ফ্রেমবন্দী

সৌভিক মুখোপাধ্যায় ও বর্ণদীপ ব্যানার্জী
"নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস আন্তঃরাষ্ট্রীয় হাওয়াই আড্ডামে আপকা স্বাগত হ্যায়|” বছর কুড়ির মেঘনা পিঠে একটা ব্যাগ আর ছোট একটা ট্রলি নিয়ে এয়ারপোর্ট এর বাইরে বেরিয়ে এলো| সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্যাক্সিটার সাথে রফা করে তাতে চেপে বসলো| ফোনটা কানে নিয়ে “মা আমি দমদম নেমে গেছি | ট্যাক্সিতে আছি| না না কোনো অসুবিধা কিছু হয়নি | হা হা সব ঠিক আছে, আমি বাড়ি গিয়ে বলবো” বলে রেখে দিলো | হোয়াটস্যাপটা খুলে একবার চেক করে নিলো| প্রিয়াঙ্কা, ওর বেস্টি টেক্সট করেছে রাত একটায়, “কখন পৌছবি?”
“দমদম নামলাম | এখন ট্যাক্সিতে | ফ্লাইট লেট ছিল দেড়ঘন্টা ” মেসেজটা টাইপ করে নেটটা অফ করে রেখে দিলো মেঘনা | জানলার ধরে বসে শীতের সকালের রবিবাসরীয় কলকাতার আমেজটা নিতে লাগলো | শহরটা এখনো জেগে ওঠেনি সেভাবে | গাড়ি হলদিরাম , ভি আই পি রোড , উল্টোডাঙা , ছাড়িয়ে এগিয়ে চললো |
চিংড়িঘাটার ক্রসিংয়ের কাছে সিগনালে এসে দাঁড়ালো গাড়িটা | একটা বাচ্ছা মেয়ে সিগনালে দাঁড়িয়ে ধূপকাঠি বিক্রি করছে | মেঘনার ট্যাক্সিটার কাছে এসে কাঁচের জানলায় টোকা মেরে , “দিদি একটু ধূপকাঠি নাও না গো দিদি |”
মেয়েটাকে দেখে মেঘনার মায়া লাগলো | এই শীতেও একটা পাতলা ছেঁড়া জামা পরে আছে | ও ওর পার্স থেকে ১০০ টাকার একটা নোট বের করে দশটা প্যাকেট কিনে নিলো | বাচ্ছা মেয়েটার চোখে মুখে তখন এক অনাবিল আনন্দ | মেঘনা এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে নিজের মোবাইলটা বের করে ওই স্মাইলটাকে ফ্রেম বন্দি করলো |

------------------------------------------------------------ --------

(ফ্ল্যাশব্যাক ১ - ৬ মাস আগে)
মেঘনার বাবা রজত সেনের প্রমোশন উপলক্ষে বাড়িতে একটা ছোট গেট টুগেদার আয়োজন হয়েছে , দু একজন খুব ক্লোস বন্ধুর ফ্যামিলিরা এসেছে | মেঘনা ওদের রিসেন্ট সিক্কিম ফ্যামিলি তৌরের ফটোগুলো দেখাচ্ছে |
প্রথম অতিথি - "বা রে , এটা তো দারুন তুলেছিস , এই দেখো কি সুন্দর ছবিটা তুলেছে দেখো মেয়েটা " বলে অ্যালবামটা ওনার হাসব্যান্ডএর দিকে বাড়িয়ে দিলেন
দ্বিতীয় অতিথি - "হমম , বাহ্ , ভেরি নাইস | ব্রিলিয়ান্ট কম্পোজিশন | এক্সসেলেন্ট মাই ডিয়ার , কিপ ইট আপ "
মেঘনা , একটু লাজুক হাসি হেসে , “থ্যাংক ইউ আঙ্কেল ”
প্রথম অতিথি : “হ্যা রে মেঘনা , এগুলো কি করে তুলিস রে ? তোর মায়ের মুখ টা এতটা ক্লিয়ার আর পিছনের সিনারিটা এতটা ঝাপসা | খুব সুন্দর লাগছে কিন্তু ”
মেঘনা “আন্টি ওটাকে ডেপ্থ অফ ফিল্ড বলে | কোন ডিসটেন্স এ অবজেক্টকে ফোকাস করবে সেটা ডিসাইড করা যায় |”
তৃতীয় অতিথি : “মেঘনাদি তোমার DSLR আছে ?”
মেঘনার মা , “আর নাম করিসনা বাবা | ওই নিয়ে তো রোজ অশান্তি | খালি বায়না DSLR দাও | বললেই কি দিয়ে দেওয়া যায় নাকি , এক একটা DSLR এর কম দাম? আমার ভাইপোটার একটা আছে সেটা থেকে তুলেছে”
চতুর্থ অতিথি - "তবে সত্যি , ওর ফটো গুলো কিন্তু দারুন || এত ভালো ফটো তোলা কথা থেকে শিখলি রে মনা ?"
মেঘনা - "আমার ভালো লাগে | নেটে সার্চ করে কিছুটা দেখেছি , আর কলেজে আমার একটা খুব ভালো ফ্রেন্ড আছে অরিজিত , ও দারুন ফটো তোলে | ওর কাছ থেকেই কিছু কিছু টিপস নি "

------------------------------------------------------------ --------

মোবাইলটা খুলে আরেকবার হোয়াটস্যাপটা চেক করলো মেঘনা | না , কোনো মেসেজ করেনি অরিজিত | ওর আর অরিজিতের মধ্যেও এতটা ইগো আসবে এটা ও কল্পনাও করতে পারেনি | প্রিয়াঙ্কা টাও কোনো রিপ্লাই করছেনা এখনো | রবিবারের সকাল , তাও আবার এরকম ঠান্ডা , সে যে এখনো লেপ মুড়ে ঘুমোচ্ছে এই নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না | মেঘনা নিজেই লিখতে থাকে ,
“এত কাছে গিয়েও হলো না | কাউকে কিছু প্রমান করতে পারলাম না | জানিনা এরপর আর কোথাও যাওয়ার সুযোগ পাবো কিনা |” মেসেজটা সেন্ড করে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে ও |

------------------------------------------------------------ --------

ফ্ল্যাশব্যাক ২ - এক মাস আগে
রজত বাবু খবরের কাগজ নিয়ে বসে আছেন | শান্ত পায়ে ধীরে ধীরে এসে কিছুটা ভয় ও কিছুটা আব্দারের সুরে মেঘনা বলেছিলো “বাবা একটা ফোটোগ্রাফি কনটেস্ট আছে নেক্সট মানথ-এ | করাচ্ছে ফোটোগ্রাফি আর্টস এসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া | সিটি ওয়াইস প্রিলিমিস হবে একটা দেন নিউ দিল্লিতে ফাইনাল | প্রাইজ কিন্তু …”
“এত কথা না বাড়িয়ে সোজা কথায় বলো কি চাও ”
“উমম , মানে || কিছু টাকা লাগবে ফর্ম ভরবো | ওই ১২০০ মতো ”
“না | এইসব আজেবাজে জিনিসের জন্য আমি এক পয়সা খরচ করবোনা ”
“প্লিজ বাবা একবার চান্স দাও | আমাদের ক্লাবের আরো অনেকে পার্টিসিপেট করবে ”
“ক্লাব আর ক্লাব , সারাদিন শুধু ফোটোগ্রাফি ক্লাব | কলেজে কি যাও পড়াশুনা করতে নাকি ফোটোগ্রাফি করতে ? ওসব ফটো টোটো তুলে কিছু হবেনা | নিজের কাজ করো গিয়ে ”| বাবা ধমকে ওঠেন |
“আঃ ! অমনি করে বলছো কেন ?” মেঘনার মা এসে একটু বোঝানোর চেষ্টা করেন “মেয়ে তো বড় হয়েছে | একটু আধটু তো এলাও করতে হবে | মেয়েরা আর কে কে নাম দেবে ?”
মেঘনার উত্তর দেওয়ার আগেই ওর বাবা গর্জে ওঠে “তুমি চুপ করো তো | তোমার আদরেই ওর দিন দিন বার বেড়ে যাচ্ছে | আজ বলছে এখানে , কাল আবার অন্য কোথাও যাওয়ার বায়না তুলবে | রেজাল্টটা দেখেছো কি হচ্ছে দিন দিন ? আর ওদিকে রাকেশের ছেলেটাকে দেখো | আই আই টি তে চান্স পেয়ে গেলো , এরপর নাকি ক্যাট দেবে , কতটা কন্সসিয়াস নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে | আর তোমার মেয়ে ? কোনো হেলদোল নেই ? গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াবে | একটা চাকরি জোটাতে পারবে না বলে দিলাম ”

------------------------------------------------------------ --------

“পাগল নাকি তুই ! ইউ গট ইনটু দা টপ ফাইভ ফাইনালিস্টস | এরকম একটা অল ইন্ডিয়া লেভেল কম্পিটিশনে | উই আর প্রাউড অফ ইউ মেঘনা ” প্রিয়াঙ্কা রিপ্লাই করেছে |
“ইয়া, বাট কেউ মনে রাখবেনা এটা | আমি জিততে পারলাম না | প্রাইজটাও হাতছাড়া হয়ে গেলো”

------------------------------------------------------------ --------

ফ্ল্যাশব্যাক ২ –
“বাবা প্লিজ , আজকাল ফোটোগ্রাফি থেকেও অনেকদূর এগোনো যায় | তুমি জানোনা , সো প্লিজ বাজে বোলোনা ”
“ওই তো পিনটু ফটোগ্রাফার , লোকের বাড়ি বাড়ি ঘুরে এর ওর বিয়েতে ফটো তুলে বেড়াতো | কি করা যায় সে তো দেখলাম | আজ পেটের দায়ে সে কিনা দোকানে দোকানে মাল সাপ্লাই এর কাজ করছে | কখনো গিয়ে জিজ্ঞাসা কোরো মাস গেলে কত টাকা হাতে আসে ”
“কিন্তু বাবা , মানুষের কিছু ইচ্ছে অনিচ্ছে থাকে | আমি জানতে চাইনা কে কি করে | কিন্তু কখনো তো একবার ভেবে দেখো আমি কি চাই ? আমার ইচ্ছে গুলোর কি কোনো দাম নেই ?”
“হা, নিজের ইচ্ছে ভাঙিয়ে খাও | বড় বড় কথা তো শিখেছো কিছু ”
" কি মনে হয় ? এসব এতটাই সোজা ? লোকজন ফোটোগ্রাফি নিয়ে পড়াশুনা করে রীতিমতো | ওই একটা চড়াইপাখি , ওই একটা গরুর লেজ ওসব তুলে কেউ বড় ফটোগ্রাফার হয়না |”
“একবার চেষ্টা টুকু তো করতে দাও | চিরকাল তো এভাবেই আন্ডার এস্টিমেট করে গেলে | আমি নাম দেব ব্যাস !”
ঘরটা একমুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ পুরো | শুধু উত্তেজিত মেঘনার জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ার শব্দ হচ্ছে |
নীরবতা ভেঙে একটা গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন রজতবাবু , “আমার মত নেই | নিজে যেভাবে যা পারো করো | ”
মেঘনা তখনও জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে | কোনোরকম নিজের উত্তেজনাটাকে কন্ট্রোলে এনে একটু শান্ত স্বরে মেঘনা বললো ,
“তোমরাই তো শিখিয়েছিলে টাকা মানুষকে সব কিছু দিতে পারেনা | আমি ফটোগ্রাফি ভালোবাসি , খুব কি দরকার আমাকেও অন্ধের মতো ওই ১০টা - ৫টার ইঁদুর দৌড়ে দৌড়ানোর ? বাবা , ভেবে দেখো , তুমি আজ এত সিনিয়র পজিশনে আছো , তুমি তোমার জব লাইফ নিয়ে কতটা খুশি ?” রজত বাবু চুপ হয়ে পড়েন |
“আমাকে কিছু প্রমান করার সুযোগ টুকু এটলিস্ট দাও একবার ”

------------------------------------------------------------ --------

“আরে ইয়ার , ইটস জাস্ট দি বিগিনিং |” ……………………………….
“জানিনা ,” দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলে মেঘনা |
“অরিজিত তোকে তারপর থেকে আর কিচ্ছু বলেনি ? একটা টেক্সটও করেনি ?”
মেসেজটা পরে একটা পরিহাসের হাসি হাসে মেঘনা | লাস্ট ৭ দিনে অন্তত অরিজিতের সাথে ওর একবারও কথা হয়নি ||

------------------------------------------------------------ --------

ফ্ল্যাশব্যাক ৩ - এক মাস আগে
ধাঁই করে ফুটবলটায় প্রকান্ড একটা লাথি মারলো অরিজিত | গোলকীপার কিছু বুঝে ওঠার আগেই বল সোজা গোলের জালে |
“আই লাভ দিস শট !” পিছন থেকে মেঘনার গলা |
পিছন ফিরে তাকিয়ে অরিজিত ”ও তুই ! কখন এলি ? থ্যাংকস ফর দি কমপ্লিমেন্ট ”
“তোকে বলিনি | ক্যামেরায় শটটা দেখ ”
একটু চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো একবার তাকিয়ে ও ক্যামেরাটার কাছে গিয়ে দেখলো | সবুজ ঘাসের মধ্যে ওর বুট পরা পা টা লাথি মারছে | বলটা সদ্য মাটি ছেড়েছে | আর সকালের শিশির ভেজা ঘাসের থেকে বিন্দুবিন্দু জল ছিটকে পড়ছে আর রোদের আলোয় সেটা চকচক করছে |
একটু জোরে জোরে দম নিতে নিতে অরিজিত “দেখি দেখি | চরম তুলেছিস তো !”
চোখটা ছোট ছোট করে বিড়ালছানার মতো নাক মুখ বাঁকিয়ে মেঘনা উত্তর দেয় “থ্যাংক ইউ ”|
“আরেকটু এক্সপোসারটা কম হলে সুপার্ব লাগতো ”
“তুই খুঁত ধরতে পারলে আর কিছু চাসনা | হাহ , ওটা এডিটিংএ ঠিক করে দেব ”
সেদিনের মতো প্রাকটিস সেরে দুজনে হাঁটা দেয় | সাদার্ন এভেন্যুয়ের রাস্তাটা ধরে হাটতে হাটতে ,
অরিজিত - "শোননা , কাল সুবীর স্যারের সাথে কথা বলছিলাম | একটা অল ইন্ডিয়া লেভেলের ফোটোগ্রাফি কনটেস্ট আছে নেক্সট মানথ-এ | অর্গানাইজ করছে ফটোগ্রাফি আর্টস এসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া | সিটি ওয়াইস প্রিলিমিস হবে একটা দেন নিউ দিল্লীতে ফাইনাল | ফাস্ট প্রাইজটা কিন্তু এট্রাক্টিভ , একটা ক্যানন ৭৫০ডি | তুই পার্টিসিপেট কর না "
মেঘনা - "আমায় বলছিস ? তুই করবিনা ?”
“অবভিয়াসলি করবো ”
“কে জানে বাড়ি থেকে যেতে দেবে কিনা | এন্ট্রি ফী কত ?
“উমম , ১২০০ ”
“অসম্ভব | বাবা কিছুতেই দেবে না ”
“উফ্ফ | দরকার হয় আমি দিয়ে দেব ”
“খেপেছিস নাকি ? না , এগুলো আমার পছন্দ নয় একদম | যেদিন আমার বর হবি সেদিন দিস ”
প্রেমের ইশারায় কনুই দিয়ে অরিজিতকে খোঁচা দেয় মেঘনা | অরিজিত ও একটু হেসে ওর কোমরটা ধরে | দুজন মুহূর্তটা উপভোগ করতে করতে হেঁটে চলে |

------------------------------------------------------------ --------

সায়েন্স সিটির সিগন্যালে এসে থামলো গাড়িটা | বইমেলার জন্য বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড করা জায়গায় জায়গায় | পুরোনো স্মৃতি মনে পড়তে লাগলো মেঘনার | এই বইমেলায় ও আর অরিজিত কত ঘুরে বেরিয়েছে , হস্তশিল্প মেলায় এসে অরিজিত ওকে লো লাইট ফোটোগ্রাফি করা শিখিয়েছে | ফেরার সময় ভিড় বসে কত প্রোটেকশন দিয়েছে | মনটা খারাপ হয়ে যেতে থাকে মেঘনার |
মনে পড়তে থাকে ভিক্টোরিয়াতে ফোটোগ্রাফি ক্লাবের সৌজন্যে অরিজিতের সাথে ওর আলাপ , ফটো তোলার পারফেকশন দেখে অরিজিতকে ভালো লাগতে শুরু করে মেঘনার | সেই থেকে পরিচয় ও ফ্রেশার্সের দিন অরিজিতের হঠাৎ প্রপোজ |
তারপর কলকাতার অলি গলি , পুজোর কুমারটুলি , সন্ধ্যার গঙ্গার ঘাট , বাহাদুরের পাপড়ি চাট সর্বত্রই ওদের দুজনের অজস্র স্মৃতি | অরিজিত ওকে নিজে হাতে শিখিয়েছে DSLR এ ফটো তোলা | যখন ফটো তোলা বা ফোটোগ্রাফিতে ক্যারিয়ার এগোবার ব্যাপারে বাবার সাথে দ্বন্দ্ব লাগতো তখন অরিজিতে ওর পাশে থাকতো সান্তনা দিতো | আজ ওর বাবাকে কিছুটা রাজি করলো যদিও বা , অরিজিত এসে ওর পশে দাঁড়ালো না |

------------------------------------------------------------ --------

ফ্ল্যাশব্যাক ৪ - সাতদিন আগে

“হ্যালো ”
প্রিয়াঙ্কা – “কি রে কি করছিস ?”
“কিছুনা , বল ”| গলাটা কিঞ্চিৎ বিরক্ত |
“কিছুনা মানে ? অরে কিছুতো করে মানুষ | মিনিমাম ল্যাদটুকু তো খায় |”
“হম | বল না কি বলবি ”
“একিরে , বাইরের এই কাঠফাটা রোদ্দুরেও তোর মুখটায় কালবৈশাখীর মেঘ মনে হচ্ছে ”
“প্লিজ জালাসনা আর| এখন মুড নেই , কখন থেকে অরিজিতটার ফোন সুইচ অফ, ইরেস্পন্সিবল ননসেন্স ছেলে একটা ” একটু ধমকে ওঠে মেঘনা |
“আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যাট |”
“কি ?”
“শোন , আই হ্যাভ আ গুড নিউজ এন্ড আ ব্যাড নিউজ | কোনটা আগে শুনবি ?”
“মানে ? কি নিউজ ?আমি কিছু বুঝলাম না ”
“দিল্লির টিকিটটা কেটে ফেল ”
“মানে ? আমি কিছুই বুঝলাম না ”
“ওরে বি.সি. তুই ফাইনাল রাউন্ডের জন্য সিলেক্ট হয়ে গেছিস | কংগ্রাচুলেশন্স বেবি , লাভ ইউ ”
“রিয়েলি ?” আনন্দে লাফিয়ে ওঠে মেঘনা ,”তোকে কে বললো ?”
তোদের ক্লাবের তানিয়াদি | ও তোকে ফোন করতে ট্রাই করেছিল বাট সামহাও কল লাগেনি
“আর কার কি হয়েছে ? অরিজিতের ?”
“আর কার কি হয়েছে জানিনা | অরিজিতের হয়নি | মে বি তাই ও আপসেট ভীষণ |”
“এ বাবা , এটা খুব বাজে হলো ”
“ও ঠিক হয়ে যাবে ডন’ট ওরি | ওদের ওয়েবসাইট এ রেজাল্টটা দিয়েছে | আর ট্রিট কিন্তু মাস্ট ”
সেদিন প্রেলিমসে যখন মেঘনা সিলেক্ট হয়ে গেলো অথচ অরিজিত হলো না , ওর সুপ্ত মেল শভিনিজম তখন তার পাশবিক রূপ নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলো | সেদিন সন্ধ্যায় “তুই এখন ন্যাশনাল লেভেল ফটোগ্রাফার | আমাদের মতো চুনোপুঁটিদের সাথে আর মেশার দরকার কি ?” বলে ক্লাব-এর একঘর ছেলে মেয়ের মধ্যে সিন-ক্রিয়েট করে চলে গেছিলো | মেঘনা অরিজিতকে পরে বোঝাবার বা শান্ত করার চেষ্টা করেছিল , কিন্তু অরিজিত না বুঝতে চেয়েছে , না ভদ্র ভাবে কথা বলতে চেয়েছে |
বাড়ি ফিরে ও ওয়েবসাইটটা খুলে মা বাবাকে দেখায় | কলকাতা থেকে একটাই নাম সিলেক্ট হয়েছে , মেঘনা সেন | মা বাবা দুজনেই মেয়ের সাফল্যে হতবাক | মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন বুকে | বাবা খুব উচ্ছাস না দেখালেও মনে মনে যে বেশই খুশি হয়েছেন সেটা বোঝাই গেলো |
“কিন্তু এটার টাকা কথা থেকে পেলে তুমি ?”
“আমার যেটুকু যা জমানো ছিল রাখি আর ভাইফোঁটার গিফট থেকে , ওখান থেকেই করেছি ”
মেয়ের জেদ দেখে অবাক হয়ে পড়েন রজত বাবু | মেয়েকে এতটা খুশি হতেও কখনো দেখেননি তিনি | তবে এরপর দিল্লী যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে পারমিশন পেতে বা টিকিটের জন্য বিশেষ কাঠখড় পোড়াতে হয়নি মেঘনাকে | রজত বাবু নিজেই ওর যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন |
চূড়াঁন্ত ৫ জনের মধ্যে থেকেও যখন শেষে ফাইনাল প্রাইজটা মেঘনার হাত থেকে বেরিয়ে যায় , চোখের জল সামলাতে পারেনি ও | বাড়িতে ফোন করে রেজাল্টটা বলার সময় ওর মা কিছুটা সান্তনা দিয়েছিলেন , কিন্তু বাবার গলায় বিশেষ অভিব্যক্তি ধরা পড়েনি | ভেবেছিলো অরিজিতটা একবার ও ফোন করবে অন্তত , কিন্তু সেও তো কিছু করলোও না

------------------------------------------------------------ --------

শহরের আঁকাবাঁকা গলি ছাড়িয়ে ট্যাক্সিটা মেঘনার বাড়ির সামনে এসে থামলো | ট্যাক্সি থেকে নেমে এসে ঘরের বেল বাজাতেই ওর মা এসে দরজাটা খুললো , “এসে গেছিস মা , আয় আয় ” বলে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলো |
“মা , এত কাছে গিয়েও জিততে পারলামনা প্রাইজটা ” কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে বলে উঠলো মেঘনা |
“দেখো পাগলটা , ওরে তোর তো সবে শুরু | রেজাল্ট যাই বলুক , আমাদের চোখে তুইই উইনার | আমরা ভীষণ প্রাউড তোর জন্য ”
“বাবা নেই ঘরে ?”
হঠাৎ ঘরের ভিতর থেকে একটা ফ্লাশবাল্বের আলোতে ও চমকে যায় | রজত বাবু দাঁড়িয়ে আছেন ঘরের ভিতরে , গলায় একটা নতুন DSLR নিয়ে |
“এটা কথা থেকে পেলে ?” বিস্ময়ে অভিভূত মেঘনার দুটো চোখ | রজতবাবু হাসছেন মুচকি |
“এটা তোমার | এই ডেডিকেশনটা বজায় রেখো , লাইফে অনেক দূর এগোবে |”
মেঘনা ওর নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেনা |
“তবে গ্র্যাজুয়েশনটা কমপ্লিট করো ভালো ভাবে | আমি তা নাহলে কিন্তু কিচ্ছু এলাও করবো না ”
“নিশ্চই বাবা ” খুশিতে মেঘনার মুখটা চকমক করে উঠলো | বাবা রাজি হয়ে গেছে | ফিফ্থ হয়েও ও ফার্স্ট প্রাইজের থেকে অনেক বেশি কিছু জিতে গেছে এবার |
পকেটের মোবাইলটা ভাইব্রেট করে উঠলো | অবশেষে অরিজিতের একটা ছোট্ট টেক্সট ৭ দিনের নীরবতা ভেঙে , “কংগ্রাচুলেশন্স |”
মেঘনা স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে থাকে অবাক চোখে | হঠাৎ ? কি চায় অরিজিত ? অরিজিত কি নিজের ভুল শুধরে ফিরে আসতে চায় ? নাকি এটা শুধুই লোক দেখানো সৌজন্য ? প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে মেঘনার মনে | অরিজিত আরো কিছু লিখছে , মেঘনা অধীর চোখে স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে থাকে , " টাইপিং .…"

আপনার মতামত জানান