গুহাচিত্র

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়
এদিকটা দিনের বেলা মোটামুটি আলো আসে, কিন্তু রোদ বাড়লে তেতে ওঠে না। বরং রোদ না এলে কেমন স্যাঁতস্যাঁতে।
জায়গাটার খোঁজ আমিই করেছিলাম। আগে যেখানে থাকতাম সেখানে নেকড়ে বাঘ আর সাপের উৎপাৎ খুব। এখানেও বিছে আছে, সাপও আসে... তবে অত বেশি নয়। সে বার ঝোপঝাড় থেকে পাতা আর শেকড় তুলতে গিয়ে খ্রোঁ-এর মা মরল সাপের কামড় খেয়ে। একদম নীল হয়ে গেছিল। কয়েক দিন ধরে ধরে সাপের মাথা থ্যাঁতলানো হ'ল। তারপর আর পোষালো না, এদিকে এসে দেখলাম জায়গাটা মন্দ না... বাকিরাও একে একে চলে এলো এইদিকেই। নিচের জঙ্গল ফাঁকা। মানে দু’পেয়ে আর নেই ওদিকটায়।

পাহাড়ের পায়ের কাছে অনেক নুড়ি পাথর। সেই দিয়েই অনেক কাজের কাজ হয়। কটা জড়ো করে ভাল করে ঘষে ঘষে ধারালো, ছুঁচলো করা হ’ল। কতগুলো ঘষে ঘষে শুকনো পাতায় জ্বলল আগুন। আগুন থাকলে বেশ ভরসা হয়। একটা আলাদা সাহস আসে। রাতগুলোও আর অত লম্বা লাগে না আগের মত, অত ঠাণ্ডা মনে হয় না। শিঁহ্‌ আগুন দেখলে ভয় পায়। ওর মেঘ ডাকলেও ভয়, বিদ্যুৎ চমকালেও ভয়, ঝড় উঠলেও... ওর ভয়টাকেই যেন বেশি করে আঁকড়ে ধরতে চায় কেউ কেউ, যেভাবে ও আঁকড়ে ধরে থাকে ভয়কে। আগুন দেখলে কেমন কাছে সরে সরে আসে ভয়ে... ওকে তখন আগুন থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে হয়। তখন তাপের জন্য আর আগুন লাগে না। সকালে পাতা আর কাঠের ছাই পড়ে থাকে, আর এক কোণে শিঁহ্ও‌ ঘুমিয়ে থাকে ছাই হয়।

ঘাঁক খুব ভাল শিকার করতে পারে। একদম বনবেড়ালের মত আসতে আসতে পা ফেলে, জঙ্গলের একটা পাতাও নড়ে শব্দ হবে না ও এগোলে। কিছুদিন হ’ল, বেশ কায়দা করে গাছের ডালে সুকনো লতা বেঁধে কি একটা বানিয়েছে। তাতে ছুঁচলো সরু ডাল আটকে টেনে ছুঁড়লে অনেকটা দূরে গিয়ে পড়ে সাঁ করে। ছোটখাটো পাখি বা জানোয়ার হলে একদম বিঁধে যায়। আমাকে শেখাতে এসেছিল, আমিও বেশ ছুঁড়তে পারছিলাম। তবে যেখানে ছুঁড়ছিলাম সেখানে না গিয়ে অন্য কোথাও পড়ছিল উড়ে গিয়ে। আমার এই ছুঁচলো আর চ্যাপটা পাথর গুলোই ভাল। বেশ দড়াম করে বসিয়ে দেওয়া যায়... সে ইঁদুর হোক, খরগোশ হোক, সাপ-ব্যাঙ যাই হোক। একটা লম্বা ডালের সঙ্গে আটকে নিয়ে ঘুরিয়ে মারলে আরও জোরে লাগে, এক বারেই খেল খতম। ঘাঁকের ছোঁড়া সরু ডাল বিঁধে যায়, আর আমি গিয়ে দড়াম করে পাথর বসিয়ে দিই। বেশ চলছিল আমাদের একসাথে শিকার। তারপর একদিন হঠাৎ শিকারের যাওয়ার সময় ঝামেলা হ’ল। পাথরের ওপর পাতা আর ফুলের রস বেটে শিঁহ্‌ আর আমার হাতের ছাপ এঁকেছিলাম। বেশ লাগছিল দেখতে। এবার তার পাশে আবার রস বেটে ঘাঁকের দেওয়া ওই সরু ডালের মাথা দিয়ে হাত, পা, মাথা ... বেশ আঁকছিলাম। তারপর যেই শিঁহ্‌-এর উঁচু বুকটা আঁকা শেষ করেছি। কোথা থেকে ঘাঁক এসে হাজির। শিকারে যাওয়ার জন্য ডাকতে এসেছিল, ছবি দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। পাথরের ওপর উঁচু বুক দেখে শিঁহের কথা ভাবল কি না কে জানে। ওর দেওয়া শিকারের ডাল দিয়ে এইসব কেন করছি বলে আমার ওপর চোটপাট শুরু করল। ও একা শিকার করবে, আর দলের বাকিরা ফুর্তি করবে... চলবে না। চেঁচাতে চেঁচাতে চলে গেল। যাওয়ার আগে ডালটা হাঁটু দিয়ে মটকে ভেঙে দিয়ে গেল। আমার আর শিঁহ্‌ কে আঁকা হ’ল না।

এই নতুন জায়গায় আসার পর, আর কোনও সাপ বা নেকড়ের জন্য কেউ মরেনি দলের। তাও একটু মৃত্যু ঘটে গেল।
চার দিন আগে আমারই একটা মোটা পাথর দিয়ে আমারই মাথা থেঁতলে দিয়ে ঘাঁক। ঘুমচ্ছিলাম, কিছু টেরই পেলাম না।
এখন আমাকে মাটিতে পুঁতে রেখেছে একটা বড় গাছের তলায়। মাথাটা মাটির ওপরে বেরিয়ে আছে। আমারই জোগার করা ফুল-পাতার রস, কপালে আর গালে লাগিয়ে কেমন রঙিন করে দিয়েছে মুখটা। একটু দূরে দলের লোকজন এসে মাঝে মাঝে দাঁড়ায়, দূর থেকে দেখে। ঘাঁক আর শিঁহ্‌ ও একসাথে এসে বসে থাকে সূর্য ডোবার ঠিক পর। অন্ধকারকে শিঁহ্‌ ভয় পায়, ঘাঁক ওর হাত ধরে থাকে। আমি এখনও আছি কি নেই... ওরা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। দূর থেকে চেয়ে থাকে রঙিন মুখটার দিকে, যার চোখ দুটো বন্ধই থাকে। আমিও আমার বন্ধ চোখ দুটো দেখি... তার থেকেও বেশি দেখি শিঁহ্‌-এর খোলা বুক... পাথরের আঁকাটা আর শেষ হয় নি।


আপনার মতামত জানান