যখন এসেছিলে

অভীক দত্ত
১।
বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
পাহাড়ে বৃষ্টি (হু, লেখক কদিন আগে পাহাড় থেকে ঘুরে এসছে, পাহাড়ের হ্যাং ওভার কাটে নি তাই এই গল্পও পাহাড়েই শুরু হচ্ছে), কোথাও যাবার অবস্থা নেই।
কুয়াশা আর মেঘে চারদিক ঢেকে আছে।
আঁখি জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে বলল “মা, বাবা সব সময় কেন ভুল ভাল টাইমে ছুটি গুলো পায়?”
সোম গম্ভীর হয়ে রিসেপশন থেকে আনা খবরের কাগজ পড়ছিলেন। রাণী সেদিকে দেখে বললেন “তোর বাবাকেই জিজ্ঞেস কর। এই সময় কেউ পাহাড়ে আসে বল? আমার তো ভয় লাগছে রাস্তায় কোথায় ধ্বস না নেমে যায়। বাড়ি ফেরা বন্ধ হয়ে যাবে তখন। দুনিয়ার লোকের গরমের ছুটি শেষ হল আর তোর বাবা এই বর্ষাকালে ছুটি নিল। তাও ভাল, ছুটি পেয়েছে, যা অবস্থা চাকরির, বাবাহ!”।
আঁখি হেসে বলল “বেশ হয় তাহলে। বাড়ি কে যেতে চায়? আমি তো এখানেই থাকতে চাই”।
রাণী চোখ পাকালেন “হ্যাঁ, কলেজ তো আর যেতে হবে না। তুইও তো সেটাই চাস”।
আঁখি বলল “ও বাবা, কালকে সাইট সীনটা বাদ দিয়ে দিতে বল না। আমার তো ঘরেই বৃষ্টি দেখতে দারুণ লাগছে”।
সোম বললেন “বৃষ্টির মধ্যে যাবই বা কেন? আমারও দিব্যি লাগছে। আজ খিচুড়ি করছে। সঙ্গে মাংস”।
রাণী বললেন “এই হোটেলটা ভালো বেশ। কেমন সুন্দর কথা শোনে। আচ্ছা, এরা কি শুধু আমাদের তিনজনের জন্যই খিচুড়ি রাঁধবে? বাকিরা কী খাবে?”
সোম বললেন “বাকি আর দেখলে কোথায়? হোটেলে আর কেউ আছে নাকি!”
রাণী বললেন “ব্রেকফাস্ট টেবিলে একজনকে দেখলাম যেন?”
সোম বললেন “ওহ হ্যাঁ, এও আমাদের মতই পাগল। বর্ষায় পাহাড় দেখতে এসছে”।
আঁখি বলল “বাঙালি? ঈশ, আমি সকালে ঘুমালাম দেখতে পেলাম না”।
সোম বললেন “এমনভাবে কথাটা বললি যেন বাঙালি মানে চিড়িয়াখানায় দেখতে যাবার কিছু। তুই লোক ভালবাসিস বললেই পারতি, গ্যাংটকে থাকতাম”।
আঁখি ঠোঁট বেকিয়ে বলল “ছাতা। আমি সেটা কোথায় বললাম? মজা লাগে না? এরকম নির্জন জায়গায় বাঙালি!”
সোম বললেন “সিজনে আসলে আর মজা লাগত না। বিরক্ত লাগত। চারদিকে গিজগিজ করছে লোকে। আর সব বাঙালি। মনে হত ধর্মতলাটাকেই টেম্পারেচার কমিয়ে সিকিম বানিয়ে দিয়েছে”।
রাণী বললেন “আমার বাপু লোকজনই ভাল লাগে। একে নির্জন তায় এরকম বৃষ্টি! কী যে ছাইয়ের চাকরি কর, পুজোতে ছুটি নেই, গরমের ছুটিতে ছুটি নেই, আত্মীয় স্বজনও এমন ভাবে তাকায় যেন পুলিশের চাকরি মানেই ঘুষের টাকা। আমার আর ভাল লাগে না”।
সোম বললেন “ভাল তো। তুমিও ঘ্যামসে থাকবে। পাওয়ারফুল লোকের বউরা যেরকম ঘ্যামে থাকে। তোমার বন্ধু সুজাতার বর ব্যবসা করে যা ঘ্যাম নেয় তুমি তো পুলিশের বউ হয়ে তার সিকিভাগও নিতে পার না”।
আঁখি বললেন “মা ঘ্যাম নেবে কী, মা সিরিয়াস হতে পারলে তো ঘ্যাম নেবে। মা শুধু সুযোগ খোঁজে হাসার। কিছু হলেই হাসি স্টার্ট। জানো বাবা সেদিন কী হয়েছে, আমরা সেদিন গড়িয়াহাট গেছি...”
রাণী বললেন “এই আমি কিন্তু বেরিয়ে যাব”।
আঁখি হাসতে হাসতে বলল “প্লিজ মা বলতে দাও, বলতে দাও। এখানে তো আমরা তিনজনই আছি। শোন না বাবা, গড়িয়াহাটে একটা দোকানে ব্যাগ কিনছি। দোকানদার শুরু করেছে তিনশো তে, আর আমি তিরিশে, যেই বলেছি, মা হাসতে শুরু করেছে। ব্যস, দোকানদার বুঝে গেছে, সে বলে এটা ফিক্সড রেট, কিছুতেই দাম কম করা যাবে না, আমি তো রেগে মেগে অস্থির, আর মা শুধু হেসেই যায়, বলে এত দরদাম তুই শিখলি কী করে?”
সোম বললেন “তোর মাকে নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা আরও করুণ। ত্রিদিবদার বউ মারা গেছে। তোর মাকে নিয়ে দেখতে গেছি তার পরের দিন। ত্রিদিবদা হঠাৎ কেমন ভেবলে গিয়ে আমাকে বলেছে সোম আমি বিধবা হয়ে গেলাম। আমারও হাসি পাচ্ছিল কিন্তু অনেক কষ্টে জিভ কামড়ে সেটাকে চেপে ছিলাম। তোর মা ওখানেই হাসতে শুরু করে দিল। আমি এই মারি কি সেই মারি, কিন্তু তোর মাকে কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। ত্রিদিবদা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল হ্যাঁরে সোম, বউদি বোধহয় ওকে খুব ভালবাসত। কেমন একটা সেন্টিমেন্টাল হয়ে কী করবে বুঝতে না পেরে হেসে ফেলছে দেখ। নেহাত ত্রিদিবদা মানুষটা খুব ভাল বলে। সব জায়গায় এরকম হাসি হাসলে আমাদের মার খাবার মত অবস্থা তৈরী হয়”।
আঁখি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। রাণী হাসতে হাসতে বললেন “আমার ওই বিধবা কথাটা শুনে এত হাসি পেয়ে গেল বিশ্বাস কর। আমি কিছুতেই আর আটকে রাখতে পারলাম না হাসিটা”।
কলিং বেল বাজল। সোম কাগজটা ভাঁজ করতে করতে বললেন “ওই দেখ, লাঞ্চ এসে গেছে মনে হচ্ছে”।
আঁখি দরজা খুলল। এবং খুলেই অবাক হয়ে গেল, একজন যুবক কাঁচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে, আঁখি বলল “বলুন”।
যুবক বলল “নমস্কার আমি অর্ক। আপনাদের কারও কাছে জুতোর ফিতে আছে?”
সোম বললেন “ওহ, আপনি। আসুন ভিতরে আসুন”।
আঁখি দরজাটা ছেড়ে দাঁড়াল। ছেলেটা তড়িঘড়ি ঘরের ভিতর ঢুকে চেয়ারের ওপর বসে বলল “আপনার কাছে জুতোর ফিতে হবে?”
সোম বললেন “জুতোর ফিতে নিয়ে তো ঘুরি না, কেন বলুন তো?”
ছেলেটা হতাশ হয়ে বলল “নেই! খুব সমস্যা হয়ে গেল”।
বলে আর কারও দিকে না তাকিয়ে চেয়ার থেকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাণী হাসতে শুরু করলেন, সোম ছেলেটির চলে যাওয়া দেখতে দেখতে বললেন “এ ছেলের নির্ঘাত মাথায় দু চারটে স্ক্রু ঢিলা আছে”।

“জুতোর ফিতে পেয়েছেন?” অর্ককে দেখে সোম জিজ্ঞেস করলেন। তারা লাঞ্চ করতে নেমেছেন ডাইনিং রুমে। অর্ক গোগ্রাসে গিলছিল।
সোমের প্রশ্ন শুনে বলল “হ্যাঁ,হোটেলের এক ছেলের থেকে পেলাম”।
সোম একবার রাণীর দিকে তাকিয়ে তারপর অর্কর দিকে তাকালেন “জুতোর ফিতে দিয়ে কী করবেন?”
অর্ক বলল “আর বলবেন না, বুদ্ধ মূর্তির ওখানে জুতো খুলে ঢুকতে হত। আমার কী মনে হল ফিতেটা খুলে জুতোটাকে র্যাাকের সঙ্গে বেঁধে গেছিলাম। ফিরে দেখি জুতো আছে ফিতে নেই”।
আঁখি হেসে ফেলল খিলখিল করে।
অর্ক আঁখির দিকে তাকিয়ে বলল “সত্যি ভাবুন, এখানকার লোকগুলো কী অদ্ভুত! জুতোর ফিতে নিয়ে কী করবে? জুতো নিয়ে গেলেই পারত”!
সোম বললেন “আপনি এই বৃষ্টির মধ্যে মূর্তির ওখানে গেছিলেন”?
অর্ক একটু দ্বিধান্বিতভাবে সোমের দিকে তাকিয়ে বলল “রেইন কোট আছে তো। ভাবলাম ঘরে বসে বসে কী করব! চলে গেলাম”।
রাণী হাসছিলেন। বললেন “আরেকটা জুতোর ফিতে কি জুতোতেই ছিল?”
অর্ক বলল “না, আরেকটা ফিতে পকেটে নিয়ে গেছিলাম”।
রাণী বললেন “সেটা জুতোতে থাকলে কী হত?”
অর্ক বলল “সেখানেই তো আমি জিতলাম। চোর ব্যাটা একটা ফিতে পাবে। আরেকটা আমার কাছে”। বলে খুব জিতেছে এরকম মুখ করে আবার খাওয়া শুরু করল।
আঁখিদের খাবার দেওয়া হচ্ছিল, রাণী বললেন “আপনি কি চাকরি করেন?”
ছেলেটা বলল “হ্যাঁ, আমার কাজের খুব চাপ। তাই আমি সাত দিন ছুটি নিয়ে ঘুরতে চলে এসছি। ফোনটাও অফ। কিছুতেই পাবে না”।
রাণী বললেন “শুধু রাবাংলাতেই থাকবেন?”
ছেলেটা বলল “আমার তো ইচ্ছা ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘায় উঠব কিন্তু শুনলাম অনেক হ্যাপা আছে, তাই আর রিস্ক নিলাম না। আজ কাল তো রাবাংলায় থাকব। এবার তারপরে দেখা যাক”।
রাণী আর আঁখি অনেক কষ্টে হাসি চেপে রাখছিল, সোম অবাক গলায় বললেন “একবারে কাঞ্চনজঙ্ঘা? এটা একটু বেশি হয়ে গেছিল না?”
অর্ক বলল “হ্যাঁ, পরে আমারও তাই মনে হয়েছে। আসলে আমি ভেবেছিলাম যাকে দেখার জন্য সবাই পাহাড়ে এসে এত হ্যাংলামি করে, যদি সরাসরি তার কাছেই যাওয়া যায়, মানে বুঝতে পারছেন তো আমি কী বলতে চাইছি?”
সোম বললেন “হ্যাঁ, খুব হাই লেভেলের চিন্তা ভাবনা বোঝা যাচ্ছে”।
অর্ক বলল “সেটা হতে পারে, আমি ছোটখাট কিছু ভাবতে পারি না আসলে। এই দেখুন না, অফিসে ছুটি পাচ্ছিলাম না, আসার আগের দিন ছুটির অ্যাপ্লিকেশন আমার কিউবিকলে টেবিলের ওপর রেখে চলে এসছি। ছুটি দিলে দে, নইলে যা ইচ্ছে কর। ফিরে দেখা যাবে”।
সোম বললেন “সে কী! চাকরি চলে যেতে পারে তো!”
অর্ক বলল “গেলে যাবে, চাকরি করে কে আর বড়লোক হয়েছে বলুন না। সেই এক কলকাতা, এক অফিস, যাও আর আসো, আসো আর যাও। লাইফে কোন আনন্দ নেই, অ্যাডভেঞ্চার নেই, আমি ঠিকই করে রেখেছি চাকরি গেলে যাক, তারপরে না হয় কাঞ্চনজঙ্ঘাতেই একটা বাড়ি করে থাকব। আচ্ছা আপনার কী মনে হয়, কোনটা বেটার হবে? কাঞ্চনজঙ্ঘা না এভারেস্ট?”
রাণী বললেন “এভারেস্টে কী করবেন? বাড়ি বানাবেন?”
অর্ক বলল “না না, বাড়ি বানানোটা বড় কথা না, বড় কথা হল এভারেস্টে ওঠাটা। সবাই কত ট্রেনিং করে, আমার তো আজকাল মনে হয় চাকরি বাকরি না করে মাউন্টেনিয়ারিং করলে ভাল হত। মা যদি ঝামেলা না করত তাহলে তাই করতাম”।
সোম বললেন “বাড়িতে কে কে আছে আপনার?”
অর্ক বলল “সবাই আছে। বাবা আছে মা আছে, কাকু কাকীমা, ঠাকুরদা। এবারে অবশ্য কাউকে জানিয়ে আসি নি। ওই অফিস স্টাইল, একটা চিঠি বাবার টেবিলে দিয়ে চলে এসছি। বলে কী না বিয়ে দেবে। কী ঝামেলার জিনিস বলুন তো!”
সোম বললেন “ওহ, তাহলে অফিসের ঝামেলার থেকে বিয়ের ঝামেলাটাই বড় মনে হল?”
অর্ক বলল “ওই তো, দুটোই। বিয়ে টিয়ে করলে আর পাহাড়ে আসতে পারব বলুন? আমার দুটো বন্ধু বিয়ে করেছে, নাকে দড়ি দিয়ে বউয়েরা তাদের ঘুরিয়ে যাচ্ছে, খ্যাপা নাকি”?
বলেই অর্ক হোটেলের ছেলেগুলোকে ডাকল “ও ভাই, দু পিস মাংস দাও তো, এরকম মাংস বানালে তো আর বাড়িও যাব না, এখানেই থেকে যাব”।
ছেলেটা মুখ কাঁচুমাচু করে বলল “মাংস শেষ হয়ে গেছে”।
রাণী তার বাটিটা এগিয়ে দিলেন “এখান থেকে নিয়ে নিন, আমি বেশি মাংস খেতে পারি না”।
অর্ক নির্দ্বিধায় সেখান থেকে দু পিস চামচ দিয়ে নিয়ে বলল “বাঁচালেন। খাওয়ার সময় অত হিসেব করে খেতে পারি না আসলে। আজ রাত থেকে এদের বলে দিতে হবে আমার জন্য যেন দু প্লেট মাংস রান্না করে। পাহাড়ে এত হাঁটাচলা করতে হয় শরীরে একটু বেশি প্রোটিন দরকার হয় তাই না?”
আঁখি বলল “আপনি হাটলেন কোথায়?গাড়িতে ঘুরছেন না?”
অর্ক অবাক গলায় বলল “সেকী! গাড়ি থেকে নেমে যে হাঁটতে হয়? সেটা কম নাকি?”
আঁখি কী বলবে বুঝতে না পেরে খিচুড়িতে মন দিল। সোম বললেন “কাল কী প্ল্যান?”
অর্ক বলল “কোন প্ল্যান নেই, গাড়িওয়ালা কিছু বলে নি এখনও”।
সোম বললেন “কাল আমাদের সঙ্গে চলুন, টি গার্ডেন যাব”।
আঁখি বাবার দিকে রাগী রাগী চোখে তাকাল। অর্ক বলল “টি গার্ডেন যাবেন? আচ্ছা, যাব, আমার কোন চাপ নেই। একা একাও ঘোরাটা অবশ্য সত্যি বাজে আইডিয়া ছিল। এখন বুঝতে পারছি। কিন্তু একটা বন্ধুকেও পেলাম না বুঝলেন? সবাই বউয়ের ভেড়া। শেষ মেষ ওই আমাকে একাই আসতে হল”।
রাণী বললেন “একা একা এই বর্ষাকালে পাহাড়ে আসাটা একটু কেমন না?”
অর্ক বলল “কেমন তো বটেই? কিন্তু কী করব? গোটা গরম কালটা একটা প্রোজেক্টে ফেঁসে থাকলাম। এখন সময় হয়েছে!”
সোম বললেন “বেশ বেশ। আচ্ছা তাহলে কালকে তৈরী থাকবেন। আমি ডেকে নেব”।
ছেলেটার খাওয়া হয়ে গেছিল, টেবিল থেকে উঠে বেসিনের দিকে যেতে যেতে বলল “একদম, নো টেনশন”।
অর্ক বেরিয়ে যেতে আঁখি বলল “কী বাবা, যাকে তাকে বলে দিচ্ছ যাবার জন্য!”
সোম বললেন “আরে এই পাগলাটাকে নিয়ে গেলে ভালই হবে। সময় কেটে যাবে”।
আঁখি মুখ গোমড়া করে খেতে লাগল।
৩)
বিকেল নাগাদ বৃষ্টি ধরল তবে মেঘটা গেল না। রোদ ওঠে নি। একটা হিমশীতল হাওয়া বইছে।
সোম আর রাণী ঘুমাচ্ছিলেন। আঁখির ঘুম আসছিল না। সে একা একা ছাদে চলে এল। দেখল অর্ক একটা ক্যামেরা নিয়ে ছাদের ওপরে রাখা কয়েকটা টবের ফটো তুলে যাচ্ছে মনোযোগ দিয়ে। প্রথমে আঁখি ভাবল নীচে নেমে যাবে, পরক্ষণে তার মনে হল ঘরে ফিরেই বা কী করবে, ছাদের অন্য পাশটায় গিয়ে রাস্তায় মানুষজন দেখতে লাগল।
“এই ছাদ থেকে নাকি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যায় বুঝলেন?”
অর্ক ফটো তুলতে তুলতে তাকে বলল।
আঁখি একটু অবাকই হল। ছেলেটার মধ্যে কোন জড়তা নেই, কেমন সাবলীলভাবে কথা বলে যায়।
সে কিছু বলল না।
অর্ক বলে যেতে লাগল “এই যে ফুলগুলোর ফটো তুলছি, এটাই যদি কাঞ্চনজঙ্ঘা ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকত তাহলেই জমে যেত। জমছে না ঠিক। এত মেঘের কী দরকার ছিল”?
আঁখি বুঝল সে কথা বলুক বা না বলুক অর্ক বকবক করেই যাবে। সে খানিকটা দায়সারা ভাবেই বলল “তাহলে যখন মেঘ থাকে না তখন এলেই পারতেন”।
অর্ক বলল “এবার তাই করব। শুনলাম শীতকালে এখানে মারাত্মক শীত পড়ে, তবে আকাশ পরিষ্কারই থাকে। সে সময় চলে আসব”।
আঁখি বলল “শীতে এলে আপনি টিকতে পারবেন না তো! অত ঠান্ডায় কেউ থাকতে পারে নাকি?”
অর্ক বলল “কেন পারে না? পারতে হবে। আরে পাহাড়ে তো লোকে শীতে থাকে, তারাও মানুষ, আমিও মানুষ না পারার তো কিছু নেই। আচ্ছা, আপনি একটু এই টবটাকে ধরে দাঁড়ান তো!”
আঁখি অবাক হল “কেন বলুন তো?”
অর্ক বলল “শুধু টবের ছবি তুললে কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া লাগছে, আপনার ছবি তুললে ব্যাপারটা বেশ একটা ফটোগ্রাফি ফটোগ্রাফি মনে হবে। এই যে এই টবটা ধরুন”।
অর্ক একটা টব আঁখির দিকে এগিয়ে দিল।
আঁখি বলল “আপনার কি মনে হয় না আপনি একটু বেশি বেশি করছেন?”
অর্ক অবাক হয়ে বলল “আমি? কী বেশি করলাম?”
আঁখি এবার রেগে গেল “আপনার মনে হচ্ছে না আপনি একটু বেশি সরল সেজে থাকার অভিনয় করছেন”।
অর্ক থতমত খেয়ে টবটা রেখে আর একটাও কথা না বলে ছাদের অন্যদিকে চলে গেল। আঁখির মাথাটা গরম হয়ে গেছিল। সে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রুমে ফিরে গেল।
রাণী উঠে বসেছিলেন। আঁখি ফিরতে ঘুম গলায় বললেন “কীরে কোথায় গেছিলি?”
আঁখি বলল “ছাদে গেছিলাম একটু”।
রাণী শঙ্কিত গলায় বললেন “একা একা?”
আঁখি বিরক্ত গলায় বলল “কী একা একা? আমি কি কচি খুকি নাকি?”
রাণী বললেন “তবু। দুমদাম চলে যাবি না। অজানা অচেনা জায়গা। তুই মেয়ে এটা ভুলে যাবি না। ছাদে একা ছিলি?”
আঁখি বলল “না ওই পাগলটাও ছিল”।
রাণীর মুড চেঞ্জ হয়ে গেল, তিনি আগ্রহের সঙ্গে জানতে চাইলেন “কী করছে?”
আঁখি গম্ভীর মুখে বলল “ফটো তুলছে। গাছ, পাতা, পাথর যা পাচ্ছে তার ফটো তুলে বেড়াচ্ছে”।
রাণী বললেন “তোর ফটো তুলেছে?”
আঁখি রাগী গলায় বলল “আশ্চর্য মা! আমার ফটো তুলতে যাবে কেন? আমি কি গাছ, পাতা না পাথর?”
রাণী বললেন “তুই তো কাঞ্চনজঙ্ঘা। সবাই তোর জন্যই অপেক্ষা করে থাকে। আচ্ছা তোর সেই ছেলেটার খবর কী? কী যেন নাম? কী যেন...?”
আঁখি বলল “কে? প্রীতম?”
রাণী বললেন “হ্যাঁ হ্যাঁ প্রীতম। আজকাল কী খবর ছেলেটার?”
আঁখি বলল “মা! প্রীতম আমার বন্ধু! কতবার বলব বল তো! তুমি না এখনও সেই মান্ধাতার আমলেই পড়ে আছ”।
রাণী বললেন “ওহ, বন্ধু তাই না? ওকে দেখে কিন্তু মনে হয় না ও তোকে বন্ধু হিসেবে ভাবে”।
আঁখি বলল “তুমি একটু বেশি বেশিই ভাব মা”।
রাণী বললেন “হবে হয়ত। যাক গে, তোর বাবাকে ঘুম থেকে তোল তো। এখন বৃষ্টিটা বন্ধ হয়েছে যখন এখানকার বাজার থেকে ঘুরে আসি অন্তত। সর্বক্ষণ ঘরে বসে থাকতে আর ইচ্ছা করছে না”।
আঁখি ডাকতে শুরু করল “ও বাবা, বাবা, উঠে পড় শিগগিরি। আমরা বাজারটা ঘুরে আসি। এখন বৃষ্টি বন্ধ আছে”।
সোম অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠলেন “উফ, তোরা যদি একটু শান্তিতে ঘুমোতে দিস”।
তিনজনে বেরলেন একটু পরে। হোটেল থেকে বেরিয়ে আঁখি একবার পিছন ফিরে দেখল অর্ক তখনও ছাদে ফটো তুলে যাচ্ছে। তাকে দেখে অন্য দিকে ঘুরে গেল। আঁখির হাসি পেয়ে গেল।
রাতে খেতে গিয়ে তারা শুনল অর্ক নাকি ঘরেই খেয়ে নিচ্ছে। আঁখি বুঝল বিকেলের ঘটনার জন্য ছেলেটা লজ্জা পেয়েছে হয়ত।
রাণী বললেন “ঈশ, কেমন একটা লাগছে না?”
সোম বললেন “হ্যাঁ, ছেলেটার পাগলামি দেখতে ভাল লাগছিল। যাক গে, কাল সকালে তো আমাদের সঙ্গেই যাবে। চিন্তা করে লাভ নেই”।
রাণী বললেন “তাই হবে”।
আঁখি গম্ভীর মুখে খেয়ে নিল।
পরের দিন সকালে ড্রাইভার এসে সকাল সাড়ে সাতটায় নক করল। তারা সবে ঘুম থেকে উঠেছিল। সোম বললেন “আমি অর্ককে একবার নক করি। ব্যাটা নিশ্চয়ই ঘুমোচ্ছে”।
রাণী বললেন “হ্যাঁ, যাও তো। ঘুমোলে তো বিপদ”।
সোম বেরিয়ে কিছুক্ষণ পরে ঘুরে এসে বললেন “ছেলেটা সত্যি পাগল”।
আঁখি অবাক চোখে বাবার দিকে তাকাল। রাণী বললেন “কেন কী হয়েছে?”
সোম বললেন “সকাল ছ’টায় চেক আউট করে চলে গেছে”।
রাণী অবাক গলায় বললেন “কোথায় গেল?”
সোম বললেন “হোটেলে তো কিছু বলে যায় নি। দেখো কেমন পাগল একটা”!
আঁখির খুব রাগ হচ্ছিল। কান্নাও পাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সব ছেড়ে ছুঁড়ে দিয়ে যেদিকে দু চোখ যায় হাঁটা দেয়।
৪)
আঁখির ইচ্ছা করছিল না যেতে। সে বলল “বাবা, আমার না ভীষণ শরীর খারাপ লাগছে। তুমি আর মা গিয়ে ঘুরে এসো”।
রাণী ফিক করে হেসে দিয়ে বললেন “কেন? অর্ক চলে গেল বলে মন খারাপ হয়ে গেল বুঝি?”
আঁখি রেগে মেগে সোমকে নালিশ করল “দেখো বাবা, মা সব সময় কেমন বাজে ইয়ার্কি করে”।
সোম কপট গাম্ভীর্যে রাণীর দিকে তাকিয়ে বললেন “তুমি না মা? ভুলে গেলে চলবে? আচ্ছা আজ মামণির যখন শরীর খারাপ লাগছে তখন না হয় আমরা সাইট সীনটা ক্যান্সেলই করে দি?”
আঁখি আপত্তি করল “না না তা কেন? আমার জন্য কেন তোমরা নিজেদের ঘোরাটা ক্যান্সেল করবে বল তো?”
রাণী বললেন “তুই না গেলে আমরা আর কী করব বল? আচ্ছা, তাহলে কালকের মত আজকেও শুয়েই কাটিয়ে দি। আজ একটু ওয়েদারটা ভাল ছিল, গেলে মন্দ হত না এই যা”।
রাণী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
আঁখি বিরক্ত হয়ে বলল “আচ্ছা, আচ্ছা, যাচ্ছি। উফ”।
সোমের মুখে হাসি ফুটল, বললেন “এই তো, তাড়াতাড়ি কর। অনেকক্ষণ লাগবে যেতে”।
আধঘন্টা পরে তারা বেরোল। আঁখি একটু গম্ভীর, সোম সেটা বুঝে রাণীকে বললেন “ছেলেটা একবারে বাজে বুঝলে? কোন আদব কায়দা জানে না, এভাবে শেষ মুহূর্তে পালাবার মানে কী”?
রাণী আড়চোখে আঁখির গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন “যা বলেছ, পাগল মানে বদ্ধ পাগল। দেখো গে সত্যি সত্যি হয়ত কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকেই চলে গেল”।
আঁখি বাবা মার কথা না শুনবার ভান করে মোবাইলটা বের করল। বন্ধুদের হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে একবার ঢু মেরে নিল। প্রীতম বেশ কয়েকটা মজার মিম পাঠিয়েছে সেগুলো দেখতে থাকল। কিন্তু কিছুতেই সে হাসতে পারছিল না।
সোম বললেন “বলা যায় না। কালকে রাতেও খেতে এল না। কী হল বল তো হঠাৎ করে”?
রাণী ইউরেকা সুলভ মুখ করে বললেন “কাল তো মামণি ছাদে গেছিল, ওখানে আবার ওকে বকাঝকা করে ফেলিস নি তো? তোর যা মেজাজ!”
আঁখি মোবাইল থেকে চোখ না সরিয়েই বলল “অজানা অচেনা ফালতু লোকের সঙ্গে আমি কথা বলি না মা। তোমরাই তো শিখিয়েছ। ভুলে গেলে?”
রাণী বললেন “কী জানি, ছেলেটাকে আমার বেশ মজার লেগেছিল। আচ্ছা, জায়গাটা কী সুন্দর না?”
সোম বললেন “মাঝে মাঝে পাহাড়ের ভাঁজে মেঘ এসে বৃষ্টি পড়ছে, জায়গাটা দুর্দান্ত সন্দেহ নেই”।
রাণী বললেন “গাড়িটা দাঁড় করিয়ে কয়েকটা ফটো তুলতে পারতে তো”।
আঁখি বাধা দিল “একদম না, যেখানে যাচ্ছি সেখানে চল তো। দেরী করবে না একদম”।
রাণী ভয় পেয়ে চুপ করে গেলেন।সোমের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করলেন। সোম বললেন “আচ্ছা, আচ্ছা। আর কোন দেরী না। আচ্ছা আজ দুপুরে আমরা কী খাব মা?”
আঁখি বলল “যা ইচ্ছা। ওই স্কোয়াশের তরকারি আর ভাত খেলেও আমার কোন আপত্তি নেই”।
রাণী হাসতে শুরু করলেন। আঁখি রেগেমেগে বসে রইল।
তারা যখন চা বাগানে পৌছল তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সোম হতাশ গলায় বললেন “গোটা রাস্তা এত ভাল ছিল, এখানেই শুরু হয়ে গেল দেখো। আমাদের কপালে সুখ সইবে না”!
হঠাৎ রাণী চেঁচিয়ে উঠলেন “আরে, ওখানে অর্ক না?”
তাদের চোখ চলে গেল বাইরে। একটা বিরাট ছাতা মাথায় নিয়ে অর্ক গম্ভীর মুখে ফটো তুলে যাচ্ছে। রাণী একবার আঁখির দিকে তাকালেন। আঁখি অকারণেই হেসে উঠল, রাণী বললেন “হাসলি কেন?”
আঁখি বলল “হাসব না? এ কেমন পাগল দেখো? ছাতা মাথায় দিয়ে চা গাছের ফটো তুলছে”।
গাড়িটা পার্ক হয়ে গেছিল। সোম ছাতা মাথায় দিয়ে নেমে অর্ককে ডাকলেন “এই ছেলে, এদিকে এসো”।
অর্ক দেখতে পেল তাদের। এদিক ওদিক তাকিয়ে এগিয়ে এল। “আরে আপনারা এসে গেছেন?”
সোম বললেন “তুমি তো আচ্ছা পাগল ছেলে হে! আমাদের তো এখানেই আসার কথা ছিল। তুমি আগে থেকে আসতে গেলে কেন?”
অর্ক একগাল হেসে বলল “এবাবা, ভেরি সরি বুঝলেন, আসলে আমাকে কাল একজন বাজারে বলল ভোরবেলা নাকি একটা ভিউ পয়েন্ট আছে যেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দারুণ দেখা যাবে। আমিও সব ভুলে টুলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম”।
সোম বললেন “তাহলে চেক আউট করলে কেন? হোটেলে আর ফিরবে না? ওহ সরি সরি আমি তুমি করে বলে যাচ্ছি শুধু।”
অর্ক বলল “আহা, না না সেটা তো বলবেনই। আপনি আমার দাদুর বয়সী”।
রাণী গাড়ি থেকে নেমেছিলেন। অর্কর কথা শুনে হাসতে শুরু করলেন।
সোম ভ্রু কুঁচকে বললেন “দাদু বানিয়ে দিলে হে? তুমি তো মহা ত্যাঁদোড়!”
অর্ক জিভ কেটে বলল “এহ, বেশি সম্মান দিতে গিয়ে একটু বেশিই বলে ফেললাম। দাদু না হন, আমার কাকার বয়সী তো বটেই”।
রাণী হাসতে হাসতেই বললেন “দাদু থেকে কাকা বানিয়ে দিলে? আরেকটু দরদাম করলে তো নাতি বানিয়ে দিতে”।
আঁখি গাড়ি থেকে নেমেছিল। অর্ক সেদিকে দেখে তটস্থ হয়ে বলল “আচ্ছা, আপনারা ঘুরুন, আমি নামচি বাজার যাব”।
সোম বললেন “একদম না, তুমি এখানেই থাকবে, পালাবে না একদম”।
অর্ক কাঁচুমাচু মুখে বলল “হোটেলে তো চেক আউট করে এলাম”।
সোম বললেন “আবার চেক ইন করবে। কেন কোথায় যাবার প্ল্যান করেছিলে?”
অর্ক মাথা চুলকে বলল “আসলে চেক আউটের প্ল্যান ছিল না। কী মনে হল, গাড়ি যখন এল, আমি চেক আউট করে ফেললাম। কোথায় যাব তারও ঠিক নেই। নামচিতে শুনেছি একটা ভাল জায়গা আছে, ওখানে থাকতে পারি আজ”।
সোম বললেন “এরকম উদ্দেশ্যহীনের মত ঘুরে কী হবে? আচ্ছা তুমি ঘুরতে চাইছ যখন তখন নিজের মতই ঘোর”।
বৃষ্টি থেমে গেছিল।
রাণী বললেন “এই শোন, চল তো একটু কফি খাই, শীত লাগছে বেশ”।
সোম বললেন “তথাস্তু। চল। মামণি যাবি না?”
আঁখি বলল “না, আমি বরং এখানেই থাকি, বৃষ্টিটা থামল যখন তখন তো আর প্রবলেম নেই”।
রাণী বললেন “অর্ক তুমি যাবে?”
অর্ক মাথা নাড়ল “নাহ”।
রাণী সোমের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন “চল”।
আঁখি রাগী চোখে মার দিকে তাকাল।
দুজনে এগোলে অর্ক ক্যামেরা নিয়ে আবার চা বাগানে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এমন সময় আঁখি ডাকল “আপনি কি আমার কালকের রুড বিহেভিয়ারের জন্য চেক আউট করেছেন?”
অর্ক বলল “সিকিমে কিন্তু সেরকম চা বাগান নেই জানেন তো? রেয়ার খুব”।
আঁখি বলল “আপনি আমার কথার উত্তর দিলেন না কিন্তু”।
অর্ক বলল “খুব কফি খেতে ইচ্ছা করছে। ঈশ কী ঠান্ডা”!
বলে কফি শপের দিকে দৌড় লাগাল।
আঁখি গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে রইল।

তারা হোটেলে ফিরে এল বিকেল পাঁচটা নাগাদ।
সঙ্গে অর্ক। সামনের সিটে বসে সারাক্ষণ বকবক করে গেল অর্ক। আঁখি গম্ভীর হয়ে বসে ছিল। রাণী অনেকবার আঁখিকে খুচিয়েছেন কিন্তু আঁখি একটা কথাও বলে নি। সোম খানিকটা বুঝেছেন তবে গোটা সময়টাই তিনি অর্কর সঙ্গে কথা বলে গেছেন।
অর্ক বলছিল ওর নাকি এবার মানস সরোবর যাবার ইচ্ছা। শুনে রাণী দু তিনবার কাশি আটকাতে গিয়ে বেজায় হেসেছেন। আঁখি তাতে রেগে গিয়ে রাণীকে চিমটি কেটে দিয়েছে।
হোটেলে ফিরে অর্ক আবার চেক ইন করল লজ্জা লজ্জা মুখে। রাণী এবং আঁখি ঘরে ঢোকার পর হোটেলের একজন বয় এসে বলল “সাহেব আপনাকে ওই স্যার একটু ডাকছেন”।
সোম বিরক্ত গলায় বললেন “দেখেছ? নিশ্চয়ই আবার কিছু পাকিয়েছে। দেখে আসি”।
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “দেখো। যা পাগল”।
সোম হাসিমুখেই রওনা দিলেন।
অর্কর ঘরের দরজা খোলাই ছিল। সোম ঢুকে দেখলেন অর্ক স্যুটকেসটা খুলতে পারছে না কিছুতেই। বললেন “কী হল?”
অর্ক মাথা চুলকে বলল “কম্বিনেশনটা হারিয়ে ফেলেছি। মানে ভুলে গেছি। কী করি বলুন তো?”
সোম বললেন “উফ, সত্যি। কোথাও লিখে রাখো নি?”
অর্ক বলল “নাহ। পুরো ভুলে মেরে দিয়েছি”।
সোম স্যুটকেসটার কম্বিনেশনটা ঘাটতে লাগলেন। প্রথম চেষ্টাতেই খুলে বললেন “দেখ কান্ড, এ তো কোন লকই ছিল না। তিনটে জিরো”।
অর্ক হাসতে লাগল, “দেখেছেন মিস্টার লাহিড়ী, কী কান্ড বলুন তো! রত্নাকর আগরওয়ালের স্যুটকেসেও সেই জিরো জিরো জিরো কম্বিনেশন লক ছিল। পুরো প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় লকটা খুললেন বলুন?”
সোম হাসছিলেন, অর্কর কথা শুনে তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল, বললেন “তু... আপনি কে?”
অর্ক বলল “বসুন বসুন। ঘরে সোফা আছে। খারাপ হোটেলে তো আপনি উঠবেন না। এত গুলো টাকা যখন পেয়েছেন”।
সোম বুঝতে পারলেন এই শীতেও তিনি ঘামতে শুরু করেছেন। বললেন “আপনি কে বলুন তো?”
অর্ক হাসল “বেশি দিন হল জয়েন করিনি বুঝলেন? তবে সেন্ট্রাল ব্যুরো জায়গাটা বেশ ভাল। আমাদের মত পাগলদের জন্য খুব সুন্দর জায়গা”।
সোম পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছে বললেন “আপনি কী চাইছেন?”
অর্ক বলল “আমি পুরো কেস হিস্ট্রিটা আপনার মুখ থেকে শুনতে চাইছি। আগামী কয়েকদিন আমি আপনার সঙ্গেই থাকব। ওই যেরকম পাগল সেজে থাকছি। খুব একটা খারাপ অভিনয় হচ্ছে না বলুন? আরে আপনি বসছেন না কেন বলুন তো?”
সোম একটা সোফায় কোনমতে বসে পড়লেন। বললেন “দেখুন অর্ক বাবু...”
“আমার নাম সায়ন মিত্র, অর্কটা ছদ্মনাম। আচ্ছা আপনি অর্ক বলতে চাইলে বলে যেতে পারেন। নট ব্যাড। জানেন আমার মা এই নামটা দিয়েছিল আমার। আমার বাবার আবার সায়নই পছন্দ ছিল। হ্যাঁ বলুন কী বলছিলেন”।
সোম বললেন “দেখুন সায়নবাবু, এই গোটা ইনভেস্টিগেশনে আমি শুরু থেকে ছিলাম না, চার্জটা আমি পরে টেক ওভার করি। আমি প্রথমে বুঝতেই পারি নি অত বড় পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স ছিল পার্টির। আমার কিছু করার ছিল না, আমি কী করব বলুন? অত প্রেশারে থাকলে...”
সায়ন পকেট থেকে একটা রিভলভার বের করে টেবিলে রাখল, বলল “পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স সব জায়গার সমস্যা লাহিড়ীবাবু, তা বলে আপনার মত অনেস্ট অফিসারদের যখন পা পিছলে যায় তখন থেকেই সমস্যাটা শুরু হয়। আপনি তো পুলিশ কোয়ার্টারসে থাকেন। খামোখা বড় স্বপ্ন দেখতে গেলেন কেন?”
সোম বললেন “আপনি এখানে একা এসছেন? আমার ফ্যামিলি এখানে বুঝতে পারছেন তো?”
সায়ন বলল “আমি একাই এসছি। আমি জানতাম আপনি ফ্যামিলি নিয়ে বেড়াতে এসছেন। এবং এই সময়টাই আপনি এমন কিছু বোকামি করবেন না যাতে আপনাকে শায়েস্তা করার কথা আমাকে ভাবতে হয়। বলুন মিস্টার লাহিড়ী, এই স্ক্যামে কে কে জড়িত?”
সায়ন কথাটা বলেই রিভলভারটা পকেটে ঢুকিয়ে নিল কারও পায়ের শব্দ পেয়ে। রাণী চলে এসছিলেন, বললেন “আরে কী ব্যাপার? তুমি তো সেই কখন গেছ?”
সায়ন মাথা চুলকে বলল “আর বলবেন না, স্যারের থেকে ওনার অফিসের গল্প শুনছিলাম। আমাদের মত পিষেদের তো আর পুলিশ দেখার খুব একটা সৌভাগ্য হয় না। কী বলুন স্যার?”
সোম ম্লান হাসলেন। বললেন “হ্যাঁ, একেবারেই তাই। ছেলেটা একদম পাগলা। বুঝলে না?”
রাণী বললেন “চল বাজার ঘুরে আসি। কী অর্ক বাবু? যাবে?”
অর্ক বলল “নিশ্চয়ই। আমাকে আরেকজোড়া জুতোর ফিতে কিনতে হবে। আজকেও হারিয়েছি”।

আঁখি শুয়ে শুয়ে মোবাইল ঘাটছিল। রাণী এসে হাসতে হাসতে বললেন “আরেক কান্ড হয়েছে”।
আঁখি নির্লিপ্ত গলায় বলল “কী হয়েছে?”
রাণী বললেন “ছেলে স্যুটকেসের কম্বিনেশন ভুলে গেছে”।
আঁখি বলল “বাহ। খুব ভাল”।
রাণী বললেন “তুই এত গম্ভীর হয়ে গেলি কেন?”
আঁখি বলল “কিছু না। ভাল লাগছে না মা। সারাদিন এক জায়গায় থাকা”।
রাণী বললেন “শুধু তাই? আর কিচ্ছু না?”
আঁখি মোবাইলটা রেখে রাণীর দিকে তাকাল “আর কী? মানে কী বলতে চাইছ একটু খুলে বলবে?”
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “আমি কী জানি! তুই যা বুঝবি”।
সোম এলেন। রাণী বললেন “কী ব্যাপার? খুলেছে স্যুটকেস?”
সোম বললেন “হ্যাঁ, অনেক কষ্টে। যা পাগল!”
রাণী বললেন “সত্যি! আবার বলছে আরও জুতোর ফিতে কিনবে, বোঝ!”
সোম বললেন “পাগল কত রকমের হয়”!
রাণী বললেন “তা হ্যাঁ গো, আজ রাতের মেনুটা কী ঠিক করলে?”
সোম বললেন “তোমাদের জন্য চিকেন কষা আর ভাত বলে দিয়েছি”।
রাণী অবাক হলেন “আমাদের জন্য মানে? তুমি কী খাবে?”
সোম বললেন “আজ একদম খিদে নেই। গ্যাস হয়ে গেছে আর কী! কিছু না খেয়ে কাটাব আজ”।
রাণী বললেন “কী যে বল! কিছুই তো খেলে না, একবারে রাতের খাবারটাই অফ করে দিলে?”
সোম বললেন “দুপুরে আলু পরোটা খেলাম না? একবারে ভরে আছে পেটটা”।
রাণী অবাক গলায় বললেন “আমিও তো খেয়েছি। সে তো কখন হজম হয়ে গেছে! পাহাড়ে তো আমার বার বার খিদে পায়। তুমি একটু কারবোভেজ খেয়ে নাও তো, গ্যাসটা নেমে যাবে”।
সোম বললেন “আরে মুড়ি খেয়ে নিচ্ছি। ওসব চিন্তা কোর না তো। মাঝে মাঝে ফাস্টিং ইজ গুড ফর হেলথ”।
আঁখি বলল “বাবা, কাল কিন্তু ভোরে উঠবে। ছাদ থেকে আমরা সান রাইজ দেখব”।
রাণী বললেন “রক্ষা কর, তুই গিয়ে দেখে আসিস। আর এই বৃষ্টির মধ্যে তুই সান রাইজ দেখবিই বা কী করে?”
আঁখি বলল “হোটেলের ছেলেটা তখন বলল না বৃষ্টিটা ধরেছে এখন! কপাল ভাল থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যেতে পারে কাল?”
সোম বললেন “আচ্ছা, তুই গিয়ে দেখে আসিস। তবে সাবধানে। সেরকম হলে সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসবি”।
আঁখি বলল “সেসব চিন্তা কোর না। আচ্ছা বাবা, আমরা কতদিন এখানে থাকব?”
সোম বললেন “কেন বল তো?”
আঁখি বলল “বোর লাগছে না?”
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “ও আসলে জানতে চাইছে অর্ক আমাদের সঙ্গে কদিন থাকবে”?
আঁখি রেগে গেল “উফ মা, তুমি কী শুরু করলে বল তো?”
সোম বললেন “আমি তো অর্ককে বলে এলাম যতদিন আমরা থাকব, আমাদের সঙ্গেই থাকতে। একা ছেলে কী না কী পাগলামি করে বেড়াবে পাহাড়ে”...
আঁখি বলল “কেন বাবা! ও নিজের মত ঘুরুক না, ওকে কেন জড়াতে যাচ্ছ?”
সোম বললেন “কেন মামণি? ও কি কিছু বলেছে তোকে?”
আঁখি বলল “না কিছু বলে নি, তবে বেশি পাগল টাগল নিয়ে ঘোরা ভাল না এই আর কী”!
রাণী বললেন “তুই থাম, তাছাড়া ছেলেটা যা দেখলাম আবার দেখবি কোনদিন আমাদের কিছু না বলে পালাবে। অত চিন্তা করিস না”।
আঁখি গুম হয়ে থাকল।
#
আঁখি এবং রাণী ডাইনিং রুমে পৌছে দেখলেন অর্ক দু প্লেট মাংস নিয়ে বসেছে। তাদের দেখেই বলল “আজ আর রিস্ক নিলাম না বুঝলেন? মাংসটা এরা যা বানাচ্ছে, মনে হচ্ছে অফিস টফিস ছেড়ে এখানেই থেকে যাব”।
আঁখি না শোনার ভান করে হেডফোন কানে গুজল। রাণী বললেন “তোমার বাড়ি থেকে ফোন করে নি?”
অর্ক বলল “করছে তো, ফোন করে করে জ্বালিয়ে মারছে, আমি ফোন ধরছি না এই যা। যা পাগল বাড়ির লোক সব”।
রানী বললেন “কেমন পাগল?”
তাদের প্লেট দিয়ে গেল হোটেলের ছেলেটা। রাণী বললেন “তোমার আর মাংস লাগবে? আমার থেকে দু পিস নিতে পার”।
অর্ক মাথা নাড়তে নাড়তে হাসল “না না, আজকে আর লাগবে না। আজকের জন্য দু প্লেট ইজ গুড। আচ্ছা আপনারা জেলুসিল এনেছেন তো? আমার আবার জেলুসিলটা ভাল স্যুট করে”।
রাণী হেসে দিলেন “খাবার আগেই কোন ওষুধ খাবে ঠিক করে নিচ্ছ?”
অর্ক বলল “সেটা তো ঠিক করতেই হবে। ওষুধটাই তো আসল। বিদেশ বিভুইয়ে ডাক্তার তো আর পাওয়া যায় না বলুন?”
রাণী বললেন “তা বটে। তুমি বাজার গেছিলে? কী কী কিনলে?”
অর্ক বলল “জুতোর ফিতে কিনলাম, মোজা কিনলাম দু জোড়া, সব থেকে বড় কথা মিষ্টি খেলাম বাজারের একটা দোকান থেকে। নিয়েও এসছি মাঝরাতে খিদে পেলে খাব বলে। দিব্যি খেতে কিন্তু মিষ্টিটা”।
রাণী অবাক হয়ে বললেন “মাঝ রাতে মিষ্টি খাবে?”
অর্ক কাঁচুমাচু মুখে বলল “হ্যাঁ আমার রাত তিনটেয় একবার ঘুম ভাঙে। তখন মনে হয় আকাশ খাই পাতাল খাই”।
রাণী বললেন “বাবা! কী কান্ড”।
অর্কর খাওয়া হয়ে গেছিল। সে উঠে বলল “আমি জেলুসিল আনতে যাব কিন্তু”।
রাণী বললেন “তুমি এখন যাও না। ও আছে তো ঘরে”।
অর্ক বলল “ওহ, ভুলেই গেছিলাম। ইয়েস ইয়েস। আচ্ছা এখনই যাচ্ছি”।
হাত মুখ ধুয়ে অর্ক শিস দিতে দিতে বেরিয়ে গেল।
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “পুরো পাগল ছেলেটা”।
আঁখি বলল “এত কথা বলার কী দরকার?”
রাণী বললেন “তোরই বা এত গম্ভীর হবার কী দরকার?”
আঁখি রাগী রাগী মুখ করে বসে রইল।
৭)
“জেলুসিল আছে নাকি লাহিড়ীবাবু?” সোম দরজাটা খুলতেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল অর্ক। সোম কয়েক সেকেন্ড অর্কর দিকে তাকিয়ে বললেন “আসুন, আছে”।
অর্ক ঘরে ঢুকল। সোম বললেন “বসুন, এই ড্রয়ারে রেখেছি জেলুসিল”।
অর্ক একটা চেয়ার টেনে বসে ঘরটা দেখতে দেখতে বলল “খেতে গেলেন না কেন? আমার ভয়ে?”
সোম বললেন “আমার ডাইজেশন প্রবলেম আছে। জলে থেকে কুমীরের সঙ্গে লড়াই করে কি লাভ আছে কোন?”
অর্ক বলল “তা বটে। আচ্ছা আমি আরেকটা জিনিস ভাবছিলাম। সেভাবে অবশ্য খুব এক্সপেনসিভ কোন হোটেলে ওঠেন নি আপনি। জায়গাটাও দেশেই চুজ করলেন। কলকাতার কাছেই। আপনার বন্ধু মিত্র তো ইউরোপ ট্যুরে গেছে তাই না?”
সোম জেলুসিলের স্ট্রিপটা অর্কর হাতে দিয়ে বললেন “হু। গেছে”।
অর্ক একটা জেলুসিল মুখের ভিতর চালান করে দিয়ে বলল “আপনি গেলেন না কেন?”
সোম হেসে বললেন “বহুদিন পর ছুটি পেলাম। ইউরোপ না, আমার ঘরের কাছেই কোথাও একটা মেয়ে বউয়ের সঙ্গে কাটানোর ইচ্ছা ছিল। কলকাতায় থাকলে তো ওদের সময় দেওয়া হয় না”।
অর্ক মাথা নাড়ল, “দ্যাটস গুড। সময় দেন না, দিতে চান এসব ভাল। আচ্ছা, আমাকে এবার বলবেন একটু রত্নাকরের কেস ডিটেলসটা? আমি আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই”।
সোম একটু ইতস্তত করে বললেন “বলতে চাই, কিন্তু ওরা তো যে কোন সময় চলে আসবে...” সোমের চোখটা দরজার দিকে চলে আসল।
অর্ক বলল “আপনি বলতে থাকুন। আমি অ্যালার্ট থাকব। আপনিও থাকবেন। বলুন”।
সোম বললেন “তিন মাস আগের কথা। আমি বাড়িতে ছিলাম। এই সময় হেড অফিস থেকে একটা ফোন আসে। আমি সেদিন ছুটিতে ছিলাম, স্বাভাবিকভাবেই একটু বিরক্ত হই, কিন্তু ফোনটা না ধরলে আবার অন্য সমস্যা হতে পারে, তাই ফোনটা ধরলাম”।
অর্ক বলল “ঈশ, একটা সিগারেট দরকার ছিল। অবশ্য আমি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি। সিগারেট স্মোকিং ইজ ভেরি ব্যাড। আপনি স্মোক করেন নাকি?”
সোম বললেন “না”।
অর্ক অবাক হবার ভাব করে বলল “স্ট্রেঞ্জ! ভেরি স্ট্রেঞ্জ। বাট ইয়েস, আই মাস্ট অ্যাপ্রেসিয়েট ইট। আচ্ছা, ক্যারি অন”।
সোম বললেন “ফোনটা করেছিলেন উপরের এক অফিসার”।
অর্ক বলল “বিপুল কুমার তালুকদার? তাই তো?”
সোম একটু চমকে অর্কর দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই স্বাভাবিক গলায় বললেন “হ্যাঁ”।
অর্ক বলল “তারপর?”
সোম বললেন “আমাকে তখনই ওনার সঙ্গে দেখা করতে যেতে বললেন। আমি বিরক্ত হলাম কিন্তু কিছু করার ছিল না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হেড অফিসে পৌঁছে গেলাম”।
অর্ক বলল “দেন?”
সোম বললেন “স্যার বললেন রত্নাকর আগরওয়ালের কেসের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার সুরেশ্বর রাও কিছুতেই সুবিধা করে উঠতে পারছেন না তো আমি যেন এই কেসের চার্জটা নি”।
অর্ক বলল “সুরেশ্বর রাওয়ের তো ট্রান্সফারও হয়ে গেছিল সেদিনই। তাই না?”
সোম মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ, সেদিনই। স্যার ওনাকে নিয়ে একেবারেই অখুশি ছিলেন। সুরেশ্বর নাকি এতদিন ধরে ঘুমোচ্ছিল, কিছুই করছিল না ইত্যাদি ইত্যাদি ওকে আমার সামনেই যা নয় তাই বলে ঝেড়ে গেলেন। আমি সুরেশ্বর সম্পর্কে যেটুকু জানতাম তাতে বুঝেছিলাম নিশ্চয়ই কোন ইনফ্লুয়েন্স আছে বলেই ও কেসটা নিয়ে ধীরে চলার নীতি নিয়েছিল, এবং সেটা প্রমাণ হতেও বেশি সময় লাগল না। স্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে সবে রাওয়ের কাছ থেকে চার্জ বুঝতে বেরিয়েছি ঠিক সেই সময় অর্ণব বোস ফোন করলেন”।
অর্ক বলল “দ্যাট ফেমাস লিডার যে জনসভায় রক স্টারের মত মাথা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে বক্তৃতা দেন?”
সোম বললেন “হ্যাঁ। দ্যাট ফেমাস লিডার”।
অর্ক বলল “তো তিনি কী বললেন আপনাকে?”
সোম বললেন “ফোন ধরেই বললেন তিনি আমার কর্ম ক্ষমতার খুব সুখ্যাতি শুনেছেন, তিনি জানেন রত্নাকর আগরওয়াল মার্ডার কেসটা আমার থেকে ভাল কেউ হ্যান্ডেল করতে পারবে না”।
অর্ক বিড়বিড় করে বলল “দ্যাট ফাকিং স্কাউন্ড্রেল। ওহ সরি, ইউ ক্যারি অন”।
সোম দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন “ওরা আসছে বোধ হয়। পায়ের শব্দ পাচ্ছি”।
অর্ক গলাটা একটু জোরে করেই বলতে শুরু করল “তারপর বুঝলেন তো, আমার মানস সরোবর যাবার খুব ইচ্ছা। কৈলাশে গেলেও নাকি খুব পুণ্য হয়। ছোটবেলা থেকে আমার ইচ্ছা মানস সরোবরে স্নান করার। মাইনাস টেম্পারেচারে খালি গায়ে স্নান, উফ, ভাবতেই গায়ে কেমন কাঁটা দিচ্ছে না বলুন?”
দরজা ঠেলে রাণী ঢুকলেন। পিছন পিছন আঁখি। অর্ক রাণীর দিকে তাকাল “আচ্ছা শীতে স্নান করেন আপনারা? আমি কিন্তু শীত হোক গরম হোক ঠান্ডা জলে স্নান করি”।
রাণী বললেন “এই শীতে?”
অর্ক উঠল “হ্যাঁ এই শীতে। এই তো আজকে আমি ওই ভোরে ঠান্ডা জলে স্নান করে নিয়েছিলাম, আমি তো প্রাণায়মও করি, আপনারাও ট্রাই করতে পারেন দেখবেন?”
রাণী সভয়ে বললেন “রক্ষে কর বাপু, মাঝরাতে এইসব ব্যায়ামের ক্লাস আমি করতে চাই না”।
অর্ক জোরে জোরে হাসতে হাসতে বলল “আচ্ছা, তাহলে আমি আসি, দেখা যাক, দু প্লেট মাংস একটা জেলুসিলে হজম হয় নাকি”।
সোম বললেন “আরেকটা জেলুসিল নিয়ে যাও তাহলে?”
অর্ক বলল “না না, আমি বরং যাই”।
হন হন করে বেরিয়ে চলে গেল অর্ক। আঁখি বলল “বাবা তুমি এতক্ষণ এই পাগলটার সঙ্গে কথা বলছিলে? তোমার কি মাথা খারাপ?”
সোম মুখে হাসিয়ে ফুটিয়ে বললেন “আর বলিস না, সে কত গল্প, ওর নাকি মানস সরোবর যাবার ইচ্ছা, আরও কী কী সব বলে গেল গড়গড় করে”।
আঁখি রাগী রাগী গলায় বলল “ডিসগাস্টিং”!
৮ )
মাঝরাত থেকে তুমুল বৃষ্টি শুরু হল।
আঁখি ঘুম ভেঙে উঠে বসে ছিল। বাজ পড়ছে জোরে জোরে। রাণী ঘুম চোখে বললেন “কীরে, উঠলি কেন?”
আঁখি বলল “দেখো না কেমন বাজ পড়ছে, আমার ভয় লাগছে খুব”।
রাণী বললেন “ভয় পাবার কী আছে?”
আঁখি বলল “কী জোরে বৃষ্টি হচ্ছে দেখো”।
রাণী বললেন “আরে পাগলী পাহাড়ে এরকম বৃষ্টিই হয়। ভয় না পেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমো”।
আঁখি বলল “পাওয়ার চলে গেছে মনে হচ্ছে?”
রাণী বললেন “রাতে পাওয়ার দিয়ে কী করবি? ঘুমো তো”।
সোমের ঘুম ভেঙে গেছিল। বললেন “কীরে কী হল?”
আঁখি বলল “আমার না খুব ভয় লাগছে, মনে হচ্ছে ভূমিকম্প হবে”।
সোম বললেন “কিচ্ছু হবে না মা, ঘুমা, বৃষ্টি এভাবেই হয় পাহাড়ে”।
রাণী জোরে করে আঁখিকে শুইয়ে দিলেন। আঁখি গুটিশুটি মেরে মাকে জড়িয়ে শুয়ে থাকল।
রাণী বললেন “পাগলী!”
#
আঁখির ভোরে ঘুম ভেঙে গেল। বৃষ্টি থেমে গেছে।
জানলার কাঁচ ভিজে আছে। আঁখি উঠে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। তার মনে পড়ল হোটেলের ছেলেটা বলেছিল আকাশ পরিষ্কার থাকলে ছাদ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যাবে।
সে পা টিপে টিপে দরজা খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদে গেল। ছাদের দরজা খোলাই ছিল।
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে। অপূর্ব সে রূপ। আঁখির মনে হল সে স্বপ্ন দেখছে। সে মুগ্ধ হয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে থাকল।
“এখান থেকে কত কিলোমিটার হতে পারে?”
অর্কর কথায় আঁখির ঘোর কাটল। বলল “মানে?”
অর্ক ক্যামেরাতে কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুলতে তুলতে বলল “কাঞ্চনজঙ্ঘা, এখান থেকে কত কিলোমিটার হতে পারে?”
আঁখি বলল “আমি আপনার একটা প্রশ্নেরও উত্তর দেব না”।
অর্ক বলল “কেন আমি কী করলাম?”
আঁখি বলল “আপনি সেদিন আমার জন্য হোটেল থেকে চেক আউট করেছিলেন তাই না?”
অর্ক বলল “না না, ব্যাপারটা আসলে তা নয়, আপনি ভুল বুঝছেন”।
আঁখি বলল “কী ভুল বুঝছি? যা বোঝার ঠিকই বুঝছি। আমি সেদিন একটু বেশি রুড বিহেভ করে ফেলেছিলাম। আই অ্যাম সরি ফর দ্যাট”।
অর্ক বলল “এই মরেছে, আপনি আবার সরি বলছেন কেন? আমাকে আবার কেউ সরি বলে নাকি? আমি কত ছোট আপনার থেকে!”
আঁখি হেসে ফেলল “আমি ছোট?”
অর্ক জিভ কাটল “ঈশ, না না সরি সরি, এটা ফ্লোতে বেরিয়ে গেল। মানে সবাই আমার থেকে বড় তো, এই আপনাকেই পেলাম যে আমার থেকে ছোট। এটা খুব ভাল হল। মানে আই অ্যাম হাইলি হ্যাপি”।
আঁখি বলল “হাইলি হ্যাপিটা কী জিনিস?”
অর্ক বলল “অনেকদিন পর খুব ভাল একটা ফুচকা খেলে যে ফিলিংটা হয়, কিংবা ধরুন আপনি রান্না জানেন না, কিন্তু রান্না করার পর অ্যাক্সিডেন্টলি দেখলেন যে জিনিসটা বানিয়েছেন সেটার টেস্ট হেভেনলি হয়েছে। তখন যে ফিলটা হয় তাকে হাইলি হ্যাপি বলা হয়”।
আঁখি বলল “ওহ, আচ্ছা। বুঝলাম”।
অর্ক বলল “কী বুঝলেন? জানেন কাল রাতে আমি ঘুমোতেই পারি নি, শুধু মনে হচ্ছিল বৃষ্টিতে বোধ হয় হোটেল শুদ্ধ ভেঙে পড়বে। অনেক দিন পর এরকম ভয় পেলাম আমি। এর আগে শেষ ভয় পেয়েছিলাম মাধ্যমিকের ইতিহাস পরীক্ষার আগে। তারপর বহুদিন পরে এরকম একটা জম্পেশ ভয় পেলাম”।
আঁখি বলল “ওহ, আপনি ভয় পেয়েছেন? ভয় পাওয়ার মত কী হল?”
অর্ক বলল “ভয় পাব না? কী যে বলেন? তবে আপনাকে দেখলেই মনে হয় আপনি ভীষণ সাহসী। সেরকম লেভেলের একটা বন্দুক পেলে বাঘ টাঘ মারা আপনার কাছে নস্যি। প্লে অফ লেফট হ্যান্ড”।
আঁখি বলল “প্লে অফ লেফট হ্যান্ড মানে?”
অর্ক বলল “বা হাতের খেল। আমি আবার ভীষণ ভীতু জানেন?”
আঁখি বলল “আপনি কিসে ভয় পান?”
অর্ক বলল “সব কিছুতেই। সব থেকে ভয় পাই পাহাড়ে ভূমিকম্পকে। তারপরে ভয় পাই নাগরদোলাকে, তারপরে ভয় পাই কেউ যদি আমার উপর খুব রেগে যায় তাকে। এই যেমন আপনি”।
আঁখি বলল “রাগ করার ভ্যালিড কারণ ছিল। এমনি এমনি কেউ রাগ করে না। আপনাকে আমি চিনি না জানি না আর আপনি বলে দিলেন টব হাতে ফটো তুলতে? মানে সিরিয়াসলি? আপনার মাথায় এলো কী করে একটা মেয়ে অত বড় একটা টব হাতে ফটো তুলবে? ছবিটা কখনও মাথায় এসছে আপনার?”
অর্ক কয়েক সেকেন্ড মাথা চুলকে বলল “ছবিটা? বলছেন? আচ্ছা আপনি আমার এই ক্যামেরাটা ধরুন তো!”
অর্ক ক্যামেরাটা আঁখির হাতে দিল। তারপর একটা টব তুলে সব কটা দাঁত বের করে বলল “নিন এবার একটা ফটো তুলুন তো। দেখি কেমন দেখতে লাগে”।
আঁখি জোরে হেসে উঠল, বলল “আপনি নিজেকে দিয়ে আমার ছবিটা কল্পনা করবেন?”
অর্ক বলল “হ্যাঁ কারণ আপনি তো আর টব ধরে দাঁড়াবেন না”।
আঁখি বলল “আপনাকে কেউ বলে নি আপনার মাথায় দু চারটে স্ক্রু ঢিলা আছে?”
অর্ক বলল “বলেছে তো। সবাই আসলে আমাকে হিংসা করে। আমি একটা এক্সট্রা অরডিনারি ট্যালেন্ট তো তাই”।
আঁখি বলল “হ্যাঁ, সত্যিই আপনি এক্সট্রা অরডিনারি ট্যালেন্টই বটে। এক কোটিতে একটা, আপনি স্পেশাল এডিশন, আনডাউটেডলি”।
অর্ক বলল “এই তো, আপনি তো খুব ভাল। কত ভাল আমাকে চিনতে পেরেছেন”।
আঁখি বলল “আপনাকে চিনতে কিছুই লাগে না। আপনি সাদা পাতার মত স্বচ্ছ”।
অর্ক বলল “একদম। আচ্ছা এসব বাদ দিন। দেখুন না আপনার বাবাকে বলে আজ যদি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করা যায়”।
আঁখি বলল “কোথায় যাবেন?”
অর্ক বলল “কাঞ্চনজঙ্ঘা। কত আর দূর হবে? এখান থেকে যখন দেখাই যাচ্ছে তখন খুব বেশি হলে দশ বারো কিলোমিটার? কী বলেন?”
আঁখি মাথায় হাত দিয়ে বলল “উফ! কার পাল্লায় পড়লাম আমি!”

আঁখি যখন ঘরে ঢুকল তখন রাণী ঘুমাচ্ছিলেন। সোম উঠে বসেছিলেন।
আঁখি বলল “ঈশ, কী মিস যে করলে তোমরা! কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেছিল। এখন আবার ঢেকে গেল”।
আঁখির গলা কাঁদো কাঁদো শোনাল।
সোম হাসলেন “চিন্তা করিস না মা, আবার দেখা যাবে। পালিয়ে যাবে কোথায়?”
আঁখি বলল “কে জানে, যা বৃষ্টি হচ্ছে কদিন ধরে। আচ্ছা বাবা মা এখনও ঘুমাচ্ছে কেন বলতো? সাতটা বাজতে চলল। বাড়িতে থাকলে এতক্ষণ যে কী করে বেড়াত!”
সোম বললেন, “থাক থাক। ঘুমাতে দে। যা ঝড় যায় কলকাতা থাকলে, কদিন বিশ্রাম করে নিক। তুই কি ছাদে একা ছিলি?”
আঁখি বলল “না না, ওই পাগলটাও ছিল”।
সোম বললেন “তাই ভাবি, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেল অথচ তুই তো আমাদের ডাকতে এলি না”!
আঁখি ঈষৎ লাল হল “ধ্যাত, কী যে বল না। আমি তো পাগলটার পাগলামি দেখছিলাম”।
সোম বললেন “তাই? তা কী কী পাগলামি দেখলি?”
আঁখি হাসতে হাসতে বলল “বলে কী না তোমাকে একটা গাড়ি ঠিক করতে বলবে। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা নাকি বেশি দূরে না, মাত্র দশ পনেরো কিলোমিটার”।
আঁখির হাসির শব্দে রাণীর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি ভাঙা গলায় বললেন “কী রে এত হাসি কীসের?”
আঁখি বলল “তুমি আজ বিশাল মিস করে গেছ মা, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেছিল”।
রাণী বললেন “ডাকলি না কেন?”
আঁখি আবার লাল হল, বলল “তোমরা ঘুমোচ্ছিলে, ভাবলাম যদি ডিস্টার্বড হও”।
রাণী কয়েক সেকেন্ড আঁখির দিকে তাকিয়ে বললেন “ডিস্টার্বড হব কেন খামোখা? কী যে বলিস না? একা একা ছাদে ছিলি?”
আঁখি বাবার দিকে তাকিয়ে বলল “উফ, সবাই একই প্রশ্ন করে যায় শুধু”।
সোম বললেন “না অর্ক ছিল তো ছাদে”।
রাণী হাসতে শুরু করলেন “ওহ, বুঝেছি বুঝেছি”।
আঁখি রেগেমেগে একটা কম্বলের তলায় ঢুকে গেল।
রাণী বললেন “আমাদের মেয়েটাও তো কম পাগল না, সেটা তো আমার থেকে ভাল কেউ জানে না, জানো কাল সারারাত আমাকে জড়িয়ে শুয়ে ছিল। এখনও বাজ পড়লে ভয় পায়, বোঝ!”
সোম বললেন “স্বাভাবিক। শহরে মানুষ হলে বাজে একটু ভয় পাবেই। তবে পাহাড়ের বৃষ্টি ভয় পাবার মতই। এক একটা রাস্তা ধ্বস নেমে বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে অশেষ দুর্ভোগ। পাহাড়ের কষ্ট পাহাড়ী লোকেরাই বোঝে। আমরা শহর থেকে সাত আটদিন থেকে চলে যাই। যারা থাকে তারাই জানে”।
রাণী বললেন “রুমকিরাই তো গত বছর, ভুলে গেলে? সিকিমে এসে আটকে গেছিল? জিনিস পত্রের সব দ্বিগুণ তিনগুণ করে দাম নিচ্ছে, বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। বৃষ্টি হলে আমার সেসব ভয়ই লাগে”।
আঁখি বলল “আর আমার মনে হয় হোটেলটা বোধ হয় গুড়িয়েই গেল। দেখ না কেমন খাদের ওপর হোটেল, আমার খুব ভয় লাগে”।
সোম বললেন “অত ভয় পেলে হয় না। বাড়িতে থাকলেও ভূমিকম্প হতে পারে মা। মনে নেই গত বছর? আমি তখন অফিসে, তুই ফোন করে কী চ্যাঁচামেচি শুরু করেছিলি? সব কিছুতে এত ভয় পাস কেন?”
আঁখি বলল “ভয় পাবার ব্যাপারে ভয় তো পেতেই হবে...”
আঁখির কথা শেষ হল না কলিং বেল বেজে উঠল। সোম একটু গলা তুলে বললেন “খোলা আছে”।
দরজাটা খুলল। অর্ক। বলল “একটু পেস্ট হবে আপনাদের কাছে? আমারটা কাল থেকে পাচ্ছি না। ব্যাগের কোন কোণায় ঢুকিয়ে ছিলাম চেক আউটের সময় ভুলে গেছি। সারা দিন কাল শুধু ব্রাশ আর জল দিয়ে কাজ চালিয়েছি। আজ আর হবে না”।
রাণী হাসলেন “বেসিনেই আছে, নিয়ে নাও”।
অর্ক “থ্যাঙ্কস” বলে বেসিন থেকে পেস্ট নিয়ে ব্রাশে লাগিয়ে মন দিয়ে দাঁত মাজতে লাগল। মুখ টুখ দিয়ে বলল “উফ, বাঁচালেন, পেস্টের অপর নাম জীবন, আজ বুঝতে পারলাম। নইলে কেউ আর কথা বলত না আমার সঙ্গে”।
সোম বললেন “আজ কি কোথাও যাবে না হোটেলেই কাটাবার প্ল্যান আছে?”
অর্ক বলল “আজ একটা কাজ করলে হয় না? আমি ভাবছিলাম পেলিং চলে গেলে কেমন হয়? উত্তরেতে একটা দারুণ হোম স্টে আছে”।
সোম কয়েক সেকেন্ড অর্কর দিকে তাকিয়ে বললেন “এত দূরে যেতে যেতে যদি কোথাও ধ্বস নামে তাহলে ফিরবে কী করে?”
অর্ক বলল “তাহলে তো ভালই হয়। ফিরতে কে চায়। ফিরলেই তো সেই থোড় বড়ি খাড়া, আর খাড়া বড়ি থোড়। ওই অফিস কি ভাল লাগে বলুন? আপনিই বলুন, আপনার অফিস ভাল লাগে?”
সোম বললেন “নাহ। সত্যিই ভাল লাগে না। মাঝে মাঝে মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে দিলেই ভাল হত”।
অর্ক বলল “তবে? তবেই বুঝুন? দেখুন কী করবেন বলুন, তাহলে উত্তরে যাওয়া যেতে পারে”।
সোম আঁখির দিকে তাকালেন “কী রে মা, যাবি?”
আঁখি বলল “চল। এ জায়গাটা একটু এক ঘেয়ে লাগছে এখন”।
রাণী বললেন “চল তো! ঘুরেই আসি”।
সোম বললেন “ওকে, আপনি, ইয়ে সরি তুমি তাহলে দেখো গাড়ি জোগাড় করতে পারো নাকি। আজ উত্তরেই যাওয়া যাক তবে”।
অর্ক বলল “দেখছি দেখছি, গাড়ি নিয়ে সমস্যা হবার কথা নয়”।
বলতে বলতে অর্ক বেরিয়ে গেল।
রাণী বললেন “দেখি, ছোকরা কোথায় নিয়ে যায়। কী বলিস মা?”
আঁখি কম্বলের তলা থেকে বলল “হু”।
১০।
“এরকম একটা নির্জন রাস্তায় একা একা হাঁটতে কেমন লাগে?”
আঁখি গাড়িতে যেতে যেতে নিজের মনেই কথাটা বলল।
অর্কর কানে গেল কথাটা। বলল “ভাল লাগে তবে খিদে পেলে বড্ড বিপদ। মাঝরাস্তায় খিদে পেলে ধরুন ফুচকা খেতে ইচ্ছা করল তখন কী করবেন?”
আঁখি রাগী গলায় বলল “খাওয়া ছাড়াও পৃথিবীতে অনেক কিছু আছে”।
অর্ক বলল “হ্যাঁ তা আছে, তবে খাওয়া বাদ দিলে কিছুই নেই। জীবন এবং পেট দুটোই ভারি গোলমেলে কী না!”
রাণী বললেন “অর্ক তুমি খেতে খুব ভালবাস না?”
অর্ক বলল “ব্যাপারটা ঠিক তা না। দেখুন, বেঁচে থাকতে হলে তো খেতে হবেই। এবার খেতে যদি হয়ই তাহলে এমন কিছু খেতে হবে যেটা খেলে বেঁচে থাকাটা আরও ভাল হয়ে যায়। আমি কি বোঝাতে পারলাম?”
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “খুব পারলে”।
আঁখি বলল “এই রাস্তায় আপনার এত কিছু থাকতে খাওয়ার কথাই মনে হল কেন?আপনি ব্রেকফাস্ট করেন নি?”
অর্ক বলল “করেছি তো, কিন্তু দেখুন, একে পাহাড়, তার ওপর বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি, খিদে পাবে না? আমার যেমন এখন খুব করে মোমো খিদে পাচ্ছে”।
রাণী বললেন “আমারও”।
সোম বললেন “ড্রাইভারকে বলব নাকি কোন রেস্তোরাঁয় দাঁড়াতে”?
আঁখি বলল “একদম না। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়াতে আমার একদম ভাল লাগে না”।
রাণী বললেন “এরকম বলে না মামণি, সবার কথা ভাবতে হবে তো তোকে”।
আঁখি গুম হয়ে বসে রইল।
অর্ক বলল “না না, অত তাড়া নেই, আমরা পেলিং পৌছেও খেতে পারি, অত খিদে পায় নি আমার। আমি তো এমনি কথায় কথায় বললাম”।
রাণী বললেন “আমার কিন্তু বাপু পেয়েছে। হলে খারাপ হত না”।
সোম ড্রাইভারকে বললেন কোন ভাল রেস্তোরাঁ দেখে দাঁড়াতে। ড্রাইভার বলল সামনে রাস্তা খুব খারাপ, পেলিং পৌছে দাঁড়ালেই ভাল হয়। রাণী বললেন “ঠিক আছে, তাহলে তাই হোক”।
সোম বললেন “কেক ছিল না? সেটা বের করা যাক বরং”।
রাণী খুশি হলেন “একদম, ভুলেই গেছিলাম দেখো”।
ব্যাগ থেকে কেক বের করে রাণী সবাইকে দিলেন। আঁখি নিল না। অর্ক কেক খেতে খেতে বলল “আচ্ছা অফিসে কেন রেইনি ডে থাকে না বলুন তো? কী ভালই না হত! বৃষ্টির জন্য যেদিন যাব না, পরের দিন বস এমনভাবে তাকাবে যেন আমি মার্ডার করে এসছি। মিনমিন করে কোন মতে যদি বলি স্যার বৃষ্টির জন্য আসতে পারি নি, উনি এমন ভাব করবেন যেন কোন বৃষ্টিই পড়ে নি আসলে, সবটাই আমি ঢপ মেরেছিলাম! যত্তসব!”
রাণী বললেন “তোমার আসলে এখনও স্কুলে পড়াই উচিত ছিল”।
আঁখি বলল “হ্যাঁ, নার্সারিতে”।
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “তোরও। তুইও তো বড় হোস নি এখনও”।
আঁখি বলল “কে বলেছে বড় হই নি, আমি যথেষ্ট ম্যাচিওরড”।
রাণী বললেন “যারা নিজেদের ম্যাচিওরড বলে তারা আসলে এখনও বড় হয় নি”।
আঁখি বলল “হুহ, বাজে কথা যত”।
বেশ কিছু বাচ্চা রেনকোট পরে রাস্তা দিয়ে স্কুলে যাচ্ছিল, অর্ক বলল “এই দেখুন, এই টুকু বাচ্চাদের রেইনি ডে নেই। বহত না ইনসাফি হ্যায় ইয়ে”।
সোম বললেন “ওদের অভ্যাস হয়ে গেছে। এইরকম প্রতিকূলতা ওদের সারাবছরই থাকে”।
রাণী বললেন “এখানে সবাই থাকতে পারে কী করে কে জানে, দেখো দেখো, কতটা সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হচ্ছে ওদের বাড়ি পৌঁছতে হলে”!
সোম বললেন “এইসব চত্বরে ল্যান্ড স্লাইডও একটা বড় ইস্যু”।
ড্রাইভার নেপালি ভাষায় বলল কয়েকদিন আগেই একটা রাস্তায় গাড়ি খাদে পড়ে গেছিল ট্যুরিস্ট সমেত। অর্ক বলল “এই জন্য আমার পাহাড় ভাল লাগে, এই আছি, এই নেই, চরম অনিশ্চয়তা। হাউ থ্রিলিং না?”
রাণী বললেন “রক্ষে কর বাপু এখন ওই সব কথা উচ্চারণ কোর না। তাছাড়া মামণিও এসবে খুব ভয় পায়”।
আঁখি রেগে বলল “আমি কেন ভয় পেতে যাব। আমাকে কি অত ভীতু মনে হয়?”
রাণী বুঝলেন অর্কর সামনে আঁখির ভয়ের কথা বলায় আঁখি রেগে গেছে। তিনি আরও রাগিয়ে দিতে দিতে বললেন “হ্যাঁ, কাল রাতে তুই যা ভয় পাচ্ছিলি বাজের শব্দে”...
অর্ক বলল “বলেন কী! ভয় পাচ্ছিলেন? আমিও তো! সারারাত জেগে বসেছিলাম, মনে হচ্ছিল হোটেলটা না গুড়িয়ে যায়। বাজ জিনিসটা আমি খুব ভয় পাই বুঝলেন?”
সোম বললেন “বাজে ভয় পাবারই কথা, তবে পাহাড়ে এসব খুব ন্যাচারাল ব্যাপার”।
আঁখি বলল “আমি মোটেও ভয় পাই না। এসব কথা বলবে না একদম মা”।
রাণী বললেন “আচ্ছা আচ্ছা পাস না, পাস না। তুই বীরকন্যা এক্কেবারে”।
অর্ক বলল “পাহাড়ের ডিসট্যানস জিনিসটা নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিত। সমতলের কুড়ি কিলোমিটার আর পাহাড়ের কুড়ি কিলোমিটারের মধ্যে হেল এন্ড হেভেন ডিফারেন্স!”
রাস্তা একটা জায়গায় সরু হয়ে এসছে, পিচের রাস্তা বলে আর কিছু নেই, পাহাড়ের গা বেয়ে ঝর্ণা নামছে, বাদিকটা খাদ, রাণী বললেন “দেখেছ? কী অবস্থা রাস্তার”!
সোম বললেন “পেলিং পৌঁছতে পৌঁছতে আজ ব্রেকফাস্ট হজম হয়ে যাবে, তারপর তো আবার উত্তরে যাবে বলছ”।
খানিকটা যাবার পর দেখা গেল অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। অর্ক গাড়ি থেকে নেমে একটু এগিয়েই ফিরে এসে হাসতে হাসতে বলল “কনগ্র্যাচুলেশনস। আজ মনে হয় এখানেই কাটাতে হবে। ধ্বস নেমেছে সামনে। রাস্তা বন্ধ”।
সোম এবং রাণী প্রায় একসঙ্গেই বললেন “সর্বনাশ!”
১১
আকাশের মুখ ভার। মেঘ করে আছে। যে কোন সময় বৃষ্টি হতে পারে। সামনে বেশ কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
আঁখি বলল “বাবা রাস্তা কখন ক্লিয়ার হবে?”
সোম বললেন “কে জানে, পাহাড়ের রাস্তা তো, কিছুই বলা যায় না”।
আঁখি বলল “সব ওর জন্য। ওর কথায় নাচার কী ছিল তোমাদের?”
সোম বললেন “এই কথাটা বলবি না কখনও মা। কেউ কাউকে নাচায় না। ওর প্রপোজালটা তো খারাপ ছিল না। রাস্তার ধ্বস কিন্তু নোটিস দিয়ে আসে না”।
আঁখি হতাশ হয়ে বলল “এবার কী হবে?”
সোম বললেন “আমি নেমে দেখি দাঁড়া কী অবস্থা”।
আঁখি বলল “না না, তুমি যাবে না”।
সোম হাসলেন “ধুর পাগল, কোন ভয় নেই। এখনই আসছি”।
রাণী বললেন “এই মেয়েটা সব কিছুতে ভয় পায়। আমরা তো গাড়িতেই থাকছি। বাবা যাবে না দেখতে কী হয়েছে?”
আঁখি কিছু বলল না।
সোম নেমে এগোলেন। অর্ক খানিকটা এগিয়ে গেছিল। দেখা গেল ধ্বস অনেকটাই। পুলিশের একটা গাড়ি এসছে। পুরো প্রক্রিয়াটাই বেশ ধীর গতিতে চলছে। একজন সিনিয়র অফিসার কোমরে হাত দিয়ে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন।
অর্ক বলল “অবস্থা তো কেরোসিন”।
সোম বললেন “হু”।
অর্ক বলল “তারপর? অর্ণব বোস কী বললেন?”
সোম একবার গাড়ির দিকে তাকালেন, গাড়ি থেকে অনেকটাই দূরে চলে এসছেন তিনি। বললেন “এখানে বলব?”
অর্ক বলল “সমস্যা কী? বলতে থাকুন, আমি দেখে নিচ্ছি”।
সোম বললেন “অর্ণব বোস... হু, তো অর্ণব বোস আমাকে ফোন করে প্রথমে খুব আপে তুললেন। তারপর জানালেন আমার প্রোমোশন নিয়ে তিনি খুবই চিন্তিত। এই ক্রুশিয়াল টাইমে যদি কোন বাজে কেসে আমার প্রোমোশন ঝাড় খেয়ে যায় তাহলে নাকি ওনার থেকে বেশি কেউ দুঃখিত হবে না”।
অর্ক বলল “ওহ, তারমানে হুমকি আর প্রলোভন মেশানো টক ঝাল মিষ্টি ব্যাপার স্যাপার?”
সোম বললেন “হ্যাঁ। একেবারেই তাই”।
অর্ক বলল “তারপর?”
সোম বললেন “তারপর বললেন উনি আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। উনি আমার বাড়িতে আসবেন না আমি ওনার বাড়িতে যাব! স্বাভাবিকভাবেই আমি বলি ওনার বাড়িতেই দেখা করতে যাব। সেটা শুনে বললেন বিকেল পাঁচটার দিকে যেতে, এবং তারপর ফোনটা কেটে দিলেন”।
অর্ক বললেন “আচ্ছা।”
সোম বললেন “আমি এরপর সুরেশ্বরের কাছে চার্জ বুঝতে গেলাম। ওর ঘরে তখন কেউ ছিল না। আমায় দেখে হাসতে হাসতে বলল “আরে লাহিড়ী, তুমিও শেষে আমার মতই ফেঁসে গেলে?” আমি অবাক হয়ে বললাম ‘ফেঁসে গেলাম মানে?’ কিছুক্ষণ ওর সাথে কথা বলে বুঝলাম এটা পুরোপুরি ওপেন এন্ড শাট কেস। অর্ণব বোসের ভাইপো উজ্জ্বল বোস প্রোমোটার। উঠতি ঘুড়ি। আর রত্নাকর আগরওয়াল বুড়ো ঘুঘু। ভাইপো কাকার ইনফ্লুয়েন্স নিয়ে উঠছিল রত্নাকর প্রাণপণ চেষ্টা করছিল সেটাকে বাধা দিতে, তিনজন পাবলিককে টাকা খাইয়ে পাতি খুন করা হয়েছে বুড়োকে”।
অর্ক বলল “আচ্ছা? শুরুতেই আপনাকে কনক্লুশন বলে দিল সুরেশ্বর?”
সোম হাসলেন “আমি তো জানতাম এটা অস্বাভাবিক না। সুরেশ্বর অনেক পুরনো এবং অভিজ্ঞ অফিসার”।
অর্ক বলল “এবং কোরাপ্টেডও”।
সোম বললেন “হু”।
অর্ক বলল “আপনি কিন্তু কোরাপ্টেড ছিলেন না মিস্টার লাহিড়ী”।
একটা জেসিবি মেশিন আসছিল। সোম সেদিকে তাকিয়ে বললেন “আপনি কি শুরুতেই কনক্লুশনে পৌঁছে গেলেন?”
অর্ক বলল “আমি এখন উত্তর মেলাচ্ছি লাহিড়ী বাবু। আমি ব্যাক ক্যালকুলেশনে বরাবরই খুব পাকা। অনেক উত্তর মেলানো এখনও বাকি। এরপরে বলুন”।
সোম বললেন “বিকেলে অর্ণব বোসের বাড়ি গেলাম। ঘরভর্তি বড় মেজো সেজো চামচা। আমি যেতেই অর্ণব আমাকে নিয়ে ভিতরের ঘরে নিয়ে গেলেন। বললেন ‘স্কচ খাবেন লাহিড়ীবাবু?’
আমি বললাম ‘সেসবের নেশা নেই’। অর্ণব বোস মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন ‘সিগারেট?’
আমি বললাম ‘না’। অর্ণব বোস তখন বললেন ‘ত্রিশ লাখ খাবেন?’”
অর্ক বলল “বাহ, খাবারের সিকোয়েন্সটা ভারি সুন্দর তো”।
সোম বললেন “হ্যাঁ। আমি তখন ওনাকে বললাম ‘আমাকে খামোখা টাকা দিতে যাবেন কেন?’ অর্ণব বোস বললেন ‘আপনারা আমাদের কাছের লোক। আমার কাজ শুধু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা। আপনার সঙ্গে আমি সম্পর্ক তৈরি করতে চাই। আপনি আমার ভাইপোকে চেনেন? ভারি সুন্দর গীটার বাজায়। ছোটখাট ব্যবসা করে। আচ্ছা একমিনিট, আমি পরিচয় করিয়ে দি’। ভাইপো এল। দশ আঙুলে দশটা আংটি। গলায় মোটা সোনার চেন। এসেই আমাকে সস্টাঙ্গে প্রণাম করল”।
আঁখি গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা শুরু করেছে। অর্ক বলল “এই দেখুন, এই রাস্তায় নামার কী দরকার ছিল, আপনি ওনাকে বলুন প্লিজ গাড়িতে গিয়ে বসতে”।
সোম বললেন “আমি ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি সায়নবাবু, আর অভিনয় করতে পারছি না”।
১২।

আঁখির দিকে এগিয়ে গেলেন সোম, “কী ব্যাপার মা? গাড়ি থেকে বেরোলি কেন?”
আঁখি বলল “ভাল লাগছে না বাবা, গাড়ির মধ্যে কত কথা বলব বল? তোমরা কী এত কথা বলছ?”
সোম বললেন “অর্ক ওর ঘোরার গল্প শোনাচ্ছিল”।
অর্ক সোমের পিছন পিছন এসছিল, বলল “আপনি খাদ পছন্দ করেন?”
আঁখি বলল “খাদ কেন পছন্দ করতে যাব?”
অর্ক খাদের দিকে আঙুল তুলে দেখাল, “দেখুন, কেমন একটা অদ্ভুত ডাক দিচ্ছে না খাদটা? মনে হচ্ছে না বলছে, চলে আয় চলে আয়”!
আঁখি সোমের দিকে তাকিয়ে বলল “কী বলব বল! এটা কোন কথা হল?”
অর্ক বলল “কেন? কেন কথা হবে না, সব কিছুর প্রাণ আছে, গাছের যখন আছে, খাদের থাকতে আপত্তি কোথায়? আপনি তাকিয়ে দেখুন, খাদের গাছেরা আপনাকে সত্যি সত্যি ডাকছে কি না?”
আঁখি কড়া চোখে অর্কর দিকে তাকাল। অর্ক সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে জেসিবি যেদিকে রাস্তা পরিষ্কার করছে সেদিকে হাঁটা লাগাল।
সোম হাসলেন “তুই গাড়িতে গিয়ে বস মা, মা একা আছে গাড়িতে”।
আঁখি বলল “আমার ভাল লাগছে না। কেমন দম আটকে আসছে গাড়িতে বসলে। খুব টেনশন হচ্ছে”।
সোম বললেন “টেনশন কিসের?”
আঁখি বলল “এখন ক’টা বাজে বাবা?”
সোম ঘড়ি দেখলেন “সাড়ে বারোটা বাজে। কেন?”
আঁখি বলছে, “আমার মনে হচ্ছে এখানে অন্ধকার হয়ে যাবে”।
সোম বললেন “ধুস, কী যে বলিস! ওই দেখ, অলরেডি কাজ শুরু হয়ে গেছে, আর বড় জোর আধঘন্টা”।
জেসিবিটা একটা পাথরকে রাস্তা থেকে সরানোর চেষ্টা করছে। আঁখি দেখে বলল “এই মেশিন দিয়ে হবে?”
সোম বললেন “হবে, ওরা এক্সপার্ট, এসব নিয়ে চিন্তা করিস না”।
একটা গাড়িতে একটা বাচ্চা চিল চিৎকার জুড়েছে, অর্ক জানলা দিয়ে বিভিন্ন মুখ ভঙ্গী করে বাচ্চাটাকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করছে। আঁখি সেদিকে তাকিয়ে বলল “দেখো, ওর বয়সী একজনকে পেয়েছে”।
সোম আঁখির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন একটা। আঁখি বলল “কী হল বাবা, তোমাকে কেমন মনমরা লাগছে মনে হচ্ছে?”
সোম হাসার চেস্টা করলেন “না রে মা, তেমন কিছু হয় নি। আচ্ছা, চ আমরা গাড়িতে গিয়েই বসি। তোর মাকে একা ছাড়া ঠিক হবে না”।
সোম হাঁটা শুরু করলেন। আঁখি পিছন পিছন আসতে আসতে বলল “আচ্ছা বাবা ধ্বস কি সারাবছরই নামে?”
সোম বললেন “নামে, তবে বর্ষাকালে ধ্বসের প্রোবাবিলিটি বেশি থাকে”।
আঁখি বলল “বর্ষাকালে ধ্বস বেশি নামে?”
সোম অন্যমনস্ক ভাবে বললেন “হ্যাঁ। বর্ষাকালটা খুব অপয়া সময় আসলে”।
আঁখি বিরক্ত হয়ে বলল “তুমি যে কী বল না বাবা, বর্ষাকাল অপয়া হতে যাবে কেন? আমার তো সবচেয়ে প্রিয় সময় বর্ষাকাল। কেমন একটা ভালো লাগা বল তো বৃষ্টিতে ভেজা!”
সোম বললেন “কোন কিছুই কি বেশি ভাল? সব কিছুই একসময় এসে এক ঘেয়ে হয়ে যায় আসলে”।
আঁখি জোরে জোরে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল “একদম এক ঘেয়ে হয় না, বর্ষাকাল সব সময় আলাদা। আমার কাছে সবসময় স্পেশাল”।
সোম কিছু বললেন না। একে একে গাড়ি এসে জড়ো হয়েছে। গাড়ির লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এই অফ সিজনেও এত গাড়ি আসে? সোম একটু অবাক হলেন। সবাই এলাকার নয়। ট্যুরিস্টও আছে দেখে বোঝা যাচ্ছে।
গাড়ির কাছে এসে জানলা দিয়ে মুখ বাড়ালেন সোম, রাণী চোখ বন্ধ করেছে, সোম ডাকলেন “তুমি এর মধ্যে ঘুমিয়ে নিচ্ছ? পারোও বটে!”
আঁখি বলল “মার তো এ এক আশ্চর্য গুণ, মা সব পরিস্থিতিতে ঘুমিয়ে নিতে পারে, ঈশ, আমি এই গুণটা মার থেকে পেলাম না কেন!”
রাণী চোখ খুলে বললেন “ঘুমাই নি, চোখ বুজেছিলাম শুধু”।
সোম বললেন “হ্যাঁ তুমি শুধু চোখই বুজে থাকো, ঘুমাও তো না”।
রাণী বললেন “আমার না খুব খিদে পেয়েছে। রাস্তা আটকে থাকলে খাব কী?”
সোম বললেন “আপাতত খিদেটা চাপা দিয়ে রাখো। বেশিক্ষণ লাগার কথা না। দেখা যাক কী হয়”।
বৃষ্টি শুরু হল। সোম দরজা খুলে আঁখিকে বললেন “ঢোক তাড়াতাড়ি, ভিজলেই নির্ঘাত জ্বর”।
আঁখি গাড়ির ভিতর ঢুকে বসল। সোম ঢুকে দরজা বন্ধ করে বললেন “বৃষ্টির ফলে না আবার রাস্তা পরিষ্কার করতে কোন সমস্যা তৈরী হয়”।
রাণী বললেন “দেখ তো মা, আমার ব্যাগের ভিতর একটা বিস্কুটের প্যাকেট আছে। ওটা খোল”।
আঁখি রাণীর ব্যাগ বের করে বিস্কুটের প্যাকেটটা বের করে রাণীকে দিল।
সোম বললেন “একটা জিনিস দেখবে, এতক্ষণ খিদে টিদে কিছু পাচ্ছিল না, এখন যেই দেখা গেল রাস্তা আটকে থাকার ভয়, এখন শুধু খিদে পাবে”।
অর্ক দৌড়তে দৌড়তে গাড়িতে এসে দরজা বন্ধ করল “উফ, কী বৃষ্টি! কী বৃষ্টি! এই বৃষ্টিতেই মনে হয় কবিরা কবিতা লেখে”।
আঁখি বলল “বৃষ্টিতে কবিতা লেখা ছাড়া লোকের আর কোন কাজ নেই?”
অর্ক বলল “আছে”।
আঁখি বলল “কী?”
অর্ক বলল “খিচুড়ি আর ডিমভাজা খাওয়া”।
১৩)
দুপুর সাড়ে তিনটে।
অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে, তার মধ্যেই রাস্তার এক দিক খুলে দেওয়া হয়েছে। জ্যাম একটু একটু করে ছাড়ছে। গাড়ি এগোচ্ছে শম্বুক গতিতে।
অর্ক বলল “যে টুকু জায়গা দিয়েছে গাড়ি বেরনোর জন্য, যে কোন সময় খাদে পড়ে যাবার চান্স আছে”।
আঁখি বলল “সব সময় অলুক্ষুণে কথা না বললে হয় না, না?”
অর্ক বলল “অলুক্ষুণের কী আছে? আরে আপনারা মৃত্যুটাকে এত সিরিয়াসলি নেন কেন বলুন তো? কথা আছে একটা জানেন না? জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য ইত্যাদি ইত্যাদি। ভাবুন তো যে লোকটা এভারেস্টে উঠছে, তার তো প্রতি মুহূর্তেই লাইফ রিস্ক থেকেই যায় একটা। কখন একটা ইয়েতি এসে পড়বে, তাহলেই তো গেল!”
আঁখি অবাক হয়ে বলল “ইয়েতি কোত্থেকে এল? ইয়েতি বলে কিছু হয় নাকি?”
অর্ক বলল “ইয়েতি হয় তো। কেন আপনি টেনিদা আর ইয়েতির গল্প পড়েন নি?”
আঁখি বলল “ওটা গল্প! তাছাড়া ওসব কিছু হয় না”।
অর্ক বলল “হতেই পারে। ধরুন আপনার পিছনেই একটা ইয়েতি চুপ করে বসে আছে আপনি দেখতে পাচ্ছেন না হয়ত। কিংবা রাতে খাটের তলায় একটা ইয়েতি ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকতেই পারে। পাহাড়ে এসব খুব বেশি হয়। আপনি জানেন না?”
রাণী শব্দ করে হেসে উঠলেন।
আঁখি মার দিকে রাগী রাগী চোখ করে তাকিয়ে বলল “দেখুন, আমাকে এইসব ভয় দেখাবেন না। আমি নার্সারির বাচ্চা নই”।
অর্ক পিছন দিকে তাকাল “সিরিয়াসলি? ভয় পান না তাহলে আপনি?”
আঁখি বলল “একদম না। আমাকে কী ভেবেছেন আপনি?”
অর্ক বলল “আমি কিন্তু ভীষণ ভয় পাই”।
আঁখি বলল “হ্যাঁ, সে কারণেই তো একা একা বেড়াতে চলে এসেছেন”।
অর্ক বলল “একা একা বেড়াতে এসেছি ঠিকই কিন্তু বিশ্বাস করুন, রাত্তিরে টয়লেট পেলে চেপে বসে থাকি, বলা যায় না, কোথায় একটা ইয়েতি লুকিয়ে আছে”।
আঁখি বলল “ইয়েতি লুকিয়ে আছে? আর কলকাতায় কী লুকিয়ে থাকে?”
অর্ক বলল “কলকাতায় ভূত আছে। ভূত ঠিক না, আমার ঘরের পিছনে একটা বট গাছ আছে, ওখানে একটা ব্রহ্মদত্যি থাকে। মাঝে মাঝেই দেখা হয়। হাই হ্যালো বলে। আমি পিজা এনে খেলে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকে। যখন বলি খাবে নাকি? তখন ব্যাজার মুখে বলে নাহ আমাদের হাওয়া খাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই”।
আঁখি বিরক্ত হয়ে বলল “উফ, আপনি কী পরিমাণ গল্প বানাতে পারেন!”
অর্ক বলল “বিশ্বাস না করলে কী করব বলুন? সবটাই তো বিশ্বাসের ওপর। আপনি জানেন না, ইয়েতির গায়ে বড় বড় লোম আছে, ব্লু ইয়েতির মার্কেট সব চেয়ে বেশি আছে, কেউ খুঁজে পেলে কয়েক কোটি টাকা পাবে। আমার সিকিমে আসার এটাও একটা কারণ তো, ইয়েতি ধরব। শোনা যায় তেনজিং নোরগে নাকি ইয়েতি দেখেছিলেন। আপনি শুনেছেন?”
আঁখি বলল “এগুলো সবই গল্প। আর শুনুন, আপনি আমাকে বাচ্চা মেয়ে পান নি যে ভর দুপুরে এসব বলে ভয় দেখাবেন”।
রাণী বললেন “হ্যাঁ, আমাদের মামণি ভর দুপুরে একদম ভয় পায় না। রাতে একটু আধটু ভয় পায় আর কী!”।
আঁখি মাকে একটা চিমটি কাটল।
সোম বললেন “আজ আর উত্তরে যাওয়া যাবে না বোধহয়”।
অর্ক বলল “হ্যাঁ, আর রিস্ক নিয়ে লাভ নেই। ড্রাইভার পেলিঙেই নিয়ে যাক। অবশ্য পেলিঙের থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা শুনেছি আরও কাছে। এরকম বৃষ্টি না হলে আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা ট্রাই নিয়েই ছাড়তাম বিশ্বাস করুন”।
কোথাও রাস্তা ভেঙে গেছে, কোথাও রাস্তা বলে কিছু অবশিষ্ট নেই, কাদাময় গোটাটাই। গাড়ির কাঁচ মাঝে মাঝেই সাদা হয়ে যাচ্ছে। মুছতে হচ্ছে।
আঁখি বলল “থাক অনেক হয়েছে। উফ, কখন যে পৌঁছব”।
রাণী বললেন “আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে”।
অর্ক ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে বলল “পেলিঙে গিয়ে খাবেন না গেজিঙে খেয়ে নেবেন। গেজিং থেকে পেলিং খুব একটা দূর নয়”।
রাণী বললেন “আমি আর পারছি না বাপু। ওই গেজে যাওয়া না কী বললে ওখানেই চল, আগে খেয়ে নি”।
সোম বললেন “হ্যাঁ, গেজিঙে খেয়ে নি। তারপর না হয় যাওয়া যাবে”।
অর্ক বলল “এখন কী খেতে হয় বলুন তো? একদম আগুন গরম ঝুরঝুরে ভাত, একটু ঘি, পেঁয়াজ লংকা দিয়ে মাখা আলুসেদ্ধ, আর ঝাল ঝাল চিকেন”।
আঁখি বলল “এটা কি কলকাতা পেয়েছেন যে এই বৃষ্টির দিনে আপনি এইসব পাবেন?”
অর্ক বলল “সত্যি, বেড়াতে গেলে এই তো সমস্যা। বাড়ির খাওয়ার কথা মনে পড়ে গেল। মা যা বদভ্যাস করে দিয়েছে ভাল খাইয়ে খাইয়ে, এই জন্যই তো কিছু হল না লাইফে। নইলে কবে সব কিছু ছেড়ে ছুঁড়ে পাহাড়ে ঘর বানিয়ে থাকতাম। মাকে আনা গেলে সব থেকে ভাল হত কিন্তু সে তো আর সম্ভব নয়। হয়ত নিয়ে এলাম, তারপরেই মা ফাটা রেকর্ড অন করে দিল কই রে আমার বউমা কই”?
অর্কর গলা বিষণ্ণ শোনাল।
রাণী বললেন “বিয়ে করলে যদি রেকর্ডটা বন্ধ হয় তাহলে তাই করতে পারো তো”।
অর্ক বলল “খেপেছেন? আমার বন্ধু দীপাংশু, সেম কেস, বিয়ের আগে ওর মা পাগল করে দিত বাবা বিয়ে কর বিয়ে কর বলে। সেই ছেলেই বিয়ের পর যেই একটু বউয়ের কথায় উঠতে বসতে শুরু করল, ওর বাড়ি গেলে কাকীমার এখন অন্য ফাটা রেকর্ড শুরু হয়, বউমা কত খারাপ, তার ছেলেকে তার থেকে দূর করে দিল, ঈশ... প্যাথেটিক”।
আঁখি বলল “আপনার বউ হওয়া উচিত হেডমিস্ট্রেসটাইপ কেউ। একটা বেত নিয়ে সব সময় আপনাকে শাসনে রাখবে”।
অর্ক করুণ গলায় বলল “কেন, আপনার কী ক্ষতি করেছি আমি যে আপনি আমাকে এই অভিশাপ দিচ্ছেন”।
আঁখি হাসতে শুরু করল।
অর্ক বলল “হাসুন হাসুন, মানুষের সুখ তো চোখে দেখতে পান না আপনি। হাসুন”।
গেজিং চলে এসছিল। ড্রাইভার একটা হোটেলে দাঁড়াল। রাণী বললেন “উফ, বাঁচলাম! আরেকটু দেরী হলে আমি হয়ত মরেই যেতাম”।
১৪
“পাহাড়ের সমস্যা হল এখানে দু মিনিট পর পর খিদে পায়। কিছুক্ষণের মধ্যে যা খাই তা হজম হয়ে যায়, আর তারপরেই যত ঝামেলা শুরু”।
কাঁটা চামচ দিয়ে চিলি চিকেনের পিসটাকে কায়দা করতে করতে বলল অর্ক।
রাণী বললেন “ তা যা বলেছ, দ্যাখো না, কলকাতায় থাকলে তো আমি যাই খেতাম তাতেই অম্বল হত। এখানে অন্তত সেই ঝামেলাটা পোহাতে হচ্ছে না”।
আঁখি বলল “এখানেই থেকে যাই চল। বাড়ি গিয়ে আর কী হবে? বাবার ওই অফিস অফিস অফিস! এখানে তাও বাবাকে পাচ্ছি। বাড়ি গেলে তো দিন নেই, রাত নেই, পুজো নেই, ক্রিসমাস নেই, নিউ ইয়ার নেই, সব সময় বাবা ডিউটিতে”।
রাণী বললেন “কী যে কপাল আমার! বিয়ের আগে তোর বাবা আমাকে বলেছিল মাথায় করে রাখবে। এখন দেখছি মাথা থেকেই বের করে দিয়েছে আমাদের”।
সোম বিরক্ত গলায় বললেন “আহ খাও তো”।
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “দেখেছিস সেই গায়ে লেগে গেল। আর কপালটাও দেখ, এত ডিউটি করে এত কিছু করে, তবু কী শুনতে হয়? ওহ, তোমার বর পুলিশে চাকরি করে, তা মাইনেতে হাত দিতে হয়? ইয়ার্কিচ্ছলে কথাগুলো বললেও ভীষণ গায়ে লাগে শুনতে”।
সোম অর্কর দিকে তাকালেন, অর্ক খাচ্ছিল, রাণীর কথা শুনে সেও হাসতে হাসতে বলল “আপনি বলতে পারতেন তো, আমাদের অনেক টাকা হয়ে গেছে রাখার জায়গা নেই, একদিন দু চারটে ব্যাগ নিয়ে আসবেন, ভাল করে টাকা গুছিয়ে দেব, নিয়ে যাবেন”।
রাণী চোখ বড় বড় করে অর্কর দিকে তাকিয়ে বলল “বাহ, এই কথাটা তো খুব ভাল বলেছ। এর পর থেকে আমি এটাই বলব। বিশ্বাস কর, এসব শুনতে আর ভাল লাগে না। চিরকাল পুলিশ কোয়ার্টারসের ছোট ছোট ঘরে থেকে এলাম, ছুটি ছাটার বালাই নেই,শখ আহ্লাদ তো ছেড়েই দিলাম, এত কিছুর পরেও লোকের এইসব কথা ভীষণ গায়ে লাগে”।
অর্ক বলল “ছাড়ুন। আচ্ছা শুনুন, পেলিঙে আর যাই হোক, আজ রাতে ভাত খেতে হবে। আমার এই ফ্রায়েড রাইস খেয়েও কেমন ভাতের খিদে পেয়ে গেল”।
রাণী বললেন “যা বলেছ। এই সব মোমো থুকপা ওই এক আধ দিন শখে খেলাম ঠিক আছে, ভাত ছাড়া ঠিক পোষায় না আমার”।
আঁখি বলল “আমার দিব্যি পোষায়। ভাত না খেয়ে রোজ রোজ মোমো খেতে পারি আমি। নো প্রবলেম। তবে এরা থুকপাতে কী একটা মশলা দেয়, খেতে ভাল লাগে না ঠিক। কলকাতার রেস্তরাঁগুলো অনেক ভাল থুকপা বানায় এদের থেকে। মোমো অবশ্য এখানে ভাল”।
রাণী বললেন “আমার কিছুই ভাল লাগে না। একটু ভাত, ডাল বেগুনভাজা খেতে পারলে বাঁচতাম”।
পাশের টেবিলে একজন ভাত আর তরকারি নিয়ে খেতে বসেছে। রাণী সেদিকে করুণ চোখে তাকালেন।
সোম বললেন “আগে বলতে পারতে। ভাত অর্ডার করতাম তোমার জন্য”।
রাণী বললেন “আগে কি ছাই জানতাম ভাত আছে? আমি তো ভাবলাম শুধু এইসবই পাওয়া যায়।”
আঁখি নিচু গলায় বলল “ওভাবে অন্য লোকের খাবার দেখতে নেই মা, এটা খুব বাজে! ঈশ!”
অর্ক বলল “কেন দেখবেন না আন্টি? কে কী খাচ্ছে একশোবার দেখবেন, আচ্ছা আমিও দেখছি”।
অর্ক বড় বড় চোখ করে ভাত তরকারির দিকে তাকিয়ে থাকল।
আঁখি রেগে মেগে বলল “যা ইচ্ছা করুন”।
সোম বললেন “তোমরা ভাত খাবে? বলব?”
রাণী বললেন “না না, থাক, আপাতত খেয়ে নি। আর আলাদা করে টাকা নষ্ট করতে হবে না। পেলিঙে পৌঁছে ভাত খাব এক্কেবারে”।
সোম বললেন “আচ্ছা তাই হবে। শুনেছি পেলিঙে প্রচুর বাঙালি হোটেল আছে, সেরকম কোন হোটেলে উঠলেই তোমাকে আর চিন্তা করতে হবে না”।
রাণী বললেন “হ্যাঁ। তাই কোর। আর এ ছাতার বৃষ্টিও থামতে চায় না। শীত পড়বে আজকে রাত্তিরে দেখো কেমন জাঁকিয়ে”।
সোম বললেন “বৃষ্টি তো হবেই, এখন বৃষ্টির মরসুম”।
রাণী বললেন “আর কখনও বৃষ্টির সময় পাহাড়ে এনো না প্লিজ, আজ ধ্বসের সময় খুব ভয় লাগছিল। ভালোয় ভালোয় এন জে পি ফিরতে পারলে হয়’।
আঁখি বলল “মা এখনও আমরা চারদিন আছি। কথায় কথায় ফেরার কথা বলে মন খারাপ করে দিও না তো!”
রাণী অর্কর দিকে তাকালেন “তুমি ক’দিন থাকবে অর্ক?”
অর্ক বলল “আমি? একমিনিট”। বলে কর গুণতে শুরু করল, কয়েক সেকেন্ড পর বলল “হিসাব করে দেখলাম আমিও ওই চারদিনই থাকব। তবে বলা তো যায় না পাহাড়ের ব্যাপার। যদি ধ্বস টস নামে তাহলে আরও সাতদিন। তারপরে যদি আবার ধ্বস নামে তাহলে আবার সাতদিন। এভাবেই ছুটিটা এক্সটেন্ড করে যাব”।
আঁখি বললেন “হ্যাঁ, আপনি এখানেই থেকে যান। তারপর পাহাড়ে আপনাকে ইয়েতিতে ধরবে”।
অর্ক বলল “ইয়েতিতে আমাকে ধরবে কেন, ইয়েতি তো মেয়েদের টার্গেট করে বেশি। আপনাকে ধরবে”।
আঁখি বলল “হ্যাঁ, জানা আছে। যত্তসব!”
সোমের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। উঠে কাউন্টারে গিয়ে বিল চাইলেন। অর্ক বলল “আপনি কি আমার বিলও দিয়ে দেবেন?”
সোম একটু থমকে দাঁড়াল “হ্যাঁ, কেন?”
অর্ক চামচ দিয়ে নুডলস বাগে আনতে আনতে বলল “আচ্ছা ঠিক আছে, আমিও কিন্তু একদিন খাওয়াব মনে রাখবেন হ্যাঁ”।
রাণী চোখ বড় বড় করলেন “বাবা! তোমার তো খুব আত্মসম্মান”!
অর্ক মাথা নাড়তে নাড়তে বলল “একদম। বাবা ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছে কখনও কারও ঋণ রাখতে নেই”।
রাণী বললেন “বাহ। তুমি দেখছি মাঝে মাঝে সিরিয়াসও হয়ে যাও”।
অর্ক বলল “আমি তো সিরিয়াস সব সময়। কেন আমাকে দেখলে সেটা মনে হয় না?”
রাণী আঁখির দিকে তাকিয়ে বললেন “বোঝ, ও নাকি সিরিয়াস!”
আঁখি বলল “সে তো বোঝাই যাচ্ছে, এখনই রাস্তা পরিষ্কার পেলে কাঞ্চনজঙ্ঘা চলে যেত”।
অর্ক খুশি হয়ে বলল “এটা কিন্তু আপনি একদম ঠিক বলেছেন”।
আঁখি মার দিকে তাকিয়ে বলল “এই দেখ সিরিয়াসনেস!”
১৫)
রাত ন’টা। পেলিং এর হোটেলে পাওয়ার নেই।
হোটেলের বাইরে অঝোরে বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। আঁখি বলল “বাবা, কারেন্ট আসবে না আজ?”
সোম বললেন “না মনে হয়। এইসব জায়গায় এমনিতেই পাওয়ারের সমস্যা হয়েই থাকে। তার ওপর যা দুর্যোগ চলছে!”
রাণী বললেন “জানো তো, আমার না এবার একটু ভয় ভয় লাগছে”।
সোম বললেন “কেন বল তো?”
রাণী বললেন “যে হারে বৃষ্টি পড়ছে, শুধু মনে হচ্ছে ফেরার দিন দেখা গেল রাস্তা পুরো বন্ধ হয়ে গেল। বলছি একদিন আগে থাকতেই শিলিগুড়ি নেমে গেলে হত না?তাছাড়া যা জামাকাপড় এনেছি সেসব তো কাচাও হচ্ছে না। এভাবে থাকা যায় নাকি?”
আঁখি প্রতিবাদ করল “একদম না, কিচ্ছু হবে না মা, তুমি এত চিন্তা কোর না তো! জামা কাপড় হোটেলে ঠিক শুকিয়ে যাবে। একদিন না হোক দুদিনে তো শুকোবেই। কাল আমি সব ধুয়ে দেব।”
সোম বললেন “দাঁড়াও, এখনই এত চিন্তা করার কিছু হয় নি। কালকের দিনটা দেখি, তারপর ডিসিশন নেওয়া যাবে”।
রাণী বললেন “তাই কোর”।
আঁখি বলল “হোটেলের ম্যানেজার বলল এই জানলা খুললেই নাকি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যায়”।
রাণী বললেন “তুই তো দেখেছিস একদিন। আবার তাহলে এত দেখার জন্য পাগল পাগল করছিস কেন?”
আঁখি বলল “কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখলে আশ মেটে না ঠিক আসলে। মনে হয় সারাদিন ধরে দেখে যাই। অদ্ভুত ফিলিং”।
সোম বললেন “স্বাভাবিক। তোর বয়সটা কম। এখন সহজেই কোন কিছুতে ইম্প্রেস হয়ে যাবি”।
আঁখি বলল “কেন? তোমাকে কাঞ্চনজঙ্ঘা ইম্প্রেস করে না?”
সোম বললেন “করে। কিন্তু প্রথম দেখার সময় যতটা করেছিল, এখন ততটা করে না”।
রাণী বললেন “আমার করে। তোমার আবার সবকিছুতেই বেশি বেশি। পুলিশে কাজ করে করে কাঠখোট্টা হয়ে যাচ্ছ কেমন যেন”!
আঁখি বলল “তা যা বলেছ। আচ্ছা বাবা, তুমি কীসে ইম্প্রেস হও তাহলে?”
সোম বললেন “একটা ইন্টারেস্টিং কেস। যেখানে মাথা খাটাতে হয়”।
রাণী বললেন “ওই দেখ, দেখেছিস? এই করেই আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেল”।
আঁখি বলল “সত্যি বাবা! তুমি এরকম কেন বলত?”
সোম বললেন “এক কাজ কর, এতই যখন অপছন্দ, বাবা চেঞ্জ করে নে। তোর মা কে বল ভাল দেখে একটা বাবা পছন্দ করে নিতে”।
আঁখি হিহি করে হেসে উঠল। রাণী রাগী গলায় বললেন “হ্যাঁ, এই তো কাজ হবে এখন আমার, বুড়ো বয়সে বর খুঁজতে বেরোব”।
আঁখি বলল “তারপর যাকে পেলে তাকে হয়ত বাবা গুলি করেই মেরে ফেলল, ঢিসুম ঢিসুম”।
সবাই জোরে হেসে উঠল।
রাণী বললেন “আচ্ছা ওই ভূতটা কী করছে বল তো এখন অন্ধকারে বসে?”
আঁখি হাসি না থামিয়েই বলল “ইয়েতির সঙ্গে খোশ গল্প করছে নির্ঘাত”।
সোম বললেন “ঠিকই বলেছ। আমি একবার গিয়ে দেখে আসি”।
রাণী বললেন “আমিও যাই?”
আঁখি বলল “না না, মা তুমি একদম যাবে না”।
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “জানি তো, তখন কত বীরত্ব দেখাচ্ছিলি মনে আছে?”
আঁখি বলল “বাইরের লোকের সামনে ওরকম একটু আধটু বীরত্ব দেখাতে হয়। তোমার তখন উচিত ছিল আমাকে হেল্প করা। তা না করে তুমি সবার সামনে ওসব বললে”।
রাণী বললেন “আচ্ছা বাবা, আর হবে না। খুশি। তা হ্যাঁগো, যাও গিয়ে খোঁজ নিয়ে আস। আর ডিনার কখন দেবে জানিও। খিদে পেয়ে গেল”।
সোম উঠলেন। বললেন “আচ্ছা,দেখছি”।
মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বেলে ঘর থেকে বেরলেন।
রাণী বললেন “হ্যাঁ রে মামণি, একটা সত্যি কথা বলবি?”
আঁখি বলল “কী”?
রাণী বললেন “তোর পাগলটাকে ভাল লেগেছে না?”
আঁখি বিরক্ত হয়ে বলল “মা! সব কিছু এক ফর্মুলায় না ফেললে হয় না তোমার না? এর আগে কলেজের ফার্স্ট ইয়ার থেকে তুমি প্রীতমকে নিয়ে সন্দেহ করে এলে। এখন একে নিয়ে করছ! কেন!”
রাণী বললেন “প্রীতমকে নিয়ে আমি কিন্তু কোন কালেই সিরিয়াস ছিলাম না, তোকে খ্যাপাতাম। তার কারণ ছিল, প্রীতমের চোখ দেখে আমার একটা সন্দেহ বরাবরই হয়েছে। যদিও তুই যে প্রীতমকে সেভাবে পাত্তা দিস না সেটা আমি বুঝেছিলাম পরে। কিন্তু অর্ককে দেখে বারবার যেভাবে তুই ছটফট করিস, ছদ্ম রাগ করিস, সব কিছু দেখে যা বোঝার ঠিকই বুঝেছি আমি”।
আঁখি বলল “তুমি ছাই বুঝেছ, কিচ্ছু বোঝ নি”।
রাণী আঁখির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন “মা কিন্তু সব বোঝে মামণি”।
আঁখি বলল “কিচ্ছু বোঝে না। তুমি তোমাদের জেনারেশন আর আমাদের জেনারেশনের মধ্যে তফাৎটাই বোঝ না। এরকম একটা খ্যাপা ছেলেকে তোমার কী দেখে মনে হল আমার পছন্দ হবে! এ তো নিজেকে সামলাতেই অস্থির হয়ে যায়, কোথায় কখন যাবে নিজে কিছুই ঠিক করতে পারে না। ও নিজেই জানে না ওর চাকরিটা থাকবে নাকি! ভাবতে পারো অফিসে ছুটির দরখাস্ত রেখে চলে এসছে! বি প্র্যাক্টিক্যাল মা। আমি অতটাও হাওয়ায় ভেসে চলি না যে আর পাঁচটা মেয়ের মত বোহেমিয়ান নেচারের কোন ছেলে দেখলেই তার প্রেমে পড়ে যাবে। তুমি ভাবলে কী করে এতকিছু? রিডিকিউলাস!”
রাণী কয়েকসেকেন্ড আঁখির দিকে তাকিয়ে বলল “তাই? আমি যা বললাম তার এগেইন্সটে এত গুলো যুক্তি সাজিয়ে দিলি? এটা কি আগে থেকেই ভেবে বসেছিলিস যে আমি কথাটা তুলব?”
আঁখি বলল “না। আমি এটাই ভাবি। আর যেটা ভাবি, সেটা ঠিকই ভাবি”।
রাণী বললেন “দেখা যাক। আমার কাছে আগে থেকে সারেন্ডার করে দিলে কিন্তু তোরই লাভ হত। পরে কিন্তু আমি তোকে চিনব না মামণি”।
আঁখি ঠোঁট ফুলিয়ে বলল “চিনো না। চিনতে হবে না তোমাকে। যত্তসব”!
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “খুব চিনেছি”।
১৬)
“পাহাড়ে লোডশেডিং জিনিসটা মন্দ না, তাই না মিস্টার লাহিড়ী”?
সোম অর্কর কথাটা শুনে মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ, ঠান্ডা থাকলে লোডশেডিঙে তো কোন কালেই প্রবলেম হয় না। তবে গীজার না চললে সমস্যা হবে”।
অর্ক বলল “আমার কোন সমস্যা হয় না। সেই ট্রেনিং নেওয়া আছে। তবে শুধু নিজের কথা ভাবলে তো হবে না। মানুষের কথা ভাবতে হবে। আমি ভাবি পাহাড়ের লোক বর্ষাটা কাটায় কী করে! এত প্রতিকূলতা! যাক গে, এইসব বাদ দি। আসল কথায় আসি। আপনি গল্পটা শেষ করতে এসেছেন তো?”
সোম বললেন “হ্যাঁ। বলুন আপনি কী জানতে চান?”
অর্ক বলল “তারপর কী হল? অর্ণব বোসের ভাইপো কী বলল আপনাকে? সেই দশ আঙুলে দশটা আংটি?”
সোম বললেন “উজ্জ্বল বোস। নায়কের মত চেহারা। টল, ফেয়ার, হ্যান্ডসাম। ওরকম একটা লোক এসে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলে অস্বস্তি হবারই কথা। আমারও হল”।
অর্ক থামাল, “আপনি পুলিশ অফিসার মিস্টার লাহিড়ী, এত সফট হবেন কেন?”
সোম বললেন “কোন কোন সময় অনেক কঠিন লোকও অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে যায় সায়নবাবু। আমি সফট হয়েছিলাম, সেটা কিন্তু বলি নি। বলতে পারেন, অপ্রস্তুত হয়েছিলাম”।
অর্ক বলল “বেশ। তারপর?”
সোম বললেন “উজ্জ্বল বোস প্রণাম সেরে মেঝেতেই হাসিমুখে বসে রইল। অর্ণব বোস বললেন ‘বুঝলেন লাহিড়ীবাবু, আমি নিঃসন্তান। আমার সব কিছু এই ভাইপোরই। সুতরাং বুঝতেই পারছেন ভাইপোর কিছু হলে আমি যেভাবে মানুষের সেবা করি সেটা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না’। আমি কিছুই জানি না, এভাবে বললাম ‘সে তো নিশ্চয়ই। আপনি যেভাবে মানুষের সেবা করেন তা আর ক’জন করে?’ অর্ণব বোস সে কথা শুনে ভারি খুশি হলেন, বললেন ‘তবেই বুঝুন। রত্নাকর আগরওয়ালকে তো আপনি চিনতেন না লাহিড়ীবাবু, এক নম্বরের ঘুঘু ছিল বুড়ো। আদাজল খেয়ে ভাইপোর পিছনে লেগেছিল’। অর্ণবের কথা শুনে আমি হাসলাম, কিছু বললাম না। অর্ণব বললেন ‘ভাল কেস পেয়েছেন আপনি। চিন্তার কোন কারণ নেই, সব আমরাই দেখে রাখব, আপনি আপাতত ক’দিন এদিক সেদিক ঘুরুন তদন্তের নামে, প্যাকেট ঠিক সময়ে পাঠিয়ে দেব। বুঝতেই পারছেন, মানুষের মেমোরির মত বাজে জিনিস আর কিছু হয় না। সময় যত এগোতে থাকে মানুষ তত ভুলতে থাকে। রত্নাকরের কেসটা নিয়ে দেখুন না ক’দিন ওই শুয়োরের বাচ্চা চ্যানেলটা কেমন লাফাল। তারপরেই একটা রেপ কেস চলে এল। তারপর সুন্দরবনের ডাকাতির কেসটা। ব্যস, ধীরে ধীরে মানুষ ভুলেই গেল রত্নাকর বলে কেউ ছিল। তো আপনার কাজটাও সেটাই, সময় কাটিয়ে দেওয়া, তদন্তের নামে দেখছি, দেখব করে এদিক ওদিক ভিজিট করা। তারপর ধীরে ধীরে কেসটা হালকা করে দিলেই হবে। চাপ নেবেন না, আপনার উপরতলাও আমি সেটিং করে রেখেছি। এই কেসটা যে সুরেশ্বর থেকে আপনার কাছে গেল সেটাও লোক দেখানো। আই ওয়াশ বলতে পারেন। আপনি তো আমাদেরই লোক মিস্টার লাহিড়ী’”।
অর্ক বলল “প্যাকেট মানে টাকার প্যাকেট?”
সোম বললেন “হ্যাঁ”।
অর্ক বলল “অর্ণব বোস যখন আপনাকে বললেন আপনি ওনাদের লোক, আপনার মনে হয় নি থুতু ফেলে ডুবে মরি?”
সোম হাসলেন “হ্যাঁ। সেটা মনে হয়েছিল। তবে আমি খানিকটা কনফিউজডও ছিলাম যে কী করে অর্ণব বোসের আমাকে নিজেদের লোক মনে হয়েছিল”।
অর্ক বলল “অপোনেন্ট পার্টির মিছিলের দিন আপনি খুবই অ্যাক্টিভ ছিলেন মিস্টার লাহিড়ী, মনে আছে আশা করি”।
সোম বললেন “হ্যাঁ, আমারও পরে সেটাই মনে হয়েছিল। তবে অপোনেন্ট পার্টি যেদিন মিছিলটা করেছিল, সেদিন আমার কিছু করার ছিল না, প্রোভোকেশনটা ওদিক থেকেই এসছিল। আর আমাদের ওপর স্ট্রিক্ট অর্ডার ছিল কিছুতেই যেন আমরা মেইন রোডের অন্যদিকে ওদের যেতে না দি। আমি আর অন্য কিছু ভাবতে পারি নি। তবে আমি কাউকেই মুখে মারি নি। প্রায় সবারই পায়ে লাঠি চার্জ করেছিলাম”।
অর্ক বলল “সেই ইনসিডেন্টটাই অর্ণব বোসের গুড বুকে আপনার নামটা তুলেছিল আর কী! যাই হোক, এরপর বলুন”।
সোম বললেন “উজ্জ্বল বোস গোটা সময় ধরে একটা কথাও বলে নি। নিস্পাপ সরল মুখ করে বসেছিল। আমি যখনই মাঝে মাঝে ওর দিকে তাকিয়েছি, ততবার আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল। ওকে দেখে কারও পক্ষেই বোঝা সম্ভব না, যে ব্যাটা পাক্কা ক্রিমিনাল। অর্ণব বোসের বাড়ি থেকে যখন বেরচ্ছি, তখন পিছন পিছন এল, গাড়িতে ওঠা অবধি একটা কথাও বলে নি। শুধু শেষে বলল ‘স্যার, আপনার বাড়িতে কাল সকালে ফার্স্ট ইনস্টলমেন্টটা পাঠাব?’ আমি বললাম ‘না, না। আমাকে এসব পাঠাবেন না প্লিজ, আমি পরে কনট্যাক্ট করব’। উজ্জ্বল আর কিচ্ছু বলল না’। বাড়িতে আসার পর সেদিন নিজের উপর অদ্ভুত একটা ঘেন্না এল। মনে হচ্ছিল পরের দিনই হেড অফিসে গিয়ে রেজিগনেশন দিয়ে আসি”।
ঘরের আলো জ্বলে উঠল। অর্ক বলল “বাহ। এই তো”।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অর্কর ঘরের কলিং বেল বেজে উঠল, অর্ক গলা তুলল “খোলা আছে”।
আঁখি এবং রাণী।
রাণী বললেন “দেখেছ, আমরা রুম থেকে বেরলাম আর পাওয়ার চলে এল! বলছি, তোমরা কি এখানেই গল্প করে যাবে? খাওয়া দাওয়ার কারও কোন ইচ্ছা নেই নাকি?”
১৭)
“উফ, মনে হচ্ছে কতদিন পর বাঙালি খাবার খাচ্ছি”।
আলুভাজা আর ডাল দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে বললেন রাণী। থালার পাশে ডিমের লাল লাল ঝোল অপেক্ষা করছে। দুটো করে ডিম।
হোটেলের মালিক বাঙালি। নিজেই তদারকি করছিলেন। রাণীর কথা শুনে বললেন “কাল আপনাদের চিকেন খাওয়াব ম্যাডাম। আজকে ডিমের বেশি করা গেল না”।
অর্ক বলল “রান্না কে করেছে দাদা? পুরো স্বর্গীয় তো রান্না বান্না। এই শীতে এরকম ধোঁয়া ওঠা ভাত, তার সঙ্গে এরকম রান্না, আনবিলিভেবল”।
ভদ্রলোক খুশি হয়ে বললেন “আমার ওয়াইফ স্যার। এখন কম লোকের রান্না তো, কোন অসুবিধা হয় না”।
সোম বললেন “আপনি এখানে পুরো ফ্যামিলি নিয়ে আছেন?”
ভদ্রলোক বললেন “হ্যাঁ, সেই নব্বই সালে এসে জায়গাটার প্রেমে পড়ে গেলাম। তারপর আর যাবার কথা ভেবে উঠতে পারলাম না”।
রাণী বললেন “এখানে থাকতে কষ্ট হয় না?”
ভদ্রলোক বললেন “হত। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। আমার ছেলে মেয়ে তো এখানকার স্কুলেই ভর্তি হয়ে গেছে। এখন এখানেই সেট হয়ে গেছি একবারে। কলকাতা গেলে বরং অস্বস্তি হয়। বেশিদিন থাকতে পারে না”।
সোম বললেন “গ্রেট, তা পেলিঙে তো কাঞ্চনজঙ্ঘা বাদে কিছু দেখার নেই, আছে কি?”
ভদ্রলোক বললেন “আর কী চাই বলুন তো! সূর্যের আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘার এক রূপ। ঘোর পূর্ণিমায় দেখলে বুঝতেন, সে রূপের কোন তুলনা নেই। অনেকেই আছে শুধু জ্যোৎস্নায় কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখবে বলে আসে। বারবার আসে। সারারাত দেখে যায়”।
অর্ক বলল “আপনি তো স্বভাব কবি মশাই”।
ভদ্রলোক হো হো করে হেসে উঠলেন “অনেক নীরস লোককেও কাঞ্চনজঙ্ঘা কবি বানিয়ে দেয়। আপনারা তো এসছেন বর্ষাকালে। কপাল ভীষণ ভাল না থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাবার কোন চান্সই নেই”।
আঁখি বলল “আমি দেখেছি, রাবাংলায়”।
ভদ্রলোক বললেন “সত্যিই কপাল ভাল আপনাদের। মানতেই হবে। নইলে যা চলছে ক’দিন ধরে”।
সোম বললেন “আচ্ছা, আপনারা ক’দিনের খাবার স্টক করে রাখেন?”
ভদ্রলোক বললেন “বর্ষার আগে যতটা সম্ভব করে রাখি। তবু বলা যায় না, সবই কপাল, কপালে থাকলে কিছুই যে করার থাকে না সেটা তো বুঝতেই পারেন”।
রাণী বললেন “সত্য! জীবিকার জন্য মানুষকে কী কী করতে হয় বল! কলকাতার লোক এই জায়গায় পড়ে আছে ভাবা যায় না!”
ভদ্রলোক হাসলেন “আপনাদের কলকাতার থেকে তবু কিন্তু ভাল আছি যাই বলুন”।
অর্ক বলল “তা যা বলেছেন। কলকাতা একটা জায়গা হল? দূর দূর! আমার একদম ভাল্লাগে না! সাধে কী সুনীল গাঙ্গুলি একে কংক্রিটের জঙ্গল বলে গেছিলেন! এখন তো আরও ভয়াবহ অবস্থা মশাই। উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম যেদিক দিয়ে পারছে কলকাতা বেড়ে উঠছে। একসময় দেখবেন একদিকে সুন্দরবন অন্যদিকে বনগাঁ অবধি কলকাতা বংশবিস্তার করেছে,যত্তসব!”
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “তোমার কি কলকাতার ওপর যত রাগ ওখানে তোমার অফিসটা আছে বলে?”
অর্ক বলল “না না শুধু অফিস কেন, কলকাতার ওপর আমার ছোট থেকেই রাগ। স্কুলটাও তো ওখানেই ছিল”।
সবাই হেসে উঠল, হোটেলের ভদ্রলোকও। বললেন “আপনি এক কাজ করুন না, এখানেই থেকে যান, আমার সঙ্গে। ব্যবস্থা করে দেব, একটা হোটেল লিজ নিয়ে নেবেন। মন্দ না কিন্তু লাইফটা। ভেবে দেখতে পারেন”।
অর্ক বলল “উহু, আমার সেরকম প্ল্যান না”।
রাণী বললেন “তবে কী রকম প্ল্যান?”
অর্ক বলল “হোমস্টে করব। ধরুন একটা নির্জন জায়গায় একটা বাংলো থাকবে। সন্ধ্যে বেলা বন ফায়ার হবে, গান হবে, আড্ডা হবে সারারাত ধরে, কোন এক খামখেয়ালী লেখক এসে থেকে যাবেন, তার কাছে জীবনের গল্প শুনব, জীবন দর্শন বোঝার চেষ্টা করব, বছরের প্রথম বরফ পড়বে যখন তখন দু চোখ ভরে সেসব দেখব, শুধু এই বিতিকিচ্ছিরি বর্ষাটায় পড়ে পড়ে ঘুমাব”।
হোটেলের ভদ্রলোক বললেন “বেশ রোম্যান্টিক চিন্তাভাবনা কিন্তু আপনার। আপনিও কবিতা লেখেন?”
অর্ক বলল “হ্যাঁ, লিখি কিন্তু লেখার পর সে লেখা নিজেই আর পড়তে পারি না, জিনিসটা ঠিক কবিতা হয় না তো আসলে। গবিতা বা খবিতা ধরণের কিছু একটা হয়”।
আঁখি বলল “গবিতা! সে আবার কী!”
অর্ক ভাবলেশহীন মুখে বলল “কবিতা যখন থার্ড গ্রেডেড হয় তখন সেটা গবিতা হয়। সেকেন্ড গ্রেডেড হলে খবিতা। আর যখন একেবারেই পড়া যায় না তখন ঘবিতা হয়ে যায়। আর ফেসবুকে যে কবিতা লেখা হয় তাকে ফবিতা বলা হয়। ফবিয়া+কবিতা= ফবিতা। আমার যেমন এখন ফেসবুক কবিতায় অনীহা ধরে গেছে”।
আঁখি গম্ভীর গলায় বলল “খুব বাজে কথা এটা। ফেসবুকে অনেক ভাল ভাল কবিতা পাওয়া যায়। আপনি একটু স্নব তাই বেশি হ্যাটা করে ফেললেন এটা বলে”।
অর্ক থতমত খেয়ে বলল “না মানে আমি আবেগের বশে বলে ফেলেছি। আমার এক বন্ধু আছে জানেন তো, ছেলেটা দিব্যি ছিল, হাসত খেলত ঘুরে বেড়াত, তা হল কী, একদিন ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলল। আর আমাকে একটার পর একটা কবিতা পাঠাতে লাগল। সেগুলো চবিতা বা ছবিতা বললেও অত্যুক্তি হয় না। সেগুলো থেকেই আমার ফেসবুকের কবিতার প্রতি কেমন একটা বদ হজম হয়ে গেল আর কী!”
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “সব থেকে খারাপ গ্রেড কোনটা?”
অর্ক গম্ভীর মুখে বলল “সেটা এখন গবেষণার পর্যায়ে আছে, তাই বলা যাবে না”।
আবার সবাই হেসে উঠল।
রাণী সোমকে বললেন “তোমার এককালে কবিতা লেখার শখ ছিল না”?
আঁখি বলল “রিয়েলি! এটা জানি না তো!”
রাণী বললেন “হ্যাঁ, এটা খুব সিক্রেট! তোর বাবার বিয়ের আগে একটা কবিতার বইও ছিল”।
অর্ক বলল “কবি পুলিশ অফিসার! ইম্প্রেসিভ কিন্তু মশাই!”
সোম হাসলেন “না না, সেসব চাকরিতে ঢোকার আগেই। কবিতা সব বাঙালিই লিখেছে বোধ হয় ওই সময়ে। যারা একটু বেশি উৎসাহী ছিল তারা বইও বের করেছিল। আমাকে তার মধ্যেই একজন ধরতে পারো। সেকেন্ড ইয়ারে পড়তে টাকা বাঁচিয়ে একটা দু ফর্মার কবিতার বই বের করেছিলাম। তাও নিজের নামে না, ছদ্মনামে। পাছে কেউ খারাপ বলে”।
আঁখি বলল “বইটা আছে?”
সোম রাণীর দিকে তাকালেন। রাণী বললেন “আছে, আছে, আমি ঠিক রেখে দিয়েছি”।
অর্ক বলল “আপনার ছদ্মনাম ছিল? ইন্টারেস্টিং! তা কী ছিল সেটা?”
সোম বললেন “কর্ণ”।
১৮
খাওয়া শেষে তারা হোটেলের বাইরে এসে দাঁড়াল। বৃষ্টি থেমেছে।
রাস্তায় লোকজন তেমন নেই। কয়েকটা হোটেলের আলো জ্বলছে। রাস্তা ভেজা। তবে পাহাড়ি রাস্তা বলে কোথাও জল দাঁড়িয়ে নেই।
আঁখি বলল “একটু হাঁটতে ইচ্ছা করছে আমার। সেই সকাল থেকে কখনও গাড়িতে আটকে আছি তো কখনও হোটেলে”।
সোম বললেন “না, আজ আর না, খানিকটা হেঁটে বৃষ্টি নামলে বিপদ হয়ে যাবে”।
অর্ক বলল “হ্যাঁ, আমার না এই খাওয়ার পরে হাঁটার কথা ভাবলেই কেমন একটা আতঙ্ক তৈরী হয়! তাছাড়া ভেবে দেখুন, রাস্তাঘাটে কোথায় গাছের আড়ালে ঘাপটি মেরে ইয়েতি বসে আছে, আপনি তো জানেন না সেটা”!
আঁখি বিরক্ত গলায় বলল “হ্যাঁ, ইয়েতির তো খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, আপনাকে ধরার জন্য গাছের আড়ালে বসে থাকবে”।
রাণী বললেন “দ্যাখ, হয়ত ইয়েতির অর্ককে পছন্দ না, তোকে পছন্দ”।
আঁখি বলল “উফ মা, তুমি প্লিজ, এই সব শুরু কোর না তো! আচ্ছা বাবা, আমাদের কালকের প্ল্যান কী?”
সোম বললেন “আমি তো কিছু ভাবি নি। অর্ক কি কিছু ভেবেছ?”
অর্ক বলল “হ্যাঁ, ভাবব না, কেন, ভাবাটাই তো আমার কাজ, অবশ্যই ভেবেছি। কাল আমরা উত্তরে যাব”।
আঁখি বলল “সেই হোমস্টে?”
অর্ক বলল “হ্যাঁ”।
আঁখি বলল “সরি। আমি যাচ্ছি না, আপনি যান। গিয়ে একা একা থাকুন। ইয়েতির সঙ্গে কুস্তি করুন। আমি এখানেই থাকব। পেলিঙেই লোকজন নেই, কে যাবে ওখানে!”
রাণী বললেন “সত্যি, অর্ক। এবার খ্যামা দাও। ওসব আর পারব না। আজকে ওই ধ্বসের জন্য আটকে থাকার সময়েই আমার অনেক শিক্ষা হয়ে গেছে”।
অর্ক কাঁধ ঝাঁকাল “আচ্ছা, তাহলে আমি একাই যাব”।
রাণী বললেন “সত্যি তুমি যাবে? ওখানে একা একা থাকতে পারবে?”
অর্ক বলল “সেটাই তো চ্যালেঞ্জ। একা থাকার মত চ্যালেঞ্জ আর কিসে আছে বলুন তো? আচ্ছা ছেড়ে দিন, আপনারা এখানেই রেস্ট করুন, আমি কাল উত্তরে চলে যাব”।
সোম অর্কর দিকে তাকিয়ে বললেন “তুমি সত্যিই চলে যাবে কাল?”
অর্ক বলল “হ্যাঁ। ওখানে আজ থেকেই বাংলোটা বুক করা ছিল। দুদিনের জন্য বুক হয়ে আছে। না গেলে খারাপ দেখাবে”।
সোম বললেন “কিন্তু না গেলে কার কাছে আর খারাপ দেখাবে?”
অর্ক বলল “যার কাছেই হোক। খারাপ তো দেখাবে। আমি কথা দিয়ে ওভাবে বিট্রে করতে পারি না। কেমন একটা অস্বস্তি হয়”।
আঁখি বলল “সেই ভাল। আপনি যান। নির্জন জায়গায় একা একা থেকে আসুন। আমি আর কোথাও যাচ্ছি না”।
রাণী বললেন “আমার তো কালকে সারাদিন ঘুমোতে ইচ্ছা করছে”।
আঁখি বলল “আমারও”।
অর্ক সোমের দিকে তাকাল “আপনার কী ইচ্ছা করছে? যাবেন নাকি?”
আঁখি রেগে গেল “বাবা কেন যাবে আপনার সঙ্গে? বাবার কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই?”
সোম হাসলেন “আমার কিন্তু একটু অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেলে ভালই লাগে। যাই হোক, আঁখি আর রাণী না গেলে আমি একা একা ওদের ছেড়ে রেখে যেতে পারব না। ব্যাপারটা একটু রিস্কি হয়ে যাবে আর কী!”
অর্ক বলল “সেটা ঠিক, আচ্ছা। আমি একা একাই ঘুরে আসি। আর কোন দিন দেখা হবে নাকি জানি না। কলকাতায় গেলে তো সেই অফিস টু বাড়ি আর বাড়ি টু অফিস। ধুস! আর দেখা হবে না কোন দিন। আচ্ছা, চলতা হু, দুয়ায়ো মে ইয়াদ রাখনা”।
রাণী অবাক হয়ে বললেন “তোমার সঙ্গে কি আর সত্যি সত্যিই দেখা হবে না?”
অর্ক বলল “হ্যাঁ, কী করে হবে? উত্তরের হোম স্টেতে আমি কদিন থাকব তা এখনো বলতে পারছি না তো!”
রাণী বলল “কদিন থাকবে মানে! তোমার ফেরার টিকিট কবে?”
অর্ক বলল “আমার ফেরার কোন কিছু ঠিক নেই তো! ট্রেনের টিকিট কাটি নি”।
রাণী বললেন “ওহ, ফ্লাইটে ফিরবে?”
অর্ক বলল “হ্যাঁ। দেখি যদি টাকা বাঁচাতে পারি, নইলে ট্রেনে জেনারেল কামরায় উঠে যাব। কলকাতায় গিয়ে তো আবার চাকরি খুঁজতে হবে। এ যাত্রায় তো মনে হয় চাকরিটা বাঁচাতে পারলাম না”।
আঁখি বলল “আপনাকে কোন সুস্থ বসই চাকরিতে রাখবে না। যদি না আপনার মতই পাগল হয়”।
রাণী বললেন “এই মামণি, কী সব বলছিস!”
আঁখি বলল “ভুল কী বলেছি? ঠিকই তো বলেছি। যে লোক ছুটি নিজের টেবিলে লিখে চলে আসে তাকে কেউ চাকরিতে রাখে না”।
সোম বললেন “ব্যতিক্রম আছে। যদি সে সুপার এফিসিয়েন্ট কেউ হয়। তখন বস সেগুলো কনসিডার করেন। তবে ওদের অফিসে সেরকম কিছু কনসিডার করা হয় নাকি জানি না’।
অর্ক হাসতে হাসতে বলল “আমি শিওর, আমার চাকরি নেই। আমার বস ওসব একেবারেই কনসিডার করেন না”।
রাণী বললেন “তাহলে কলকাতায় গিয়ে কী করবে?”
অর্ক বলল “আমি কলকাতায় যাব কে বলল? সেরকম হলে এখানেই থেকে যাব!”
সোম অর্কর দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে বললেন “উত্তরে এখান থেকে কত দূর?”
অর্ক বলল “খুব বেশি দূর না। পনেরো ষোল কিলোমিটার হবে। তবে রাস্তা কেমন সেটা বলতে পারছি না”।
আঁখি বলল “আমি কোথাও যাচ্ছি না কাল। যে যেখানে ইচ্ছা যাক”।
অর্ক বলল “এই করেই তো বাঙালি শেষ হয়ে গেল। আপনার মত কলম্বাস ভাবলে কি আর ব্রাজিল আবিষ্কার হত?”
আঁখি বলল “কলম্বাস ব্রাজিল আবিষ্কার করেছিলেন?”
অর্ক বলল “ওই হল। যাহা ব্রাজিল তাহাই কলম্বিয়া”।
আঁখি বলল “কলম্বিয়া! উফ ডিসগাস্টিং। মা! আমি ঘুমাতে গেলাম। তুমি যাবে তো চল”।
রাণী বললেন “আচ্ছা চ, এই তুমিও আস”।
সোম বললেন “তোমরা যাও, আমি আসছে একটু পরে”।

১৯)

রাণী ঘরে এসে বললেন “পাগলটা তাহলে শেষ মেষ চলেই যাচ্ছে”।
আঁখি বলল “হু। ভাল হয়েছে। যাক। একা একা পাগলামি করুক”।
রাণী বললেন “তোর কি যেতে ইচ্ছা করছে?”
আঁখি খাটের উপর বসে রাণীর দিকে তাকিয়ে বলল “আমার কেন যেতে ইচ্ছা করবে? কী পাগলের মত কথা বলছ বল তো?”
রাণী বললেন “সেই। কাল অবশ্য চাইলেও যাওয়া হত না। এত জামাকাপড় ধুতে হবে”।
আঁখি বলল “জানি তো। তাছাড়া এরকম বিচ্ছিরি বৃষ্টিতে কোথাও যাওয়াটাও অসম্ভব”।
রাণী বললেন “আগের বছর মেঘনারা উত্তরে গেছিল। দারুণ নাকি”।
আঁখি বলল “নিশ্চয়ই এই বৃষ্টিতে আসেনি মাসীরা?”
রাণী বললেন “তা ঠিক। গরমের সময়ে পাহাড় তো এক্কেবারে গিজগিজ করে। তোর মেসোর তো আর ছুটির অভাব নেই। ওরাই কী সব সার্চ টারচ করে উত্তরেতে হোমস্টের খোঁজ পেয়েছিল”।
আঁখি বলল “এর পরের বার আমি মাসীদের সাথেই ঘুরতে যাব। অনেকবার বলেছিল এবার। এরকম সময়ে বেড়াতে যাওয়া মানে কলেজও হ্যাম্পার হয়”।
রাণী বললেন “এরকম বলিস না। তোর বাবার কথাও ভাব। বেচারা কোথাও যেতেও পারে না”।
আঁখি বলল “বাবা তো এবারেও আসতে পারছিল না। তখন কী হত? গত বছরও আমরা কোথাও যেতে পারি নি। তাছাড়া বাবার সব কিছুতেই একটু বেশি বাড়াবাড়ি। হালদার আংকেলকে দেখেছ কত তাড়াতাড়ি কোয়ার্টারে ফিরে আসে? বাবা কেন পারে না?”
রাণী বললেন “বিকজ হি ইজ দ্য বেস্ট। আর তুইও সেটা জানিস। জানিস না?”
আঁখি গোঁজ হয়ে বসে রইল। বলল “সেই ফিরে যাব। সেই এক লাইফ। বাবা কখন ফিরবে সারাদিনের শেষে বসে থাকো। কোথায় পুলিশের সঙ্গে জনতার মারপিট হয়েছে, টেনশন নিয়ে বসে থাকো। বাবার কিছু হল না তো? বন্ধুদের কাছ থেকে মাঝে মাঝে টিজ শোনা বাবাকে নিয়ে, ভালো লাগে না বিশ্বাস কর”।
রাণী বললেন “টিজ শোনা ভাল তো। সেটা ভিতরে ভিতরে তোকে স্ট্রং করে দেয়। তুই আমি না চাইতেও আর পাঁচটা ফ্যামিলির লোকজনদের থেকে আমরা অনেক বেশি ভিতর থেকে স্ট্রং। আচ্ছা তুইই বল, প্রথম প্রথম যেভাবে তুই রি অ্যাক্ট করতিস এদের কথায়, এখন আর করিস?”
আঁখি উত্তর দিল না।
রাণী বললেন “আমাদের যখন বিয়ে হয়েছিল তখন তোর বাবা কত আর মাইনা পায়! কিন্তু আমাদের সবাই, ইনক্লুডিং আমার বাপের বাড়িরও অনেকে, কিভাবে ঘুরিয়ে পেচিয়ে কথা শোনাত। তোর বাবা তখন বাড়িতে থাকত না। আমি একা একা শুয়ে শুয়ে কাঁদতাম। সারাদিন মন খারাপ হয়ে থাকত। একদিন নিজেই নিজেকে বললাম কেন আমি এগুলো করছি! আমায় এভাবে বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে বলছে, আমি কাঁদি, ওরাও তো সেটাই চায়। আমি কেন ওরা যেটা চাইবে সেটা করতে যাব। এখন তো আমিও ওদের ইয়ার্কিটাই হাসতে হাসতে ঘুরিয়ে ওদের কাছেই ফিরিয়ে দি। যখন কারও গাড়ি আটকায় কিংবা কারও মেয়েকে কেউ টিজ করে, তখন কিন্তু সোম লাহিড়ীর কাছেই আসতে হয়। হ্যাঁ, এখনও হয়ত পুরোপুরি শক্ত হতে পারি নি। কিন্তু প্রথম দিনটার তুলনায় তো অনেকটাই হয়েছি। সেটাই বা কম কী?”
আঁখি বলল “আমার মাঝে মাঝে খুব ডিপ্রেসন আসে মা। ভাল লাগে না মাঝে মাঝে কিছু। বাবা চাকরিটা ছেড়ে দিতে পারে না?”
রাণী হেসে ফেললেন “না পারে না। কে খাওয়াবে আমাদের?”
আঁখি রেগে গেল “সব কিছুতেই হাসো কেন বল তো? এতে হাসির কী বললাম?”
রাণী বললেন “হাসিটা আছে বলেই তো বেচে আছি। যেদিন হাসিটা থাকবে না, দেখবি সব শেষ হয়ে গেছে”।
আঁখি মাকে জড়িয়ে ধরল। বলল “কিচ্ছু শেষ হবে না। এভাবে বোল না প্লিজ”।
রাণী বললেন “এবার একটা কথা বল তো”।
আঁখি বলল “না আমার উত্তরে যাবার কোন ইচ্ছা নেই”।
রাণী আবার হেসে ফেললেন।
আঁখি বলল “আমি কাল জানলা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখব”।
রাণী বললেন “যদি মেঘ না থাকে তবেই। সেটা বললি না?”
আঁখি বলল “মেঘ থাকবে না। মিলিয়ে নিও। আমি জানি”।
রাণী বললেন “কী করে জানলি?”
আঁখি বলল “বললাম তো, মিলিয়ে নিও। একদম পুজোর আকাশের মত নীল আকাশ থাকবে কাল”।
রাণী বললেন “আচ্ছা আমাদের ওখানে শরৎকালে যেরকম আকাশ থাকে পাহাড়েও কি তাই থাকবে? আমার খুব পুজোর সময় পাহাড়ে আসার ইচ্ছা”।
আঁখি বলল “পুজোর সময় আমি কলকাতা ছেড়ে কোথাও নড়ছি না মা। সরি”।
রাণী বললেন “হ্যাঁ হ্যাঁ। সেটা আমি জানি। পুজোর আড্ডা না হলে তো তোমার সারাবছর ভাত হজম হবে না”।
আঁখি বলল “ইয়েস। একদম। ভুলেও অন্য কোন প্ল্যান করবে না”।
রাণী উঠলেন। জানলা দিয়ে দেখলেন সোম এবং অর্ক কথা বলছে। অবাক হয়ে বললেন “আচ্ছা তোর বাবা অর্কর সঙ্গে এত কী কথা বলে বলত?”
আঁখি গম্ভীর হয়ে গেল, “আমি কী করে জানব! বাবাকেই জিজ্ঞেস কোর এলে!”
২০)
“আপনি কি সত্যিই চলে যাবেন?”
অর্ক বলল “হ্যাঁ। চলে যাব”।
সোম বিস্মিত হয়ে বললেন “তারপরে?”
অর্ক বলল “আপনি ভগবানে বিশ্বাস করেন মিস্টার লাহিড়ী?”
সোম অবাক হলেন “কেন বলুন তো?”
অর্ক বলল “একটা প্রচলিত বিশ্বাস আছে ভগবানে বিশ্বাস করলেই তো মানুষ ইহকাল পরকাল নিয়ে ভাবে। পাপ পুণ্য নিয়েও”।
সোম বললেন “নট নেসেসারিলি। অর্ণব বোসের বাড়িতে ঢুকতেই বিরাট একটা মন্দির পড়ে। তাতে কি অর্ণব বোস নিস্পাপ হয়ে যায়? বহু দুর্নীতিগ্রস্থ মানুষ ভগবানের আশ্রয় নিয়ে ভাবে আমার আর কেউ কোন ক্ষতি করতে পারবে না”।
অর্ক একটা শিস দিয়ে উঠল “ওহ, আপনি নাস্তিক?”
সোম বললেন “নাস্তিক নই, আস্তিকও নই। আমার স্ত্রী পুজো করেন নিয়ম করে, প্রসাদ দেন খাই। ওটুকুই। লোক দেখানো জিনিস আমার আসে না”।
অর্ক বলল “সেটা ভাল ব্যাপার। যাক গে যেটা জিজ্ঞেস করছিলেন সেটার উত্তর দি। হ্যাঁ আমি কাল উত্তরে চলে যাব। এটা কনফার্ম”।
সোম বললেন “একটা ইনভেস্টিগেশন মাঝপথে রেখে আপনি নির্জন পাহাড়ে একা একা বসে থাকবেন?”
অর্ক হাসল “তা না, আমাদের দেখা ঠিকই হবে লাহিড়ীবাবু। যাই হোক, আমরা মনে হয় আপনি বাড়ি ফেরার পর থেকে আটকে আছি। তারপর বলুন। পরের দিন কী করলেন?”
সোম বললেন “পরের দিন না। সেদিন রাতেই আমি সুরেশ্বরকে ফোন করলাম”।
অর্ক বলল “কী বললেন সুরেশ্বর”?
সোম বললেন “আমি যখন ফোন করেছিলাম তখন রাত দশটা হবে। ফোনটা রিং হয়ে গেল। ধরল না। রাত বারোটা নাগাদ, আমি তখন কয়েকটা কেস হিস্ট্রি নিয়ে পড়াশুনা করছিলাম, দেখি সুরেশ্বর ফোন করছে। ধরলাম। সুরেশ্বর প্রথমেই বলল ‘সরি লাহিড়ি আমি তখন অর্ণব বোসের বাড়িতে ছিলাম’। আমি জিজ্ঞেস করলাম তুমি গেছিলে না তোমাকে ডেকছিল। সুরেশ্বর বলল ডেকেছিল। এবং তোমাকে নিয়েই একগাদা প্রশ্ন করল”।
অর্ক বলল “বাহ। সুরেশ্বর তো বেশ অনেস্ট কোরাপ্টেড অফিসার তো! আপনাকে নিয়ে কালচার করল, সেটা আবার আপনাকেই শুনিয়ে দিল!আপনি ওর সব কথাই বিশ্বাস করলেন?”
সোম হাসলেন “না করার কোন কারণ তো দেখি নি। কাক কি কাকের মাংস খায়?”
অর্ক বলল “হু। সেটা ঠিক। আচ্ছা, তারপর কী বললেন?”
সোম বললেন “সুরেশ্বর জানাল অর্ণব বোস চাইছে কেসটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ধামাচাপা পড়ুক। আমাকে দিয়ে কিভাবে সেটা সম্ভব সে ব্যাপারেই আলোচনা করতে ডেকেছিল”।
অর্ক বলল “তো কী প্ল্যান হল সে নিয়ে কিছু বলল?”
সোম বললেন “আমাকে সুরেশ্বর বেশ কিছু সাজেশন দিল। আমি সে সবই শুনলাম। হু হাঁ করে গেলাম। সেসব নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলছি না। তবে সুরেশ্বর ফোন রাখার পরেই আমি ঠিক করলাম পরের দিন আমার প্রথম কাজ হবে রত্নাকর আগরওয়ালের ফ্ল্যাটে যাওয়া। কেমন যেন নিজের অজান্তেই একটা রোখ চেপে গেল, দেখি না নদীর ওপাশেও কেউ বলার জন্য আছে নাকি!”
অর্ক বলল “এবং সেখানে গিয়েই আপনি গিয়েই আপনি সুরভী জয়সওয়ালের খোঁজ পেলেন। প্রথম দিনেই।”
সোম কয়েক সেকেন্ড থমকে বললেন “আপনি সুরভীর ব্যাপারটা জানেন এটা আমি বুঝে গেছিলাম যখন আপনি কম্বিনেশন লকের প্রসঙ্গটা এনেছিলেন”।
অর্ক বলল “হ্যাঁ। সেটাই স্বাভাবিক। আচ্ছা বলুন তারপর?”
সোম বললেন “রত্নাকর আগরওয়ালের বালিগঞ্জে বাড়ি। সুন্দর দোতলা বাড়ি। অনেক খানি জায়গা জুড়ে। কলকাতার বুকে ও বাড়ির বাজারদর আকাশছোঁয়া এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আমি যখন গেলাম তখন দেখলাম রত্নাকরের বড় ছেলে কিশোর আগরওয়াল বাড়ির বাইরে বসে ওদের বড় শেভ্রলে গাড়িটা মুছছে। আমি একাই গেছিলাম, তবে ইউনিফর্ম ছিল। আমি গিয়ে পরিচয় দিতে কিশোর আমায় সাদরে ঘরের ভিতর নিয়ে গেল। রত্নাকরের দুই ছেলে। কিশোর এবং সুবোধ। দুজনেই বিবাহিত। দুজনেরই অনেক রকম ব্যবসা। আমি যেতে সুবোধও বেরিয়ে এল”।
অর্ক বলল “বুড়ো মারা যাবার পরে বাড়ির ভাগ বাটোয়ারা হয়েছে?”
সোম বললেন “হয়েছে। অবশ্য বুড়ো বেচে থাকাকালীনই সেটা হয়েছিল। নিচের তলাটা কিশোরের উপরের তলাটা সুবোধের। রত্নাকর কিশোরের সঙ্গে থাকতেন”।
অর্ক বলল “দুই ভাই নিশ্চয়ই বাবার মার্ডারার যাতে ছাড় না পায় তার জন্য হাতে পায়ে ধরলেন?”
সোম বললেন “না। ওরা একেবারেই সেই লাইনে গেল না। ওই কথাতেই ঢুকল না। যেন আমি কোন মতে বাড়ি থেকে গেলেই ওরা বাঁচে”।
অর্ক বলল “মন্ত্রীর ভয়ে?”
সোম বললেন “আমারও তাই মনে হয়েছিল। আমি আধ ঘন্টাখানেক ওদের সঙ্গে রত্নাকর সম্পর্কে বেশ কিছু কথা বলার পরেও যখন বুঝলাম আদতে এদের পেট থেকে বোম মারলেও যে কথাটা আমি শুনতে চাইছি সেটা বেরোবে না তখন ওই বাড়ি থেকে চুপচাপ বেরিয়ে গেলাম”।
অর্ক বলল “কিশোর বা সুবোধের বউয়ের সঙ্গে কথা হয় নি? ওদের বাচ্চা কাচ্চা ক’জন?”
সোম বললেন “কিশোর নিঃসন্তান। ওর বউ রাধিকা আগরওয়াল। হাউসওয়াইফ। এক ফাঁকে এসে আলাপ করে গেলেন। মুখ দেখে কিছুই বোঝার উপায় নেই। সুবোধের বউ নিধি আগরওয়াল। দ্যাট ফেমাস স্কিন স্পেশালিস্ট। ওদের এক ছেলে। ভুবন আগরওয়াল। ক্লাস ফোরে পড়ে। নিধির সঙ্গে আমার কোন কথা হয় নি। সে সময় ছিল না”।
অর্ক বলল “বেশ। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় গেলেন?”
সোম বললেন “পল্টুকে ফোন করলাম। ইনফরমার। পল্টু রত্নাকর নামটা শুনেই বলল ‘স্যার সুরভীর বাড়ি না গেলে রত্নাকর কেস ঘেঁটে কিছুই বুঝতে পারবেন না’। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম ‘সুরভী কে?’ পল্টু বলল ‘এলাকার সবাই জানে, রত্নাকরের আসলে দুটো বউ। একটা বউ যে মরে গেছে, আরেকটা বউ যাকে রত্নাকর বালিগঞ্জ হাইটসে সব থেকে উঁচু তলায় ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছিল”।
তারা কথা বলছিল রাস্তায় দাঁড়িয়ে। নিস্তব্ধ হয়ে এসছে চারদিক। বৃষ্টির পরে প্রকৃতি যেন বিশ্রাম নিচ্ছিল।
সোমের কথা শুনে অর্ক কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল এই সময় একটা গাড়ির জোরাল হর্নের শব্দ শোনা গেল। সোম রাস্তার মাঝবরাবর ছিলেন। অর্ক রাস্তার একপাশে।
গাড়িটা যখন তাদের কাছে চলে এসছিল সোম কোনমতে রাস্তার একপাশে যেতে সক্ষম হলেন। গাড়িটা প্রবল গতিবেগে চলে গেল।
সোম বললেন “পাহাড়ে এরকম জোরে গাড়ি চালায় নাকি! এরা কি পাগল”?
অর্ক হাসল “পাগল নাকি বলতে পারব না কিন্তু কলকাতার নম্বরের গাড়ি ঘোর বর্ষায় পাহাড়ে কী করছে সেটা একটা প্রশ্ন বটে”।
সোম অবাক হয়ে বললেন “কলকাতার নাম্বার? আপনি এর মধ্যে দেখলেন কী করে?”
অর্ক বলল “ইয়েস। দেখলাম কারণ অভ্যাস আছে এভাবে দেখার। নাম্বারটাও খুব চেনা চেনা লাগছে। দেখুন তো আপনার অফিসের বন্ধুমহলে ফোন করে নাম্বারটা কার, গাড়ির লোকজন পেলিঙেই বা কী করছে?”
২১
সোমের বিরক্ত লাগছিল। গত রাত থেকে মোবাইলে একটাও টাওয়ার নেই। হোটেলের ল্যান্ডলাইনও কাজ করছে না। ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছিলেন রাতে। ঘুম ভাঙল সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ। আকাশের মুখ ভার। আঁখি, রাণী দুজনেই ঘুমোচ্ছে।
সোম উঠে মুখ ধুয়ে ঘর থেকে বেরলেন। অর্কর ঘরে গিয়ে দেখলেন ঘর লক করা। রিসেপশনে গিয়ে জানতে পারলেন অর্ক ভোরেই হোটেল থেকে বেরিয়ে গেছে।
বিস্মিত হয়ে রিসেপশনে বসে থাকলেন কিছুক্ষণ।
“খবরের কাগজ পড়বেন স্যার?”
হোটেলের বাঙালি মালিক। সোম বললেন “কাগজ আসে?”
ভদ্রলোক বললেন “আসে তবে একটু দেরী করে। কালকের কাগজটা পড়লে দিতে পারি”।
সোম বললেন “থাক। বিচ্ছিন্ন থাকাই ভাল। কাগজ পড়লেই একগাদা উৎকণ্ঠা”।
ভদ্রলোক হাসলেন “সেই, কলকাতার যা অবস্থা। একটা না একটা ঝামেলা লেগেই আছে”।
সোম বললেন “আপনাদের এখানে টেলিফোন যোগাযোগ কি পুরোটাই বিচ্ছিন্ন? মোবাইলের টাওয়ার নেই, ল্যান্ডলাইনের অবস্থাও তথৈবচ।”
ভদ্রলোক বললেন “হ্যাঁ কাল থেকে এই সমস্যাটা শুরু হয়েছে। আমাদেরও অনেক সমস্যা হয়ে গেছে। আচ্ছা আপনারা এবং ওই ভদ্রলোক এক সঙ্গে ছিলেন না? আমি তো তাই ভেবেছিলাম”।
সোম বললেন “হ্যাঁ, আমরা একসঙ্গে এসেছিলাম। তবে উনি উত্তরে বাংলো বুক করে ছিলেন আগে থেকেই”।
ভদ্রলোক অবাক হয়ে বললেন “আবার উত্তরে? খুব ঘুরতে ভালোবাসেন বুঝি?”
সোম বললেন “হ্যাঁ। আচ্ছা এখানে রেজর পাওয়া যাবে? ইনস্ট্যান্ট রেজার হলেই হবে”।
ভদ্রলোক বললেন “কেন পাওয়া যাবে না। এই তো আমাদের হোটেলের পাশের দোকানেই পাওয়া যাবে”।
সোম উঠলেন, “দেখি”।
ভদ্রলোক বললেন “লাঞ্চে চিকেন খাবেন তো স্যার?”
সোম বললেন “আচ্ছা। দেখবেন বেশি ঝাল যেন না হয়। আমার মেয়ে ঝাল একেবারেই খেতে পারে না”।
ভদ্রলোক বললেন “না না, ঝাল এমনিতেও সেভাবে আমরা দি না”।
সোম বেরলেন। হোটেলের পাশেই একটা ছোট দোকান। এখানকার ছোট ছোট দোকানগুলো বেশিরভাগই মেয়েরা চালায়। সোম রেজর কিনলেন।
একটা হালকা শীত আছে। কামড় নেই যদিও। বেশ খানিকক্ষণ হেঁটে হোটেলে ফিরলেন।
আঁখি উঠে খাটেই বসে আছে। রাণী ঘুমোচ্ছে। তাকে দেখে বলল “কোথায় গেছিলে বাবা?”
সোম বললেন “একটু হেঁটে এলাম”।
আঁখি বলল “বৃষ্টি হচ্ছে?”
সোম বললেন “নাহ। তোর মা এখনও ঘুমোচ্ছে? ওদিকে কাল পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা করল কাপড় চোপড় সব ধোবে”।
আঁখি বলল “হোটেলের লোকটাকে বল না লন্ড্রিতে দিয়ে দিতে পারলে সব থেকে ভাল হয়”।
সোম বললেন “তারপর সময়মত না শুকালে কী করবি?”
আঁখি বলল “ওরা ঠিক শুকিয়ে দেবে। এখন যদি কাপড় চোপড় কাচতে হয় তাহলে আর দেখতে হবে না। বেড়ানোর মজাটাই মাটি হয়ে যাবে”।
সোম বললেন “তা ঠিক। ডাক তোর মাকে, কী বলে শুনি”।
আঁখি রাণীকে ঠেলল, রাণী ঘুমন্ত অবস্থাতেই বলল “কী হল আবার?”
আঁখি বলল “কাপড় কাচার প্ল্যানটা কী হল? ঘুমোলে হবে?”
রাণী উঠলেন। সোম বললেন “লন্ড্রিতে দেব?”
রাণী বললেন “সে তো একগাদা টাকা নিয়ে নেবে”।
সোম বললেন “নিলে নেবে। এমনিতেও তো কোথাও ঘুরতে যাচ্ছ না। সেসব টাকা তো বেচে গেছে”।
রাণী বললেন “ওহ। তাহলে তাই কর। ঈশ, তাহলে তো উত্তরে চলে গেলেই হত। অর্ক গেছে?”
সোম বললেন “হ্যাঁ। ভোরেই চলে গেছে”।
রাণী আঁখির দিকে এক ঝলক তাকিয়েই সোমের দিকে ফিরলেন “আমরা কিন্তু যেতেই পারতাম। মামণি তখন এমন করল!”
আঁখি রাগল “কী করলাম? আবার ধ্বস নামলে কী হত? একটা পাগলের সঙ্গে তো যেখানে ইচ্ছা চলে যাওয়া যায় না”।
সোম বললেন “আচ্ছা, আচ্ছা। শান্তি। এবার এখানে কী করবি সেটা ঠিক করা যাক। দুপুরে চিকেন হচ্ছে”।
রাণী বললেন “বাহ। তাহলে আর কোথাও যাওয়া হবে না? হোটেলেই সারাদিন”?
সোম বললেন “আগে লন্ড্রির ব্যবস্থা করি”।
সোম বেরলেন।
আঁখি বলল “আমার আর ভালো লাগছে না, কলকাতা চলে যাই চল”।
রাণী হাসতে শুরু করলেন “জানি তো ভাল লাগবে না এখন”।
আঁখি বলল “সকাল সকাল শুরু হয়ে গেলে?”
রাণী বললেন “আমরা গেলেই ভাল হত যাই বল। একটা ট্যুরিস্ট পর্যন্ত নেই যার সঙ্গে কথা বলা যায়”।
আঁখি মোবাইলটা নিল। কয়েকবার ব্রাউজার খোলার চেষ্টা করে বুঝল নেটওয়ার্ক নেই। বলল “ধুস। নেটওয়ার্ক পর্যন্ত নেই। এবার সত্যি বিরক্তিকর লাগছে”।
রাণী খাট থেকে নেমে জানলার কাছে দাঁড়ালেন। বললেন “ঈশ, আমাদের বোধ হয় আর কপাল হল না কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার। আজকেও বৃষ্টি হবে দেখে নিস”।
আঁখি বলল “ভাল হল। কতবার আর দেখবে”!
সোম ফিরলেন, রাণী বললেন “হল লন্ড্রি?”
সোম বললেন “হ্যাঁ, পাঠাচ্ছে লোক। আর শোন একটা অন্য খবর আছে”।
রাণী বললেন “কী?”
সোম বললেন “পাহাড়ে ঝামেলা শুরু হয়েছে দার্জিলিং সাইডে। শিলিগুড়ি নামার বহু গাড়ি আটকে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। ফেরাটা খুব চাপ হয়ে যাবে”।
২২

“বহুদিন মায়ের পায়ে নিজেকে নিবেদন করা হয় না রে উজু”।
স্কচের গ্লাসে বরফ মেশাতে মেশাতে বললেন অর্ণব বোস। উজ্জ্বল গীটারে সুর তুলছে। অর্ণব বললেন “কী গান বাজাচ্ছিস?”
উজ্জ্বল বলল “একটা স্প্যানিশ গান”।
অর্ণব মুখ বিকৃত করলেন “কী সব স্প্যানিশ ইংলিশ গান বাজাস। মাঝে মাঝে মায়ের গান বাজাতে পারিস তো বাপ। আমায় একটু জায়গা দাও মায়ের মন্দিরে বসি। আহা”।
অর্ণব গ্লাসে চুমুক দিলেন।
অর্ণব বোস সোফায় বসে মদ খাচ্ছিলেন। রাত দেড়টা বাজে।
ঘরে তারা দুজন ছাড়া কেউ নেই।
বেশ খানিকক্ষণ গীটার বাজিয়ে উজ্জ্বল থামল। বলল “সোম লাহিড়ীর খবর কী কাকা?”
অর্ণব মুখ বিকৃত করলেন “সিকিম গেছে। ঘুরছে”।
উজ্জ্বল বলল “সেটা তো জানি। আর কী খবর?”
অর্ণব বললেন “কোন খবর?”
উজ্জ্বল বলল “কেস এখনও ক্লোজ হল না”।
অর্ণব হাত তুললেন “সেসব নিয়ে তোকে কে ভাবতে বলেছে? আমি তো বলেইছি তোকে তার জন্য আমি আছি”।
উজ্জ্বল বলল “আমার কেন জানি না সোম লাহিড়ীকে সুবিধার লোক বলে মনে হয় না। চাউনিটা কেমন যেন”।
অর্ণব উজ্জ্বলের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত গলায় বললেন “কেমন যেন?”
উজ্জ্বল বলল “ঠিক সুবিধার লাগে না। সুরেশ্বর বরং অনেক ভাল ছিল”।
অর্ণব বললেন “পুলিশের চাউনি ওরকমই হয়। ওসব পাওয়ার দিয়ে দাবিয়ে রাখতে হয়। আমরা যখন অপোনেন্টে ছিলাম এরা তখন আমাদের পাত্তাই দিত না। পাওয়ারে আছি বলেই না যা বলি তাই শুনে চলে? পুলিশ তো হাতের পুতুল এখন আমাদের”।
উজ্জ্বল বলল “আমার প্যারিস যাওয়ার কী হল?”
অর্ণব বললেন “ক্ষেপেছিস এখন? বাইরে গেলেই লোকের সন্দেহ বেড়ে যাবে। ভাববে পালাচ্ছিস। শুয়োরের বাচ্চা মিডিয়া আছে। আরও অনেক শুয়োরের বাচ্চা আছে। সব কটার ঘোতঘোতানি বেড়ে যাবে। খামোখা কেন সুযোগ দেব?”
উজ্জ্বল বলল “এতো মহা সমস্যা হল। একটু ঘুরতেও যেতে পারব না?”
অর্ণব বোস কয়েক সেকেন্ড উজ্জ্বলের দিকে তাকিয়ে বললেন “যাবি। দরকার পড়লে সারাজীবন প্যারিসেই থাকবি। কিন্তু এখন না”।
উজ্জ্বল গীটার বাজানো শুরু করল আবার।
অর্ণব মোবাইলটা হাতে নিয়ে ডায়াল করলেন, কয়েকবার রিং হবার পর ওপাশে কেউ ফোন ধরল, অর্ণব কয়েক মিনিট পরে ফোন রাখলেন। বললেন “সুবোধ”।
উজ্জ্বল গীটার বাজাতে বাজাতেই বলল “কী বলছে?”
অর্ণব মিটি মিটি হাসতে হাসতে বললেন “কী বলবে? বিড়াল যা করে তাই করল। মিউ মিউ”।
উজ্জ্বল বলল “মিউ মিউ না করে কেসটা তুলে নিতে কী হয়?”
অর্ণব বিরক্ত মুখে উজ্জ্বলের দিকে তাকিয়ে বললেন “তোর কি মাথা খারাপ? কেস তুলে নেবে? অত সোজা? আমারই ভুল হয়েছে বাচ্চাদের উপর ভরসা করে। তোর এখনো পলিটিকস শেখা অনেক বাকি”।
উজ্জ্বল বলল “কেন কী হয় তুললে?”
অর্ণব বললেন “বাপকে লোকে গুলি করে মেরেছে। আর ছেলে সে কেস তুলে নেবে? তাতে কী হবে? লোকে ভাববে ছেলেই সম্পত্তির লোভে বাপকে খুন করেছে। দিন কে দিন তোর বুদ্ধি কোথায় যাচ্ছে বলত? ওই যে কী যেন বলে মেয়েটা, সাহানা না কী, ওইটার কাছে খুব যাচ্ছিস না?”
উজ্জ্বলের মুখ শক্ত হল “সাহানা এখানে কোত্থেকে এল কাকা?”
অর্ণব বললেন “আসবেই তো। আলবাত আসবে। মেয়েছেলে মানেই দুর্বলতা। সেটা বুঝবিনা তুই এখন। কোত্থেকে একটা সিনেমা আর্টিস্টের সাথে লটকে গেলি। হিস্ট্রি দেখলি না, বায়োলজি আর জিওগ্রাফি দেখেই গলে পড়লি। এই জন্যই তোদের কিছু হয় না। একটা গীটার নিয়ে ভাবলি আমি একটা বিরাট হনু হয়ে গেলাম”।
উজ্জ্বল বলল “সাহানার হিস্ট্রি যথেষ্ট ভাল। তুমি খোঁজ নাও। জানতে পারবে”।
অর্ণব চোখ লাল করে বললেন “হোক ভাল। তাতে কী যায় আসে? নিজের পেটটা চালাবি কী করে সেটা নিয়ে ভাব। চিরদিন কাহারও সময় নাহি যায়। আজ আমরা পাওয়ারে আছি, লোকে ভক্তি শ্রদ্ধা করছে, কথা শুনছে। দুদিন পরে দান উল্টাতে পারে। তখন কী করবি? কুত্তাতেও পুছবে না বাবা। মনে রাখ”।
উজ্জ্বল উঠল “আমি ঘুমোতে গেলাম”।
অর্ণব বললেন “বস বস বাবা বস। রাগ করিস না। কাকার কথায় রাগ করলে হবে?”
উজ্ব্ ল বসল। কাকার বোতল থেকে মদ ঢালল নিজের গ্লাসে। তারপর র খেয়ে নিল।
অর্ণব বললেন “এই দেখো, টগবগে রক্ত। এভাবেই মরবে একদিন। উফ। তোকে কতবার বলব র খাস নি?”
উজ্জ্বল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে বলল “তুমি আমার কাছে কিছু একটা লুকাচ্ছ কাকা। আমার আগেও মনে হয়েছে। বলবে কি এখন?”
অর্ণব বললেন “কী লুকোচ্ছি?”
উজ্জ্বল বলল “সেটাই তো জানতে চাইছি, কী লুকোচ্ছ? আমার যতদূর মনে হচ্ছে সোম লাহিড়ীকে নিয়ে কিছু। বলা যাবে কি?”
অর্ণব গম্ভীর হয়ে গ্লাসে চুমুক দিলেন।
উজ্জ্বল বলল “রাণাকে সিকিমে পাঠিয়েছ কেন বলবে?”
অর্ণব বললেন “তোকে কে বলল?”
উজ্জ্বল বলল “সেটা তো বলব না। কেন পাঠিয়েছ সেটা গেস করতে পারছি”।
অর্ণব কিছু বললেন না। উজ্জ্বলের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলেন মিটিমিটি।
২৩
“পাহাড় আবার অশান্ত হবে এবার”।
হোটেলের মালিক অবনীশবাবু বললেন।
সোম বসে ছিলেন রিসেপশনে। বললেন “আপনি কোত্থেকে খবর পেলেন? টিভি দেখে?”
অবনীশবাবু বললেন “না না, দার্জিলিং থেকে একজন এল তো সকালে। আমাদেরই ড্রাইভার। ওর থেকেই শুনলাম। পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ”।
সোম বললেন “আপনারা কী করেন এই সময়টা?”
অবনীশবাবু বললেন “এখানে অতটা সমস্যা হয় না। হিংসা খুব একটা ছোঁয় না আমাদের। তবে জিনিস পত্র আসা যাওয়া রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে বুঝতেই পারছেন অন্যান্য আরও সমস্যা মাথা চাড়া দেয়”।
সোম বললেন “আপনারা কী চান? ভাগ হয়ে যাক?”
অবনীশবাবু বললেন “কেন চাইব বলুন তো? আর কত ভাগ হবে? সেই ঠাকুরদাদের চলে আসতে হল বাংলাদেশ থেকে। দুদিন পরে পাহাড়ের লোক বলবে এবার পাহাড় থেকে নেমে যাও। বাঙালিরা কি শুধু তাড়া খেয়ে যাবে নাকি সারাটা জীবন?”
সোম অবনীশবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন “ট্যুরিস্টদের ওপর কোন অ্যাটাকের খবর পেয়েছেন?”
অবনীশবাবু বললেন “হ্যাঁ। শুনলাম সেরকম। মব ক্ষেপেছে। বুঝতেই পারছেন”।
সোম বললেন “কোথাও কি ফোন করার কোন ব্যবস্থাই নেই?”
অবনীশবাবু বললেন “আমি যা খবর পেলাম বিকেল নাগাদ ব্যবস্থা হয়ে যাবে। অত চিন্তা করতে হবে না স্যার”।
সোম বললেন “তবু ভাল। ফোনের দরকারটা আমার সবথেকে বেশি এখন”।
অবনীশবাবু বললেন “আমি ব্যবস্থা হলেই আপনাকে জানাব স্যার”।
সোম বললেন “সমতলে নামার রুটে ঝামেলা হলে আপনারা কী করেন?”
অবনীশবাবু ম্লান হাসলেন, “কী করব বলুন? আমাদের কিছুই করার থাকে না। পাহাড়ে আমরা যাদের ভরসায় থাকি তারাই যদি ক্ষেপে গিয়ে আমাদের ক্ষতি করতে আসে, সেক্ষেত্রে আমাদের আর কী করার থাকে? আপাতত বর্ষার জন্য মজুত করা চাল ডাল সব আছে। কদিন পরে কী হবে সেটা নিয়েই তো দুশ্চিন্তা। এখানে শিকড় গজিয়ে গেছে আমাদের। ছেলের স্কুলও এখানে। চাইলে সব ছেড়ে ছুঁড়ে দিয়ে কলকাতা ফিরে যাবারও উপায় নেই”।
আঁখি নেমে এসছিল রিসেপশনে। সোমকে বসে থাকতে দেখে বলল “কী হল বাবা? খুব ঝামেলা শুরু হয়েছে নাকি?”
সোম বললেন “আর কী! যা ভয় পাচ্ছিলাম, তাই হল”।
আঁখি বলল “ভালই হল, এখানেই থেকে যাই তাহলে”।
অবনীশবাবু হাসলেন “দূর থেকে ভাল লাগে, এখানে থাকলে আর অতটা ভাল নাও লাগতে পারে। অনেকরকম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় আমাদের”।
সোম বললেন “পাহাড়ের সব থেকে সমস্যা জল, তাই না?”
অবনীশবাবু বললেন “জল তো বটেই। কয়েক বছর আগে যখন ভূমিকম্প হয়েছিল তখন যে কী করব, কোথাও যাব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। সে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি”।
আঁখি বলল “ধুস। চল তো বাবা, একটু হেঁটে আসি। আমার আর ঘরের মধ্যে বসে থাকতে ভাল লাগছে না”।
সোম উঠলেন, “আচ্ছা, তাই চ। মাকে ডাকবি না?”
আঁখি বলল “মা একটা গল্পের বই নিয়ে বসেছে। বলল যা হেঁটে আয়”।
সোম অবনীশবাবুকে বললেন “হেঁটেই আসি তবে। লন্ড্রিটা যত তাড়াতাড়ি পারেন দেখবেন ম্যানেজ করা যায় নাকি”।
অবনীশবাবু বললেন “হয়ে যাবে স্যার। আজ বৃষ্টি না হলে তো একদম হান্ড্রেড পারসেন্ট শিওর। আপনি হেঁটে আসুন। আমি লাঞ্চের ব্যবস্থা করি”।
মেঘ থাকলেও আকাশ সেভাবে কালো হয়ে নেই। হালকা শীত আছে। আঁখি বলল “চল বাবা, একটা ছোট্ট বাজার মত আছে উপরের দিকে। ওদিক থেকে ঘুরে আসি”।
সোম বললেন “চ”।
আঁখি হাঁটতে হাঁটতে বলল “ওই পাগলটা এখন উত্তরে গিয়ে কী করছে?”
সোম হাসলেন “কে জানে? তবে বেশিদিন না থাকলেই পারে। সমতলে নামাটা এখন টেনশনের ব্যাপার হয়ে গেছে”।
আঁখি জোরে জোরে হাঁটছিল। সোমের একটু জোরে হাঁটার অভ্যাস আছে। বাবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে হলে আঁখিকে একটু তাড়াতাড়ি হাঁটতে হয়।
আঁখি বলল “বলছিল পারলে পাহাড়েই থেকে যাবে, এখন থাকুক না। বুঝবে কেমন মজা”।
সোম বললেন “আসলে আমরা যে যেখানেই কাজ করি, সে জায়গাগুলোতে এত সমস্যা থাকে সবসময়, মনে হয় সেখান থেকে গিয়ে অন্য কোন জায়গায় গিয়ে থাকি। আদতে সবাই পরিস্থিতি থেকে পালাতে চাই। কিন্তু সেটা তো আর সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। আর পালিয়ে যাওয়াটাও তো কোন কাজের কথা না। সমস্যা সামলে লড়ে যাওয়াটাই বড় কথা”।
আঁখি বলল “আচ্ছা বাবা, দার্জিলিংএর ঝামেলাটা কী নিয়ে?”
সোম বললেন “রাজ্য চায় তারা”।
আঁখি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, একটা টাটা সুমো গাড়ি তাদের পেরিয়ে গিয়ে দাঁড়াল। সোম আঁখির হাত শক্ত করে ধরলেন।
পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ বছর বয়সের এক যুবক গাড়ি থেকে নেমে সোমের দিকে এগিয়ে এল “স্যার আপনি?”
সোম রাণাকে এক পলক দেখেই চিনে গেলেন। বললেন “জেল থেকে ছাড়া পেলে কবে?”
রাণা এক পলক আঁখির দিকে তাকিয়ে সোমের দিকে তাকাল “এই তো কদিন আগে। একটু ঘুরতে এসছি স্যার। আপনাকে দেখে খুব ভাল লাগল”।
সোম বললেন “ঠিক আছে। আমার সঙ্গে তো তোমার খুব বেশি কথা বলার নেই। তুমি বরং এসো এখন”।
রাণা একটা অদ্ভুত হাসি হেসে বলল “আসি স্যার”।
বলে একটু তাড়াহুড়োতেই গাড়িতে গিয়ে উঠল।
গাড়িটা বেরিয়ে যেতে আঁখি বলল “কে বাবা? কেমন বিচ্ছিরি ভাবে তাকায়”!
সোম গাড়িটার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে বললেন “এরা সমাজের ক্যান্সার। যত থাকে, তত দূষণ ছড়িয়ে যায়”।
২৪

রাণী আঁখির স্যুটকেস খুলে বসেছিলেন। আঁখি ঘরে ঢুকতেই বললেন, “হ্যাঁ রে, মনের সুখে জামাকাপড়গুলো সব বের করেছিস আর পরেছিস। কে গুছাবে এগুলো?”
আঁখি বলল, “আমিই গুছাবো। তুমি কেন গুছাতে যাচ্ছ?”
রাণী বললেন, “শেষ পর্যন্ত আমাকেই করতে হবে কিনা! তাই আগে থেকেই দেখে রাখছি ঠিক কোন পরিস্থিতিতে আমাকে হস্তক্ষেপ করতে হবে”।
আঁখি খাটে শুয়ে পড়ে বলল, “রাখো তো মা, এখন বন্ধ কর। সব গুছিয়ে রাখব আমি। কথা দিলাম।“
রাণী স্যুটকেসটা গোছাতে গোছাতে বললেন, “হ্যাঁ, ওই আশাতেই তো আমি থাকি! যাক গে। তোর বাবা কোথায়?”
আঁখি বলল, “বাবা রিসেপশনে আছে। ল্যান্ডলাইনের কানেকশন এসছে নাকি, কলকাতায় ফোন করার চেষ্টা করছে।“
রাণী বললেন, “কলকাতায় ফোন করে কী করবে? তার আগে শিলিগুড়ি অবধি পৌঁছতে পারি কিনা দেখ।“
আঁখি বিরক্ত গলায় বলল, “উফ মা! সব সময় সব ব্যাপারে এত নেগেটিভ ভাবো কী করে বল তো? জানো তো এই যে তুমি রোজ বসে বসে ভাবছিলে ঠিক করে শিলিগুড়ি যাব তো, ঠিক করে শিলিগুড়ি যাব তো, ঠিক এই কারণেই ঝামেলাটা হয়েছে। একে বলে পাওয়ার অফ নেগেটিভ থিংকিং।“
রাণী বললেন, “হ্যাঁ, সব কিছুর জন্য তো আমিই দায়ী! আচ্ছা, এই নে, আমি এখন সব পজিটিভ ভাবব। তাহলে রাস্তা ক্লিয়ার হয়ে যাবে?”
আঁখি বলল, “হ্যাঁ হবে তো। তুমি ভেবে দেখো। ভাবতে হবে মা, ভাবা প্র্যাক্টিস কর। পজিটিভ থিংকিঙের জোর বাড়াও।“
রাণী বললেন, “আচ্ছা। অনেক হয়েছে। এবার স্নান সেরে ফেল। আমার খিদে পেয়ে গেল।“
আঁখি বলল, “আচ্ছা মা, উত্তরেতে আসলে দেখার কী আছে?”
রাণী বললেন, “আমি কী করে জানব। তুইও যেখানে আমিও সেখানে। তবে দেখার কী আছে সেটা থেকেও তো আমার মনে হয় তোর কাছে উত্তরেতে কে আছে সেটা বেশি ইম্পরট্যান্ট।“
আঁখি বলল, “নাও। আবার সেই একই কথা। আমি একটা নরম্যাল কোশ্চেন করলাম। সেটারও তুমি কত দূর উত্তর ভেবে নিলে। সিম্পলি ডিজগাস্টিং”।
রাণী বললেন, “আচ্ছা আচ্ছা। তুমি কিছুই ভাবো না। আমি যে তোর মা, সেটাই তুই ভুলে যাস। তাছাড়া কলকাতার কেউ থাকলে ভালোও লাগে বেড়াতে এসে”।
আঁখি বলল, “কলকাতার লোক দরকার যখন তখন তো কলকাতাতেই থাকতে পারো। কলকাতার লোক আছেও তো। হোটেলের মালিক আছে, টেরিফিক গুন্ডা রাণা আছে...”
বলেই আঁখি জিভ কাটল। রাণার কথা বাবা মাকে বলতে বারণ করেছিল।
রাণী বললেন, “গুন্ডা? এখানেও? উফ! ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে একটা কথা শুনেছিলাম এ দেখছি তাই হতে চলেছে। তা তোর বাবা কি ওই রাণার পিছনে বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে?” রাণী মাথায় হাত দিলেন।
আঁখি রাণীকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেন, “আহ, অত চাপ নাও কেন। কলকাতার গুন্ডা এখানে বেড়াতে এসেছে। বাবার সঙ্গে ওর কিছু নেই। কেন থাকতে যাবে?”
রাণী বললেন, “আমার কালকে থেকেই মনটা কেমন কু ডাক ডাকছিল। এখন কেমন যেন একটা ভয় ভয় লাগছে। একদিকে রাস্তা বন্ধ, অন্যদিকে ওই রাণা না কার কথা বললি! এখানে যদি তোর বাবা আবার কোন ঝামেলা পাকায় না দেখবি আমি কী করি!”
আঁখি বলল, “মা! তোমার হল কি হঠাৎ? এরকম করছ কেন? বাবা কি কোনদিন কোন ঝামেলা পাকিয়েছে? সেরকম দেখেছ কখনও?”
রাণী বললেন, “তোর বাবা আসলে আমি বলব কালকেই সমতলে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করতে। আমার আর এখানে থাকতে এক ফোঁটাও ইচ্ছা করছে না।“
আঁখি অবাক হয়ে বলল, “কালকেই নেমে যাবে? তোমার কি মাথাখারাপ হয়ে গেল?”
রাণী বললেন, “হ্যাঁ, কালকেই। অনেক হয়েছে এই বৃষ্টি আর ধ্বসের পাহাড়ে থাকা। এবার ভালোয় ভালোয় কলকাতা ফিরতে পারলে বাঁচি।“
আঁখি বলল, “মাঝে মাঝে তুমি এমন কর না, আমারই কেমন ভয় ভয় লাগে। এই তো দিব্যি হাসিখুশি ছিলে, হঠাৎ করে এমন প্যানিকড হয়ে গেলে কেন?”
রাণী বললেন, “আমি তোর বাবাকে চিনি বলেই প্যানিকড হচ্ছি। যদি একবার তোর বাবার গো ধরে যায় যে ওই ছেলেটার পিছু নেবে, তাহলে আমরা যে এখানে আছি সেসব কিছুই মনে থাকবে না। তোর মনে নেই, তোর তখন তিন কী চার বছর বয়স। আমরা দীঘায় গেছি বেড়াতে। আমরা বিচে ঘুরছিলাম। হঠাৎ দেখি তোর বাবা ধাঁ। এক ঘন্টা যায়, দু ঘণ্টা যায়, তোর বাবার কোন খোঁজ নেই। আমার তো তোকে নিয়ে ভয়াবহ অবস্থা। লোকাল থানাতেও গেছিলাম কিন্তু কেউ কোন খোঁজ দিতে পারল না। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হোটেলে এসে জেগে বসে ছিলাম। শুধু মনে হচ্ছিল মানুষটা বোধ হয় আর ফিরবে না। শেষ মেষ রাত দেড়টার সময় দেখি হোটেলের দরজায় কে ধাক্কা মারছে। আমি তো কিছুতেই খুলি না। শেষে দেখি তোর বাবার গলার আওয়াজ। বলে ‘আরে আমি, খোল খোল’। দরজা খুলে দেখি তোর বাবা দাঁড়িয়ে। হাতে ব্যান্ডেজ করা। বলে ওখানে নাকি কলকাতার কোন সাসপেক্টকে চোখে পড়ে গেছিল। তাকে ধাওয়া করে উড়িষ্যা অবধি চলে গেছিল। ওখানে হালকা হাতাহাতিও হয়েছিল। কিন্তু তোর বাবা শেষ পর্যন্ত লোকটাকে ধরেছিল। এখানে যদি এরকম কিছু হয় তাহলে আমি তোকে নিয়ে কোথায় যাব বলত?”
আঁখি হাসতে হাসতে বলল, “উফ!!! একটা সাধারন ঘটনাকে নিয়ে এত টেনশন করতে তোমার চেয়ে ভাল আর কেউ পারে না মা! সেসব কিছুই হবে না। রাণা চলেও গেছে। আর যে গুন্ডা গাড়ি থেকে নেমে নিজে পুলিশের সঙ্গে দেখা করতে চায় তার পিছনে বাবা কেন ছুটতে যাবে!”
রাণী বললেন, “সে আবার কী!”
আঁখি বলল, “হ্যাঁ। তবে বাবা ছেলেটাকে একেবারেই পছন্দ করে না যা বুঝলাম।“
রাণী বললেন, “তুই যা তো, রিসেপশনে গিয়ে দেখ তোর বাবা কী করছে। বল আমি ডাকছি। সর্বক্ষণ শুধু একা একা ঘুরে বেড়াবে। যা গিয়ে বাবাকে ঘরে আসতে বল।“
আঁখি বলল, “আচ্ছা। আমি যাচ্ছি। আর এখন মনে হচ্ছে উত্তরে গেলেও হত।“
রাণী বললেন “খামোখা তখন বেশি করে মানা করলি! আমি জানি ভেতরে ভেতরে তুই ঠিকই উত্তরে যাবার জন্য ছটফট করছিলি।“
আঁখি উঠে ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বলল, “কেন ছটফট করতে যাব, কোথাকার কোন পাগল!”
রাণী হাসতে হাসতে বললেন, “সেই, পাগলই বটে, আর তুই খুব সুস্থ!”

২৫

একমনে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা চলে এসছিলেন সোম। পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটার মজা হল নামার সময় নামতে ভালই লাগে। উঠতে গেলে কষ্ট হয়। সোম হাঁটার ক্ষেত্রে বরাবর স্বচ্ছন্দ্য। অনেকটা নিচের দিকে চলে এসছিলেন। খেয়াল হল যখন বৃষ্টি নামল। একটা দোকানের শেডের তলায় দাঁড়াতে বাধ্য হলেন।
মোবাইলটা বাজতে শুরু করেছে। সোম অবাক হলেন। হোটেলে টাওয়ার ছিল না। এখানে টাওয়ার পেল কী করে? পকেট থেকে ফোনটা বের করলেন সোম, অফিস থেকে ফোন।
সোম ফোনটা ধরলেন, “হ্যালো”।
“হ্যাঁ লাহিড়ী, আমি সুরেশ্বর বলছি”। ওপাশের গলাটা উত্তেজিত শোনাল।
সোম অবাক হলেন। সুরেশ্বর কেন? বললেন, “হ্যাঁ বল। কী হল?”
সুরেশ্বর বললেন, “তুমি কোথায় বলত?”
সোম বললেন, “আপাতত পেলিঙে। কেন?”
সুরেশ্বর বললেন, “রত্নাকর আগরওয়াল কেসটা উপরে চলে গেছে। ইনভেস্টিগেশন শুরু হয়েছে সেন্ট্রাল থেকে।“
সোম অবাক হবার ভান করলেন, “তাই?”
সুরেশ্বর বললেন, “হ্যাঁ। একটু আগে আমার কাছে দুজন এসছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম রিসেন্ট একজন এক্স মন্ত্রীর মার্ডার হয়েছে, সে ব্যাপারে কথা বলবে। শুরুও করেছিল হালকাভাবে। খানিকক্ষণ পরে বুঝলাম রত্নাকর আগরওয়াল কেসে এসছে। তুমি তো সিকিম গিয়ে বেচে গেছ ভাই, আমি তো এখন সমস্যায় পড়ে গেলাম।“
সোম বললেন, “অর্ণব বোসকে জানাও”।
সুরেশ্বর একটা গালাগাল দিয়ে বললেন, “ওকে জানিয়ে তো ব্যাপারটা আরও বাড়বে বই কমবে না লাহিড়ী।“
সোম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “তবু ওকে জানাও। যে ঝামেলায় ফেলেছে, তাকে না জানিয়ে তুমি কিভাবে এগোবে?”
সুরেশ্বর বললেন, “সব কিছুই তো আসলে পলিটিশিয়ানরাই চালায় লাহিড়ী। মাঝখান দিয়ে বলি কা বকরা আমরা হই। উজ্জ্বল বোসকে বাঁচাতে অর্ণব বোসই কোন খেলা খেলছে নাকি সেটা কী করে বুঝব? শুনছিলাম সে ব্যাটা দিল্লির লিডারদের সঙ্গেও যোগাযোগ রেখে চলছে।“
সোম বললেন, “অর্ণব বোস যে কোন সময় দল পাল্টাবে সুরেশ্বর। সেটা আমিও জানি। কিন্তু এই কেসে অর্ণব বোসকে টাইম টু টাইম রিপোর্টিং না করলে তোমার ফেঁসে যাবার চান্সটা বাড়তে থাকবে যেহেতু শুরুতে তুমিই ছিলে এই কেসের চার্জে।“
সুরেশ্বর বললেন, “তোমার ফাঁসার চান্স নেই বলছ?”
সোম বললেন, “আছে। আমাদের সবার চান্সই আছে। কিন্তু আজকাল আমি আর এসব নিয়ে ভাবি না। ফিরে ভাবব না হয়। আপাতত ফ্যামিলির সঙ্গেই সময় কাটাই।“
সুরেশ্বর বললেন, “আমি রাখছি এখন ফোনটা। ওই শুয়োরটার কাছে যাই। দেখি কী বলে।“
সোম ফোনটা কেটে রাস্তার দিকে তাকালেন। বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার পাশ দিয়ে অনবরত জল বয়ে চলেছে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা স্কুল থেকে ফিরছে। বৃষ্টি হয়ে রাস্তার চারপাশের গাছপালা ক্রমাগত ভিজে চলেছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য সব কিছু ভুলে যাচ্ছিলেন সোম।
সব কিছু ভুলে থাকার চেষ্টা করছিলেন এমন সময় ফোনটা আবার বেজে উঠল। সোম নম্বরটা চিনলেন না তবে ধরলেন।
“মিস্টার লাহিড়ী, সায়ন বলছি”।
সোম বুঝলেন। অর্ক। বললেন, “বলুন, আপনি কি উত্তরেই আছেন?”
“হ্যাঁ। এখানকার ল্যান্ডলাইন থেকে আপনাকে ফোন করছি”।
সোম বললেন, “বলুন”।
অর্ক বলল, “আপনাকে এই মাত্র সুরেশ্বর ফোন করেছিল?”
সোম অবাক হতে গিয়েও হলেন না। বললেন, “ফোন ট্যাপ করছেন?”
অর্ক বলল, “আপনার ফোন। আপনার হেড অফিসের ফোন নয়। সেটা করতে একটু ঝক্কি আছে। আপাতত সে ঝক্কিটা নিই নি আমরা।“
সোম হাসলেন, “আচ্ছা। বলুন।“
অর্ক বলল, “সুরেশ্বরকে আপনি যেভাবে উত্তর দিলেন এক্কেবারে সেভাবেই দিয়ে যাবেন এরপরেও যদি উনি ফোন করেন। ও কিন্তু জল মাপল। আপনি সেটা বুঝেছেন?”
সোম বললেন, “বুঝেছি। তবে আমি সঙ্গত কারণেই আপনার কথা বলি নি। আমার মনে হয়েছিল ব্যাপারটা না বলাই ভাল।“
অর্ক বলল, “গুড। আপনি বুদ্ধিমান মিস্টার লাহিড়ী। আর কাল রাতের গাড়িটার নাম্বারের কথা জিজ্ঞেস করলেন?”
সোম বললেন, “প্রয়োজন পড়ে নি। স্কাউন্ড্রেলটার সঙ্গে আমার সকালেই দেখা হয়েছে।“
অর্ক অবাক হল, “কোন স্কাউন্ড্রেল?”
সোম বললেন, “দ্যাট ফেমাস রাইট হ্যান্ড অফ অর্ণব বোস। রাণা সরখেল।“
অর্ক একটা শিস দিয়ে উঠল, “মাই গড। অর্ণব বোসকে যতটা বোকা ভেবেছিলাম লোকটা ততটা বোকা নয়। রাণা কিন্তু আপনাকে ফলো করেই এসেছে।“
সোম বিস্মিত হয়ে বললেন, “আমাকে ফলো করে কেন আসবে? ওরা ঘুরতে এসছে জেল থেকে বেরিয়ে?”
অর্ক বলল, “ইয়েস স্যার। ইকোয়েশন খুব সিম্পল। অর্ণব বোস আপনাকে বিশ্বাস করছে না।“
সোম বললেন, “কিন্তু কেস তো ডেড হয়ে গেছে অলমোস্ট।“
অর্ক বলল, “এটা পলিটিক্যাল কেস লাহিড়ীবাবু। অত সহজে ডেড হবার জিনিস? আচ্ছা আপনাকে একটা সিম্পল একজ্যাম্পেল দি। আপনার বন্ধুর সঙ্গে আপনার একটা ডিল ছিল। আপনিও মেনে চলতেন সেটা আপনার বন্ধুও মেনে চলত। এখন ওয়ান ফাইন মর্নিং আপনি আবিষ্কার করলেন আপনার বন্ধু আপনাকে ডাম্প করেছে। তখন আপনিও রেগে গিয়ে সেই ডিলটা ভেঙে দিলেন।“
সোম বললেন, “বুঝলাম। আপনি বলতে চাইছেন অর্ণব বোস জার্সি পাল্টাবেন এবং সেটার ফলে কেসটা আবার রি ওপেন হবার চান্স আছে?”
অর্ক বলল, “ইয়েস স্যার। আর হ্যাঁ। গল্পটা আমি কিন্তু এখনো পুরোটা শুনিনি।“
সোম বললেন, “আপনি ফোনে শুনবেন?”
অর্ক বলল, “নাহ। একেবারেই না।“
সোম বললেন, “তবে?”
অর্ক বলল, “ইচ্ছা থাকলে উপায় হয় লাহিড়ীবাবু। আপনি শুধু একটু খেয়াল রাখবেন আপনার ফ্যামিলি যেন আপনার সঙ্গেই থাকে। রাণা হ্যাজ আ টেরিবল রেকর্ড। আপনি হোটেলের চারপাশেই আছেন তো?”
সোম বললেন, “না, বেশ খানিকটা দূরে...”
কথাটা বলতে বলতেই সোম বুঝলেন একটা চোরা টেনশন টের পেতে শুরু করেছেন কোন কারণ ছাড়াই...

২৬

“বাবা রিসেপশনে নেই মা। হাঁটতে গেছে আবার।“ আঁখি ঘরে ফিরে বলল।
রাণী চিন্তিত মুখে বললেন, “দেখলি? আমি ঠিক এই ভয়টা পাচ্ছিলাম। তোর বাবা ঠিক কিছু না কিছু একটা গণ্ডগোল করবেই। ফোন করত একটা।“
আঁখি বিরক্ত হয়ে বলল, “এত অধৈর্য হবে না তো মা! বাবা কি বাচ্চা ছেলে? একটু অপেক্ষা কর। ক’দিন ধরে হোটেলে আটকে থেকে থেকে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে সবার। একটু হাঁটবেও না তা বলে?”
রাণী বললেন, “এই যে তুই বললি কাল কী যেন কার সাথে দেখা হয়েছে? ওটা শোনার পর থেকেই আমার মনে হচ্ছে তোর বাবা বোধহয় আবার কার পিছনে দৌড় লাগাল।“
আঁখি বলল, “তোমাকে এত চিন্তা করতে হবে না। তবে সমস্যাটা অন্য। বাবা মনে হয় ছাতা নিয়ে যায় নি। বৃষ্টি হলে চিন্তার ব্যাপার।“
রাণী বললেন, “একটু যদি ছোট ছোট বুদ্ধিগুলো থাকত। কী করে যে এত বছর পুলিশে চাকরি করল কে জানে। ঘুরতে এসেও যে একটু চিন্তামুক্ত হব তার কোন ব্যাপার নেই।“
আঁখি বলল, “অত চিন্তা কোর না। তোমার তো লন্ড্রির চিন্তা নেই। সে জন্যই কি এখন হঠাৎ করে বাবার জন্য চিন্তা শুরু করলে?”
রাণী বললেন, “ধুস। যা হবে হবে।“
আঁখি জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। আঁখি বলল, “এখানে বরফ পড়ে মা?”
রাণী বললেন, “আমি কী করে জানব?”
আঁখি বলল, “হোটেলের ভদ্রলোক বলছিলেন শীতের পূর্ণিমা রাতে কাঞ্চনজঙ্ঘা অসাধারন দেখায়। আমরা শীতকালে আসতে পারি না?”
রাণী বললেন, “রক্ষে কর বাপু। এই বর্ষায় এসেই আমার যা শিক্ষা হয়ে গেল এবার। দার্জিলিংএর দিকে আবার নাকি ঝামেলা। কী হবে কে জানে!”
আঁখি বলল, “একটা কাজ করব আমরা। যদি ওদিকে ঝামেলা হয় সিকিম হয়ে চিন চলে যাব। সেখান থেকে প্লেনে কলকাতা ফিরব।“
রাণী হেসে ফেললেন এবার। “তোর সেই পাগলামি শুরু হয়ে গেল না? এটা চন্দনমামা বলত। সিঙ্গাপুর যাবে? খুব সহজ যাওয়া। আগে মিদনাপুর চলে যা। সেখান থেকে দীঘার সমুদ্রে ডুব দে, মাথা তুললেই সিঙ্গাপুর পৌঁছে যাবি।“
আঁখিও হেসে ফেলল। “হ্যাঁ, ঈশ চন্দনদাদুর মাথাতে আসেও এসব।“
রাণী বললেন, “কিন্তু ফ্লাইট মিস হয়ে গেলে কী করব আমরা? যদি সত্যি বড় ঝামেলা শুরু হয়ে যায়?”
আঁখি বলল, “দেখো মা, কিছু না কিছু ঠিক হয়ে যাবে। অনেক ট্যুরিস্টই তো বেড়াতে আসে। ওরা নিশ্চয়ই আটকে থাকবে না। তাছাড়া এটা তো কোন টেররিস্ট অ্যাটাক হচ্ছে না। কিছু একটা ওয়ে আউট হয়েই যাবে।“
রাণী বললেন, “আসলে কী জানিস তো, এমনি সাধারন লোক হলে কোন অসুবিধা হয় না। আন্দোলনকারীরা যদি জানে এখানে পুলিশ অফিসার তার ফ্যামিলি নিয়ে এসছে, তাহলেই সমস্যা হতে পারে। আর তুই তো জানিসই তোর বাবার অত প্যাঁচ ট্যাচ নেই। এখানেই হোটেল মালিক থেকে শুরু করে প্রায় সবাই জেনে গেছে তোর বাবা পুলিশের বড় অফিসার। এটা সমস্যা তৈরী করে যদি!”
আঁখি বলল, “আচ্ছা মা তোমার কলকাতা এত ভাল লাগে কেন? ঘুরতে বেরিয়েও সারাক্ষণ বাড়ি ফেরার কথাই ভেবে যাচ্ছ।“
রাণী বললেন, “কারণ সেখানে আমাদের ঘর আছে। দিনের পর দিন যেখানে আমরা থেকেছি সেই ঘরগুলো আছে।“
আঁখি বলল, “আর বাবার যদি রিটায়ারমেন্ট হয় তখন কী করবে?”
রাণী বললেন, “তখন আর কী! তখন যে খানে নিয়ে গিয়ে তুলবে সেখানে যেতে হবে! জীবন তো এরকমই। একদিকে খুব নিষ্ঠুর আবার একদিকে ভীষণ মায়াবী। শুধু আমরা কেউই ঠিক ঠাক ব্যালেন্স করে উঠতে পারলাম না।“
আঁখি চোখ বড় বড় করে বলল, “বাবাহ, মা!!! তুমি তো পুরো দার্শনিকের মত কথা বললে! খুব বাংলা সাহিত্য পড়ছ না আজকাল?”
রাণী বললেন, “তা পড়ছি। আমার তো ওই অভ্যাসটুকুই আছে। তুই যখন কলেজে যাস, তোর বাবা যখন ডিউটিতে যায় তখন তো ওই বইগুলোই আমার সম্বল।“
আঁখি রাস্তার দিকের জানলার কাছে গেল। হোটেলের সামনে একটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। আঁখি কয়েক সেকেন্ড সেদিকে তাকিয়ে বলল, “আজ সকালের গাড়িটা মনে হচ্ছে।“
রাণী বললেন, “জানলার কাছ থেকে সরে আয়। তুই দেখছিস সেটা ওদের দেখার দরকার নেই।“
আঁখি বলল, “দেখলে দেখবে। ছাড়ো তো। আচ্ছা শুনেছি এখানে একটা মনাস্ট্রি আছে। যাবে নাকি?”
রাণী বললেন, “তোর বাবা ফিরুক। তারপর না হয় যাব!”
কলিং বেল বেজে উঠল। রাণী অবাক হয়ে আঁখির দিকে তাকালেন, “কে এল?”
আঁখি বলল, “হোটেলের ছেলেটা বোধ হয়। লন্ড্রির আর কাপড় আছে নাকি দেখতে এসছে।“
রাণী বললেন, “আমি দেখছি”।
রাণী উঠে দরজা খুললেন। রাণা দাঁড়িয়ে আছে।
আঁখি বলল, “কী চাই”।
রাণা একগাল হেসে বলল, “লাহিড়ী স্যার আছেন?”
আঁখি বলল, “নেই তো”।
রাণা চোখ দিয়ে একবার আঁখিকে, আরেকবার ঘরের ভিতরটা দেখে বলল, “আমি কি বসব?”
রাণী বললেন, “এখানে তো বসা যাবে না। আপনি বরং রিসেপশনে বসুন।“
রাণা কয়েকসেকেন্ড রাণীর দিকে আর আঁখির দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে গেল।
রাণী দরজা বন্ধ করলেন।
আঁখি বলল, “সকালের ছেলেটা।“
রাণী আঁখির দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে বললেন “কী সাহস শুধু ভাবছি!”

২৭

বয়স চুয়ান্ন ছুঁই ছুঁই। কিন্তু এখনও সুগার প্রেশার ছুঁতে পারে নি। পাহাড়ি পথে খুব একটা কষ্ট হচ্ছিল না সোমের। হাঁটার সময় অনেকটা ঢালু পথে চলে এসছিলেন। আঁখিকে কয়েকবার ফোনে চেষ্টা করে পেলেন না। হাঁটার গতিবেগ বাড়াতে বাধ্য হলেন। ফেরার রাস্তাটা একটু চড়াইয়ের দিকে। সময় লাগছিল।
বৃষ্টি থেমেছে। মেঘ অনেকটা সরেছে। সোম কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলেন একবারও যদি দেখতে পাওয়া যায় তাহলে আঁখি খুশি হবে। একটা দমবন্ধ করে থাকা পরিবেশকে হয়ত একা কাঞ্চনজঙ্ঘাই পারে সবাইকে বের করে আনতে। তার চোরা টেনশনটাও খানিকটা কমবে।
পাহাড়ে ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে প্রচন্ড পরিশ্রমী হয়। সোম দেখছিলেন দুজন মধ্যবয়সী মহিলা একটা ভারি বস্তা মাথায় নিয়ে কী দ্রুত গতিতে চড়াই ভেঙে উঠে যাচ্ছেন। এখানে মানুষের বয়স বোঝা যায় না। তবু তাদের বয়স ষাট ছুঁয়ে গেছে সেটা আন্দাজ করা যায়।
ফোনটা বেজে উঠল। সোম বিরক্ত হলেন। এই একটা জিনিস মানুষের মানসিক শান্তি নষ্ট করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। আননোন নাম্বার থেকে ফোনটা এসছে।
সোম তুললেন, “কে বলছেন?”
“স্যার আপনাকে খুঁজছিলাম। হোটেলে গেলাম পেলাম না। বৌদি আর ভাইঝি আছে।“
সোম অবাক হলেন, “কে বলছেন?”
“স্যার আমি রাণা।“ ওপাশ থেকে গলাটা মোলায়েম শোনাল।
“তুমি হোটেলে গেছ কেন?” রাগলেন সোম।
“স্যার হঠাৎ করে উজ্জ্বলদা বললেন আপনাকে একটা ইন্সটলমেন্ট পৌছতে হবে এখানে চলে এলাম তাই।“
“ইন্সটলমেন্টমেন্ট? মানে?” সোম বুঝতে পারছিলেন মেজাজটা চড়ছে এবার।
“স্যার আপনাকে উজ্জ্বলদা কিছু বলেনি?”
সোম বললেন “না”।
“আচ্ছা স্যার আপনি একবার কথা বলে নিন। আমি রিসেপশনে বসে আছি।“
ফোনটা কেটে গেল। সোম কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাদের রুমে চলে গেছে রাণা! সাহসটা হল কী করে?
প্রথমে আঁখির ফোন ট্রাই করলেন। নট অ্যাভেলেবল বলছে।
একটু ভেবে উজ্জ্বল বোসের নাম্বার ডায়াল করলেন। প্রথমে একবার ফুল রিং হয়ে ফোনটা কেটে গেল।
দ্বিতীয়বার করতে ধরল, “বলুন লাহিড়ী সাহেব কোন সমস্যা?”
উজ্জ্বল বোস খোশমেজাজে আছে বোঝা যাচ্ছিল।
সোম সরাসরি বললেন, “রাণা এখানে কী করছে?”
উজ্জ্বল অবাক হবার ভান করে বলল, “রাণা? কোথায়? ও তো জেলে?”
সোম বুঝলেন উজ্জ্বল অভিনয় করছে। বললেন, “রাণা পেলিঙে আছে। আমার হোটেলে এসে বলছে আপনি ওকে আমাকে কোন ইন্সটলমেন্ট দিতে পাঠিয়েছেন। আপনাকে ফোন করার কথা বলল।“
উজ্জ্বল যেন আকাশ থেকে পড়ল, “ওহ... দেখেছেন? মেমোরি বিট্রে করছে আজকাল। হ্যাঁ স্যার, আপনাকে তো আমাদের তরফ থেকে কোন ইন্সটলমেন্টই দেওয়া হয় নি। ভাবলাম পাহাড়ে আগুন জ্বলছে, আপনার হয়ত দরকার পড়তে পারে। তাই লাখ দশেক টাকা ওর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।“
সোম বললেন, “এসবের মানে কী মিস্টার বোস? আমি যে কোন টাকা নেব না সেটা তো আপনাদের বলেছিলাম।“
উজ্জ্বল হাসতে হাসতে বলল, “কী যে বলেন স্যার। বেড়াল যদি মাছ খাবে না বলে তাহলে কী হয় বলুন? পুলিশ ঘুষ খাবে না সেসব আমাকে বুঝিয়ে লাভ আছে?”
সোম বললেন, “আপনি রাণাকে বলুন হোটেল লিভ করতে। ইমিডিয়েটলি। আমি চাই না আমার ফ্যামিলির সামনে কোন সীন ক্রিয়েট হোক।“
উজ্জ্বল বললে, “ওকে স্যার। আপনি যেমন চাইবেন। আচ্ছা আপনি চাইলে আপনার অ্যাকাউন্ট নাম্বারে দিয়ে দিতে পারি।“
সোম বললেন, “আমি জানাব। এখন ওকে হোটেল লিভ করতে বলুন। প্লিজ।“
উজ্জ্বল বলল, “ওকে স্যার। হ্যাভ এ হ্যাপি এন্ড সেভ স্টে। বাই।“
ফোনটা কেটে গেল।
সোম বুঝতে পারছিলেন না এখানে হঠাৎ ওরা এই খেলাটা শুরু করল কেন।
ফোনটা বাজছিল। বুঝলেন অর্ক ফোন করছে।
ধরলেন, “বলুন”।
“আপনি এত তাড়াতাড়ি উত্তেজিত হয়ে পড়েন কেন বলুন তো?”
“উত্তেজিত হবার মত কারণ ঘটলে উত্তেজিত হতে হবে। হোটেলে রাণী আর আঁখি আছে।“
“তাতে কী হয়েছে? আপনি যদি সেটা ওদের বুঝতে দেন যে আপনি ঘাবড়ে যাচ্ছেন তাহলে তো ওদের লাভ সেটা একজন সিনিয়র অফিসার হয়ে আপনার বোঝা উচিত। তাই না?”
সোম বললেন, “কলকাতা হলে আমি এতটা চাপ নিতাম না।“
“স্বাভাবিক। কিন্তু এখন আপনি যদি নার্ভ ফেইল করেন তাহলে পুরো খেলাটা আমরা হেরে যেতে পারি সেটা বুঝতে পারছেন?”
সোম বললেন, “আমি হোটেল থেকে এখনও প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে আছি।“
অর্ক বলল, “সে কারণেই ফোন করেছি। আপনি এখন যেখানে আছেন সেখান থেকে আরও খানিকটা হেঁটে দেখুন একটা লাল অল্টো দাঁড়িয়ে আছে। লাস্ট চার ডিজিট এইট ফাইভ সেভেন জিরো। সেটায় উঠে হোটেলে চলে যান। আর আপনার চিন্তার কোন কারণ নেই। আপনি একা নন।“
সোম বললেন, “থ্যাংকস। অ্যাকচুয়ালি রাণাকে আপনি চেনেন না। হি ইজ আ ডেনজারাস এলিমেন্ট।“
অর্ক বলল, “মাস সাতেক আগে ট্যাংরার এক শ্রমিককে সিম্পলি গলা কেটে খুন করেছিল ছেলেটা। তবু কেসটা হালকা হয়ে গেল অর্ণব উজ্জ্বলের চামচা হবার জন্য। ঠিক বলছি তো?”
সোম বললেন, “হ্যাঁ”।
অর্ক বলল, “প্রতিটা অপরাধকে হালকা করার পেছনে রাজনীতির হাত থাকে। সেই রাজনীতির হাতটা পুলিশ ডিপার্টমেন্ট শক্ত করেছে দিনের পর দিন। ডিপার্টমেন্টের থেকে আমরা কি আরেকটু ভাল কিছু আশা করতে পারতাম না মিস্টার লাহিড়ী?”
সোম কিছু বলতে পারলেন না। কোন কোন প্রশ্নের জবাব জানা থাকলেও দেওয়া যায় না।

আপনার মতামত জানান