রাইটার্স ব্লক

সায়ন্তন ভট্টাচার্য

ঘুম থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলেন কাঞ্চন। কপালে, গলায় বিন্দু বিন্দু ঘাম, সিলিং ফ্যান বাঁইবাঁই করে ঘুরলেও কাজ দিচ্ছেনা বিশেষ। রাত দেড়টা বাজে। আবার সেই একই স্বপ্ন। আসলে স্বপ্ন ঠিক নয়, স্মৃতি, যেটা বারংবার ঘুমের মধ্যে ফিরে ফিরে আসে। প্রমিসিং কিশোর সাহিত্যিক কাঞ্চন চক্রবর্তী তখন নিজে কিশোর, সবে গ্র্যাজুয়েশনের ফার্স্ট ইয়ার। ঘুম থেকে উঠতে বরাবর লেট হওয়ায় কাঞ্চনকে রিতীমত দৌড়ঝাঁপ করে কলেজের জন্যে বেরোতে হত। বাড়ি থেকে সাইকেলে পাঁচ মিনিট ঘুরে স্টেশন, সেখান থেকে ট্রেন ধরে শিয়ালদা। এখন আমাদের কাঞ্চন লেট হলেও ট্রেনটি তো নয়, ফলে প্রত্যেকদিনই সাইকেল গ্যারেজ থেকে বেরোতে বেরোতে অ্যানাউন্সমেন্ট হয়ে যেত, “ডাউন ট্রেন তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসছে” আর কাঞ্চনও ওভারব্রিজের তোয়াক্কা না করে ছেলেবেলায় খেলা কুমিরডাঙা মত লাফিয়ে লাফিয়ে লাইন টপকে ওপারের প্ল্যাটফর্মে গিয়ে উঠতেন। না, কাঞ্চন ট্রেনে কাটা পড়েননি। পড়লে এখন তার ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে ওঠাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যেত। ব্যাপারটা হল কাঞ্চনের সেই কুমিরডাঙা খেলার লাইনটায় মাঝেমাঝেই কিছু অসভ্য মালগাড়ি গোঁজ মেরে দাঁড়িয়ে থাকত আর লেটের সময় ব্যাপারটা হত গোদের উপর বিষফোঁড়া! কিন্তু থামলে তো আর চলেনা, ট্রেন মিস করা মানে ক্লাস মিস করা, তখন আবার অ্যাটেন্ডেন্সের বাজে কড়াকড়ি। কাঞ্চন তাই পিঠের ব্যাগটাকে বুকে আগলে হামাগুড়ি দিয়ে ট্রেনের তলা দিয়ে ওপারে চলে যেতেন। এভাবেই হল এক বিপত্তি। সেদিন সোমবার, তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম ভিড়ে গিসগিস করছে, শিয়ালদা যাওয়ার গাড়িও অ্যানাউন্স হবো হবো। কাঞ্চন সেদিন অভ্যেসমত ব্যাগটা বুকের বদলে পিঠে নিয়েই মালগাড়িটার তলা দিয়ে হামা দিতে শুরু করেছিলেন এবং অত্যন্ত সিনেমাটিক ভাবে তার ব্যাগের লেস গাড়ির একটা লাল, মরচেধরা পাইপের সাথে আটকে গিয়েছিল। ওদিকে ট্রেন আসব আসব, মাথা গুলিয়ে গিয়ে ব্যাগটাও আর খুলছে না। এমন সময় মালগাড়িটা হঠাৎ চলতে শুরু করল। তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে একরাশ “গেল গেল রে” চিৎকার শোনা যাচ্ছে, মাথার উপর দিয়ে ধীরে ধীরে একটা ভয়ানক দানব হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে যে আর একটু পরেই স্পীড নিতে আরম্ভ করবে, ব্যাগটা ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে চোখের সামনে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে আর কাঞ্চন কিছুতেই বুঝতে পারছেন না সিনেমার হিরোদের মত গড়িয়ে লাইন থেকে বেরোনোর চেষ্টা করতে গেলে চাকার তলায় চলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা...

রাত দেড়টা বাজে। অনিরুদ্ধ বেডরুমের লাইটটা জ্বালিয়ে দিলেন। অন্ধকার ঘরে ল্যাপটপের আলোটায় মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। হাতে আর সাতদিন সময় পূজাবার্ষিকী বড় গল্প জমা দেওয়ার, কিচ্ছু লেখা হয়নি। একটা লাইনও না। এর মধ্যে সবকিছু চেষ্টা করা হয়ে গেছে, কিচ্ছু নামেনি। কলেজ হিরোর মালগাড়ির নীচে আটকা পড়ে যাওয়ার খেলো গোঁজামিল থেকে আরম্ভ করে গোয়েন্দা, ভুত, কল্পবিজ্ঞান কিছুই আর মনের মত হচ্ছেনা! অনিরুদ্ধ বিরক্ত হয়ে পুরো লেখাটা কনট্রোল এ চেপে উড়িয়ে দিলেন, এসব কাঞ্চন ফাঞ্চন চলবে না। তবে চলবে কী? অনিরুদ্ধ একটা সিগারেট ধরালেন, গত চার ঘন্টায় এই নিয়ে ছয় নম্বর। মাথা কাজ করছে না, একটু বেরোবেন কি! অভ্যেসটা আসলে বেশ পুরোনো। অনিরুদ্ধ মাঝেমাঝেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন, সে মধ্যরাত হোক বা ঝাঁঝাঁ দুপুর। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে উদ্দেশ্যহীনদের মত এদিকে- ওদিকে কিছুক্ষণ ঘোরেন, তারপর আবার সুড়সুড় করে ফিরে আসেন। অনিরুদ্ধ আসলে অবিবাহিত, বাবা- মা মারা গিয়েছেন বছর পাঁচেক হতে চলল অথচ তাও, ঝাড়া হাত পাওয়ালা মানুষটা হাজারবার চেয়েও, কোনোদিন পালাতে পারেননি। সেই জন্যেই এসব ছোটোখাটো ভেকেশন। অনিরুদ্ধ আর দেরি না করে হাওয়াই চপ্পলটা গলিয়ে মেন গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন।


প্রায় পনের মিনিট ধরে অন্ধকার পুকুরপাড়ে মশার কামড় উপেক্ষা করে বসে আছেন অনিরুদ্ধ। তার ওঠার ক্ষমতা নেই। ছোটোবেলার গল্পের বইতে মিরর ইউনিভার্স বলে একটা জিনিস পড়েছিলেন তিনি, আজ এই বুড়ো বয়েসে এসে সেই গল্পগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে। তখন দুটো মত বাজে, অনিরুদ্ধ তার পাড়ার এদিকে ওদিকে কিছুক্ষণ ঘুরে রোজকার মত পেছনের দিকে মাঠ লাগোয়া পুকুরপাড়ে এসে বসে ছিলেন। এখানে মাঝেমাঝেই আসেন তিনি। ভদ্রলোক আসলে বড্ড একা, ফলে গত বারো বছর ধরে এখানেই থাকলেও পাড়ার কারো সাথেই তার বিশেষ আলাপ নেই। রাস্তার নেড়িগুলো বাদে। অনিরুদ্ধ আরাম করে দু পা ছড়িয়ে বসলেন। আজ বোধহয় পুর্ণিমা, পূর্ণিমা না হলেও প্রতিপদ বা দ্বিতীয়া তো বটেই! তার উপর খোলা পুকুরের উপর দিয়ে হুহু করে একটা মিষ্টি হাওয়া দিচ্ছিল।

“দেশলাই হবে?” চমকে উঠলেন অনিরুদ্ধ! রাত দুটোর সময় দেশলাই চাইছে কে? “আসলে নিয়ে বেরোতে ভুলে গেছি হেঁহেঁ! চিন্তা করবেন না, আমি ডাকাত নই, পুকুরের ওইদিকে ফ্ল্যাট আমার। আপনি গার্লস স্কুলের সাইডটায় থাকেন না?” অনিরুদ্ধর ভালো লাগছিল না। তার এখন একটু শান্ত পরিবেশ চাই, মাথা না খুললে প্লট আসবে না। তিনি একবার ভাবলেন জিজ্ঞেস করবেন ভদ্রলোক এত রাত্রে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেন, কিন্তু প্রশ্নটা করতে বাধল কারণ তিনি নিজেও এখন রাস্তাতেই। অনিরুদ্ধ অল্প সৌজন্যের হাসি হেসে লাইটারটা এগিয়ে দিলেন। আপদ বিদেয় হোক তাড়াতাড়ি। “আপনাকে এর আগেও দেখেছি রাতের দিকে এখানে এসে বসতে। আসলে আমিও মাঝে মাঝে হাওয়া খেতে বেরোই, মাথা খোলে ভালো, লোকজন না ঘুমোলে সারাক্ষণ চারিদিকে এত্ত হুল্লোড় চলে যে লেখা আসেনা জানেন তো!” লোকটার শেষ কথাটা শুনে অনিরুদ্ধ নড়ে বসলেন। এ আবার কী ধরনের ইয়ার্কি? কেনই বা তার পেছনে লাগা? লোকটা ততক্ষণে অনিরুদ্ধর পাশে জুত করে বসে পড়েছে, প্রথমে বিরক্তি লাগলেও শেষ কথাটা শোনার পর অনিরুদ্ধও আর আপত্তি করেননি। “লেখা আসেনা মানে?”
“ওই দেখুন, বকবক করার চক্করে নিজের পরিচয়টাই দেওয়া হয়নি। আমার নাম কাঞ্চন চক্রবর্তী। ওই গল্পটল্প লিখি আর্কি হেঁহেঁ! আপনার নামটা?”

বাড়ি ফিরে অনেক্ষণ ধরে গভীর চিন্তায় ডুবে থাকলেন অনিরুদ্ধ। কাঞ্চন চক্রবর্তী নামটা কি তার জানা? লেখক যখন, হয়তো কোনো সভাটভায় শুনেছিলেন, সেটাই হয়তো সাব-কনসাশে থেকে গেছে আর তারপর গল্প লেখার সময় উধোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চেপে এই কীর্তি। তবে ভদ্রলোক যেমন লেখকই হোন না কেন তেমন ফেমাস নন, হলে অনিরুদ্ধ জানতেন। এসব নিয়ে মুশকিল নয়, নাম মিলে যাওয়া আকছার ঘটে। মুশকিল তার পরের জায়গাটায়। অনিরুদ্ধ ল্যাপটপের ডালা তুলে ওয়র্ড ফাইলটা আবার খুললেন, তারপর কনট্রোল জি মেরে উড়িয়ে দেওয়া লেখাটা ফিরিয়ে আনলেন। “আপনার কলেজ কোথায় ছিল? সি ইউ তো?” লোকটা বড্ড বাচাল!
“হুঁ, মোতিঝিল, তারপর যাদবপুর। আপনার?”
“শেয়ালদা সুরেন্দ্রনাথ থেকে গ্র্যাজুয়েশন, তারপর আর পড়াশোনাটা করা হয়নি হেঁহেঁ! সে এক সময় ছিল মশাই- আজকালকার ছেলেপিলেগুলো তো খালি রুপেই ময়ূর, কাজের বেলা কাঁদাখোচা। আমি সকালে বাবার দোকান সামলে রোজ কলেজ ছুটতাম, ফিরে আবার দোকানে। একবার তো মরেই যাচ্ছিলাম! কলেজ যাওয়ার জন্য স্টেশনে এসে দেখি লাইনে এক মালগাড়ি!” –এখানেই এসে হোঁচট খাচ্ছেন অনিরুদ্ধ, এটা কীভাবে হতে পারে? সাহিত্যিকরা ভবিষ্যৎ দেখতে পায় বলে একটা কথা আছে জানেন তিনি, এ তো অতীত দেখতে পাওয়া! ব্যাপারটাকে কিছুতেই কাকতালীর পর্যায়ে ফেলতে পারছিলেন না অনিরুদ্ধ, তবে কি তারই কলেজের কোনো বন্ধু তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এসব প্ল্যান করে- ধুশ! ওসব গল্পে হয়। অনিরুদ্ধ একটা সময় ভাবা ছেড়ে দিলেন, যুক্তি খুঁজে না পেয়ে মন এখন কল্পনাকে বিশ্বাস করতে চাইছে। কত কী না ঘটে এই দুনিয়ায়, এটাও হয়ত তেমন অলৌকিক কিছু, হয়তো কোনো আশ্চর্য উপায়ে অনিরুদ্ধর গল্পের হিরো জ্যান্ত হয়ে গেছে! আচমকা নিজেকে ঈশ্বর মনে হল অনিরুদ্ধর। আর কে না জানে, ঈশ্বরের মাথায় স্রেফ দুর্বুদ্ধি খেলে!


এই পর্যন্ত লিখে থামলেন কাঞ্চন। গল্পটা কী একটু বেশিই জটিল হয়ে যাচ্ছে! পাঠক খেই হারিয়ে ফেলবে না তো? কাঞ্চন আবার প্রথম লাইন থেকে গল্পটা পড়তে শুরু করলেন। সন্ধ্যে নামবো নামবো করছে, খাটের সামনের জানলাটা দিয়ে যে একফালি মাঠ দেখা যাচ্ছে সেখানে পাড়ার বাচ্চারা ফুটবল পেটাচ্ছে, সামনের রাস্তা দিয়ে টং টং করে ঘন্টা নাড়াতে নাড়াতে ফুচকাওয়ালা যাচ্ছে, হাওয়ায় একটা মিষ্টি লেবু- তেঁতুল মেশানো গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে, মাঝেসাঝে দু- একটা সাইকেল, রিক্সা। দূর থেকে দেখলে কেন জানি মনে হবে জানলাটার সামনে ডাকঘরের অমল এসে দাঁড়ালে বেশ হয়! নাহ, ঠিকই আছে গল্পটা তবে শেষটা জমিয়ে করতে হবে। কাঞ্চন উঠে দাঁড়ালেন। রান্নাঘরের দিকের জানলাগুলো এখনই বন্ধ না করলে মশা ঢুকে সারারাত ভোগাবে। হাতে আর ছয়দিন বাকি, তবে কাঞ্চন এখন ফুল মেজাজে। একবার গল্পের ফ্লো এসে গেলে তার কোনো সমস্যা হয়না- গল্পের ক্যারেক্টররাই গল্প বানিয়ে নেয়! “আআহ!” দরজার সামনে থেকে ছিটকে গেলেন কাঞ্চন, বঁটির একটা ধার কীভবে যেন বাইরে বেরিয়ে ছিল। উল্টোদিকের দরজার পাল্লায় কোনোমতে পিঠ ঠেকিয়ে কাঞ্চন পায়ের দিকে তাকালেন- বাঁদিকের পায়জামার তলাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে, গোড়ালির একটা বড় জায়গা হাঁ হয়ে রয়েছে।

“কী ব্যাপার, খোঁড়াচ্ছেন কেন?” কাঞ্চনকে ল্যাঙচাতে ল্যাঙচাতে পুকুরের দিকে আসতে দেখে এগিয়ে গেলেন অনিরুদ্ধ। আবার মাঝরাত, আবার সেই পুকুরপাড়। “একি, ব্যান্ডেজ কেন? কী হয়েছে?” কাঞ্চন মুচকি হাসলেন, “আর বলবেন না, গল্প লিখছিলাম একটা, অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড হয়ে ঘচাং- হেঁহেঁ!”
“টিটেনাস নিয়েছেন? মরচে ধরা বঁটি তো-” কাঞ্চন কেমন একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে অনিরুদ্ধর দিকে তাকালেন, “আপনি কীভাবে বুঝলেন বঁটিতে কেটেছে যে?”
“এটা একটা প্রশ্ন হল! শোয়ানো বঁটি ছাড়া অমন আড়াআড়ি সারফেসে কীসে কাটবে? শেয়াল ধরার কল পেতে রাখেননি নিশ্চই মেঝেতে!” কাঞ্চন হেসে ফেললেন, তিনি বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারবেন না আজ, পাটা টনটন করছে, তাছাড়া কাটা জায়গাটা এমন বাইরে এক্সপোজড হতে থাকলে ইনফেকশন হওয়ারও ভয় থাকে। কাঞ্চন পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালেন, এটা শেষ হলেই ফিরতে হবে বাড়িতে, গল্পটা কেমন টানছে তাকে! “ইয়ে কীসব গল্প লিখছেন বলছিলেন, কী নিয়ে?” অনিরুদ্ধর চেহারায় একটা খুনি খুনি ব্যাপার রয়েছে। এটা আগের দিনও খেয়াল করেছেন কাঞ্চন। পেতে আঁচড়ানো চুল, ধারালো দাড়ি, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা আর সবচেয়ে ভয়ানক ঠোঁটের কোণের হাসিটা। “শেষটা নিয়ে একটু চাপে আছি, ওটা ভেবে নেই, পরেরদিন পুরোটা বলব, কী বলেন?”
“আপনি কখনো রুবিক্স কিউব সলভ করেছেন?”
“রুবিক্স কিউব? হ্যাঁ, ছোটোবেলায়। কেন?” অনিরুদ্ধ সিনেমার সুপারস্মার্ট ভিলেনদের স্টাইলে তার ধারালো দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, “রুবিক্স কিউবকে কতভাবে সলভ করা যায় সেই নিয়ে অজস্র হাইপোথেসিস, ইকুয়েশন, বইপত্র আছে। কেন জানেন?” অনিরুদ্ধ অনেকটা ধোঁয়া একসাথে ছাড়ার জন্য কিছুক্ষণ পজ দিয়ে বললেন, “কারণ ওই মুভগুলোই আসল। দেখবেন এই কলামের তিনটে রঙ এক করতে গিয়ে উল্টোদিক ফোকলা হয়ে গেল, তিনটের গোটা সেট তৈরী হরার পর দেখলেন আরেকটা সেট ইম্পসিবল পোজিশনে বসে আছে- এগুলোই তো মজা, ব্লকগুলোকে জুড়বেন কীভাবে? শেষে যে সব রঙ মিলে যাবে সে তো সবাই জানে...”


জুলজির প্র্যাক্টিকাল ক্লাসে একবার অ্যানিমাল হাউজের খাঁচা ভেঙে অনিরুদ্ধর সবকটা এক্সপেরিমেন্টের ইঁদুর পালিয়ে গেছিল। আজ, এত বছর পরে আবার সেই অনুভূতি ফিরে আসছে। গত তিনদিন ধরে কাঞ্চনের কোনো পাত্তা নেই। অবশ্য পায়ের যা দশা তাতে প্রত্যেকদিন একা একা মাঝরাত্রে তার পক্ষে বাইরে বেরোনোও সম্ভব নয়। কোনো এক অজানা কারণে দুজনের কেউই কোনোদিন দিনের আলোয় একে অপরকে খোঁজার চেষ্টা করেননি, আসলে অনিরুদ্ধ নিজেও সেটা চাননি। ঈশ্বর আর ভুত বেশি দেখা দিলে সন্দেহ জাগে। কিন্তু এই বিরক্তিটার কী হবে? অনিরুদ্ধ রিয়ালাইজ করলেন তিনি যে তার গল্পের হিরোর উপর অসম্ভব রেগে যাচ্ছেন, তার মনের ভেতরে একটা কুৎসিত ইচ্ছে চাড়া দিচ্ছে। লেখার ধারে গোড়ালি হাঁ করে দেওয়া গেলে...যাক গে। রাত তখন আড়াইটে মত বাজে, পায়ের যন্ত্রণায় কিছুতেই ঘুম আসছে না, দুটো পেইনকিলারেও কাজ দিচ্ছে না। কাঞ্চন ঘুম থেকে উঠে বসলেন, তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গেছে। তিনি আস্তে আস্তে পা ফেলে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। ব্যান্ডেজের উপর থেকে চাপচাপ লাল ওষুধ মাখানো রক্ত জেগে আছে, পাজামা সেখানে টাচ করলেই ইলেকট্রিক শকের মত ব্যাথা লাগছে বলে কাপড়টা গুটিয়ে হাঁটু অবধি তোলা। কাঞ্চন পায়ে যতটা সম্ভব কম জোর দিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে দিলেন জলের নীল বোতলটার দিকে; যার ভেতরে বিষাক্ত অ্যাসিড ভরে রেখেছে কেউ...নাহ, পারবেন না অনিরুদ্ধ। তিনি নিষ্ঠুর হতে পারেন, কিন্তু একজন মানুষকে মেরে ফেলার মত নিষ্ঠুরও তিনি নন! অনিরুদ্ধ গোটা গল্পটা পাকাপাকিভাবে ডিলিট করে দিয়ে সটান শুয়ে পড়লেন, এই স্টোরি আর নয়।

ঘুম ভাঙল পরেরদিন কলিংবেলে। সকাল সাড়ে আটটা মত বাজে, অনিরুদ্ধ ঘুমচোখে দরজা খুলে চমকে গেলেন। উল্টোদিকে খাঁকি উর্দিপরা তিনজন পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে রয়েছেন। অনিরুদ্ধ কিছু বলার আগেই তারা সোজা অনিরুদ্ধর ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলেন, গোটা ঘরটা ভালো করে একবার দেখলেন, তারপর সোফায় আরাম করে গা এলিয়ে বললেন, “আপনি কাঞ্চন চক্রবর্তীকে চিনতেন কীভাবে?
“মানে?”
“গতকাল রাত্রে মারা গেছেন ভদ্রলোক। মাঝরাত্রে ঘুমের চোখে জল ভেবে অ্যাসিড মেরে দিয়েছেন।”
“কী বলছেন কি!” অনিরুদ্ধর বুক কেঁপে উঠল, তিনি কিছু বলার আগেই ডানদিকে দাঁড়ানো পুলিশটি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার সাথে ওনার কীরকম সম্পর্ক ছিল?”
“দেখুন আমিও সাহিত্যিক। মাঝেমাঝে গল্পের আইডিয়া না পেলে পাড়ায় হাওয়া খেতে বেরোতাম, এমন করেই একদিন দেখা হয়ে গেছিল, দু-তিনবার কথা হয়েছে। কেন বলুন তো?” প্রথম অফিসার এবার পকেট থেকে একতাড়া কাগজ বের করে অনিরুদ্ধর টেবিলের উপর ফেললেন। “ভদ্রলোক কোনোদিন ফেমাস টেমাস হলে এই মাল লাখটাকার নিলামে চড়বে, সাহিত্যিকের শেষ গল্পের ম্যানুস্ক্রিপ্ট। হাহ হাহ!” কাগজের তাড়াগুলো হাতে নিয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করলেন অনিরুদ্ধ। ভারি সুন্দর হাতের লেখা কাঞ্চনের, প্রথম পৃষ্ঠার একদম মাথায় পরিচ্ছন্নভাবে লেখা “রাইটার্স ব্লক”, তারপর সচ্ছল হাতের লেখায় তরতরিয়ে শুরু হচ্ছে গল্প- “রাত দেড়টা বাজে। অনিরুদ্ধ বেডরুমের লাইটটা জ্বালিয়ে দিলেন। অন্ধকার ঘরে ল্যাপটপের আলোটায় মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। হাতে আর সাতদিন সময় পূজাবার্ষিকী বড় গল্প জমা দেওয়ার, কিচ্ছু লেখা হয়নি। একটা লাইনও না।” অনিরুদ্ধ ম্যানুস্ক্রিপ্টটা ফেলে দিলেন টেবিলে, তার মাথা কাজ করছে না আবার, একটু পুকুরধারে গিয়ে হাওয়া খাওয়া দরকার। “আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আমি কিচ্ছু জানিনা বিশ্বাস করুন!”
“আমরাও জানিনা, আপনারা সব হাইফাই আঁতেল লোকজন কী যে করেন! তবে গল্পের শেষটার জন্য আমাদের আপনাকে কিছু ট্রাবল দিতে হবে স্যার, প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড!” অনিরুদ্ধ ধরতে পারলেন না অফিসারের মুখে লেগে থাকা হাসিটা তার টেনশন কমতে হেল্প করার জন্যে নাকি বিদ্রুপ প্রকাশের জন্যে জন্মাচ্ছে। খসখস করে পাতা এগিয়ে চলেছে, একদম শেষপাতায় এসে অফিসার অনিরুদ্ধর দিকে সরাসরি চোখ রেখে বললেন, “শেষ পাতা বলছে জল সরিয়ে অ্যাসিড রাখার কুকির্তীটা আপনার।” অনিরুদ্ধ জানেন তিনি এখন চাইলেই প্রতিবাদ করতে পারেন, বলতেই পারেন তিনি যে আদৌ কাঞ্চন চক্রবর্তীর বাড়িটাই চেনেন না, বলতেই পারেন পুরো ব্যাপারটা তাকে ফাঁসানোর জন্য বানানো হয়েছে, বলতেই পারেন তার কাছে মার্ডার হওয়ার টাইমের অ্যালিবাই আছে। অনিরুদ্ধ কিছুই বললেন না, উলটে ফ্যালফ্যাল করে টেবিলের উপরে পড়ে থাকা গল্পটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। “এগুলোই তো মজা, ব্লকগুলোকে জুড়বেন কীভাবে? শেষে যে সব রঙ মিলে যাবে সে তো সবাই জানে...” কাগজগুলোর ভেতর থেকে ফিসফিস করে বলে উঠলেন কাঞ্চন চক্রবর্তী, অনিরুদ্ধর ছোটোগল্পের নায়ক।

আপনার মতামত জানান