আগন্তুক

গৌতম চট্টোপাধ্যায়
“৩১৬২৯ আপ শিয়ালদহ রানাঘাট লোকাল ১ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে।”

মাইকে ঘোষণা হতেই ছুটে গেলাম সেদিকে। ষ্টেশনের প্রত্যেকটা দোকান, তার অলিগলি এখন কেমন যেন এক নিঃসঙ্গ মরুভূমি। সারাদিনের দৌড়ঝাপের আড়ালে কোথাও যেন এক অপার্থিব সাবেকিয়ানা। এখানে মানুষ বলতে ওই দাত না মাজা, জটাধারী নির্জীব প্রাণগুলো যারা নিজেদের মধ্যেই গড়ে তুলেছে এক আনমনা সংসার। প্রায় নিথর হলদেটে দৃষ্টির মধ্যে কোথাও যেন বিদ্বেষ, কোথাও এক তীব্র হাহাকার, “কি বাবু্‌, পা মাড়াবেন না!! দেবেন না মন ভরা খিস্তি!!” আসলে আমাদের কপালের ভাগীদার আমরা নিজেই। যদিও শোনা যায় নেপোলিয়ান নিজের ভাগ্য নিজেই তৈরি করেছিলেন কিন্তু তার আদি চিত্রপট যেন তাঁর হাতেই আঁকা। তাই এই প্রতিটা খাঁ খাঁ চত্বর কোথাও যেন চেনায় নিশুতির একাকীত্ব কে, যেখানে ভাগ্যই তোমার অবগাহন পরিহাস।

জ্বলজ্বলে ডিজিটাল ঘড়িতে তখন সময় দেখাচ্ছে রাত ১১ টা বেজে ৩৮ মিনিট অর্থাৎ হাতে সময় বলতে মাত্র দু’মিনিট নাহলে শেষ ট্রেনটাও হাতছাড়া। বিয়েবাড়ির মশগুলে ফেঁসে গিয়ে যে এই হাল হবে তা ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। কাল সকালেই আবার ঝুলতে ঝুলতে এক প্রকার ‘পিতৃভূমি’ তেই যেতে হবে অফিস। তাই অগত্যা...। মারপিট নেই, নেই জায়গার জন্য হুড়োহুড়ি, কেমন যেন থমথমে সবকিছু। কাল সকালের চিরাচরিত যুদ্ধকালীন প্রলয়ের আগে একটু আলতো জিরিয়ে নেওয়া যেন। উপাদান মজুত আছে, কাল দরজাগুলোয় আবার বর্ষণ হবে, ভিড়ের। পুরো রেকটা তে যাত্রী বলতে মেরেকেটে হাতে গোনা ৭-৮ জন, বাকি শুধু লাল কাঠের বেঞ্চের সারি। একটা জানালার ধারে হাত পা ছড়িয়ে বসলাম, যাক এবার নিশ্চিন্ত।

ট্রেন ছেড়েছে গন্তব্যের পথে। এক ঠাণ্ডা অথচ আরামদায়ক হাওয়ার ঝাপটা সারা জাগায় ইন্দ্রিয়গুলিকে। সারাদিনের ধকলের পর কোথাও যেন এক ক্লান্তিনাশা উদ্ধারকর্তা। হঠাৎ খেয়াল হলো ঠিক পাশেই কেউ যেন এসে বসেছে। ত্বক রুক্ষ, চুল এলোমেলো, চোখ ঘোলাটে, রঙ কৃষ্ণ আর গায়ে বহুকালের অপরিছন্ন জামাকাপড়, কোথাও ছেড়া কোথাও বা তাপ্পি। মনে হয় তার যেন সুকরুন আর্থিক অনটন। উনি কখন যে এসেছেন, কখন যে বাম দিকে জায়গা করে নিয়েছেন তা ভেবেও ঠাহর করতে পারলাম না। বোধয় চোখ লেগে এসেছিল তাই হয়তো ব্রেনের ফ্রন্টাল লোব থেকে স্মৃতি বেমালুম উবে গেছে।

-“এতো রাতে কোথা থেকে ফেরা হচ্ছে কত্তা?” আগন্তুকের খসখসে স্বরে চমকে উঠলাম। কি আওয়াজ রে বাবা!! এমন কি মানুষের হতে পারে!! যেন কোন সহস্র মেঘের গর্জন বা ঢেউয়ের উথাল পাতাল আকুতি, তা ঠিক ধরা যায়না।
-“ বিয়েবাড়ি,” ঢোক গিলে বললাম আমি।
-“ তা কত্তা, যাবেন কোথায়!!”
-“ বারাকপুর...আপনি?”
এই প্রশ্ন শুনে খিক খিক করে হেসে উঠলো সে। ধুলো মাখা মেঝের উপর হাওয়াই চটি পরা পা দাপিয়ে গেলো ঘোর অমবস্যার চাঁদে।
-“আমার যাওয়ার জায়গা তো অনেক। এই ধরুন রানাঘাট চলে যেতে পারি আবার নেমেও যেতে পারি দমদমে।”
লোকটা বলে কি!! বাড়িঘর নেই নাকি!! নির্ঘাত মাথায় কোন গণ্ডগোল রয়েছে বা নেশার ঘোরে ভুলভাল বকছে। কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ তারপর কিছুটা মনের কৌতূহল আন্দাজ করেই সে বলে উঠলো, “আজ্ঞে আমার নাম স্বপন বাড়ুই। পালপাড়ায় খেতি খামারি করে দিন চলতো কোনোরকম। বাড়িতে বউ আর একটা ফুটফুটে মেয়ে ছিল জানেন। খুব ভালবাসতেম ওদের। কিন্তু মাগী ঘরে থাকার ছিলোনি।অন্য মরদের সাথে গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর করতো,” এই বলে কিছুক্ষণ থামল সে। বুঝতে পারছিলাম তার টুকরো আবেগ, তারও গলা শুকিয়ে আসছে। কিছুক্ষণ দম নিয়ে আবার শুরু করলো, “একদিন চুল্লু খেয়ে ফিরেছি ঘরে, ব্যাস মাগীর দপদপানি শুরু। আমার টাকা, আমার মদ, তুই বলার কে গা!! সেদিন ঝগড়া হয়েছিল খুব, আমার মাথায় রক্ত উঠি গেলো। পাশে ডাঁসা দিয়ে মারলুম এক ঘা, সেই যে পড়লো আর উঠলো নি গো... আর উঠলো নি।”

মানে কি? আমার পাশে বসা লোকটা একটা ক্রিমিনাল!!
-“আপনি শেষ পর্যন্ত খুন করলেন!!”
-“করতি যাবো কেন!! হয়ে গেলো। আমি কি জানতুম নাকি সে আর উঠবে না!! এখনো স্বপ্ন দেখি জানেন, ও পড়ি আছে, একপাশ থেকে রক্ত বেইরাচ্ছে। কি যে ভুল করেছি, হের কি ক্ষমা নাই?”
আমার দু’ হাত ধরে তার আস্ফালন। অনুভব করলাম গরম দু’ ফোটা জল আমার হাতে এসে পড়লো, তারপর আরো দু’ ফোটা... আরো একবার। সান্ত্বনা কি দেবো বুঝতে পারছিলাম না কিন্তু মনের কৌতূহল ক্রমশই বাড়তে শুরু করেছিল। তারপর কি ঘটেছে!! তারপর......

-“পাশের ঘরে মেয়েটা ঘুমাচ্ছিল। ওর মুখের দিকে চাইতে পারছিলেম নি। ওর আলো কেড়ে নিয়েছি তো। ওখান থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসি। তারপর পালিয়ে এলাম টিটাগড়ে। পরে বুঝেছিলুম ও মরদ ছিল মোর মনে।”
-“তার মানে আপনি আপনার বউ কে সন্দেহ করতেন!!তাকে খুনও করলেন!! একবার সত্যি টা জানবার চেষ্টা করলেন না!! পারলেন কি করে আপনি? ছিঃ...দোহাই আপনার।”
দেখলাম তার চোখ এখনও জলে ভরা। তার ঠোঁট কাঁপছে, চোয়াল শক্ত। মাথায় হাত দিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পরেছে সে। আজ সমাজের চোখে সে এক দাগি আসামি; নিজের ভালোবাসা, নিজের প্রাণভোমরা কে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে সে পিছপা হয়নি। হয়তো এটাই মেয়েদের ভালোবাসার প্রতিকার যার নির্মম পরিণতিই গ্রাহ্য। নারী তুমি রক্তাক্ত বর্বরের অধিকারে। ভালোবাসা হয়তো আপেক্ষিক, এখন প্রেম হয়তো সাবেকি মুন্সিয়ানা কিন্তু কোথাও কর্তব্যবিমুখ শ্লেষ বয়ে চলেছে মাতলা নদীর জলে।

আমার কথার উত্তর সে দেয়নি। বা বলা ভালো তার উত্তর জানা ছিল না। বিক্ষুব্ধ...বিভক্ত...বিল ুপ্ত। নিজের মনেই সে বলে চলেছে, “ওরা ধরে ফেললি আমায়। মারলি...খুব...খুব। তারপর...তারপর ওই গাছের ডালে...”

ট্রেন ঢুকছে জনমানবহীন টিটাগড়ে। সময় যেন থমকে দাড়িয়েছে এই বিষাক্ত বায়ুমণ্ডলে; আগন্তুক সেখানে নেই। ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মের অদূরের বটগাছের ডালে একটা মৃতদেহ ঝুলছে।।

আপনার মতামত জানান