পুতুল

দেবজিৎ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়
তিনি স্বপ্নে দেখেন,কার্ফু নেমেছে শহরের বুকে সেই রাতে। একদল সৈন্যসামন্ত একই তালে মার্চ করতে করতে চলে গেলো অন্য কোনখানে। সেনাগাড়িরা টহল টহলে সেলাই খুলছে শহরের আর স্ট্রিটলাইটগুলোর আলোতেও ভয় লেগে। এরকম শান্ত আর চুপচাপ শহর তিনি আগে কখনও দেখেন নি। এই স্বপ্নটা তিনি দেখছিলেন, এক বিচ রিসর্টের নরম বিছানায় শুয়ে শুয়ে। সেই রিসর্টের জানলা দিয়ে সমুদ্র দেখা যায়। সমুদ্রের শব্দ সোজাসুজি ঝাঁপিয়ে পরে ঘরে। এখনও সমুদ্রের গর্জন জানলা দিয়ে তার ঘরে ঢুকে পড়ছে,তাও তিনি স্বপ্নে সেসব শোনেন নি। শুনেছেন, সৈনসামন্তের বুটের আওয়াজ, সেনাগাড়ির চাকার শব্দ আর দূরে কোথাও কুকুর ডেকে উঠছে। আর কিছুই ঘটে না স্বপ্নে। এই নাগাড়ে কার্ফু সারারাত চলতে থাকে। মাঝে সাঝে একটা দুটো সেনা গাড়ি টহল দিয়ে যায় আর দু চারটে কুকুর ফাঁকা রাস্তায় খেলা করে। এই রকম একটা দীর্ঘ,ঘ্যানঘ্যানে গল্প কি করে একটা মানুষ দেখতে পারে ভেবে নিজেই অবাক হয়ে যান। বিরক্তও। অফিসের সবাই কেমন প্রোমোশন এর,গাড়ি কেনার,থাইল্যান্ড ঘুরতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে- অথচ তার স্বপ্নটা এমনই একঘেয়ে আর বিচ্ছিরি যে কাউকে বলার মতও না। সারাক্ষণ মনে হয়,কিছু একটা হবে... কিছু একটা হবে। অথচ শেষ প্রায় তিন মাসের কোন রাতেই কিছু হয় না। অথচ, তার প্রত্যেকটা মুহূর্তে মনে হয়,আজ স্বপ্নে সেই "কিছু হওয়া" হওয়াটা হবে। আজকে ঘুমানোর সময়ও মনে হয়েছে। অথচ এই যে,এখনও অব্ধি তিনি যতদূর স্বপ্ন দেখে ফেল্লেন- তাতে ব্যাপারটা অন্যদিনের মতই এবং তাতে নতুন কিছু ঘটে নি।

এই স্বপ্নটা তিনি আগে প্রায়ই দেখতেন,ও এখন রোজ দেখেন- এই কথাটা তিনি একমাত্র তার সাইকায়াট্রিস্টকে বলেছেন। সম্ভবত, ডঃ চক্রবর্তীয় একমাত্র মানুষ যিনি এই স্বপ্নটার কথা জানেন। আর কাউকে সে বলতে পারে নি। বললে,হয় পাগল ভাববে না হলে খুব স্বাভাবিক কিছু উপদেশ দেবে। তার কোনটাই চাই না। ডঃ চক্রবর্তী সবটা শুনে বলেছিলেন, এই স্বপ্ন আসলে তার মানসিক নৈঃশব্দ্যের প্রতিফলন। আর কিছুই না। এই স্বপ্ন দেখে বোঝা যায়- তিনি খুব একাকীত্বে ভোগেন,তার সঙ্গীহীনতা ও জীবনযাত্রা -সব কিছুই নাকি এই স্বপ্ন থেকে বোঝা যাচ্ছে। একটা মাত্র স্বপ্ন থেকে একটা মানুষের এত কিছু নিখুঁত ভাবে জানা যায় -জেনে তার বেশ অবাকই লেগেছিলো।আর ওই "কিছু একটা হবে" আসলে কিছুই না-আসলে সেটা তার ভয়। ভবিষ্যৎকাল নিয়ে তার ভাবনা যে খুব ঘোলাটে ও তা নিয়ে তিনি যে আশঙ্কার আছেন-এটাই বোঝা যাচ্ছে। মাত্র একটা স্বপ্ন শুনে ডঃ চক্রবর্তী এত কিছু বুঝে যাচ্ছেন দেখে তার অস্বস্তিই হয়। তিনি ঠিক করেন- কোনদিন আর কাউকে কোন স্বপ্নের কথা বলবেন না। এত গোপন ব্যাপার সবাইকে জানিয়ে দেওয়া উচিৎ না।

তখন রাত আড়াইটে কি তিনটে।সমুদ্রের হাওয়া হু হু করে ঘরে ঢুকে আসছে। ফলে তার বুক থেকে চাদরটা অল্প সরে গেছে। এখনই সেই অদ্ভুত ব্যাপারটা ঘটলো স্বপ্নে। একটা বছর পাঁচেকের মেয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একা একা। একটু আগে সেখান দিয়ে সেনাগাড়ি টহল দিয়ে চলে গেছে।বাতাস থেকে এখনও ডিজেল পোড়া গন্ধ যায় নি। বছর পাঁচ ছয়েকের মেয়েটা হাতে একটা পুতুল ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। সাদা লালে একটা ফ্রক পরে। এভাবে কার্ফুর রাস্তায় বেরনো উচিৎ না। তার বাবা মা'ই বা কেমন বেয়াক্কেলে যে ওইটুকু একটা বাচ্চাকে এরকম ফাঁকা রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছে? যদি কোন বিপদ আপদ ঘটে যায়? একদল সেনা মার্চ করতে করতে উল্টোদিকে থেকে আসছিলো-যদিও তাদের মার্চের আওয়াজ অনেক আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিলো-চারপাশ অদ্ভুত ভাবে শান্ত বলে। যার পাশে একমাত্র আওয়াজ-ওই বছর পাঁচেকের বাচ্চাটার পায়ের নুপুরের। কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। মার্চ করা সেনার দল সেই বাচ্চা মেয়েটিকে দাঁড়াতে বলে। সে কি আর এসব বোঝে? সে তার পুতুলকে বুকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলো সেনাদের দিকে। তিনবার বারণ করার পর,হঠাৎই কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে এলো বাচ্চাটার দিকে। ওইটুকু খানি শরীর বুলেটে বুলেটে ক্ষত বিক্ষত হয়ে পড়ে গেল রাস্তায়। বাতাসে বারুদের গন্ধ। পুতুলটা গুলি লেগে ফেটেফুটে গেছে। এক রাশ রক্ত রাস্তা ভিজিয়ে দিচ্ছে। মার্চ করতে করতে সৈনরা যেদিকে যাওয়ার কথা ছিল সেদিকেই চলে গেল -সেই বছর পাঁচ কি ছয়ের বাচ্চা মেয়ে আর তার পুতুলের লাশের পাশ দিয়ে।

তার ঘুম ভেঙে গেছে। সারা কপালে ঘাম। গা ঘামে ভিজে সপসপ করছে। এটা তিনি কি দেখলেন? এইটাই ঘটার ছিল তাহলে? ডঃ চক্রবর্তী সাজেস্ট করেছিলেন কোথাও থেকে একটা ঘুরে আসতে। পুরীতে এসেছিলেন। স্বর্গদ্বারের ভীড় ভালোলাগে না বলে একটু দূরেই রিসর্টে উঠেছিলেন। কিন্তু ঘুরতে এসে আজ প্রথম দিনেই তিনি এই ভয়ংকর স্বপ্নটা দেখে ফেললেন? জানলার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন অনেকক্ষণ অন্ধকারেই। সমুদ্র থেকে আসা ঠান্ডা হাওয়ায় আরামই লাগছিলো। রিসর্টের বাইরে থেকে অল্প আলো আসছে বলে তিনি আর আলো জ্বালাননি। কিন্তু বেশিক্ষণ এই ঠান্ডা হাওয়া সোজাসুজি বুকে খেলে কাল ঠান্ডা লাগা অনিবার্য।এমনিতেই তার ঠান্ডার ধাত। তার ওপর সমুদ্রের জোলো হাওয়া। গায়ে কিছু একটা দেওয়া দরকার। আলো জ্বালাতেই আঁতকে উঠলেন তিনি। একটা পুর্ণ বয়স্ক মানুষের গোঙানি আর সমুদ্রের গর্জন ছাড়া ঘরে আর কোন শব্দ নেই এখন।তিনি বিষ্ফোরিত চোখে খাটের দিকে তাকিয়ে দেখছেন,যেখানে তিনি শুয়েছিলেন একটু আগেই-সেখানে একটা ফেটে ফুটে যাওয়া পুতুল,যা থেকে খানিকটা টাটকা রক্ত বেড়িয়ে চাদর ভিজিয়ে দিয়েছে অনেকখানি...

আপনার মতামত জানান