চিত্রাঙ্গদা

অর্জুন/ অভীক দত্ত
পিসির ঘর থেকে গান ভেসে আসছে “যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে”। বাইরে একফোঁটা ঝড়ের ব্যাপার স্যাপার নেই। তার বদলে ভ্যাপসা গরম। কবে বৃষ্টি আসবে কেউ বলতে পারছে না। সম্ভবত আবহাওয়া দপ্তরের লোকেরাও জানে না।
মা রান্না করছে। গতকালের মত আজও সোয়াবিনের তরকারি খেতে হবে। একটা প্রিয় খাবার দিনের পর দিন খাইয়ে কিভাবে অপ্রিয় করে তুলতে হয় সেটা আমাদের বাড়ি না এলে জানা যাবে না।
বাবা বাজার যেতে পারে নি। পা ভেঙে বাড়িতে পড়ে আছে। সামনের ঘরে বসে বসে সারাদিন ধরে টিভি দেখে যাবে আর কিছুক্ষণ পর পর “মা শোন, মা শোন” বলে আমাকে ডেকে কিছু না কিছু কাজ দিয়ে যাবে। কাজগুলো বড় কিছু না, পেন দেওয়া, কোন বই বের করে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
পিসির ঘর থেকে গানটা ভেসে আসা মানে আজ আবার পিসির মুড অফ থাকবে। দুপুরে খেতে চাইবে না। আমাকে গিয়ে থালা নিয়ে পিসির ঘরে বসে কাকুতি মিনতি করে খাইয়ে আসতে হবে।
কলিং বেল বাজল। আমাকেই যেতে হবে। বাবা যথারীতি বসার ঘর থেকে “দেখ তো মা কে এল” বলে ডাকা শুরু করে দিয়েছে।
আমি বেরোলাম। দরজা খুলে দেখি পাড়ার পিন্টুকাকু। আমাকে দেখে একগাল হাসি হেসে বলল “পিউ, দাদা আছে রে?”
আমি বললাম “এস”।
পিন্টুকাকু হল আমাদের পাড়ার সাংস্কৃতিক বিভাগের সেক্রেটারী। আঁকার শিক্ষক। প্রচুর টিউশনি করে আর প্রতিবছর বড় করে রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করে।
বাবার সামনে বসল পিন্টুকাকু।
বাবা বলল “বল হে পিন্টু, কী খবর?”
পিন্টুকাকু বলল “দাদা, প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও আমরা রবীন্দ্রজয়ন্তীতে ব্রতী হয়েছি”।
আমার হাসি পেয়ে গেল। পিন্টুকাকুর কথাগুলোই এরকম।
বাবা বলল “হ্যাঁ সে তো খুব ভাল কথা, কিন্তু আমি কী করতে পারি? দেখো বাপু, চাঁদা টাদা দিতে বোল না, আমার এখন উইদাউট পে সিজন চলছে”।
পিন্টুকাকু জিভ কেটে বলল “এ মা, দাদা, চাঁদা কে চাইতে এসছে। আমি তো অনুমতি চাইতে এসছি”।
বাবা বলল “অনুমতি? সে আমি দেব কেন? লোকাল কাউন্সিলরের কাছে যাও”।
পিন্টুকাকু বলল “ওহ দাদা, আপনি বুঝছেন না। ফাংশানের অনুমতি না, আমি পিউকে আমাদের অনুষ্ঠানে গানের জন্য নেব, সেটার অনুমতি নিতে এসছি”।
বাবা একবার আমার দিকে আরেকবার পিন্টুকাকুর দিকে তাকিয়ে একটা দ্বিধান্বিত গলায় বলল “পিউকে? ও তো কবে গান ছেড়ে দিয়েছে। ভুলতে বসেছে সব কিছু। কিরে পিউ, শুনছিস পিন্টু কী বলছে?”
আমি শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বললাম “আমি তো সব ছেড়ে দিয়েছি পিন্টুকাকু। জানো তো”।
পিন্টুকাকু একবার আমার দিকে, আরেকবার বাবার দিকে তাকিয়ে করুণ গলায় বলল “দাদা, বিশ্বাস করুন এবার কিচ্ছু করার নেই। মধুদি থাকলে বলতাম না, কিন্তু তিনি এবছর ওই সময় গ্যাংটকে যাবেন। পিউকে না পেলে নৃত্যনাট্যই হবে না। এ বছর চিত্রাঙ্গদা করার কথা তার ওপর”।
বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বলল “কী রে, পারবি?পারলে কর। সেই তো ঘরে থেকে থেকে পাগল হচ্ছিস সারাটা দিন।”
আমি গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। একটু ভেবে বললাম “অতগুলো গান, অনেকদিন প্র্যাকটিস করি না। জানি না কী করব”।
পিন্টুকাকু বলল “ঠিক পারবি। শোন, আজ বিকেল থেকে রিহার্সাল শুরু হবে। তুই আয়। ধীরে ধীরে দেখবি ঠিক হয়ে যাবে। আমরা আছি তো। তোর কোন অসুবিধা হবে না”।
আমি বাবার দিকে তাকালাম। বাবা একটু ভেবে বলল “ঠিক আছে, দেখ যদি হয়, একদিকে ভালই হয়, মেয়েটা যদি আবার গানে ফিরতে পারে”।
পিন্টুকাকুর মুখে হাসি ফুটল। বাবার ভাঙ্গা পা তেই প্রণাম করতে গেল। বাবা হা হা করে উঠল। পিন্টুকাকু জিভ টিভ কেটে হাসিমুখে বেরিয়ে গেল।
বাবা বলল “যা বিকেল থেকে। মনটাও ভাল থাকবে”।
আমি কিছু বললাম না। চুপচাপ ঘরে চলে এলাম।
পিসি ওই একটাই গান ইনফাইনাইট লুপে বারবার শুনে চলেছে।
২।
পিন্টুকাকুর বাড়িটা খুব বড় না, কিন্তু বারান্দাটা বড়, ওখানেই রিহার্সাল হয়।
আমি যখন পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা হবে হবে।
পিন্টুকাকু আমায় দেখেই হৈ হৈ করে উঠল, “ওই তো পিউ এসে গেছে”।
আমার লজ্জা লাগছিল। প্রায় তিন বছর হয়ে গেল পিন্টুকাকুর ফাংশানে গাই না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রিহার্সাল শুরু হল। পিয়ালীদি নাচের ইন্সট্রাকটার। প্রথমটা কোরাস হচ্ছিল। সবার সঙ্গে আমিও গলা মেলালাম। বাড়ির দম বন্ধ করা পরিবেশে থাকতে থাকতে এতদিন পর এখানে এসে নিজেকে মুক্ত মনে হচ্ছিল। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিলাম।
খানিকক্ষণ পর একটা ছেলে এসে বসল। পিন্টুকাকু চেঁচিয়ে উঠল “এই তো আমার অর্জুন চলে এসছে। এই যে চিত্রাঙ্গদা, তোমার অর্জুন চলে এসছে”।
সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
আমি তাকালাম। কিছু বললাম না। আমি তো শুধু গান গাইতে এসছি এখানে। পিন্টুকাকু সবাইকে ধমক দিল “হাসার কী আছে এত? ওর গান শুনেছ? শুরু কর তো অর্জুন। পিউ তুই হারমোনিয়ামটা নে”।
আমি এতক্ষণ কোরাসে গাইছিলাম। এখন একটু সংকুচিত হলাম।
হারমোনিয়ামটা বেণুদা বাজাচ্ছিল। ওর থেকে নিজের কাছে নিলাম। অনেক দিন পরে মনে হল নিজের কাছে ফিরে গেলাম।
একটু অপেক্ষা করে স্কেলটা ধরলাম, ছেলেটার মধ্যে যেন একটা পরিবর্তন এল, খোলা গলায় শুরু করল “অহো কী দুঃসহ স্পর্ধা, অর্জুনে যে করে অশ্রদ্ধা...”!
অর্জুন বনে বিশ্রাম নিচ্ছিল। সেই সময় চিত্রাঙ্গদার এক সহচরী তাকে তাড়না করলে অর্জুন রেগে গিয়ে এই সংলাপ বলেন।
এর পরে চিত্রাঙ্গদার অর্জুনকে দেখে অবাক হবার পালা, আমি গাইলাম “অর্জুন তুমি অর্জুন”!
ছেলেটা চিত্রাঙ্গদা আর তার সহচরীদের প্রতি অর্জুনের সেই অবজ্ঞাভরা অংশটা অবলীলায় গাইল।
“হাহাহাহা বালকের দল, মার কোলে যাও চলে নাই ভয়, অহো কী অদ্ভুত কৌতুক”!
পিন্টুকাকু খুশি হয়ে মেঝেতে একটা বাড়ি মেরে বলল “তবে! হবে না মানে! ফাটিয়ে দিয়েছিস তোরা”।
রিহার্সাল শেষ হতে হতে সাড়ে আটটা বাজল। আমাদের পাড়ার বুল্টি আর পূজার সাথে ফিরছিলাম। খানিকটা এগোতেই দেখলাম একটা সাইকেল আমাদের ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে। চিনতে পারলাম। অর্জুন। ছেলেটা খানিকটা এগিয়ে ফিরে এল। আমাকে বলল “আপনাদের এগিয়ে দিতে হবে?”
আমি হাসলাম “না না, কাছেই আমাদের বাড়ি। আপনি চলে যান”।
ছেলেটা একটু ইতস্তত করে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেল।
বুল্টি আমাকে বলল “পিউদি, তোমার জন্য ফিরে এল দেখলে?”
আমি বুল্টির দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বললাম “এ ধরণের কথা আমার সঙ্গে না বললেই ভাল হয় সেটা জানিস নিশ্চয়ই”।
বুল্টি থতমত খেয়ে চুপ করে গেল। পূজা বুল্টির কথা শুনে হাসছিল। ও থেমে গেল সঙ্গে সঙ্গে। বাকি রাস্তাটা গম্ভীর হয়েই ফিরলাম।
৩।
একটা বাড়িতে একই দিনে যে পরপর বিপর্যয় নেমে আসতে পারে সেটা আমাদের বাড়ি না এলে কেউ জানতে পারত না।
তিন বছর আগের মে মাস। আমার বিয়ে ঠিক। পিসির ছেলে বাবলুদা আর আমার দাদা, কলেজ স্ট্রীট গেছিল বিয়ের কার্ড করাতে। আমারই বায়না ছিল কার্ড যেন কলকাতা থেকে হয়। সেদিনটা খুব গরম পড়েছিল। বিকেলের দিকে ঈশান কোণে মেঘ করে এসছে। কালবৈশাখী যে কোন সময় শুরু হয়ে যেতে পারে।
মা আর পিসি আমায় নিয়ে গয়না দেখতে বসেছে। বাবা অফিসে। পিসেমশাই মারা যাবার পর পিসি আর বাবলুদা আমাদের বাড়িতেই থাকে। ওদের শরিকি বাড়ি। পিসিকে অনেক জ্বালাতন সহ্য করতে হত। বাবা-ই গিয়ে ওদের নিয়ে এসছিল। বাবলুদা তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। তারপর থেকে আমাদের বাড়িতেই ওর বড় হওয়া।
মা আর পিসি পালা করে আমাকে খেপিয়ে যাচ্ছে, এই তো পিউ শ্বশুরবাড়ি গিয়ে আমাদের সব ভুলে যাবি, এই সময় কলিং বেল বাজল। পিসি দরজা খুলে কী শুনল কে জানে, চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল।
বাইরে বেরিয়ে দেখি পাড়ার অনেকেই এসে জড়ো হয়েছে। বাসে করে দাদা আর বাবলুদা ফিরছিল। একটা লরি পিছন থেকে বাসটাকে ধাক্কা মারে। দাদা আর বাবলুদা দুজনেই স্পট ডেড। মা হতভম্ব হয়ে শুধু আমার হাতটা ধরে বারবার বলে যাচ্ছে “ওরে ওরা কী বলছে, বানিয়ে বলছে বল?”
ঠিক সেই সময়েই লোডশেডিং হয়ে গেল। তুমুল বাজ পড়ছে। বাড়ির সামনেটা মুহূর্তের মধ্যে ফাঁকা হয়ে গেল। মা পিসি আর আমি চুপচাপ বসে থাকলাম ছন্নছাড়ার মত।
তার দুদিন পর ছেলের বাবা মা এসে খুব ঠান্ডা গলায় আমাদের বাড়িতে জানিয়ে দিয়ে গেল অপয়া মেয়ে তাদের চাই না। আমার খারাপ লাগে নি। বরং খুশিই হয়েছিলাম তখন। বাড়িতে থাকলে অন্তত মা পিসিকে সামলানো যাবে এ’কথা ভেবেই।
ছেলেটার সঙ্গে আমার ফোনে বেশি কথা হত না। বিয়ের আগে দুবার শুধু দেখা হয়েছিল আমাদের বাড়িতেই।
ওর মা ওসব বলে যাবার পর রাতে ফোন করে ছেলেটা অনেক দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিল বাড়ির অমতে কিছুতেই ও যেতে পারবে না। আমি যেন ওকে ক্ষমা করে দি।
আমি কিছু বলি নি। চুপচাপ ফোনটা কেটে দিয়েছিলাম।
আমাদের বাড়িটা ধীরে ধীরে বদলে গেল। যে বাড়িতে সারাক্ষণ হাসি ঠাট্টা গান বাজনা চলত, সে বাড়িটাই চোখের নিমেষে শ্মশান হয়ে গেল।
একটা গানই চলে শুধু। বাবলুদা একটা হোম থিয়েটার কিনেছিল ব্যবসায় লাভের টাকা জমিয়ে। সেটায় পিসি শুধু দেবব্রত বিশ্বাসের “যে রাতে মোর দুয়ারগুলি” চালিয়ে যায়।
৪।
পিন্টুকাকু আমাদের পাড়ার আদি ও অকৃত্রিম সাংস্কৃতিক লোক। বসন্তোৎসব হোক বা রবীন্দ্রজয়ন্তী, পিন্টুকাকু প্রভাতফেরী করবেই। রবীন্দ্রজয়ন্তীটা হল পিন্টুকাকুর ট্রেডমার্ক।
এমনিতে এলাকার সবাইকে আঁকা শেখায়। কিন্তু রবীন্দ্রজয়ন্তীর সময় একেবারে উঠে পড়ে লাগে। সকাল থেকে আঁকা, গান, নাচ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। বিকেলে ন’টা অবধি তার পুরস্কার বিতরণ হয়ে যায়। তারপর শুরু হয় আসল অনুষ্ঠান।
দু সপ্তাহ আগে থেকে মঞ্চ তৈরি হয়ে গেলেও শেষ মুহূর্তে কিছু না কিছু কাজ থেকেই যাবে।
যেমন একবার অমল ও দইওয়ালা নাটকটা হল। নাটকটা শুরু হয়েছে এমন সময় পিন্টুকাকু স্টেজে ঢুকে “একবার দাঁড়া তো, জানলাটা ঠিক সেটিং হয় নি” বলে পেরেক নিয়ে থারমোকলের জানলা ঠিক করা শুরু করে দিল। সবাই হো হো করে হাসছে। কিন্তু পিন্টুকাকুর ভ্রুক্ষেপ নেই।
গান নাচ ইত্যাদি শেষ হতে হতে রাত সাড়ে এগারোটা বেজে যায়। নৃত্যনাট্য যখন শুরু হয় তখন মোটামুটি রাত বারোটা বাজে। আমাদের পাড়াটা অবশ্য অদ্ভুত। ওই রাত বারোটার সময়ও মাঠভর্তি লোক থাকে।
আগে যখন আমি গাইতাম বাড়িসুদ্ধ লোক চলে আসত মাঠের মধ্যে। দাদা ফটো তুলছে, বাবলুদা রেকর্ড করছে, সে মানে যা তা ব্যাপার একেবারে। রিহার্সাল থেকে ফেরার সময় কোনদিন দাদা, কোনদিন বাবলুদা নিয়ে ফিরত।
এবারে প্রতিদিন রিহার্সাল থেকে ফেরার সময় মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরে আসি। অর্জুন প্রতিদিনই নিয়ম করে সাইকেল নিয়ে প্রথমে এগিয়ে যায়। তারপর আবার ফিরে আসে। দ্বিতীয়দিন থেকে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করে না। চুপচাপ আমাদের বাড়ির সামনে অবধি যায়। আমি বাড়ি ঢুকে গেলে সাইকেলে উঠে চলে যায়।
পূজা আর বুল্টির অবশ্য এই নিয়ে টু শব্দটি বলার আর সাহস হয় নি। পুরো ব্যাপারটারই অদ্ভুত নীরসভাবে পুনরাবৃত্তি হয়ে চলল অনুষ্ঠানের দিন অবধি। রিহার্সালে আমাদের কোন বাড়তি কথা হত না। সময়ও কম থাকত।
পঁচিশে বৈশাখ চলে এল। রাত্রে অনুষ্ঠান। পিসি সকাল থেকে সেই গান চালানো শুরু করে দিয়েছে।
মা রান্নাঘরে কী যে করে যাচ্ছে মা-ই জানে। আমি রান্নাঘরে ঢুকতে গেলেই “তোকে রান্না করতে হবে না, তুই কালো হয়ে যাবি” বলে বকাঝকা শুরু করে। আমি আর কিছু বলি না। রান্না নিয়ে আছে, তাই থাক। সেই ঘটনার পর আমার ব্যাপারে মা কেমন রক্ষণশীল হয়ে গেছে। মার ধারণা রান্না করলেই আমি কালো হয়ে যাব, আর তারপরে আমাকে কেউ বিয়ে করবে না।
বেশ খানিকক্ষণ পরে পা টিপে টিপে পিসির ঘরে ঢুকলাম। পিসি বসে বসে উল বুনে যাচ্ছে। কার জন্য বুনছে পিসিই জানে।
আমি পিসির পাশে গিয়ে বসে ডাকলাম “পিসি”।
“বল”।
“আজ পঁচিশে বৈশাখ”।
পিসি আমার দিকে তাকাল। তারপর বলল “ও”।
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম “আজ আমি গাইব পিসি। চিত্রাঙ্গদা হচ্ছে এবছর। তুমি কিছু বলবে না?”
আমার কথা শুনে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “গাইবার সময় পিউ গায় না যেন, চিত্রাঙ্গদাই যেন গায়। সেটা মনে রাখিস, আর কী?”
আমি বললাম “তুমি আজ অন্য কোন গান শোন না পিসি? ভাল লাগে সব সময় এক গান শুনতে?”
পিসি আমার দিকে একবার তাকিয়ে আবার উলে মনোযোগী হল। বলল “আজ বাবলুর দেওয়া শাড়িটা পরিস”।
৫।
পুরস্কার বিতরণী সাড়ে আটটা নাগাদ শেষ হয়েছে। অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে পৌনে ন’টা নাগাদ। সাড়ে ন’টায় জোরে হাওয়া দিতে শুরু করল। পাড়ার যত বাচ্চারা সবাই স্টেজের সামনে চট পেতে বসেছিল। তারা উঠে দৌড় দিল।
পিন্টুকাকু গম্ভীর মুখে পায়চারি করা শুরু করেছে। বাচ্চাদের বাবা মায়েরা উদ্বিগ্ন মুখে এসে বলে যাচ্ছে, “পিন্টুদা, প্রোগ্রাম বন্ধ করে দিন। ঝড় আসছে”।
পিন্টুকাকু বলল “দ্য শো মাস্ট গো অন। আগে ঝড় আসুক তারপর দেখা যাবে”।
দশটা নাগাদ ঝড় এল। সাথে তুমুল বৃষ্টি।
স্টেজে তখন “এসো শ্যামল সুন্দর” গানের সঙ্গে নাচ চলছিল। প্রকৃতি সম্ভবত এই আকুল আবেদনে সাড়া না দিয়ে পারে নি।
স্টেজটা ভাগ্যিস শক্তপোক্ত করে তৈরী ছিল বলে স্টেজের কোন ক্ষতি হল না। স্টেজের সামনে চট পেতে লোকের বসার জায়গাটা মুহূর্তের মধ্যে এদিক ওদিক হয়ে গেল।
বাকি দর্শক যে যেখানে ছিল বাড়ির দিকে ছুট লাগাল।
নৃত্যনাট্যের নাচের দলের এক মেয়ের অভিভাবক পিন্টুকাকুকে বললেন “ও দাদা, ঝড়ে তো সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল”।
পিন্টু কাকু হেসে বললেন “কতক্ষণ আর হবে? হতে দিন”।
সবাই ব্যাজার মুখে ব্যাকস্টেজে জড়ো সড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। স্টেজের পিছনেই পিন্টুকাকুর বাড়ি। সেখানেও কয়েকজন ছিল। ছাউনি থেকে চুয়ে চুয়ে জল পড়ছিল। অনেকেই তাতে ভিজে যাচ্ছিল।
অর্জুন কয়েকজনকে ছাতা নিয়ে মন্টুকাকুর বাড়ি নিয়ে গেল। আমাকেও নিতে এসছিল আমি বারণ করে দিলাম।
পৌনে এগারোটা নাগাদ বৃষ্টি থামল। একজন দর্শকও নেই।
অভিভাবকরা ভ্যান, টোটো সব ডাকা শুরু করেছে। আমিও বাড়ি যাবার জন্য উঠব উঠব করছি এইসময় পিন্টুকাকু এসে গম্ভীর গলায় বলল “দ্য শো মাস্ট গো অন”।
এক গার্জিয়ান অবাক হয়ে বলল “একটা লোক নেই দেখার মত আর আপনি বলছেন দ্য শো মাস্ট গো অন?”
পিন্টু কাকু মঞ্চে উঠল, এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল “ওই দেখুন, ওই দিদি চলে এসছেন নৃত্যনাট্য দেখার জন্য। আজ শুধু ওনার জন্যই চিত্রাঙ্গদা হবে”।
আমি সামনের দিকে তাকালাম। পিসি কখন চুপচাপ এসে বসে রয়েছে।
দুয়েকজন গাইগুই করছিল পিন্টুকাকুর ধমকের সামনে বিশেষ সুবিধা করতে পারল না।
স্টেজের সামনে যেটুকু জল ছিল সব পরিষ্কার করা শুরু হল।
যখন স্টেজে বসলাম গাইবার জন্য বারবার মনে হচ্ছিল দাদা আর বাবলুদা হয়ত ক্যামেরা নিয়ে কাছাকাছিই আছে, যে কোন সময় এসে ফটো তুলে নিয়ে যাবে। আমি একটু বসেই স্টেজ থেকে নেমে বাইরে চলে এলাম।
অর্জুনের সঙ্গে এতদিন আমার সেভাবে কথা হয় নি। আমাকে নেমে যেতে দেখে আমার পিছন পিছন চলে এসে বলল “কোন সমস্যা হয়েছে?”
আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বললাম “আমি বোধ হয় গাইতে পারব না”।
বাইরে পিসি ছাড়া একটাও লোক নেই ওদিকে পিন্টুকাকু স্টেজ সাজিয়ে চলেছে বলে আমি যে নেমে গেছি সেটা দেখতে পায় নি।
অর্জুন আমার কথা শুনে বলল “এতদিন রিহার্সাল দিলেন আর গাইতে পারবেন না?”
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
অর্জুনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
পিন্টুকাকুর স্টেজ সাজানো হয়ে গেছিল। অর্জুন স্টেজে ওঠার সিড়িতে উঠে বলল “চলুন, শুরু করা যাক, কোই আসুন। অর্জুন ডাকলে চিত্রাঙ্গদার মানা করা বারণ জানেন না?”
আমি অবাক চোখে ছেলেটার দিকে তাকালাম। মনে হল এভাবে কেউ যেন অনেকদিন কোন স্বপ্নের ভিতরে আমাকে ডেকেছে। এই ডাকটা শোনার জন্যই যেন আমি এতদিন অপেক্ষা করেছিলাম।
মন্ত্রমুগ্ধের মত স্টেজে উঠে পড়লাম।
মণিপুরের বনে অর্জুন আর চিত্রাঙ্গদার কাহিনী।
চিত্রাঙ্গদার আত্মোপলব্ধির কাহিনী, সব পুরনো ধ্যান ধ্যারনা ভেঙে মেয়েদের স্বতন্ত্র হতে শেখাবার এক নতুন কাহিনী...
“পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্বে
সে নহি নহি,
হেলা করি রাখিবে পিছে
সে নহি নহি,
যদি পার্শ্বে রাখ মোরে,
সংকটে সম্পদে
সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে
পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে”...
নৃত্যনাট্য যখন শেষ হল তখন হাততালির শব্দে বুঝতে পারলাম যারা বাড়ি চলে গেছিল তারা আবার ফিরে এসেছে। এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। প্রতিটা গান আমার এতদিনের অন্ধকার কাটিয়ে দিচ্ছিল। ঠাকুরের প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করলাম নিজের প্রতি হারিয়ে যাওয়া সমস্ত আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেবার জন্য।
সবাই এসে আমার প্রশংসা করে যাচ্ছিল। অনেকদিন পরে চোখে জল এল আমার। দুঃখে না, আনন্দে।
পিন্টুকাকু খুশি খুশি মুখ করে বলে যেতে লাগল “তবে? হল তো? দেখলেন তো সবাই?”
সব কিছু শেষ হয়ে গেলে স্টেজ থেকে নেমে পিসির কাছে যাবার জন্য বেরোতে যাচ্ছিলাম এই সময় শুনতে পেলাম “যদি চিত্রাঙ্গদার পাশে থাকতে চাই, তাহলে কি তাকে চিনতে পারব?”
দাঁড়ালাম।
চিত্রাঙ্গদা কি অর্জুনের ডাক অমান্য করতে পারে?

আপনার মতামত জানান