঠে।
নির্মলবাবু কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন অফিসার তার হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিয়েছে।



“মৃত্যু তোমাদের ফেলে দিয়েছে/অন্ধকারের অচল অভ্যাসের ভিতর”।




সোমা খারাপ মেয়ে ছিল না। কিন্তু তার ছিল অভাব আর বিশাল উচ্চাশা। ধনী বন্ধদের কাছ থেকে উপহার অর্থ সাহায্য নিতে সঙ্কুচিত হবার বিলাসিতা তার ছিল না। কারণ তাকে পেয়িং গেস্ট থাকার ভাড়া গুনতে হত। পড়ার খরচ ছিল। প্রথমে সে টিউশানি করে এই সব খরচ-পত্রের যোগাড় করত। তার পরে সে আস্তে আস্তে অন্য রাস্তায় নামে। বিভিন্ন বড়লোক ছেলেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতে থাকে।
তার অভাবের খবরটা টের পেয়েছিলেন নির্মলবাবু। নির্মলবাবু সাদা ব্যবসার পাশে পাশে কালো ব্যবসাও শুরু করেছিলেন। বেআইনি জিনিসের স্মাগলিং শুরু করেছিলেন।

নির্মল আর মালবিকার সম্পর্ক ছিল অনেকটা বিবাহিত জীবনের অভিনয়ের মতো। ক্রমাগত শীতলতার ভিতর দিয়ে বিবাহিত জীবনের অভ্যাসে তারা পটু আর অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছিল। তাদের জীবনে প্রেম ছিলনা কিন্তু একটা যেন কাল্পনিক আর মেকি যৌনতার খেলা খেলতে খেলতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। গভীর রাত্রি পর্যন্ত টিভির ভলিউম মিউট করে দিয়ে তারা মদ্যপান করত। তারপরে কিছুক্ষণ এক মেকি যৌনতার অভ্যাসে তারা নগ্ন দেহে পরস্পর পরস্পরকে জড়িয়ে শুয়ে থাকত।
সোমা ভাড়া আসার পরেও কয়েক মাস নির্মল আর মালবিকা এমনি কেরেই জীবন কাটিয়েছে। তারপরে একদিন আলগোছে মালবিকা সোমার ঘরে গিয়ে পড়ে। সোমা তখন সবে স্নান সেরে বেরিয়েছে। শুধুমাত্র একটি টাওয়েল তার বুক থেকে হাঁটু পর্যন্ত জড়ানো। সোমা লজ্জা পেয়ে যায়, কিন্তু মালবিকা যেন মুগ্ধ হতবাক হয়ে যায়। কি আশ্চর্য দেহ বল্লরী। মালবিকা বলেছিল
লজ্জা কিসের বোন। আমি তো তোমার দিদির বয়সী।
ঠিক এই ভাবেই মালবিকা কথা শুরু করেছিল।
সোমার কিন্তু লজ্জা কাটেনি। সে তরি-ঘড়ি একটা নাইটি নিয়ে আবার বাথরুমে ঢুকে পড়ে। কিন্তু হয়ত তাড়া তাড়িতে সে বাথরুমের দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে না।
মালবিকা সেই দরজার ফাঁক দিয়ে নগ্ন সোমাকে দ্যাখে।
সোমা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলে মালবিকা দু চারটে মামুলি কথা বলে নীচে নেমে আসে।
নিচে ফিরে এসে মালবিকা নিজেকে আয়নায় নগ্ন দ্যাখে। মনে হয় কি কুৎসিত আর বীভৎস তার চেহারা। আনত শিথিল স্তন, স্ফীত মধ্যদেশ। কপালের উপর থেকে চুল উঠে গিয়ে সিঁথিটা ফাঁকা। সেখানে হালকা সিঁদুরের ছোঁয়া। মালবিকার হাসি পায়। ভালবাসা-হীন এক অলীক হিম বিবাহের স্মৃতি নিয়ে তার সিঁথির সামনেটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল।
সন্ধ্যাবেলা মদ্যপান করতে করতে মালবিকা সকালে দেখা সোমার গল্প বলে নির্মলকে।
বলতে বলতে মনে মনে সে হাসে। নির্মলের লোভী চোখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তার যেন আমোদ হয়। সে যেন এক নেকড়ের কাছে নধর ঘাই হরিণীর গল্প শোনায়।
বহুদিন পরে মালবিকা নিজের ভিতর এক উত্তাপ টের পায়। এই উত্তাপ যেন এতকাল এক হিমবাহের নীচে চাপা পড়ে গিয়েছিল।
কয়েকদিন পরে মালবিকার জন্মদিন পালিত হয়েছিল। সেখানে নিমন্ত্রিত বলতে কেবল সোমা।
নির্মল বলেছিল
তোমার যদি কোনও কাজের দরকার হয় আমাকে বোলো। আমার ব্যবসায় তোমাকে ঢুকিয়ে নেবো।
এমন অযাচিত একটা সুখবরে সোমা খুশী হবে কি হবে না তাই নিয়ে দোটানায় ছিল। সে কোনও উত্তর দিতে পারছিল না।
মালবিকা বলেছিল
লজ্জা কিসের বোন ! আমরা তো তোমার দাদা বৌদির মতো।
সে যখন সোমাকে এই কথা বলছিল তখন সে নির্মলের দিকে তাকিয়েছিল। নির্মলের চোখের দিকে। নির্মলের চোখে কি ছিল? লালসা?
মালবিকা সেটা দেখে যেন নিজের মধ্যে একটা উষ্ণতা টের পাচ্ছিল।
কয়েকদিন পরে নির্মলের ব্যবসায় সোমা কাজ শুরু করে।
ছোট ছোট একটা দুটো পার্সেল সোমা ক্লায়েন্টদের কাছে পৌঁছে দিতে থাকে। সে পার্সেলে কি থাকত সোমা জানত না।
১৭ই আগস্ট এক ধুম বৃষ্টির দিনে নির্মল সোমার শরীরের আমেরিকা আবিষ্কার করে। ভরা বর্ষার পুরন্ত নদীতে দুটি নৌকা যেন পাল তুলে দিয়ে ভেসে পড়ে। এমনটা যেন হবার ছিল। সোমা ভেবেছিল। নির্মল ভেবেছিল এমনটা বিশ বছর আগে হতে পারত। আপাত সাদাসিধে নির্মলকে খারাপ লাগত না সোমার।
মালবিকারও খারাপ লাগেনি। দরজার ফাঁক দিয়ে সে দেখেছিল। দুটি পালতোলা নৌকা দূরে নয়, বরং ভেসে ভসে তার কাছে চলে এসে গিয়েছে।
রাত্রে নির্মলের সঙ্গে জমিয়ে নেশা করেছিল মালবিকা। নেশার পরে সেই যৌনতার অলীক খেলা। মালবিকা যেন টের পাচ্ছিল তাদের খেলার ভিতর এক মগ্ন উষ্ণতা ফিরে এসেছে।
সোমা আর নির্মলের ভিতর আস্তে আস্তে ছায়া হয়ে যেন মালবিকা ঢুকে পড়েছিল। সেটা আর কেউই টের পায়নি। নির্মলের শরীরের ভিতর সেই ছায়া অশরীরী হয়ে ঢুকে পড়েছিল। নির্মল টের পায়নি। সোমা যেন টের পেয়েছিল। তার মনের ভিতর এক শয়তান হেসেছিল। শয়তানিটা করতে সোমা যেন আমোদ পেয়েছিল। যেমনটা চাইছিল তেমন করে সোমা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গিয়েছিল। তারপরে সে খুব হেসেছিল।
মালবিকা এমনটা আশা করেনি কখনো। সোমা তাকে এক চালে মাত করে দিয়েছিল।
অন্ধ পাগল হয়ে গিয়েছিল মালবিকা।
নির্মল সোমাকে অনেক বুঝিয়েছিল। সোমা অ্যাবরশন করাতে রাজি ছিল না। সে খেলায় হেরে যেতে পারে না। মালবিকার কাছে সে হেরে যেতে রাজি নয়। সে নির্মলকে ভয় দেখায়।
নির্মল সোমার একাধিক সম্পর্কের কথা জানত। ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যাবার ভয় পেয়েছিল সে।
একদিন রাত্রে নেশার পরে মালবিকা বিচারকের মতো সোমার ডেথ সেনটেন্স ঘোষণা করে।
জেরায় নির্মল বলেছিল সমস্ত পরিকল্পনা আসলে মালবিকার। নির্মল শুধু তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। নাটকের নাট্যকার, নির্দেশক ছিল মালবিকা। নির্মল সে নাটকে দারুণ অভিনয় করেছিল।
অর্ডার সাপ্লায়ার নির্মলের পক্ষে বোমা জোগাড় করা খুব একটা শক্ত ছিল না।
পার্সেলটা সোমার হাতে দিয়েছিল মালবিকা। বলেছিল দিদি হিসাবে বোনকে উপহার।
মালবিকা তাকে মৃত্যু উপহার দিয়েছিল।




“শূন্য মনে হয়,/শূন্য মনে হয়” !


অর্ক বলল
তুই কখন নির্মলবাবুকে সন্দেহ করলি?
প্যাকিং বক্সের ছেঁড়া টুকরো গুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে বাক্সটা কেমন দেখতে কল্পনা করছিলাম। চোখের সামনে আরও কয়েকটা বাক্সের কথা মনে পড়ল। এমনি কয়েকটা খালি বাক্স সোমার আলমারিতে দেখে ছিলাম। আবার ঠিক একই রকম বাক্স নির্মলবাবুর ঘরেও ছিল। ছেঁড়া বাক্সে যেমন স্টাইলে “M” লেখা ছিল ঠিক তেমন স্টাইলে বাকি বাক্সগুলোতেও ছিল।
প্রবাল সিগারেট ধরিয়ে আবার শুরু করল
নির্মলবাবু বলে ছিলেন তাঁর সঙ্গে সোমার যোগাযোগ তেমন ছিল না। অথচ তাদের মধ্যে ফোনে প্রয়ই কথা হত। নির্মলবাবু মিথ্যা কেন বলেছিল ? সি.সি. ক্যামেরায় ওই গলির মুখে কোনও কালো মোটর সাইকেল ঢোকেনি বা বেরিয়ে যায়নি। নির্মলবাবু ভালোই গল্প সাজিয়ে ছিলেন কিন্তু এই সব ফাঁক গুলি থেকে গিয়েছিল। ভাবলাম নির্মলবাবুকে ধরলেও অপরাধ প্রমাণ করব কি ভাবে? তখনি বিল্লু সেখ কে ব্ল্যাক-মেলার সাজিয়ে ফাঁদটা পাতার কথা মাথায় আসে। হাতে হাতে না ধরতে পারলে নির্মলবাবুর অপরাধ প্রমাণ করা শক্ত হত।
অর্ক ঘাড় নাড়ল। বলল
মালবিকা যে এ সবের পিছনে আছে সেটা ভেবেছিলি?
প্রবাল মৃদু হাসে
না। সেটা ভাবিনি।
অর্ক বলল
জেরায় বার বার নির্মলবাবুকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে ‘আপনি সোমা বিশ্বাসকে খুন করলেন কেন’ ? কিন্তু নির্মলবাবু স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। বার বার তিনি একই কথা বলে গেছেন ‘আমি জানি না’।
কথাটা প্রবালের দিকে ভাসিয়ে দিয়ে সে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
প্রবাল কিছুক্ষণ ভাবে, তারপরে সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলে
নির্মলবাবুকে ধরা পড়ার পরে যখন গাড়িতে তোলা হয় তখন তার দু-চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা দেখেছিলাম। এক নিদারুণ ক্লান্তি। কিন্তু সে কিসের ক্লান্তি ? মালবিকার সঙ্গে তার বোধহীন বিবাহিত জীবনের ক্লান্তি! সে বোধহয় সোমার সঙ্গে এক নৌকায় ভেসে পড়ে সেই ক্লান্তি থেকে মুক্তি খুঁজেছিল। কিন্তু তা হয়নি বাস্তবে। নির্মলের সমস্ত সত্তার ভিতর ছায়ার মতো ঢুকেছিল মালবিকা। অশরীরীর মতো মালবিকা তার শরীরে ঢুকে পড়ে এক অন্তহীন শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল। অথচ নির্মল বোকার মতো সেই শূন্যের ভিতরে ভালোবাসা খুঁজেছিল। কিন্তু কোথায় সেই ভালোবাসা? সোমার সে ভালোবাসা ছিল না। সে চাইছিল টাকা। আর মালবিকা ! তার ছিল পরাজয়ের গ্লানি। নির্মলকে সে সন্তান দিতে পারেনি অথচ সোমা পেরেছিল বলে তার মনে হয়েছিল।
অর্ক বলল
মালবিকাই নির্মলকে সোমার দিকে এগিয়ে দিয়েছিল !
হ্যাঁ। সে বোধহয় তাদের হিম শীতল জীবনকে ভয়ঙ্কর ভাবে আবেগ দিতে চেয়েছিল। অথবা সোমার শরীরের ভিতর নিজের অসুন্দর শরীরকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। এবং খুনের পরিকল্পনা মালবিকা সচেতন ভাবেই করেছিল। ধরা পড়ার পরে তাই সে দারুণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
প্রবাল থামল।


আপনার মতামত জানান