মেঘ ও ঘাসবনের উপাখ্যান

অমিত কুমার বিশ্বাস


কালো । অথচ দু'চোখ মেললেই জোছনা ছড়িয়ে পড়ে ঘাসবনে । ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিতেই পাখি ডেকে ওঠে একসাথে। নিটোল হাতের ছোঁয়ায় নদীতে ঢেউ খেলে যায়। বাতাসের ঘ্রাণে ভেসে বেড়ায় বসন্তের ঘরবাড়ি। এমন রূপ থেকে মুক্ত হতে চেয়েছি বার বার। কিন্তু শেষমেশ ধরা পড়ে গেছি হাতেনাতেই।
একদিন আমাকে না বলেই চলে গেলে। রাগ হল। খুব। হয়তো বলতে চেয়েছিলে অনেক কিছুই। পারো নি । ভেবেছিলে কোনো লাভ নেই। তাই...
ফিরে এলে । কোলে কাকে যেন নিয়ে। তারপর আবার। এবং আবার। এভাবে কিশোরী কখন যে বড়ো হয়ে গেল! টের পেলাম কই?
একদিন চোখে চোখ। বললে- কেমন আছো? বললাম, গাছেদের মতো, মেঘেদের মতো , বৃষ্টির মতো , হাওয়ার মতো, শিশিরের মতো। খুব হাসলে । খুব। খুব। খুব। যেন অনেক অনেক দিন পর হেসে উঠলে সজিনা ফুলের মতো। মেঘের উপর সবচেয়ে উঁচু মেঘের মতো । আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। একা একা। পথগুলো ভাঙছিল। একে একে। টুকরো টুকরো হয়ে হারিয়ে যাচ্ছিল বাতাসে।
একটা চিরুনি কারখানায় কাজ পেলাম। হাম্বুর পেটানোর । সারাদিনে দেড়শো। আগুনের পাশে থেকে থেকে আগুন ভুলে গেলাম। একটু একটু করে।
সেদিন বাড়ি ফিরলাম। শুনলাম আর নেই! খুব কান্না পেল। অথচ একটুও পারলাম না। মনে পড়ল ওই ঠোঁট ওই বুক ওই চুল ওই হাত এখন আগুন মাখা। ওই পা ওই নগ্ন পা এখন নূপুরহীন দুপুরহীন পথে একলা একলা হেঁটে যাবে বৈতরণীর তীরে। ভাবছি ভাবছি আর ভাবছি । অথচ এক ফোঁটা জল এল না। তবে কি স্বার্থপর হয়ে গেলাম? এতটাই?
এরকম করে কেটে গেল দিন। বছর। যুগ। একদিন দেখলাম সব চুল সাদা। ঘর ভরতি কচিকাঁচারা । উঠোন ছোটো হতে হতে তুলসীবেদির থেকে একটু ছোটো। কাঁটাতারের শরীর জুরে কেবল পাণ্ডুলিপি। ঘাসবনে প্রোমোটারের পরিত্যক্ত বিয়ারবোতল আর চানাচুরের প্যাকেট। পাশে বালির ঢিবি। তবু চিলেকোঠায় মেঘ করলেই গম্ভীর হয়ে যাই আজও। ছাতা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ি ছাদে। একা একা। চেয়ে থাকি। দেখি জোছনা আবার ছেয়ে গেছে আমাদের ঘাসবনে। ভিজে গেছে উঠোন। ।বাবলাদের উঁচু উঁচু আমগাছগুলো। ঘাসবনে তখন রাজহাঁস । উড়ছে ছুটছে । আর ওপাশে দাঁড়িয়ে আমার কালো মেঘ। বৃষ্টির নিচে । একা !

আপনার মতামত জানান