লস্যি

অনুপম মুখোপাধ্যায়


দু-হাতে দুটো লস্যির কাপ নিয়ে ভাবলাম, এখন আমাকে সিকি কিমি হাঁটতে হবে। ওই দ্যাখা যায় রাজাদের দূর্গের তোরণ। এককালে ওখানে মল্লরাজাদের সৈনিকরা পাহারা দিত। বর্গীদের আগমনের দিকে নজর রাখত।
এখন আমার বৌ আর মেয়ে একটা সাদা গাড়ির মধ্যে। সামনের জানলায় ড্রাইভারের কনুই।
আজ একখান রোদ উঠেছে বটে! এই চৈত্রমাসেই চাঁদি ফেটে যাচ্ছে। একটা মানত ছিল বলেই এই গরমের মধ্যে আরো গরমের দেশ বিষ্ণুপুরে এসেছিলাম। সেটা সকালের মধ্যেই মিটে গেছল। এখন আমরা আটকে আছি রোদের দাপটে। তেজ একটু না কমলে ফেরার পথ ধরা যাচ্ছে না। আমার মেয়েটা গরম একদম সইতে পারে না। বৌ তো একেবারেই লবেজান হয়ে পড়েছে। কিছু কেনাকাটা হয়েছে এর মধ্যে। বিরাট সাইজের দুটো পোড়ামাটির ঘোড়া কেনা হয়েছে। তিনটে শাড়ি। মেয়ের একটা পুতুল।
মেয়েকে অবিশ্যি লস্যি দেওয়া চলবে না। ওর ঠান্ডায় এলার্জি আছে।
লস্যিওলার সঙ্গে গল্প করছিলাম এতক্ষণ। প্রথমেই নিজে একগ্লাস খেয়ে নিয়েছিলাম। তারপর ও বাকি দুটো গ্লাস বানাচ্ছিল।
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ন্যাড়া হয়েছ কেন?’
‘মা মারা গেল। আজ প্রায় দেড় মাস হয়ে গেল।’
‘কী হয়েছিল?’
‘স্ট্রোক। হার্টফেল করে মারা গেল।’
ওর কন্ঠস্বরের ফাঁকাটা লক্ষ্য করেও আমি ভেবেছিলাম, স্ট্রোক আর হার্টফেল কি একসঙ্গে হতে পারে? কে জানে!
লস্যিওলা বলল, ‘মজার ব্যাপার জানেন, তার আগের দিন আমি বাবার বার্ষিকী করলাম। পরের দিন মা চলে গেল।’
‘আশ্চর্য তো!’
‘হ্যাঁ।’
ওর চোখ এই ঝাঁ ঝাঁ রোদেও একটু সজল মনে হল। আমার কেমন একটু ঠান্ডা লাগল। লস্যির চেয়ে অন্যরকম ঠান্ডা।
লস্যি তৈরি করে বলল, ‘নিয়ে যান চটপট। গরম হয়ে যাবে যেতে-যেতে। গাড়িটা তো একটু নিয়ে এলেই পারতেন।’
আমি টাকা মিটিয়ে গ্লাস দুটো হাতে নিলাম। বললাম, ‘নাঃ ! তাড়াতাড়ি চলে যাবো। মিনিটখানেক লাগবে।’
হাঁটতে শুরু করলাম দড়ির উপর দিয়ে পা চালানোর সাবধানতায়। দেখতে পাচ্ছিলাম একটা গ্লাসে ফেনা বেশি একটায় কম। বেশি ফেনার গ্লাসটা বৌকে দেব।
পিছন থেকে লস্যিওলা হেসে বলল, ‘শীতকালে কফির কাপ অদ্দুর নিয়ে যেতে হলে একটু হলেও জুড়িয়ে যেত। এখন দেখুন, লস্যিটা একটু হলেও তেতে যাবে।’

আপনার মতামত জানান