অন্যমনস্ক

নির্মাল্য সেনগুপ্ত
১)
“একটা কথা তোকে বলব? তুই ভাববিনা তো যে আমি গাঁজা খেয়েছি?”
“সে আর ভাবার কী আছে। বল...”
“এইসব জীবন, প্রেম, চাকরী, বিয়ে, ভালো কেরিয়ার, বাচ্চাকাচ্চা, শনিবার করে হালকা মদ, মাসে একবার রেস্টুর্যাীন্টে খাওয়া, প্রভিডেন্ট ফান্ড ইত্যাদি ইত্যাদি যা কিছু নিয়ে আমরা টুয়েন্টি ফোর সেভেন ভেবে চলেছি না, সবকিছু জাস্ট বোকামো। আল্টিমেটলি সবই মায়া। জাস্ট মায়া। আর কিচ্ছুনা...”
“হুমম্‌...”
“কী হুমম্‌?”
“তোর মাথাটা পুরো গেছে তাতিন। ইউ আর টোটালি গন কেস। ভালো কথা বলছি শোন। এইসব কেসে জড়াসনা। মেয়েটা ঠিক সুবিধের না। যার সাথে আছিস, ভাল আছিস। তার সাথেই থাক।”
“তুই আমার কথাটা সিরিয়াসলি নিলিনা কিন্তু। আই ক্যান এক্সপ্লেইন ইট...”
“কি আর বলি। আচ্ছা এক্সপ্লেইন কর।”
“আচ্ছা দ্যাখ, আজ তুই একটা মেয়েকে ভালবাসলি, প্রচন্ড ভালবাসলি। গাদা গাদা জিনিস উপহার দিলি, কে.এফ.সি তে খাওয়ালি, মেয়েটা তোকে সকাল বিকেল ফোন করে ভালবাসার আলাপ করল, তুই তোর উড়নচন্ডী জীবন থেকে ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে গিয়ে কেরিয়ার নিয়ে ভাবতে বসলি। কোটি কোটি প্ল্যান করলি, একটা স্বপ্নের জগৎ তৈরী হল তোর চারিপাশে। বন্ধুদের বেকার খিল্লি তোর অসহ্য লাগতে শুরু করল, এমন কি তোর যেটা জীবনের প্যাশন, যেমন ধর তোর ডাক্তারি, আমার লেখক হওয়া, তোরটা যদিও তোর কেরিয়ার, আমারটা নয়, সে যাই হোক, সেটাও তোর কাছে সেকেন্ডারী মনে হতে শুরু করল। ঠিক যখন তুই হাজারটা জঘন্য অপরাধ করার পর জীবনটাকে একটু গুছাতে শুরু করেছিস, মেয়েটা কেটে পড়ল, জাস্ট কেটে পড়ল। কী পেলি তুই? কিচ্ছু না। দিনে দশবার কাঁদলি। হাত টাত পোড়ালি, মদ খেয়ে একাকার করলি, অমানুষিক বাজে কবিতা লিখলি, তুই যদিও লিখবিনা, সে যাই হোক, ইউ আর লস্ট। মেয়েটাও হয়ত কিছুদিন পর রিয়ালাইজ করল। ফিরতে চাইল। ততদিনে তুই একটু তাও নিজেকে সামলেছিস। তুই আর রিস্ক নিতে না চেয়ে তাকে “মাগী, টাগি” বলে কাটালি। আবার কাঁদলি, আবার হাত পোড়ালি...”
“তোর এই লুপটা কখন শেষ হবে বলবি একটু? বলেছিলিস এক ঘন্টার ব্যাপার। গত পয়তাল্লিশ মিনিট ধরে রোদের মধ্যে হেঁটে চলেছি, একফোঁটা রাস্তা চিনিসনা তুই। এইদিকে মোটেও কলেজ স্ট্রীট নয়...”
“ওফ পিয়ুশ, এবার কিন্তু মার খাবি। শোন যা বলছি। তারপর তুই কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে গেলি। কেটে গেল দিন। অনেকদিন... একদিন মেয়েটার সাথে তোর দেখা হল রাস্তায়, দুজনের কেউই কাউকে প্রথমে চিনতে পারিসনি। তারপর হতভম্ব হয়ে তাকালি দুজনে দুজনের দিকে। একটু হাসলি। তারপর তুই হয়ত সামনের সেমেস্টারের অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে ভাবছিস, আর মেয়েটা তার বর্তমান ‘পুচু/ সোনা/ জান’ কি করছে এখন, সেই নিয়ে ভাবতে ভাবতে চলে গেল। অথচ এই মেয়েটার সাথে তুই এক সময় আফটার ফর্টি, লাইফটা কেমন হবে ভেবেছিলি, হনিমুনে লাচুং ছাড়া আর কোথাও যাওয়া সম্ভবই নয় সেই নিয়ে খুনসুটি করেছিলি। জন্মদিনের পোশাকে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে এমন কিছু মূহুর্ত কাটিয়েছিলি, যা কোনো অসম্ভব ভাল কবিতার থেকে কোনো অংশে কম সুন্দর নয়। কিন্তু অ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য ডে কি হল? নাথিং। একবার ভাবলিওনা কেউ। যার মৃত্যুর কথা ভাবলে একসময় নিজের মৃত্যু কষ্ট হত, সে কনস্টিপেশনে ভুগছে কিনা তা নিয়েও আজ তোদের মাথাব্যথা নেই, এই বাঁড়া, তুই হাসছিস কেন রে? আমি কী ছ্যাবলামো করছি নাকি?”
“মা কালী তোর কথায় হাসিনি। একটা কোল্ড ড্রিঙ্ক খাওয়া না প্লিজ। প্রচন্ড তেষ্টা পেয়েছে।”
“চল খাওয়াচ্ছি। তুই মিলিয়ে নিস আমার কথা। এই যে ধর, কোল্ড ড্রিঙ্ক খাবি, দশ টাকা খরচ হবে, খাওয়ার পর যখন তেষ্টা মিটে যাবে তখন মনে হবে কী হল খেয়ে। তেষ্টা তো মিটেই গেল। এর থেকে জল খেলেও এই মূহুর্তে আমার কাছে আলাদা কিছুই লাগতনা। এই টাকাটা জমিয়ে বিকেলে একটা চিকেন রোল খাওয়া যেত। সেটা খাওয়ার পরও তোর মনে হবে, মা’কে ম্যাগি বানিয়ে দিতে বললেই হত। একই তো ব্যাপার! সুখগুলোও ঠিক এরকমই রে। সবই মোমেন্টারি। আসে, চলে যায়, আবার আসে, মাঝে মাঝে তো মনে হয় জন্মে কী লাভ হল? এই এতকিছু আজ আমি তোকে বলছি, কিছুদিন পর তো মরেই যাব। তখন? আবার অমর হয়েই বা কী করব? কোনোদিন মনযোগ দিয়ে নিশ্বাস নিয়ে দেখেছিস? হাঁপিয়ে যাবি কিছুক্ষণ পর পরিশ্রমে।”
“তাতিন, আমি শিওর, এই রাস্তাটা কলেজ স্ট্রীটের নয়, মৌলালি চলে এসেছি মনে হচ্ছে। চল ওই কাকুটাকে জিজ্ঞেস করি।”
“রাস্তা? সেটাও কী মায়া নয়? যেটা হেঁটে আধ ঘন্টা লাগে, অটোতে দশ মিনিট। আমরা কী বাঁচাই পয়সা খরচ করে? শ্রম? সময়? সময় বাঁচাই কেন? সময়ের দাম আছে বলে? সেই দামটা কিভাবে পাই? পরিশ্রম করে? কী মুর্খ আমরা দ্যাখ। প্রথমে খেটে রোজগার কর। তারপর খরচ কর যাতে কম পরিশ্রম হয়...সেই তোর লুপ। এভরিথিং ইস ইন আ লুপ ডার্লিং। এভরিথিং ইস জাস্ট অ্যান ইলিউশন...তুই বাঁড়া ডাক্তার হয়েও মরে যাবি একদিন। আমি গল্পে পঞ্চাশটা নায়ককে বাঁচিয়ে হ্যাপি এন্ডিং করিয়ে, কল্পনাও করতে পারবনা কোনটা আমার লেখা শেষ গল্প হবে...”
“ওরেবাবা...গাঁজাটা ছাড় জানোয়ার...”

২)
সকাল পাঁচটা পয়তাল্লিশ –:-
‘ধর খুব সকালবেলা আমি একটা হাঁটু অবধি হাফপ্যান্ট আর হাতকাটা গেঞ্জি পড়ে নাগেরবাজার বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে তিনটাকার একটা চা আর সিগারেট হাতে নিয়ে খুব মনযোগ দিয়ে সামনের বাসের জানলা দিয়ে একটা বোদির দিকে তাকিয়ে আছি। না, না, কোনো অসম্ভব সুন্দরী এবং গিটারের শেপের মতন ফিগারওয়ালা ‘উফফ’ টাইপের বৌদি নয়। একটা মাঝারী ফরসা, গাঢ় লাল লিপস্টিক ঠোঁটে, মাথায় সস্তা হেনা করা বৌদি, যার পিঠের ব্লাউজের নীচ থেকে চর্বির দলা ঝুলে পড়েছে এবং বৌদিটা আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে, যেন কেউ দেখতেই পেলনা এমন ভাব করে বগলটা চুলকে নাকে হাত দিল। আমি সেই জিনিসটাও খুব মনযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে চায়ে এমন ব্যক্তিত্বের সাথে চুমুক দিলাম যেন এই অঞ্চলে আমার থেকে বড় সেয়ানা আর কেউ নেই। এরপর সিগারেট শেষ হলে সেটাকে হ্যালায় নর্দমায় ছুড়ে দিয়ে, চায়ের ভাড়টাকে একটা স্করপিওন কিক মারার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে, যেন পৃথিবীতে যাই হোক, আমার তাতে ছেঁড়া গেছে এমন অঙ্গভঙ্গী করে আমি পাড়ার দিকে এগোলাম। এরপর পার্কের পাশের রকে বসে, পুজোর চাঁদা দিতে অপারগ বাড়ীটার থেকে ভেসে আসা রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনলাম অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে। এরপর ঘুরতে ঘুরতে ভাদ্রমাসকালীন সারমেয় অসভ্যতা, আসন্নপ্রসবা দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে উপবিষ্ট ঢাকির, ঢাকের চামড়ায় আগুন ছুঁয়ানো, হালকা বাতাসে ক্যাপ বন্দুকের বারুদের গন্ধ ও বুড়ি ভিখিরি তারস্বরে ‘মা’ ধ্বনিতে করুণ আর্তনাদ, এসবের সাক্ষী হয়ে শেষে বাড়ি ফিরে এলাম। জিজ্ঞেস করতেই পারিস, এত ভোরে আমি কেন রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়ে এসব করছিলাম? উত্তরটা একটু ন্যাকা ন্যাকা শোনাবে। কাল রাতে তোর কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমই এলনা। এসএমএসটা একটু বেশিই বড় হয়ে গেল জানি। হয়ত পুরোটা তুই পড়তে পারবিনা। বৌদির বগল চুলকোনোর গল্পটার পরই তোর ইনবক্সে লেখা থাকবে ‘some texts are missing’. সে যাই হোক, এত সুন্দর সকালের কিছুটা তোকেও না দিয়ে পারলামনা। আমি এখন ঘুমাবো। উঠে রিপ্লাই দিস।’

সকাল ছ’টা সাত –:-
‘পুরোটাই এসেছে। তোমার সকালটা সুন্দর ছিল কিনা জানিনা, তবে বেশ অন্যরকম ছিল। আমার সকালটাও বেশ অন্যমনস্ক। আমি তো বেশিদূর দেখতে পাচ্ছিনা বিশেষ। কী করব, আমাকে তো বেরোতে দেবেনা এত সকালে বাড়ি থেকে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে বারান্দা থেকে যতদূর দেখা যায়। যেমন ধর, এই মূহুর্তে আমি দেখতে পারছি সামনের বাড়ির বারান্দাটাতে একটা গামছা ঝুলছে। তুমি হাসবে, একটা ঝোলা গামছার মধ্যে কী সকালের কোন সৌন্দর্য্য থাকতে পারে। আমিও জিভ ভেঙ্গিয়ে বলব, তোমার ওই মোটা বৌদির বগলে যেমন সৌন্দর্য্য ছিল, ঠিক তেমনই। তারপর যেমন বালিশে যদি আরেকটু মাথাটা গুঁজে দিই জোর করে, তবে আরেকটু আইসাইটের কার্ভেচারটা বাড়বে। ঠিক তার পাশের ফ্ল্যাটের ডিস অ্যান্টেনাটা চোখে পড়ছে, যার পিছন দিয়ে ওয়ান থার্ড একটা টকটকে লাল সূর্য্য দেখতে পাচ্ছি। একটা কাক এসে একটু আগে ওই অ্যান্টেনাটাতে বসার চেষ্টা করছিল। পিছলে গিয়ে ঠিক সুবিধা না করতে পারায় উড়ে গেল। আমি গুনে দেখলাম, রাত থেকে দিন হওয়ার মধ্যে ঠিক ছ’টা রঙ বদলায় আকাশে। প্রথমে কালো, তারপর বৃটিশ রেসিং গ্রিন, তারপর বালগেরিয়ান রোজ, তারপর ডার্ক জাঙ্গল গ্রীন, তারপর নেভি ব্লু, তারপর কেপ্রি আর শেষে আকাশি। তুমি ভাবছ আমি হিব্রু বলছি, না না, আমি রঙ চিনতে ভালবাসি। বলতে পারো এটাই আমার হবি। আচ্ছা, তুমি মেঘ দেখা খেলাটা জানো? সেই আকাশের মেঘ দেখে একটা কোনো অবয়ব গেস করা? খুব ক্লিশে। কিন্তু আমার খুব প্রিয় খেলা। আমি খুব আঁতেল না? বা খুব ছেলেমানুষ? সূর্য্যটা এখন ক্যাডমিয়াম অরেঞ্জ হয়েছে। তার ছটা বেরোনো শুরু করে দিয়েছে। তার উপরেই একটা মেঘ যেটাকে দেখতে ঠিক কত্থকলি ড্যান্সারদের মুকুটটার মতন। কী অদ্ভুত না? ঠিক যেমন অদ্ভুত আমার এসএমএস’টারও এতটা বড় হয়ে যাওয়া। যাই হোক, আমাদের রাত আর সকালটা প্রায় একই রকম কাটল...’

৩)
ঈশ্বরের সাথে বসে গাজা খাওয়া যায়,
আমি খেয়ে দেখেছি।
কপালে ক্ষতচিহ্ন নিয়ে সে আমাকে নাস্তিক হতে শেখায়,
আমি মানিনা, তবু,
ঈশ্বরকে চুমু খাওয়া যায়,
আমি খেয়ে দেখেছি...

- সৌম্যদা, আমার অবস্থা যাতা খারাপ। তুমি বিশ্বাসই করতে পারবেনা। অনলাইন এলে পিং কোর।
- আছি। চ্যাট অফ করা। আবার কী ছড়ালি?
- আমি প্রেমে পড়েছি। পড়েছি মানে মারাত্মক পড়েছি। সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে।
- সেতো তোর হরদমের কেস। নিশ্চয়ই প্রচন্ড বাজে দেখতে একটা মেয়ে।
- আমি আমার জন্মের পর থেকে ওর মতন সুন্দর মেয়ে আর দেখিনি।
- ছাড়, তোর চয়েস বোঝা আছে। এর আগে যে একটা মেয়েকে দেখে এই কথাটা বলেছিলি, তাকে দেখতে অবিকল আমার স্কুলের সুখেন স্যরের মতন ছিল।
- তোমার তো কাউকেই সুন্দর লাগেনা নিজেকে ছাড়া।
- ঠিক বলেছিস। আমি মারাত্মক নার্সিসাস।
- দেখাটা বড় কথা নয়, আসল কথা হচ্ছে জানো ত, আমার এতদিন ধারণা ছিল, মেয়েরা, অন্তত আমাদের বয়েসী মেয়েরা, টেডি বিয়ার, নেলপালিশ আর বয়ফ্রেন্ডের বাইক, এর বাইরে কোনোদিন বেরতেই পারেনা। তাই মেয়েদের আমার শুধু একটা সেক্স অবজেক্ট ছাড়া কিছুই মনে হয়নি এতদিন। এই মেয়েটার সাথে দেখা হওয়ার পর, আমি মানে, কি বলব, আই ফেল্ট দ্যাট, যেন ঈশ্বরকে দেখতে পেলাম সামনে। যেন সে আমার যত অহঙ্কার, আত্মতুষ্টি আর হিরোইজমকে পা দিয়ে পিঁষে আমাকে ল্যাংটো করে বলল, এই দ্যাখ, এটা হচ্ছিস আসলে তুই। আমার ভরং এর পোশাকটা ছিড়ে ফেলে দিল ছুড়ে।
- ইউ হ্যাড সেক্স উইদ হার?
- ধ্যাত, খালি ইয়ার্কি। না। বাট আই কিসড্‌...
- ধ্যাত। একটা গাধা তুই। কিস করেছিলিস মানে সেক্সেরও চান্স ছিল। করে দিতিস। দ্যন ঝামেলা ভাগাতিস। বৃষ্টি কেমন আছে?
- আমি ওকে ছেড়ে দিয়েছি সৌম্যদা।
- ওয়াট? তুই কী পাগল? তাতিন তুই কী সিরিয়াসলি বলছিলিস এতক্ষণ কথাগুলো? কী হয়েছে কী তোর? তুই আর বৃষ্টি চার বছর ধরে একসাথে আছিস। আর একটা দুইদিনের আলাপের মেয়ের জন্য তুই...
- জানো সৌম্যদা, ওকে প্রথমবার যখন দেখি, আমার খুব হাসি পেয়েছিল। পুঁচকে একটা আঁতেল মেয়ে। সবে এই কবিতা, গল্প, উত্তরাধুনিকতা ইত্যাদি বালামোর স্বাদ পেয়েছে। নন্দনে যেগুলোকে দেখা যায়। সাহিত্য না হাতি, সব ফোকটে চা আর চরস খেতে আসে। কপালে আবার একটা সেলাই এর দাগ। আমি হেসে জিজ্ঞেস করেছিলাম, খুব শান্ত তো তুই? তখন কিছু বলেনি। পরে কী জানলাম জানো, ও ওর প্রেমিকের সাথে গল্প করছিল স্টেশনে, ট্রেন আসায় লাইনের উপর পড়ে থাকা একটা পাথর ছিটকে এসে লাগে ওদের গায়ে। ওর প্রেমিক স্পট ডেড, ও বেঁচে যায়। দাগটা থেকে যায় শুধু...
- ওয়াটেভার তাতিন। আমি বৃষ্টিকে বোনের মতন দেখতাম। তুই যা যা করিস, সেম যদি আমার বোনের প্রেমিক করত ওর সাথে, তবে আমি তোকে পাথর দিয়ে মাথা ফাটিয়ে তোর ওই আঁতেল মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড যে স্টেশনে মরেছিল, সেই রেললাইনে ট্রেন চাপা দিয়ে মারতাম।
- জানো সৌম্যদা, আমি ওকে বলেছিলাম, তোর কপালে একটা চুমু খাবো? ও বলেছিল, প্রেমে পড়বেনা তো?
- এইসবের কোনো মানে হয়না। তুই এখন ঘোরে আছিস। তুই কিছু বুঝবিইনা এখন।
- জানো সৌম্যদা, আমি খুব খারাপ ছেলে। বাট ওর সাথে দেখা হয়ে বুঝলাম, ভাল হওয়া কাকে বলে। আমাকে ভাল হতে হবে জানো তো। খুব ভাল ছেলে হতে হবে।
- আমার অসহ্য লাগছে তাতিন। গত পাঁচ বছরের বন্ধুত্বে এই প্রথম, আমার তোকে জাস্ট অসহ্য লাগছে। বাই...


৪)
“একটা কথা কী জানো? মানুষও পশু। মানুষ পশু ছাড়া আর কিচ্ছু নয়। আমরাও খাই, ঘুমাই, বর্জ্য ত্যাগ করি, বংশবিস্তার করি, মারা যাই, এইসব কিছু একটা হ্যামিংটন পাখিও করে। তবে বল তো? মানুষ আর দশটা পশুর থেকে কোথায় আলাদা?”
“কোথায়?”
“মানুষ ছাড়া আর কেউ আদর করতে জানেনা। মানুষ ছাড়া আর কেউ স্বপ্ন দেখতে জানেনা। ওই যে মেঘটা দেখছ, ওটাকে দেখতে পুরো নেলকাটারের মতন।”
“হ্যা, ওই তো ক্লিপটা। ওই তো, ফাইলের জায়গাটা...”
“এটা কিন্তু আশ্চর্য্য।”
“কোনটা?”
“এই যে, আমি আর তুমি একই অবয়ব দেখতে পারি মেঘের। কখনও দুটো মানুষ একই মেঘ চিনতে পারেনা...”
“হুমম্‌, আমি আগেও দেখেছি। তোর আর আমার ব্রেইনের ওয়েভলেন্থ পুরো এক। অনেকবারই দেখেছি, আমি কোনো কথা বলতে যাচ্ছি, ঠিক সেই কথাটা, একদম সেম, তুই বলে দিলি।”
“কারেক্ট। ঠিক এটাই আমিও খেয়াল করেছি। যাতা কিন্তু। আমি ভাবতাম, এটা কোয়েন্সিডেন্স। এখন দেখছি এক। কি যাতা ব্যাপার...”
“এটাকে বলে ‘হাইভমাইন্ড’। পৃথিবীতে এক কোটি মানুষের মধ্যে দুটো মানুষ এরকম হয়। এটা নিয়ে আমার একটা গল্পও আছে...”
“দারুণ কিন্তু। মানে সেই দুজন যেখানে কোনোদিন চিনতেও পারেনা একে অপরকে, সম্ভাবনাই থাকেনা, সেখানে আমরা প্রেম করছি। ফাটাফাটি।”
“তোর এই মেঘ মেঘ খেলার মতন আমারও খুব বোকা বোকা একটা খেলা আছে জানিস।”
“তাই? কী শুনি। আমার বোকা বোকা খেলা খুব ভাল লাগে...”
“আমার মনে হয়, এই সারা কলকাতাটা একটা দাবার বোর্ড। ঠিক দাবাও নয়, একটা অদ্ভুত নকশার ছক আঁকা একটা শহর। যেখানে প্রতি পদক্ষেপে আমাকে সেই ছকের দাগগুলোকে এড়িয়ে হাঁটতে হবে। মানে যেন একটা ভিডিও গেম। ঠিক বোঝাতে পারছিনা। ছাড় বাদ দে।”
“তুমি জানো তাতিনদা, তুমি একটা অসাধারণ মানুষ। আমি আশাও করিনি কোনোদিন যে তোমাকে আমি পাব। আমি পুরোটা তোমার মতন হতে চাই। যেন তুমি আমার আয়নার মতন হও...”
“আমি খুব খারাপ রে। বিশ্বাস কর। বাট আমি ভাল হয়ে যাব। খুব ভাল হয়ে যাব...”
“আচ্ছা। হোও। এখন আমার কাছে আস। আরেকটু। উমম...”
“তুই জানিস পিটবুল শুধু সিঙ্গার না, একটা কুকুরেরও জাতের নাম? আমার খুব ইচ্ছে ওই কুকুরটাকে পুষি।”
“নাহ্‌, আমরা কুকুর পুষবনা। আমার খেয়েদেয়ে কাজ নেই। ওসব যন্ত্রণা ঘরে আনলে তুমি দায়িত্ব নেবে।”
“প্লিজ, এমন কথাবার্তা বলিসনা যাতে তোকে আমার নিষ্ঠুর মনে হয়। সৌম্যদা বলে, ভগবানের শ্রেষ্ট সৃষ্টি আসলে মানুষ না, কুকুর...”
“দেখা যাবে। এখন আমাকে আদর কর। তুমি বানানো খেলা খেলতে জানো?”
“সেটা কেমন?”
“এই ধর, আমি একটা রাজপ্রাসাদের রাজকন্যা, আমার সোনালী রঙের বিশাল বড় চুল। যাতে হাত দিলে সব রোগ সেরে যায়। তুমি হলে একটা চোর, যে রাজার মুকুট চুরি করেছে...তারপর...”


৫)
- সৌম্যদা, খুব অবস্থা খারাপ।
- কী হয়েছে? আবার তোরা ঝগড়া করেছিস?
- না, তার থেকে অনেক বড় বিষয়।
- আরে কী বলবি তো?
- শি ইজ প্রেগন্যান্ট...
- ওয়াট? আর ইউ ফাকিং কিডিং মি?
- আমি বুঝিনি। মানে, কি বলব? এখন কী করব আমি?
- তাতিন তুই জানিস তুই কী করে চলেছিস? রোজ তোদের ঝগড়া। ওর বাবা মা, তোর বাবা মা, সবাই তোদের জন্য অতিষ্ট হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন কান্নাকাটি, অভিমান, ব্রেক আপ ইত্যাদি লেগেই আছে তোদের মধ্যে। না ও পড়াশুনা করছে, না তুই একটা ভাল চাকরী খুঁজছিস। তোর লেখালিখির কথা তো বাদই দিলাম। সেতো কবেই ভোগে গেছে। সারাদিন একসাথে থাকছিস। মা বাবার কথা একবার ভেবে দেখেছিস তুই? এরপর এই ঘটনা। জীবনটা নিয়ে ছেলেখেলা করছিস তুই।
- আই অ্যাম স্যরি সৌম্যদা। বাট এখন কি করব...
- আর কী! আবোর্শন করাতে হবে। তোর কাছে নিশ্চয়ই টাকা নেই। থাকবে কী করে অমন উশৃঙ্খল জীবনযাপন করলে। ঠিক আছে। আমি দেখছি। তুই সামলা ওকে।
- আমি শোধ করে দেব সৌম্যদা। তুমি একটু হেল্প কর।
- তুই আমার ভাই তাতিন। বাট, এখনও টাইম আছে। শুধরে যা। সেদিন শুনলাম, ওর গায়েও হাত তুলেছিলি তুই।
- হুমম্‌। কিছু বিষয় আছে সৌম্যদা, আমি মানতে পারিনা। চেষ্টা করছি। তাও পারছিনা।
- তুই জানিস, কারা মেয়েদের গায়ে হাত তোলে? পৃথিবীর সবথেকে খারাপ পুরুষরা।
- জানি সৌম্যদা।
- ভালো হ তাতিন, ভাল হ।
- হয়ে যাব সৌম্যদা। হয়ে যাব...



৬)
“আরে কাঁদছিস কেন? কী হয়েছে? বল আমাকে।”
“আজ চার মাস হল।”
“ওহ্‌। ভাবিসনা। এটা ভাব, তখন ওকে জন্ম দিলে, ও খুব খারাপ একটা পৃথিবী দেখত। দেখত, ওর বাবা মা সারাদিন ঝগড়া করে, মারপিট করে, নেশা করে। না ভাল খাবার দিতে পারতাম ওর মুখে। না সুন্দর একটা জীবন দিতে পারতাম। যখন ওর আসার সময় হবে, তখন আমাদের থাকবে একটা সুন্দর ঘুছানো সংসার। আমাদের দুজনের একটা স্টেডি কেরিয়ার, একটা বড় বাড়ি, ভবিষ্যতের কোনো চিন্তা থাকবেনা মাথায়। ওকে ভাল স্কুলে পাঠাতে পারব। পুষ্টিকর খাবার দিতে পারব। একটা দারুণ জীবন, যা আমরা পাইনি আমাদের ছোটবেলায়।”
“তাতিনদা, একটা সত্যি কথা বলবে? তুমি কী সত্যিই এতটা বদলে গেছ? নাকি আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছিলাম তাই অভিনয় করছ?”
“তুই খেয়াল করিসনি, আমি একবারে বদলাইনি, আস্তে আস্তে বদলেছি। একটু সময় লেগেছে। তবু বদলেছি। তুইও নিজের কথা ভেবে দ্যাখ। এক বছর আগে যেই মেয়েটার প্রেমে আমি পড়েছিলাম, যে জীবন মানে শুধু ফুর্তি করা ছাড়া আর কিছু ভাবতনা, যে আমাকে পছন্দই করেছিল আমার উশৃঙ্খল জীবনযাপন দেখে, সে আমাকে আজ শেখালো কিভাবে বাঁচতে হয়। তুইও কী একবারে বদলেছিস? তোরও সময় লেগেছে। আমারও লাগল।
“হুমম। আচ্ছা আমি রাখছি।“”
“কেন কী হয়েছে? ঝামেলা শুনছি পিছনে...”
“আর কি। সেই এক গল্প মায়ের।”
“ওহ্‌, আমার সাথে কথা বলছিস তাই।”
“ছাড়ো।”
“একদিন ঠিক বুঝবে ওরা। যে আমি বদলে গেছি। বুঝবে, যে আমি তোকে ভীষণ ভালবাসি। কাল সকালে আমার সাথে বেরোবি রে? অনেকদিন তোকে দেখিনা। অনেকদিন ছকে বাঁধা কলকাতাকে পায়ে পায়ে হারাইনা...”
“দেখছি। এখন রাখছি। টাটা...”

৭)

“মানে আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা। ও তোকে ছেড়ে দিল? যে মেয়েটা তোকে ছাড়া নিশ্বাস অবধি নেওয়ার কথা ভাবতনা! মানে, আমি জাস্ট...ভাবতেও পারছিনা। তোদের দুজনকে আলাদা করে। বাট কেন?”
“জানিস, যেদিন ওর আবোর্শনটা হল, নার্স আমাকে ডেকে বলেছিল, প্রোডাক্টটা দেখবে? আমি পারিনি দেখতে। খুব কান্না পেয়েছিল। খুব বলতে ইচ্ছে করছিল, দ্যাট ইস নট আ প্রোডাক্ট। দ্যাটস মাই চাইল্ড। কী হাস্যকর বল। যার জন্য এত ঝামেলা হল, তার কথা ভাবলেই সবথেকে বেশি কষ্ট হয়।”
“সে কথা ছাড়। বাট ও বলল কী?”
“কিছুইনা। বলল যে, ও জানে আমি ওকে খুব ভালবাসি, আমি বদলে গেছি, ভাল হয়ে গেছি। বাট ও এখন ওর কেরিয়ার নিয়ে ভাবতে চায়। আমার জন্য ওর ফ্যামিলিতে চাপ হচ্ছে, পড়াশুনাতে চাপ হচ্ছে, ও পারবেনা আর...”
“তাতিন প্লিজ, ও তোর সাথে মেশার আগে কেমন ছিল আমি জানি, গত এক বছরেই তো ও বদলালো। এখন কেরিয়ারের কথা মারাচ্ছে...”
“তাতে কী? ওর সাথে মেশার আগে আমি কী ছিলাম তাও তো আমি জানি। আমিও তো ওর সাথে মিশেই বদলালাম। ওর উপর আমার আর একটুও রাগ নেই।”
“চুপ কর। ও তোকে আসলে কোনোদিন ভালইবাসেনি। তুই এক বছর জীবনের নষ্ট করলি পুরো। এমন স্বার্থপর কেউ হতে পারে ভাবিইনি। সবাই ওকে জাস্ট গালাগালি দিচ্ছে। ও যা করল তোর সাথে, কোনো পশুও করতে পারেনা।”
“মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্য কোথায় জানিস? পশুরা শুধু বাঁচতে জানে। আর মানুষ ভাবে জীবনটা শুধু মায়া...”
“তুই আবার গাঁজা খাওয়া ধরেছিস?”
“নাহ্‌, গাঁজা খাইনা প্রায় এক বছর হয়ে গেল। কারণটা অন্য। শুনবি?”
“বলে ফ্যাল...”
“কারণটা হল, মানুষের জীবনে ভাল আর বাজে এই বিষয় দুটো এতটাই আপেক্ষিক, যে সেটাকে অনুভব করার ক্ষমতা মানুষেরও নেই। আমি নিজেই জানিনা, আমি কখন ভাল ছিলাম, কখন বাজে, শুধু এটুকু জানি, জীবনটা লুপের মতন। আজ যাই চলে যায়, কাল ঠিক একইভাবে ফিরে আসে। আজ দুঃখ পাচ্ছি। কাল আবার ভীষণ খুশি থাকব। আবার দুঃখ পাব। দুঃখ আর খুশির জন্য কোনো অবলম্বন লাগেনা। ওই অবলম্বনটুকুই হল মায়া। বাকিটা বাস্তব। আমি ভালও নই, খারাপও নই, আমি এমন একটা মানুষ যে ছকে হাঁটতে গিয়ে রাস্তা হারিয়েছে শুধু। সেই ছক ধরেই আবার ফিরে আসব ঠিক একদিন। কোনো প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে আবার দেখা হবে ওর সাথে, আমি হাসব, তারপর কোনো অ্যাসাইনমেন্টের কথা ভাবতে ভাবতে হেঁটে চলে যাব সামনে। এটুকুই। যেমনটা হয়। শুধু তখন মাথার উপর নানান রঙের আকাশে একটা আইসক্রিমের মতন দেখতে মেঘের টুকরো থাকবে, পায়ের নীচে ছক কাটা কলকাতা আর একটা মৃত শিশুর গায়ের গন্ধ। ব্যস, আর কিচ্ছুনা...


আপনার মতামত জানান