ঘুম নেই

রিপন হালদার
-“আজকাল আমি একটা সমস্যায় পড়েছি। শুনবেন? অবশ্য একে আপনি একটা মজার সিনেমা হিসেবেও নিতে পারেন!“
অনেকক্ষণ কথাবার্তার পর মাল্টিপ্লেক্সের আরামদায়ক সিটে হেলান দিয়ে আমার পাশের সিটে বসা দর্শকটির উদ্দেশ্যে বললাম।

-“অসুবিধা নেই। আমাদের শো-টা কখন শুরু হবে বোঝা যাচ্ছে না। তাহলে আপনার গল্পটাই শুনি! প্লিজ ক্যারি অন!”

-“ঠিকই বলেছেন। শো কখন শুরু হবে কেউ জানে না। ডিজিটাল প্রোজেকসনের এই এক অসুবিধা। লিঙ্ক চলে গেলে গেল। শুধু শুধু সময় নষ্ট। তবে শুনলাম আরো মিনিট তিরিশের মধ্যে লিঙ্ক না এলে টিকিটের মূল্য রিটার্ন করে দেবে। যাইহোক, এই অবসরে আমি বরং আমার গল্পটাই শুরু করে দেই!”

-“একদম!”

-“আসলে মানুষ তো অনেক কিছুর বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করে, তাই না! কী অদ্ভুত দেখুন, আমি করছি ঘুমের সাথে যুদ্ধ।“

-“সেটা কীরকম?”

-“আমার জীবন দুটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্ব- রাতে আট থেকে দশ ঘন্টার ঘুম। সকাল সকাল উঠে পৌরসভার পাম্প মেশিন চালু করা, তারপর আবার ঘুম।“

-“কোথায় ঘুমান?”

-“মেশিন রুমেই। চেয়ার থাকে একটা। ওখানে বসে বসেই নাক ডাকতে শুরু করে দেই।“ হাসতে হাসতে বললাম।

-“পারেন কীভাবে? মানে, ঐরকম শব্দের মধ্যে?”

-“অভ্যাস, অভ্যাস।“ একটু থেমে মৃদু হেসে বলি-“বলতে পারেন এটাও এক ধরনের সাধনা। চুড়ান্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের লক্ষ্য স্থির রাখার সাধনা। কজন পারে বলুন তো!”

-“ঠিকই বলেছেন। অনেকেই পারবে না।“ দর্শকের মুখে হাসি।

-“তাহলেই বুঝুন!... তা যা বলছিলাম- আমার যখন এই ঘুম পর্ব চলে পৃথিবীর কোন কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। এর জন্য চাকরিটা না চলে যায়...”

-“সে একটা সমস্যাই বটে! ভোর ছটার জল সাতটায় এলে পাবলিক তো ক্ষেপে যাবেই!”

-“কী করি বলুন তো! কিছুতেই বেয়াড়া ঘুমকে বাগে আনতে পারছি না। অনেক কষ্টে পার্টির পিছনে ঘুরে ঘুরে এই চাকরিটা যোগাড় করেছি। এটা গেলে কী করব বুঝতে পারছি না।“

-“ঘরে আর কে কে আছে আপনার?”

-“বয়স্ক মা বাবা, আর আমি।“

-“তা আপনি তো মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়েও রাখতে পারেন!”

-“করেছি... সব চেষ্টাই। এমন কি বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মত পায়ে দড়ি বেঁধেও রেখেছিলাম একদিন। কোন ফল পাই নি।“

-“সত্যি অদ্ভুত!”

-“ডাক্তার দেখিয়েছিলেন?”

-“হ্যাঁ। তাও দেখিয়েছিলাম। ডাক্তার বললেন-‘সাধারনত লোকে আপনার উলটো সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে আসে’। কথাটা বলে ডাক্তার আমার দিকে এমন বিদ্রূপের দৃষ্টিতে তাকালেন যে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হলাম”।

-“স্বাভাবিক। উলটো জিনিস মানুষ সহজে নিতে পারবে কেন!” দর্শকের গলায় সহানুভূতির সুর।

-“এর থেকে আমার হয়ত আর মুক্তি নেই, জানেন! সারা জীবন বুর্জোয়াদের মত ঘুমিয়েই কাটাতে হবে আমাকে”।

-“বাহ্‌! ‘বুর্জোয়া’ শব্দটা দারুন ইউজ করলেন তো!”

-“এটা আমার শব্দ না, আমার বাবার। আমাকে ঘুমোতে দেখলেই বলে- ‘বুর্জোয়াদের’ মত সারাদিন ঘুমোতে লজ্জা করে না তোর?’ বাবার চিৎকারে অবশ্য মাঝে মাঝে দুর্ঘটনাটা ঘটেই যায়। আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি।
ঘুমের বোঝা মাথায় নিয়ে তখন টলতে টলতে আমি বাথরুমে ঢুকি স্নান করতে। কিন্তু আমাদের ওয়ার্ডে তো কেউ মেশিন অন রেখে দেবে না! সবাই আমার মতও না যে ঘুমের জন্য মেশিন অফ করতে দেরি হবে! তাই বাধ্য হয়েই আমাকে চৌবাচ্চার শ্যাওলা পড়া জলে চান সারতে হয়। কোন কোন দিন আবার শুধু মাথা ধুয়েই কাজ সারি”। একটু সামলে আরো জানাই-“এই ঘুমের জন্য জানেন, বৌটাও চলে গেল!”

-“সেকি, আপনার স্ত্রীও আছে নাকি! আগে বলেন নি তো?”

-“আছে, মানে ঐ না থাকারই মত। তাই আর ক্যারেক্টার বাড়াই নি। বছর খানেক আগে তিনি বাপের বাড়ি চলে গেছেন। কবে ফিরবেন জানি না। আর কোনদিন ফিরবেন কিনা তাও বলতে পারছি না। বলে নাকি- ঘুমরোগীর সঙ্গে সংসার করা যায় না। আমার নাক ডাকাটাও হয়ত ওর সমস্যা ছিল। শুধু কি ঘুম আর নাক ডাকা! তাও মনেহয় ঠিক না। আসলে সারারাত আমার শরীরটাও তো আমার সঙ্গে ঘুমিয়ে কাটায়। এটা একটা পূর্ণবয়স্ক যুবতীর সহ্য হবে কেন!”

-“তা ঠিক” দর্শক সম্মতি জানায়।
কয়েক মুহূর্ত বিরতি নিয়ে আবার শুরু করি –“এই রোগের কারনে জানেন, ছাত্র জীবনে পড়াশুনাটাও ঠিকভাবে করতে পারি নি! রাত আটটা বাজলেই কে যেন প্রচণ্ড শক্তিতে আমার চোখের পাতাদুটি টেনে টেনে বুজিয়ে দিতে থাকত। কী এক তীব্র আঠা কে যেন আমার চোখে লেপে দিত। শুধু খোলা বইয়ের পৃষ্ঠাগুলি মেলে থাকত আলোর নীচে।“

-“আপনার বাবা কী করেন?”

-“আগে হারা পার্টির হোলটাইমার ছিল। ওতে তো আর পেট চলেনা, তাই পার্টি থেকে কাজ দিয়েছিল। স্পিনিং মিলে”।

-“তারপর?”

-“আন্দোলনের চাপে একসময় মিল গেল বন্ধ হয়ে। এক রাতে কোথা থেকে মিটিং সেরে এসে গম্ভীরভাবে বাবা বলল- ‘মিলটা বন্ধ হয়ে গেল রে!’ শুনে মা উঠে অন্য ঘরে চলে গিয়েছিল। বাবার তখন পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স। আমি মাধ্যমিক দেব।“

-“অন্য আর কোন কাজ পেয়েছিলেন?”

-“হ্যাঁ। চেষ্টা করেছিল। পার্টির অবস্থা তখন নিভু নিভু। সিঙুর নন্দীগ্রাম হয়ে গেল কয়েক মাস আগে। রাজ্যের শাসনভার তখন শাসক না বিরোধীদের হাতে বোঝা যাচ্ছিল না। নৌকা ওল্টায় ওল্টায় আর কি! এই টালমাটাল সময়ে পার্টি আর কী করতে পারে!”

-“হ্যাঁ। আমরা তো দেখেছি এই অবস্থা। তারপর?”

-“তারপর... একদিন বাবাকে দেখলাম- ব্যাগের মধ্যে কী যেন ঢোকাচ্ছে। কাছে গিয়ে দেখলাম, নীল-কালো রঙের ইউনিফর্মের মত জামা-প্যান্টের সেট। বুঝলাম, আমার পঞ্চাশ বছরের রোগা, হারা পার্টির একদা হোলটাইমার বাবা সিকিউরিটি জবে ঢুকছে! বলল-‘কাল থেকে আমেরিকার ব্যাঙ্ক পাহারা দিতে যাচ্ছি রে, খোকন!’ আমি কিছুটা বুঝতে পারছিলাম বাবার কষ্টটা। কিন্তু ঐ বয়সে আমি আর কী-ই বা করতে পারতাম, বলুন! তখন ঐ চার হাজার টাকার মাইনেটুকুই আমাদের সম্বল।“

-“সত্যি প্যাথেটিক!”

-“এরপর আমি কোন মতে কলেজে ঊঠলাম। ফার্স্ট ইয়ারের পাস কোর্সের ক্লাস-রুমটা ছোট খাটো একটা রেল স্টেশনের মত লাগল। একজন জানাল- আমাদের ক্লাসের স্টুডেন্ট সংখ্যা নাকি পাঁচশোর উপর! ভাবুন তো একবার! ভাল লাগল না। কলেজ দিলাম বন্ধ করে। বাবা কিছু বলল না। কিন্তু মনে মনে কষ্ট পেয়েছে। বুঝলাম। একমাত্র ছেলে গ্রাজুয়েট হতে পারল না! কিন্তু একদিকে বাবার ক্ষয়াটে চেহারা আর অন্যদিকে কলেজের রঙিন বিলাসিতা। মেনে নিতে পারছিলাম না।“

-“ভালোই করেছেন! তারপর কী করলেন?”

-“ইতিমধ্যে রাজ্যে শাসক বদল হয়েছে। জেতা পার্টি ক্ষমতায়। ভোটের রেজাল্টের দিন বাবার সেকি কান্না! কেউ থামাতে পারে না। শিশুর মত সারাটা দিন কেঁদে গুম খেয়ে রইল কয়েকদিন। যাইহোক, জানেন তো তখন হারা পার্টির কী কোনঠাসা অবস্থা! সময় অসময় বাইক বাহিনীর দাপট। আসলে আমাদের পাড়ার বেশিরভাগ মানুষ হারা পার্টির সমর্থক। বিনা কারণে বাড়ি-ঘরের উপর হামলা, জানলার কাঁচ ভাঙ্গা, ভোটের আগে হুমকি, ভোট দিতে গেলে বাধা, আবার হুমকি... আরো কত কী! ভোটের দিন আমরা গলির বাইরে পর্যন্ত বেরোতে পারিনা। গলির মুখে মুখে সদ্য রাজনীতি শেখা ছেলেরা।“

-“কেন্দ্রীয় বাহিনী আসে নি?”

-“কী যে বলেন! তারা বলে, ভোট দিতে চলুন সবাই! আমরা আছি। যখন বলা হলো ভোটের পরও থাকবেন তো? চুপ করে যায়। ঐ ভোটের দিনই ঘটল একটা বাজে ব্যাপার। বাবার গায়ে হাত পড়ল। বেপাড়ার গোঁফ না ওঠা বাচ্চা ছেলেদের কাজ আর কি! বলে- এবার বদলা নেবার পালা। কার উপর বদলা! আমার নিরীহ বাবার উপর! কেউ যার উপর কোনদিন কোন বিষয়ে আঙুল তুলতে পারে নি! সারাজীবন পাড়ার লোকের জন্যই ভুলে থাকল সংসার...”

-“আমার মনেহয়, এটা কালেকটিভ অ্যাংগার” দর্শক বলল।

-“হতে পারে। হারা পার্টির অন্য নেতার কৃতকর্মের ফল বাবাকে ভোগ করতে হলো। যাইহোক, আগের সমস্ত হিসেব হয়ত এখন জেতা পার্টির সুদাসলে ফেরত দেবার পালা। এইভাবে পৌরসভা, লোকসভা মিলিয়ে দুই-তিনটি ভোট গেল। ঐ সময় পাড়ার বুথের বেশির ভাগ ভোটার ঘর বন্দী। কেন্দ্রীয় বাহিনী টহল দেয় অবশ্য মাঝে মাঝে। কিন্তু ভোট দেবার থেকে সম্মান আর জীবন তো বেশি ইম্পরট্যান্ট, তাই না!”

-“সে তো ঠিকই। তারপর কী হলো?”

-“এভাবে তো চলা যায় না। তাই পাড়ার আমার বয়সী ছেলেরা ঠিক করলাম- জেতা পার্টিতে যোগ দেব। গোপনে মিটিং করলাম। পাড়ার কিছু পরিবারকে বোঝালাম পরিস্থিতি। অবশেষে আমাদের পাড়ার ৪১টি পরিবার জেতা পার্টিতে নাম লেখাল। ব্যাপারটা থেকে আমি আড়াল থাকলাম।
একদিন ডিউটি থেকে ফিরে বাবা বলল-‘শুনেছিস?’ তা আমি আর কী বলব! আমি তো সবই জানি। তারপর থেকে বাবা মুষড়ে পড়তে লাগল। এলাকার মানুষজন বাবাকে আর আগের মত সম্মানও করে না। অথচ একসময় আমার বাবাই ছিল বিপদে আপদে তাদের একমাত্র ভরসা। এইসব কারনে আমার রোগা, হারা পার্টির বাবা ধীরে ধীরে আরো রোগা, আরো শীর্ণ হয়ে যেতে লাগল।
মা কত বোঝায়, ‘দিন পাল্টেছে, মেনে নাও সব!’ কে শোনে কার কথা! বাবার প্রিয় জায়গা ছিল পার্টি অফিসটা। জেতা পার্টি সেটাও বন্ধ করে দেওয়ায় বাবা আরো নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছিল।“

-“এই অবস্থায় আপনি কী করলেন?”

-“আমি গোপনে বাবাকে এড়িয়ে জেতা পার্টির অফিসে যাতায়াত শুরু করে দিলাম। আমাদের বলা হলো- ‘পার্টিকে তুমি কিছু দিলে পার্টিও তোমাকে দেবে।‘ ঠিকই। আমরা খবর পেয়েছিলাম পৌরসভার কিছু নিচু পোস্টে লোক নেওয়া হবে। এই সুযোগটা ছাড়তে চাইছিলাম না। কিন্তু সমস্যা বাবাকে নিয়ে। কতদিন আর আমি লুকিয়ে লুকিয়ে এসব করব! অথচ পারমানেন্ট কাজও একটা দরকার। যদিও মাকে বলেছিলাম সব। মা-ই ম্যানেজ করত।

প্রতিটি ভোর হত আর দেখতাম- সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরা নাইট ডিউটি-ফেরত আমার বাবা তার পুরনো ভাঙ্গা সাইকেলটা চালিয়ে বাড়ি ফিরছে। মুখ চোখে রাত জাগার চিহ্ণ। হাত মুখ ধুয়েই বাবা বসে যেত ‘জনশক্তি’ নিয়ে। লাল রঙে ছোপানো ব্রিগেডের ছবির দিকে তাকিয়ে বাবা বিড়বিড় করে আমার উদ্দেশ্যে বলত-‘দিন আসবে রে, আমাদের দিন আবার আসবে! তখন হয়ত আমি থাকব না। তুই থাকবি, তোরা থাকবি!’ বলে দুই হাতে মাথা চেপে ধরে বাবা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে থাকত পত্রিকাটা।“

-“ আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, আপনার বাবা কি চাইছেন অনন্তকাল ধরে আগের দলটা ক্ষমতায় থাকুক! গণতন্ত্র বলে তো একটা কথা আছে, না কি!” মৃদু অনুযোগ দর্শকের কন্ঠে।

-“আপনি ঠিকই বলেছেন। আসলে অনেক লড়াই সংগ্রামের পর বাবার দলটা ক্ষমতায় এসেছিল তো তাই হয়ত এই পতনটা মেনে নিতে পারছিল না। লোকের মুখে শুনেছিলাম ৭২ সালের কথা। পুলিশ নাকি বাবার গায়ে কড়াই ভরতি গরম মিষ্টির সিরা ঢেলে দিয়েছিল। বাবা অবশ্য এসব কথা আমাকে বলেনি। তবে হাতে আর বুকে পোড়া দাগ দেখে কিছু আন্দাজ করতে পারি। বাবা শুধু একটা কথা আমাকে বলেছিল, পুলিশের ভয়ে মাঘ মাসের কনকনে শীতে সারারাত ঝিলের জলে কচুরিপানার আড়ালে লুকিয়ে ছিল। তারপর ক্ষমতায় এসে কত নেতা আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়ে উঠল। আর আমার রোগা বাবা বোকাই থেকে গেল আজীবন! এইসব দৃশ্য আমি যত বেশি করে দেখি, তত বেড়ে যায় আমার ঘুম”।

-“হুম। সমস্যা তো গুরুতর! তা এই মানসিক অবস্থায় আপনি এসেছেন সিনেমা দেখতে?”
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর অল্প হেসে বললাম-“ এটাই তো সিনেমা দেখার উপযুক্ত সময়!” তারপর যোগ করলাম-“আমি আর কী-ই বা করতে পারি বলুন! শুধু জোড় করে বাবার গার্ডের চাকরিটা ছাড়াতে পেরেছি। আমার রোজগারেই এখন সংসার চলে”।

-“আপনার বাবা এখন সময় কাটান কীভাবে?”

-“তেমন কিছু করে না। সকালের দিকে বাড়ির চারপাশ আর রাস্তার আসেপাশের জঞ্জাল পরিষ্কার করে। আর...”

-“আর?”

-“ মন দিয়ে সারাদিন ‘জনশক্তি’ পড়ে। মনেহয় ঐ পত্রিকাটার একটা অক্ষরও বাবা বাদ দেয় না। মা বলে, রাতে বাবা নাকি একটুও ঘুমায় না। সারারাত কী যেন ভাবে। আর আমি তখন ঘুমে বিভোর।...

একদিন অফিসে গিয়ে শুনলাম- আমার নাকি ডিমোশন হয়েছে। অর্থাৎ পাম্প মেশিন থেকে আমাকে ড্রেনের সাফাই বিভাগে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাবুন তো একবার, এখানেও যদি গাফিলতি করি তবে কোথায় নামব! ড্রেনের নীচে তো আর কোন সেকসন নেই! এই ঘুম না তাড়াতে না পারলে বাবা মাকে নিয়ে আমায় না খেয়ে থাকতে হবে। এই বাজারে আমার সামান্য পড়াশুনার জোরে আমি আর কোন্‌ চাকরিটা পাবো বলতে পারেন?”

-“সত্যি, প্রবলেমের ব্যাপার। তা ড্রেনের কাজে আপনাকে কখন উঠতে হয়?”

-“সাড়ে পাঁচটায়। ছটায় ডিউটি শুরু। দুটোয় ছুটি। কিন্তু সাড়ে পাঁচটায় ওঠাই তো সমস্যা। মাঝে মাঝেই লেট হয়ে যাচ্ছে। সেদিন সুপারভাইজার ধমকালো- আর একদিন লেট হলেই নাকি চেয়ারম্যানকে জানাবে।“

-“কী বলি বলুন তো! আসলে মানুষ চেষ্টা করলে কিন্তু সব পারে।“

-“ঠিকই বলেছেন। তাই আমি মাঝে মাঝে আপ্রাণ চেষ্টা করি ভোরে জাগতে। দুই একদিন সাফল্যও আসে।“

-“বাহ্! এই তো!”

-“না না। এখানেই শেষ না। কাজে গিয়ে বসার সুযোগ পেলেই ঘুম এসে যাচ্ছে চোখে। সুপারভাইজার চিৎকার করতে থাকে। আর আমি তা অগ্রাহ্য করে নোংরা পচা ময়লার পাশে বসে মিনিট দশেক ঘুমিয়ে নেই। একদিন ঐভাবে ঘুমানোর সময় গায়ে ঝির ঝিরে বৃষ্টির ছাট অনুভব করলাম। চোখ খুলে দেখলাম অন্য ব্যাপার! সামনের ময়লার স্তূপে এক পা তুলে পেচ্ছাব করছে একটা কুকুর। অভিশাপ...অভিশাপ... অভিশপ্ত আমার জীবন!”

-“তারপর?”

-“গত বিধানসভা ভোটের ফলাফলের দিন। বিজয় মিছিলে জোর করে বন্ধুরা ধরে নিয়ে গেল। সারাটা এলাকা ঘুরলাম ওদের সাথে। বিকেল থেকে সন্ধ্যায় গড়িয়ে চলল সময়। সন্ধ্যা থেকে রাত। সঙ্গে ঢাক ঢোল বাজি, কত বিচিত্র শব্দ! সারা শরীর আর মাথা ভরতি জেতা দলের আবির। বাড়ি ফিরলাম রাত দশটার সময়। চান টান না করে ঐ অবস্থায় পড়লাম ঘুমিয়ে।
মা অথবা বাবা কেউই আমার আসার শব্দ পায় নি বোধয়। পেলেও কাছে আসেনি কেউ। বিশেষ করে বাবা যে ঐ অবস্থায় আমাকে দেখতে পায় নি, তা ভেবে নিশ্চিন্ত ছিলাম। খাবার তো বাইরে থেকেই খেয়ে এসেছিলাম। আর কি! চোখে তখন আমার দেহ অবশ করা নেশার মত ঘুম।
আশ্চর্য, ভোরে সেদিন ঠিক সময়ে ঘুম ভেঙে গেল। তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে গেলাম। বাবা যেন আবির মাখা শরীর না দেখতে পায়, এই ভয়ে। ছটার জল তখনো আসেনি। চৌবাচ্চার জল গায়ে ঢালব কি ঢালব না- এরকম দোনামনা করছি। এমন সময় মায়ের ডাক- ‘খোকন, একবার এই ঘরে তাড়াতাড়ি শুনে যা তো!’ সর্বনাশ! বাবা নিশ্চয় জেগে আছে! আমি শেষ আজকে! মাথাটা ঝেরে গামছা দিয়ে ভালোভাবে মুঝে ব্রাশে পেস্টটা লাগিয়ে মায়ের কাছে গেলাম। বাইরে দরজার একটু আড়ালে দাঁড়ালাম।

-“বলো?”

-‘শোন্‌। কাল সন্ধ্যায় বাড়িতে পার্টির লোক এসেছিল।‘

-“কোন্‌ পার্টির মা?”

-“কারা আবার! যারা আসে! তারা ছাড়া আর কারা আসবে? এই কয় বছরে তোর বাবার পার্টির কেউ কি একবারও দেখা করে গেছে? লোকটা বেঁচে আছে কি মরে গেছে, একবারও কি খবর নিয়েছে? এমন কি যখন ঐ বাচ্চা ছেলেগুলো গায় হাত দিল তোর বাবার, তখনো তো একবার দেখতে এলো না! এরা নাকি ৭২ এ বিপ্লব করেছে! ছাই করেছে!’ সেই একি ঘ্যানঘ্যান মায়ের। আমি অধৈর্য হয়ে পড়লাম।

-“আসল কথাটা বলবে তো!” বাঁ হাত দিয়ে মাথাটা চুলকাচ্ছিলাম তখন। দলা দলা আবির উঠে আসছিল নখে।

-“ওরা বলল, তোর বাবা যদি রাজি থাকে তবে সামনের পৌরসভার ভোটে তোর বাবাকে ওরা ওদের পার্টি থেকে দাঁড় করাবে। তুই কী বলিস্‌?” খুশি আর গাম্ভীর্যের মিশেল মায়ের কথায়।

-“আমি আর কী বলব! বাবা কী বলল সেটা বলো?”

-“তোর বাবাকে শেষ পর্যন্ত আমি রাজি করিয়েছি। আজ সন্দেবেলা ওরা এসে তোর বাবাকে ওরা নিয়ে যাবে”।

-“কোথায়?”

-“তোর বাবার পুরনো পার্টি অফিসে। ওটা এখন থেকে ওরাই ব্যবহার করবে। তোর বাবাকে দিয়ে উদ্বোধন করাবে”। বলে সকাল সকালই মা মুখের মধ্যে পান ঢোকাল মনেহল।
আমি শুধু বললাম- “বাহ্‌! দারুণ তো!”
বারান্দা থেকে নামার আগে এক ঝলক মা-বাবার ঘরের দিকে তাকালাম। দেখি সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা আমার রোগা হারা পার্টির বাবা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বাবাকে এমন নিশ্চিন্তে ঘুমোতে আমি অনেক বছর দেখিনি।

-“বাহ্‌! চমৎকার!” আমার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলেন দর্শক। তারপর বললেন- “প্রবলেম তো সল্ভড?”

-“হ্যাঁ। তা বলতে পারেন আপাতত। কিন্তু এবার আমার জীবনে শুরু হল দ্বিতীয় পর্ব।“

-“ ও হ্যাঁ। প্রথমে বলেছিলেন দুটি পর্বের কথা! তার মানে এখন ইন্টারভাল, তাই তো!” দর্শকের মুখে হাসি।

-“ হ্যাঁ। তা ধরে নিতে পারেন। এবার শুনুন! ঐ ঘটনার পর থেকে আমার মধ্যে ঘটল গভীর এক পরিবর্তন।“

-“হ্যাঁ। পরিবর্তন তো এখন জনপ্রিয় শব্দ। তা আপনার পরিবর্তনটা কী রকম?

-“চোখ থেকে ঘুম উধাও। ঘুম আর আসতেই চায় না। কমতে কমতে এখন মাত্র ঘন্টা খানেকে দাঁড়িয়েছে। ভোর রাতে ঐ ঘন্টা খনেকের তন্দ্রা। ব্যাস্‌ ঐটুকুই।“

-“কী বলছেন!” দর্শক অবাক।

-“একদম ঠিক। প্রায় সারারাত ধরে এখন আমি জেগে থাকি। জেগে জেগে সিনেমা দেখি। সেই সব সিনেমা। যেখানে এক ঘুষিতেই প্লেনের মত আকাশে উড়ে চলে মানুষ! সিনেমা শেষ হলে দেখি খেলা। বিরাট কোহলির ব্যাট থেকে বেরিয়ে বলটা কীভাবে চিয়ার লিডারের শরীরের ঢেউয়ে মিশে যায়- আমি দেখি। খেলা শেষ হলে দেখি বিজ্ঞাপন। হাঁটু সারানোর ওষুধ, ডায়াবেটিসের ওষুধ, রোগা হওয়ার অষুধ, মোটা হওয়ার অষুধ, যৌন শক্তি বাড়ানোর অষুধ- কত কী! এইসব চমৎকার জিনিস আমি একা একা রাত জেগে দেখি।
এখন যেমন আপনার পাশে বসে এই সিনেমাটা দেখছি। অথবা ঘরে বসে যেমন দেখি। কী যায় আসে! কার আসে যায়! আসলে তো আমাদের দেখা একটাই। আসলে তো আমাদের বলা একটাই। আপনি হয়ত আমার পাশে নেই। আমি হয়ত নেই আপনার পাশে। তবু আছে এই সিনেমা, তবু থাকবে এই চলমান চিত্র। যতক্ষণ না আমার চোখে ঘুম আসে।


(কোন ব্যক্তি, পত্রিকা বা কোন রাজনৈতিক মতাদর্শকে আঘাত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়।)

আপনার মতামত জানান