প্রলয় সাহার হিয়ারিং এইড

অভীক দত্ত
প্রলয় সাহা সামনের মুদিখানার দোকানে একটা ব্যাগ নিয়ে ঢুকলেন।
“যারা মনে করেন ওই বুড়ো প্রলয় সাহা আসলে কানে শুনতে পান না, তারা আসলে জানেই না প্রলয় সাহা সবই শুনতে পায় কিন্তু না শোনার ভান করে থাকে”।
সেদিকে তাকিয়ে বিজ্ঞের মত কথাটা বলে চায়ে চুমুক দিলেন বাবু বৈরাগী। তার পাশে বসে কিশোর তন্তুবাই বললেন “তুমি কিছুই জানো না, খালি বড় বড় কথা। প্রলয় সাহার হিয়ারিং এড কিনতে আমি গেছিলাম কলকাতায়। আমাকেই নিয়ে গিয়েছিল। গোটা বনগাঁ লোকালে আমি খিস্তি দিতে দিতে নিয়ে গেছি প্রলয় সাহাকে কিন্তু কিছুই শুনতে পায় নি। বললে হবে হে?”
বাবু বৈরাগী বড় বড় চোখ করে কিশোর তন্তুবাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন “খিস্তি দিয়েছিলে কেন?”
কিশোর তন্তুবাই তার পাশের গোবিন্দ লোধের থেকে একটা বিড়ি নিয়ে সেটাতে মন দিয়ে অগ্নিসংযোগ করতে করতে আনমনে বললেন “খিস্তি দেব না? আমার বউয়ের ভাইঝির শ্বশুর হয় তো! মানে আমার শালার মেয়ের শ্বশুর বুঝলে কীনা! ঘর খোলা দেখে বুড়ো আটকে দিয়ে বাইরে বসে বিড়ি খাচ্ছিল। ভাইঝি শুয়েছিল টের পায় নি। ঘুম থেকে উঠে শালার মেয়ে তো ডেকে ডেকে হদ্দ। শালা তখন হরিদ্বার গেছে। আমার বউকে ফোন করতে বউ আমায় পাঠাল। আমি গিয়ে পৌঁছতে দেখি শালার মেয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে হেদিয়ে পড়েছে আর প্রলয় সাহা তামুক খাচ্ছে বাড়ির বাইরের বারান্দায় বসে। তারপরেই তো বউ জোর করে আমাকে দিয়ে বুড়োর জন্য একখান হিয়ারিং এড কেনাল। সে কলকাতা নিয়ে গিয়ে বুড়োকে গ্যাঁটের টাকা খরচা করে মেশিন কিনে দিতে হল। রাগ থাকবে না বলছ?”
চায়ের দোকানী বিশু চা ঢালতে ঢালতে গম্ভীর হয়ে বলল “আপনি কিছুই জানেন না কাকা। ওই বুড়োর মত ঢ্যামনা বুড়ো খুব কম আছে। দেখুন গে ওনার বউমা সেদিন রান্নায় নুন বেশি দিয়েছিল তাই চুপচাপ দরজা বন্ধ করে তামাশা দেখছিল”।
কিশোর তন্তুবাইয়ের কাছ থেকে বিশু পঞ্চান্ন টাকা পায়। পকেটে টাকা ছিল না। তাই কিশোর বিশুকে খেঁকিয়ে উঠলেন না। শুধু উদাস গলায় বললেন “অত কী বুঝি রে ভাই, শুধু ট্রেনে সেদিন বুড়োর বাপের শ্রাদ্ধ করে দেওয়ার পরেও বুড়ো আমায় কলকাতায় গিয়ে গুড়ের সন্দেশ খাইয়েছেল। এ থেকেই ঠাহর হয় বুড়ো আসলে কানে শুনতে পায় না। যা সব মাগমারানি ছাগমারানি বলেছিলাম সেসব স্বকর্ণে শুনে কি কেউ আর পকেটের টাকা খরচা করে মিষ্টি খাওয়ায় রে ভাই?”
বাবু বৈরাগী চায়ের কাপটা বেঞ্চির তলায় রাখতে রাখতে বললেন “সেরকম ঢ্যামনা লোকের পাল্লায় তো পড় নি, তাই বোঝ নি। সেদিন সারারাস্তাই বুড়ো তোমার গালাগাল শুনেও তোমাকে খাইয়েছে। ওর ধান্দাতেই তো গেছিলে নাকি? নিজের ধান্দাতে তো আর যাও নি? হিয়ারিং এডের টাকা কে দিয়েছিল? তোমার পেছন মেরেই তো...”
এই অবধি কানে এসেছিল সুবলের। বিশুর দোকানে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল সে।
এই সময় সবাইকে চমকে দিয়ে চারদিক দুলে উঠল। বিশুর চায়ের সরঞ্জাম দুলে উঠল, কিশোর তন্তুবাইয়ের বিড়ি হাত থেকে পড়ে গেল, বাবু বৈরাগীর চায়ের চশমা নড়ে গেল, আশে পাশের সব দোকান কেউ কিছু বুঝবার আগেই চারদিক থেকে “ভূমিকম্প” “ভূমিকম্প” রব শোনা যেতে লাগল।
দু সেকেন্ড নড়েছিল, তারপর আবার চারদিক ঠান্ডা হয়ে গেল। কিন্তু এই দু সেকেন্ডের তীব্রতা যথেষ্ট ছিল। সবাই রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। সুবল দেখল প্রলয় সাহা আর কিশোর তন্তুবাই জুবু থুবু হয়ে পাশাপাশি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে বাজারের ব্যাগ প্রলয় সাহার। কিশোর তন্তুবাই জোরে জোরে “দুগগা দুগগা” বলতে লাগলেন, প্রলয় সাহার কোনদিকেই হুশ নেই, বেশ খানিকক্ষণ পরে কিশোর তন্তুবাইয়ের দিকে তাকিয়ে প্রলয় সাহা বললেন “এখন সবই শুনতে পাচ্ছি হে, ভূমিকম্পের ফলেই হয়ত। হিয়ারিং এডটা কেনার আগে ভূমিকম্পটা হয়ে গেলে তোমার টাকাটা বেঁচে যেত যা বুঝছি”।
কিশোর তন্তুবাই বেশ খানিকক্ষণ প্রলয় সাহার দিকে তাকিয়ে বললেন “আরেকবার ভূমিকম্প হলে তো আবার শুনতে পাবেন না তখন?”
রাস্তায় ততক্ষণে হরিনাম সংকীর্তন পার্টি নেমে পড়েছে...

আপনার মতামত জানান